সিনেমা কথা-১

সেই প্রথম ছবি : চলমান আলোর জন্মকথা

অনিশ রায় 
 

মানুষের স্মৃতির ভিতর কিছু ছবি থাকে, যাদের কোনো জন্মদিন নেই। তারা কোনো বিশেষ সময়ের সম্পত্তি নয়। তারা সময়ের ভিতর দিয়ে আমাদের কাছে ফিরে ফিরে আসে। শৈশবে অন্ধকার ঘরে দেখা (বা টেলিভিশন নামক বাক্সের মধ্যে দেখা) চার্লি চ্যাপলিনের ছোট্ট টুপি, হাতে বাঁকানো লাঠি আর অসম্ভব এক হাঁটা; লরেল ও হার্ডির শরীরী কৌতুক; গুপী-বাঘার অলৌকিক গান; কাশবনের ভিতর দিয়ে অপু-দুর্গার ছুটে যাওয়া; সোনার কেল্লার মরুভূমির হলুদ আলো; পাহাড়ের ঢালে The Sound of Music-এর গান; স্পাইডারম্যানের জালের ভিতর দিয়ে নগরীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া; হ্যারি পটারের অন্ধকার জাদুবিশ্ব—এরা প্রত্যেকে আলাদা ইতিহাস, আলাদা ভূগোল, আলাদা ভাষা ও আলাদা নন্দনবোধের সন্তান, অথচ তাদের ভিতরে একটি আশ্চর্য আত্মীয়তা আছে। তারা আমাদের চোখের সামনে এমন এক পৃথিবী নির্মাণ করে, যা আমরা একই সঙ্গে সত্য বলে জানি এবং মিথ্যা বলেও মানি। আমরা জানি পর্দার ওই মানুষ আমাদের মতো মানুষ নয়। তবু তার দুঃখে কাঁদি। জানি ট্রেনটি আমাদের দিকে আসছে না, তবু তার আগমনে শরীর সরে যেতে চায়। জানি মৃত মানুষ ফিরে আসেনি, তবু তার প্রত্যাবর্তনে আমাদের ভিতরের কোনো হারানো দরজা খুলে যায়। এই দ্বৈত অনুভূতিই সম্ভবত সিনেমার প্রথম রহস্য—যা সত্য নয়, তাকে সত্যের মতো অনুভব করা। সিনেমা তাই কেবল ছবি নয়। সিনেমা মানুষের বিশ্বাস করার ক্ষমতার সঙ্গে, তার অবিশ্বাস করার ক্ষমতার এক অদ্ভুত সন্ধি। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে আমরা জানি যে সামনে আলো পড়ছে সাদা পর্দায়, তবু সেই আলোকে আমরা নদী, মানুষ, মৃত্যু, প্রেম, যুদ্ধ, স্মৃতি, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ—সবকিছুর শরীর দান করি। কয়েক ঘণ্টার জন্য আমরা বাস্তবের স্থির সংজ্ঞা থেকে সরে এসে আরেকটি বাস্তবতার নাগরিক হয়ে উঠি।

কিন্তু এই বিপুল জাদুর শুরু কোথায়? আজকের ডিজিটাল সিনেমা, কম্পিউটার-নির্মিত মহাবিশ্ব, ত্রিমাত্রিক ছবি, ভার্চুয়াল ক্যামেরা, মোশন ক্যাপচার কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের বহু আগে—সিনেমার জন্ম হয়েছিল প্রায় নগ্ন অবস্থায়। তার হাতে ছিল না গল্প, সংলাপ, তারকা, সঙ্গীত, বিশেষ প্রভাব কিংবা বিশাল প্রযোজনা। ছিল কেবল আলো, ছায়া এবং গতি। আর এই সামান্য তিনটি শব্দের মধ্যে মানুষের সভ্যতার সেই গভীর স্বপ্ন গোপন ছিল—সময়কে দৃশ্যমান করার স্বপ্ন। স্থির ছবির আবিষ্কার মানুষকে প্রথমবার পৃথিবীর বিশেষ এক মুহূর্তের সঙ্গে এক ধরনের অদ্ভুত চুক্তি সম্পাদন করতে দিয়েছিল। মুখের রেখা, নদীর ঢেউ, শিশুর চোখ, মৃত মানুষের মুখ, যুদ্ধের দৃশ্য—সবকিছুকে এক সমতল পৃষ্ঠে আটকে রাখা সম্ভব হল। ফটোগ্রাফ যেন সময়ের শরীর থেকে একটি ক্ষুদ্র অংশ কেটে নিয়ে তাকে স্থায়ী করে রাখল। কিন্তু সেই স্থায়িত্বের মধ্যেই ছিল তার সীমা। কারণ জীবন কখনও স্থির নয়। মানুষ হাঁটে। ঘোড়া দৌড়ায়। পাখি ডানা মেলে। বাতাসে গাছের পাতা কাঁপে। চোখের পাতা বন্ধ হয়। ঠোঁটে হাসি আসে এবং মিলিয়ে যায়। নদী একই নদী থেকেও প্রতি মুহূর্তে অন্য নদী। অর্থাৎ জীবনকে যদি সত্যিই ধরে রাখতে হয়, তবে শুধু তার আকৃতি ধরে রাখলেই চলবে না; তার সময়কেও ধরে রাখতে হবে। ফটোগ্রাফি তাই মানুষের কাছে শেষ আবিষ্কার হয়ে দাঁড়াল না। উপরন্তু তা আরও গভীর এক প্রশ্নের জন্ম দিল—ছবিকে কি আবার চলানো যায়?

