স্বর্ণপর্ণী

— সত্যজিৎ রায়

১ নম্বরের SAQ ও MCQ প্রশ্নোত্তর


ক. সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (SAQ)

প্রতিটি প্রশ্নের মান – ১

প্রশ্ন ১। ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পের কথক কে?
উত্তর : ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পের কথক হলেন প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু।

প্রশ্ন ২। প্রোফেসর শঙ্কু পেশাগতভাবে কী ছিলেন?
উত্তর : প্রোফেসর শঙ্কু পেশাগতভাবে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন।

প্রশ্ন ৩। শঙ্কু কোন কলেজে অধ্যাপনা করতেন?
উত্তর : শঙ্কু কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে অধ্যাপনা করতেন।

প্রশ্ন ৪। শঙ্কুর বাবার নাম কী?
উত্তর : শঙ্কুর বাবার নাম ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু।

প্রশ্ন ৫। ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু কোন্‌ চিকিৎসাপদ্ধতিতে পারদর্শী ছিলেন?
উত্তর : ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় পারদর্শী ছিলেন।

প্রশ্ন ৬। টিক্‌ড়ীবাবা কোথায় সাধনা করতেন?
উত্তর : উশ্রী নদীর ওপারের একটি গ্রামে টিক্‌ড়ীবাবা সাধনা করতেন।

প্রশ্ন ৭। টিক্‌ড়ীবাবা কোন্‌ রোগে ভুগছিলেন?
উত্তর : টিক্‌ড়ীবাবা শ্বাসকষ্টের রোগে ভুগছিলেন।

প্রশ্ন ৮। ‘স্বর্ণপর্ণী’-র অপর নাম কী?
উত্তর : ‘স্বর্ণপর্ণী’-র অপর নাম ‘সোনেপত্তী’।

প্রশ্ন ৯। স্বর্ণপর্ণীর উল্লেখ কোন্‌ প্রাচীন চিকিৎসাগ্রন্থে আছে?
উত্তর : স্বর্ণপর্ণীর উল্লেখ ‘চরকসংহিতা’-য় আছে।

প্রশ্ন ১০। কসৌলি কোথা থেকে প্রায় কত দূরে অবস্থিত?
উত্তর : কালকা থেকে কসৌলি প্রায় ছেচল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

প্রশ্ন ১১। কসৌলিতে শঙ্কুর প্রধান সহায়ক কে হয়েছিল?
উত্তর : কসৌলিতে শঙ্কুর প্রধান সহায়ক হয়েছিল ঘোড়ার মালিক ছোটেলাল।

প্রশ্ন ১২। স্বর্ণপর্ণী গাছটি কোথায় পাওয়া গিয়েছিল?
উত্তর : চামুণ্ডার মন্দিরের পিছনের জঙ্গলে একটি ঝরনার পাশে স্বর্ণপর্ণী গাছটি পাওয়া গিয়েছিল।

প্রশ্ন ১৩। স্বর্ণপর্ণী গাছটি দেখতে কেমন ছিল?
উত্তর : গাছটি প্রায় কোমর-উঁচু এবং হলদে পাতায় ভরা ছিল।

প্রশ্ন ১৪। জয়গোপাল মিত্রের কী রোগ হয়েছিল?
উত্তর : জয়গোপাল মিত্র অ্যাসাইটিস বা উদরী রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

প্রশ্ন ১৫। স্বর্ণপর্ণীর পাতা প্রথমে কীভাবে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল?
উত্তর : স্বর্ণপর্ণীর পাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো হয়েছিল।

প্রশ্ন ১৬। মিরাকিউরল নামটির অর্থ কী?
উত্তর : ‘মিরাকিউরল’ নামটির অর্থ—সর্বরোগনাশক বা ‘মিরাকল কিওর ফর অল কমপ্লেন্টস্‌’।

প্রশ্ন ১৭। জেরেমি সন্ডার্সের পেশা কী ছিল?
উত্তর : জেরেমি সন্ডার্স ছিলেন একজন জীবতত্ত্ববিদ।

প্রশ্ন ১৮। জেরেমি সন্ডার্স কোন্‌ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন?
উত্তর : জেরেমি সন্ডার্স যকৃতের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

প্রশ্ন ১৯। হাইনরিখ স্টাইনার কোন্‌ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন?
উত্তর : হাইনরিখ স্টাইনার বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন।

প্রশ্ন ২০। হাইনরিখ স্টাইনার কোন্‌ বিষয়ের অধ্যাপক ছিলেন?
উত্তর : হাইনরিখ স্টাইনার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন।

প্রশ্ন ২১। নরবার্ট স্টাইনারের সঙ্গে হাইনরিখ স্টাইনারের সম্পর্ক কী?
উত্তর : নরবার্ট স্টাইনার ছিলেন হাইনরিখ স্টাইনারের পুত্র।

প্রশ্ন ২২। হাইনরিখ স্টাইনার কেন নাৎসিদের অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন?
উত্তর : তিনি ইহুদি হওয়া এবং ‘হাইল হিটলার’ বলতে অস্বীকার করার কারণে নাৎসিদের অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন।

প্রশ্ন ২৩। ‘কারিনহল’ কী?
উত্তর : ‘কারিনহল’ ছিল নাৎসি নেতা হের্ গোয়রিং-এর বিশাল প্রাসাদ।

প্রশ্ন ২৪। গোয়রিং-এর সঙ্গে শঙ্কুর দেখা কোথায় হয়েছিল?
উত্তর : গোয়রিং-এর প্রাসাদ কারিনহলেই শঙ্কুর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল।

প্রশ্ন ২৫। সন্ডার্স মিরাকিউরলের শিশিতে কী বদলে রেখেছিলেন?
উত্তর : সন্ডার্স মিরাকিউরলের শিশিতে আসল বড়ির পরিবর্তে ঘুমের ওষুধ রেখেছিলেন।


খ. বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)

প্রতিটি প্রশ্নের মান – ১

প্রশ্ন ১। সত্যজিৎ রায়ের ‘স্বর্ণপর্ণী’ কোন্‌ ধরনের কাহিনি?
(ক) ঐতিহাসিক
(খ) কল্পবিজ্ঞাননির্ভর
(গ) সামাজিক
(ঘ) রোমান্টিক
উত্তর : (খ) কল্পবিজ্ঞাননির্ভর


প্রশ্ন ২। শঙ্কু পূজার ছুটিতে সাধারণত কোথায় যেতেন?
(ক) দার্জিলিং
(খ) গিরিডি
(গ) কসৌলি
(ঘ) শিলং
উত্তর : (খ) গিরিডি


প্রশ্ন ৩। ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু তাঁর জীবনে কাদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করতেন?
(ক) ধনী ব্যক্তিদের
(খ) বিদেশিদের
(গ) দরিদ্র মানুষদের
(ঘ) সরকারি কর্মচারীদের
উত্তর : (গ) দরিদ্র মানুষদের


প্রশ্ন ৪। শঙ্কুর বাবা কোন্‌ রোগে মারা যান?
(ক) ক্যানসার
(খ) হার্টব্লক
(গ) যক্ষ্মা
(ঘ) নিউমোনিয়া
উত্তর : (খ) হার্টব্লক


প্রশ্ন ৫। ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুর মৃত্যুকালে বয়স কত ছিল?
(ক) ৪০ বছর
(খ) ৪৫ বছর
(গ) ৫০ বছর
(ঘ) ৬০ বছর
উত্তর : (গ) ৫০ বছর


প্রশ্ন ৬। টিক্‌ড়ীবাবা স্বর্ণপর্ণীকে কী নামে উল্লেখ করেছিলেন?
(ক) সোনেপত্তী
(খ) সোনাঝুরি
(গ) সোনালতা
(ঘ) সোনাঝরা
উত্তর : (ক) সোনেপত্তী


প্রশ্ন ৭। স্বর্ণপর্ণীর গাছের সন্ধান পেতে শঙ্কু কোন্‌ মন্দিরের কাছে গিয়েছিলেন?
(ক) কালীমন্দির
(খ) চামুণ্ডার মন্দির
(গ) শিবমন্দির
(ঘ) দুর্গামন্দির
উত্তর : (খ) চামুণ্ডার মন্দির


প্রশ্ন ৮। স্বর্ণপর্ণী গাছটি কোন্‌ প্রাকৃতিক উৎসের কাছে ছিল?
(ক) নদীর তীরে
(খ) পাহাড়ের চূড়ায়
(গ) ঝরনার পাশে
(ঘ) সমুদ্রের ধারে
উত্তর : (গ) ঝরনার পাশে


প্রশ্ন ৯। স্বর্ণপর্ণী গাছটি খুঁজে পাওয়ার সময় শঙ্কুর সঙ্গে কে ছিল?
(ক) সন্ডার্স
(খ) নরবার্ট
(গ) ছোটেলাল
(ঘ) গোয়রিং
উত্তর : (গ) ছোটেলাল


প্রশ্ন ১০। স্বর্ণপর্ণীর পাতার ওষুধে প্রথম যে রোগীর চিকিৎসা করা হয়েছিল, তিনি কে?
(ক) জয়গোপাল মিত্র
(খ) সন্ডার্স
(গ) হাইনরিখ স্টাইনার
(ঘ) গোয়রিং
উত্তর : (ক) জয়গোপাল মিত্র


প্রশ্ন ১১। মিরাকিউরলের আবিষ্কারের সঙ্গে কোন্‌ গাছটি সরাসরি যুক্ত?
(ক) অশ্বত্থ
(খ) স্বর্ণপর্ণী
(গ) নিম
(ঘ) তুলসী
উত্তর : (খ) স্বর্ণপর্ণী


প্রশ্ন ১২। মিরাকিউরলের রাসায়নিক বিশ্লেষণে কোন্‌ অজানা বিষয়ের সন্ধান পাওয়া যায়?
(ক) নতুন ধাতু
(খ) অজ্ঞাত উপাদান
(গ) নতুন ভিটামিন
(ঘ) নতুন গ্যাস
উত্তর : (খ) অজ্ঞাত উপাদান


প্রশ্ন ১৩। সন্ডার্স শঙ্কুর কোন্‌ গুণে বিশেষভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন?
(ক) সংগীতপ্রতিভায়
(খ) বৈজ্ঞানিক প্রতিভায়
(গ) অভিনয়ক্ষমতায়
(ঘ) ক্রীড়ানৈপুণ্যে
উত্তর : (খ) বৈজ্ঞানিক প্রতিভায়


প্রশ্ন ১৪। শঙ্কুর বক্তৃতা কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল?
(ক) রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে
(খ) ক্যাক্সটন হলে
(গ) অক্সফোর্ড হলে
(ঘ) কারিনহলে
উত্তর : (খ) ক্যাক্সটন হলে


প্রশ্ন ১৫। শঙ্কুর বক্তৃতার আয়োজন করেছিলেন কে?
(ক) নরবার্ট স্টাইনার
(খ) হের্ গোয়রিং
(গ) জেরেমি সন্ডার্স
(ঘ) হাইনরিখ স্টাইনার
উত্তর : (গ) জেরেমি সন্ডার্স


প্রশ্ন ১৬। হাইনরিখ স্টাইনার কোন্‌ প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন?
(ক) রামায়ণ ও মহাভারত
(খ) বেদ ও উপনিষদ
(গ) মঙ্গলকাব্য
(ঘ) জাতককথা
উত্তর : (খ) বেদ ও উপনিষদ


প্রশ্ন ১৭। হাইনরিখ স্টাইনার কতবার ভারতবর্ষে এসেছিলেন?
(ক) তিনবার
(খ) পাঁচবার
(গ) সাতবার
(ঘ) দশবার
উত্তর : (গ) সাতবার


প্রশ্ন ১৮। নাৎসি বাহিনীর প্রতীক হিসেবে কোন্‌ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছিল?
(ক) পদ্ম
(খ) স্বস্তিক
(গ) ত্রিশূল
(ঘ) সূর্য
উত্তর : (খ) স্বস্তিক


প্রশ্ন ১৯। হের্ গোয়রিং জার্মানিতে কার পরেই ক্ষমতাশালী ছিলেন বলে নিজে দাবি করেছিলেন?
(ক) হাইনরিখ স্টাইনারের
(খ) হিটলারের
(গ) সন্ডার্সের
(ঘ) শঙ্কুর
উত্তর : (খ) হিটলারের


প্রশ্ন ২০। গোয়রিং-এর শারীরিক সমস্যার অন্যতম কারণ কী ছিল?
(ক) গ্ল্যান্ডের অসুখ
(খ) হৃদরোগ
(গ) যক্ষ্মা
(ঘ) পক্ষাঘাত
উত্তর : (ক) গ্ল্যান্ডের অসুখ


প্রশ্ন ২১। গোয়রিং-এর প্রাসাদে কী ধরনের শিল্পকর্ম দেখা যেত?
(ক) মাটির মূর্তি
(খ) তেলরঙে আঁকা বিখ্যাত শিল্পীদের ছবি
(গ) প্রাচীন পুঁথি
(ঘ) পাথরের শিলালিপি
উত্তর : (খ) তেলরঙে আঁকা বিখ্যাত শিল্পীদের ছবি


প্রশ্ন ২২। শঙ্কু কীভাবে গোয়রিংকে সাময়িকভাবে নিরস্ত করেছিলেন?
(ক) তাঁকে ভয় দেখিয়ে
(খ) ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বলে
(গ) পুলিশের সাহায্য নিয়ে
(ঘ) প্রাসাদে আগুন লাগিয়ে
উত্তর : (খ) ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বলে


প্রশ্ন ২৩। গোয়রিং-এর অনুচর এরিখ ফ্রোম কোন্‌ রোগে ভুগছিল?
(ক) হাঁপানি
(খ) মৃগী
(গ) ডায়াবেটিস
(ঘ) ক্যানসার
উত্তর : (খ) মৃগী


প্রশ্ন ২৪। শঙ্কু জার্মানি থেকে কীভাবে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন?
(ক) ট্রেনে করে
(খ) নৌকায় করে
(গ) গোয়রিং-এর গাড়ি নিয়ে
(ঘ) পায়ে হেঁটে
উত্তর : (গ) গোয়রিং-এর গাড়ি নিয়ে


প্রশ্ন ২৫। সন্ডার্সের পরিবর্তন করা বড়ি খেয়ে গোয়রিং ও এরিখ কী করেছিল?
(ক) অসুস্থ হয়ে পড়েছিল
(খ) ঘুমিয়ে পড়েছিল
(গ) শঙ্কুকে আক্রমণ করেছিল
(ঘ) পালিয়ে গিয়েছিল
উত্তর : (খ) ঘুমিয়ে পড়েছিল


✦ পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে মনে রাখবে

স্বর্ণপর্ণী → সোনেপত্তী → টিক্‌ড়ীবাবা → কসৌলি → চামুণ্ডার মন্দির → ঝরনা → স্বর্ণপর্ণী গাছ → মিরাকিউরল → জয়গোপাল মিত্র → জেরেমি সন্ডার্স → হাইনরিখ স্টাইনার → গোয়রিং → কারিনহল → সন্ডার্সের বুদ্ধি → ঘুমের ওষুধ।

এই ধারাটি মনে রাখলে গল্পটির ঘটনাক্রম, চরিত্র, স্থান এবং গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার খুব সহজে মনে রাখা যাবে।

বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন ১। স্বর্ণপর্ণী পাতার খোঁজ শঙ্কু কীভাবে পেলেন? কীভাবে সেই পাতা তিনি সংগ্রহ করে আনলেন?

