সমাস

বাংলা ব্যাকরণের শব্দগঠন, অর্থসংক্ষেপ ও ভাষাসৌন্দর্যের পূর্ণাঙ্গ অধ্যায়

বহু পদের বিস্তৃত প্রকাশকে অর্থের অখণ্ডতা বজায় রেখে এক পদে সংক্ষেপিত করার প্রক্রিয়াই সমাস।


১. সমাস : ভূমিকা

ভাষার প্রধান উদ্দেশ্য হল অর্থের যথাযথ প্রকাশ। কিন্তু একই কথা সব সময় দীর্ঘ বাক্যে প্রকাশ করতে হয় না। ভাষা তার স্বাভাবিক বিবর্তনে দীর্ঘ প্রকাশকে সংক্ষিপ্ত করে, বহু পদের অর্থকে একত্র করে এবং নতুন শব্দ নির্মাণ করে। বাংলা ভাষায় এই অর্থসংক্ষেপ ও পদসংগঠনের অন্যতম প্রধান পদ্ধতি হল সমাস

আমরা বলি—

রাজার পুত্র
কিন্তু সংক্ষেপে বলি—
রাজপুত্র

বলি—

দেশের প্রতি প্রেম
কিন্তু এক পদে বলি—
দেশপ্রেম

বলি—

যার নীল কণ্ঠ
কিন্তু এক পদে বলি—
নীলকণ্ঠ

আবার—

রাম ও লক্ষ্মণ
থেকে হয়—
রামলক্ষ্মণ

প্রতিটি ক্ষেত্রেই একাধিক পদের মধ্যে কোনো না কোনো অর্থগত সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই সম্পর্ককে সংহত করে একটি নতুন পদ তৈরি হয়েছে। এই প্রক্রিয়াই সমাস


২. ‘সমাস’ শব্দের অর্থ ও ব্যুৎপত্তি

সমাস শব্দটি সংস্কৃত ‘সম্ + আস্’ থেকে গঠিত।

  • সম্ = একত্র, সঙ্গে, সম্যক্
  • আস্ = বসা, অবস্থান করা

সুতরাং ব্যুৎপত্তিগত অর্থে সমাস = একত্রে বসা বা একত্র হওয়া

ব্যাকরণে এর অর্থ আরও নির্দিষ্ট—

পরস্পর সম্পর্কযুক্ত একাধিক পদ একত্র হয়ে সংক্ষেপে একটি পদে পরিণত হওয়াই সমাস।

মনে রাখুন

ব্যুৎপত্তিগত অর্থ → একত্রে বসা
ব্যাকরণগত অর্থ → একাধিক পদের একপদীকরণ


৩. সমাসের সংজ্ঞা

সহজ সংজ্ঞা

দুই বা ততোধিক সম্পর্কযুক্ত পদকে সংক্ষেপ করে একটি পদে পরিণত করার প্রক্রিয়াকে সমাস বলে।

পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণগত সংজ্ঞা

পরস্পর অর্থসম্পর্কযুক্ত দুই বা ততোধিক সমস্যমান পদকে বিভক্তি, অনুসর্গ বা অন্য কোনো সংযোগসূচক অংশের লোপ বা সংহতির মাধ্যমে একপদে পরিণত করার প্রক্রিয়াকে সমাস বলে।

তবে মনে রাখতে হবে—প্রত্যেক সমাসেই যে বিভক্তি অবশ্যই লোপ পাবে, এমন নয়। অলোপ/অলুক সমাসে বিভক্তিচিহ্ন থেকেও যেতে পারে।


৪. সমাসের মূল কথা : একপদীকরণ

সমাসের কেন্দ্রীয় ধারণা হল—

বহু পদ → অর্থসম্পর্ক → সংক্ষেপ → এক পদ

যেমন—

রাজার পুত্র → রাজপুত্র

এখানে—

  • ‘রাজার’ = পূর্বপদ
  • ‘পুত্র’ = পরপদ
  • ‘রাজার পুত্র’ = ব্যাসবাক্য
  • ‘রাজপুত্র’ = সমস্তপদ
  • ‘রাজার’ ও ‘পুত্র’ = সমস্যমান পদ

৫. সমাসের কাজ

সমাসের কাজ শুধু শব্দ ছোট করা নয়। বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার, প্রকাশভঙ্গি ও সাহিত্যিক শক্তি গঠনে সমাসের গভীর ভূমিকা রয়েছে।

সমাসের প্রধান কাজ

১. ভাষাকে সংক্ষিপ্ত করা
রাজার পুত্র → রাজপুত্র

২. অর্থকে ঘনীভূত করা
দেশের প্রতি প্রেম → দেশপ্রেম

৩. নতুন শব্দ সৃষ্টি করা
সমাজ + সেবা → সমাজসেবা

৪. ভাষাকে শক্তিশালী করা
মহান যে পুরুষ → মহাপুরুষ

৫. সাহিত্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা
নীলকমল, চন্দ্রমুখী, পীতাম্বর প্রভৃতি শব্দে অর্থের সঙ্গে চিত্রকল্পও সৃষ্টি হয়।