এই প্রশ্নের ভিতরে প্রযুক্তির যতটা ইতিহাস আছে, তার চেয়ে কিন্তু কম নেই পুরাণের। মানুষ বরাবরই মৃত্যুর বিরুদ্ধে স্মৃতি নির্মাণ করেছে। গুহাচিত্রে শিকারী ও হরিণের শরীর আঁকা হয়েছে, মিশরের সমাধিতে মৃতের জীবন পুনর্গঠিত হয়েছে, ভাস্কর্য মানুষের শরীরকে পাথরের মধ্যে স্থায়ী করেছে, প্রতিকৃতি মুখকে সময়ের বাইরে নিয়ে যেতে চেয়েছে। শিল্পের এক গোপন আকাঙ্ক্ষা ছিল—যে চলে গেছে তাকে যেন আবার উপস্থিত করা যায়। সিনেমা সেই প্রাচীন আকাঙ্ক্ষাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে এক নতুন শরীর দিল। এই অর্থে চলচ্চিত্রের জন্ম কেবল বিজ্ঞানের ইতিহাস নয়; তা মানুষের মৃত্যুচেতনা, স্মৃতিচেতনা এবং সময়চেতনারও ইতিহা। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপ ও আমেরিকায় নানা বৈজ্ঞানিক ও অপটিক্যাল পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এই স্বপ্ন ধীরে ধীরে বাস্তবের দিকে এগোতে থাকে। ফেনাকিস্টোস্কোপ, জোট্রোপ, প্র্যাক্সিনোস্কোপ—আজ যাদের শিশুর খেলনার মতো মনে হয়, তারা আসলে ছিল মানুষের চোখ ও মস্তিষ্ককে প্রতারণা করার প্রথম সুসংগঠিত প্রচেষ্টা। স্থির ছবির পরপর বিন্যাসে গতি অনুভূত হতে পারে—এই উপলব্ধি ছিল চলচ্চিত্রের জন্মের অন্যতম বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। কিন্তু এখানে এক সূক্ষ্ম দার্শনিক প্রশ্ন এসে পড়ে। গতি কি সত্যিই ছবির ভিতরে ছিল? নাকি আমাদের মস্তিষ্কই স্থির ছবিগুলির মধ্যে গতি সৃষ্টি করেছিল? চলচ্চিত্রের জন্মের সঙ্গে তাই শুরু হয় বাস্তবতা এবং উপলব্ধির সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন। পর্দায় আমরা যে চলন দেখি, তা আসলে অসংখ্য স্থির ফ্রেমের ধারাবাহিকতা। অথচ আমাদের চেতনা সেই বিচ্ছিন্ন মুহূর্তগুলিকে অবিচ্ছিন্ন জীবনের রূপ দেয়। অর্থাৎ সিনেমা শুরু থেকেই এক ধরনের সৃজনশীল মায়া—বাস্তবের অনুকরণ নয় শুধু, বাস্তবকে উপলব্ধি করার আমাদের নিজস্ব পদ্ধতিরও অনুকরণ।

এখানে এডওয়ার্ড মাইব্রিজের পরীক্ষাগুলি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ঘোড়ার দৌড়ের সময় তার চারটি পা একই সঙ্গে মাটি থেকে উঠে যায় কিনা—এই আপাত সরল প্রশ্ন থেকেই তিনি ধারাবাহিক আলোকচিত্রের মাধ্যমে গতির এমন মুহূর্ত ধরে ফেললেন, যা মানুষের খালি চোখ কখনও দেখতে পায় না। The Horse in Motion তাই শুধু ঘোড়ার ছবি তো আর নয়; তা ছিল মানুষের চোখের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে প্রযুক্তির প্রথম বড়ো বিজয়গুলির একটি। চোখ যে বাস্তবতাকে একটানা বলে অনুভব করে, ক্যামেরা তাকে ভেঙে দেখাল। গতি যে আসলে অসংখ্য ক্ষুদ্র স্থির মুহূর্তের সমষ্টি, সেই গোপন সত্য ক্যামেরা প্রকাশ করল। অর্থাৎ সিনেমা জন্মের আগেই বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছিল। এইখানেই আধুনিকতার সঙ্গে সিনেমার গভীর সম্পর্ক। শিল্পবিপ্লব মানুষের জীবনকে যেমন যন্ত্র, গতি, নগর, কারখানা এবং সময়ের নতুন শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে এসেছিল, চলচ্চিত্রও তেমনই সেই নতুন আধুনিক অভিজ্ঞতার বিশেষ দৃশ্যমান ভাষা হয়ে উঠল। শিল্পায়িত পৃথিবী সময়কে ঘড়ির কাঁটায় ভাগ করেছিল। কারখানার শ্রমিকের শরীরকে নির্দিষ্ট গতির সঙ্গে বেঁধেছিল। রেলগাড়ি দূরত্বের অর্থ বদলে দিয়েছিল। নগর মানুষের চোখের সামনে একের পর এক দৃশ্য ছুঁড়ে দিতে শুরু করেছিল। সিনেমা সেই আধুনিক জীবনেরই এক আশ্চর্য নন্দনতাত্ত্বিক সন্তান। রেলপথ, ফটোগ্রাফি, বিদ্যুৎ, টেলিগ্রাফ, শিল্পকারখানা—সব মিলিয়ে উনিশ শতকের মানুষ প্রথমবার এমন এক পৃথিবীতে প্রবেশ করছিল, যেখানে গতি নিজেই আধুনিকতার প্রতীক। আর সেই পৃথিবীকে সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে ধারণ করতে পারত যে শিল্প, তার নাম হতে যাচ্ছিল সিনেমা।

