১. বাচ্য কী?
মানুষ বাক্যের সাহায্যে মনের বিভিন্ন ভাব প্রকাশ করে। প্রত্যেক মানুষের কথা বলার ভঙ্গি স্বতন্ত্র। তাই বাক্যে কথা বলার ভঙ্গি বা প্রকৃতিও বিভিন্ন প্রকারের হয়। বাক্যে কথা বলার যে বিশিষ্ট ভঙ্গি, তাকেই বাচ্য বলে।
কথা বলার বিভিন্ন ভঙ্গি অনুসারে বাক্যে ক্রিয়াপদের রূপভেদ ঘটে। বাক্যে ক্রিয়ার সম্বন্ধ কর্তার সঙ্গে, না কর্মের সঙ্গে, অথবা কর্তা ও কর্ম কারও সঙ্গে না হয়ে কেবল ক্রিয়ার কাজটিকেই প্রকাশ করছে—এরকম ক্রিয়ার রূপভেদকেও বাচ্য বলে।
অর্থাৎ, বাক্যে ক্রিয়ার সঙ্গে কর্তা, কর্ম অথবা ক্রিয়ার ভাবের যে প্রধান সম্পর্ক প্রকাশ পায়, তার ভিত্তিতে ক্রিয়ার যে রূপভেদ ঘটে, তাকে বাচ্য বলে।
মনে রাখবে
একই বক্তব্যকে বাচ্যভেদে বিভিন্ন রূপে প্রকাশ করা যায়; সেক্ষেত্রে মূল বক্তব্যের অর্থ মোটামুটি একই থাকে, কিন্তু বাক্যের গঠনগত কাঠামো এবং কোন পদকে মুখ্য করে তোলা হচ্ছে, তার পরিবর্তন ঘটে।
যেমন—
পুলিশ চোর ধরেছে। — কর্তৃবাচ্য
পুলিশের হাতে চোর ধরা পড়েছে। — কর্ম-কর্তৃবাচ্য
চোর পুলিশের দ্বারা ধরা পড়েছে। — কর্মবাচ্য
আবার—
আমি বাবাকে চিঠি লিখেছি।
আমার দ্বারা বাবাকে চিঠি লেখা হয়েছে।
প্রথম বাক্যে ‘আমি’ মুখ্য; দ্বিতীয় বাক্যে ‘চিঠি’ মুখ্য হয়েছে।
২. বাচ্যের মূল ধারণা
বাচ্য বুঝতে হলে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে—
কর্তা → কে কাজ করছে?
কর্ম → কাকে/কীকে নিয়ে কাজটি হচ্ছে?
ক্রিয়া → কী কাজ হচ্ছে?
এই তিনটির মধ্যে বাক্যে কাকে মুখ্য করে ক্রিয়াটি প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিই বাচ্য নির্ণয়ের প্রধান সূত্র।
| বাচ্য | প্রধান বিষয় |
|---|---|
| কর্তৃবাচ্য | কর্তা |
| কর্মবাচ্য | কর্ম |
| ভাববাচ্য | ক্রিয়ার ভাব বা কাজ |
| কর্ম-কর্তৃবাচ্য | কর্মই যেন কর্তা বলে প্রতীয়মান |
৩. বাচ্যের শ্রেণিবিভাগ
বাংলা ব্যাকরণের প্রচলিত রীতিতে বাচ্যকে সাধারণভাবে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়—
১. কর্তৃবাচ্য
২. কর্মবাচ্য
৩. ভাববাচ্য
৪. কর্ম-কর্তৃবাচ্য
৪. কর্তৃবাচ্য
সংজ্ঞা
যে বাক্যে কর্তাই ক্রিয়ার কার্য সম্পন্ন করে, ক্রিয়াপদটি সরাসরি কর্তার সঙ্গে অন্বিত থাকে এবং ক্রিয়াপদটি কর্তারই অনুগামী হয়, তাকে কর্তৃবাচ্য বলে।
কর্তৃবাচ্যে কর্তার প্রাধান্য থাকে। অর্থাৎ, বক্তা বা লেখক কাজটির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকে বা সত্তাকে মুখ্য করে বক্তব্য প্রকাশ করেন।
উদাহরণ
মহিম গান জানে।
সুধীরবাবু কলকাতা গেছেন।
জীবন পড়াশোনা করে না।
সূর্যের চারদিকে পৃথিবী ঘুরছে।
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে।
ঝড় উঠল।
‘বাতাসে দুলিছে শনশন্ বনবীথিকা।’
হরিণটি বাঘের ভয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে।
উপরের প্রতিটি বাক্যে ক্রিয়াটি যে কর্তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত, তা স্পষ্ট। তাই এগুলি কর্তৃবাচ্য।
গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন
কর্তৃবাচ্যের কর্তা শুধু মানুষ বা প্রাণীই হবে—এমন নয়। উদ্ভিদ, জড়বস্তু, প্রাকৃতিক শক্তি বা অপ্রাণীবাচক পদও কর্তৃবাচ্যের কর্তা হতে পারে, যদি বাক্যে সেটিই ক্রিয়ার কর্তা হিসেবে গৃহীত হয়।
যেমন—
গাছটি বেড়ে উঠেছে।
সূর্য উঠেছে।
ঝড় উঠল।
নদী বইছে।
কর্তৃবাচ্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য
(১) কর্তৃবাচ্যে কর্তার প্রাধান্য থাকে।
(২) ক্রিয়া সাধারণত কর্তার অনুগামী হয়। কর্তার পুরুষ ও বচন অনুযায়ী ক্রিয়ার রূপ পরিবর্তিত হতে পারে।
যেমন—
আমি যাই।
তুমি যাও।
সে যায়।
তারা যায়।
(৩) কর্তৃবাচ্যে কর্তা সাধারণত শূন্য বিভক্তিযুক্ত হয়; তবে অর্থ ও ক্রিয়ার প্রকৃতি অনুযায়ী অন্যান্য বিভক্তিযুক্ত পদও কর্তার ভূমিকা নিতে পারে।
(৪) কর্তৃবাচ্যে কর্ম থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তাই কর্তৃবাচ্য সকর্মক ও অকর্মক—উভয় ক্রিয়াতেই হতে পারে।
যেমন—
রাম বই পড়ে। — সকর্মক কর্তৃবাচ্য
রাম ঘুমায়। — অকর্মক কর্তৃবাচ্য
৫. কর্মবাচ্য
সংজ্ঞা
যে বাক্যে কর্মই মুখ্য রূপে প্রতীয়মান হয় এবং ক্রিয়ার প্রধান সম্পর্ক কর্মের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাকে কর্মবাচ্য বলে।
কর্মবাচ্যে কর্তার তুলনায় কর্মের প্রাধান্য থাকে। কর্তৃবাচ্যের কর্মপদ কর্মবাচ্যে সাধারণত মুখ্য পদ বা কর্তার মর্যাদা লাভ করে।
উদাহরণ
রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক ‘গীতাঞ্জলি’ রচিত হয়।
আমার দ্বারা এ কাজটি হয়েছে।
রমার বইটি পড়া হয়ে গেছে।
শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রদের পড়াটি বুঝিয়ে দেওয়া হল।
এই বালকের হস্তে রাজচক্রবর্তী-লক্ষণ লক্ষিত হচ্ছে।
কর্মবাচ্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য
(১) কর্তৃবাচ্যের কর্মপদ কর্মবাচ্যে মুখ্য পদে পরিণত হয়
যেমন—
পিতা পুত্রকে একটি পুস্তক দিলেন। — কর্তৃবাচ্য
এখানে ‘পুস্তক’ মুখ্য কর্ম।
কর্মবাচ্যে—
পিতা কর্তৃক পুত্রকে একটি পুস্তক দেওয়া হল।
আবার গৌণ কর্মকে মুখ্য করে—
পিতা কর্তৃক পুত্র একটি পুস্তক প্রাপ্ত হল।
প্রচলিত ব্যাকরণে কর্মবাচ্যে মুখ্য কর্মের কর্তারূপে উন্নীত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
(২) কর্ম কর্তার মর্যাদা পেলে সাধারণত শূন্য বিভক্তি গ্রহণ করে
যেমন—
আমি চিঠি পেয়েছি।
→ আমার চিঠি পাওয়া হয়েছে।
শিক্ষক রমাকে আদেশ দিয়েছেন।
→ রমা শিক্ষকের আদেশ পেয়েছে।
তবে সব ক্ষেত্রে যান্ত্রিকভাবে বিভক্তি লোপ পাবে না; বাক্যের অর্থ ও গঠন অনুযায়ী রূপান্তর করতে হবে।
(৩) কর্তৃবাচ্যের কর্তা কর্মবাচ্যে অনুক্ত কর্তা হয়
কর্মবাচ্যে কর্তৃবাচ্যের কর্তা সাধারণত মুখ্য থাকে না। তাকে বলা হয় অনুক্ত কর্তা।
অনুক্ত কর্তার সঙ্গে সাধারণত—
- র/এর
- কে
- দ্বারা
- দিয়ে/দিয়া
- কর্তৃক
ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়।
যেমন—
সে এ কাজ পারবে না।