উত্তর :
বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় সাহিত্যসৃষ্টিতেও ছিলেন এক অসামান্য প্রতিভা। তাঁর সৃষ্ট প্রফেসর শঙ্কু বাংলা কল্পবিজ্ঞানের এক অনন্য চরিত্র—যাঁর মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, অনুসন্ধিৎসা, মানবিকতা ও নৈতিক আদর্শ একসূত্রে মিলিত হয়েছে।

শঙ্কু পেশায় পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। পূজাবকাশে তিনি গিরিডিতে নিজের বাড়িতে এলে একদিন বাবার সঙ্গে কথোপকথনের সময় একটি আশ্চর্য গাছের কথা জানতে পারেন। তাঁর বাবা উশ্রীর ওপারের এক গ্রামে বসবাসকারী সাধু টিকড়ি বাবার কাছ থেকে ‘স্বর্ণপর্ণী’ নামের সেই গাছের কথা শুনেছিলেন। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে স্বর্ণপর্ণীর উল্লেখ থাকলেও তার বাস্তব অস্তিত্ব সম্পর্কে শঙ্কু এতদিন নিশ্চিত ছিলেন না। ফলে বাবার মুখে এই সংবাদ তাঁর বৈজ্ঞানিক কৌতূহলকে প্রবল করে তোলে।

বাবার মৃত্যুর পরও স্বর্ণপর্ণীর সন্ধান তাঁর মনে ক্রমাগত ঘুরতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তিনি বাবার নির্দেশিত পথে কসৌলী রওনা হন। সেখানে হোটেল ম্যানেজার নন্দকিশোরের সাহায্যে চামুণ্ডার মন্দিরের দিকে যাওয়ার জন্য ঘোড়ার ব্যবস্থা করেন। ঘোড়ার মালিক ছোটেলালকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করে একটি ঝরনার কাছে তিনি স্বর্ণপর্ণী গাছটি দেখতে পান। সূর্যালোকের মধ্যে হলুদ পাতায় ঝলমল করা গাছটি তাঁর বহুদিনের অনুসন্ধানের অবসান ঘটায়।

শঙ্কু নিজে গাছটি শিকড়-সহ তুলতে ব্যর্থ হলে ছোটেলাল সেটি তুলে দেয়। পরে গিরিডিতে ফিরে মালি হরেকৃষ্ণকে গাছটি বাগানে রোপণের নির্দেশ দেন।


প্রশ্ন ২। স্বর্ণপর্ণী দ্বারা শঙ্কু কার কার কী কী অসুখ সারিয়েছিলেন? মিরাকিউরল বড়ির উপাদানগুলি কী কী?

উত্তর :
প্রফেসর শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক প্রতিভার অন্যতম বিস্ময়কর প্রকাশ হল স্বর্ণপর্ণীর পাতা থেকে প্রস্তুত মিরাকিউরল নামের মহৌষধ। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে বর্ণিত এক বিস্মৃত উদ্ভিদকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে শঙ্কুর বিজ্ঞানচেতনার সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যের এক অভিনব সমন্বয় ঘটে।

প্রথমে শঙ্কু স্বর্ণপর্ণীর পাতা গুঁড়ো করে উকিল জয়গোপাল মিত্রের চিকিৎসা করেন। মিত্রবাবু অ্যাসাইটিস বা উদরী রোগে আক্রান্ত ছিলেন। স্বর্ণপর্ণীর প্রয়োগে তাঁর রোগ নিরাময় হয়।

পরবর্তীকালে শঙ্কু স্বর্ণপর্ণীর পাতা থেকে মিরাকিউরল বড়ি আবিষ্কার করেন। এই ওষুধ প্রায় সর্বরোগনাশক বলে প্রতীয়মান হয়। শঙ্কু তাঁর বন্ধু জেরামি স্যান্ডার্সের যকৃতের ক্যান্সার নিরাময় করেন। জার্মানির মিসেস ফিৎস্নারের সর্দিও এই ওষুধে সেরে যায়। আবার সংস্কৃত ও উপনিষদের জার্মান অনুবাদক হাইনরিখ স্টাইনার নাৎসি পুলিশের অত্যাচারে গুরুতর আহত হলে মিরাকিউরলের সাহায্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। শঙ্কুর মতে, ক্যান্সার, যক্ষ্মা, হাঁপানি, উদরী, ডায়াবেটিস প্রভৃতি কঠিন রোগেও এর উপকার পাওয়া যায়।

লন্ডনে মিরাকিউরলের রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে বিভিন্ন ভিটামিন, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়োডিন ও অ্যালিলসালফাইট রয়েছে। তবে এর মধ্যে এমন একটি রহস্যময় উপাদানও ছিল, যার কোনো পরিচয় প্রচলিত রসায়নশাস্ত্রে পাওয়া যায়নি।


প্রশ্ন ৩। প্রফেসর শঙ্কুর আবিষ্কারগুলির সম্পর্কে যা জানো লেখ।

উত্তর :
প্রফেসর শঙ্কু সত্যজিৎ রায়ের কল্পনার এমন এক বিজ্ঞানী, যাঁর আবিষ্কারগুলি কেবল বৈজ্ঞানিক বিস্ময়ের পরিচয় দেয় না, মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও অর্থবহ করে তোলার স্বপ্নও প্রকাশ করে। তাঁর আবিষ্কারের পরিধি চিকিৎসা থেকে যুদ্ধ, স্মৃতি থেকে নিদ্রা, ভাষা থেকে প্রাণীজগৎ—সর্বত্র বিস্তৃত।

তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার মিরাকিউরল, যা বহু দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ে সক্ষম। যুদ্ধ ও হত্যার বিরুদ্ধে তাঁর মানবিক বিজ্ঞানচেতনার পরিচয় মেলে অ্যানাইহিলিন পিস্তল-এ; এর সাহায্যে শত্রুকে হত্যা না করে নিষ্ক্রিয় বা নিশ্চিহ্ন করা যায়। এয়ারকন্ডিশনিং পিল শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে—শীতে উষ্ণতা ও গ্রীষ্মে শীতলতা প্রদান করে।

হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর আবিষ্কার রিমেমব্রেন। অনিদ্রার চিকিৎসায় তিনি আবিষ্কার করেন সম্বোলিন। বিড়ালের আয়ু বৃদ্ধির জন্য মার্জারিন এবং অন্ধকারে আলো পাওয়ার জন্য লুমিনিম্যাক্স তাঁর উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার। পৃথিবীর অপরিচিত ভাষাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্য তিনি তৈরি করেন লিঙ্গুয়াগ্রাফ। পাখিদের শিক্ষা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয় অরনিথন। এছাড়াও তাঁর আবিষ্কার নস্যাস্ত্র বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।

এই আবিষ্কারগুলির মধ্যে দিয়ে সত্যজিৎ রায় শঙ্কুকে কেবল কল্পবিজ্ঞানী করেননি; তাঁকে মানবকল্যাণকামী বিজ্ঞানীর আদর্শ প্রতিমূর্তিতে পরিণত করেছেন।


প্রশ্ন ৪। “সন্ডার্সের হাতটা মুঠো করে ধরলাম, মুখে কিছু বলতে পারলাম না”—সন্ডার্সের হাত মুঠো করে ধরার কারণ কী? কথক মুখে কিছু বলতে পারলেন না কেন?

উত্তর :
উদ্ধৃত উক্তিটি ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পের একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তের প্রকাশ। এর মধ্যে প্রফেসর শঙ্কুর বিস্ময়, আনন্দ, কৃতজ্ঞতা এবং বন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে।

নাৎসি জার্মানিতে অবস্থানকালে শঙ্কুকে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। গোয়েরিং ও পাহারারত এরিক তাঁর কাছ থেকে মিরাকিউরল বড়ি আদায় করে নেয়। শঙ্কু জানতেন, এই বড়ি যদি সত্যিই তাঁদের হাতে যায়, তবে দুই নিষ্ঠুর মানুষের জীবন রক্ষা পাবে। বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল। পরে লন্ডনে ফিরে তিনি সন্ডার্সকে সমস্ত ঘটনা জানান এবং নিজের মূল্যবান আবিষ্কার এমন ব্যক্তিদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হওয়ায় অনুতপ্ত হন।

তখন সন্ডার্স তাঁকে জানান যে, তিনি আগেই অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মিরাকিউরলের শিশির মধ্যে থাকা বড়ি বদলে সেকোন্যাল রেখেছিলেন। ফলে গোয়েরিং ও এরিক মিরাকিউরল পায়নি; তারা পেয়েছিল ঘুমের ওষুধ। শঙ্কুর মহৌষধ তাই নষ্ট হয়নি এবং দুই নৃশংস মানুষের উপকারেও আসেনি।

এই সংবাদে শঙ্কু গভীর আনন্দ ও স্বস্তিতে অভিভূত হয়ে পড়েন। সন্ডার্সের বুদ্ধি, দূরদৃষ্টি ও বন্ধুত্ব তাঁকে এতটাই স্পর্শ করে যে তিনি আবেগে ভাষা হারিয়ে ফেলেন। তাই কোনো কথা না বলে সন্ডার্সের হাত দুটো মুঠো করে ধরে নিজের কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ প্রকাশ করেন। তাঁর নীরবতা আসলে ভাষার সীমা অতিক্রম করা এক গভীর আবেগের প্রকাশ।

প্রশ্ন ৫। ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে প্রফেসর শঙ্কুর চরিত্রের যে বৈশিষ্ট্যগুলি প্রকাশ পেয়েছে, তা আলোচনা করো।

উত্তর :
‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রফেসর শঙ্কু। তিনি শুধু একজন কল্পবিজ্ঞানী নন; সত্যজিৎ রায়ের মানবতাবাদী বিজ্ঞানচেতনার প্রতীক। তাঁর চরিত্রে মেধা, অনুসন্ধিৎসা, সাহস, মানবিকতা, দেশজ ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নৈতিক আদর্শ একত্রিত হয়েছে।

শঙ্কু মূলত একজন অনুসন্ধিৎসু বিজ্ঞানী। স্বর্ণপর্ণীর অস্তিত্বের কথা শুনেই তিনি তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। কোনো প্রাচীন বিশ্বাসকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে তার বাস্তবতা যাচাই করার প্রবণতা তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচায়ক। আবার স্বর্ণপর্ণী আবিষ্কারের পর তিনি তার শক্তিকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেননি; বরং মিরাকিউরল তৈরি করে অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার করেছেন।

শঙ্কুর মধ্যে সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধিও লক্ষণীয়। নাৎসি বাহিনীর কবল থেকে স্টাইনারকে রক্ষা করার চেষ্টা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে নিজের পলায়ন তাঁর সাহসিকতার পরিচয় দেয়।

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য মানবিকতা। গোয়েরিং ও এরিকের মতো ব্যক্তিদেরও তিনি চিকিৎসার যোগ্য মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করেন। কিন্তু তাঁদের অন্যায়ের প্রতি কোনো সমর্থন নেই। এখানেই তাঁর বিজ্ঞান নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

সর্বোপরি, শঙ্কু এমন এক বিজ্ঞানীর প্রতিমূর্তি, যাঁর কাছে বিজ্ঞান ক্ষমতার অস্ত্র নয়—মানবকল্যাণের সাধনা।


প্রশ্ন ৬। ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে বিজ্ঞান ও ভারতীয় ঐতিহ্যের সমন্বয় কীভাবে ঘটেছে?

উত্তর :
‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল আধুনিক বিজ্ঞানচেতনার সঙ্গে ভারতীয় প্রাচীন জ্ঞান-ঐতিহ্যের এক সৃজনশীল সমন্বয়। সত্যজিৎ রায় এখানে বিজ্ঞানকে ঐতিহ্যের বিরোধী হিসেবে দেখাননি; বরং যুক্তি ও পরীক্ষার সাহায্যে প্রাচীন জ্ঞানকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সম্ভাবনা দেখিয়েছেন।

স্বর্ণপর্ণী কোনো আধুনিক গবেষণাগারে আবিষ্কৃত উদ্ভিদ নয়। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে, বিশেষত চরকসংহিতায়, এর উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আধুনিক যুগে তার বাস্তব অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান হারিয়ে গিয়েছিল। শঙ্কুর বাবা টিকড়ি বাবার কাছ থেকে সেই গাছের সন্ধান পান এবং শঙ্কু সেই তথ্যকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বিষয় করে তোলেন।

এখানেই গল্পের তাৎপর্য। শঙ্কু প্রাচীন তথ্যকে অন্ধবিশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করেননি। তিনি নিজে কসৌলীতে গিয়ে গাছটি সংগ্রহ করেন এবং পরে তার পাতা ব্যবহার করে মিরাকিউরল প্রস্তুত করেন। অর্থাৎ ঐতিহ্য তাঁকে তথ্য দিয়েছে, বিজ্ঞান দিয়েছে যাচাই ও প্রয়োগের পদ্ধতি

মিরাকিউরলের রাসায়নিক বিশ্লেষণেও আধুনিক বিজ্ঞানের ভূমিকা দেখা যায়। ফলে গল্পে ভারতীয় জ্ঞান-ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।

এই সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে সত্যজিৎ রায় বোঝাতে চেয়েছেন—অতীতকে অন্ধভাবে পূজা নয়, আবার আধুনিকতাকে অন্ধভাবে গ্রহণও নয়; বরং যুক্তিবোধের আলোয় ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কারই প্রকৃত জ্ঞানচর্চার পথ।


প্রশ্ন ৭। স্বর্ণপর্ণী গাছ আবিষ্কারের ঘটনাটি গল্পে কীভাবে রহস্য ও রোমাঞ্চ সৃষ্টি করেছে?