এই প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় থমাস এডিসনের গবেষণাগার। উইলিয়াম কেনেডি লরি ডিকসনের সহযোগিতায় তৈরি কাইনেটোস্কোপ চলমান ছবিকে দর্শকের চোখের কাছে নিয়ে এল। একজন মানুষ যন্ত্রের ভিতর চোখ রেখে ছবি দেখছে—এই অভিজ্ঞতা ছিল ব্যক্তিগত, প্রায় গোপন। যেন দর্শক এবং ছবির মধ্যে এক ব্যক্তিগত চুক্তি। কিন্তু এখানেই সিনেমার ইতিহাসে সেই মৌলিক পরিবর্তনের অপেক্ষা ছিল—ছবি একা দেখা থেকে একসঙ্গে দেখা। এই রূপান্তর প্রযুক্তিগত যতটা, সামাজিক দিক থেকে ছিল তার চেয়ে বেশি। কারণ সিনেমা শুধু নতুন ধরনের ছবি সৃষ্টি করেনি; সে নতুন ধরনের দর্শক সৃষ্টি করেছে। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসের গ্রাঁ ক্যাফের ইন্ডিয়ান স্যালোঁ-তে অগুস্ত ও লুই লুমিয়ের তাঁদের ‘Cinématographe’ প্রদর্শন করলেন। চলমান ছবি নিয়ে এর আগেও বহু পরীক্ষা ও প্রদর্শন হয়েছে—তাই চলচ্চিত্রের জন্মকে কোনো একক দিন বা একক আবিষ্কারের মধ্যে বন্দি করা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়। তবু লুমিয়েরদের প্রদর্শন এক প্রতীকী সূচনা হয়ে আছে। কারণ এখানে চলমান ছবি ব্যক্তিগত কৌতূহল থেকে বেরিয়ে সমষ্টিগত দর্শনের এক নতুন সামাজিক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠল। কোনো-এক অন্ধকার ঘরে বহু মানুষ পাশাপাশি বসে একই আলো, একই সময় এবং একই ঘটনার দিকে তাকিয়ে আছে। এ আধুনিক সংস্কৃতির এক নতুন দৃশ্য। আজ আমরা এই অভিজ্ঞতাকে এত স্বাভাবিক মনে করি যে তার বিপ্লবী চরিত্রটাই ভুলে যাই। কিন্তু ভাবলে বোঝা যায়—একই সময়ে বহু মানুষ একই কল্পিত বাস্তবতার মধ্যে প্রবেশ করছে। তাদের হাসি একসঙ্গে উঠছে, বিস্ময় একসঙ্গে জন্ম নিচ্ছে, ভয় একসঙ্গে শরীরকে স্পর্শ করছে। সিনেমা সেই অর্থে শুধু শিল্প নয়; এক সমষ্টিগত অনুভূতির স্থাপত্য।

লুমিয়েরদের ছবিগুলি ছিল আশ্চর্যরকম সাধারণ। Workers Leaving the Lumière Factory—কারখানার দরজা দিয়ে শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসছে। Arrival of a Train at La Ciotat—স্টেশনে একটি ট্রেন এসে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত ব্যঙ্গ এখানেই—সিনেমার প্রথম বিস্ময় তৈরি করতে কোনো মহাকাব্যের দরকার হয়নি। দরকার হয়েছিল বাস্তব জীবনের সামান্যতম ঘটনাকে আবার ঘটতে দেখা। শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসছে। ট্রেন আসছে। পাতা নড়ছে। মানুষ হাঁটছে। পৃথিবী নিজের মতো চলছে। ক্যামেরা কেবল তাকে ধরে রাখছে। কিন্তু এই ‘কেবল’ শব্দটির ভিতরেই লুকিয়ে আছে বিপ্লব। কারণ প্রথমবার মানুষ বুঝল—বাস্তবতা নিজেই তো কোনো দৃশ্য হতে পারে। সাহিত্য মানুষকে কল্পনার ভিতর পৃথিবী নির্মাণ করতে শেখায়। চিত্রকলা বিশেষ মুহূর্তকে স্থির করে তাকে দর্শনের বস্তু করে তোলে। সংগীত সময়কে শব্দে রূপান্তরিত করে। কিন্তু সিনেমা এসে এই তিনটির এক অদ্ভুত মিলন ঘটাল—দৃশ্যকে সময়ের মধ্যে প্রবাহিত করল। তাই সিনেমা শুধু দৃশ্যের শিল্প নয়; সিনেমা সময়ের শিল্প। একটি ট্রেনের আগমনকে আমরা শুধু দেখি না; আমরা তার জন্য অপেক্ষা করি। একটি মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু মুখ দেখি না; তার পরিবর্তন দেখি। একটি দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জানি, সেই দরজার ওপারে এখন আরেকটি সময় শুরু হয়েছে। সিনেমা আমাদের চোখকে সময়ের নাগরিক করে তোলে।

