১. বাক্য : সংজ্ঞা ও স্বরূপ
মানুষের মনের ভাব ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু বিচ্ছিন্ন শব্দ বা এলোমেলো পদসমষ্টি সর্বদা মনের সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ করতে পারে না। পরস্পর সম্পর্কযুক্ত, সুশৃঙ্খল ও অর্থপূর্ণ পদসমষ্টিই যখন একটি সম্পূর্ণ ভাব বা মনোভাব প্রকাশ করে, তখন তাকে বাক্য বলা হয়।
প্রচলিত সংজ্ঞায়—
একটি সম্পূর্ণ মনোভাব যে সমস্ত পদ দ্বারা প্রকাশ করা হয়, তাদের সমষ্টিকে বাক্য বলে।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রচলিত সংজ্ঞাতেও বাক্যকে একটি সম্পূর্ণ মনোভাব প্রকাশকারী পদসমষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
অন্যভাবে বলা যায়—
যে সুশৃঙ্খল পদসমষ্টি দ্বারা বক্তার একটি সম্পূর্ণ ভাব, বক্তব্য, প্রশ্ন, ইচ্ছা, আদেশ, আবেগ, সংশয় বা শর্ত প্রকাশিত হয়, তাকে বাক্য বলে।
উদাহরণ
- রাহুল বই পড়ে।
- আজ খুব বৃষ্টি হচ্ছে।
- তুমি কি কলকাতায় যাবে?
- মন দিয়ে পড়াশোনা করো।
- আহা! কী সুন্দর দৃশ্য!
- হয়তো সে আজ আসবে।
- যদি বৃষ্টি হয়, তবে আমরা যাব না।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই বক্তার একটি সম্পূর্ণ মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে।
২. সার্থক বা পূর্ণাঙ্গ বাক্যের লক্ষণ
একটি সার্থক ও পূর্ণাঙ্গ বাক্যের প্রধান তিনটি গুণ বা শর্ত—
১. আকাঙ্ক্ষা
২. আসত্তি
৩. যোগ্যতা
এই তিনটি শর্তকে বাংলা ব্যাকরণে বাক্যগঠনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।
আকাঙ্ক্ষা বলে বাক্যের পূর্ণতার প্রত্যাশাকে, আসত্তি বলে পদের সুশৃঙ্খল নৈকট্য ও সংযোগকে এবং যোগ্যতা বলে পদগুলির অর্থগত ও ভাবগত সামঞ্জস্যকে।
৩. আকাঙ্ক্ষা
এক পদের পর অন্য পদ শোনার যে স্বাভাবিক ইচ্ছা বা প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়, তাকে আকাঙ্ক্ষা বলে।
অর্থাৎ, বাক্যের কোনো অংশ শুনে যদি শ্রোতার মনে হয়—‘এরপর কী?’—তাহলে সেখানে আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রয়েছে।
উদাহরণ
‘আমরা কলম দিয়ে…’
এই অংশটি শুনলে শ্রোতার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—কলম দিয়ে কী?
‘আমরা কলম দিয়ে লিখি।’
বললে বাক্যটি পূর্ণতা পায়। ‘লিখি’ পদটি শোনার যে প্রত্যাশা পূর্ববর্তী অংশে সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিই আকাঙ্ক্ষা।
আরও উদাহরণ
‘রাহুল স্কুলে…’
এখানে বক্তব্য অসম্পূর্ণ।
‘রাহুল স্কুলে যায়।’
এখানে বক্তব্য সম্পূর্ণ।
সহজ সূত্র
অপূর্ণ বক্তব্য → আরও পদের প্রত্যাশা → আকাঙ্ক্ষা।
মনে রাখবে
আকাঙ্ক্ষা শুধু শব্দের পর শব্দ শোনার ইচ্ছা নয়; বরং অর্থের পূর্ণতার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানের প্রত্যাশা।
৪. আসত্তি
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন।
প্রচলিত বাংলা ব্যাকরণে শব্দটি ‘আসত্তি’, ‘আসক্তি’ নয়। ‘আসত্তি’ বলতে বোঝায় বাক্যের অর্থসংগতি রক্ষার জন্য পদের সুশৃঙ্খল বিন্যাস ও পারস্পরিক নৈকট্য।
বাক্যের অর্থসংগতি রক্ষার জন্য পরস্পর সম্পর্কযুক্ত পদগুলির যথাযথ ও সন্নিহিত বিন্যাসকে আসত্তি বলে।
উদাহরণ
‘আজ আমি স্কুলে যাব না।’
এখানে পদগুলির বিন্যাস স্বাভাবিক এবং অর্থসংগতি স্পষ্ট।
প্রচলিত উদাহরণ হিসেবে—
‘আজ না যাব স্কুলে আমি।’
বাক্যটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক পদবিন্যাসের কারণে দুর্বল।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাবৈজ্ঞানিক সতর্কতা আছে। বাংলা ভাষায় পদক্রম তুলনামূলকভাবে নমনীয়। সাহিত্যিক ভাষায় বিশেষ গুরুত্ব, ছন্দ বা আবেগ প্রকাশের জন্য স্বাভাবিক পদক্রম পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আসত্তি মানে যান্ত্রিকভাবে একটি নির্দিষ্ট পদক্রম নয়; বরং সম্পর্কযুক্ত পদগুলির অর্থবহ ও স্বাভাবিক বিন্যাস।
সহজ সূত্র
সুশৃঙ্খল পদবিন্যাস ও পারস্পরিক নৈকট্য = আসত্তি।
৫. যোগ্যতা
বাক্যে ব্যবহৃত পদগুলির মধ্যে অর্থগত, ভাবগত ও প্রসঙ্গগত সামঞ্জস্য থাকাকে যোগ্যতা বলে।
বাক্যে ব্যবহৃত পদগুলির পারস্পরিক অর্থগত ও ভাবগত সামঞ্জস্যের নাম যোগ্যতা।
উদাহরণ
‘পাখি আকাশে ওড়ে।’
এখানে ‘পাখি’, ‘আকাশ’ ও ‘ওড়ে’—এই পদগুলির মধ্যে অর্থগত সামঞ্জস্য রয়েছে। তাই বাক্যটির যোগ্যতা আছে।
কিন্তু—
‘গরু আকাশে ওড়ে।’
সাধারণ বাস্তব অর্থে ‘গরু’ ও ‘ওড়ে’-র মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। তাই বাক্যটি যোগ্যতাহীন।
আরও একটি উদাহরণ
‘পাথর গান গায়।’