→ তার দ্বারা এ কাজ হবে না।
রবীন্দ্রনাথ ‘ভারততীর্থ’ কবিতা লেখেন।
→ ‘ভারততীর্থ’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের লেখা।
→ রবীন্দ্রনাথের দ্বারা ‘ভারততীর্থ’ কবিতাটি লেখা হয়।
(৪) কর্মবাচ্যে ক্রিয়ার বিশেষ রূপান্তর ঘটে
কর্তৃবাচ্যের ক্রিয়া কর্মবাচ্যে সাধারণত কৃদন্ত/ভাববাচক রূপ গ্রহণ করে ‘হওয়া’ বা অনুরূপ সহায়ক ক্রিয়ার সাহায্যে ব্যবহৃত হয়।
যেমন—
রাম রাবণকে নিহত করেন।
→ রাম কর্তৃক রাবণ নিহত হন।
যা জানবার তা জানলাম।
→ যা জানবার তা জানা হল।
মহিমকে ডাক।
→ মহিমকে ডাকা হোক।
কখনো কখনো ‘হওয়া’ ছাড়াও অন্য ক্রিয়ার সাহায্যে কর্মবাচ্যধর্মী অর্থ প্রকাশ পায়।
যেমন—
মধুবাবু আমাকে কলকাতায় ডেকেছেন।
→ আমি মধুবাবুর কলকাতা যাওয়ার ডাক পেয়েছি।
কখনো যৌগিক রূপও দেখা যায়—
মাতাপিতাকে ভক্তি করবে।
→ মাতাপিতাকে ভক্তি করা উচিত।
আবার কখনো মূল ক্রিয়াটির পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়—
আমি চিঠি পেয়েছি।
→ আমার চিঠি পাওয়া হয়েছে।
তারা সভা করছেন।
→ তাদের সভা চলছে।
আমায় টাকা দাও।
→ আমার টাকা চাই।
এখানে লক্ষণীয়, বাচ্যান্তর সব সময় শব্দে-শব্দে যান্ত্রিক রূপান্তর নয়; অর্থ ও বাক্যগঠনের স্বাভাবিকতা বজায় রাখাই প্রধান।
৬. ভাববাচ্য
সংজ্ঞা
যে বাক্যে কর্তা বা কর্মের তুলনায় ক্রিয়ার ভাব বা কাজটিই প্রধান হয়ে ওঠে এবং ক্রিয়ার সংঘটন বা সম্পাদনের ভাবকে মুখ্য করে বক্তব্য প্রকাশ করা হয়, তাকে ভাববাচ্য বলে।
অর্থাৎ, এখানে প্রশ্নটি প্রধান নয়—কে কাজটি করল বা কাকে নিয়ে কাজটি হল; বরং কাজটি হওয়া বা না-হওয়ার ঘটনাই মুখ্য।
উদাহরণ
ছেলেটি খেলছে।
→ ছেলেটির খেলা হচ্ছে।
মূল ক্রিয়া ‘খেলছে’। ভাববাচ্যে ‘খেলা’ ক্রিয়াবাচক/ভাববাচক বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত হয়েছে এবং তার সঙ্গে ‘হচ্ছে’ যুক্ত হয়েছে।
আরও উদাহরণ—
কখন খাবে?
→ খাওয়া হবে কখন?
থাক কোথায়?
→ থাকা হয় কোথায়?
মা রেগে গেছেন।
→ মায়ের রাগ হয়েছে।
মন্ত্রীমশাই সরে পড়লেন।
→ মন্ত্রীমশাইকে সরে পড়তে হল।
আজ তুমি কলেজ যাবে।
→ আজ তোমাকে কলেজ যেতে হবে।
ভাববাচ্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য
(১) ভাববাচ্যে ক্রিয়ার অর্থ বা কাজের ভাবই প্রধান হয়।
(২) কর্তা বা কর্ম মুখ্য থাকে না; অনেক ক্ষেত্রে কর্তা অনুক্ত থাকে।
(৩) কর্তা-সংক্রান্ত পদে সাধারণত সম্বন্ধবাচক রূপ দেখা যায়।
যেমন—
আমি যাব।
→ আমার যাওয়া হবে।
তুমি যাবে।
→ তোমার যাওয়া হবে।
(৪) ভাববাচ্যে ক্রিয়ার ভাব সাধারণত ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য বা কৃদন্ত রূপে প্রকাশ পায়।
(৫) প্রচলিত বাংলা ব্যাকরণে ভাববাচ্যের সহায়ক ক্রিয়া সাধারণত ‘হওয়া’ বা ‘যাওয়া’-জাতীয় ক্রিয়ার সাহায্যে গঠিত হয়।