উত্তর :
‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে স্বর্ণপর্ণী গাছের সন্ধান একটি সাধারণ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান নয়; সত্যজিৎ রায় সেটিকে রহস্য, প্রকৃতি ও রোমাঞ্চের আবহে নির্মাণ করেছেন। ফলে পাঠকের কাছে গাছটির আবিষ্কার একটি অসাধারণ অভিযানের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

বাবার কাছ থেকে স্বর্ণপর্ণীর কথা শোনার পর থেকেই শঙ্কুর মনে তার প্রতি প্রবল কৌতূহল জন্মায়। বাবার মৃত্যুর পর সেই কৌতূহল আরও গভীর হয়ে ওঠে। অবশেষে তিনি কসৌলীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। অচেনা পাহাড়ি পথ, নির্জন পরিবেশ, হোটেল ম্যানেজার নন্দকিশোর, ঘোড়ার ব্যবস্থা এবং ছোটেলালকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলের দিকে যাত্রা—প্রতিটি ধাপ গল্পে রহস্যের আবহ তৈরি করে।

জঙ্গলে প্রবেশের পর পরিবেশের বর্ণনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঘন পাতার ছায়ায় চারদিকে অন্ধকার; তার মধ্যে হঠাৎ সূর্যের আলো এসে পড়েছে একটি নির্দিষ্ট স্থানে। সেই আলোয় হলুদ পাতায় ঝলমল করছে কোমর-উঁচু একটি গাছ। এই দৃশ্যটি যেন প্রকৃতির নিজস্ব মঞ্চে বহুদিনের লুকিয়ে থাকা রহস্যের আকস্মিক উন্মোচন।

শঙ্কুর কাছে সেই মুহূর্তটি ছিল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আনন্দের পাশাপাশি এক ধরনের নান্দনিক বিস্ময়। শেষ পর্যন্ত গাছটি শিকড়-সহ সংগ্রহ করার ঘটনায় অভিযানের পরিসমাপ্তি ঘটে।

এইভাবে প্রকৃতির রহস্য, অজানার প্রতি আকর্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসাকে একত্র করে সত্যজিৎ রায় স্বর্ণপর্ণী আবিষ্কারের ঘটনাকে রোমাঞ্চকর করে তুলেছেন।


প্রশ্ন ৮। মিরাকিউরলকে ‘সর্বরোগনাশক’ বলা হয় কেন?

উত্তর :
মিরাকিউরল হল প্রফেসর শঙ্কুর অন্যতম বিস্ময়কর আবিষ্কার। স্বর্ণপর্ণী পাতার নির্যাস থেকে প্রস্তুত এই ওষুধের কার্যকারিতা এত ব্যাপক যে গল্পে তাকে প্রায় ‘সর্বরোগনাশক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রথমত, মিরাকিউরলের সাহায্যে জয়গোপাল মিত্রের অ্যাসাইটিস বা উদরী রোগ নিরাময় হয়। পরবর্তীকালে শঙ্কু তাঁর বন্ধু জেরামি স্যান্ডার্সের যকৃতের ক্যান্সার সারিয়ে তোলেন। মিসেস ফিৎস্নারের দীর্ঘস্থায়ী সর্দিও মিরাকিউরলে দূর হয়। আবার নাৎসি পুলিশের অত্যাচারে গুরুতর আহত হাইনরিখ স্টাইনারের জীবনও এই ওষুধের সাহায্যে রক্ষা পায়।

শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি রোগ নয়, শঙ্কুর বক্তব্য অনুযায়ী ক্যান্সার, যক্ষ্মা, হাঁপানি, উদরী, ডায়াবেটিস প্রভৃতি বহু কঠিন রোগের ক্ষেত্রেও মিরাকিউরল কার্যকর। ফলে এর কার্যক্ষমতা প্রচলিত ওষুধের সীমাকে অতিক্রম করে যায়।

মিরাকিউরলের রাসায়নিক বিশ্লেষণেও এর বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। এতে নানা ভিটামিনের পাশাপাশি পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়োডিন ও অ্যালিলসালফাইট পাওয়া যায়। তবে এমন একটি অজ্ঞাত উপাদানের সন্ধানও মেলে, যার পরিচয় প্রচলিত রসায়নশাস্ত্রে নেই।

তাই মিরাকিউরল শুধু একটি ওষুধ নয়; এটি সত্যজিৎ রায়ের কল্পবিজ্ঞানে মানবজাতির দুরারোগ্য ব্যাধিমুক্ত ভবিষ্যতের স্বপ্নের প্রতীক


প্রশ্ন ৯। ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে সন্ডার্সের ভূমিকা আলোচনা করো।

উত্তর :
‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে সন্ডার্সের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও কাহিনির নৈতিক তাৎপর্যকে গভীর করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রফেসর শঙ্কুর বন্ধু এবং একই সঙ্গে তাঁর আবিষ্কার ও মানবিক আদর্শের একজন বিশ্বস্ত সহযাত্রী।

গল্পের শেষদিকে সন্ডার্সের বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। নাৎসি জার্মানিতে শঙ্কু যখন গোয়েরিং ও এরিকের হাতে মিরাকিউরল বড়ি দিতে বাধ্য হন, তখন তিনি মনে করেন তাঁর মহৌষধ পৃথিবীর নিকৃষ্টতম মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে চলেছে। এই সম্ভাবনা তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়।

কিন্তু পরে সন্ডার্স জানান, তিনি অত্যন্ত কৌশলে মিরাকিউরলের শিশি থেকে বড়ি সরিয়ে সেখানে সেকোন্যাল রেখেছিলেন। ফলে গোয়েরিং ও এরিক মিরাকিউরল পায়নি। সন্ডার্সের এই কাজ শুধু বন্ধুর আবিষ্কারকে রক্ষা করেনি; এক অর্থে শঙ্কুর নৈতিক সংকটও দূর করেছে।

সন্ডার্সের চরিত্রে তাই বন্ধুত্ব, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা এবং নৈতিক অবস্থান একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জানতেন, মিরাকিউরল নিছক একটি ওষুধ নয়; এটি মানুষের কল্যাণের জন্য আবিষ্কৃত এক মহামূল্য সম্পদ। তাই তার অপব্যবহার তিনি মেনে নিতে পারেননি।

সন্ডার্সের এই কাজের কথা শুনে শঙ্কু এতটাই আবেগাপ্লুত হন যে কোনো কথা বলতে পারেননি। তাঁর হাত মুঠো করে ধরা ছিল বন্ধুর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতার নীরব প্রকাশ।


প্রশ্ন ১০। ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে লেখকের মনোভাব কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?

উত্তর :
‘স্বর্ণপর্ণী’ শুধু কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়; এর অন্তর্লীন স্তরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসিবাদ ও মানবতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রশক্তির নিষ্ঠুরতার একটি তীব্র প্রতিবাদ রয়েছে। সত্যজিৎ রায় বিজ্ঞান ও মানবতার আদর্শকে নাৎসি হিংস্রতার বিপরীতে স্থাপন করেছেন।

গল্পে হাইনরিখ স্টাইনার একজন বিদ্বান মানুষ। তিনি বেদ, উপনিষদ ও সংস্কৃত সাহিত্যের জার্মান অনুবাদক। কিন্তু নাৎসি পুলিশ তাঁকে নির্মমভাবে প্রহার করে। তাঁর অপরাধ মূলত মতাদর্শগত—তিনি সেই স্বৈরাচারী শক্তির অনুগত নন। ফলে জ্ঞান ও স্বাধীন চিন্তার ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন প্রফেসর শঙ্কু। তিনি বিজ্ঞানী, কিন্তু তাঁর বিজ্ঞান ক্ষমতার জন্য নয়; মানুষের জন্য। তিনি স্টাইনারের জীবন রক্ষা করতে চান এবং তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

গল্পের আরও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল গোয়েরিং ও এরিকের হাতে মিরাকিউরল যাওয়ার ঘটনা। তাঁরা শঙ্কুকে জোর করে ওষুধ দিতে বাধ্য করলেও সন্ডার্সের বুদ্ধিমত্তায় সেই ওষুধ তাঁদের হাতে কার্যত পৌঁছায় না। ফলে মানবকল্যাণের বিজ্ঞান নৃশংসতার হাত থেকে রক্ষা পায়।

এই দ্বন্দ্বে একদিকে আছে যুদ্ধ, হিংসা, দমন ও ক্ষমতার উন্মত্ততা; অন্যদিকে আছে বিজ্ঞান, জ্ঞান, বন্ধুত্ব ও মানবতা। সত্যজিৎ রায় স্পষ্টতই দ্বিতীয় পক্ষের সমর্থক। তাই ‘স্বর্ণপর্ণী’ একটি কল্পবৈজ্ঞানিক গল্পের পাশাপাশি মানবতার পক্ষের নৈতিক আখ্যানও হয়ে উঠেছে।


প্রশ্ন ১১। ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর :
সত্যজিৎ রায়ের ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পটির নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সার্থক। কারণ কাহিনির মূল ঘটনা, রহস্য, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং মানবকল্যাণের ভাবনা—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে স্বর্ণপর্ণী গাছ।

প্রথম থেকেই স্বর্ণপর্ণী একটি রহস্যময় উদ্ভিদ হিসেবে গল্পে উপস্থিত। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে যার উল্লেখ থাকলেও আধুনিক পৃথিবীতে যার বাস্তব অস্তিত্ব প্রায় বিস্মৃত। শঙ্কুর বাবা টিকড়ি বাবার কাছ থেকে তার সন্ধান পান। সেই তথ্য শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসাকে জাগিয়ে তোলে।

পরবর্তীতে কসৌলীর দুর্গম জঙ্গলে শঙ্কুর স্বর্ণপর্ণী আবিষ্কার গল্পের প্রধান রোমাঞ্চকর ঘটনায় পরিণত হয়। তিনি গাছটি শিকড়-সহ সংগ্রহ করে গিরিডিতে নিয়ে আসেন এবং তার পাতা ব্যবহার করে তৈরি করেন মিরাকিউরল। এই ওষুধের সাহায্যে বহু মানুষের দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময় হয়।

অর্থাৎ স্বর্ণপর্ণী কেবল একটি উদ্ভিদ নয়; এটি গল্পে বিস্মৃত জ্ঞান, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, মানবকল্যাণ এবং আশার প্রতীক। স্বর্ণপর্ণী না থাকলে মিরাকিউরলের সৃষ্টি সম্ভব হত না; আর মিরাকিউরল ছাড়া গল্পের মানবিক ও নৈতিক তাৎপর্যও সম্পূর্ণ হত না।

তাই কাহিনির ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রবিন্দু এবং এর অন্তর্নিহিত ভাবের প্রতীক হিসেবে ‘স্বর্ণপর্ণী’ নামটি সম্পূর্ণ সার্থক ও ব্যঞ্জনাময়

আরও কিছু বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (পরীক্ষায় বিশেষ সুবিধার জন্য)


প্রশ্ন — ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে প্রোফেসর শঙ্কু তাঁর আবিষ্কারের কী কী তালিকা দিয়েছিলেন?

অথবা, প্রোফেসর শঙ্কুর আবিষ্কারগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

উত্তর :

প্রাক্কথন : সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট প্রোফেসর শঙ্কু একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী ও আবিষ্কারক। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা, অনুসন্ধিৎসা এবং মানবকল্যাণের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে দেশ-বিদেশে খ্যাতি এনে দিয়েছিল। আলোচ্য ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে তাঁর বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও পাওয়া যায়।

মিরাকিউরল : শঙ্কুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ‘মিরাকিউরল’। এটি একটি সর্বরোগনাশক বড়ি। তবে শঙ্কু এই আবিষ্কারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব নিজের বলে মনে করেননি; স্বর্ণপর্ণীর সন্ধানদাতা টিক্‌ড়ীবাবার অবদান তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।

অ্যানাইহিলিন পিস্তল : মিরাকিউরলের পর তাঁর উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার ‘অ্যানাইহিলিন পিস্তল’। এটি শত্রুকে হত্যা না করে নিশ্চিহ্ন বা নিস্তেজ করে দিতে পারে। রক্তপাতকে অপছন্দ করতেন শঙ্কু; তাই আত্মরক্ষার জন্যও তিনি এমন একটি অস্ত্র তৈরি করেছিলেন, যার ব্যবহার প্রাণঘাতী নয়।

এয়ারকন্ডিশনিং পিল : জিভের তলায় এই বড়ি রাখলে ঋতুর প্রতিকূলতা শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে না—শীতকালে শরীর উষ্ণ এবং গ্রীষ্মকালে শীতল থাকে।

রিমেমব্রেন : বিস্মৃত বা হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনার জন্য শঙ্কু ‘রিমেমব্রেন’ আবিষ্কার করেন।

অন্যান্য আবিষ্কার : এ ছাড়াও নিদ্রাহীনতা দূর করার জন্য ‘সমনোলিন’, অন্ধকারে সস্তায় উজ্জ্বল আলো পাওয়ার জন্য ‘লুমিনিম্যাক্স’, পৃথিবীর অচেনা ভাষা ইংরেজিতে অনুবাদের জন্য ‘লিঙ্গুয়াগ্রাফ’ এবং পাখিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য ‘অরনিথন’ প্রভৃতি আবিষ্কার তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভার পরিচয় বহন করে।


প্রশ্ন — ‘বাবার এই কথাগুলো আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল।’—বক্তার বাবা কে? এখানে কোন্ কথাগুলোর কথা বলা হয়েছে?