সাধারণ বাস্তব অর্থে এটি যোগ্যতাহীন। তবে কবিতায় রূপক বা মানবীকরণের মাধ্যমে একই বাক্য বিশেষ নান্দনিক অর্থ লাভ করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ
যোগ্যতা বিচার করার সময় প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ ভাষায়—
‘সূর্য হাসছে।’
বাস্তব অর্থে অযোগ্য হলেও কবিতায় এটি রূপক অর্থে সম্পূর্ণ সার্থক হতে পারে।
অতএব—
যোগ্যতা = শুধু বাস্তবতার সঙ্গে মিল নয়; প্রসঙ্গ অনুযায়ী অর্থগত সঙ্গতিও।
৬. আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা : এক নজরে
| শর্ত | অর্থ | সহজ সূত্র |
|---|---|---|
| আকাঙ্ক্ষা | পূর্ণ অর্থের জন্য পরবর্তী পদের প্রত্যাশা | ‘এরপর কী?’ |
| আসত্তি | পদের সুশৃঙ্খল বিন্যাস ও নৈকট্য | ‘কোন পদ কোথায় বসবে?’ |
| যোগ্যতা | পদগুলির অর্থগত ও ভাবগত সামঞ্জস্য | ‘অর্থের মিল আছে কি?’ |
স্মরণসূত্র
আকাঙ্ক্ষা চায় পূর্ণতা, আসত্তি চায় শৃঙ্খলা, যোগ্যতা চায় সঙ্গতি।
৭. বাক্যের প্রধান অঙ্গ : উদ্দেশ্য ও বিধেয়
প্রথাগত ব্যাকরণে একটি বাক্যের দুটি প্রধান অংশ—
১. উদ্দেশ্য
২. বিধেয়
৭.১ উদ্দেশ্য
বাক্যে যাকে উদ্দেশ্য করে বা যার সম্পর্কে কিছু বলা হয়, তাকে উদ্দেশ্য বলে।
সহজভাবে—
বাক্যে যার সম্পর্কে কিছু বলা হয়, তাকে উদ্দেশ্য বলে।
উদাহরণ
‘সূর্য উঠেছে।’
এখানে ‘সূর্য’ সম্পর্কে ‘উঠেছে’ বলা হয়েছে।
সুতরাং—
সূর্য — উদ্দেশ্য
উঠেছে — বিধেয়
একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন
‘উদ্দেশ্য অর্থাৎ বাক্যের কর্তাই উদ্দেশ্য’—এভাবে সরলীকরণ করা ঠিক নয়।
কারণ কর্তা ও উদ্দেশ্য একই বিষয় নয়।
উদ্দেশ্য হলো যার সম্পর্কে কিছু বলা হচ্ছে; আর কর্তা হলো ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি ব্যাকরণগত ভূমিকা।
অনেক সরল বাক্যে উদ্দেশ্য ও কর্তা একই পদ হতে পারে—
‘রাহুল বই পড়ে।’
এখানে ‘রাহুল’ একই সঙ্গে কর্তা এবং উদ্দেশ্য।
কিন্তু—
‘রাহুলকে সবাই ভালোবাসে।’
এখানে ‘রাহুলকে’ কর্ম, অথচ ‘রাহুল’ সম্পর্কেই বক্তব্যটি কেন্দ্রীভূত। তাই উদ্দেশ্য ও কর্তার ধারণাকে এক করে দেখা উচিত নয়।
৮. বিধেয়
উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বলা, জানানো, নির্দেশ করা বা বিধান করা হয়, তাকে বিধেয় বলে।
উদাহরণ
‘সূর্য উঠেছে।’
- সূর্য — উদ্দেশ্য
- উঠেছে — বিধেয়
আরও উদাহরণ—
‘রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি।’
- রবীন্দ্রনাথ — উদ্দেশ্য
- বিশ্বকবি — বিধেয়
‘ছেলেটি মাঠে খেলছে।’
- ছেলেটি — উদ্দেশ্য
- মাঠে খেলছে — বিধেয়
৯. উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের সম্প্রসারক
উদ্দেশ্য বা বিধেয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত পদ বা পদসমষ্টি যুক্ত হয়ে তাদের অর্থকে বিস্তৃত, নির্দিষ্ট বা সমৃদ্ধ করতে পারে।
প্রধানত দুই ধরনের সম্প্রসারক—
১. উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক
২. বিধেয়ের সম্প্রসারক
৯.১ উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক
যে পদ বা পদসমষ্টি উদ্দেশ্য অংশকে বিস্তৃত বা বিশেষিত করে, তাকে উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক বলে।
উদাহরণ
মূল বাক্য—
‘রামচন্দ্র বনবাসে গিয়েছিলেন।’
বিস্তৃত বাক্য—
‘রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র রামচন্দ্র চোদ্দ বছরের জন্য বনবাসে গিয়েছিলেন।’
এখানে—
‘রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র’
অংশটি ‘রামচন্দ্র’ উদ্দেশ্যকে বিস্তৃত করেছে।
অতএব এটি উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক।
৯.২ বিধেয়ের সম্প্রসারক
বিধেয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে পদ বা পদসমষ্টি বিধেয়ের অর্থকে বিস্তৃত বা বিশেষিত করে, তাকে বিধেয়ের সম্প্রসারক বলে।
উদাহরণ
‘রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি লিখে নোবেল পুরস্কার পান।’
এখানে ‘গীতাঞ্জলি লিখে’ অংশটি বিধেয়ের অর্থকে বিস্তৃত করেছে।
আরও সহজ উদাহরণ—
‘রাহুল মন দিয়ে পড়ে।’
এখানে ‘মন দিয়ে’ অংশটি ‘পড়ে’ ক্রিয়াকে বিশেষিত করেছে।
১০. উদ্দেশ্য-বিধেয় এবং আধুনিক বাক্যবিশ্লেষণ
প্রথাগত ব্যাকরণে—
বাক্য = উদ্দেশ্য + বিধেয়
এই বিশ্লেষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে বাক্যের গঠনকে আরও সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে উদ্দেশ্যাংশের সঙ্গে বিশেষ্যগুচ্ছ/বিশেষ্যখণ্ড এবং বিধেয়াংশের সঙ্গে ক্রিয়াগুচ্ছ/ক্রিয়াভাগ-এর সম্পর্ক বিবেচনা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্যবইয়েও এই আধুনিক বিশ্লেষণের ব্যবহার দেখা যায়।
উদাহরণ—
‘আমার বন্ধু সুভাষ আজ খুব মন দিয়ে বই পড়ছে।’