(৬) প্রচলিত ব্যাকরণে ভাববাচ্যের সহায়ক ক্রিয়া সাধারণত প্রথম পুরুষের রূপে ব্যবহৃত হয় বলে বর্ণনা করা হয়; তবে আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে এটিকে যান্ত্রিক নিয়ম না ধরে ভাবপ্রধান, কর্তা-নিরপেক্ষ ক্রিয়ারূপ হিসেবে বোঝাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।
৭. কর্ম-কর্তৃবাচ্য
সংজ্ঞা
কতকগুলি বাক্যে ক্রিয়ার প্রকৃত কর্তা প্রকাশিত থাকে না; কর্মপদই যেন কর্তারূপে প্রতীয়মান হয় এবং ক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি অন্বিত হয়—তখন তাকে কর্ম-কর্তৃবাচ্য বলে।
এখানে বাহ্যিকভাবে কর্মই কর্তার মতো আচরণ করে। কিন্তু বাস্তবে সে নিজে কাজটি সম্পাদন করছে না।
উদাহরণ
শাঁখ বাজে।
শীত কাপড় ছিঁড়ছে।
ঘুড়ি উড়ছে।
কলসি ভরেছে।
ফল পাকে।
বাঁশ ভাঙে।
এখানে—
ঘুড়ি উড়ছে।
ঘুড়ি নিজে উড়ছে না; কেউ তাকে ওড়াচ্ছে। অথচ বাক্যে ‘ঘুড়ি’-ই ক্রিয়ার সঙ্গে কর্তার মতো সরাসরি যুক্ত হয়েছে। তাই এটি কর্ম-কর্তৃবাচ্য।
কর্ম-কর্তৃবাচ্যের বিশেষ লক্ষণ
কর্ম-কর্তৃবাচ্যে সাধারণত অপ্রাণীবাচক পদ কর্মের মতো হলেও কর্তার মর্যাদা গ্রহণ করে।
তবে শুধুমাত্র অপ্রাণীবাচক পদ থাকলেই কর্ম-কর্তৃবাচ্য হবে না।
তুলনা করো—
ঘুড়ি উড়ছে। — কর্ম-কর্তৃবাচ্য
কারণ ঘুড়ি নিজে উড়তে পারে না।
কিন্তু—
পাখি উড়ছে। — কর্তৃবাচ্য
কারণ পাখি নিজেই উড়তে পারে।
আবার—
গাছ দুলছে।
এখানে গাছের দোলার কারণ বাতাস হলেও বাক্যে ‘গাছ’কে এমনভাবে ধরা হয়েছে যে সে নিজেই ক্রিয়ার কর্তা হিসেবে প্রতীয়মান; তাই শুধু অপ্রাণীবাচকতা দেখে কর্ম-কর্তৃবাচ্য নির্ণয় করা যাবে না। বাক্যের অর্থগত সম্পর্ক ও ক্রিয়ার প্রকৃতি বিচার করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
অপ্রাণীবাচক কর্তা + স্বতঃসিদ্ধভাবে কাজটি না করার ক্ষমতা + ক্রিয়ার কর্তারূপে তার প্রকাশ = কর্ম-কর্তৃবাচ্যের সম্ভাবনা।
৮. চার বাচ্যের তুলনামূলক ছক
| বাচ্য | যার প্রাধান্য | প্রধান বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| কর্তৃবাচ্য | কর্তা | কর্তা ক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত | রাম বই পড়ে। |
| কর্মবাচ্য | কর্ম | কর্ম মুখ্য হয়; কর্তা অনুক্ত হতে পারে | রামের দ্বারা বই পড়া হয়। |
| ভাববাচ্য | ক্রিয়ার ভাব | কাজটি হওয়ার ভাব মুখ্য | রামের বই পড়া হয়। |
| কর্ম-কর্তৃবাচ্য | কর্মের মতো পদ | কর্মই যেন কর্তারূপে প্রকাশিত | ঘুড়ি উড়ছে। |
৯. বাচ্য নির্ণয়ের সহজ পদ্ধতি
কোনো বাক্যের বাচ্য নির্ণয় করতে নিম্নলিখিত ধাপগুলি অনুসরণ করা যায়।
প্রথম ধাপ
বাক্যের ক্রিয়াপদটি চিহ্নিত করো।
দ্বিতীয় ধাপ
প্রশ্ন করো—
কে কাজটি করছে?
যদি কর্তা স্পষ্টভাবে মুখ্য হয় → কর্তৃবাচ্য।
তৃতীয় ধাপ
দেখো, কর্মটি কি মুখ্য হয়ে উঠেছে?
কর্ম মুখ্য এবং কর্তা অনুক্ত/‘দ্বারা’, ‘কর্তৃক’ ইত্যাদির সাহায্যে প্রকাশিত → কর্মবাচ্য।
চতুর্থ ধাপ
দেখো, কর্তা-কর্মের তুলনায় কাজটির ভাবই কি মুখ্য?
→ ভাববাচ্য।
পঞ্চম ধাপ
দেখো, কর্মপদই কি কর্তার মতো ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, অথচ বাস্তবে সে কাজটি করছে না?
