অধ্যায় : কারক, বিভক্তি, নির্দেশক, অনুসর্গ ও অকারক

বাংলা ব্যাকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম অধ্যায় হল কারক, বিভক্তি, নির্দেশক, অনুসর্গ ও অকারক। বাক্যের বিভিন্ন পদের পারস্পরিক সম্পর্ক, বিশেষত ক্রিয়ার সঙ্গে নামপদের সম্পর্ক, কীভাবে প্রকাশিত হয়—এই অধ্যায়ে তারই সুসংবদ্ধ আলোচনা করা হয়। কারক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে শুধু শব্দের শেষে ‘এ’, ‘কে’, ‘তে’, ‘র/এর’ ইত্যাদি চিহ্ন দেখলেই চলে না; দেখতে হয় ক্রিয়াটি কী এবং সেই ক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদটির অর্থগত সম্পর্ক কী। আবার ‘টি’, ‘টা’, ‘গুলি’, ‘গুলো’ প্রভৃতি নির্দেশককে বিভক্তি ভাবলে ভুল হবে; ‘জন্য’, ‘থেকে’, ‘দিয়ে’, ‘কাছে’, ‘জন্য’ প্রভৃতি অনুসর্গও বিভক্তি নয়। অন্যদিকে ‘র/এর’ বিভক্তিযুক্ত সম্বন্ধপদ এবং সম্বোধনপদ কারক নয়—এগুলি অকারক

সুতরাং এই অধ্যায়ে বিষয়গুলিকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পরস্পরের সম্পর্কের ভিতর দিয়ে বোঝা হবে।


১. কারক

কারক শব্দের অর্থ

‘কারক’ শব্দটি সংস্কৃত ‘কৃ’ ধাতু থেকে গঠিত। ‘কৃ’ ধাতুর অর্থ করা বা সম্পাদন করা। ব্যাকরণে ‘কারক’ বলতে বোঝায়—ক্রিয়ার সঙ্গে বাক্যের বিভিন্ন নামপদের কার্যগত সম্পর্ক

কারক কাকে বলে?

বাক্যে ব্যবহৃত বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের সঙ্গে সমাপিকা ক্রিয়াপদের যে অর্থগত ও ব্যাকরণগত সম্পর্ক থাকে, তাকে কারক বলে।

সহজ কথায়—

ক্রিয়ার সঙ্গে নামপদের সম্পর্কই কারক।

যেমন—

রাহুল বই পড়ে।

এখানে ‘পড়ে’ ক্রিয়ার সঙ্গে—

  • ‘রাহুল’-এর সম্পর্ক → যে পড়ছে → কর্তৃকারক
  • ‘বই’-এর সম্পর্ক → যা পড়া হচ্ছে → কর্মকারক

আবার—

রাহুল কলম দিয়ে চিঠি লেখে।

এখানে—

  • রাহুল → কর্তৃকারক
  • কলম দিয়ে → করণকারক
  • চিঠি → কর্মকারক

অতএব কারক নির্ণয়ের মূল কেন্দ্র হল ক্রিয়া


২. কারক ও বিভক্তির সম্পর্ক

কারক এবং বিভক্তি এক জিনিস নয়।

কারক হল সম্পর্ক; বিভক্তি হল সেই সম্পর্ক প্রকাশের একটি ব্যাকরণগত চিহ্ন।

যেমন—

রাহুলকে দেখলাম।

এখানে ‘দেখলাম’ ক্রিয়ার সঙ্গে ‘রাহুল’-এর যে সম্পর্ক, তা কর্মকারক। আর ‘কে’ হল সেই পদের সঙ্গে যুক্ত বিভক্তি

অতএব—

রাহুল → কর্মকারক
কে → বিভক্তি

আবার—

ঘরে বসে আছি।

এখানে—

ঘর → অধিকরণ কারক
এ → বিভক্তি

সুতরাং—

কারক ≠ বিভক্তি।


৩. কারকের শ্রেণিবিভাগ

বাংলা ব্যাকরণের এই পাঠধারায় কারক প্রধানত ছয় প্রকার

১. কর্তৃকারক
২. কর্মকারক
৩. করণকারক
৪. নিমিত্ত কারক
৫. অপাদান কারক
৬. অধিকরণ কারক

এখানে বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, এই পাঠধারায় সংস্কৃত ব্যাকরণের ‘সম্প্রদান কারক’কে স্বতন্ত্র কারক হিসেবে না রেখে ‘নিমিত্ত কারক’ বলা হয়।


৪. বিভক্তি

কারক বোঝার পরেই আসে বিভক্তির প্রসঙ্গ। কারণ কারক-সম্পর্ক অনেক সময় বিভক্তির সাহায্যে প্রকাশিত হয়।

বিভক্তি কাকে বলে?

বাক্যে ব্যবহৃত শব্দের সঙ্গে অন্য পদের সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য এবং শব্দকে পদে পরিণত করার জন্য শব্দের শেষে যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি যুক্ত হয়, তাকে বিভক্তি বলে।

যেমন—

ছাদ + এ = ছাদে

বাক্য:

শিশুটি ছাদে বসে আছে।

এখানে ‘ছাদ’ শব্দের সঙ্গে ‘এ’ যুক্ত হয়ে ‘ছাদে’ হয়েছে।


৫. বিভক্তির প্রধান শ্রেণিবিভাগ

বিভক্তি প্রধানত দুই প্রকার—

১. শব্দবিভক্তি

বিশেষ্য, সর্বনাম প্রভৃতি নামপদের সঙ্গে যুক্ত হয়।

যেমন—

রাম + কে = রামকে
ঘর + এ = ঘরে
দেশ + এর = দেশের

২. ধাতুবিভক্তি বা ক্রিয়াবিভক্তি

ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্রিয়াপদ গঠন করে।

যেমন—

কর + ই = করি
কর + ল = করল
কর + ছি = করছি

এই অধ্যায়ে আমাদের আলোচনার প্রধান বিষয় শব্দবিভক্তি


৬. বাংলা শব্দবিভক্তি

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত প্রধান শব্দবিভক্তিগুলি হল—

শূন্য, এ, তে, কে, রে, র, এর, য়/য়ে প্রভৃতি।

এগুলির ব্যবহার সর্বত্র একরকম নয়। একই বিভক্তি একাধিক কারকে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই বিভক্তি দেখে সরাসরি কারক নির্ণয় করা যায় না।


৬.১ শূন্য বিভক্তি

শূন্য বিভক্তি কী?

যে বিভক্তির কোনো দৃশ্যমান রূপ নেই, কিন্তু তার উপস্থিতি ব্যাকরণগতভাবে স্বীকৃত, তাকে শূন্য বিভক্তি বলে।

এর চিহ্ন—

Ø

যেমন—

রাম যায়।

এখানে ‘রাম’ কর্তৃকারক। কিন্তু তার সঙ্গে কোনো দৃশ্যমান বিভক্তি নেই।

বিশ্লেষণ—

রাম + Ø

আবার—

আমি বই পড়ি।

এখানে—

বই + Ø → কর্মকারক

অতএব শূন্য বিভক্তি শুধু কর্তৃকারকেই নয়, অন্য কারকেও ব্যবহৃত হতে পারে।

উদাহরণ

পাখি উড়ছে।
পাখি → কর্তৃকারক, শূন্য বিভক্তি।

আমি গান গাই।
গান → কর্মকারক, শূন্য বিভক্তি।

ছেলে ফুটবল খেলছে।
ছেলে → কর্তৃকারক, শূন্য বিভক্তি।


৭. ‘এ’ বিভক্তি

‘এ’ বাংলা ভাষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভক্তি। এটি একাধিক কারকে ব্যবহৃত হয়।

অধিকরণে

ঘরে বসে আছি।
→ ঘর + এ

মাঠে ছেলেরা খেলছে।
→ মাঠ + এ

করণে

চোখে দেখি।
→ চোখ + এ

অপাদানে

তিলে তেল হয়।
→ তিল + এ

অতএব একই ‘এ’—

  • করণকারক প্রকাশ করতে পারে,
  • অধিকরণ কারক প্রকাশ করতে পারে,
  • অপাদান কারক প্রকাশ করতে পারে।