কিন্তু লুমিয়েরদের পরেই চলচ্চিত্র আর বাস্তবতার বিশ্বস্ত সাক্ষী হয়ে থাকতে রাজি হল না। এখানে প্রবেশ করলেন জর্জ মেলিয়েস। মেলিয়েস বুঝেছিলেন—ক্যামেরা যদি বাস্তবকে ধরে রাখতে পারে, তবে তাকে দিয়ে বাস্তবকে ভাঙাও যায়। দৃশ্য হঠাৎ অদৃশ্য হতে পারে, মানুষ হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে, একটি শরীর বহু শরীরে বিভক্ত হতে পারে, চাঁদ মানুষের মুখ পেতে পারে, পৃথিবী স্বপ্নের মতো বিকৃত হতে পারে। A Trip to the Moon তাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কেবল কল্পবিজ্ঞানের ছবি নয়; এই সিনেমার আত্মপরিচয়ের একটি মুহূর্ত। লুমিয়ের যেন বলেছিলেন—দেখো, পৃথিবী চলছে। মেলিয়েস বললেন—দেখো, পৃথিবীকে নতুন করে বানানো যায়। এই দুই প্রবণতার মধ্যেই সিনেমার দুই চিরন্তন মেরু জন্ম নিল—বাস্তবতা এবং কল্পনা। পরবর্তী এক শতাব্দীর চলচ্চিত্র বারবার এই দুই মেরুর মধ্যে দোল খেয়েছে। ডকুমেন্টারি বনাম কল্পকাহিনি, বাস্তববাদ বনাম শৈলী, রেকর্ড বনাম নির্মাণ, সত্য বনাম মায়া—এই দ্বন্দ্ব আসলে সিনেমার জন্মলগ্ন থেকেই তার শরীরে লেখা ছিল।

তারপর ধীরে ধীরে ক্যামেরা একপ্রকার জানালা হয়ে থাকার অভ্যাস বন্ধ করল। সে নড়ল। কাছে এল। দূরে গেল। একটি মুখকে অন্য একটি দৃশ্যের পাশে রাখল। একটি সময়কে আরেকটি সময়ের সঙ্গে জুড়ে দিল। এবং এখানেই জন্ম নিল চলচ্চিত্রের ভাষা। এডউইন এস. পোর্টার দেখালেন, ঘটনাকে কেবল শুরু থেকে শেষপর্যন্ত দেখাতে হয় না। বিভিন্ন স্থান ও সময়কে পাশাপাশি বসিয়ে উত্তেজনা তৈরি করা যায়। পরে ডি. ডব্লিউ. গ্রিফিথ ক্লোজ-আপ, ক্রস-কাটিং, প্যারালাল এডিটিং এবং নাটকীয় নির্মাণের নানা সম্ভাবনাকে এমনভাবে ব্যবহার করলেন যে, চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে থিয়েটারের মঞ্চ থেকে নিজস্ব ভাষার দিকে এগিয়ে গেল। ক্যামেরা আর কেবল দর্শকের চোখ হয়ে নয়, ক্যামেরা নিজেই চিন্তা করতে শুরু করল। একটি মুখ বড়ো করে দেখালে দর্শক শুধু মুখ দেখে না—তার ভিতরের অনুভূতি পড়তে শুরু করে। একটি শিশুর দিকে তাকানো চোখের সঙ্গে পরের শটে একটি খালি দরজা দেখালে তাদের মধ্যে একটি অর্থ জন্ম নেয়। দুটি দৃশ্যের মাঝখানে যে অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হয়, তা কোনো একক ছবির ভিতরে ছিল না; জন্ম নিল তাদের সংঘর্ষের ভিতর থেকে।

সের্গেই আইজেনস্টাইনের মন্টাজ এই সত্যকে তাত্ত্বিক উচ্চতায় নিয়ে গেল। দুটি ছবি পাশাপাশি বসানো মানে শুধু দুটি ছবি দেখানো নয়; তাদের সংঘর্ষ থেকে একটি তৃতীয় অর্থ জন্ম নিতে পারে। অর্থাৎ সিনেমা তখন আর কেবল যা আছে তা দেখানোর শিল্প থাকে না; যা নেই, তা দর্শকের মস্তিষ্কে তৈরি করার শিল্প হয়ে ওঠে। এইখানেই সিনেমার সঙ্গে চিন্তার গভীর সম্পর্ক। সিনেমা দর্শককে শুধু চোখ দেয় না; তাকে অর্থ নির্মাণের দায়িত্বও দেয়। একটি ছবি নিজে কখনও সম্পূর্ণ নয়। দুটি ছবির মধ্যবর্তী অন্ধকারেও একটি ছবি থাকে। একটি কাটের ভিতরেও একটি বাক্য থাকে। একটি নীরব মুখের ভিতরেও একটি উপন্যাস থাকতে পারে। এই কারণেই চলচ্চিত্রের সম্পাদনা নিছক প্রযুক্তিগত কাজ নয়; তা এক ধরনের দার্শনিক ব্যাকরণ।