→ কর্ম-কর্তৃবাচ্য।
১০. বাচ্যান্তর বা বাচ্য-পরিবর্তন
সংজ্ঞা
একটি বাচ্য থেকে অন্য বাচ্যে বাক্যের রূপ পরিবর্তন করাকে বাচ্যান্তর বা বাচ্য-পরিবর্তন বলে।
বাচ্য পরিবর্তনের সময় প্রধান শর্ত হল—
মূল বক্তব্যের অর্থ যথাসম্ভব অপরিবর্তিত রেখে বাক্যের গঠন ও ক্রিয়ার রূপ পরিবর্তন করতে হবে।
বাচ্য পরিবর্তনের সাধারণ নিয়ম
(১) বাক্যের মূল অর্থ অপরিবর্তিত রাখতে হবে।
(২) কর্তা, কর্ম ও ক্রিয়ার অবস্থান ও রূপ পরিবর্তিত হতে পারে।
(৩) বাচ্যান্তরের সময় বাক্যের অন্যান্য পদ অযথা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
(৪) কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্য এবং ভাববাচ্যে রূপান্তর করা যায়; প্রয়োজন অনুযায়ী বিপরীত দিকেও রূপান্তর করা যায়।
(৫) সব বাক্যের বাচ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়।
(৬) বিশেষত অকর্মক ক্রিয়াযুক্ত বহু কর্তৃবাচ্যের সরাসরি কর্মবাচ্য হয় না।
যেমন—
রাম ঘুমায়।
এখানে ‘ঘুমায়’ অকর্মক ক্রিয়া। কোনো কর্ম নেই। তাই এর স্বাভাবিক কর্মবাচ্য করা যায় না।
১১. কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্য
কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাধারণত নিম্নলিখিত পরিবর্তন ঘটে—
সূত্র
কর্তা → অনুক্ত কর্তা
কর্ম → মুখ্য পদ/কর্তার মর্যাদা
মূল ক্রিয়া → কৃদন্ত/ভাবরূপ + হওয়া-জাতীয় সহায়ক ক্রিয়া
উদাহরণ
পুলিশ চোর ধরেছে।
→ পুলিশের দ্বারা চোর ধরা হয়েছে।
এখানে—
- ‘পুলিশ’ → অনুক্ত কর্তা
- ‘চোর’ → মুখ্য পদ
- ‘ধরেছে’ → ‘ধরা হয়েছে’
আরও—
রবীন্দ্রনাথ ‘গীতাঞ্জলি’ রচনা করেছেন।
→ ‘গীতাঞ্জলি’ রবীন্দ্রনাথের দ্বারা রচিত হয়েছে।
কর্তৃবাচ্য → কর্মবাচ্য : মূল সূত্র
১। কর্তার সাধারণত সম্বন্ধরূপ করা হয়।
রাম → রামের
রবীন্দ্রনাথ → রবীন্দ্রনাথের
২। প্রয়োজন অনুসারে দ্বারা/দিয়া/দিয়ে/কর্তৃক যোগ করা হয়।
৩। কর্মপদকে মুখ্য পদে উন্নীত করা হয়।
৪। মূল ক্রিয়ার পরিবর্তে সাধারণত কৃদন্ত রূপ ব্যবহৃত হয়।
৫। তার সঙ্গে হওয়া/যাওয়া-জাতীয় সহায়ক ক্রিয়া যুক্ত হয়।
১২. কর্তৃবাচ্য থেকে ভাববাচ্য
সাধারণ সূত্র
কর্তা → সম্বন্ধরূপ
মূল ক্রিয়া → ক্রিয়াবাচক/ভাববাচক বিশেষ্য
সহায়ক ক্রিয়া → হওয়া/যাওয়া/লাগা ইত্যাদি প্রসঙ্গনির্ভর রূপ
উদাহরণ
আমি যাব।
→ আমার যাওয়া হবে।
তুমি আজ কলেজ যাবে।
→ আজ তোমার কলেজ যাওয়া হবে।
সে পড়ে।
→ তার পড়া হয়।
তারা খেলল।
→ তাদের খেলা হল।
১৩. কর্মবাচ্য থেকে ভাববাচ্য
কর্মবাচ্য থেকে ভাববাচ্যে পরিবর্তনের সময়—
১। অনুক্ত কর্তার সঙ্গে যুক্ত দ্বারা/কর্তৃক/দিয়ে/দিয়া ইত্যাদি সাধারণত লোপ পায়।
২। মুখ্য কর্মের গুরুত্ব কমে যায় বা প্রয়োজনে তা বাদ পড়ে।
৩। ক্রিয়ার ভাবকে মুখ্য করা হয়।
উদাহরণ
আমার দ্বারা এখানে থাকা হয় না।
→ আমার এখানে থাকা হয় না।
তার দ্বারা এতক্ষণ অপেক্ষা করা হল।
→ তার এতক্ষণ অপেক্ষা করা হল।
তবে প্রতিটি কর্মবাচ্যকে যান্ত্রিকভাবে ভাববাচ্যে রূপান্তর করা যায় না। অর্থ, ক্রিয়ার প্রকৃতি এবং বাক্যের স্বাভাবিকতা বিচার করতে হয়।
১৪. ভাববাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্য
সূত্র
ভাববাচ্যের—
সম্বন্ধবাচক পদ → কর্তা
ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য → মূল ক্রিয়া
যেমন—
আমার যাওয়া হবে।
→ আমি যাব।
তার পড়া হয়।
→ সে পড়ে।
তোমার এখানে থাকা হবে না।
→ তুমি এখানে থাকবে না।
১৫. কর্মবাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্য
কর্মবাচ্যে যে পদটি দ্বারা/কর্তৃক/দিয়ে ইত্যাদির সাহায্যে অনুক্ত কর্তা হিসেবে থাকে, তাকে কর্তৃবাচ্যে কর্তা করতে হয়। কর্মপদকে আবার কর্মের মর্যাদায় ফিরিয়ে এনে মূল ক্রিয়াকে কর্তৃবাচ্যের রূপ দিতে হয়।