এই কারণে ‘এ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ তির্যক বিভক্তি


৮. ‘তে’ বিভক্তি

‘তে’ বিভক্তিও প্রধানত স্থান, আধার, কাল বা অন্য সম্পর্ক প্রকাশে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

বাড়িতে সবাই আছে।
জলে মাছ থাকে।
রাতে আকাশ পরিষ্কার ছিল।
নদীতে নৌকা চলছে।

এখানে—

বাড়িতে → স্থানাধিকরণ
রাতে → কালাধিকরণ


৯. ‘কে’ বিভক্তি

‘কে’ বাংলা ভাষার বহুল ব্যবহৃত বিভক্তি।

কর্মকারকে

আমি রাহুলকে দেখেছি।

কাকে দেখেছি? → রাহুলকে।

নিমিত্ত কারকে

আমি রাহুলকে বই দিলাম।

কার জন্য/কার উদ্দেশে বই দিলাম? → রাহুলকে।

তাই—

‘কে’ দেখলেই কর্মকারক হবে—এই ধারণা ভুল।

কারক নির্ণয়ের জন্য ক্রিয়ার সঙ্গে পদের সম্পর্ক দেখতে হবে।


১০. ‘রে’ বিভক্তি

‘রে’ বিভক্তির ব্যবহার আধুনিক চলিত বাংলায় সীমিত হলেও কাব্যিক, সাধু ও আঞ্চলিক ব্যবহারে এর পরিচয় পাওয়া যায়।

যেমন—

তারে আমি চিনি।
তোরে আমি ভালোবাসি।

এখানে ‘রে’ কর্ম বা নিমিত্তগত সম্পর্ক প্রকাশ করতে পারে।


১১. ‘র/এর’ বিভক্তি

‘র’ ও ‘এর’ প্রধানত সম্বন্ধপদ গঠনে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

রামের বই।
মায়ের স্নেহ।
দেশের মানুষ।
কলকাতার ইতিহাস।

এখানে—

রামের, মায়ের, দেশের, কলকাতার → সম্বন্ধপদ

এবং সম্বন্ধপদ কারক নয়।


১২. ‘য়/য়ে’ রূপ

বাংলায় ‘এ’ বিভক্তি যুক্ত হওয়ার ফলে ধ্বনিগত ও বানানগত পরিবর্তনে অনেক ক্ষেত্রে য়/য়ে/য়-জাতীয় রূপ দেখা যায়।

যেমন—

হৃদয় + এ → হৃদয়ে
গঙ্গা + এ → গঙ্গায়
বিদ্যা + এ → বিদ্যায়

এগুলি মূলত বিভক্তির রূপগত পরিবর্তনের ফল।


১৩. তির্যক বিভক্তি

সংজ্ঞা

যে বিভক্তি একাধিক কারকে ব্যবহৃত হয়, তাকে তির্যক বিভক্তি বলে।

বাংলায় বিশেষত—

এ, তে, কে ইত্যাদি বিভক্তি বিভিন্ন কারকে ব্যবহৃত হয়।

উদাহরণ

চোখে দেখি। → করণ

ঘরে বসি। → অধিকরণ

তিলে তেল হয়। → অপাদান

তিন ক্ষেত্রেই ‘এ’ বিভক্তি আছে, কিন্তু কারক তিন রকম।

এটাই তির্যক বিভক্তির মূল বৈশিষ্ট্য।


১৪. বিভক্তির দুটি প্রধান কাজ

বিভক্তির কাজ শুধু কারক প্রকাশ করা নয়।

প্রথমত — পদগঠন

শব্দকে বাক্যে ব্যবহারের উপযোগী পদে পরিণত করে।

দ্বিতীয়ত — সম্পর্ক প্রকাশ

বাক্যের অন্য পদের সঙ্গে তার ব্যাকরণগত সম্পর্ক প্রকাশে সাহায্য করে।

যেমন—

ঘর + এ = ঘরে

‘ঘরে’ একটি পদ এবং ‘এ’ তার অধিকরণগত সম্পর্ক প্রকাশ করছে।


১৫. নির্দেশক

বিভক্তির সঙ্গে নির্দেশককে গুলিয়ে ফেলা বাংলা ব্যাকরণের একটি সাধারণ ভুল।

নির্দেশক কাকে বলে?

যে পদাশ্রিত চিহ্ন বা শব্দাংশ কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে নির্দিষ্টভাবে নির্দেশ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তার সংখ্যা, পরিমাণ, বচন বা গণনাযোগ্যতা প্রকাশ করে, তাকে নির্দেশক বলে।

প্রধান নির্দেশক—

টি, টা, খানি, খানা, গাছা, গাছি, জন, জনা, গুলি, গুলো, গণ, বৃন্দ, সব, সমূহ, রা, দের প্রভৃতি।


১৫.১ নির্দেশকের উদাহরণ

বইটি পড়ো।
ছেলেটা কোথায়?
মানুষটি চলে গেছে।
বইগুলি নতুন।
ছেলেরা মাঠে খেলছে।
শিক্ষকদের সভা আছে।

এখানে—

টি, টা, গুলি, রা ইত্যাদি পদকে নির্দিষ্ট বা সংখ্যাগতভাবে চিহ্নিত করছে।


১৬. নির্দেশকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

নির্দেশককে বলা হয় পদাশ্রিত নির্দেশক, কারণ এটি বিশেষ্য বা অন্য নামপদকে আশ্রয় করে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

বই + টি
ছেলে + রা
মানুষ + জন

‘টি’, ‘রা’, ‘জন’ একা বসে সাধারণত সেই অর্থ প্রকাশ করে না; তারা কোনো পদকে আশ্রয় করে তার নির্দিষ্টতা বা সংখ্যা প্রকাশ করে।


১৭. নির্দেশক ও বিভক্তির সম্পর্ক

একটি শব্দে নির্দেশক ও বিভক্তি একই সঙ্গে থাকতে পারে।

উদাহরণ

বইটিকে

বিশ্লেষণ—

বই + টি + কে

এখানে—

  • বই → মূল শব্দ
  • টি → নির্দেশক
  • কে → বিভক্তি

আবার—

ছেলেটির

= ছেলে + টি + র

এখানে—

  • টি → নির্দেশক
  • র → বিভক্তি

সুতরাং—

নির্দেশক বিভক্তি নয়।


১৮. নির্দেশক ও অনুসর্গের পার্থক্য

বইটি → ‘টি’ নির্দেশক।

বইটির জন্য →
‘টি’ = নির্দেশক
‘র’ = বিভক্তি
‘জন্য’ = অনুসর্গ।

এখানে তিনটি আলাদা ব্যাকরণগত উপাদান পাশাপাশি রয়েছে।


১৯. অনুসর্গ

অনুসর্গ কাকে বলে?

যেসব অব্যয় বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের পরে বসে সেই পদের সঙ্গে বাক্যের অন্য পদের সম্পর্ক প্রকাশ করে, তাদের অনুসর্গ বলে।

অনুসর্গের আরেক নাম পরসর্গ

যেমন—

আমার জন্য
তোমার কাছে
কলকাতা থেকে
কলম দিয়ে
তার সঙ্গে
বাড়ির দিকে

এখানে জন্য, কাছে, থেকে, দিয়ে, সঙ্গে, দিকে—সবই অনুসর্গ।


২০. অনুসর্গের বৈশিষ্ট্য

১. অনুসর্গ অব্যয় পদ।

২. সাধারণত বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে বসে।

৩. বিভক্তির মতো সম্পর্ক প্রকাশ করে।

৪. কিন্তু বিভক্তির মতো শব্দের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় না।

৫. অনুসর্গের নিজস্ব অর্থ আছে।

৬. অনুসর্গ কারক-সম্পর্ককে স্পষ্ট করে।


২১. অনুসর্গের উদাহরণ

বাংলায় ব্যবহৃত অনুসর্গের সংখ্যা অনেক। যেমন—

দ্বারা, দিয়া, দিয়ে, কর্তৃক, সাহায্যে, করে, হইতে, থেকে, চেয়ে, কাছে, নিকটে, অপেক্ষা, অবধি, পর্যন্ত, মধ্যে, ভিতরে, উপরে, ওপর, নিচে, পাশে, নিমিত্ত, জন্য, তরে, হেতু, সন্ধানে, অন্বেষণে, কারণে, প্রতি, সঙ্গে, সাথে, সনে, ছাড়া, ভিন্ন, বিহনে, বিনা, মতো, মতন, আগে, পিছে, পরে, দিকে, বাদে, বদলে, বনাম প্রভৃতি।