তারপর এলেন চ্যাপলিন। চ্যাপলিনের মধ্যেকার সেই ভবঘুরে মানুষ আধুনিকতার এক অসামান্য প্রতীক হয়ে গেলেন। সে শিল্পায়িত পৃথিবীর মধ্যে এক কোমল, অসহায়, হাস্যকর অথচ মর্যাদাবান মানুষ। যন্ত্র তাকে গ্রাস করতে চায়, দারিদ্র্য তাকে অপমান করে, সমাজ তাকে প্রান্তে ঠেলে দেয়। কিন্তু সে আবার উঠে দাঁড়ায়। তার হাসির ভিতরে কান্না। তার কৌতুকের ভিতরে রাজনীতি। তার শরীরের পতনের ভিতরে সভ্যতার পতনের প্রতিধ্বনি। Modern Times-এ যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে যে শরীরী কৌতুকের মাধ্যমে চ্যাপলিন প্রকাশ করেছিলেন, তা আসলে আধুনিকতার গভীরতম সংকটের এক নন্দনতাত্ত্বিক এবং অস্তিত্বতাত্ব্বিক রূপ। মানুষ যন্ত্র তৈরি করেছিল নিজের শ্রমকে সহজ করার জন্য; শেষপর্যন্ত সেই যন্ত্রই মানুষকে তার নিজস্ব ছন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করল। লরেল ও হার্ডির কৌতুকও তাই নিছক হাসির শিল্প নয়। শরীর, বস্তু, সামাজিক পরিস্থিতি এবং মানুষের অক্ষমতাকে তাঁরা এমন এক দৃশ্যভাষায় রূপ দিয়েছিলেন, যার অনুবাদ প্রায় অপ্রয়োজনীয়। ভাষা না জেনেও দর্শক হাসতে পারে। এখানেই আছে সিনেমার আরেক বিপ্লবী শক্তি—তার শরীরী বিশ্বভাষা। একটি মুখের কান্না অনুবাদ চায় না। একটি শিশুর হাসি অভিধান চায় না। একটি আলিঙ্গন ব্যাকরণ চায় না। একটি বিদায়ের মুহূর্তের জন্য কোনো ভাষার সাবটাইটেল প্রয়োজন হয় না। এই কারণে সিনেমা সম্ভবত আধুনিক পৃথিবীর প্রথম বৃহৎ বিশ্বভাষা, এমন এক ভাষা যার মৌলিক শব্দগুলি আলো, শরীর, মুখ, গতি, দৃষ্টি এবং নীরবতা।

তবে শব্দ এল। ১৯২৭ সালের The Jazz Singer জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শব্দযুগের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করল। সিনেমা কথা বলতে শুরু করল, গান গাইতে শুরু করল। কিন্তু এই পরিবর্তন সিনেমার ভাষাকে শুধু সমৃদ্ধ করেনি; তার সঙ্গে নতুন প্রশ্নও নিয়ে আসে। নীরবতা কি শব্দের অনুপস্থিতি? নাকি নীরবতাও এক ভাষা? নির্বাক সিনেমা আমাদের শিখিয়েছিল, চোখের দৃষ্টি কখনও কখনও কোনো সম্পূর্ণ সংলাপের চেয়ে শক্তিশালী। একটি মুখের সামান্য পরিবর্তন, একটি হাতের থেমে যাওয়া, একটি দরজা বন্ধ হওয়া—এসবের ভিতরেও শব্দহীন ভাষা কাজ করতে পারে। তাই শব্দ সিনেমাকে সম্পূর্ণ করেনি; বরং সিনেমার ভাষার সম্ভাবনাকে আরেকবার পুনর্গঠন করেছে।

এবং আশ্চর্যের বিষয়, সিনেমা যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে, তার আদিম রহস্য ততটুকু হারায়নি। ফিল্ম থেকে ডিজিটাল। প্রজেক্টর থেকে LED স্ক্রিন। সেলুলয়েড থেকে পিক্সেল। স্টুডিও থেকে ভার্চুয়াল প্রোডাকশন। ক্যামেরা থেকে কম্পিউটার-উৎপাদিত চিত্র। সবকিছু বদলে গেছে। কিন্তু অন্ধকার ঘরে বসে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকার সেই মৌলিক অভিজ্ঞতা বদলায়নি। ভারত যখন চলচ্চিত্রকে গ্রহণ করল, তখন এই বিশ্বভাষা নিজের সাংস্কৃতিক শরীর খুঁজে নিতে শুরু করল। হীরালাল সেনের প্রাথমিক চলচ্চিত্রচর্চা থেকে দাদাসাহেব ফালকে, তারপর অসংখ্য আঞ্চলিক চলচ্চিত্র-পরম্পরা—ভারতীয় সিনেমা পাশ্চাত্যের প্রযুক্তিকে গ্রহণ করলেও তাকে নিছক অনুকরণ করেনি। গান, নৃত্য, পুরাণ, মেলা, লোকনাট্য, রামায়ণ-মহাভারত, দেবদেবী, প্রেম, পরিবার, সামাজিক সংঘাত—ভারতীয় সাংস্কৃতিক স্মৃতি সিনেমার পর্দায় নিজস্ব এক ধারা নির্মাণ করল। কারণ কোনো প্রযুক্তি যখন নতুন সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে, তখন সে কেবল প্রযুক্তি থাকে না; সে সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখার যে পদ্ধতি, তার অংশ হয়ে যায়।