উত্তর :

পরিচয় : উদ্ধৃত অংশটি সত্যজিৎ রায়ের ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পের অন্তর্গত। এখানে ‘বাবা’ বলতে প্রোফেসর শঙ্কুর পিতা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুকে বোঝানো হয়েছে। তিনি গিরিডির একজন খ্যাতনামা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ছিলেন।

দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি : ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু সারাজীবন বহু দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা বিনা পয়সায় করেছিলেন। চিকিৎসক হিসেবে প্রচুর উপার্জনের সুযোগ থাকলেও তিনি অর্থলোভী ছিলেন না।

অর্থের প্রকৃত মূল্য : তিনি মনে করতেন, স্বচ্ছন্দ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সামর্থ্য থাকলেই অঢেল অর্থ উপার্জন করে যাওয়ার মধ্যে জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নেই।

মানবসেবার আদর্শ : যেসব মানুষ দু-বেলা দু-মুঠো অন্নের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে, অথবা কোনো কারণে উপার্জন করতে পারে না, তাদের দুঃখ যদি সামান্যও লাঘব করা যায়, তবে তার চেয়ে বড়ো আনন্দ আর কিছু হতে পারে না—এই মানবিক আদর্শই তিনি পুত্রের সামনে তুলে ধরেছিলেন।

প্রভাব : পিতার এই কথাগুলি শঙ্কুর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তীকালে তাঁর আবিষ্কার ও চিকিৎসাবোধের মধ্যেও এই মানবকল্যাণের আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে।


প্রশ্ন — ‘এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে মুহূর্তের জন্য আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।’—কোন্ দৃশ্য? এরপরে কী হয়েছিল?

উত্তর :

ঘটনার প্রেক্ষাপট : সত্যজিৎ রায়ের ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে প্রোফেসর শঙ্কু একদিন গিরিডিতে নিজের বাড়িতে ফিরে বাবার ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানেই তিনি এমন একটি দৃশ্য দেখেছিলেন, যা তাঁকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দেয়।

অদ্ভুত দৃশ্য : তাঁর বাবা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু কাজের টেবিলের পাশে মেঝেতে চিত হয়ে পড়েছিলেন। সদা কর্মব্যস্ত চিকিৎসক বাবাকে এই অবস্থায় আগে কখনও দেখেননি শঙ্কু। তাই দৃশ্যটি তাঁর কাছে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও আতঙ্কজনক মনে হয়।

পরবর্তী ঘটনা : শঙ্কু তৎক্ষণাৎ বাবার কাছে ছুটে যান এবং নাড়ি পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন যে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের খবর পাঠানো হয়। তবে চিকিৎসক আসার আগেই তাঁর বাবার জ্ঞান ফিরে আসে।

বাবার অসুখ : জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু জানান, এর আগেও দু-বার তাঁর এমন হয়েছিল। হঠাৎ হৃদ্যন্ত্রের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই রোগের নাম ‘হার্টব্লক’। এর কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই বলেও তিনি জানান।

পরিণতি : এই ঘটনার প্রায় দেড় বছর পরে মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু হার্টব্লক রোগে মৃত্যুবরণ করেন।


প্রশ্ন — ‘সেদিনই রাত্রে বাবা আমাকে একটা আশ্চর্য ঘটনা বলেন।’—এখানে কোন্ দিনের কথা বলা হয়েছে? আশ্চর্য ঘটনাটি কী?

উত্তর :

উদ্দিষ্ট দিন : এখানে সেই দিনের কথা বলা হয়েছে, যেদিন প্রোফেসর শঙ্কু তাঁর বাবার মৃত্যুর তিন দিন আগে গিরিডির বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন।

টিক্‌ড়ীবাবার আগমন : সেই রাতে ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু পুত্রকে এক আশ্চর্য ঘটনার কথা জানান। উশ্রী নদীর ওপারের একটি গ্রামে টিক্‌ড়ীবাবা নামে এক সাধু থাকতেন। তিনি গাছতলায় বসে সাধনা করতেন।

চিকিৎসার ঘটনা : একসময় টিক্‌ড়ীবাবা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হলে তাঁর শিষ্যরা তাঁকে ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুর কাছে নিয়ে আসে। চিকিৎসার সময় টিক্‌ড়ীবাবা পালটা জানতে চান—যিনি তাঁর চিকিৎসা করছেন, তাঁর নিজের চিকিৎসা হবে কীভাবে?

স্বর্ণপর্ণীর কথা : ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু নিজের রোগের কোনো চিকিৎসা নেই জানালে টিক্‌ড়ীবাবা ‘সোনেপত্তী’ বা স্বর্ণপর্ণীর কথা বলেন। তাঁর মতে, এই গাছের সাহায্যে শঙ্কুর দুরারোগ্য ব্যাধিও সারানো সম্ভব।

গাছটির অবস্থান : টিক্‌ড়ীবাবা জানান, কসৌলি থেকে প্রায় তিন ক্রোশ উত্তরে একটি ভাঙা চামুণ্ডা মন্দিরের পিছনের জঙ্গলে ঝরনার ধারে স্বর্ণপর্ণীর গাছ রয়েছে। ‘চরকসংহিতা’-তেও এই গাছের উল্লেখ আছে বলে তিনি জানান।

তাৎপর্য : টিক্‌ড়ীবাবার এই আশ্চর্য জ্ঞান এবং আধুনিক যুগে লুপ্তপ্রায় স্বর্ণপর্ণীর অস্তিত্বের কথা জানতে পারাই শঙ্কুর কাছে ঘটনাটিকে আশ্চর্য করে তুলেছিল।


প্রশ্ন — ‘এটাই যে স্বর্ণপর্ণী তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’—কে কীভাবে স্বর্ণপর্ণী পেয়েছিলেন?

উত্তর :

সন্ধানের সূচনা : প্রোফেসর শঙ্কু তাঁর পিতা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুর কাছ থেকে টিক্‌ড়ীবাবার মুখে শোনা স্বর্ণপর্ণীর কথা জানতে পারেন। গাছটির অসাধারণ ঔষধিগুণের কথা শুনে তাঁর মনে প্রবল কৌতূহল জন্মায়।

কসৌলির পথে : পিতার মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধশান্তি সম্পন্ন করে শঙ্কু স্বর্ণপর্ণীর সন্ধানে রওনা হন। গিরিডি থেকে কালকা এবং সেখান থেকে প্রায় ছেচল্লিশ কিলোমিটার দূরে কসৌলিতে পৌঁছোন।

চামুণ্ডার মন্দির : কসৌলির একটি হোটেলে উঠে ম্যানেজারের কাছ থেকে টিক্‌ড়ীবাবা কথিত চামুণ্ডার মন্দিরের অবস্থান জেনে নেন। সেখানে গাড়িতে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় ম্যানেজারের সাহায্যে ঘোড়ার ব্যবস্থা করেন।

জঙ্গলে প্রবেশ : ঘোড়ার মালিক ছোটেলালকে সঙ্গে নিয়ে শঙ্কু মন্দিরের দিকে এগিয়ে যান। ঘোড়া রেখে তাঁরা জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করেন। প্রায় পনেরো মিনিট পর শঙ্কুর কানে ঝরনার শব্দ আসে।

স্বর্ণপর্ণীর সন্ধান : ঘন অন্ধকারের মধ্যে সূর্যের এক ফালি আলো এসে পড়েছিল একটি হলুদাভ পাতা-ভরা গাছের ওপর। গাছটির স্বর্ণাভ পাতা দেখে শঙ্কু বুঝতে পারেন—এই সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘সোনেপত্তী’ বা স্বর্ণপর্ণী।


প্রশ্ন — ‘এইসময় একটা ঘটনা ঘটল, যেটা বলা যেতে পারে আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।’—এখানে কোন্ ঘটনার কথা বলা হয়েছে?

উত্তর :

ঘটনার সূচনা : প্রোফেসর শঙ্কু ‘নেচার’ পত্রিকায় জীবতত্ত্ব সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধ পড়ে তার লেখক জেরেমি সন্ডার্সকে চিঠি লেখেন। চিঠির উত্তর দিতে গিয়ে সন্ডার্স নিজের ভারত-সম্পর্কের কথা জানান। ক্রমে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

সন্ডার্সের বিপদ : কিছুদিন পরে সন্ডার্সের স্ত্রী শঙ্কুকে জানান যে সন্ডার্সের যকৃতে ক্যানসার ধরা পড়েছে। চিকিৎসকদের মতে তাঁর বাঁচার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

মিরাকিউরলের প্রয়োগ : বন্ধুর এই দুরবস্থার কথা শুনে শঙ্কু তাঁকে স্বর্ণপর্ণী থেকে তৈরি মিরাকিউরলের দশটি বড়ি পাঠিয়ে দেন। নির্দেশ দেন, প্রথমে দুটি বড়ি খাওয়াতে হবে; তাতে কাজ না হলে পর্যায়ক্রমে আরও বড়ি খাওয়ানো যেতে পারে।

অলৌকিক ফল : প্রায় দেড় মাস পরে সন্ডার্স সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে নিজেই শঙ্কুর কাছে এসে উপস্থিত হন। এই অসাধারণ সাফল্য মিরাকিউরলের কার্যকারিতা প্রমাণ করে।

জীবনের মোড় : সন্ডার্স শঙ্কুকে লন্ডনে নিয়ে যেতে চান এবং তাঁর আবিষ্কারের কথা বিশ্বের বিজ্ঞানীমহলে প্রকাশ করতে উদ্যোগী হন। এর ফলে শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তাই ঘটনাটিকে তিনি তাঁর জীবনের ‘মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া’ ঘটনা বলেছেন।


প্রশ্ন — ‘এমন সময় বিদ্যুৎঝলকের মতো এই ওষুধের একটা নাম আমার মাথায় এসে গেল…’—কোন্ ওষুধের কথা বলা হয়েছে? কীভাবে বক্তা তা আবিষ্কার করেছিলেন?

উত্তর :

ওষুধের পরিচয় : এখানে প্রোফেসর শঙ্কুর আবিষ্কৃত বিখ্যাত সর্বরোগনাশক ওষুধ ‘মিরাকিউরল’-এর কথা বলা হয়েছে। এর পূর্ণ অর্থ ‘মিরাকল কিওর ফর অল কমপ্লেন্টস্’—অর্থাৎ সমস্ত রোগের আশ্চর্য নিরাময়।

স্বর্ণপর্ণীর সন্ধান : টিক্‌ড়ীবাবার কাছ থেকে স্বর্ণপর্ণীর কথা শুনে শঙ্কু কসৌলির জঙ্গলে গিয়ে গাছটি খুঁজে বের করেন। গিরিডিতে ফিরে তিনি সেটিকে নিজের বাগানে রোপণ করেন এবং আরও গাছ তৈরির চেষ্টা শুরু করেন।

প্রাথমিক পরীক্ষা : উকিল জয়গোপাল মিত্রের উদরী রোগে স্বর্ণপর্ণীর পাতার প্রয়োগ করে শঙ্কু প্রথম এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন। ফল আশ্চর্যজনক হওয়ায় তাঁর কাছে আরও কঠিন রোগের রোগী আসতে থাকে এবং সেখানেও একই সাফল্য পাওয়া যায়।

বড়ি তৈরির পরিকল্পনা : শুকনো পাতা গুঁড়ো করে দুধের সঙ্গে খাওয়ানোর পদ্ধতিটি শঙ্কুর কাছে সুবিধাজনক মনে হয়নি। তাই তিনি স্বর্ণপর্ণীর নির্যাস থেকে সহজে সেবনযোগ্য বড়ি তৈরির পরিকল্পনা করেন।

মিরাকিউরলের জন্ম : প্রায় এক মাসের প্রচেষ্টায় তিনি বড়ি তৈরিতে সফল হন। এরপরই আকস্মিকভাবে তাঁর মনে আসে নামটি—‘মিরাকিউরল’। এইভাবেই স্বর্ণপর্ণীর পাতার অসাধারণ ঔষধিগুণ একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের রূপ লাভ করে।


প্রশ্ন — ‘আমার বক্তৃতার এত লোক হবে সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি।’—কোন্ বক্তৃতার কথা বলা হয়েছে? বক্তৃতার বর্ণনা দাও। তার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল?

উত্তর :

বক্তৃতার পরিচয় : এখানে লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে মিরাকিউরল সম্পর্কে প্রোফেসর শঙ্কুর দেওয়া বক্তৃতার কথা বলা হয়েছে। জেরেমি সন্ডার্সের উদ্যোগেই এই বক্তৃতার আয়োজন হয়েছিল।

বক্তৃতার বিষয়বস্তু : শঙ্কু বক্তৃতায় ভারতীয় আয়ুর্বেদচর্চার ঐতিহ্য, চরক ও সুশ্রুতের চিকিৎসাশাস্ত্র, তাঁর পিতা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুর চিকিৎসাবোধ এবং টিক্‌ড়ীবাবার কাছ থেকে স্বর্ণপর্ণীর সন্ধান পাওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন।

আবিষ্কারের বিবরণ : তিনি কসৌলির জঙ্গল থেকে স্বর্ণপর্ণী সংগ্রহ, তার ঔষধিগুণ পরীক্ষা এবং পরবর্তীকালে মিরাকিউরল বড়ি তৈরির সম্পূর্ণ বিবরণ শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন।

প্রশ্নের উত্তর : বক্তৃতার মধ্যেই তিনি স্পষ্ট করে দেন যে মিরাকিউরল তিনি বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করতে চান না। পাশাপাশি লন্ডনে থেকে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও তাঁর নেই।

প্রতিক্রিয়া : বক্তৃতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল হাততালিতে সভাকক্ষ মুখর হয়ে ওঠে। বহু মানুষ তাঁর সঙ্গে হাত মেলান এবং অভিনন্দন জানান। পরদিন লন্ডনের বিভিন্ন সংবাদপত্রে ছবি-সহ তাঁর বক্তৃতার খবর প্রকাশিত হয়। এই বিপুল সাড়া দেখে শঙ্কু নিজেও বিস্মিত হয়ে যান।


প্রশ্ন — ‘তোমার আসার কারণটা জানতে পারি কি?’—কে, কাকে এই প্রশ্ন করেছিলেন? তাঁর আসার কারণ কী ছিল?