২২. অনুসর্গের গঠনগত শ্রেণিবিভাগ

গঠনগত দিক থেকে অনুসর্গ প্রধানত দুই ধরনের—

১. শব্দজাত বা নাম অনুসর্গ

বিশেষ্যজাত শব্দ থেকে গঠিত অনুসর্গ।

যেমন—

দ্বারা, কর্তৃক, জন্য, নিমিত্ত, কারণে, সাহায্যে, পক্ষে, অপেক্ষা প্রভৃতি।

২. ক্রিয়াজাত বা অসমাপিকা অনুসর্গ

ক্রিয়াজাত রূপ থেকে গঠিত অনুসর্গ।

যেমন—

দিয়ে, করে, চেয়ে প্রভৃতি।


২৩. উৎসের বিচারে অনুসর্গ

উৎসের দিক থেকেও অনুসর্গের বৈচিত্র্য রয়েছে।

তৎসম

প্রতি, নিমিত্ত, কর্তৃক, দ্বারা, হেতু প্রভৃতি।

তদ্ভব/দেশজ

কাছে, পাশে, তরে, থেকে প্রভৃতি।

বিদেশি উৎসজাত

বাংলা ব্যবহারে প্রবেশ করা কিছু বিদেশি উৎসের সম্পর্কসূচক অব্যয় বা অনুসর্গও রয়েছে।

যেমন—

বনাম, বাদে, বদলে প্রভৃতি।


২৪. কর্মপ্রবচনীয়

বাংলা ব্যাকরণের প্রাচীন আলোচনায় কর্মপ্রবচনীয় শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়।

যেসব অব্যয় স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহৃত হয়ে বিশেষ্যপদের সঙ্গে সম্পর্ক প্রকাশ করে, তাদের কর্মপ্রবচনীয় বলা হয়। অনুসর্গের সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

তবে আধুনিক বাংলা ব্যাকরণে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘অনুসর্গ’ শব্দটিই বেশি কার্যকর ও প্রচলিত।


২৫. বিভক্তি ও অনুসর্গের সাদৃশ্য

১. উভয়েই পদের সঙ্গে অন্য পদের সম্পর্ক প্রকাশ করতে পারে।

২. উভয়েই কারক-সম্পর্ক বোঝাতে সাহায্য করে।

৩. উভয়ের সাহায্যেই বাক্যের অর্থগত সম্পর্ক স্পষ্ট হয়।


২৬. বিভক্তি ও অনুসর্গের পার্থক্য

বিভক্তিঅনুসর্গ
শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়সাধারণত শব্দের পরে পৃথকভাবে বসে
শব্দের সঙ্গে একাত্ম হয়স্বাধীন অব্যয় হিসেবে থাকে
নিজস্ব অর্থ সাধারণত থাকে নানিজস্ব অর্থ থাকে
শব্দের রূপের অংশপৃথক শব্দ
‘রামকে’, ‘ঘরে’, ‘দেশের’‘রামের জন্য’, ‘ঘর থেকে’, ‘তার কাছে’
ব্যাকরণগত সম্পর্কের চিহ্নঅর্থপূর্ণ সম্পর্কসূচক অব্যয়

সহজ সূত্র

শব্দের গায়ে লেগে গেলে—বিভক্তি।
শব্দের পরে আলাদা দাঁড়ালে—অনুসর্গ।


২৭. কারক নির্ণয়ের মূলনীতি

কারক নির্ণয় করার সময় শুধু বিভক্তি বা অনুসর্গ দেখলে চলবে না।

কারক নির্ণয়ের তিনটি ধাপ—

প্রথম ধাপ

সমাপিকা ক্রিয়া চিহ্নিত করো।

দ্বিতীয় ধাপ

ক্রিয়াকে উপযুক্ত প্রশ্ন করো।

তৃতীয় ধাপ

প্রাপ্ত উত্তরের সঙ্গে ক্রিয়ার অর্থগত সম্পর্ক বিচার করো।


২৮. ছয় কারকের নির্ণায়ক প্রশ্ন

কারকপ্রশ্ন
কর্তৃকে? কারা?
কর্মকী? কাকে?
করণকী দিয়ে? কিসের দ্বারা? কীসের সাহায্যে?
নিমিত্তকার জন্য? কিসের উদ্দেশ্যে? কার উদ্দেশে?
অপাদানকোথা থেকে? কী থেকে? কার থেকে? কিসের চেয়ে?
অধিকরণকোথায়? কখন? কীসে? কোন বিষয়ে?

তবে এই প্রশ্নগুলি সহায়ক পদ্ধতি, চূড়ান্ত নিয়ম নয়। অর্থগত সম্পর্কই শেষ কথা।


২৯. কর্তৃকারক

সংজ্ঞা

যে কারকে ক্রিয়ার সঙ্গে কর্তার সম্পর্ক প্রকাশ পায়, তাকে কর্তৃকারক বলে।

যে ব্যক্তি, প্রাণী, বস্তু বা সত্তা ক্রিয়ার ঘটক বা সম্পাদনকারী, সে কর্তৃকারক।

উদাহরণ

রাহুল বই পড়ে।
পাখি উড়ছে।
ছাত্ররা পড়ছে।
বৃষ্টি পড়ছে।
সূর্য উঠেছে।


৩০. কর্তৃকারক নির্ণয়

ক্রিয়াকে—

কে? কারা?

দিয়ে প্রশ্ন করলে সাধারণত যে উত্তর পাওয়া যায়, সেটি কর্তৃকারক।

রাহুল বই পড়ে।

কে পড়ে? → রাহুল।

অতএব রাহুল → কর্তৃকারক।


৩১. কর্তৃকারকের বিভক্তি

কর্তৃকারকে প্রধানত শূন্য বিভক্তি দেখা যায়।

যেমন—

রাম যায়।
পাখি উড়ে।
ছেলেরা খেলে।

তবে বিশেষ ব্যবহার ও অর্থগত পরিবেশে অন্য বিভক্তিও দেখা যায়—

লোকে বলে।
বাঘে-মহিষে লড়াই।

এখানে ‘এ’ কর্তৃকারক সম্পর্কেও ব্যবহৃত হয়েছে।


৩২. মুখ্য কর্তা

যে কর্তা নিজেই ক্রিয়া সম্পন্ন করে, তাকে মুখ্য কর্তা বলে।

যেমন—

রিয়া বই পড়ে।
পিয়ালী ভাত খায়।
সুমন মাঠে যায়।

এখানে কর্তারাই নিজে কাজ করছে।


৩৩. প্রযোজক কর্তা

যে কর্তা নিজে কাজটি না করে অন্যকে দিয়ে কাজটি করায়, তাকে প্রযোজক কর্তা বলে।

যেমন—

মা ছেলেকে পড়ান।

মা নিজে পড়ছেন না; ছেলেকে দিয়ে পড়ার কাজ করাচ্ছেন।

অতএব ‘মা’ → প্রযোজক কর্তা।

আরও—

শিক্ষক ছাত্রদের দিয়ে নাটক অভিনয় করালেন।

শিক্ষক → প্রযোজক কর্তা।


৩৪. প্রযোজ্য কর্তা

প্রযোজক কর্তার প্রেরণায় যে ব্যক্তি বা সত্তা মূল কাজটি সম্পন্ন করে, তাকে প্রযোজ্য কর্তা বলে।

যেমন—

মা ছেলেকে পড়ালেন।

এখানে—

মা → প্রযোজক কর্তা
ছেলে → প্রযোজ্য কর্তা

আরও—

শিক্ষক ছাত্রদের দিয়ে নাটক অভিনয় করালেন।

শিক্ষক → প্রযোজক
ছাত্ররা → প্রযোজ্য


৩৫. ব্যতিহার কর্তা

দুই বা ততোধিক কর্তা পরস্পর একই বা অনুরূপ ক্রিয়া করলে তাকে ব্যতিহার কর্তা বলে।

যেমন—

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়।

ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া চলছে।

দুই বন্ধুর মধ্যে লড়াই হল।

এখানে পরস্পর-সম্পর্কিত কর্তার উপস্থিতি রয়েছে।


৩৬. কর্মকারক

সংজ্ঞা

কর্তা যে ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়কে অবলম্বন করে ক্রিয়া সম্পাদন করে এবং যার উপর ক্রিয়ার ফল বা প্রভাব পড়ে, তাকে কর্মকারক বলে।

উদাহরণ

আমি বই পড়ি।
সে চিঠি লিখেছে।
পুলিশ চোরকে ধরেছে।
মা ভাত রান্না করেছেন।


৩৭. কর্মকারক নির্ণয়

ক্রিয়াকে—

কী? কাকে?