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এই আত্মসাৎ ও পুনর্নির্মাণের অসামান্য পরিণতি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে। পথের পাঁচালী দেখায়, সিনেমার মহত্ত্ব সবসময় বৃহৎ ঘটনার মধ্যে থাকে না। একটি শিশুর দৌড়, কাশবনের দোলা, দূরের ট্রেন, মায়ের মুখ, বৃষ্টির শব্দ—এসবও মহাকাব্যের সমান গভীর হয়ে উঠতে পারে। লুমিয়েরের Arrival of a Train at La Ciotat-এর ট্রেন এবং সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী-র ট্রেন—এই দুই দৃশ্যের মধ্যে প্রায় অর্ধশতাব্দীর ইতিহাস। তবু তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য আত্মীয়তা আছে। লুমিয়েরের ট্রেন ছিল আগমনের বিস্ময়। সত্যজিতের ট্রেন হয়ে উঠল অজানার আহ্বান। একটিতে প্রযুক্তি পৃথিবীকে নতুন করে দেখিয়েছিল; অন্যটিতে সেই প্রযুক্তি মানুষের অন্তর্জগৎকে পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করল। অপুর চোখে ট্রেন শুধু ট্রেন নয়। তা দূরের পৃথিবী, অজানা ভবিষ্যৎ, স্থানান্তর, আকাঙ্ক্ষা, আধুনিকতা—সবকিছুর প্রতীক। তা যন্ত্রসভ্যতার একটি চিহ্ন থেকে কোনো শিশুর স্বপ্নের ভাষায় রূপান্তরিত হল। এই রূপান্তরই শিল্পের প্রকৃত ইতিহাস। প্রযুক্তি তখনই শিল্প হয়, যখন যন্ত্র মানুষের অন্তর্জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে।

এই কারণেই সিনেমার ইতিহাস কেবল তার আবিষ্কারগুলির ধারাবাহিকতা হিসেবে পড়লে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য অধরা থেকে যায়। ক্যামেরা কে বানালেন, প্রজেক্টর কে আবিষ্কার করলেন, প্রথম ছবি কোনটি—এসব প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও গভীর প্রশ্ন হল—মানুষ কেন চলমান ছবি দেখতে চাইল? কেন সে অন্ধকার ঘরে বসে অন্যের জীবন দেখতে চায়? কেন সে জানে যে পর্দার মানুষটি কাল্পনিক, তবু তার মৃত্যুতে কাঁদে? কেন সে একই গল্প বারবার দেখে? কেন শৈশবে দেখা কোনো এক দৃশ্য পঞ্চাশ বছর পরেও তার ভিতরে আলো জ্বেলে দেয়? কারণ সম্ভবত সিনেমা আমাদের স্মৃতির সঙ্গে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য বহন করে। স্মৃতিও তো সম্পূর্ণ নয়। স্মৃতি দৃশ্য ধরে রাখে, শব্দ হারিয়ে ফেলে; কখনও কোনো মুখ মনে থাকে, অথচ তার চারপাশের পৃথিবী মুছে যায়। কখনও কোনো গন্ধ সম্পূর্ণ সময়কে ফিরিয়ে আনে। কখনও একটি দৃশ্যের সামান্য অংশ আমাদের ভিতরে বহু বছরের জীবনকে পুনর্গঠন করে। সিনেমাও তেমনই। সে জীবনের সম্পূর্ণতা দেয় না; জীবনের নির্বাচিত মুহূর্তগুলিকে এমনভাবে সাজায় যে আমরা তাদের ভিতর সম্পূর্ণতার অনুভূতি পাই।

এই কারণেই সিনেমা স্মৃতির যন্ত্রও। ক্যামেরা যা ধারণ করে, তা কেবল দৃশ্য নয়— তা বিশেষ সময়কে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করে। কোনো পুরোনো শহরের রাস্তা, কোনো মৃত মানুষের মুখ, কোনো বিলুপ্ত পোশাক, কোনো হারিয়ে যাওয়া সামাজিক আচরণ—চলচ্চিত্রে তারা একদিনের বাস্তবতা থেকে ভবিষ্যতের স্মৃতিতে পরিণত হয়। সিনেমা তাই এক অর্থে সময়ের বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী নান্দনিক প্রতিবাদ। সময় বলে—সবকিছু চলে যাবে। সিনেমা বলে—একবার অন্তত ফিরে এসো। মানুষ মরে যায়। পর্দায় তার মুখ থেকে যায়। শহর বদলে যায়। পুরোনো রাস্তা আলোয় থেকে যায়। শৈশব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু পর্দায় একটি শিশু এখনও দৌড়ায়। এইখানেই সিনেমার সঙ্গে মৃত্যুর গভীর সম্পর্ক। আমরা যখন পুরোনো কোনো চলচ্চিত্র দেখি, তখন শুধু কোনো গল্প দেখি না; আমরা এমন এক পৃথিবীর দিকে তাকাই, যা আর নেই। সেই পৃথিবীর মানুষদের অনেকেই মৃত। তাদের কণ্ঠ, মুখ, চলন—সবই অতীত। অথচ পর্দায় তারা এখনও হাঁটছে। অর্থাৎ সিনেমা এমন এক শিল্প যেখানে মৃত্যু এবং উপস্থিতি একই সঙ্গে সত্য। মানুষ জানে—এ তো অতীত। কিন্তু চোখ বলে—না, সে এখনও এখানে। এই দ্বন্দ্বই চলচ্চিত্রের জাদুর গভীরতম স্তরগুলির বিশেষ একটি।