যেমন—
পুলিশের দ্বারা চোর ধরা হয়েছে।
→ পুলিশ চোর ধরেছে।
রবীন্দ্রনাথের দ্বারা ‘গীতাঞ্জলি’ রচিত হয়েছে।
→ রবীন্দ্রনাথ ‘গীতাঞ্জলি’ রচনা করেছেন।
১৬. বাচ্যান্তরের একটি পূর্ণ উদাহরণ
কর্তৃবাচ্য
রাম চিঠি লিখেছে।
কর্মবাচ্য
রামের দ্বারা চিঠি লেখা হয়েছে।
ভাববাচ্য
রামের চিঠি লেখা হয়েছে।
এখানে তিনটি বাক্যের মূল কাজ একই—চিঠি লেখা। কিন্তু—
- প্রথমটিতে রাম মুখ্য;
- দ্বিতীয়টিতে চিঠি মুখ্য;
- তৃতীয়টিতে চিঠি লেখার কাজটি মুখ্য।
এটাই বাচ্যের প্রকৃত তাৎপর্য।
১৭. সকর্মক ও অকর্মক ক্রিয়ার সঙ্গে বাচ্যের সম্পর্ক
বাচ্য নির্ণয়ে ক্রিয়ার প্রকৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সকর্মক ক্রিয়া
যে ক্রিয়ার সঙ্গে কর্ম থাকে তাকে সকর্মক ক্রিয়া বলে।
রাম বই পড়ে।
সে চিঠি লেখে।
এ ধরনের ক্রিয়া থেকে সাধারণত কর্মবাচ্য তৈরি করা যায়।
রামের দ্বারা বই পড়া হয়।
তার দ্বারা চিঠি লেখা হয়।
অকর্মক ক্রিয়া
যে ক্রিয়ার কোনো কর্ম থাকে না তাকে অকর্মক ক্রিয়া বলে।
রাম ঘুমায়।
পাখি উড়ে।
শিশুটি হাসে।
এ ধরনের ক্রিয়ার সাধারণ কর্মবাচ্য হয় না।
তাই মনে রাখবে
কর্মবাচ্যের প্রধান পূর্বশর্ত—কর্মের উপস্থিতি।
তবে বাংলা ভাষায় কিছু বিশেষ গঠন আছে যেখানে প্রচলিত ‘কর্ম’ ধারণা ও বাচ্যগত বিশ্লেষণ একেবারে সরল নয়। তাই শুধু কর্ম আছে কি নেই—এই একটি সূত্রেই সব ক্ষেত্রে বাচ্য নির্ণয় করা উচিত নয়।
১৮. কোন বাক্যের বাচ্য পরিবর্তন করা যায় না?
সব বাক্যের বাচ্যান্তর সম্ভব নয়।
(ক) বহু অকর্মক ক্রিয়াযুক্ত বাক্য
পাখি উড়ছে।
শিশু হাসছে।
লোকটি ঘুমাচ্ছে।
এগুলির স্বাভাবিক কর্মবাচ্য হয় না।
(খ) যেসব বাক্যে কর্ম নেই
কর্ম না থাকলে সাধারণ নিয়মে কর্মবাচ্য তৈরির সুযোগ থাকে না।
(গ) কর্ম-কর্তৃবাচ্য
প্রচলিত ব্যাকরণে কর্ম-কর্তৃবাচ্যকে সাধারণত অন্য বাচ্যে পরিবর্তন করা হয় না।
১৯. বাচ্য ও পুরুষ
কর্তৃবাচ্যে কর্তার পুরুষ অনুযায়ী ক্রিয়ার রূপ পরিবর্তিত হতে পারে।
আমি যাই। — উত্তম পুরুষ
তুমি যাও। — মধ্যম পুরুষ
সে যায়। — প্রথম পুরুষ
কিন্তু কর্মবাচ্য ও ভাববাচ্যে ক্রিয়ার রূপান্তর ঘটায় কর্তার সঙ্গে ক্রিয়ার সরাসরি সম্পর্ক অনেক সময় দুর্বল বা বিলুপ্ত হয়।
তাই বাচ্য নির্ণয়ের সময় শুধু ক্রিয়ার পুরুষ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না; ক্রিয়া কাকে মুখ্য করে প্রকাশিত হয়েছে, সেটিই প্রধান।
২০. বাচ্য ও অনুজ্ঞাসূচক বাক্য
অনুজ্ঞাসূচক বাক্যেও বাচ্যান্তর হতে পারে।
যেমন—
বেলাকে বলো।
→ বেলাকে বলা হোক।
চোরটাকে শাস্তি দাও।
→ চোরের শাস্তি হোক।
মহিমকে ডাক।
→ মহিমকে ডাকা হোক।
এখানে ক্রিয়ার নির্দেশমূলক ভাব বজায় রেখে বাচ্যের পরিবর্তন ঘটেছে।
২১. বাচ্য নির্ণয়ে কয়েকটি সূক্ষ্ম পার্থক্য
‘রাম বই পড়ে।’
এখানে রাম কাজ করছে এবং বই কর্ম।
→ কর্তৃবাচ্য
‘রামের দ্বারা বই পড়া হয়।’
এখানে বই মুখ্য এবং ‘রাম’ অনুক্ত কর্তা।
→ কর্মবাচ্য
‘রামের বই পড়া হয়।’
এখানে বই পড়ার কাজটিই মুখ্য।
→ ভাববাচ্য
‘বই খুলছে।’
যদি অর্থ হয় বইটি নিজে নিজে খোলা অবস্থায় যাচ্ছে/খুলে যাচ্ছে, তাহলে প্রেক্ষিতভেদে এটি স্বাভাবিক কর্তৃবাচ্যধর্মী গঠন হতে পারে; কিন্তু—
দরজা খুলছে।
এর অর্থ যদি হয় কেউ দরজা খুলছে অথচ কর্তা প্রকাশিত নয়, তাহলে প্রচলিত বিশ্লেষণে এটি কর্ম-কর্তৃবাচ্যধর্মী অর্থ প্রকাশ করতে পারে। তাই শুধু ক্রিয়ার রূপ দেখে নয়, বাক্যের অর্থ ও প্রেক্ষিত দেখে বাচ্য নির্ণয় করতে হবে।
২২. বাচ্য নির্ণয়ের পরীক্ষামূলক কৌশল
পরীক্ষায় দ্রুত বাচ্য নির্ণয়ের জন্য চারটি প্রশ্ন মনে রাখো—
১. ‘কে?’