দিয়ে প্রশ্ন করতে হবে।

আমি ভাত খাই।

আমি কী খাই? → ভাত।

অতএব ভাত → কর্মকারক।

পুলিশ চোরকে ধরেছে।

পুলিশ কাকে ধরেছে? → চোরকে।

অতএব চোরকে → কর্মকারক।


৩৮. মুখ্য কর্ম

দ্বিকর্মক ক্রিয়ায় যে কর্মটি ক্রিয়ার প্রত্যক্ষ ফল গ্রহণ করে, তাকে মুখ্য কর্ম বলা হয়।

যেমন—

মা ছেলেকে বই দিলেন।

এখানে ‘বই’ সরাসরি দেওয়া হয়েছে। তাই বই → মুখ্য কর্ম।


৩৯. গৌণ কর্ম

যে ব্যক্তি বা সত্তা মুখ্য কর্মের প্রাপক বা গ্রহীতা, তাকে গৌণ কর্ম বলা হয়।

মা ছেলেকে বই দিলেন।

এখানে—

বই → মুখ্য কর্ম
ছেলেকে → গৌণ কর্ম/নিমিত্তগত প্রাপক

আধুনিক বাংলা ব্যাকরণে এই ধরনের প্রাপক-সম্পর্ককে নিমিত্ত কারক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়। তাই প্রসঙ্গ ও পাঠ্যধারা অনুযায়ী পরিভাষার পার্থক্য থাকতে পারে।


৪০. উদ্দেশ্য কর্ম

কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে অন্য কোনো নামে পরিচিত করা বা অন্য কোনো রূপে নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে যে পদ মূল ব্যক্তি বা বস্তুকে নির্দেশ করে, তাকে উদ্দেশ্য কর্ম বলে।

যেমন—

দুধকে আমরা দুগ্ধ বলি।

এখানে ‘দুধকে’ → উদ্দেশ্য কর্ম।


৪১. বিধেয় কর্ম

উদ্দেশ্য কর্মকে যে নামে, পরিচয়ে বা রূপে অভিহিত করা হয়, তাকে বিধেয় কর্ম বলে।

উপরের বাক্যে—

দুধকে আমরা দুগ্ধ বলি।

দুধকে → উদ্দেশ্য কর্ম
দুগ্ধ → বিধেয় কর্ম


৪২. সমধাতুজ কর্ম

যে কর্মপদ ক্রিয়াপদের ধাতুর সঙ্গে অর্থগত বা ধাতুগত সাদৃশ্য বহন করে, তাকে সমধাতুজ কর্ম বলে।

যেমন—

সে একটা কান্না কাঁদল।

‘কান্না’ এবং ‘কাঁদল’ একই ধাতুগত উৎসের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আরও—

সে ঘুমের ঘুম ঘুমোল—কাব্যিক/বিশেষ ব্যবহারে এই ধরনের সমধাতুজ কর্ম দেখা যায়।


৪৩. করণকারক

সংজ্ঞা

যে কারকে কোনো কাজ সম্পাদনের উপায়, উপকরণ, মাধ্যম বা সাধনের সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্ক প্রকাশ পায়, তাকে করণকারক বলে।

নির্ণয়ের প্রশ্ন

কী দিয়ে? কিসের দ্বারা? কীসের সাহায্যে? কী উপায়ে?

উদাহরণ

কলম দিয়ে লিখি।
ছুরি দিয়ে ফল কাটে।
চোখে দেখি।
পরিশ্রমে সাফল্য আসে।


৪৪. উপায়াত্মক করণ

যে উপায় বা যন্ত্রের সাহায্যে কাজ সম্পন্ন হয়, তাকে উপায়াত্মক করণ বলে।

কলম দিয়ে লিখি।
কলম → করণ।

নৌকায় নদী পার হলাম।

নৌকা → করণ।


৪৫. হেত্বার্থক করণ

যে কারণে বা হেতুতে কোনো কাজ সংঘটিত হয়, সেখানে করণগত সম্পর্ক প্রকাশ পেতে পারে।

আনন্দে সে হাসল।

আনন্দ → হাসার কারণ।

দুঃখে সে কাঁদল।

দুঃখ → কান্নার হেতু।


৪৬. লক্ষণাত্মক করণ

যে লক্ষণ বা চিহ্নের মাধ্যমে কোনো বিষয়কে চেনা বা তার পরিচয় পাওয়া যায়, তাকে লক্ষণাত্মক করণ বলা হয়।

যেমন—

ফলেই বৃক্ষের পরিচয়।

ফল → বৃক্ষের পরিচয় পাওয়ার লক্ষণ।


৪৭. নিমিত্ত কারক

সংজ্ঞা

যে কারকে কোনো কাজের উদ্দেশ্য, প্রয়োজন, লক্ষ্য, প্রাপক, বা কারও জন্য কিছু করার সম্পর্ক প্রকাশ পায়, তাকে নিমিত্ত কারক বলে।

এই পাঠধারায় ‘সম্প্রদান’ নামের পরিবর্তে নিমিত্ত কারক পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়।

উদাহরণ

দেশের জন্য প্রাণ দেব।
শিশুদের জন্য বই কিনলাম।
পূজার জন্য ফুল আনো।
অন্ধজনে দেহ আলো।
রাহুলকে বই দিলাম।


৪৮. নিমিত্ত কারকের চিহ্ন

নিমিত্তগত সম্পর্ক প্রকাশে ব্যবহৃত হয়—

জন্য, জন্যে, তরে, লাগি, নিমিত্ত, উদ্দেশে, হেতু, কে, রে, এ/য় প্রভৃতি।

যেমন—

দেশের তরে প্রাণ দেব।
তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
পূজার নিমিত্ত ফুল আনা হয়েছে।


৪৯. কর্ম ও নিমিত্তের পার্থক্য

এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১. আমি রাহুলকে দেখলাম।

কাকে দেখলাম? → রাহুলকে।

রাহুলকে = কর্মকারক

২. আমি রাহুলকে বই দিলাম।

কার জন্য/কার উদ্দেশে বই দিলাম? → রাহুলকে।

রাহুলকে = নিমিত্তগত সম্পর্ক

অতএব—

একই ‘কে’ বিভক্তি দুই বাক্যে দুই ভিন্ন কারক-সম্পর্ক প্রকাশ করতে পারে।


৫০. অপাদান কারক

সংজ্ঞা

যে কারকে কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা স্থান থেকে বিচ্ছেদ, বিচ্যুতি, পতন, উৎপত্তি, নিঃসরণ, দূরত্ব, তুলনা, ভয়, বিরতি, আরম্ভ ইত্যাদির সম্পর্ক প্রকাশ পায়, তাকে অপাদান কারক বলে।

অপাদানের মূল ভাব—

যেখান থেকে কোনো কিছু বিচ্ছিন্ন, উৎপন্ন, পতিত, দূরীভূত বা তুলনীয় হয়।


৫১. অপাদান নির্ণয়ের প্রশ্ন

কোথা থেকে?
কী থেকে?
কার থেকে?
কিসের চেয়ে?
কোথা হতে?