এখানে—
বিশেষ্যখণ্ড : আমার বন্ধু সুভাষ
ক্রিয়াভাগ : আজ খুব মন দিয়ে বই পড়ছে
অর্থাৎ, আধুনিক বিশ্লেষণ প্রথাগত উদ্দেশ্য-বিধেয় বিশ্লেষণকে বাতিল করে না; বরং বাক্যের অভ্যন্তরীণ গঠন আরও সূক্ষ্মভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
১১. খণ্ডবাক্য
একটি বৃহত্তর বাক্যের মধ্যে কখনও একাধিক বাক্যসদৃশ অংশ থাকে। প্রতিটি অংশে নিজস্ব কর্তা ও সমাপিকা ক্রিয়া থাকতে পারে এবং তারা বৃহত্তর বাক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে।
এই ধরনের অংশকে খণ্ডবাক্য বলে।
উদাহরণ
‘যদি তুমি আস, তাহলে আমি যাব।’
এখানে দুটি খণ্ডবাক্য—
১. যদি তুমি আস
২. তাহলে আমি যাব
১২. প্রধান বা স্বাধীন খণ্ডবাক্য
যে খণ্ডবাক্য অন্য কোনো খণ্ডবাক্যের ওপর নির্ভর না করে মূল বক্তব্যের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে, তাকে প্রধান, স্বাধীন বা স্বনির্ভর খণ্ডবাক্য বলে।
উদাহরণ
‘যদি তুমি আস, তাহলে আমি যাব।’
এখানে—
‘আমি যাব’
হলো প্রধান খণ্ডবাক্য।
১৩. অপ্রধান বা অধীন খণ্ডবাক্য
যে খণ্ডবাক্য প্রধান খণ্ডবাক্যের ওপর নির্ভরশীল এবং একা মূল বক্তব্য সম্পূর্ণ করতে পারে না, তাকে অপ্রধান, অধীন বা পরনির্ভর খণ্ডবাক্য বলে।
উপরের উদাহরণে—
‘যদি তুমি আস’
হলো অপ্রধান খণ্ডবাক্য।
১৪. অপ্রধান খণ্ডবাক্যের শ্রেণিবিভাগ
প্রধান খণ্ডবাক্যের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে অপ্রধান খণ্ডবাক্য প্রধানত তিন প্রকার—
১. বিশেষ্যধর্মী বা বিশেষ্যস্থানীয় খণ্ডবাক্য
২. বিশেষণধর্মী বা বিশেষণস্থানীয় খণ্ডবাক্য
৩. ক্রিয়াবিশেষণধর্মী বা ক্রিয়াবিশেষণস্থানীয় খণ্ডবাক্য
এই শ্রেণিবিভাগটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১৫. বিশেষ্যখণ্ড / বিশেষ্যধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য
বিশেষ্য পদের মতো ব্যবহৃত হয়ে যে অপ্রধান খণ্ডবাক্য প্রধান খণ্ডবাক্যের ক্রিয়ার সঙ্গে কারক-সম্পর্ক স্থাপন করে, তাকে বিশেষ্যধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য বা বিশেষ্যস্থানীয় খণ্ডবাক্য বলা হয়।
উদাহরণ
‘সকাল থেকে এইভাবে মুষলধারে বৃষ্টি হবে, তা কিছুতেই ভাবতে পারিনি।’
এখানে—
প্রধান খণ্ডবাক্য : ‘তা কিছুতেই ভাবতে পারিনি।’
অপ্রধান খণ্ডবাক্য : ‘সকাল থেকে এইভাবে মুষলধারে বৃষ্টি হবে।’
এই অংশটি ‘তা’-র পরিবর্তে বিশেষ্যপদের মতো ব্যবহৃত হয়ে ‘ভাবতে পারিনি’ ক্রিয়ার কর্ম হিসেবে কাজ করছে।
অতএব এটি বিশেষ্যধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য।
আরও উদাহরণ
‘সে যে আসবে, তা আমি জানতাম।’
এখানে—
‘সে যে আসবে’ — বিশেষ্যধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য
‘তা আমি জানতাম’ — প্রধান খণ্ডবাক্য
১৬. বিশেষণখণ্ড / বিশেষণধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য
প্রধান খণ্ডবাক্যের অন্তর্ভুক্ত কোনো বিশেষ্য বা সর্বনামকে বিশেষিত করে যে অপ্রধান খণ্ডবাক্য, তাকে বিশেষণধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য বা বিশেষণখণ্ড বলে।
উদাহরণ
‘যে লোকটি সেই গান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছিল, সেই লোকটির বাড়ি বারাসাতে।’
এখানে—
প্রধান খণ্ডবাক্য : ‘সেই লোকটির বাড়ি বারাসাতে।’
অপ্রধান খণ্ডবাক্য : ‘যে লোকটি সেই গান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।’
অপ্রধান খণ্ডবাক্যটি ‘লোকটি’ বিশেষ্যকে বিশেষিত করেছে।
তাই এটি বিশেষণধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য।
আরও উদাহরণ
‘যে ছেলেটি গতকাল এসেছিল, সে আমার ভাই।’
‘যে ছেলেটি গতকাল এসেছিল’ — বিশেষণধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য।
১৭. ক্রিয়াবিশেষণখণ্ড / ক্রিয়াবিশেষণধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য
প্রধান খণ্ডবাক্যের ক্রিয়াকে সময়, স্থান, কারণ, শর্ত, উদ্দেশ্য, ফল, পদ্ধতি ইত্যাদি দিক থেকে বিশেষিত করে যে অপ্রধান খণ্ডবাক্য, তাকে ক্রিয়াবিশেষণধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য বা ক্রিয়াবিশেষণখণ্ড বলে।
উদাহরণ
‘যদি সকল কথা মন দিয়ে শুনিস, তবেই আমি বলব।’
এখানে—
প্রধান খণ্ডবাক্য : ‘তবেই আমি বলব।’
অপ্রধান খণ্ডবাক্য : ‘যদি সকল কথা মন দিয়ে শুনিস।’
এই অংশটি ‘বলব’ ক্রিয়ার শর্ত নির্দেশ করেছে।
অতএব এটি ক্রিয়াবিশেষণধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্য।
আরও উদাহরণ
‘যখন বৃষ্টি নামে, তখন ব্যাঙ ডাকে।’
‘যখন বৃষ্টি নামে’ — সময়বাচক ক্রিয়াবিশেষণধর্মী খণ্ডবাক্য।