উত্তর :

প্রশ্নকর্তা : এই প্রশ্নটি জেরেমি সন্ডার্স নরবার্ট স্টাইনারকে করেছিলেন।

নরবার্টের পরিচয় : নরবার্ট স্টাইনার ছিলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক হাইনরিখ স্টাইনারের পুত্র। তাঁর পিতা ছিলেন ইহুদি এবং নাৎসি শাসনের সময় জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর চলা অত্যাচারের শিকার।

অত্যাচারের ঘটনা : হাইনরিখ স্টাইনার ‘হাইল হিটলার’ বলতে অস্বীকার করায় নাৎসি গুপ্ত পুলিশ তাঁকে নির্মমভাবে প্রহার করে। তিনি গুরুতর আহত হয়ে পড়েন। কিন্তু ইহুদি হওয়ার কারণে বার্লিনের হাসপাতালগুলিও তাঁর চিকিৎসার জন্য দরজা বন্ধ করে দেয়।

নরবার্টের উদ্দেশ্য : সংবাদপত্রে প্রোফেসর শঙ্কু এবং তাঁর মিরাকিউরল বড়ির কথা জানতে পেরে নরবার্ট সন্ডার্সের কাছে আসেন। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শঙ্কুর সাহায্যে তাঁর মৃত্যুপথযাত্রী পিতাকে সুস্থ করে তোলা।

পরবর্তী ঘটনা : নরবার্টের অনুরোধে শঙ্কু মানবিক দায়িত্ববোধে সাড়া দেন। পিতার জীবন রক্ষার জন্য তিনি বিপজ্জনক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও বার্লিনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।


প্রশ্ন — ‘একজন মনীষীর ত্রাণকর্তা হতে পারলে তোর জীবন ধন্য হবে।’—কোন্ প্রসঙ্গে বক্তার এই কথা স্মরণে আসে? ‘মনীষীর ত্রাণকর্তা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর :

প্রসঙ্গ : নরবার্ট স্টাইনার তাঁর পিতা হাইনরিখ স্টাইনারকে বাঁচানোর জন্য প্রোফেসর শঙ্কুর কাছে সাহায্য চান। নাৎসি অত্যাচারে আহত পিতার জীবন তখন বিপন্ন। এই অবস্থায় শঙ্কুর মনে তাঁর পিতার উপদেশের কথা ভেসে ওঠে।

মনীষীর পরিচয় : হাইনরিখ স্টাইনার ছিলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট ভারততত্ত্ববিদ। বেদ, উপনিষদ ও সংস্কৃত সাহিত্যের বহু রচনা তিনি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল এবং তিনি বহুবার ভারতবর্ষে এসেছিলেন।

শঙ্কুর পিতার আদর্শ : ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা অন্যের দুঃখ লাঘবের মধ্যে। একজন মহৎ ও জ্ঞানী মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারা জীবনের বড়ো অর্জন।

শঙ্কুর সিদ্ধান্ত : তাই সন্ডার্স যখন তাঁর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বার্লিনে যেতে নিষেধ করেন, তখনও শঙ্কু পিছু হটেননি। তিনি মনে করেছিলেন, হাইনরিখ স্টাইনারের মতো একজন ভারতপ্রেমী মনীষীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারলে তাঁর পিতার আদর্শই সার্থক হবে।

তাৎপর্য : ‘মনীষীর ত্রাণকর্তা’ বলতে এখানে একজন মহৎ, জ্ঞানী ও ভারতপ্রেমী মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধারকারীকে বোঝানো হয়েছে।


প্রশ্ন — ‘আমি তো মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলাম, কারণ বেঁচে থেকে তো আমার কোনো লাভ নেই!’—বক্তা কে? তাঁর এই মন্তব্যের কারণ কী? শঙ্কু তাঁকে কীভাবে সাহায্য করেছিলেন?

উত্তর :

বক্তার পরিচয় : উদ্ধৃতিটির বক্তা হলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক হাইনরিখ স্টাইনার।

মৃত্যুর প্রতি আকাঙ্ক্ষার কারণ : নাৎসি বাহিনীর অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন স্টাইনার। ‘হাইল হিটলার’ বলতে অস্বীকার করায় তাঁকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়। তাঁর মাথা ফেটে যায়, সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে পড়ে এবং তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

নিরুপায় অবস্থা : ইহুদি হওয়ার কারণে কোনো হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা হচ্ছিল না। নিজের দেশেই তিনি পরবাসীর মতো জীবনযাপন করছিলেন। তাঁর গবেষণা ও সংস্কৃতচর্চার ক্ষেত্রও নাৎসি শাসনের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। ফলে বেঁচে থাকার ইচ্ছাও তাঁর প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল।

শঙ্কুর চিকিৎসা : প্রোফেসর শঙ্কু তাঁকে মিরাকিউরল বড়ি খাওয়ান। আশ্চর্যজনকভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই স্টাইনার সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মানসিক পুনর্জাগরণ : শুধু শারীরিক চিকিৎসাই নয়, শঙ্কু তাঁকে মানসিকভাবেও নতুন করে বাঁচার প্রেরণা দেন। জার্মানি ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে আবার নিজের গবেষণা শুরু করার পরামর্শ দেন।

ফলাফল : মিরাকিউরলের চিকিৎসা এবং শঙ্কুর মানবিক সাহচর্যে স্টাইনার মৃত্যুর হতাশা কাটিয়ে নতুন জীবনের দিকে ফিরে আসেন।


প্রশ্ন — ‘এটা যে একটা প্রাসাদ তাতে সন্দেহ নেই, তবে প্রাচীন নয়।’—কোন্ প্রাসাদ? প্রাসাদের বর্ণনা দাও।

উত্তর :

প্রাসাদের পরিচয় : এখানে হের্ গোয়রিং-এর প্রাসাদ ‘কারিনহল’-এর কথা বলা হয়েছে। গোয়রিং ছিলেন নাৎসি জার্মানির অন্যতম প্রধান নেতা এবং সামরিক শক্তির প্রধান ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রথম স্ত্রীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছিল।

বাহ্যিক সৌন্দর্য : কারিনহল ছিল বিশাল ও ঐশ্বর্যময়। প্রাসাদের সামনে বিস্তীর্ণ বাগান ছিল। সেখানে ফুলের কেয়ারি, লিলি ফুল এবং শ্বেতপাথরের নানা মূর্তি শোভা পেত।

প্রবেশপথ : প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করলেই একটি বিশাল ঘর পড়ত। তার দৈর্ঘ্য প্রায় পঞ্চাশ গজ। ছাদ থেকে ঝুলত বৃহৎ ঝাড়লণ্ঠন। দেয়ালে বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা তৈলচিত্র গিল্টি করা ফ্রেমে সাজানো ছিল।

অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা : ঘরের এক প্রান্তে দোতলায় ওঠার জন্য ঘোরানো সিঁড়ি ছিল। এরপর ছিল রিসেপশন রুম। সেখানে বড়ো বড়ো সোফা, কাউচ, বাহারি চেয়ার, প্রকাণ্ড টেবিল ও টেলিফোন প্রভৃতি ছিল।

তাৎপর্য : প্রাসাদের বিপুল ঐশ্বর্য গোয়রিং-এর ক্ষমতা, সম্পদ ও আত্মম্ভরিতার পরিচয় বহন করলেও তার চাকচিক্যের আড়ালে নাৎসি শাসনের নিষ্ঠুরতার এক গভীর বৈপরীত্যও প্রকাশ পেয়েছে।


প্রশ্ন — ‘লোকটার প্রতি আমার অশ্রদ্ধা ক্রমেই বাড়ছিল।’—লোকটা কে? তাঁর চরিত্র সম্পর্কে কী জানা যায়?

উত্তর :

লোকটির পরিচয় : এখানে ‘লোকটা’ বলতে নাৎসি জার্মানির সামরিক প্রধান হের্ গোয়রিংকে বোঝানো হয়েছে। তিনি হিটলারের পরেই জার্মানির অন্যতম ক্ষমতাবান ব্যক্তি ছিলেন।

অহংকার : গোয়রিং নিজের ক্ষমতা ও মর্যাদা সম্পর্কে অত্যন্ত অহংকারী ছিলেন। নিজের প্রাসাদ কারিনহল, সামরিক ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তাঁর প্রবল আত্মগর্ব ছিল।

নিষ্ঠুরতা : ইহুদিদের প্রতি তাঁর গভীর বিদ্বেষ ছিল। হাইনরিখ স্টাইনারের মতো একজন পণ্ডিত মানুষকেও তিনি শুধু জাতিগত পরিচয়ের কারণে ঘৃণা করতেন।

স্বার্থপরতা : মিরাকিউরলের অসাধারণ ক্ষমতার কথা শুনে তিনি মানবকল্যাণের কথা না ভেবে প্রথমেই নিজের অসুখ সারানোর কথা ভাবেন। এমনকি ওষুধটি জার্মানির সাধারণ মানুষের জন্য নয়, কেবল নাৎসি দলের জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনাও তাঁর মনে ছিল।

লোভ : প্রচণ্ড স্থূলকায় ও অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর খাদ্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। বারবার স্যান্ডউইচ ও বিয়ার খাওয়ার অভ্যাস তাঁর লোভী স্বভাবের পরিচয় দেয়।

বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা : নিজেকে অত্যন্ত চালাক মনে করলেও শঙ্কুর বুদ্ধির কাছে তিনি পরাস্ত হন। ঘুমের ওষুধকে মিরাকিউরল ভেবে খেয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন।

মূল্যায়ন : সব মিলিয়ে গোয়রিং চরিত্রটি অহংকার, নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা, লোভ এবং আত্মম্ভরিতার এক অন্ধকার প্রতিচ্ছবি।


প্রশ্ন — ‘আমি মনে মনে স্থির করে নিয়েছিলাম, এ অবস্থায় যা বললে কাজ হবে, সেটাই বলব।’—কোন্ অবস্থার কথা বলা হয়েছে? বক্তা কী বলেছিলেন?

উত্তর :

পরিস্থিতি : হাইনরিখ স্টাইনারের চিকিৎসা করার পর প্রোফেসর শঙ্কুকে নাৎসি নেতা হের্ গোয়রিং তাঁর প্রাসাদ কারিনহলে ধরে নিয়ে যান। গোয়রিং নিজের অসুখ সারানোর জন্য মিরাকিউরল দাবি করেন।

শঙ্কুর শর্ত : শঙ্কু বুঝতে পারেন, সরাসরি প্রতিবাদ করে এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। তাই তিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন।

গোয়রিং-এর হুমকি : গোয়রিং পিস্তল দেখিয়ে মিরাকিউরল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। শঙ্কু বুঝতে পারেন, তাঁকে এমন কথা বলতে হবে যা গোয়রিংকে নিজের স্বার্থেই তাঁর শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করবে।

শঙ্কুর বক্তব্য : তিনি বলেন, মিরাকিউরল একটি বিশেষ ওষুধ এবং অনিচ্ছায় বা জোর করে কাউকে এই ওষুধ খাওয়ালে তার বিপরীত ফল হতে পারে। তাই জোর করে ওষুধ নেওয়ার কোনো অর্থ নেই।

শর্ত : শঙ্কু জানান, স্টাইনারের পরিবারকে নিরাপদে প্যারিসে চলে যাওয়ার সুযোগ দিলে তিনি স্বেচ্ছায় গোয়রিংকে ওষুধ দেবেন।

পরিণতি : নিজের রোগ সারানোর প্রবল আকাঙ্ক্ষায় গোয়রিং শেষ পর্যন্ত শঙ্কুর শর্ত মেনে নেন। ফলে শঙ্কু নিজের উদ্দেশ্য সফল করতে সক্ষম হন।


প্রশ্ন — ‘কী অদ্ভুত অভিজ্ঞতা!’—এখানে কার অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে? তাঁর সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার বিবরণ দাও।

উত্তর :

উদ্দিষ্ট ব্যক্তি : এখানে প্রোফেসর শঙ্কুর অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। লন্ডন থেকে বার্লিনে যাওয়ার পর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি একের পর এক বিচিত্র ঘটনার মুখোমুখি হন।

প্রথম ঘটনা : নরবার্ট স্টাইনারের সঙ্গে বার্লিনে পৌঁছে শঙ্কু তাঁর পিতা হাইনরিখ স্টাইনারের চিকিৎসা করেন। মিরাকিউরল প্রয়োগের ফলে মৃত্যুপথযাত্রী অধ্যাপক দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।

দ্বিতীয় ঘটনা : তাঁর অসাধারণ চিকিৎসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই নাৎসি নেতা হের্ গোয়রিং-এর লোকেরা শঙ্কুকে জোর করে কারিনহলে নিয়ে যায়।

তৃতীয় ঘটনা : গোয়রিং নিজের অসুখ সারানোর জন্য মিরাকিউরল দাবি করেন। শঙ্কু বুদ্ধি করে স্টাইনারের পরিবারকে নিরাপদে চলে যাওয়ার শর্ত দেন।

চতুর্থ ঘটনা : গোয়রিং শর্ত মেনে চারটি বড়ি নেন। তাঁর অনুচর এরিখও নিজের রোগ সারানোর জন্য আরও চারটি বড়ি নেয়।

শেষ পরিণতি : শঙ্কু জানতেন না যে তাঁর মিরাকিউরলের শিশিতে আসল ওষুধ নেই। সন্ডার্স গোপনে সেগুলির পরিবর্তে ঘুমের বড়ি রেখেছিলেন। ফলে গোয়রিং ও এরিখ ঘুমিয়ে পড়ে এবং শঙ্কু পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।

তাৎপর্য : একই দিনে একজন মহৎ মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো এবং দুই নিষ্ঠুর নাৎসিকে বোকা বানিয়ে পালিয়ে আসার অভিজ্ঞতা শঙ্কুর কাছে নিঃসন্দেহে অদ্ভুত ও স্মরণীয় ছিল।


প্রশ্ন — ‘মনের মধ্যে দুটো বিপরীত ভাবের দ্বন্দ্ব চলেছে।’—কীসের দ্বন্দ্ব?