উদাহরণ

গাছ থেকে পাতা পড়ে।

কোথা থেকে পাতা পড়ে? → গাছ থেকে।

অতএব গাছ → অপাদান।


৫২. অপাদানের বিভিন্ন অর্থ

১. বিচ্যুতিবাচক অপাদান

মাথা থেকে বোঝা নামাও।

মাথা → অপাদান।

২. পতনবাচক অপাদান

গাছ থেকে ফল পড়ল।

গাছ → অপাদান।

৩. স্থানবাচক অপাদান

কলকাতা থেকে এসেছি।

কলকাতা → অপাদান।

৪. উৎপত্তিবাচক অপাদান

দুধ থেকে দই হয়।

দুধ → অপাদান।

৫. জাতিবাচক অপাদান

লোহা থেকে যন্ত্র তৈরি হয়।

লোহা → উৎপত্তির উৎস।

৬. আরম্ভবাচক অপাদান

সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে।

সকাল → কাজের আরম্ভকাল।

৭. দূরত্ববাচক অপাদান

কলকাতা থেকে মালদা অনেক দূর।

কলকাতা → দূরত্বের সূচনাবিন্দু।

৮. তারতম্যবাচক অপাদান

রাহুলের চেয়ে শ্যাম লম্বা।

রাহুলের চেয়ে → তুলনার অপাদান।

৯. ভয়বাচক অপাদান

বাঘের ভয়ে সে পালাল।

বাঘ → ভয়ের উৎস।

১০. বিরতিবাচক অপাদান

পাপ থেকে বিরত হও।

পাপ → বিরতির উৎস।


৫৩. অধিকরণ কারক

সংজ্ঞা

যে কারকে কোনো ক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার স্থান, কাল, আধার বা বিষয়ের সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্ক প্রকাশ পায়, তাকে অধিকরণ কারক বলে।

অধিকরণের মূল প্রশ্ন—

কোথায়? কখন? কীসে? কোন বিষয়ে?


৫৪. স্থানাধিকরণ

যে স্থানে ক্রিয়া সংঘটিত হয়।

ঘরে বসে আছি।
মাঠে ছেলেরা খেলছে।
কলকাতায় থাকি।
নদীতে নৌকা চলছে।


৫৫. কালাধিকরণ

যে সময়ে ক্রিয়া সংঘটিত হয়।

সকালে সূর্য ওঠে।
রাতে আকাশ পরিষ্কার।
দুপুরে সে এসেছিল।
দুই দিনে কাজ শেষ হয়েছে।


৫৬. বিষয়াধিকরণ

কোনো বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান, দক্ষতা, দুর্বলতা, পারদর্শিতা বা অক্ষমতা প্রকাশ করলে বিষয়াধিকরণ হয়।

গণিতে সে ভালো।
ইংরেজিতে সে দুর্বল।
সংগীতে তার বিশেষ দক্ষতা আছে।
বাংলায় তাঁর গভীর জ্ঞান রয়েছে।


৫৭. ভাবাধিকরণ

কোনো ক্রিয়ার সঙ্গে অন্য ক্রিয়ার সম্পর্ক বা কোনো ক্রিয়াবাচক ভাবের আধার বোঝালে ভাবাধিকরণ হয়।

যেমন—

লিখতে লিখতে হাত ব্যথা হয়ে গেল।
কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে গেল।
কান্নায় শোক হালকা হয়।

এখানে একটি ক্রিয়া বা ক্রিয়াজাত ভাব অন্য ক্রিয়ার সংঘটনের আধার বা অবস্থা নির্দেশ করছে।


৫৮. কারক নির্ণয়ের পূর্ণ পদ্ধতি

কারক নির্ণয়ে শুধু মুখস্থ প্রশ্ন প্রয়োগ করলে অনেক সময় ভুল হয়। একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

ধাপ ১ : সমাপিকা ক্রিয়া খুঁজে বের করো।

ধাপ ২ : ক্রিয়ার কর্তা নির্ণয় করো।

ধাপ ৩ : ক্রিয়ার ফল যার উপর পড়ছে তা খুঁজে দেখো।

ধাপ ৪ : কাজটি কী দিয়ে বা কী উপায়ে হয়েছে তা দেখো।

ধাপ ৫ : কার জন্য বা কী উদ্দেশ্যে হয়েছে তা দেখো।

ধাপ ৬ : কোথা থেকে বিচ্ছেদ, উৎপত্তি, পতন বা তুলনা বোঝাচ্ছে তা দেখো।

ধাপ ৭ : কোথায়, কখন বা কোন বিষয়ে কাজটি হচ্ছে তা দেখো।

ধাপ ৮ : কোনো পদ যদি ক্রিয়ার সঙ্গে নয়, অন্য বিশেষ্যপদের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাকে সম্বন্ধপদ হিসেবে বিচার করো।

ধাপ ৯ : কাউকে ডাকা হলে সেটি সম্বোধনপদ।


৫৯. একটি বাক্যের পূর্ণ কারক বিশ্লেষণ

বাক্য

রাহুল আজ কলকাতা থেকে মায়ের জন্য কলম দিয়ে বন্ধুকে একটি চিঠি লিখল।

ক্রিয়া → লিখল

এখন একে একে প্রশ্ন করি—

কে লিখল?
→ রাহুল
→ কর্তৃকারক

কী লিখল?
→ একটি চিঠি
→ কর্মকারক

কাকে/কার জন্য লিখল?
→ বন্ধুকে
→ নিমিত্তগত সম্পর্ক

কী দিয়ে লিখল?
→ কলম দিয়ে
→ করণকারক

কোথা থেকে?
→ কলকাতা থেকে
→ অপাদান কারক

কখন?
→ আজ
→ কালাধিকরণ

এটি একটি পূর্ণাঙ্গ কারক বিশ্লেষণ।


৬০. একই বিভক্তি, ভিন্ন কারক

এটি পরীক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘এ’

চোখে দেখি।
→ করণ

ঘরে বসি।
→ অধিকরণ

তিলে তেল হয়।
→ অপাদান

‘কে’

রাহুলকে দেখলাম।
→ কর্ম

রাহুলকে বই দিলাম।
→ নিমিত্ত

শূন্য

রাম যায়।
→ কর্তৃ

বই পড়ি।
→ কর্ম

অতএব—

বিভক্তি দেখে কারক নয়; ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক দেখে কারক নির্ণয় করতে হবে।


৬১. অকারক

কারকের পাশাপাশি কিছু পদ বাক্যে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু তাদের সঙ্গে সমাপিকা ক্রিয়ার প্রত্যক্ষ কারক-সম্পর্ক থাকে না। এগুলিকে বলা হয় অকারক

অকারক কাকে বলে?

যে পদের সঙ্গে বাক্যের সমাপিকা ক্রিয়ার প্রত্যক্ষ কারক-সম্পর্ক থাকে না, তাকে অকারক পদ বলে।

প্রধান অকারক—

১. সম্বন্ধপদ
২. সম্বোধনপদ


৬২. সম্বন্ধপদ

সংজ্ঞা

বাক্যের একটি নামপদের সঙ্গে অন্য একটি নামপদের যে সম্পর্ক প্রকাশ পায়, কিন্তু যার সঙ্গে সমাপিকা ক্রিয়ার প্রত্যক্ষ কারক-সম্পর্ক থাকে না, তাকে সম্বন্ধপদ বলে।

উদাহরণ

মিতার নাচ সকলকে মুগ্ধ করল।

এখানে—

মিতার → নাচের সঙ্গে সম্পর্কিত।

কিন্তু ‘মিতার’ সরাসরি ‘মুগ্ধ করল’ ক্রিয়ার সঙ্গে কারক-সম্পর্কে নেই।

তাই—

মিতার = সম্বন্ধপদ = অকারক।


৬৩. সম্বন্ধপদের বিভক্তি

সম্বন্ধপদ সাধারণত—

র/এর

বিভক্তি নিয়ে গঠিত হয়।

যেমন—

রামের বই
মায়ের স্নেহ
দেশের মানুষ
পুকুরের জল
কলকাতার ইতিহাস


৬৪. সম্বন্ধপদের বিভিন্ন সম্পর্ক

সম্বন্ধপদ শুধু মালিকানা বোঝায় না; বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক প্রকাশ করতে পারে।

কর্তৃ-সম্বন্ধ

ভোরের আলো মাঠ ভরিয়ে দিল।

‘ভোরের’ → আলোর সঙ্গে সম্পর্ক।

কর্ম-সম্বন্ধ

আর্তের সেবা করো।

‘আর্তের’ → সেবার বিষয়/কর্মগত সম্পর্ক।

করণ-সম্বন্ধ

তুলির টান সুন্দর।

‘তুলির’ → টানের উপায়/করণগত সম্পর্ক।

নিমিত্ত-সম্বন্ধ

ঠাকুরের নৈবেদ্য সাজানো হয়েছে।

‘ঠাকুরের’ → নৈবেদ্যের নিমিত্তগত সম্পর্ক।

অপাদান-সম্বন্ধ

বাঘের ভয় যেখানে, সেখানে সন্ধ্যা হয়।

‘বাঘের’ → ভয়ের উৎস।

অধিকরণ-সম্বন্ধ

পুকুরের জলে সাঁতার কাটে।

‘পুকুরের’ → জলের আধারের সঙ্গে সম্পর্ক।


৬৫. সম্বন্ধপদ কেন কারক নয়?