‘যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছে, সেহেতু আমরা যাব না।’
‘যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছে’ — কারণবাচক ক্রিয়াবিশেষণধর্মী খণ্ডবাক্য।
১৮. ক্রিয়াখণ্ড : একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
এখানে প্রাথমিক পাঠের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন।
‘ক্রিয়াখণ্ড’কে বিশেষ্যখণ্ড, বিশেষণখণ্ড ও ক্রিয়াবিশেষণখণ্ডের সঙ্গে একই শ্রেণির ‘অপ্রধান খণ্ডবাক্য’ হিসেবে দেখানো ঠিক নয়।
আধুনিক বাক্যগঠন বিশ্লেষণে—
বিশেষ্যখণ্ড, ক্রিয়াবিশেষণখণ্ড এবং ক্রিয়াখণ্ড—বাক্যের গঠনগত অংশ বা constituent।
বিশেষ করে ক্রিয়াখণ্ড/ক্রিয়াদল-এর মূল কেন্দ্র হলো ক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শিক্ষাসামগ্রীতেও বিশেষ্যখণ্ড, ক্রিয়াবিশেষণখণ্ড ও ক্রিয়াখণ্ডকে বাক্যের বিভিন্ন গঠনগত উপাদান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
উদাহরণ
‘তাড়াতাড়ি এসো।’
এখানে—
- ‘তাড়াতাড়ি’ — ক্রিয়াবিশেষণখণ্ড
- ‘এসো’ — ক্রিয়াখণ্ড
আবার—
‘সে বই পড়তে বসেছে।’
এখানে ‘পড়তে বসেছে’ একটি সমন্বিত ক্রিয়াখণ্ড হিসেবে কাজ করতে পারে।
১৯. ক্রিয়াখণ্ডের মূল উপাদান
ক্রিয়াখণ্ডের কেন্দ্রে থাকে ক্রিয়া।
ক্রিয়াখণ্ডে থাকতে পারে—
- সমাপিকা ক্রিয়া
- অসমাপিকা ক্রিয়া
- সহায়ক ক্রিয়া
- ক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত অন্যান্য অংশ
উদাহরণ
‘সে পড়তে বসেছে।’
এখানে ‘পড়তে বসেছে’ সমগ্র ক্রিয়াখণ্ড।
‘সে গান গেয়ে চলে গেল।’
এখানে ‘গেয়ে চলে গেল’ একটি ক্রিয়াগত সমষ্টি।
২০. বাক্যের গঠনগত শ্রেণিবিভাগ
গঠন অনুসারে বাংলা বাক্যকে প্রধানত চার ভাগে আলোচনা করা যায়—
১. সরল বাক্য
২. জটিল বাক্য
৩. যৌগিক বাক্য
৪. মিশ্র বাক্য
তবে মনে রাখতে হবে, অনেক ব্যাকরণগ্রন্থে মূল শ্রেণিবিভাগ সরল, জটিল ও যৌগিক—এই তিন ভাগে করা হয়; ‘মিশ্র বাক্য’কে জটিল গঠনের বিস্তৃত রূপ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্যপুস্তকে মিশ্র বাক্যের স্বতন্ত্র ব্যবহারও রয়েছে।
২১. সরল বাক্য
যে বাক্যে একটি মাত্র স্বাধীন খণ্ডবাক্য থাকে এবং সাধারণত একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া থাকে, তাকে সরল বাক্য বলে।
উদাহরণ
‘বৃষ্টি পড়ছে।’
এখানে—
উদ্দেশ্য — বৃষ্টি
বিধেয় — পড়ছে
এটি সরল বাক্য।
আরও উদাহরণ
- পাখিরা আকাশে উড়ছে।
- ছেলেরা মাঠে খেলছে।
- আজ খুব শীত পড়েছে।
- রাহুল বই পড়ছে।
গুরুত্বপূর্ণ
সরল বাক্য মানেই অল্প শব্দের বাক্য নয়।
যেমন—
‘রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র রামচন্দ্র চোদ্দ বছরের জন্য বনবাসে গিয়েছিলেন।’
বাক্যটি দীর্ঘ হলেও এটি সরল বাক্য, কারণ এর মধ্যে একটি মাত্র স্বাধীন বাক্যগঠন রয়েছে।
আবার—
‘তিনি ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।’
এখানে ‘খেয়ে’ অসমাপিকা ক্রিয়া; ‘পড়লেন’ সমাপিকা ক্রিয়া। তাই বাক্যটি সরল।
২২. জটিল বাক্য
যে বাক্যে একটি প্রধান খণ্ডবাক্য এবং তার ওপর নির্ভরশীল এক বা একাধিক অপ্রধান খণ্ডবাক্য থাকে, তাকে জটিল বাক্য বলে।
উদাহরণ
‘যদি তুমি আস, তাহলে আমি যাব।’
এখানে—
অপ্রধান খণ্ডবাক্য : ‘যদি তুমি আস’
প্রধান খণ্ডবাক্য : ‘তাহলে আমি যাব।’
তাই এটি জটিল বাক্য।
জটিল বাক্যে ব্যবহৃত সাপেক্ষ শব্দজোড়
- যে—সে
- যিনি—তিনি
- যারা—তারা
- যা—তা
- যাকে—তাকে
- যেখানে—সেখানে
- যখন—তখন
- যদি—তবে/তাহলে
- যদিও—তবুও
- যেহেতু—সেহেতু
- যত—তত
- যেমন—তেমন
- যাতে—তাতে
উদাহরণ
‘যে পরিশ্রম করে, সে সফল হয়।’
‘যখন বৃষ্টি নামে, তখন ব্যাঙ ডাকে।’
‘যেখানে নদী, সেখানেই সবুজের সমারোহ।’
২৩. যৌগিক বাক্য
পরস্পর নিরপেক্ষ দুই বা ততোধিক স্বাধীন খণ্ডবাক্য কোনো যোজক বা সংযোজক দ্বারা যুক্ত হয়ে একটি পূর্ণ বাক্য গঠন করলে তাকে যৌগিক বা সংযুক্ত বাক্য বলে।
প্রধান যোজক
- এবং
- ও
- আর
- কিন্তু
- অথচ
- অথবা
- কিংবা
- নতুবা
- তাই
- সুতরাং
- ফলে
- অতএব
উদাহরণ
‘রাত্রি প্রভাত হলো এবং সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি পড়তে লাগল।’
এখানে—
১. রাত্রি প্রভাত হলো।
২. সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি পড়তে লাগল।
দুটি স্বাধীন খণ্ডবাক্য ‘এবং’ দ্বারা যুক্ত হয়েছে।
তাই এটি যৌগিক বাক্য।
আরও উদাহরণ
‘আমি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে আমাকে যেতে দিল না।’
‘তুমি এখনই যাও, নতুবা দেরি হয়ে যাবে।’
২৪. জটিল ও যৌগিক বাক্যের মূল পার্থক্য
| জটিল বাক্য | যৌগিক বাক্য |
|---|---|
| একটি প্রধান ও এক/একাধিক অপ্রধান খণ্ডবাক্য থাকে | দুই বা ততোধিক স্বাধীন খণ্ডবাক্য থাকে |