৬. পরিভাষা নির্মাণ করা
ভাষাবিজ্ঞান, শব্দতত্ত্ব, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মানবাধিকার ইত্যাদি।

৭. দীর্ঘ ভাবকে দ্রুত প্রকাশ করা
‘দেশের জন্য যে প্রেম’ → দেশপ্রেম।


৬. সমাসের প্রয়োজনীয়তা

একটি ভাষা যত সমৃদ্ধ হয়, তার শব্দগঠন ও শব্দসংক্ষেপের ক্ষমতা তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষায়—

  • সাহিত্য,
  • সংবাদপত্র,
  • প্রশাসন,
  • বিজ্ঞান,
  • দর্শন,
  • রাষ্ট্রবিজ্ঞান,
  • সমাজবিজ্ঞান,
  • প্রযুক্তি

প্রভৃতি ক্ষেত্রে সমাসবদ্ধ শব্দ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

অতএব সমাস শুধু পরীক্ষার একটি ব্যাকরণ-অধ্যায় নয়; এটি বাংলা ভাষায় নতুন শব্দ গঠনের একটি সক্রিয় পদ্ধতি


৭. সমাসের বৈশিষ্ট্য

সমাসের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—

১. একাধিক পদ থাকে

সাধারণত দুই বা ততোধিক পদ নিয়ে সমাস গঠিত হয়।

২. অর্থগত সম্পর্ক থাকে

পদগুলি নিছক পাশাপাশি বসে না; তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট সম্পর্ক থাকে।

৩. একপদীকরণ ঘটে

বহু পদ একটি পদে সংহত হয়।

৪. সংক্ষেপ ঘটে

দীর্ঘ প্রকাশ সংক্ষিপ্ত হয়।

৫. বিভক্তি বা অনুসর্গের লোপ হতে পারে

যেমন—

রাজার পুত্র → রাজপুত্র

৬. বিভক্তি সবসময় লোপ পায় না

অলোপ/অলুক সমাসে বিভক্তিচিহ্ন থাকতে পারে।

৭. সমস্তপদ একটি সংহত অর্থ প্রকাশ করে

এটি শুধু পাশাপাশি বসানো শব্দের সমষ্টি নয়।


৮. সমাসের প্রধান পরিভাষা

সমাস শেখার আগে এই শব্দগুলি অবশ্যই আয়ত্ত করতে হবে।


৮.১ সমস্যমান পদ

যে পদগুলি সমাসবদ্ধ হয়ে নতুন পদ তৈরি করে, তাদের সমস্যমান পদ বলে।

রাজার + পুত্র → রাজপুত্র

এখানে ‘রাজার’ ও ‘পুত্র’ সমস্যমান পদ।


৮.২ পূর্বপদ

সমাসবদ্ধ পদের প্রথম অংশ।

রাজপুত্র

এখানে রাজ পূর্বপদ।


৮.৩ পরপদ

সমাসবদ্ধ পদের শেষ অংশ।

রাজপুত্র

এখানে পুত্র পরপদ।


৮.৪ সমস্তপদ

সমাসের ফলে যে নতুন পদ তৈরি হয় তাকে সমস্তপদ বা সমাসবদ্ধ পদ বলে।

রাজার পুত্র → রাজপুত্র

এখানে ‘রাজপুত্র’ সমস্তপদ।


৮.৫ ব্যাসবাক্য

সমস্তপদকে বিশ্লেষণ করে যে পদবন্ধের মাধ্যমে তার অন্তর্নিহিত সম্পর্ক প্রকাশ করা হয় তাকে ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য বলে।

রাজপুত্র → রাজার পুত্র

এখানে ‘রাজার পুত্র’ ব্যাসবাক্য।

মনে রাখুন

সমস্তপদকে ভাঙলে ব্যাসবাক্য; ব্যাসবাক্যকে সংক্ষেপ করলে সমস্তপদ।


৯. সমাসের গঠন : একটি পূর্ণ উদাহরণ

রাজার পুত্র → রাজপুত্র

ধাপ ১ : রাজার + পুত্র
ধাপ ২ : সম্পর্ক নির্ণয়—‘কার?’
ধাপ ৩ : ষষ্ঠী বিভক্তি
ধাপ ৪ : বিভক্তির লোপ
ধাপ ৫ : রাজ + পুত্র
ধাপ ৬ : রাজপুত্র