কারক হল—

ক্রিয়ার সঙ্গে নামপদের সম্পর্ক।

সম্বন্ধপদ হল—

এক নামপদের সঙ্গে অন্য নামপদের সম্পর্ক।

যেমন—

রাহুলের বই পড়ে আছে।

এখানে—

রাহুলের ↔ বই → সম্বন্ধ

বই ↔ পড়ে আছে → কর্তৃকারক

তাই ‘রাহুলের’ কারক নয়।


৬৬. সম্বোধনপদ

সংজ্ঞা

যে পদের সাহায্যে কাউকে ডাকা, আহ্বান করা বা সম্বোধন করা হয়, তাকে সম্বোধনপদ বলে।

যেমন—

হে বন্ধু, শোনো।
ও রাহুল, এখানে এসো।
মা, আমাকে ক্ষমা করো।
ভাই, একটু দাঁড়াও।
ওগো সই, কোথায় গেলে?

সম্বোধনপদের সঙ্গে ক্রিয়ার কারক-সম্পর্ক নেই।

তাই—

সম্বোধনপদ = অকারক।


৬৭. সম্বন্ধপদ ও সম্বোধনপদ নির্ণয়

সম্বন্ধপদ

প্রশ্ন—

কার? কিসের?

যেমন—

রামের বই।

কার বই? → রামের।

রামের → সম্বন্ধপদ।

সম্বোধনপদ

কাউকে ডাকা হচ্ছে কি না দেখো।

হে বন্ধু, এসো।

বন্ধুকে ডাকা হচ্ছে → সম্বোধনপদ।


৬৮. কারক ও অকারকের পার্থক্য

কারকঅকারক
ক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকেসমাপিকা ক্রিয়ার সঙ্গে কারক-সম্পর্ক থাকে না
ছয় প্রকারপ্রধানত সম্বন্ধ ও সম্বোধন
ক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নির্ণয় করা হয়অন্য নামপদের সঙ্গে সম্পর্ক বা সম্বোধনের মাধ্যমে নির্ণয় করা হয়
রাহুল বই পড়ে → রাহুল কর্তৃরাহুলের বই → রাহুলের সম্বন্ধপদ
রাহুলকে দেখলাম → কর্মহে রাহুল → সম্বোধন

৬৯. একটি বাক্যে কারক, বিভক্তি, নির্দেশক ও অনুসর্গ

বাক্য

ছেলেটি তার মায়ের জন্য কলকাতা থেকে কলম দিয়ে বন্ধুকে একটি বই দিল।

বিশ্লেষণ—

ছেলেটি

ছেলে + টি

  • টি → নির্দেশক
  • শূন্য বিভক্তি
  • কর্তৃকারক

তার

তা + র

  • র → বিভক্তি
  • সম্বন্ধপদ

মায়ের জন্য

মা + এর + জন্য

  • এর → বিভক্তি
  • জন্য → অনুসর্গ
  • নিমিত্তগত সম্পর্ক

কলকাতা থেকে

কলকাতা + থেকে

  • থেকে → অনুসর্গ
  • অপাদান

কলম দিয়ে

কলম + দিয়ে

  • দিয়ে → অনুসর্গ
  • করণ

বন্ধুকে

বন্ধু + কে

  • কে → বিভক্তি
  • নিমিত্তগত প্রাপক

একটি বই

এক + টি + বই

  • টি → নির্দেশক
  • বই → কর্মকারক

এই একটি বাক্যের মধ্যেই—

কারক + বিভক্তি + নির্দেশক + অনুসর্গ + সম্বন্ধপদ

সবকিছুর ব্যবহার দেখা যায়।


৭০. কারক, বিভক্তি, নির্দেশক, অনুসর্গ ও অকারক—একসঙ্গে পার্থক্য

বিষয়কী?উদাহরণ
কারকক্রিয়ার সঙ্গে নামপদের সম্পর্করাহুল → কর্তৃ
বিভক্তিশব্দের সঙ্গে যুক্ত সম্পর্কসূচক চিহ্নরামকে
নির্দেশকপদকে নির্দিষ্ট/সংখ্যাগত করেবইটি
অনুসর্গস্বাধীন সম্পর্কসূচক অব্যয়বাড়ি থেকে
অকারকক্রিয়ার সঙ্গে কারক-সম্পর্কহীন পদরামের বই

৭১. একটি শব্দে নির্দেশক ও বিভক্তির ক্রম

বাংলায় সাধারণত একটি নামপদে নির্দেশক ও বিভক্তি পাশাপাশি থাকতে পারে।

উদাহরণ

ছেলেটিকে

= ছেলে + টি + কে

ছেলেটির

= ছেলে + টি + র

বইগুলিকে

= বই + গুলি + কে

বইগুলির

= বই + গুলি + র

এখানে লক্ষণীয়—

মূল শব্দ → নির্দেশক → বিভক্তি


৭২. কারক নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

‘কে’ দেখলেই কর্ম নয়

তাকে দেখেছি। → কর্ম

তাকে বই দিয়েছি। → নিমিত্তগত

‘এ’ দেখলেই অধিকরণ নয়

ঘরে আছি। → অধিকরণ

চোখে দেখি। → করণ

তিলে তেল হয়। → অপাদান

‘র/এর’ দেখলেই কারক নয়

রামের বই। → সম্বন্ধপদ

‘টি/টা’ বিভক্তি নয়

বইটি → টি নির্দেশক।

‘জন্য’ বিভক্তি নয়

তোমার জন্য → ‘জন্য’ অনুসর্গ।


৭৩. কারক নির্ণয়ের আরও উদাহরণ

১. কৃষক লাঙল দিয়ে জমি চাষ করে।

কৃষক → কর্তৃ
লাঙল দিয়ে → করণ
জমি → কর্ম

২. গাছ থেকে আম পড়েছে।

গাছ → অপাদান
আম → কর্তৃ/পতনগত বিষয়
থেকে → অনুসর্গ

৩. সন্ধ্যায় পাখিরা বাসায় ফেরে।

সন্ধ্যায় → কালাধিকরণ
পাখিরা → কর্তৃ
বাসায় → স্থানাধিকরণ

৪. মা শিশুর জন্য দুধ আনলেন।

মা → কর্তৃ
শিশুর জন্য → নিমিত্ত
দুধ → কর্ম

৫. কলকাতায় বহু মানুষ বাস করে।

কলকাতায় → স্থানাধিকরণ
মানুষ → কর্তৃ


৭৪. কারক নির্ণয়ের বিশেষ সমস্যা

কিছু বাক্যে একই পদকে শুধু প্রশ্ন করে নির্ণয় করা যায় না।

যেমন—

বাঘের ভয়ে মানুষ পালাল।

‘বাঘের’ দেখলে মনে হতে পারে সম্বন্ধপদ, কারণ ‘র’ বিভক্তি আছে। কিন্তু—

বাঘের ভয়ে একটি সম্বন্ধগুচ্ছ। ‘বাঘের’ ‘ভয়’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত; ‘ভয়’ আবার পালানোর কারণ। তাই এখানে ‘বাঘের’ সরাসরি কারক নয়—এটি সম্বন্ধপদ