উত্তর :

দ্বন্দ্বের সূচনা : বার্লিনে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল নাৎসি অত্যাচারে মৃত্যুপথযাত্রী অধ্যাপক হাইনরিখ স্টাইনারকে মিরাকিউরলের সাহায্যে সুস্থ করে তোলা। শঙ্কু সেই কাজে সম্পূর্ণ সফল হন।

আনন্দের কারণ : একজন মহৎ, জ্ঞানী ও ভারতপ্রেমী মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পেরে শঙ্কু আনন্দিত হন। তাঁর পিতার মানবসেবার আদর্শও এর মাধ্যমে সার্থক হয়।

বিপরীত অনুভূতি : কিন্তু পরক্ষণেই তাঁকে হের্ গোয়রিং-এর প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। গোয়রিং এবং তার অনুচর এরিখ নিজেদের অসুখ সারানোর জন্য মিরাকিউরল দাবি করে।

অসহায়তা : পরিস্থিতির চাপে পড়ে শঙ্কুকে তাদের হাতে আটটি বড়ি তুলে দিতে হয়। তাঁর মনে হয়, স্বর্ণপর্ণীর মতো মহৌষধ পৃথিবীর এই দুই নিষ্ঠুর মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

মনের অন্ধকার : একদিকে হাইনরিখ স্টাইনারকে সুস্থ করার আনন্দ, অন্যদিকে গোয়রিং ও এরিখের মতো হীন মানুষের চিকিৎসায় নিজের আবিষ্কার ব্যবহৃত হওয়ার বেদনা—এই দুই বিপরীত অনুভূতিই শঙ্কুর মনে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছিল।

সমাধান : পরে সন্ডার্সের বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলের কথা জানতে পেরে শঙ্কু বুঝতে পারেন, গোয়রিং ও এরিখ আসলে মিরাকিউরল নয়, ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল। তখন তাঁর মনের দ্বন্দ্বও দূর হয়ে যায়।


প্রশ্ন — ‘তোমার মহৌষধ বিশ্বের হীনতম প্রাণীর উপকারে আসবে এটা আমি চাইনি, চাইনি, চাইনি!’—প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এখানে কোন্ মহৌষধের কথা বলা হয়েছে? তিনি কী করেছিলেন?

উত্তর :

মহৌষধের পরিচয় : এখানে ‘মহৌষধ’ বলতে স্বর্ণপর্ণীর পাতা থেকে প্রোফেসর শঙ্কুর তৈরি সর্বরোগনাশক ‘মিরাকিউরল’-এর কথা বলা হয়েছে। এই ওষুধের সাহায্যে বহু দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময় সম্ভব হয়েছিল।

সন্ডার্সের আশঙ্কা : শঙ্কু যখন হাইনরিখ স্টাইনারকে চিকিৎসা করার জন্য বার্লিন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর বন্ধু জেরেমি সন্ডার্স অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, শঙ্কু নাৎসি বাহিনীর হাতে পড়তে পারেন এবং মিরাকিউরল তাদের হাতে চলে যেতে পারে।

গোপন ব্যবস্থা : তাই শঙ্কু বার্লিনে যাওয়ার আগে সন্ডার্স গোপনে মিরাকিউরলের শিশি থেকে আসল বড়িগুলি সরিয়ে ফেলেন। তার জায়গায় রেখে দেন ঘুমের ওষুধ।

কার্যকর ফল : পরে গোয়রিং শঙ্কুর কাছ থেকে চারটি এবং তাঁর অনুচর এরিখ আরও চারটি বড়ি নেয়। তারা সেগুলি মিরাকিউরল ভেবেই খায়। কিন্তু আসলে সেগুলি ছিল ঘুমের বড়ি। ফলে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ে এবং শঙ্কু নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারেন।

সন্ডার্সের বক্তব্যের তাৎপর্য : লন্ডনে ফিরে শঙ্কু যখন সব কথা জানতে পারেন, তখন তাঁর মনের সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়। কারণ তাঁর মহৌষধ কোনো নিষ্ঠুর মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়নি।


প্রশ্ন — ‘আমার মন থেকে সমস্ত অন্ধকার দূর হয়ে গেল।’—এখানে কোন্ অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে? তা কীভাবে দূর হয়ে গেল?

উত্তর :

অন্ধকারের কারণ : বার্লিনে হাইনরিখ স্টাইনারকে মিরাকিউরলের সাহায্যে সুস্থ করার পর শঙ্কু এক বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়েন। নাৎসি নেতা হের্ গোয়রিং তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে নিজের অসুখ সারানোর জন্য মিরাকিউরল দাবি করেন।

অনিচ্ছাকৃত চিকিৎসা : পরিস্থিতির চাপে পড়ে শঙ্কুকে গোয়রিং ও তাঁর অনুচর এরিখকে চারটি করে বড়ি দিতে হয়। শঙ্কুর মনে হয়েছিল, তাঁর আবিষ্কৃত মহৌষধ পৃথিবীর দুই হীন ও নিষ্ঠুর মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হল।

মানসিক বেদনা : এই ভাবনাই তাঁর মনের ‘অন্ধকার’। কারণ মিরাকিউরল তাঁর কাছে শুধু একটি ওষুধ ছিল না; এটি ছিল মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে তৈরি এক মহৎ আবিষ্কার।

সন্ডার্সের সত্য প্রকাশ : লন্ডনে ফিরে শঙ্কু যখন সন্ডার্সকে সমস্ত ঘটনা জানান, তখন সন্ডার্স তাঁকে আশ্বস্ত করেন। তিনি জানান, শঙ্কুর আসল মিরাকিউরল বড়িগুলি তিনি আগেই সরিয়ে ফেলেছিলেন।

ঘুমের ওষুধ : গোয়রিং ও এরিখ যে বড়িগুলি খেয়েছিল, সেগুলি আসলে মিরাকিউরল নয়—ঘুমের ওষুধ। তাই তাদের কোনো রোগই মিরাকিউরলের সাহায্যে সারেনি।

অন্ধকারের অবসান : এই সত্য জানতে পেরে শঙ্কু বুঝতে পারেন, তাঁর মহৌষধ কোনো নিষ্ঠুর মানুষের উপকারে লাগেনি। ফলে তাঁর সমস্ত দুশ্চিন্তা ও মনোকষ্ট দূর হয়ে যায়। এবং আনন্দে তিনি সন্ডার্সের হাত শক্ত করে ধরে ফেলেন।

আরও কিছু বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (পরীক্ষায় বিশেষ সুবিধার জন্য)


প্রশ্ন — ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে প্রোফেসর শঙ্কু তাঁর আবিষ্কারের কী কী তালিকা দিয়েছিলেন?

অথবা, প্রোফেসর শঙ্কুর আবিষ্কারগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

উত্তর :

প্রাক্কথন : সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট প্রোফেসর শঙ্কু একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী ও আবিষ্কারক। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা, অনুসন্ধিৎসা এবং মানবকল্যাণের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে দেশ-বিদেশে খ্যাতি এনে দিয়েছিল। আলোচ্য ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে তাঁর বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও পাওয়া যায়।

মিরাকিউরল : শঙ্কুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ‘মিরাকিউরল’। এটি একটি সর্বরোগনাশক বড়ি। তবে শঙ্কু এই আবিষ্কারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব নিজের বলে মনে করেননি; স্বর্ণপর্ণীর সন্ধানদাতা টিক্‌ড়ীবাবার অবদান তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।

অ্যানাইহিলিন পিস্তল : মিরাকিউরলের পর তাঁর উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার ‘অ্যানাইহিলিন পিস্তল’। এটি শত্রুকে হত্যা না করে নিশ্চিহ্ন বা নিস্তেজ করে দিতে পারে। রক্তপাতকে অপছন্দ করতেন শঙ্কু; তাই আত্মরক্ষার জন্যও তিনি এমন একটি অস্ত্র তৈরি করেছিলেন, যার ব্যবহার প্রাণঘাতী নয়।

এয়ারকন্ডিশনিং পিল : জিভের তলায় এই বড়ি রাখলে ঋতুর প্রতিকূলতা শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে না—শীতকালে শরীর উষ্ণ এবং গ্রীষ্মকালে শীতল থাকে।

রিমেমব্রেন : বিস্মৃত বা হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনার জন্য শঙ্কু ‘রিমেমব্রেন’ আবিষ্কার করেন।

অন্যান্য আবিষ্কার : এ ছাড়াও নিদ্রাহীনতা দূর করার জন্য ‘সমনোলিন’, অন্ধকারে সস্তায় উজ্জ্বল আলো পাওয়ার জন্য ‘লুমিনিম্যাক্স’, পৃথিবীর অচেনা ভাষা ইংরেজিতে অনুবাদের জন্য ‘লিঙ্গুয়াগ্রাফ’ এবং পাখিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য ‘অরনিথন’ প্রভৃতি আবিষ্কার তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভার পরিচয় বহন করে।


প্রশ্ন — ‘বাবার এই কথাগুলো আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল।’—বক্তার বাবা কে? এখানে কোন্ কথাগুলোর কথা বলা হয়েছে?

উত্তর :

পরিচয় : উদ্ধৃত অংশটি সত্যজিৎ রায়ের ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পের অন্তর্গত। এখানে ‘বাবা’ বলতে প্রোফেসর শঙ্কুর পিতা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুকে বোঝানো হয়েছে। তিনি গিরিডির একজন খ্যাতনামা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ছিলেন।

দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি : ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু সারাজীবন বহু দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা বিনা পয়সায় করেছিলেন। চিকিৎসক হিসেবে প্রচুর উপার্জনের সুযোগ থাকলেও তিনি অর্থলোভী ছিলেন না।

অর্থের প্রকৃত মূল্য : তিনি মনে করতেন, স্বচ্ছন্দ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সামর্থ্য থাকলেই অঢেল অর্থ উপার্জন করে যাওয়ার মধ্যে জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নেই।

মানবসেবার আদর্শ : যেসব মানুষ দু-বেলা দু-মুঠো অন্নের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে, অথবা কোনো কারণে উপার্জন করতে পারে না, তাদের দুঃখ যদি সামান্যও লাঘব করা যায়, তবে তার চেয়ে বড়ো আনন্দ আর কিছু হতে পারে না—এই মানবিক আদর্শই তিনি পুত্রের সামনে তুলে ধরেছিলেন।

প্রভাব : পিতার এই কথাগুলি শঙ্কুর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তীকালে তাঁর আবিষ্কার ও চিকিৎসাবোধের মধ্যেও এই মানবকল্যাণের আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে।


প্রশ্ন — ‘এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে মুহূর্তের জন্য আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।’—কোন্ দৃশ্য? এরপরে কী হয়েছিল?

উত্তর :

ঘটনার প্রেক্ষাপট : সত্যজিৎ রায়ের ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে প্রোফেসর শঙ্কু একদিন গিরিডিতে নিজের বাড়িতে ফিরে বাবার ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানেই তিনি এমন একটি দৃশ্য দেখেছিলেন, যা তাঁকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দেয়।

অদ্ভুত দৃশ্য : তাঁর বাবা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু কাজের টেবিলের পাশে মেঝেতে চিত হয়ে পড়েছিলেন। সদা কর্মব্যস্ত চিকিৎসক বাবাকে এই অবস্থায় আগে কখনও দেখেননি শঙ্কু। তাই দৃশ্যটি তাঁর কাছে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও আতঙ্কজনক মনে হয়।

পরবর্তী ঘটনা : শঙ্কু তৎক্ষণাৎ বাবার কাছে ছুটে যান এবং নাড়ি পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন যে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের খবর পাঠানো হয়। তবে চিকিৎসক আসার আগেই তাঁর বাবার জ্ঞান ফিরে আসে।

বাবার অসুখ : জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু জানান, এর আগেও দু-বার তাঁর এমন হয়েছিল। হঠাৎ হৃদ্যন্ত্রের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই রোগের নাম ‘হার্টব্লক’। এর কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই বলেও তিনি জানান।

পরিণতি : এই ঘটনার প্রায় দেড় বছর পরে মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু হার্টব্লক রোগে মৃত্যুবরণ করেন।


প্রশ্ন — ‘সেদিনই রাত্রে বাবা আমাকে একটা আশ্চর্য ঘটনা বলেন।’—এখানে কোন্ দিনের কথা বলা হয়েছে? আশ্চর্য ঘটনাটি কী?

উত্তর :

উদ্দিষ্ট দিন : এখানে সেই দিনের কথা বলা হয়েছে, যেদিন প্রোফেসর শঙ্কু তাঁর বাবার মৃত্যুর তিন দিন আগে গিরিডির বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন।

টিক্‌ড়ীবাবার আগমন : সেই রাতে ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু পুত্রকে এক আশ্চর্য ঘটনার কথা জানান। উশ্রী নদীর ওপারের একটি গ্রামে টিক্‌ড়ীবাবা নামে এক সাধু থাকতেন। তিনি গাছতলায় বসে সাধনা করতেন।

চিকিৎসার ঘটনা : একসময় টিক্‌ড়ীবাবা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হলে তাঁর শিষ্যরা তাঁকে ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুর কাছে নিয়ে আসে। চিকিৎসার সময় টিক্‌ড়ীবাবা পালটা জানতে চান—যিনি তাঁর চিকিৎসা করছেন, তাঁর নিজের চিকিৎসা হবে কীভাবে?

স্বর্ণপর্ণীর কথা : ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু নিজের রোগের কোনো চিকিৎসা নেই জানালে টিক্‌ড়ীবাবা ‘সোনেপত্তী’ বা স্বর্ণপর্ণীর কথা বলেন। তাঁর মতে, এই গাছের সাহায্যে শঙ্কুর দুরারোগ্য ব্যাধিও সারানো সম্ভব।

গাছটির অবস্থান : টিক্‌ড়ীবাবা জানান, কসৌলি থেকে প্রায় তিন ক্রোশ উত্তরে একটি ভাঙা চামুণ্ডা মন্দিরের পিছনের জঙ্গলে ঝরনার ধারে স্বর্ণপর্ণীর গাছ রয়েছে। ‘চরকসংহিতা’-তেও এই গাছের উল্লেখ আছে বলে তিনি জানান।

তাৎপর্য : টিক্‌ড়ীবাবার এই আশ্চর্য জ্ঞান এবং আধুনিক যুগে লুপ্তপ্রায় স্বর্ণপর্ণীর অস্তিত্বের কথা জানতে পারাই শঙ্কুর কাছে ঘটনাটিকে আশ্চর্য করে তুলেছিল।


প্রশ্ন — ‘এটাই যে স্বর্ণপর্ণী তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’—কে কীভাবে স্বর্ণপর্ণী পেয়েছিলেন?