অতএব—

রাজপুত্র = রাজার পুত্র = ষষ্ঠী তৎপুরুষ


১০. সমাস ও সন্ধির পার্থক্য

সমাস ও সন্ধি—দুটিই শব্দগঠনের প্রক্রিয়া; কিন্তু তাদের ভিত্তি এক নয়।

সন্ধি

ধ্বনি/বর্ণের মিলন ও পরিবর্তন

সমাস

পদের অর্থগত সম্পর্কের ভিত্তিতে একপদীকরণ

বিষয়সমাসসন্ধি
মূল বিষয়পদধ্বনি/বর্ণ
প্রধান ভিত্তিঅর্থগত সম্পর্কধ্বনিগত সম্পর্ক
উদ্দেশ্যসংক্ষেপ ও একপদীকরণধ্বনির সংযোগ/পরিবর্তন
সমস্যমান পদথাকেথাকে না
ব্যাসবাক্যথাকেথাকে না
সমস্তপদথাকেথাকে না
বিভক্তির ভূমিকাগুরুত্বপূর্ণ হতে পারেমূল বিষয় নয়
বিশ্লেষণের পদ্ধতিঅর্থসম্পর্কধ্বনির নিয়ম
উদাহরণরাজার পুত্র → রাজপুত্রবিদ্যা + আলয় → বিদ্যালয়

স্মরণসূত্র

পদে পদে অর্থের মিল = সমাস
ধ্বনিতে ধ্বনিতে মিল = সন্ধি


১১. সমাস ও প্রত্যয়ের পার্থক্য

এটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সমাস

পদ + পদ → নতুন পদ

দেশের প্রেম → দেশপ্রেম

প্রত্যয়

ধাতু/প্রকৃতি + প্রত্যয় → নতুন শব্দ

শিক্ষা + ক → শিক্ষক

সূত্র

পদে পদে যোগ = সমাস
প্রকৃতি/ধাতুর সঙ্গে প্রত্যয় = প্রত্যয়


১২. সমাস ও উপসর্গের পার্থক্য

উপসর্গ সাধারণত শব্দ বা ধাতুর আগে যুক্ত হয়ে অর্থের পরিবর্তন ঘটায়।

যেমন—

প্র + হার = প্রহার

অন্যদিকে—

দেশের প্রেম → দেশপ্রেম

এখানে দুটি পদ অর্থসম্পর্কের মাধ্যমে এক হয়েছে।


১৩. সমাসের শ্রেণিবিভাগ

এই অধ্যায়ে আপনার নির্ধারিত ক্রমে প্রধান শ্রেণিগুলি আলোচনা করা হল—

১. দ্বন্দ্ব

২. বহুব্রীহি

৩. তৎপুরুষ

৪. কর্মধারয়

৫. দ্বিগু

৬. নিত্য

এরপর পৃথকভাবে—

৭. অব্যয়ীভাব

৮. অলোপ/অলুক

৯. বাক্যাশ্রয়ী

শ্রেণিবিভাগ নিয়ে বাংলা ব্যাকরণগ্রন্থে মতভেদ আছে। বিশেষত অব্যয়ীভাব, দ্বিগু, নিত্য, অলুক ইত্যাদিকে সব গ্রন্থে একই স্তরে রাখা হয় না। তাই এখানে শিক্ষার্থীর প্রচলিত পশ্চিমবঙ্গীয় ব্যাকরণশিক্ষা ও পরীক্ষার প্রয়োজন অনুসারে কাঠামো সাজানো হয়েছে।


১৪. দ্বন্দ্ব সমাস

সংজ্ঞা

যে সমাসে সমস্যমান পদগুলির প্রত্যেকটির অর্থই প্রধান থাকে এবং ব্যাসবাক্যে সাধারণত ‘ও’, ‘এবং’, ‘আর’, ‘বা’, ‘কিংবা’ ইত্যাদি সংযোজক সম্পর্ক পাওয়া যায়, তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে।

মূল সূত্র

A + B = A ও B

উদাহরণ

রাম ও লক্ষ্মণ → রামলক্ষ্মণ

এখানে রাম ও লক্ষ্মণ—দুজনের অর্থই প্রধান।


দ্বন্দ্বের প্রকার

১. সমার্থক

২. বিপরীতার্থক

৩. বিকল্পার্থক

৪. সমাহার

৫. মিলনার্থক

৬. অলোপ

৭. বহুপদী

৮. একশেষ


১৪.১ সমার্থক দ্বন্দ্ব

সমার্থক বা প্রায় সমার্থক পদ যুক্ত হলে—

  • কাজ ও কর্ম → কাজকর্ম
  • ঘর ও বাড়ি → ঘরবাড়ি
  • আত্মীয় ও স্বজন → আত্মীয়স্বজন

১৪.২ বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব

বিপরীত অর্থের পদ যুক্ত হলে—

  • দিন ও রাত → দিনরাত
  • সুখ ও দুঃখ → সুখদুঃখ
  • লাভ ও ক্ষতি → লাভক্ষতি
  • জীবন ও মৃত্যু → জীবনমৃত্যু