| খণ্ডবাক্যের মধ্যে নির্ভরতার সম্পর্ক থাকে | খণ্ডবাক্যগুলি পরস্পর নিরপেক্ষ |
| সাপেক্ষ শব্দজোড় প্রচলিত | যোজক/সংযোজক প্রচলিত |
| যে—সে, যদি—তবে, যখন—তখন ইত্যাদি | এবং, কিন্তু, অথবা, অথচ, তাই ইত্যাদি |
মনে রাখার সূত্র
জটিলে নির্ভরতা, যৌগিকে স্বাধীনতা।
২৫. মিশ্র বাক্য
দুই বা ততোধিক ভিন্ন গঠনধর্মী বাক্য—বিশেষত সরল, জটিল ও যৌগিক গঠনের উপাদান—একটি বৃহত্তর বাক্যকাঠামোর মধ্যে মিলিত হলে তাকে মিশ্র বাক্য বলা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্যপুস্তকেও সরল ও জটিল বাক্যের সমন্বয়ে বৃহত্তর মিশ্র বাক্যের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
উদাহরণ
‘আয়ুষী রোজ নাচ শিখতে যায় এবং দিদিমনি যা শেখান, বাড়ি এসে তাই অনুশীলন করে, কিন্তু তাই বলে পড়ায় ফাঁকি দেয় না।’
এখানে সরল ও জটিল—উভয় ধরনের গঠন পাশাপাশি রয়েছে।
তাই এটি মিশ্র বাক্যের উদাহরণ।
আরও একটি উদাহরণ
‘সে যে ভালো গান গায়, তা আমি জানতাম; কিন্তু সে ভালো ছবি আঁকে—সে কথা জানতাম না।’
এখানে প্রথম অংশে জটিল গঠন এবং ‘কিন্তু’-র মাধ্যমে বৃহত্তর যৌগিক সম্পর্ক রয়েছে।
২৬. সরল, জটিল, যৌগিক ও মিশ্র : এক নজরে
সরল
একটি স্বাধীন গঠন।
জটিল
প্রধান + অপ্রধান।
যৌগিক
স্বাধীন + স্বাধীন।
মিশ্র
বিভিন্ন গঠনরীতির সমন্বিত বৃহত্তর কাঠামো।
২৭. অর্থ অনুসারে বাক্যের শ্রেণিবিভাগ
অর্থ বা বক্তার মনোভাব অনুসারে বাক্য প্রধানত সাত প্রকার—
১. নির্দেশক বা বিবৃতিমূলক বাক্য
২. প্রশ্নসূচক বাক্য
৩. ইচ্ছাসূচক বা প্রার্থনাসূচক বাক্য
৪. অনুজ্ঞাসূচক বাক্য
৫. বিস্ময়সূচক বা আবেগসূচক বাক্য
৬. সন্দেহসূচক বাক্য
৭. শর্তসাপেক্ষ বা কার্যকারণাত্মক বাক্য
২৮. নির্দেশক বা বিবৃতিমূলক বাক্য
যে বাক্যে কোনো ঘটনা, ভাব, অবস্থা বা তথ্য সম্পর্কে সাধারণ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়, তাকে নির্দেশক বা বিবৃতিমূলক বাক্য বলে।
এটি প্রধানত দুই প্রকার—
ক) অস্তিবাচক / সদর্থক / ইতিবাচক / হ্যাঁ-বাচক
যে বাক্যে কোনো বক্তব্যকে স্বীকার বা ইতিবাচকভাবে প্রকাশ করা হয়, তাকে অস্তিবাচক বা সদর্থক বাক্য বলে।
উদাহরণ
‘শিক্ষক ছাত্রকে সঠিক পথের দিশা দেখান।’
খ) নঞর্থক / নাস্ত্যর্থক / নেতিবাচক / না-বাচক
যে বাক্যে কোনো বক্তব্যকে অস্বীকার বা নেতিবাচকভাবে প্রকাশ করা হয়, তাকে নঞর্থক বা নাস্ত্যর্থক বাক্য বলে।
উদাহরণ
‘শিক্ষক ছাত্রকে ভুল পথ দেখান না।’
মনে রাখবে
‘অস্তিবাচক’ ও ‘নঞর্থক’ বাক্যকে নির্দেশক বাক্যের দুই অর্থগত রূপ হিসেবে দেখা যায়।
২৯. প্রশ্নসূচক বাক্য
যে বাক্যে বক্তার কোনো বিষয় সম্পর্কে জানা, বোঝা বা নিশ্চিত হওয়ার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করার মনোভাব প্রকাশ পায়, তাকে প্রশ্নসূচক বাক্য বলে।
সাধারণত বাক্যের শেষে প্রশ্নচিহ্ন (?) ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ
‘কোথায় আমার যুগান্তরের খড়্গপাণি?’
‘তুমি কি আজ যাবে?’
‘তুমি কি যাবে না?’
প্রশ্নসূচক বাক্য ইতিবাচক বা নেতিবাচক—দুই রূপেই হতে পারে।
৩০. ইচ্ছাসূচক বা প্রার্থনাসূচক বাক্য
যে বাক্যে বক্তার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, প্রার্থনা, আশীর্বাদ বা কামনা প্রকাশ পায়, তাকে ইচ্ছাসূচক বা প্রার্থনাসূচক বাক্য বলে।
উদাহরণ
‘তোমারই হোক জয়।’
‘তোমার জীবন সুখে ভরে উঠুক।’
‘ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।’
৩১. অনুজ্ঞাসূচক বাক্য
যে বাক্যে আদেশ, উপদেশ, অনুরোধ, উপরোধ, নিষেধ, নির্দেশ বা অনুমতি প্রকাশ পায়, তাকে অনুজ্ঞাসূচক বাক্য বলে।
উদাহরণ
‘পড়াশোনায় বেশি করে মন দাও।’ — উপদেশ
‘দয়া করে দরজাটি বন্ধ করো।’ — অনুরোধ
‘এখানে এসো।’ — আদেশ
‘এখানে যেও না।’ — নিষেধ
অনুজ্ঞাসূচক বাক্যের কালভেদ
ক) বর্তমান অনুজ্ঞা
বর্তমান বা তাৎক্ষণিক আদেশ, উপদেশ, অনুরোধ, উপরোধ বা নিষেধ বোঝায়।
উদাহরণ :
‘পড়াশোনায় বেশি করে মন দাও।’
খ) ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা
ভবিষ্যৎ সময়ের জন্য আদেশ, উপদেশ, নির্দেশ বা নিয়ম বোঝায়।
উদাহরণ :
‘সবসময় সত্যি কথা বলবে।’
৩২. বিস্ময়সূচক বা আবেগসূচক বাক্য
যে বাক্যে বক্তার বিস্ময়, আনন্দ, দুঃখ, ভয়, ঘৃণা, বিরক্তি, ক্রোধ, প্রশংসা, বেদনা ইত্যাদি আবেগ প্রকাশ পায়, তাকে বিস্ময়সূচক বা আবেগসূচক বাক্য বলে।
উদাহরণ
‘আহা! কী সুন্দর দৃশ্য!’
‘হায়! সব শেষ হয়ে গেল!’
‘বাহ! কী চমৎকার খেললে!’
প্রদত্ত উদাহরণের সংশোধিত রূপ
মূল পাঠে ছিল—
‘আহা, কী দেখলাম, কোনোদিন ভুলবো না!’
শুদ্ধ ও স্বাভাবিক যতিচিহ্নে—
‘আহা! কী দেখলাম! কোনোদিন ভুলব না!’