অন্যদিকে—

বাঘের চেয়ে সিংহ বড়।

এখানে ‘বাঘের চেয়ে’ তুলনার অপাদানগত সম্পর্ক প্রকাশ করছে।

অতএব একই ‘এর’ ভিন্ন কাঠামোয় ভিন্ন বিশ্লেষণ দাবি করতে পারে।


৭৫. কারক ও বাচ্যের সম্পর্ক

কারক নির্ণয়ের সময় বাচ্য-এর কথাও মনে রাখতে হয়।

কর্তৃবাচ্যে কর্তা সাধারণত প্রধান থাকে—

রাহুল চিঠি লিখেছে।

কর্মবাচ্যে কর্ম প্রধান হয়ে উঠতে পারে—

রাহুলের দ্বারা চিঠি লেখা হয়েছে।

ভাববাচ্যে ক্রিয়ার ভাব প্রধান—

আমার যাওয়া হবে না।

সুতরাং কারক নির্ণয় সবসময় সরল ‘কে = কর্তা’ সূত্রে করা যায় না।


৭৬. কর্ম-কর্তৃবাচ্য ও কর্তৃকারক

ঘুড়ি উড়ছে।

ঘুড়ি নিজে উড়ছে না; কেউ তাকে উড়াচ্ছে। তাই এটি কর্ম-কর্তৃবাচ্যের উদাহরণ হতে পারে।

কিন্তু—

পাখি উড়ছে।

পাখি নিজেই উড়তে পারে। তাই এটি সাধারণ কর্তৃক্রিয়ার উদাহরণ।

এই পার্থক্য কারক ও বাচ্য—দুই অধ্যায়ের সংযোগ বোঝায়।


৭৭. পরীক্ষায় কারক নির্ণয়ের আদর্শ ছক

যে কোনো বাক্য পেলে নিচের ছক ব্যবহার করা যায়—

পদক্রিয়াপ্রশ্নসম্পর্ককারকবিভক্তি/অনুসর্গ
রাহুলপড়েকে?কর্তাকর্তৃশূন্য
বইপড়েকী?কর্মকর্মশূন্য
কলমলেখেকী দিয়ে?উপায়করণদিয়ে
বন্ধুদিলকার জন্য?প্রাপকনিমিত্তকে
কলকাতাএলকোথা থেকে?উৎসঅপাদানথেকে
ঘরবসেকোথায়?স্থানঅধিকরণ

এই পদ্ধতিতে কারক নির্ণয় অনেক সহজ হয়।


৭৮. কারক ও বিভক্তির কয়েকটি আদর্শ উদাহরণ

বাক্য : রাম মাঠে খেলছে।

রাম → কর্তৃকারক → শূন্য
মাঠে → অধিকরণ → এ

বাক্য : রামকে ডাকো।

রামকে → কর্মকারক → কে

বাক্য : রামকে বই দাও।

রামকে → নিমিত্তগত প্রাপক → কে
বই → কর্ম → শূন্য

বাক্য : কলম দিয়ে লেখো।

কলম → করণ → দিয়ে অনুসর্গ

বাক্য : গাছ থেকে ফল পড়েছে।

গাছ → অপাদান → থেকে অনুসর্গ
ফল → ক্রিয়ার বিষয়/কর্তৃগত পদ


৭৯. কারক ও অনুসর্গের সম্পর্ক

অনুসর্গ নিজে কারক নয়।

যেমন—

কলকাতা থেকে এসেছি।

এখানে—

কলকাতা → অপাদান কারক
থেকে → অনুসর্গ

আবার—

কলম দিয়ে লিখি।

কলম → করণকারক
দিয়ে → অনুসর্গ

অতএব—

‘থেকে’ অপাদান নয়; ‘কলকাতা’ অপাদান।
‘দিয়ে’ করণ নয়; ‘কলম’ করণ।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


৮০. কারক ও নির্দেশকের সম্পর্ক

নির্দেশকও কারক নয়।

বইটি পড়ি।

এখানে—

বই → কর্মকারক
টি → নির্দেশক

বইটিকে পড়ি।

এখানে—

বই → কর্মকারক
টি → নির্দেশক
কে → বিভক্তি

অতএব—

‘টি’ কখনো কর্মকারক নয়; এটি নির্দেশক।


৮১. অকারক নির্ণয়ের সহজ সূত্র

প্রথমে দেখো—

পদটির সঙ্গে কি সমাপিকা ক্রিয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে?

যদি থাকে → কারক হওয়ার সম্ভাবনা।

যদি না থাকে, কিন্তু—

অন্য নামপদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে

→ সম্বন্ধপদ

কাউকে ডাকা হয়

→ সম্বোধনপদ


৮২. সম্বন্ধপদ ও কারকের পার্থক্য—উদাহরণসহ

রামের বই পড়ে আছে।

রামের → বই-এর সঙ্গে সম্পর্ক
→ সম্বন্ধপদ।

বই → ‘পড়ে আছে’ ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক
→ কর্তৃকারক।

রাম বই পড়ে।

রাম → কর্তৃ
বই → কর্ম

এখানে কোনো সম্বন্ধপদ নেই।


৮৩. সম্বোধনপদ ও কর্তৃকারকের পার্থক্য

রাহুল, তুমি এসো।

‘রাহুল’কে ডাকা হচ্ছে।

→ রাহুল = সম্বোধনপদ।

রাহুল এসেছে।

কে এসেছে? → রাহুল।

→ রাহুল = কর্তৃকারক।

একই ‘রাহুল’ শব্দ, কিন্তু বাক্যভেদে ভূমিকা সম্পূর্ণ আলাদা।


৮৪. পরীক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তি

‘রামের’—সবসময় সম্বন্ধ?

সাধারণত হ্যাঁ, যদি তা কোনো নামপদের সঙ্গে সম্পর্ক প্রকাশ করে।

রামের বই। → সম্বন্ধপদ।

কিন্তু—

রামের চেয়ে শ্যাম লম্বা।

এখানে ‘রামের চেয়ে’ তুলনামূলক অপাদানগত গুচ্ছ।

অতএব পুরো বাক্যের অর্থ বিচার করতে হবে।


৮৫. কারক, বিভক্তি ও অনুসর্গের মহাসূত্র

কারক = সম্পর্ক
বিভক্তি = সম্পর্কের চিহ্ন
অনুসর্গ = সম্পর্কসূচক স্বাধীন অব্যয়
নির্দেশক = পদকে নির্দিষ্ট/সংখ্যাগত করে
অকারক = ক্রিয়ার সঙ্গে কারক-সম্পর্কহীন পদ


৮৬. এক নজরে ছয় কারক

কারকমূল ভাবপ্রশ্নউদাহরণ
কর্তৃকাজের কর্তাকে? কারা?রাহুল পড়ে
কর্মকাজের ফলভোগী/অবলম্বনকী? কাকে?বই পড়ে
করণউপায়/যন্ত্রকী দিয়ে?কলম দিয়ে
নিমিত্তউদ্দেশ্য/প্রাপককার জন্য?মায়ের জন্য
অপাদানউৎস/বিচ্ছেদকোথা থেকে?ঘর থেকে
অধিকরণস্থান/কাল/বিষয়কোথায়? কখন?ঘরে

৮৭. এক নজরে শব্দবিভক্তি

বিভক্তিউদাহরণসম্ভাব্য ব্যবহার
শূন্যরাম যায়কর্তৃ, কর্ম প্রভৃতি
ঘরে, চোখে, তিলেঅধিকরণ, করণ, অপাদান
তেবাড়িতে, রাতেঅধিকরণ
কেরামকেকর্ম, নিমিত্ত
রেতারে, তোরেকর্ম/নিমিত্তগত
রামেরসম্বন্ধ
এরদেশেরসম্বন্ধ
য়/য়েগঙ্গায়, হৃদয়ে‘এ’-এর রূপগত বৈচিত্র্য

৮৮. এক নজরে নির্দেশক

টি, টা, খানি, খানা, গাছা, গাছি, জন, জনা, গুলি, গুলো, গণ, বৃন্দ, সব, সমূহ, রা, দের প্রভৃতি।