১৪.৩ বিকল্পার্থক দ্বন্দ্ব

‘বা’, ‘অথবা’, ‘কিংবা’ অর্থ থাকলে—

  • সত্য অথবা মিথ্যা → সত্যমিথ্যা
  • হার অথবা জিত → হারজিত

১৪.৪ সমাহার দ্বন্দ্ব

একাধিক পদের সমষ্টিগত ধারণা প্রকাশ করলে—

  • চাল ও ডাল → চালডাল
  • শাক ও সবজি → শাকসবজি
  • ফল ও ফুল → ফলফুল

১৪.৫ মিলনার্থক দ্বন্দ্ব

যুগল বা মিলিত সত্তা বোঝালে—

  • মা ও বাবা → মা-বাবা
  • ভাই ও বোন → ভাইবোন
  • হাত ও পা → হাতপা

নোট: সমাহার ও মিলনার্থক দ্বন্দ্বের সীমারেখা বিভিন্ন ব্যাকরণগ্রন্থে এক নয়। পরীক্ষায় নির্দিষ্ট পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞা ও উদাহরণ অনুসরণ করা উচিত।


১৪.৬ অলোপ দ্বন্দ্ব

বিভক্তি লোপ না পেলে—

  • ঘরে ও বাইরে → ঘরে-বাইরে
  • হাতে ও পায়ে → হাতে-পায়ে
  • কাগজে ও কলমে → কাগজে-কলমে

১৪.৭ বহুপদী দ্বন্দ্ব

দুইয়ের বেশি পদ যুক্ত হলে—

  • রূপ-রস-গন্ধ
  • সুখ-দুঃখ-কষ্ট
  • রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্ন

১৪.৮ একশেষ দ্বন্দ্ব

একাধিক ব্যক্তি বা সত্তার সমষ্টিগত অর্থ একটি অবশিষ্ট পদে প্রকাশ পেলে—

আমি ও তুমি → আমরা
তুমি ও সে → তোমরা


১৫. বহুব্রীহি সমাস

সংজ্ঞা

যে সমাসে সমস্যমান পদগুলির কোনো একটির অর্থ প্রধান না হয়ে, তাদের সমন্বিত অর্থের দ্বারা অন্য কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়কে বোঝানো হয়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে।

উদাহরণ

দশ আনন যার → দশানন

এখানে দশ বা আনন—কোনোটিই প্রধান নয়; ‘দশানন’ দ্বারা রাবণকে বোঝানো হয়েছে।

মূল সূত্র

A + B → A নয় + B নয় → অন্য অর্থ


বহুব্রীহির প্রকার

১. সমানাধিকরণ
২. ব্যাধিকরণ
৩. মধ্যপদলোপী
৪. অলোপ
৫. নঞর্থক
৬. সহার্থক
৭. ব্যতিহার
৮. সংখ্যা


১৫.১ সমানাধিকরণ বহুব্রীহি

নীল কণ্ঠ যার → নীলকণ্ঠ
পীত অম্বর যার → পীতাম্বর


১৫.২ ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি

যেখানে সমস্যমান পদগুলির কারক/অধিকরণগত সম্পর্ক ভিন্ন এবং সমগ্র পদটি অন্য কোনো সত্তাকে নির্দেশ করে।

এই শ্রেণির উদাহরণ ব্যাকরণগ্রন্থভেদে ভিন্নভাবে বিশ্লেষিত হতে পারে।


১৫.৩ মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি

ব্যাসবাক্যের মধ্যবর্তী কোনো পদ লোপ পেলে—

গায়ে হলুদ দেওয়া যে অনুষ্ঠান → গায়েহলুদ


১৫.৪ অলোপ বহুব্রীহি

বহুব্রীহির অর্থসম্পর্ক বজায় থাকলেও বিভক্তি বা বিভক্তিচিহ্ন লোপ না পেলে অলোপ/অলুক প্রকৃতি দেখা যায়।


১৫.৫ নঞর্থক বহুব্রীহি

যার লজ্জা নেই → নির্লজ্জ
যার ভয় নেই → নির্ভয়

তুলনা

অশুভ = নয় শুভ → নঞ্-তৎপুরুষ

কিন্তু—

নির্লজ্জ = যার লজ্জা নেই → বহুব্রীহি


১৫.৬ সহার্থক বহুব্রীহি

‘সহ’, ‘সহিত’, ‘যুক্ত’, ‘বিশিষ্ট’ অর্থ প্রকাশ করে।


১৫.৭ ব্যতিহার বহুব্রীহি

পারস্পরিক ক্রিয়া বা সম্পর্ক প্রকাশ করে—

  • হাতাহাতি
  • চোখাচোখি
  • কেশাকেশি

১৫.৮ সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

সংখ্যাবাচক পদ থাকলেও সমগ্র শব্দ অন্য কোনো সত্তাকে নির্দেশ করলে—

দশ আনন যার → দশানন
তিন নয়ন যার → ত্রিনয়ন
চার বাহু যার → চতুর্ভুজ

গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য

সংখ্যা + সমাহার = দ্বিগু
সংখ্যা + যার = সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি


১৬. তৎপুরুষ সমাস

সংজ্ঞা

যে সমাসে পূর্বপদের কারক-বিভক্তি বা বিভক্তিস্থানীয় সম্পর্ক লোপ পায় এবং পরপদের অর্থ প্রধান থাকে, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে।

উদাহরণ

রাজার পুত্র → রাজপুত্র

এখানে—

কার পুত্র? → রাজার পুত্র

তাই এটি ষষ্ঠী তৎপুরুষ।


তৎপুরুষের প্রকার

১. কর্ম
২. করণ
৩. অপাদান
৪. নিমিত্ত
৫. অধিকরণ
৬. সম্বন্ধ
৭. নঞর্থক
৮. অলোপ
৯. উপসর্গ
১০. উপপদ
১১. ব্যাপ্তি
১২. ক্রিয়াবিশেষণ


১৬.১ কর্ম তৎপুরুষ

প্রশ্ন—

কাকে? কীকে?

দেশকে সেবা → দেশসেবা


১৬.২ করণ তৎপুরুষ

প্রশ্ন—

কী দিয়ে? কার দ্বারা?

বাণ দ্বারা আহত → বাণাহত


১৬.৩ অপাদান তৎপুরুষ

প্রশ্ন—

কোথা থেকে? কার থেকে?

পদ থেকে চ্যুত → পদচ্যুত


১৬.৪ নিমিত্ত তৎপুরুষ

প্রশ্ন—

কার জন্য? কিসের জন্য?

শিশুর জন্য সাহিত্য → শিশুসাহিত্য


১৬.৫ অধিকরণ তৎপুরুষ

প্রশ্ন—

কোথায়? কিসে?

ধ্যানে লীন → ধ্যানলীন


১৬.৬ সম্বন্ধ তৎপুরুষ

প্রশ্ন—

কার? কিসের?

  • রাজার পুত্র → রাজপুত্র
  • গঙ্গার জল → গঙ্গাজল
  • দেশের সেবা → দেশসেবা

১৬.৭ নঞর্থক তৎপুরুষ

‘নয়’ অর্থ প্রকাশ করে।

  • নয় শুভ → অশুভ
  • নয় যোগ্য → অযোগ্য
  • নয় নিয়ম → অনিয়ম

১৬.৮ অলোপ তৎপুরুষ

বিভক্তি বা সম্পর্কসূচক অংশ লোপ না পেলে।


১৬.৯ উপসর্গ তৎপুরুষ

উপসর্গজাত পূর্বাংশের সঙ্গে পরবর্তী অংশের সংযোগে গঠিত কিছু প্রচলিত শব্দকে এই শ্রেণিতে আলোচনা করা হয়।

তবে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের বিচারে উপসর্গযুক্ত প্রতিটি শব্দকে সমাস বলা যায় না—এটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন।


১৬.১০ উপপদ তৎপুরুষ

উপপদের সঙ্গে কৃদন্ত/ক্রিয়ামূলজাত পদ যুক্ত হলে—

জলে চরে যে → জলচর
পঙ্কে জন্মে যে → পঙ্কজ


১৬.১১ ব্যাপ্তি তৎপুরুষ

কোনো নির্দিষ্ট পরিসর, সময় বা বিস্তারের সম্পর্ক প্রকাশকারী প্রচলিত গঠন।


১৬.১২ ক্রিয়াবিশেষণ তৎপুরুষ

ক্রিয়ার ধরন, ভঙ্গি বা পদ্ধতি নির্দেশকারী কিছু সমাসবদ্ধ গঠনকে এই শ্রেণিতে রাখা হয়।


১৭. কর্মধারয় সমাস

সংজ্ঞা

যে সমাসে পূর্বপদ পরপদের বিশেষণ বা বিশেষণধর্মী পরিচায়ক এবং পরপদের অর্থ প্রধান, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে।

উদাহরণ

নীল যে কমল → নীলকমল

এখানে ‘নীল’ হল ‘কমল’-এর বিশেষণ।


কর্মধারয়ের প্রকার

১. সাধারণ
২. মধ্যপদলোপী
৩. উপমান
৪. উপমিত
৫. রূপক


১৭.১ সাধারণ কর্মধারয়

  • নীল যে কমল → নীলকমল
  • মহান যে পুরুষ → মহাপুরুষ
  • কালো যে মেঘ → কালোমেঘ

১৭.২ মধ্যপদলোপী কর্মধারয়

ব্যাসবাক্যের মধ্যবর্তী পদ লোপ পেলে—

মধ্যপদলোপী কর্মধারয়


১৭.৩ উপমান কর্মধারয়

উপমান ও সাধারণ ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত।

বজ্রের মতো কঠিন → বজ্রকঠিন


১৭.৪ উপমিত কর্মধারয়

উপমেয় ও উপমানের তুলনামূলক সম্পর্ক থাকে, কিন্তু সাধারণ ধর্ম স্পষ্টভাবে প্রকাশিত না-ও থাকতে পারে।