৩৩. সন্দেহসূচক বাক্য
যে বাক্যে কোনো ঘটনা বা বক্তব্যের সত্যতা, সম্ভাবনা বা সংঘটন সম্পর্কে সন্দেহ, সংশয় বা অনিশ্চয়তা প্রকাশ পায়, তাকে সন্দেহসূচক বা সংশয়সূচক বাক্য বলে।
উপযুক্ত উদাহরণ
‘হয়তো সে আজ আসবে।’
‘সম্ভবত আগামীকাল বৃষ্টি হবে।’
‘বোধ হয় সে কথাটি ভুলে গেছে।’
‘মনে হয়, আজ সে আসবে না।’
গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন
মূল লেখায়—
‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’
—কে সন্দেহসূচক বাক্যের উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।
এটি সন্দেহসূচক বাক্যের আদর্শ উদাহরণ নয়। এটি মূলত কাব্যিক উপমাধর্মী উক্তি। তাই পরীক্ষামূলক ও ব্যাকরণগত নির্ভুলতার জন্য উপরের ‘হয়তো’, ‘সম্ভবত’, ‘বোধ হয়’, ‘মনে হয়’-যুক্ত উদাহরণ ব্যবহার করা শ্রেয়।
৩৪. শর্তসাপেক্ষ বাক্য
যে বাক্যে একটি কাজ বা ঘটনার সংঘটন অন্য একটি কাজ বা ঘটনার ওপর শর্ত হিসেবে নির্ভরশীল, তাকে শর্তসাপেক্ষ বাক্য বলে।
একে অনেক সময় কার্যকারণাত্মক বা শর্তনির্ভর বাক্যও বলা হয়।
উদাহরণ
‘তুমি নিষেধ করলে আমি গান গাইব না।’
এখানে—
‘তুমি নিষেধ করলে’ — শর্ত
‘আমি গান গাইব না’ — শর্তাধীন ফল
আরও উদাহরণ—
‘যদি বৃষ্টি হয়, তবে আমরা যাব না।’
‘তুমি মন দিয়ে পড়লে পরীক্ষায় ভালো ফল করবে।’
গুরুত্বপূর্ণ
সব কার্যকারণাত্মক বাক্য সরাসরি শর্তসাপেক্ষ নয়। কারণ-ফল সম্পর্ক এবং শর্ত-ফল সম্পর্ক এক নয়। তাই পরীক্ষায় ‘যদি—তবে’, ‘যদি—তাহলে’, ‘… করলে…’ ইত্যাদি শর্তসূচক গঠন ব্যবহার করাই নিরাপদ।
৩৫. বাক্যের গুণ
একটি বাক্য শুধু ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ হলেই উৎকৃষ্ট বাক্য হয় না। তার প্রকাশভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি উন্নত বাক্যের প্রধান গুণ—
১. সার্থকতা
২. স্পষ্টতা
৩. অর্থের যথার্থতা
৪. সুসংগতি
৫. স্বাভাবিকতা
৬. সাবলীলতা
৭. সংক্ষিপ্ততা
৮. প্রাসঙ্গিকতা
৯. শ্রুতিমাধুর্য
মূল সূত্র
সঠিক ভাব + সঠিক শব্দ + সঠিক সম্পর্ক + সুশৃঙ্খল বিন্যাস = উৎকৃষ্ট বাক্য।
৩৬. বাক্যদোষ
বাক্যের আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি, যোগ্যতা, অর্থ, অন্বয় বা ব্যাকরণগত গঠন নষ্ট হলে বাক্যদোষ সৃষ্টি হয়।
প্রধান দোষগুলি—
১. আকাঙ্ক্ষাদোষ
প্রয়োজনীয় পদ না থাকলে।
‘আমি কলম দিয়ে…’
২. আসত্তিদোষ
পদগুলির স্বাভাবিক ও অর্থবহ বিন্যাস নষ্ট হলে।
৩. যোগ্যতাদোষ
পদগুলির অর্থগত সামঞ্জস্য না থাকলে।
‘গরু আকাশে ওড়ে।’
৪. পুনরুক্তিদোষ
একই অর্থ অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার প্রকাশ করলে।
‘সে নিজে স্বয়ং নিজের হাতে কাজটি করেছে।’
উন্নত—
‘সে নিজেই কাজটি করেছে।’
৫. অস্পষ্টতাদোষ
বাক্যের অর্থ সহজে বোঝা না গেলে।
৬. অন্বয়দোষ
বাক্যের বিভিন্ন পদের মধ্যে যথাযথ ব্যাকরণগত সম্পর্ক না থাকলে।
৩৭. বাক্যের পদক্রম ও আসত্তি
বাংলা ভাষায় সাধারণত—
কর্তা + কর্ম/অন্যান্য পদ + ক্রিয়া
এই ধরনের বিন্যাস দেখা যায়।
উদাহরণ
‘রাহুল বই পড়ে।’
তবে বাংলা পদক্রম সম্পূর্ণ যান্ত্রিক নয়।
যেমন—
‘আজ আমি যাব না।’
এবং—
‘আমি আজ যাব না।’
উভয়ই শুদ্ধ।
সাহিত্যিক ভাষায় পদক্রম আরও স্বাধীন হতে পারে।
তাই—
আসত্তি মানে শুধু নির্দিষ্ট ক্রম নয়; সম্পর্কযুক্ত পদের উপযুক্ত বিন্যাস।
৩৮. বাক্য ও খণ্ডবাক্যের পার্থক্য
| বাক্য | খণ্ডবাক্য |
|---|---|
| সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ করতে পারে | বৃহত্তর বাক্যের অংশ |
| স্বাধীন হতে পারে | স্বাধীন বা অধীন হতে পারে |
| একটি বা একাধিক খণ্ডবাক্য নিয়ে গঠিত হতে পারে | বাক্যের অভ্যন্তরীণ অংশ |
| ‘আমি বাড়ি যাব।’ | ‘যদি তুমি আস’ |
৩৯. বাক্য বিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
পরীক্ষায় কোনো বাক্য বিশ্লেষণ করতে হলে নিচের ধাপগুলি অনুসরণ করলে ভুলের সম্ভাবনা কমে যায়।
ধাপ ১
বাক্যটির সম্পূর্ণ অর্থ বোঝো।
ধাপ ২
উদ্দেশ্য ও বিধেয় চিহ্নিত করো।
ধাপ ৩
সমাপিকা ক্রিয়া চিহ্নিত করো।
ধাপ ৪
একাধিক খণ্ডবাক্য আছে কি না দেখো।
ধাপ ৫
থাকলে প্রধান ও অপ্রধান খণ্ডবাক্য আলাদা করো।
ধাপ ৬
অপ্রধান খণ্ডবাক্যের প্রকৃতি নির্ণয় করো—
- বিশেষ্যধর্মী
- বিশেষণধর্মী
- ক্রিয়াবিশেষণধর্মী
ধাপ ৭
বাক্যের গঠন নির্ণয় করো—
- সরল
- জটিল
- যৌগিক
- মিশ্র
ধাপ ৮
বাক্যের অর্থগত প্রকৃতি নির্ণয় করো—
- নির্দেশক
- প্রশ্নসূচক
- ইচ্ছাসূচক
- অনুজ্ঞাসূচক
- বিস্ময়সূচক
- সন্দেহসূচক
- শর্তসাপেক্ষ
৪০. উদাহরণসহ সম্পূর্ণ বাক্য বিশ্লেষণ
উদাহরণ ১
‘যে পরিশ্রম করে, সে সফল হয়।’
- প্রধান খণ্ডবাক্য — ‘সে সফল হয়’
- অপ্রধান খণ্ডবাক্য — ‘যে পরিশ্রম করে’
- অপ্রধান খণ্ডবাক্যের প্রকৃতি — বিশেষণধর্মী
- গঠন — জটিল বাক্য
- অর্থ — নির্দেশক বাক্য
উদাহরণ ২