উত্তর :

সন্ধানের সূচনা : প্রোফেসর শঙ্কু তাঁর পিতা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুর কাছ থেকে টিক্‌ড়ীবাবার মুখে শোনা স্বর্ণপর্ণীর কথা জানতে পারেন। গাছটির অসাধারণ ঔষধিগুণের কথা শুনে তাঁর মনে প্রবল কৌতূহল জন্মায়।

কসৌলির পথে : পিতার মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধশান্তি সম্পন্ন করে শঙ্কু স্বর্ণপর্ণীর সন্ধানে রওনা হন। গিরিডি থেকে কালকা এবং সেখান থেকে প্রায় ছেচল্লিশ কিলোমিটার দূরে কসৌলিতে পৌঁছোন।

চামুণ্ডার মন্দির : কসৌলির একটি হোটেলে উঠে ম্যানেজারের কাছ থেকে টিক্‌ড়ীবাবা কথিত চামুণ্ডার মন্দিরের অবস্থান জেনে নেন। সেখানে গাড়িতে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় ম্যানেজারের সাহায্যে ঘোড়ার ব্যবস্থা করেন।

জঙ্গলে প্রবেশ : ঘোড়ার মালিক ছোটেলালকে সঙ্গে নিয়ে শঙ্কু মন্দিরের দিকে এগিয়ে যান। ঘোড়া রেখে তাঁরা জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করেন। প্রায় পনেরো মিনিট পর শঙ্কুর কানে ঝরনার শব্দ আসে।

স্বর্ণপর্ণীর সন্ধান : ঘন অন্ধকারের মধ্যে সূর্যের এক ফালি আলো এসে পড়েছিল একটি হলুদাভ পাতা-ভরা গাছের ওপর। গাছটির স্বর্ণাভ পাতা দেখে শঙ্কু বুঝতে পারেন—এই সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘সোনেপত্তী’ বা স্বর্ণপর্ণী।


প্রশ্ন — ‘এইসময় একটা ঘটনা ঘটল, যেটা বলা যেতে পারে আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।’—এখানে কোন্ ঘটনার কথা বলা হয়েছে?

উত্তর :

ঘটনার সূচনা : প্রোফেসর শঙ্কু ‘নেচার’ পত্রিকায় জীবতত্ত্ব সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধ পড়ে তার লেখক জেরেমি সন্ডার্সকে চিঠি লেখেন। চিঠির উত্তর দিতে গিয়ে সন্ডার্স নিজের ভারত-সম্পর্কের কথা জানান। ক্রমে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

সন্ডার্সের বিপদ : কিছুদিন পরে সন্ডার্সের স্ত্রী শঙ্কুকে জানান যে সন্ডার্সের যকৃতে ক্যানসার ধরা পড়েছে। চিকিৎসকদের মতে তাঁর বাঁচার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

মিরাকিউরলের প্রয়োগ : বন্ধুর এই দুরবস্থার কথা শুনে শঙ্কু তাঁকে স্বর্ণপর্ণী থেকে তৈরি মিরাকিউরলের দশটি বড়ি পাঠিয়ে দেন। নির্দেশ দেন, প্রথমে দুটি বড়ি খাওয়াতে হবে; তাতে কাজ না হলে পর্যায়ক্রমে আরও বড়ি খাওয়ানো যেতে পারে।

অলৌকিক ফল : প্রায় দেড় মাস পরে সন্ডার্স সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে নিজেই শঙ্কুর কাছে এসে উপস্থিত হন। এই অসাধারণ সাফল্য মিরাকিউরলের কার্যকারিতা প্রমাণ করে।

জীবনের মোড় : সন্ডার্স শঙ্কুকে লন্ডনে নিয়ে যেতে চান এবং তাঁর আবিষ্কারের কথা বিশ্বের বিজ্ঞানীমহলে প্রকাশ করতে উদ্যোগী হন। এর ফলে শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তাই ঘটনাটিকে তিনি তাঁর জীবনের ‘মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া’ ঘটনা বলেছেন।


প্রশ্ন — ‘এমন সময় বিদ্যুৎঝলকের মতো এই ওষুধের একটা নাম আমার মাথায় এসে গেল…’—কোন্ ওষুধের কথা বলা হয়েছে? কীভাবে বক্তা তা আবিষ্কার করেছিলেন?

উত্তর :

ওষুধের পরিচয় : এখানে প্রোফেসর শঙ্কুর আবিষ্কৃত বিখ্যাত সর্বরোগনাশক ওষুধ ‘মিরাকিউরল’-এর কথা বলা হয়েছে। এর পূর্ণ অর্থ ‘মিরাকল কিওর ফর অল কমপ্লেন্টস্’—অর্থাৎ সমস্ত রোগের আশ্চর্য নিরাময়।

স্বর্ণপর্ণীর সন্ধান : টিক্‌ড়ীবাবার কাছ থেকে স্বর্ণপর্ণীর কথা শুনে শঙ্কু কসৌলির জঙ্গলে গিয়ে গাছটি খুঁজে বের করেন। গিরিডিতে ফিরে তিনি সেটিকে নিজের বাগানে রোপণ করেন এবং আরও গাছ তৈরির চেষ্টা শুরু করেন।

প্রাথমিক পরীক্ষা : উকিল জয়গোপাল মিত্রের উদরী রোগে স্বর্ণপর্ণীর পাতার প্রয়োগ করে শঙ্কু প্রথম এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন। ফল আশ্চর্যজনক হওয়ায় তাঁর কাছে আরও কঠিন রোগের রোগী আসতে থাকে এবং সেখানেও একই সাফল্য পাওয়া যায়।

বড়ি তৈরির পরিকল্পনা : শুকনো পাতা গুঁড়ো করে দুধের সঙ্গে খাওয়ানোর পদ্ধতিটি শঙ্কুর কাছে সুবিধাজনক মনে হয়নি। তাই তিনি স্বর্ণপর্ণীর নির্যাস থেকে সহজে সেবনযোগ্য বড়ি তৈরির পরিকল্পনা করেন।

মিরাকিউরলের জন্ম : প্রায় এক মাসের প্রচেষ্টায় তিনি বড়ি তৈরিতে সফল হন। এরপরই আকস্মিকভাবে তাঁর মনে আসে নামটি—‘মিরাকিউরল’। এইভাবেই স্বর্ণপর্ণীর পাতার অসাধারণ ঔষধিগুণ একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের রূপ লাভ করে।


প্রশ্ন — ‘আমার বক্তৃতার এত লোক হবে সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি।’—কোন্ বক্তৃতার কথা বলা হয়েছে? বক্তৃতার বর্ণনা দাও। তার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল?

উত্তর :

বক্তৃতার পরিচয় : এখানে লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে মিরাকিউরল সম্পর্কে প্রোফেসর শঙ্কুর দেওয়া বক্তৃতার কথা বলা হয়েছে। জেরেমি সন্ডার্সের উদ্যোগেই এই বক্তৃতার আয়োজন হয়েছিল।

বক্তৃতার বিষয়বস্তু : শঙ্কু বক্তৃতায় ভারতীয় আয়ুর্বেদচর্চার ঐতিহ্য, চরক ও সুশ্রুতের চিকিৎসাশাস্ত্র, তাঁর পিতা ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুর চিকিৎসাবোধ এবং টিক্‌ড়ীবাবার কাছ থেকে স্বর্ণপর্ণীর সন্ধান পাওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন।

আবিষ্কারের বিবরণ : তিনি কসৌলির জঙ্গল থেকে স্বর্ণপর্ণী সংগ্রহ, তার ঔষধিগুণ পরীক্ষা এবং পরবর্তীকালে মিরাকিউরল বড়ি তৈরির সম্পূর্ণ বিবরণ শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন।

প্রশ্নের উত্তর : বক্তৃতার মধ্যেই তিনি স্পষ্ট করে দেন যে মিরাকিউরল তিনি বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করতে চান না। পাশাপাশি লন্ডনে থেকে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও তাঁর নেই।

প্রতিক্রিয়া : বক্তৃতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল হাততালিতে সভাকক্ষ মুখর হয়ে ওঠে। বহু মানুষ তাঁর সঙ্গে হাত মেলান এবং অভিনন্দন জানান। পরদিন লন্ডনের বিভিন্ন সংবাদপত্রে ছবি-সহ তাঁর বক্তৃতার খবর প্রকাশিত হয়। এই বিপুল সাড়া দেখে শঙ্কু নিজেও বিস্মিত হয়ে যান।


প্রশ্ন — ‘তোমার আসার কারণটা জানতে পারি কি?’—কে, কাকে এই প্রশ্ন করেছিলেন? তাঁর আসার কারণ কী ছিল?

উত্তর :

প্রশ্নকর্তা : এই প্রশ্নটি জেরেমি সন্ডার্স নরবার্ট স্টাইনারকে করেছিলেন।

নরবার্টের পরিচয় : নরবার্ট স্টাইনার ছিলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক হাইনরিখ স্টাইনারের পুত্র। তাঁর পিতা ছিলেন ইহুদি এবং নাৎসি শাসনের সময় জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর চলা অত্যাচারের শিকার।

অত্যাচারের ঘটনা : হাইনরিখ স্টাইনার ‘হাইল হিটলার’ বলতে অস্বীকার করায় নাৎসি গুপ্ত পুলিশ তাঁকে নির্মমভাবে প্রহার করে। তিনি গুরুতর আহত হয়ে পড়েন। কিন্তু ইহুদি হওয়ার কারণে বার্লিনের হাসপাতালগুলিও তাঁর চিকিৎসার জন্য দরজা বন্ধ করে দেয়।

নরবার্টের উদ্দেশ্য : সংবাদপত্রে প্রোফেসর শঙ্কু এবং তাঁর মিরাকিউরল বড়ির কথা জানতে পেরে নরবার্ট সন্ডার্সের কাছে আসেন। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শঙ্কুর সাহায্যে তাঁর মৃত্যুপথযাত্রী পিতাকে সুস্থ করে তোলা।

পরবর্তী ঘটনা : নরবার্টের অনুরোধে শঙ্কু মানবিক দায়িত্ববোধে সাড়া দেন। পিতার জীবন রক্ষার জন্য তিনি বিপজ্জনক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও বার্লিনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।


প্রশ্ন — ‘একজন মনীষীর ত্রাণকর্তা হতে পারলে তোর জীবন ধন্য হবে।’—কোন্ প্রসঙ্গে বক্তার এই কথা স্মরণে আসে? ‘মনীষীর ত্রাণকর্তা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর :

প্রসঙ্গ : নরবার্ট স্টাইনার তাঁর পিতা হাইনরিখ স্টাইনারকে বাঁচানোর জন্য প্রোফেসর শঙ্কুর কাছে সাহায্য চান। নাৎসি অত্যাচারে আহত পিতার জীবন তখন বিপন্ন। এই অবস্থায় শঙ্কুর মনে তাঁর পিতার উপদেশের কথা ভেসে ওঠে।

মনীষীর পরিচয় : হাইনরিখ স্টাইনার ছিলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট ভারততত্ত্ববিদ। বেদ, উপনিষদ ও সংস্কৃত সাহিত্যের বহু রচনা তিনি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল এবং তিনি বহুবার ভারতবর্ষে এসেছিলেন।

শঙ্কুর পিতার আদর্শ : ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কু বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা অন্যের দুঃখ লাঘবের মধ্যে। একজন মহৎ ও জ্ঞানী মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারা জীবনের বড়ো অর্জন।

শঙ্কুর সিদ্ধান্ত : তাই সন্ডার্স যখন তাঁর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বার্লিনে যেতে নিষেধ করেন, তখনও শঙ্কু পিছু হটেননি। তিনি মনে করেছিলেন, হাইনরিখ স্টাইনারের মতো একজন ভারতপ্রেমী মনীষীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারলে তাঁর পিতার আদর্শই সার্থক হবে।

তাৎপর্য : ‘মনীষীর ত্রাণকর্তা’ বলতে এখানে একজন মহৎ, জ্ঞানী ও ভারতপ্রেমী মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধারকারীকে বোঝানো হয়েছে।


প্রশ্ন — ‘আমি তো মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলাম, কারণ বেঁচে থেকে তো আমার কোনো লাভ নেই!’—বক্তা কে? তাঁর এই মন্তব্যের কারণ কী? শঙ্কু তাঁকে কীভাবে সাহায্য করেছিলেন?

উত্তর :

বক্তার পরিচয় : উদ্ধৃতিটির বক্তা হলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক হাইনরিখ স্টাইনার।

মৃত্যুর প্রতি আকাঙ্ক্ষার কারণ : নাৎসি বাহিনীর অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন স্টাইনার। ‘হাইল হিটলার’ বলতে অস্বীকার করায় তাঁকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়। তাঁর মাথা ফেটে যায়, সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে পড়ে এবং তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

নিরুপায় অবস্থা : ইহুদি হওয়ার কারণে কোনো হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা হচ্ছিল না। নিজের দেশেই তিনি পরবাসীর মতো জীবনযাপন করছিলেন। তাঁর গবেষণা ও সংস্কৃতচর্চার ক্ষেত্রও নাৎসি শাসনের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। ফলে বেঁচে থাকার ইচ্ছাও তাঁর প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল।

শঙ্কুর চিকিৎসা : প্রোফেসর শঙ্কু তাঁকে মিরাকিউরল বড়ি খাওয়ান। আশ্চর্যজনকভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই স্টাইনার সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মানসিক পুনর্জাগরণ : শুধু শারীরিক চিকিৎসাই নয়, শঙ্কু তাঁকে মানসিকভাবেও নতুন করে বাঁচার প্রেরণা দেন। জার্মানি ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে আবার নিজের গবেষণা শুরু করার পরামর্শ দেন।

ফলাফল : মিরাকিউরলের চিকিৎসা এবং শঙ্কুর মানবিক সাহচর্যে স্টাইনার মৃত্যুর হতাশা কাটিয়ে নতুন জীবনের দিকে ফিরে আসেন।


প্রশ্ন — ‘এটা যে একটা প্রাসাদ তাতে সন্দেহ নেই, তবে প্রাচীন নয়।’—কোন্ প্রাসাদ? প্রাসাদের বর্ণনা দাও।

উত্তর :

প্রাসাদের পরিচয় : এখানে হের্ গোয়রিং-এর প্রাসাদ ‘কারিনহল’-এর কথা বলা হয়েছে। গোয়রিং ছিলেন নাৎসি জার্মানির অন্যতম প্রধান নেতা এবং সামরিক শক্তির প্রধান ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রথম স্ত্রীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছিল।

বাহ্যিক সৌন্দর্য : কারিনহল ছিল বিশাল ও ঐশ্বর্যময়। প্রাসাদের সামনে বিস্তীর্ণ বাগান ছিল। সেখানে ফুলের কেয়ারি, লিলি ফুল এবং শ্বেতপাথরের নানা মূর্তি শোভা পেত।

প্রবেশপথ : প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করলেই একটি বিশাল ঘর পড়ত। তার দৈর্ঘ্য প্রায় পঞ্চাশ গজ। ছাদ থেকে ঝুলত বৃহৎ ঝাড়লণ্ঠন। দেয়ালে বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা তৈলচিত্র গিল্টি করা ফ্রেমে সাজানো ছিল।

অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা : ঘরের এক প্রান্তে দোতলায় ওঠার জন্য ঘোরানো সিঁড়ি ছিল। এরপর ছিল রিসেপশন রুম। সেখানে বড়ো বড়ো সোফা, কাউচ, বাহারি চেয়ার, প্রকাণ্ড টেবিল ও টেলিফোন প্রভৃতি ছিল।

তাৎপর্য : প্রাসাদের বিপুল ঐশ্বর্য গোয়রিং-এর ক্ষমতা, সম্পদ ও আত্মম্ভরিতার পরিচয় বহন করলেও তার চাকচিক্যের আড়ালে নাৎসি শাসনের নিষ্ঠুরতার এক গভীর বৈপরীত্যও প্রকাশ পেয়েছে।


প্রশ্ন — ‘লোকটার প্রতি আমার অশ্রদ্ধা ক্রমেই বাড়ছিল।’—লোকটা কে? তাঁর চরিত্র সম্পর্কে কী জানা যায়?