কে কাজটি করছে?
→ কর্তা মুখ্য হলে কর্তৃবাচ্য।
২. ‘কাকে/কীকে?’
কাকে বা কীকে কেন্দ্র করে কাজটি প্রকাশিত?
→ কর্ম মুখ্য হলে কর্মবাচ্য।
৩. ‘কাজটি কীভাবে/হওয়ার ভাব?’
কর্তা-কর্মের চেয়ে কাজটি হওয়ার ঘটনাই মুখ্য?
→ ভাববাচ্য।
৪. ‘যে পদটি কাজ করতে পারে না, সেটিই কি কর্তার মতো এসেছে?’
→ কর্ম-কর্তৃবাচ্য হওয়ার সম্ভাবনা।
২৩. বাচ্যের চার রূপ এক নজরে
রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখেছেন।
— কর্তৃবাচ্য
রবীন্দ্রনাথের দ্বারা কবিতা লেখা হয়েছে।
— কর্মবাচ্য
রবীন্দ্রনাথের কবিতা লেখা হয়েছে।
— ভাববাচ্যধর্মী গঠন
কলম চলছে।
— প্রেক্ষিতভেদে কর্ম-কর্তৃবাচ্যধর্মী অর্থ সম্ভব
২৪. বাচ্য ও বাক্যের অর্থ
বাচ্য পরিবর্তন করলে মূল ঘটনার সম্পর্ক সাধারণত বজায় থাকে, কিন্তু দৃষ্টিকোণ পরিবর্তিত হয়।
শিক্ষক ছাত্রকে পুরস্কৃত করলেন।
এখানে শিক্ষক মুখ্য।
ছাত্রটি শিক্ষকের দ্বারা পুরস্কৃত হল।
এখানে ছাত্র মুখ্য।
অর্থাৎ, বাচ্য কেবল ক্রিয়ার রূপের পরিবর্তন নয়; বক্তব্যের দৃষ্টিকোণ বা focus-এর পরিবর্তনও।
এই কারণেই বাচ্য ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ-গঠনগত ও বাক্য-গঠনগত বৈশিষ্ট্য।
২৫. সাধারণ ভুল ও সংশোধন
ভুল ১
‘বাচ্য মানে শুধু ক্রিয়ার রূপ।’
সংশোধন
বাচ্য ক্রিয়ার রূপের সঙ্গে যুক্ত হলেও শুধু ক্রিয়ার রূপ নয়; কর্তা, কর্ম এবং ক্রিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রাধান্য বাচ্য নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভুল ২
সব অপ্রাণীবাচক কর্তা থাকলেই কর্ম-কর্তৃবাচ্য।
সংশোধন
তা নয়। অপ্রাণীবাচক পদটি কর্মের মতো অবস্থান করেও কর্তারূপে প্রতীয়মান হচ্ছে কি না, সেটি বিচার করতে হবে।
ভুল ৩
সব কর্তৃবাচ্যকে কর্মবাচ্যে পরিবর্তন করা যায়।
সংশোধন
না। বিশেষত অকর্মক ক্রিয়াযুক্ত বহু বাক্যের কর্মবাচ্য হয় না।
ভুল ৪
কর্মবাচ্যে কর্তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
সংশোধন
কর্তা অনুক্ত হতে পারে, আবার দ্বারা, কর্তৃক, দিয়ে, দিয়া ইত্যাদির সাহায্যে প্রকাশিতও হতে পারে।
ভুল ৫
বাচ্য পরিবর্তনে শুধু ক্রিয়াপদ পরিবর্তন করলেই হয়।
সংশোধন
বাচ্যান্তরে কর্তা, কর্ম, বিভক্তি, ক্রিয়ার রূপ এবং বাক্যগঠন—একাধিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
২৬. বাচ্য মনে রাখার সংক্ষিপ্ত সূত্র
কর্তা মুখ্য → কর্তৃবাচ্য
কর্ম মুখ্য → কর্মবাচ্য
ক্রিয়ার ভাব মুখ্য → ভাববাচ্য
কর্মই কর্তার মতো → কর্ম-কর্তৃবাচ্য
আর বাচ্যান্তরের ক্ষেত্রে—
কর্তা ↔ কর্ম ↔ ক্রিয়ার ভাব
— এই তিনটি কেন্দ্রের পরিবর্তনই বাচ্যান্তরের মূল রহস্য।