আজকের পৃথিবীতে সেই জাদু আরও জটিল হয়েছে। মোবাইল ফোন আমাদের প্রত্যেককে সম্ভাব্য ক্যামেরাম্যান করে দিয়েছে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত রেকর্ডযোগ্য। কোটি কোটি ছবি, ভিডিও, লাইভ সম্প্রচার—মানুষ যেন ক্রমশ এমন এক সভ্যতায় প্রবেশ করছে যেখানে দেখা এবং রেকর্ড করা প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, ছবির সংখ্যা যত বাড়ছে, কোনো ছবির বিস্ময় তত কমে যেতে পারে। কারণ যা বিরল, তা-ই বিস্ময়কে জন্ম দেয়। লুমিয়েরদের সময় কোনো চলমান ছবিই ছিল আশ্চর্য। আজ প্রতি মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ চলমান ছবি আমাদের চোখের সামনে দিয়ে যায়। তবু সিনেমা শেষ হয়ে যায়নি। বরং প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে—যখন সবকিছুই ছবি হয়ে যেতে পারে, তখন কোন ছবিকে শিল্প বলা হবে? এই প্রশ্নই আধুনিক চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ।

ক্যামেরা এখন আর বাস্তবতা ধারণের একমাত্র যন্ত্র নয়। কম্পিউটার এমন দৃশ্য তৈরি করতে পারে যা কখনও ঘটেনি। ডিজিটাল চরিত্র এমনভাবে হাঁটতে পারে, যার কোনো বাস্তব শরীর নেই। ভার্চুয়াল পৃথিবীতে এমন মানুষ সৃষ্টি করা যায়, যারা জন্মায়নি, বাঁচেনি, মরেনি—তবু তাদের মুখে আমরা আবেগ দেখতে পাই। ফলে সিনেমার আদিম প্রশ্ন আবার ফিরে এসেছে, কিন্তু আরও জটিল রূপে—ছবি যদি বাস্তবের সাক্ষ্য না হয়, তবু কি তা সত্য বলতে পারে? সম্ভবত পারে। কারণ শিল্পের সত্য কখনও কেবল তথ্যের সত্য নয়। একটি ঘটনা ঘটেছিল কি না—তা ইতিহাসের প্রশ্ন। কিন্তু একটি দৃশ্য আমাদের ভিতরে কী অনুভূতি সৃষ্টি করে—তা শিল্পের প্রশ্ন। সিনেমা সেই দ্বিতীয় সত্যের সন্ধান করে।

তাই চলচ্চিত্রের ইতিহাস আসলে প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের ইতিহাস নয়। মানুষের দেখার ক্ষমতার বিবর্তনের ইতিহাস। প্রথমে মানুষ ছবিকে স্থির করেছিল। তারপর তাকে করেছিল চলমান। তারপর ছবির মধ্যে সময়কে প্রবিষ্ট করেছিল। তারপর সম্পাদনার মাধ্যমে চিন্তা করেছিল। শব্দ দিয়ে তাকে কণ্ঠ দিয়েছিল। রঙ দিয়ে তাকে স্বপ্ন দিয়েছিল। ডিজিটাল প্রযুক্তি দিয়ে বাস্তবতার সীমানা ভেঙেছিল। কিন্তু সবশেষে সিনেমা যে জায়গায় ফিরে আসে, তা হল মানুষের মুখ। একটি মুখ। এক জোড়া চোখ। একটি অপেক্ষা। একটি বিদায়। একটি শিশুর বিস্ময়। একজন বৃদ্ধের নিঃসঙ্গতা। একজন প্রেমিকের দৃষ্টি। একজন মায়ের মুখ। কারণ সমস্ত প্রযুক্তির শেষে সিনেমা আবার মানুষকেই খুঁজে ফেরে।

এই জন্যই হয়তো চলচ্চিত্রের জন্মকে আমরা কেবল ১৮৯৫ সালের ওই সন্ধ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারি না। তার জন্ম আরও আগে—মানুষের সেই প্রথম মুহূর্তে, যখন সে কোনো পাথরের দেওয়ালে একটি বাইসন এঁকে সেই স্রষ্টা বুঝেছিল যে অনুপস্থিত প্রাণিকেও উপস্থিত করা যায়। আবার তার জন্ম সেই মুহূর্তে, যখন কেউ মৃত প্রিয়জনের মুখ আঁকল। আবার সেই মুহূর্তে, যখন ফটোগ্রাফ সময়কে স্থির করল। এবং শেষপর্যন্ত, যখন আলো ও যন্ত্র সেই স্থিরতাকে ভেঙে তাকে গতির মধ্যে ফিরিয়ে দিল। অর্থাৎ সিনেমার জন্ম একদিনে নয়। সিনেমা জন্মেছিল মানুষের সেই প্রাচীন আকাঙ্ক্ষা থেকে—অনুপস্থিতকে উপস্থিত করার আকাঙ্ক্ষা থেকে। আর চলমান ছবির জন্ম সেই আকাঙ্ক্ষার দ্বিতীয় অধ্যায়—অনুপস্থিতকে আবার চলতে দেখার আকাঙ্ক্ষা।