উত্তর :

লোকটির পরিচয় : এখানে ‘লোকটা’ বলতে নাৎসি জার্মানির সামরিক প্রধান হের্ গোয়রিংকে বোঝানো হয়েছে। তিনি হিটলারের পরেই জার্মানির অন্যতম ক্ষমতাবান ব্যক্তি ছিলেন।

অহংকার : গোয়রিং নিজের ক্ষমতা ও মর্যাদা সম্পর্কে অত্যন্ত অহংকারী ছিলেন। নিজের প্রাসাদ কারিনহল, সামরিক ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তাঁর প্রবল আত্মগর্ব ছিল।

নিষ্ঠুরতা : ইহুদিদের প্রতি তাঁর গভীর বিদ্বেষ ছিল। হাইনরিখ স্টাইনারের মতো একজন পণ্ডিত মানুষকেও তিনি শুধু জাতিগত পরিচয়ের কারণে ঘৃণা করতেন।

স্বার্থপরতা : মিরাকিউরলের অসাধারণ ক্ষমতার কথা শুনে তিনি মানবকল্যাণের কথা না ভেবে প্রথমেই নিজের অসুখ সারানোর কথা ভাবেন। এমনকি ওষুধটি জার্মানির সাধারণ মানুষের জন্য নয়, কেবল নাৎসি দলের জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনাও তাঁর মনে ছিল।

লোভ : প্রচণ্ড স্থূলকায় ও অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর খাদ্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। বারবার স্যান্ডউইচ ও বিয়ার খাওয়ার অভ্যাস তাঁর লোভী স্বভাবের পরিচয় দেয়।

বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা : নিজেকে অত্যন্ত চালাক মনে করলেও শঙ্কুর বুদ্ধির কাছে তিনি পরাস্ত হন। ঘুমের ওষুধকে মিরাকিউরল ভেবে খেয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন।

মূল্যায়ন : সব মিলিয়ে গোয়রিং চরিত্রটি অহংকার, নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা, লোভ এবং আত্মম্ভরিতার এক অন্ধকার প্রতিচ্ছবি।


প্রশ্ন — ‘আমি মনে মনে স্থির করে নিয়েছিলাম, এ অবস্থায় যা বললে কাজ হবে, সেটাই বলব।’—কোন্ অবস্থার কথা বলা হয়েছে? বক্তা কী বলেছিলেন?

উত্তর :

পরিস্থিতি : হাইনরিখ স্টাইনারের চিকিৎসা করার পর প্রোফেসর শঙ্কুকে নাৎসি নেতা হের্ গোয়রিং তাঁর প্রাসাদ কারিনহলে ধরে নিয়ে যান। গোয়রিং নিজের অসুখ সারানোর জন্য মিরাকিউরল দাবি করেন।

শঙ্কুর শর্ত : শঙ্কু বুঝতে পারেন, সরাসরি প্রতিবাদ করে এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। তাই তিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন।

গোয়রিং-এর হুমকি : গোয়রিং পিস্তল দেখিয়ে মিরাকিউরল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। শঙ্কু বুঝতে পারেন, তাঁকে এমন কথা বলতে হবে যা গোয়রিংকে নিজের স্বার্থেই তাঁর শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করবে।

শঙ্কুর বক্তব্য : তিনি বলেন, মিরাকিউরল একটি বিশেষ ওষুধ এবং অনিচ্ছায় বা জোর করে কাউকে এই ওষুধ খাওয়ালে তার বিপরীত ফল হতে পারে। তাই জোর করে ওষুধ নেওয়ার কোনো অর্থ নেই।

শর্ত : শঙ্কু জানান, স্টাইনারের পরিবারকে নিরাপদে প্যারিসে চলে যাওয়ার সুযোগ দিলে তিনি স্বেচ্ছায় গোয়রিংকে ওষুধ দেবেন।

পরিণতি : নিজের রোগ সারানোর প্রবল আকাঙ্ক্ষায় গোয়রিং শেষ পর্যন্ত শঙ্কুর শর্ত মেনে নেন। ফলে শঙ্কু নিজের উদ্দেশ্য সফল করতে সক্ষম হন।


প্রশ্ন — ‘কী অদ্ভুত অভিজ্ঞতা!’—এখানে কার অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে? তাঁর সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার বিবরণ দাও।

উত্তর :

উদ্দিষ্ট ব্যক্তি : এখানে প্রোফেসর শঙ্কুর অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। লন্ডন থেকে বার্লিনে যাওয়ার পর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি একের পর এক বিচিত্র ঘটনার মুখোমুখি হন।

প্রথম ঘটনা : নরবার্ট স্টাইনারের সঙ্গে বার্লিনে পৌঁছে শঙ্কু তাঁর পিতা হাইনরিখ স্টাইনারের চিকিৎসা করেন। মিরাকিউরল প্রয়োগের ফলে মৃত্যুপথযাত্রী অধ্যাপক দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।

দ্বিতীয় ঘটনা : তাঁর অসাধারণ চিকিৎসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই নাৎসি নেতা হের্ গোয়রিং-এর লোকেরা শঙ্কুকে জোর করে কারিনহলে নিয়ে যায়।

তৃতীয় ঘটনা : গোয়রিং নিজের অসুখ সারানোর জন্য মিরাকিউরল দাবি করেন। শঙ্কু বুদ্ধি করে স্টাইনারের পরিবারকে নিরাপদে চলে যাওয়ার শর্ত দেন।

চতুর্থ ঘটনা : গোয়রিং শর্ত মেনে চারটি বড়ি নেন। তাঁর অনুচর এরিখও নিজের রোগ সারানোর জন্য আরও চারটি বড়ি নেয়।

শেষ পরিণতি : শঙ্কু জানতেন না যে তাঁর মিরাকিউরলের শিশিতে আসল ওষুধ নেই। সন্ডার্স গোপনে সেগুলির পরিবর্তে ঘুমের বড়ি রেখেছিলেন। ফলে গোয়রিং ও এরিখ ঘুমিয়ে পড়ে এবং শঙ্কু পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।

তাৎপর্য : একই দিনে একজন মহৎ মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো এবং দুই নিষ্ঠুর নাৎসিকে বোকা বানিয়ে পালিয়ে আসার অভিজ্ঞতা শঙ্কুর কাছে নিঃসন্দেহে অদ্ভুত ও স্মরণীয় ছিল।


প্রশ্ন — ‘মনের মধ্যে দুটো বিপরীত ভাবের দ্বন্দ্ব চলেছে।’—কীসের দ্বন্দ্ব?

উত্তর :

দ্বন্দ্বের সূচনা : বার্লিনে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল নাৎসি অত্যাচারে মৃত্যুপথযাত্রী অধ্যাপক হাইনরিখ স্টাইনারকে মিরাকিউরলের সাহায্যে সুস্থ করে তোলা। শঙ্কু সেই কাজে সম্পূর্ণ সফল হন।

আনন্দের কারণ : একজন মহৎ, জ্ঞানী ও ভারতপ্রেমী মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পেরে শঙ্কু আনন্দিত হন। তাঁর পিতার মানবসেবার আদর্শও এর মাধ্যমে সার্থক হয়।

বিপরীত অনুভূতি : কিন্তু পরক্ষণেই তাঁকে হের্ গোয়রিং-এর প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। গোয়রিং এবং তার অনুচর এরিখ নিজেদের অসুখ সারানোর জন্য মিরাকিউরল দাবি করে।

অসহায়তা : পরিস্থিতির চাপে পড়ে শঙ্কুকে তাদের হাতে আটটি বড়ি তুলে দিতে হয়। তাঁর মনে হয়, স্বর্ণপর্ণীর মতো মহৌষধ পৃথিবীর এই দুই নিষ্ঠুর মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

মনের অন্ধকার : একদিকে হাইনরিখ স্টাইনারকে সুস্থ করার আনন্দ, অন্যদিকে গোয়রিং ও এরিখের মতো হীন মানুষের চিকিৎসায় নিজের আবিষ্কার ব্যবহৃত হওয়ার বেদনা—এই দুই বিপরীত অনুভূতিই শঙ্কুর মনে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছিল।

সমাধান : পরে সন্ডার্সের বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলের কথা জানতে পেরে শঙ্কু বুঝতে পারেন, গোয়রিং ও এরিখ আসলে মিরাকিউরল নয়, ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল। তখন তাঁর মনের দ্বন্দ্বও দূর হয়ে যায়।


প্রশ্ন — ‘তোমার মহৌষধ বিশ্বের হীনতম প্রাণীর উপকারে আসবে এটা আমি চাইনি, চাইনি, চাইনি!’—প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এখানে কোন্ মহৌষধের কথা বলা হয়েছে? তিনি কী করেছিলেন?

উত্তর :

মহৌষধের পরিচয় : এখানে ‘মহৌষধ’ বলতে স্বর্ণপর্ণীর পাতা থেকে প্রোফেসর শঙ্কুর তৈরি সর্বরোগনাশক ‘মিরাকিউরল’-এর কথা বলা হয়েছে। এই ওষুধের সাহায্যে বহু দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময় সম্ভব হয়েছিল।

সন্ডার্সের আশঙ্কা : শঙ্কু যখন হাইনরিখ স্টাইনারকে চিকিৎসা করার জন্য বার্লিন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর বন্ধু জেরেমি সন্ডার্স অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, শঙ্কু নাৎসি বাহিনীর হাতে পড়তে পারেন এবং মিরাকিউরল তাদের হাতে চলে যেতে পারে।

গোপন ব্যবস্থা : তাই শঙ্কু বার্লিনে যাওয়ার আগে সন্ডার্স গোপনে মিরাকিউরলের শিশি থেকে আসল বড়িগুলি সরিয়ে ফেলেন। তার জায়গায় রেখে দেন ঘুমের ওষুধ।

কার্যকর ফল : পরে গোয়রিং শঙ্কুর কাছ থেকে চারটি এবং তাঁর অনুচর এরিখ আরও চারটি বড়ি নেয়। তারা সেগুলি মিরাকিউরল ভেবেই খায়। কিন্তু আসলে সেগুলি ছিল ঘুমের বড়ি। ফলে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ে এবং শঙ্কু নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারেন।

সন্ডার্সের বক্তব্যের তাৎপর্য : লন্ডনে ফিরে শঙ্কু যখন সব কথা জানতে পারেন, তখন তাঁর মনের সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়। কারণ তাঁর মহৌষধ কোনো নিষ্ঠুর মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়নি।


প্রশ্ন — ‘আমার মন থেকে সমস্ত অন্ধকার দূর হয়ে গেল।’—এখানে কোন্ অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে? তা কীভাবে দূর হয়ে গেল?

উত্তর :

অন্ধকারের কারণ : বার্লিনে হাইনরিখ স্টাইনারকে মিরাকিউরলের সাহায্যে সুস্থ করার পর শঙ্কু এক বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়েন। নাৎসি নেতা হের্ গোয়রিং তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে নিজের অসুখ সারানোর জন্য মিরাকিউরল দাবি করেন।

অনিচ্ছাকৃত চিকিৎসা : পরিস্থিতির চাপে পড়ে শঙ্কুকে গোয়রিং ও তাঁর অনুচর এরিখকে চারটি করে বড়ি দিতে হয়। শঙ্কুর মনে হয়েছিল, তাঁর আবিষ্কৃত মহৌষধ পৃথিবীর দুই হীন ও নিষ্ঠুর মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হল।

মানসিক বেদনা : এই ভাবনাই তাঁর মনের ‘অন্ধকার’। কারণ মিরাকিউরল তাঁর কাছে শুধু একটি ওষুধ ছিল না; এটি ছিল মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে তৈরি এক মহৎ আবিষ্কার।

সন্ডার্সের সত্য প্রকাশ : লন্ডনে ফিরে শঙ্কু যখন সন্ডার্সকে সমস্ত ঘটনা জানান, তখন সন্ডার্স তাঁকে আশ্বস্ত করেন। তিনি জানান, শঙ্কুর আসল মিরাকিউরল বড়িগুলি তিনি আগেই সরিয়ে ফেলেছিলেন।

ঘুমের ওষুধ : গোয়রিং ও এরিখ যে বড়িগুলি খেয়েছিল, সেগুলি আসলে মিরাকিউরল নয়—ঘুমের ওষুধ। তাই তাদের কোনো রোগই মিরাকিউরলের সাহায্যে সারেনি।

অন্ধকারের অবসান : এই সত্য জানতে পেরে শঙ্কু বুঝতে পারেন, তাঁর মহৌষধ কোনো নিষ্ঠুর মানুষের উপকারে লাগেনি। ফলে তাঁর সমস্ত দুশ্চিন্তা ও মনোকষ্ট দূর হয়ে যায়। এবং আনন্দে তিনি সন্ডার্সের হাত শক্ত করে ধরে ফেলেন।

 
 
### ড. অনিশ রায়
 
 
 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top