২৭. গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ : বাচ্য নির্ণয়
| বাক্য | বাচ্য |
|---|---|
| রাম ভাত খায়। | কর্তৃবাচ্য |
| রামের দ্বারা ভাত খাওয়া হয়। | কর্মবাচ্য |
| রামের ভাত খাওয়া হয়। | ভাববাচ্য |
| ঘুড়ি উড়ছে। | কর্ম-কর্তৃবাচ্য |
| পুলিশ চোর ধরেছে। | কর্তৃবাচ্য |
| পুলিশের দ্বারা চোর ধরা হয়েছে। | কর্মবাচ্য |
| আমার যাওয়া হবে। | ভাববাচ্য |
| শাঁখ বাজে। | কর্ম-কর্তৃবাচ্য |
| পাখি উড়ছে। | কর্তৃবাচ্য |
| তার দ্বারা কাজটি করা হয়েছে। | কর্মবাচ্য |
২৮. পরীক্ষায় লেখার মতো সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা
কর্তৃবাচ্য
যে বাক্যে কর্তা মুখ্য এবং ক্রিয়াপদ কর্তার অনুগামী থাকে, তাকে কর্তৃবাচ্য বলে।
কর্মবাচ্য
যে বাক্যে কর্ম মুখ্য হয়ে ক্রিয়ার সঙ্গে প্রধান সম্পর্ক স্থাপন করে, তাকে কর্মবাচ্য বলে।
ভাববাচ্য
যে বাক্যে কর্তা বা কর্মের পরিবর্তে ক্রিয়ার ভাব বা কাজটি প্রধান হয়ে ওঠে, তাকে ভাববাচ্য বলে।
কর্ম-কর্তৃবাচ্য
যে বাক্যে কর্মপদই কর্তার মতো প্রতীয়মান হয়ে ক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি অন্বিত হয়, তাকে কর্ম-কর্তৃবাচ্য বলে।
২৯. অনুশীলনী
ক. নিম্নলিখিত বাক্যগুলির বাচ্য নির্ণয় করো
১। আমি প্রতিদিন বাংলা পড়ি।
২। আমার দ্বারা কাজটি সম্পন্ন হয়েছে।
৩। আজ তার যাওয়া হবে না।
৪। ঘুড়ি আকাশে উড়ছে।
৫। শিক্ষক ছাত্রকে পুরস্কার দিলেন।
৬। ছাত্রটি শিক্ষকের দ্বারা পুরস্কৃত হল।
৭। আমার এখানে থাকা হবে না।
৮। পাখি গাছে বসেছে।
৯। দরজা খুলছে।
১০। পুলিশ চোরকে গ্রেপ্তার করেছে।
খ. বাচ্য পরিবর্তন করো
১। রাম চিঠি লিখেছে।
২। শিক্ষক ছাত্রকে পড়িয়েছেন।
৩। পুলিশ চোরকে ধরেছে।
৪। আমি কাজটি করেছি।
৫। সে বই পড়ে।
৬। আমি আজ যাব।
৭। তুমি এখানে থাকবে।
৮। রবীন্দ্রনাথ কবিতাটি লিখেছেন।
৩০. শেষকথা
বাচ্য হল বাক্যের ক্রিয়াকে দেখার দৃষ্টিকোণ। একই ঘটনাকে কখনো কর্তার চোখে, কখনো কর্মের চোখে, আবার কখনো নিছক কাজটির সংঘটন হিসেবে প্রকাশ করা যায়। তাই বাচ্য কেবল ব্যাকরণের একটি রূপগত অধ্যায় নয়; এটি বক্তব্যের কেন্দ্র, ক্রিয়ার সম্পর্ক এবং বাক্যের দৃষ্টিকোণ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক উপায়।
একটি বাক্যে কে কাজ করছে, কাকে বা কীকে নিয়ে কাজটি হচ্ছে, এবং কাজটির ঘটনাই কি মুখ্য—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেই বাচ্য নির্ণয়ের মূল সূত্রটি ধরা যায়।
কর্তার প্রাধান্য—কর্তৃবাচ্য;
কর্মের প্রাধান্য—কর্মবাচ্য;
ক্রিয়ার ভাবের প্রাধান্য—ভাববাচ্য;
আর কর্মের কর্তারূপে প্রতীয়মান হওয়া—কর্ম-কর্তৃবাচ্য।
পরিবেশনে— ড. অনিশ রায়