উদাহরণ—

বইটি
বইগুলো
ছেলেরা
শিক্ষকদের


৮৯. এক নজরে অনুসর্গ

দ্বারা, কর্তৃক, দিয়ে, করে, থেকে, হইতে, কাছে, নিকটে, জন্য, জন্যে, তরে, লাগি, নিমিত্ত, হেতু, কারণে, সাহায্যে, সঙ্গে, সাথে, প্রতি, অপেক্ষা, পর্যন্ত, অবধি, মধ্যে, ভিতরে, উপরে, নিচে, পাশে, দিকে, ছাড়া, বিনা, ভিন্ন, মতো, বাদে, বদলে, বনাম প্রভৃতি।


৯০. এক নজরে অকারক

সম্বন্ধপদ

র/এর প্রভৃতি বিভক্তিযুক্ত নামপদ, যা অন্য নামপদের সঙ্গে সম্পর্ক প্রকাশ করে।

সম্বোধনপদ

কাউকে ডাকা বা আহ্বান করার পদ।


৯১. পরীক্ষার জন্য বিশেষ সতর্কতা

১. ‘কে’ = কর্ম—সবসময় নয়।

২. ‘এ’ = অধিকরণ—সবসময় নয়।

৩. ‘র/এর’ = কারক—নয়; সাধারণত সম্বন্ধপদ।

৪. ‘টি/টা’ = বিভক্তি—নয়; নির্দেশক।

৫. ‘জন্য/থেকে/দিয়ে’ = বিভক্তি—নয়; অনুসর্গ।

৬. অনুসর্গ নিজে কারক নয়; অনুসর্গযুক্ত নামপদ কারক-সম্পর্ক প্রকাশ করে।

৭. কারক নির্ণয়ের সময় ক্রিয়াকে কেন্দ্র করতে হবে।

৮. একই বিভক্তি একাধিক কারকে ব্যবহৃত হতে পারে।

৯. একই শব্দ বাক্যভেদে ভিন্ন কারক বা অকারক হতে পারে।

১০. ‘সম্প্রদান’ ও ‘নিমিত্ত’ পরিভাষার পার্থক্য পাঠ্যধারা অনুযায়ী বুঝতে হবে; এই অধ্যায়ে নির্দিষ্টভাবে ‘নিমিত্ত কারক’ অনুসরণ করা হয়েছে।


৯২. পূর্ণাঙ্গ উদাহরণ : সবকিছুর সমন্বিত বিশ্লেষণ

বাক্য

সেই ছেলেটি আজ তার মায়ের জন্য কলকাতা থেকে কলম দিয়ে বন্ধুটিকে একটি বই এনে দিল।

এবার বিশ্লেষণ করি।

সেই

নির্দেশক/নির্দেশনামূলক বিশেষণজাত পদ।

ছেলেটি

ছেলে + টি

  • টি → নির্দেশক
  • শূন্য বিভক্তি
  • কর্তৃকারক

আজ

কালাধিকরণ।

তার

তা + র

  • র → বিভক্তি
  • সম্বন্ধপদ

মায়ের জন্য

মা + এর + জন্য

  • এর → বিভক্তি
  • জন্য → অনুসর্গ
  • নিমিত্তগত সম্পর্ক

কলকাতা থেকে

কলকাতা + থেকে

  • থেকে → অনুসর্গ
  • কলকাতা → অপাদান

কলম দিয়ে

কলম + দিয়ে

  • দিয়ে → অনুসর্গ
  • কলম → করণ

বন্ধুটিকে

বন্ধু + টি + কে

  • টি → নির্দেশক
  • কে → বিভক্তি
  • প্রাপক/নিমিত্তগত সম্পর্ক

একটি বই

এক + টি + বই

  • টি → নির্দেশক
  • বই → কর্ম

এই একটি বাক্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি—

নির্দেশক + বিভক্তি + অনুসর্গ + সম্বন্ধপদ + কর্তৃ + কর্ম + করণ + নিমিত্ত + অপাদান + অধিকরণ


৯৩. অনুশীলন : কারক নির্ণয়

নিচের বাক্যগুলিতে দাগ দেওয়া পদগুলির কারক নির্ণয় করো—

১. রাহুল প্রতিদিন বই পড়ে।
২. আমি গান শুনি।
৩. সে কলম দিয়ে চিঠি লেখে।
৪. কলকাতা থেকে ট্রেন ছেড়েছে।
৫. মা শিশুর জন্য খাবার এনেছেন।
৬. ঘরে সবাই বসে আছে।
৭. সকালে পাখিরা ডাকছে।
৮. গণিতে সে খুব ভালো।
৯. গাছ থেকে পাতা পড়ছে।
১০. রাহুলের চেয়ে শ্যাম লম্বা।


৯৪. অনুশীলন : বিভক্তি নির্ণয়

নিচের শব্দগুলির বিভক্তি নির্ণয় করো—

১. রামকে
২. ঘরে
৩. দেশের
৪. মায়ের
৫. ছেলেকে
৬. মাঠে
৭. তারে
৮. হৃদয়ে
৯. গাছের
১০. বই


৯৫. অনুশীলন : নির্দেশক নির্ণয়

১. বইটি
২. ছেলেরা
৩. মানুষগুলো
৪. ফুলগুলি
৫. মেয়েটা
৬. লোকজন
৭. বইখানি
৮. ছাত্রদের

প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দেশক চিহ্নিত করো এবং যেখানে প্রযোজ্য সেখানে বিভক্তিও আলাদা করো।


৯৬. অনুশীলন : অনুসর্গ নির্ণয়

নিচের বাক্যগুলিতে অনুসর্গ চিহ্নিত করো—

১. তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
২. কলকাতা থেকে এসেছি।
৩. তার কাছে বই আছে।
৪. কলম দিয়ে লিখি।
৫. আমার সঙ্গে এসো।
৬. বাড়ির দিকে যাও।
৭. তোমার মতো আর কেউ নেই।
৮. সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে।


৯৭. অনুশীলন : অকারক নির্ণয়

১. রাহুলের বইটি নতুন।
২. মায়ের স্নেহ অমূল্য।
৩. হে বন্ধু, আমার কথা শোনো।
৪. ও রাহুল, এখানে এসো।
৫. দেশের মানুষ জেগে উঠেছে।

সম্বন্ধপদ ও সম্বোধনপদ আলাদা করে চিহ্নিত করো।


৯৮. চূড়ান্ত মনে রাখার সূত্র

কারক

ক্রিয়ার সঙ্গে নামপদের সম্পর্ক।

বিভক্তি

শব্দের সঙ্গে যুক্ত সম্পর্কসূচক বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি।

নির্দেশক

পদকে নির্দিষ্ট, গণনাযোগ্য বা সংখ্যাগতভাবে চিহ্নিত করে।

অনুসর্গ

পদের পরে বসা স্বাধীন সম্পর্কসূচক অব্যয়।

সম্বন্ধপদ

নামপদের সঙ্গে নামপদের সম্পর্ক।

সম্বোধনপদ

কাউকে ডাকা বা আহ্বান করা।

অকারক

যে পদের সঙ্গে সমাপিকা ক্রিয়ার প্রত্যক্ষ কারক-সম্পর্ক নেই।


৯৯. সর্বশেষ মহাসূত্র

কে কাজ করছে? → কর্তৃ
কী/কাকে নিয়ে কাজ? → কর্ম
কী দিয়ে কাজ? → করণ
কার জন্য/কী উদ্দেশ্যে? → নিমিত্ত
কোথা থেকে/কী থেকে? → অপাদান
কোথায়/কখন/কোন বিষয়ে? → অধিকরণ

আর—

কার/কিসের? → সম্বন্ধপদ → অকারক
কাকে ডাকা হচ্ছে? → সম্বোধনপদ → অকারক

এবং—

টি/টা/গুলি/গুলো → নির্দেশক
এ/তে/কে/রে/র/এর/শূন্য ইত্যাদি → বিভক্তি
জন্য/থেকে/দিয়ে/কাছে/সঙ্গে/দিকে ইত্যাদি → অনুসর্গ

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা—

বিভক্তি দেখে কারক নির্ণয় করা যায় না; ক্রিয়ার সঙ্গে পদের অর্থগত সম্পর্ক বিচার করেই কারক নির্ণয় করতে হয়।

এই নীতিটিই কারক, বিভক্তি, নির্দেশক, অনুসর্গ ও অকারক অধ্যায়ের মূল চাবিকাঠি।

###পরিবেশনে- ড.অনিশ রায়

 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top