‘রাত্রি প্রভাত হলো এবং সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি পড়তে লাগল।’
- প্রথম স্বাধীন খণ্ড — ‘রাত্রি প্রভাত হলো’
- দ্বিতীয় স্বাধীন খণ্ড — ‘সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি পড়তে লাগল’
- যোজক — ‘এবং’
- গঠন — যৌগিক বাক্য
- অর্থ — নির্দেশক বাক্য
উদাহরণ ৩
‘যদি তুমি মন দিয়ে পড়ো, তবে তুমি পরীক্ষায় ভালো ফল করবে।’
- অপ্রধান খণ্ডবাক্য — ‘যদি তুমি মন দিয়ে পড়ো’
- প্রধান খণ্ডবাক্য — ‘তবে তুমি পরীক্ষায় ভালো ফল করবে’
- অপ্রধান খণ্ডবাক্যের প্রকৃতি — ক্রিয়াবিশেষণধর্মী
- গঠন — জটিল বাক্য
- অর্থ — শর্তসাপেক্ষ বাক্য
৪১. বাক্য রূপান্তর
একটি বাক্যের মূল ভাব অপরিবর্তিত রেখে তার গঠন বা প্রকাশরীতি পরিবর্তন করাকে বাক্য রূপান্তর বলে।
গঠন অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর—
১. সরল → জটিল
২. জটিল → সরল
৩. সরল → যৌগিক
৪. যৌগিক → সরল
৫. জটিল → যৌগিক
৬. যৌগিক → জটিল
অর্থ অনুসারে—
৭. অস্তিবাচক → নঞর্থক
৮. নঞর্থক → অস্তিবাচক
৯. প্রশ্নসূচক → নির্দেশক
১০. নির্দেশক → প্রশ্নসূচক
১১. অনুজ্ঞাসূচক → নির্দেশক
১২. বিস্ময়সূচক → নির্দেশক
৪২. সরল → জটিল
সরল
‘পরিশ্রমী মানুষ সফল হয়।’
জটিল
‘যে মানুষ পরিশ্রমী, সে সফল হয়।’
এখানে ‘পরিশ্রমী মানুষ’ অংশটি বিশেষণধর্মী অপ্রধান খণ্ডবাক্যে রূপান্তরিত হয়েছে।
৪৩. জটিল → সরল
জটিল
‘যে মানুষ পরিশ্রমী, সে সফল হয়।’
সরল
‘পরিশ্রমী মানুষ সফল হয়।’
৪৪. সরল → যৌগিক
সরল
‘পরিশ্রম করে সে সফল হয়েছে।’
যৌগিক
‘সে পরিশ্রম করেছে এবং সফল হয়েছে।’
৪৫. যৌগিক → সরল
যৌগিক
‘সে এখানে এল এবং সব কথা খুলে বলল।’
সরল
‘সে এখানে এসে সব কথা খুলে বলল।’
৪৬. জটিল → যৌগিক
জটিল
‘যেহেতু তুমি দোষ করেছ, সেহেতু শাস্তি পাবে।’
যৌগিক
‘তুমি দোষ করেছ, তাই শাস্তি পাবে।’
৪৭. যৌগিক → জটিল
যৌগিক
‘তুমি দোষ করেছ, তাই শাস্তি পাবে।’
জটিল
‘যেহেতু তুমি দোষ করেছ, সেহেতু শাস্তি পাবে।’
৪৮. বাক্য সংক্ষেপণ
বহু পদ বা দীর্ঘ বাক্যাংশকে অল্প কথায় প্রকাশ করাকে বাক্য সংক্ষেপণ বলে।
উদাহরণ
‘যে ব্যক্তি দেশকে ভালোবাসে’ → দেশপ্রেমিক
‘যিনি অন্যের উপকার করেন’ → পরোপকারী
‘যে কথা বলা উচিত নয়’ → অকথ্য
বাক্য সংক্ষেপণের ফলে ভাষা হয়—
- সংক্ষিপ্ত
- অর্থঘন
- শক্তিশালী
- সাবলীল
৪৯. বাক্য সম্প্রসারণ
একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য বা ভাবকে ব্যাখ্যা, উদাহরণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিস্তৃত করাকে বাক্য সম্প্রসারণ বলে।
উদাহরণ
‘সময় অমূল্য।’
সম্প্রসারণ—
সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। অর্থ বা বস্তু হারালে অনেক সময় তা পুনরুদ্ধার করা যায়; কিন্তু একবার অতীত হয়ে যাওয়া সময় আর ফিরে আসে না। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে যথাযথ কাজে ব্যবহার করা উচিত।
৫০. বাক্যশুদ্ধি
বাক্যকে ব্যাকরণ, অর্থ, অন্বয়, প্রয়োগ ও রীতির দিক থেকে শুদ্ধ ও স্বাভাবিক করাকে বাক্যশুদ্ধি বলা যায়।
অশুদ্ধ
‘সে আমার থেকে বড়।’
প্রমিত
‘সে আমার চেয়ে বড়।’
অপ্রয়োজনীয় পুনরুক্তি
‘সে নিজে স্বয়ং নিজের হাতে কাজটি করেছে।’
উন্নত
‘সে নিজেই কাজটি করেছে।’
মনে রাখবে
বাক্যশুদ্ধির ক্ষেত্রে শুধু মুখস্থ নিয়ম নয়; প্রচলিত প্রমিত ব্যবহার, প্রসঙ্গ ও অর্থ বিচার করতে হবে।
৫১. বাক্যের রীতি ও সৌন্দর্য
বাক্য কেবল ব্যাকরণের কাঠামো নয়; এটি চিন্তার বাহন।
একটি শক্তিশালী বাক্যে থাকে—
স্বচ্ছ চিন্তা + যথাযথ শব্দ + সুশৃঙ্খল বিন্যাস + সংযত প্রকাশ।
অতিশয় দীর্ঘ বাক্য পাঠকের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে; আবার অতিরিক্ত খণ্ডিত বাক্য ভাবের প্রবাহ নষ্ট করতে পারে।
সাহিত্যিক বাক্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—
- শব্দের নির্বাচন
- ধ্বনি
- ছন্দ
- বিরাম
- পদক্রম
- অনুষঙ্গ
- রূপক
- বাচনভঙ্গি
তাই—
ব্যাকরণগত শুদ্ধতা বাক্যের ভিত্তি; আর ভাষাশৈলী তার সৌন্দর্য।
৫২. বাক্যের সঙ্গে ভাবের সম্পর্ক
একটি বাক্যের প্রকৃত শক্তি শুধু তার শব্দসংখ্যায় নয়, ভাবের সংগঠনে।
একটি ক্ষুদ্র বাক্যও গভীর অর্থ বহন করতে পারে—
‘মানুষ মরণশীল।’
আবার একটি দীর্ঘ বাক্যও দুর্বল হতে পারে যদি তার মধ্যে ভাবের সংগতি না থাকে।
সুতরাং বাক্য নির্মাণে—
শব্দের চেয়ে শব্দের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ; দৈর্ঘ্যের চেয়ে ভাবের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ।
৫৩. বাক্য নির্মাণের সর্বোত্তম সূত্র
একটি উৎকৃষ্ট বাক্য নির্মাণের সময় পাঁচটি প্রশ্ন মনে রাখা যায়—
১. কী বলতে চাই?
→ ভাব
২. কার সম্পর্কে বলতে চাই?
→ উদ্দেশ্য
৩. কী বলতে চাই তার সম্পর্কে?
→ বিধেয়
৪. কোন পদ কোন পদের সঙ্গে যুক্ত?
→ আসত্তি
৫. ব্যবহৃত পদগুলির অর্থগত মিল আছে কি?