মুখ চন্দ্রের ন্যায় → মুখচন্দ্র


১৭.৫ রূপক কর্মধারয়

উপমেয়কে উপমানের সঙ্গে অভিন্নরূপে কল্পনা করা হয়।

মন রূপ মন্দির → মনমন্দির

সূত্র

তুলনা = উপমা
অভিন্ন কল্পনা = রূপক


১৮. দ্বিগু সমাস

সংজ্ঞা

যে সমাসে সংখ্যাবাচক পূর্বপদ থাকে এবং সমগ্র পদে সাধারণত সমাহার বা বিশেষ তদ্ধিতার্থ প্রকাশিত হয়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে।


১৮.১ সমাহারার্থে দ্বিগু

নয় রত্নের সমাহার → নবরত্ন

তিন কালের সমাহার → ত্রিকাল


১৮.২ তদ্ধিতার্থে দ্বিগু

সংখ্যাবাচক পূর্বপদের সঙ্গে পরবর্তী পদের যোগে বিশেষ তদ্ধিতার্থ প্রকাশিত হলে—

তদ্ধিতার্থে দ্বিগু


১৯. নিত্য সমাস

সংজ্ঞা

যে সমাসবদ্ধ পদ প্রচলনে এমন একটি স্থায়ী ও বিশেষ অর্থ গ্রহণ করেছে, যা সাধারণ ব্যাসবাক্যে সহজে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা যায় না, তাকে নিত্য সমাস বলে।

এখানে প্রচলিত অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র

স্থায়ী প্রচলিত অর্থ = নিত্য


২০. অব্যয়ীভাব

সংজ্ঞা

যে সমাসে পূর্বপদ অব্যয়ধর্মী এবং পূর্বপদের অর্থ প্রধান, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে।

উদাহরণ—

  • যথারীতি = রীতি অনুযায়ী
  • যথাক্রম = ক্রম অনুযায়ী
  • আমৃত্যু = মৃত্যু পর্যন্ত

সূত্র

অব্যয় + পূর্বপদ-প্রাধান্য = অব্যয়ীভাব


২১. অলোপ বা অলুক

লুক = লোপ
অলুক = লোপ হয়নি।

অতএব—

সমাসের পরেও বিভক্তি বা বিভক্তিচিহ্ন অক্ষুণ্ণ থাকলে তাকে অলোপ/অলুক বলা হয়।

যেমন—

ঘরে ও বাইরে → ঘরে-বাইরে

গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন

অলোপকে সব সময় একটি স্বতন্ত্র অর্থভিত্তিক সমাসশ্রেণি হিসেবে দেখানো ঠিক নয়। এটি অনেক সময় সমাসের গঠনগত বৈশিষ্ট্য


২২. বাক্যাশ্রয়ী সমাস

দীর্ঘ বাক্য বা বাক্যাংশের ভাবকে সংক্ষেপ করে একটি যৌগিক গঠনে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বাক্যাশ্রয়ী সমাসের ধারণা ব্যবহৃত হয়।