আজ আমরা যখন অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসি, কিংবা মোবাইলের ক্ষুদ্র পর্দায় কোনো চলচ্চিত্র দেখি, তখন প্রযুক্তির বিপুল পরিবর্তনের আড়ালেও সেই প্রাচীন অভিজ্ঞতা অক্ষত থাকে। বাইরের পৃথিবী কিছুক্ষণের জন্য অন্ধকার হয়ে যায়। সামনে আলো জ্বলে ওঠে। আর সেই আলো আমাদের নিয়ে যায় এমন এক জগতে, যা নেই—তবু আছে; যা মিথ্যা—তবু সত্য; যা অতীত—তবু বর্তমান; যা অন্যের জীবন—তবু আশ্চর্যভাবে আমাদের নিজের। পর্দায় একজন মানুষ হাঁটে। আমরা জানি সে হাঁটছে না। তবু সে হাঁটে। একটি ট্রেন আসে। আমরা জানি সে আমাদের দিকে আসছে না। তবু আমাদের ভিতরের কোনো প্রাচীন ভয় এক মুহূর্তের জন্য জেগে ওঠে। একটি শিশু দৌড়ায়। আমরা জানি সে পর্দার ওপারে নেই। তবু আমাদের নিজেদের হারানো শৈশব তার সঙ্গে দৌড়তে শুরু করে।

এইখানেই সিনেমার অলৌকিকতা। আলো কখনও জীবন নয়। ছায়া কখনও মানুষ নয়। স্থির ফ্রেম কখনও গতি নয়। তবু আলো, ছায়া, স্থিরতা এবং ধারাবাহিকতার সম্মিলনে মানুষ এমন এক জগৎ নির্মাণ করেছে, যেখানে অসম্ভবও অনুভূত হয় সম্ভব বলে। তাই সিনেমা শেষপর্যন্ত প্রযুক্তির বিজয়কে উচ্চকিত করে না; করে মানবিক কল্পনার বিজয়কে। যা বাস্তবতার অনুকরণ নয় শুধু—বাস্তবতাকে নতুন করে অনুভব করার এক যন্ত্র। যা স্মৃতির বিকল্প নয়—স্মৃতিকে দৃশ্যমান করার এক মাধ্যম। যা সময়কে থামাতে পারে না—কিন্তু সময়ের চলে যাওয়াকে এক মুহূর্তের জন্য আমাদের চোখের সামনে ফিরিয়ে আনতে পারে।

এবং সেই কারণেই, প্রায় দেড়শো বছরের দীর্ঘ যাত্রার পরেও, সিনেমার জন্মের মুহূর্ত আজও আমাদের বিস্মিত করে। অন্ধকার। তারপর হঠাৎ আলো। একটি সাদা পর্দা। তার উপর একটি ছায়া। ছায়াটি নড়ে ওঠে। মানুষের চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে কোনো গল্প নেই, কোনো নায়ক নেই, কোনো সংলাপ নেই, কোনো সংগীত নেই। শুধু আলো আছে। ছায়া আছে। গতি আছে। আর আছে মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা—যা চলে গেছে তাকে আবার দেখতে পাওয়ার, যা কখনও ঘটেনি তাকে দেখতে পাওয়ার, এবং নিজের জীবনকে একবার বাইরে থেকে দেখে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

সেই প্রথম ছবির ভিতরেই তাই ভবিষ্যতের সমস্ত সিনেমা নিঃশব্দে ঘুমিয়ে ছিল। চ্যাপলিনের হাসি। মেলিয়েসের চাঁদ। আইজেনস্টাইনের মন্টাজ। মুরনাউয়ের ছায়া। গ্রিফিথের ক্লোজ-আপ। সত্যজিতের ট্রেন। ঋত্বিকের দেশভাগের ক্ষত। ফেলিনির স্বপ্ন। কুরোসাওয়ার বৃষ্টি। বার্গম্যানের মুখ। তারকোভস্কির সময়। আর আজকের ডিজিটাল মহাবিশ্ব। সবই যেন সেই প্রথম আলোর দীর্ঘ প্রতিধ্বনি।

মানুষ প্রথমে ছবি বানিয়েছিল। তারপর ছবিকে চলতে শিখিয়েছিল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সেই দিনই সিনেমার জন্ম হয়েছিল, যেদিন মানুষ চলমান ছবির দিকে তাকিয়ে বুঝেছিল—পৃথিবীকে শুধু দেখা যায় না; পৃথিবীকে আবার দেখা যায়। আর সেই ‘আবার’ শব্দের ভিতরের ভাবনার মধ্যেই সিনেমার সমস্ত কবিতা। কারণ জীবন একবার চলে গেলে ফিরে আসে না। কিন্তু আলো—আলো কখনও কখনও তাকে ফিরিয়ে আনে।

পর্দা অন্ধকার হয়। আবার আলো জ্বলে। ছবি নড়ে ওঠে। আর আমাদের ভিতরের সেই আদিম শিশু, যে প্রথম কোনো চলমান ছায়া দেখে বিস্ময়ে চোখ বড়ো করে তাকিয়েছিল, আজও নিঃশব্দে বলে ওঠে—ছবি নড়ছে।

এই বিস্ময়ের কোনো ইতিহাস নেই। কারণ এর যে কোনো শেষ-ই নেই।

 

[কৃতজ্ঞ স্মরণ- সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়-এর বিভিন্ন নিবন্ধ, গ্রন্থাদি ও আলোচনাসমূহ]
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top