→ যোগ্যতা
আর যদি বক্তব্য অসম্পূর্ণ হয়—
→ আকাঙ্ক্ষা পরীক্ষা করো।
৫৪. পরীক্ষার্থীর জন্য ‘বাক্য’ অধ্যায়ের মহাসূত্র
বাক্যের সংজ্ঞা
সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশকারী সুশৃঙ্খল পদসমষ্টি = বাক্য।
বাক্যগঠনের তিন শর্ত
আকাঙ্ক্ষা + আসত্তি + যোগ্যতা
বাক্যের প্রধান অঙ্গ
উদ্দেশ্য + বিধেয়
অপ্রধান খণ্ডবাক্য
বিশেষ্যধর্মী + বিশেষণধর্মী + ক্রিয়াবিশেষণধর্মী
গঠন অনুসারে
সরল + জটিল + যৌগিক + মিশ্র
অর্থ অনুসারে
নির্দেশক + প্রশ্নসূচক + ইচ্ছাসূচক + অনুজ্ঞাসূচক + বিস্ময়সূচক + সন্দেহসূচক + শর্তসাপেক্ষ
৫৫. এক নজরে সম্পূর্ণ অধ্যায়
| বিষয় | সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা |
|---|---|
| বাক্য | সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশকারী সুশৃঙ্খল পদসমষ্টি |
| আকাঙ্ক্ষা | পূর্ণ অর্থের জন্য পরবর্তী পদের প্রত্যাশা |
| আসত্তি | পদের সুশৃঙ্খল বিন্যাস ও পারস্পরিক নৈকট্য |
| যোগ্যতা | পদগুলির অর্থগত ও ভাবগত সামঞ্জস্য |
| উদ্দেশ্য | যার সম্পর্কে কিছু বলা হয় |
| বিধেয় | উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বলা হয় |
| উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক | উদ্দেশ্যকে বিস্তৃত করে |
| বিধেয়ের সম্প্রসারক | বিধেয়কে বিস্তৃত করে |
| খণ্ডবাক্য | বৃহত্তর বাক্যের অন্তর্গত বাক্যসদৃশ অংশ |
| প্রধান খণ্ডবাক্য | স্বাধীন ও মূল বক্তব্যবাহী অংশ |
| অপ্রধান খণ্ডবাক্য | প্রধানের ওপর নির্ভরশীল অংশ |
| বিশেষ্যধর্মী খণ্ডবাক্য | বিশেষ্যের কাজ করে |
| বিশেষণধর্মী খণ্ডবাক্য | বিশেষ্য/সর্বনামকে বিশেষিত করে |
| ক্রিয়াবিশেষণধর্মী খণ্ডবাক্য | ক্রিয়াকে বিশেষিত করে |
| বিশেষ্যখণ্ড | বিশেষ্যকেন্দ্রিক গঠনগত অংশ |
| ক্রিয়াবিশেষণখণ্ড | ক্রিয়াবিশেষণকেন্দ্রিক অংশ |
| ক্রিয়াখণ্ড | ক্রিয়াকেন্দ্রিক গঠনগত অংশ |
| সরল বাক্য | একটি স্বাধীন বাক্যগঠন |
| জটিল বাক্য | প্রধান + অপ্রধান খণ্ডবাক্য |
| যৌগিক বাক্য | একাধিক স্বাধীন খণ্ডবাক্যের সমন্বয় |
| মিশ্র বাক্য | বিভিন্ন গঠনরীতির সমন্বয় |
| নির্দেশক | বিবৃতি প্রকাশ করে |
| প্রশ্নসূচক | প্রশ্ন প্রকাশ করে |
| ইচ্ছাসূচক | ইচ্ছা/কামনা/প্রার্থনা প্রকাশ করে |
| অনুজ্ঞাসূচক | আদেশ/উপদেশ/অনুরোধ/নিষেধ প্রকাশ করে |
| বিস্ময়সূচক | আবেগ প্রকাশ করে |
| সন্দেহসূচক | সংশয় প্রকাশ করে |
| শর্তসাপেক্ষ | শর্তনির্ভর সম্পর্ক প্রকাশ করে |
৫৬. বিশেষভাবে মনে রাখবে : গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন
আসক্তি
আসত্তি
উদ্দেশ্য = সব সময় কর্তা
উদ্দেশ্য = যার সম্পর্কে কিছু বলা হয়
সরল বাক্য = একটি মাত্র উদ্দেশ্য ও একটি মাত্র বিধেয়—এই একমাত্র শর্ত
সরল বাক্য = একটি স্বাধীন বাক্যগঠন; সাধারণত একটি সমাপিকা ক্রিয়া থাকে
জটিল বাক্য = জটিল বা মিশ্র বাক্য—দুটি একই জিনিস
জটিল ও মিশ্র বাক্যের গঠনগত পার্থক্য আছে; পাঠ্যক্রমভেদে পরিভাষার ব্যবহারও আলাদা
বিশেষ্যখণ্ড + ক্রিয়াবিশেষণখণ্ড + ক্রিয়াখণ্ড = অপ্রধান খণ্ডবাক্যের তিন শ্রেণি
বিশেষ্যধর্মী + বিশেষণধর্মী + ক্রিয়াবিশেষণধর্মী = অপ্রধান খণ্ডবাক্যের প্রধান শ্রেণি
অন্যদিকে—
বিশেষ্যখণ্ড + ক্রিয়াবিশেষণখণ্ড + ক্রিয়াখণ্ড
হলো আধুনিক বাক্যগঠন বিশ্লেষণের গঠনগত উপাদান।
‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ = সন্দেহসূচক বাক্যের আদর্শ উদাহরণ
‘হয়তো সে আজ আসবে’ = সন্দেহসূচক বাক্যের আদর্শ উদাহরণ
৫৭. মনে রাখার মতো চূড়ান্ত কথা
বাক্য শুধু কয়েকটি শব্দের সমষ্টি নয়; সম্পর্কযুক্ত শব্দের একটি সুসংবদ্ধ সংগঠন।
আকাঙ্ক্ষা বাক্যকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়; আসত্তি পদের সম্পর্ককে শৃঙ্খলিত করে; যোগ্যতা সেই সম্পর্ককে অর্থবহ করে তোলে।
উদ্দেশ্য বলে—কার বা কিসের কথা; বিধেয় বলে—তার সম্পর্কে কী বলা হচ্ছে।
জটিল বাক্যে নির্ভরতা, যৌগিক বাক্যে স্বাধীনতা; আর মিশ্র বাক্যে বিভিন্ন গঠনরীতির সমন্বয়।
ব্যাকরণ বাক্যের শরীরকে শুদ্ধ করে; ভাব তাকে প্রাণ দেয়; আর ভাষাশৈলী তাকে সৌন্দর্য দেয়।
৫৮. পরীক্ষায় বাক্য বিশ্লেষণের চূড়ান্ত ছক
যে কোনো বাক্য বিশ্লেষণের সময় এই ক্রমটি অনুসরণ করো—
বাক্য → উদ্দেশ্য → বিধেয় → সমাপিকা ক্রিয়া → খণ্ডবাক্য → প্রধান/অপ্রধান → অপ্রধানের প্রকৃতি → গঠন → অর্থ
অর্থাৎ—
‘কার কথা?’ → ‘কী বলা হয়েছে?’ → ‘কয়টি ক্রিয়া?’ → ‘কয়টি খণ্ড?’ → ‘কে কার ওপর নির্ভরশীল?’ → ‘কী ধরনের বাক্য?’
এই পদ্ধতিতে বাক্য অধ্যায়ের প্রায় সমস্ত প্রশ্নই যুক্তি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব।
শেষ স্মরণসূত্র
আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা আনে,
আসত্তি শৃঙ্খলা আনে,
যোগ্যতা অর্থের সঙ্গতি আনে;
উদ্দেশ্য বিষয়কে সামনে আনে,
বিধেয় সেই বিষয়ের বিধান করে;
আর গঠন ও অর্থ—বাক্যের পূর্ণ পরিচয় নির্মাণ করে।