এটি বিশেষত—

  • সংবাদভাষা,
  • প্রশাসনিক ভাষা,
  • আধুনিক পরিভাষা,
  • সাহিত্যিক ভাষা

ইত্যাদিতে গুরুত্বপূর্ণ।


২৩. সবচেয়ে কঠিন পার্থক্য : তৎপুরুষ বনাম কর্মধারয়

দুটির ক্ষেত্রেই পরপদ প্রধান হতে পারে। তাই বিভ্রান্তি হয়।

নীলকমল

নীল যে কমল

এখানে ‘নীল’ হল ‘কমল’-এর বিশেষণ।

→ কর্মধারয়

রাজপুত্র

রাজার পুত্র

এখানে ‘রাজার’ ও ‘পুত্র’-এর মধ্যে সম্বন্ধ।

→ তৎপুরুষ

সূত্র

বিশেষণ + বিশেষ্য = কর্মধারয়
কারক/বিভক্তির সম্পর্ক = তৎপুরুষ


২৪. বহুব্রীহি বনাম কর্মধারয়

নীলকমল

নীল যে কমল

‘কমল’ই প্রধান।

→ কর্মধারয়

নীলকণ্ঠ

নীল কণ্ঠ যার

কণ্ঠ নয়, একজন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে।

→ বহুব্রীহি

সূত্র

‘যে’ = কর্মধারয়
‘যার’ = বহুব্রীহি

এটি অবশ্য সহায়ক সূত্র, অন্ধভাবে প্রয়োগ করার নিয়ম নয়।


২৫. দ্বিগু বনাম সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

নবরত্ন

নয় রত্নের সমাহার

→ দ্বিগু

দশানন

দশ আনন যার

→ সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

মহাসূত্র

সংখ্যা + সমাহার = দ্বিগু
সংখ্যা + যার = বহুব্রীহি


২৬. নঞ্-তৎপুরুষ বনাম নঞর্থক বহুব্রীহি

অশুভ

নয় শুভ

→ নঞ্-তৎপুরুষ

নির্লজ্জ

যার লজ্জা নেই

→ নঞর্থক বহুব্রীহি

সূত্র

‘নয়’ = তৎপুরুষ
‘যার নেই’ = বহুব্রীহি


২৭. সমাস নির্ণয়ের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

অচেনা সমাস দেখলে এই সাতটি ধাপ অনুসরণ করো—

ধাপ ১

সমস্তপদটি ভাঙো।

ধাপ ২

সম্ভাব্য ব্যাসবাক্য তৈরি করো।

ধাপ ৩

পদগুলির অর্থসম্পর্ক চিহ্নিত করো।

ধাপ ৪

কোন পদ প্রধান তা দেখো।

ধাপ ৫

‘ও’, ‘যার’, ‘কার’, ‘কাকে’, ‘দিয়ে’, ‘থেকে’, ‘যে’, ‘সংখ্যা’ ইত্যাদি সংকেত খুঁজে দেখো।

ধাপ ৬

বিশেষ বৈশিষ্ট্য—অব্যয়, অলোপ, নঞ্, উপমান, মধ্যপদলোপ ইত্যাদি আছে কি না দেখো।

ধাপ ৭

তারপর সমাসের নাম নির্ণয় করো।


২৮. সমাস নির্ণয়ের ফ্লোচার্ট

                 সমস্তপদ
                     │
                     ▼
               ব্যাসবাক্য করো
                     │
          ┌──────────┼──────────┐
          ▼          ▼          ▼
        ‘ও’?       ‘যার’?     কারক-সম্পর্ক?
          │          │          │
        দ্বন্দ্ব   বহুব্রীহি   তৎপুরুষ
                                │
                                ▼
                         বিশেষণ + বিশেষ্য?
                                │
                               হ্যাঁ
                                │
                                ▼
                           কর্মধারয়
                                │
                 সংখ্যা + সমাহার?
                                │
                               হ্যাঁ
                                ▼
                              দ্বিগু
                                │
                    অব্যয় পূর্বপদ?
                                │
                               হ্যাঁ
                                ▼
                           অব্যয়ীভাব

২৯. সমাস শেখার ‘প্রধান পদ’ সূত্র

সমাসপ্রধান পদ
দ্বন্দ্বউভয় পদ
তৎপুরুষপরপদ
কর্মধারয়পরপদ
বহুব্রীহিঅন্যপদ/অন্য অর্থ
অব্যয়ীভাবপূর্বপদ
দ্বিগুসংখ্যাবাচক পূর্বপদ + সমাহার/বিশেষার্থ

৩০. সমাসের পূর্ণাঙ্গ মাস্টার-চার্ট

দ্বন্দ্ব

উভয় পদ প্রধান

→ সমার্থক
→ বিপরীতার্থক
→ বিকল্পার্থক
→ সমাহার
→ মিলনার্থক
→ অলোপ
→ বহুপদী
→ একশেষ


বহুব্রীহি

অন্য অর্থ প্রধান

→ সমানাধিকরণ
→ ব্যাধিকরণ
→ মধ্যপদলোপী
→ অলোপ
→ নঞর্থক
→ সহার্থক
→ ব্যতিহার
→ সংখ্যাবাচক


তৎপুরুষ

পরপদ প্রধান

→ কর্ম
→ করণ
→ অপাদান
→ নিমিত্ত
→ অধিকরণ
→ সম্বন্ধ
→ নঞর্থক
→ অলোপ
→ উপসর্গ
→ উপপদ
→ ব্যাপ্তি
→ ক্রিয়াবিশেষণ


কর্মধারয়

বিশেষণ + বিশেষ্য

→ সাধারণ
→ মধ্যপদলোপী
→ উপমান
→ উপমিত
→ রূপক


দ্বিগু

সংখ্যা + সমাহার/বিশেষার্থ

→ সমাহারার্থে
→ তদ্ধিতার্থে


নিত্য

স্থায়ী প্রচলিত অর্থ


পৃথক বিশেষ গঠন

→ অব্যয়ীভাব
→ অলোপ/অলুক
→ বাক্যাশ্রয়ী


৩১. সমাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘ফর্মুলা’

এবার পুরো অধ্যায়টি মাত্র কয়েকটি সূত্রে মনে রাখার চেষ্টা করা যাক।

প্রথম সূত্র : “ভাঙো”

সমস্তপদ → ব্যাসবাক্য


দ্বিতীয় সূত্র : “সম্পর্ক ধরো”

ও → দ্বন্দ্ব
যার → বহুব্রীহি
কার/কাকে/দিয়ে/থেকে/জন্য/এ-তে → তৎপুরুষ
যে → কর্মধারয়
সংখ্যা + সমাহার → দ্বিগু


তৃতীয় সূত্র : “প্রধান পদ ধরো”

দ্বন্দ্ব → উভয়
তৎপুরুষ → পর
কর্মধারয় → পর
বহুব্রীহি → অন্য
অব্যয়ীভাব → পূর্ব


চতুর্থ সূত্র : “বিশেষ চিহ্ন ধরো”

নয় → নঞ্-তৎপুরুষ
যার নেই → নঞর্থক বহুব্রীহি
তুলনা → উপমান/উপমিত
অভিন্ন কল্পনা → রূপক
সংখ্যা + সমাহার → দ্বিগু
বিভক্তি রয়ে গেছে → অলোপ
অব্যয় আগে → অব্যয়ীভাব
স্থায়ী প্রচলিত অর্থ → নিত্য


৩২. এক মিনিটে সমাস

ও = দ্বন্দ্ব

যার = বহুব্রীহি

কার/কাকে/দিয়ে/থেকে/জন্য/এ-তে = তৎপুরুষ

যে = কর্মধারয়

সংখ্যা + সমাহার = দ্বিগু

অব্যয় প্রধান = অব্যয়ীভাব

স্থায়ী বিশেষ অর্থ = নিত্য

বিভক্তি রয়ে গেছে = অলোপ


৩৩. এক লাইনের মহামন্ত্র

“সমস্তপদ ভাঙো, ব্যাসবাক্য বানাও; সম্পর্ক বোঝো, প্রধান পদ চেনো—তারপর সমাসের নাম জানাও।”


৩৪. শিক্ষক-শিক্ষিকার জন্য শিক্ষণ-পদ্ধতি

সমাস পড়ানোর সময় সরাসরি ৩০–৪০টি সংজ্ঞা মুখস্থ করানো উচিত নয়। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি—

প্রথম স্তর

সমাস কী?

দ্বিতীয় স্তর

সমস্যমান পদ–ব্যাসবাক্য–সমস্তপদ

তৃতীয় স্তর

সমাস বনাম সন্ধি

চতুর্থ স্তর

প্রধান পদ

পঞ্চম স্তর

অর্থসম্পর্ক

ষষ্ঠ স্তর

উপপ্রকার

সপ্তম স্তর

অচেনা শব্দে সমাস নির্ণয়

অর্থাৎ—

ধারণা → বিশ্লেষণ → শ্রেণি → প্রয়োগ

এই চার ধাপে সমাস শেখালে মুখস্থনির্ভরতা অনেক কমে যায়।


৩৫. শিক্ষার্থীর জন্য শেষ মুহূর্তের ‘সমাস-কার্ড’

প্রশ্নউত্তর
কীকে/কাকে?কর্ম তৎপুরুষ
কী দিয়ে/কার দ্বারা?করণ তৎপুরুষ
কোথা থেকে?অপাদান তৎপুরুষ
কার জন্য?নিমিত্ত তৎপুরুষ
কোথায়/কিসে?অধিকরণ তৎপুরুষ
কার/কিসের?সম্বন্ধ তৎপুরুষ
ও/এবং?দ্বন্দ্ব
যার?বহুব্রীহি
যে?কর্মধারয়
সংখ্যা + সমাহার?দ্বিগু
অব্যয় আগে?অব্যয়ীভাব
বিভক্তি অক্ষুণ্ণ?অলোপ
স্থায়ী প্রচলিত অর্থ?নিত্য

উপসংহার

সমাস বাংলা ব্যাকরণের নিছক একটি শ্রেণিবিভাগ নয়; এটি বাংলা ভাষার চিন্তাকে সংক্ষিপ্ত, সংহত ও অর্থঘন করার এক অসাধারণ কৌশল। দীর্ঘ বাক্যকে একটি শব্দে, বহু ধারণাকে একটি নামের মধ্যে এবং বিস্তৃত ভাবকে একটি সংহত প্রকাশে রূপ দেওয়ার ক্ষমতাই সমাসের প্রাণ।

‘রাজার পুত্র’ যখন ‘রাজপুত্র’ হয়, ‘দেশের প্রতি প্রেম’ যখন ‘দেশপ্রেম’ হয়, ‘যার নীল কণ্ঠ’ যখন ‘নীলকণ্ঠ’ হয়—তখন শুধু শব্দ ছোট হয় না; ভাষার মধ্যে অর্থের একটি নতুন স্থাপত্য নির্মিত হয়।

তাই সমাস শেখার শেষ কথা মুখস্থ নয়—

“সমাসকে চিনতে হলে শব্দের গায়ে চোখ রাখলেই হবে না; শব্দের ভিতরের সম্পর্কটি দেখতে হবে।”

সর্বশেষ স্মরণমন্ত্র

পদ ভাঙো → ব্যাসবাক্য করো → সম্পর্ক ধরো → প্রধান পদ চেনো → বিশেষ লক্ষণ দেখো → সমাস নির্ণয় করো।

এই ছয় ধাপ আয়ত্ত করতে পারলে সমাস আর মুখস্থের অধ্যায় থাকে না; তা হয়ে ওঠে যুক্তি দিয়ে সমাধান করার একটি ভাষাবৈজ্ঞানিক অধ্যায়।

 
### পরিবেশনে- ড. অনিশ রায়
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top