বাক্যতত্ত্ব

ভূমিকা

ভাষা একটি সুসংবদ্ধ ব্যবস্থা। ধ্বনি থেকে রূপ, রূপ থেকে পদ এবং পদ থেকে বাক্য—এই ক্রমে ভাষার গঠন ক্রমশ বিস্তৃত ও জটিল হয়ে ওঠে। ধ্বনি ও রূপ ভাষার ক্ষুদ্রতর সংগঠনকে প্রকাশ করে; কিন্তু মানুষের সম্পূর্ণ ভাব, বক্তব্য, প্রশ্ন, নির্দেশ, অনুরোধ কিংবা আবেগ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হল বাক্য

বাক্য কেবল কয়েকটি শব্দের সমষ্টি নয়। শব্দ বা পদগুলি নির্দিষ্ট নিয়মে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি সুসংবদ্ধ গঠন তৈরি করে এবং সেই গঠন সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে। কোন পদের পরে কোন পদ বসবে, কোন পদের সঙ্গে কোন পদের সম্পর্ক তৈরি হবে এবং প্রয়োজনে পদের রূপ কীভাবে পরিবর্তিত হবে—এই সমস্ত বিষয়ের সামগ্রিক আলোচনা ভাষাবিজ্ঞানের বাক্যতত্ত্ব-এর অন্তর্গত।

বাক্যতত্ত্বের ইংরেজি পরিভাষা Syntax

বাক্যের গঠন, পদের বিন্যাস, পদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বাক্যগঠনের নিয়ম নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানের যে শাখায় আলোচনা করা হয়, তাকে বাক্যতত্ত্ব বলে।

ভাষার ধ্বনিস্তর নিয়ে আলোচনা করে ধ্বনিতত্ত্ব, রূপস্তর নিয়ে আলোচনা করে রূপতত্ত্ব, বাক্যস্তর নিয়ে আলোচনা করে বাক্যতত্ত্ব এবং অর্থস্তর নিয়ে আলোচনা করে শব্দার্থতত্ত্ব


১. বাক্যের ধারণা

বাক্য হল ভাষার একটি সম্পূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ গঠন, যার মাধ্যমে বক্তা কোনো সম্পূর্ণ ভাব, বক্তব্য, প্রশ্ন, আদেশ, অনুরোধ, আবেগ বা সংবাদ প্রকাশ করেন।

যেমন—

রাহুল বই পড়ে।

এখানে ‘রাহুল’, ‘বই’ এবং ‘পড়ে’—এই পদগুলি নির্দিষ্ট ক্রম ও পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ বক্তব্য প্রকাশ করেছে।

কিন্তু—

রাহুল বই…

এখানে বক্তব্য অসম্পূর্ণ। শ্রোতার মনে স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী কোনো পদের প্রত্যাশা তৈরি হয়।

অতএব, কেবল কয়েকটি শব্দ পাশাপাশি থাকলেই বাক্য হয় না; বাক্যের উপাদানগুলির মধ্যে গঠনগত ও অর্থগত সম্পর্ক এবং বক্তব্যের পূর্ণতা থাকা আবশ্যক।


২. বাক্যবিধি

বাক্য গঠনের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—

ক. পদগুলিকে সাজানোর নিয়ম
খ. বাক্যের প্রয়োজন অনুসারে পদের রূপপরিবর্তনের নিয়ম

অর্থাৎ বাক্যবিধি শুধু পদের ক্রম নিয়ন্ত্রণ করে না; প্রয়োজনে শব্দের রূপ কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তাও নির্ধারণ করে।

যেমন—

ছেলে বই পড়ে।

এখানে পদগুলির একটি নির্দিষ্ট ক্রম রয়েছে।

আবার—

ছেলেরা বই পড়ে।

এখানে ‘ছেলে’ শব্দের সঙ্গে ‘রা’ যুক্ত হয়ে বহুবচনের অর্থ প্রকাশ করেছে।


৩. সার্থক বাক্যের গুণ

প্রথাগত ব্যাকরণে একটি সার্থক বাক্যের তিনটি প্রধান গুণ স্বীকৃত—

১. আকাঙ্ক্ষা
২. আসত্তি
৩. যোগ্যতা

এই তিনটির সমন্বয়েই বাক্য সম্পূর্ণ ও অর্থবহ হয়ে ওঠে।


৩.১ আকাঙ্ক্ষা

বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণভাবে বোঝার জন্য এক পদের পর অন্য পদ শোনার যে স্বাভাবিক প্রত্যাশা তৈরি হয়, তাকে আকাঙ্ক্ষা বলে।

যেমন—

চন্দ্র পৃথিবীর চারদিকে…

এখানে শ্রোতার মনে স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে—চন্দ্র পৃথিবীর চারদিকে কী করে?

চন্দ্র পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে।

‘ঘোরে’ পদটি যুক্ত হওয়ার পর বক্তব্য সম্পূর্ণ হয়েছে।

মনে রাখবে

বাক্যের অর্থ পূর্ণ করার জন্য পরবর্তী পদের প্রত্যাশা = আকাঙ্ক্ষা।


৩.২ আসত্তি

বাক্যে ব্যবহৃত পদগুলির মধ্যে অর্থের সঙ্গতি বজায় রাখার জন্য তাদের সুশৃঙ্খল বিন্যাস ও যথাযথ নৈকট্যকে আসত্তি বলে।

যেমন—

রাহুল বই পড়ে।

এখানে পদগুলির বিন্যাস স্বাভাবিক এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সহজেই বোঝা যায়।

মনে রাখবে

সুশৃঙ্খল পদবিন্যাস = আসত্তি।


৩.৩ যোগ্যতা

বাক্যে ব্যবহৃত পদগুলির মধ্যে অর্থগত ও ভাবগত সামঞ্জস্যকে যোগ্যতা বলে।

যেমন—

পাখি আকাশে উড়ে।

এখানে ‘পাখি’, ‘আকাশে’ ও ‘উড়ে’—এই পদগুলির মধ্যে স্বাভাবিক অর্থগত সামঞ্জস্য রয়েছে।

মনে রাখবে

পদগুলির অর্থগত ও ভাবগত মেলবন্ধন = যোগ্যতা।


একনজরে : সার্থক বাক্যের তিন গুণ

গুণঅর্থ
আকাঙ্ক্ষাপরবর্তী পদের প্রত্যাশা
আসত্তিপদের সুশৃঙ্খল নৈকট্য
যোগ্যতাপদের অর্থগত সামঞ্জস্য

আকাঙ্ক্ষা + আসত্তি + যোগ্যতা = সার্থক বাক্য


৪. বাক্যের প্রধান দুটি অংশ : উদ্দেশ্য ও বিধেয়

প্রথাগত ব্যাকরণে বাক্যের দুটি প্রধান অংশ হল—

১. উদ্দেশ্য
২. বিধেয়

উদ্দেশ্য

বাক্যে যাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলা হয়, তাকে উদ্দেশ্য বলে।

বিধেয়

উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বলা হয়, তাকে বিধেয় বলে।

উদাহরণ

সুমন বল খেলে।

এখানে—

সুমন → উদ্দেশ্য
বল খেলে → বিধেয়


৫. উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের প্রসার

বাক্য যত দীর্ঘ হয়, উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের সঙ্গে নানা ধরনের পদ বা পদগুচ্ছ যুক্ত হতে পারে। এগুলি উদ্দেশ্য ও বিধেয়কে প্রসারিত করে। এই প্রসারক উপাদানকে বলা হয় প্রসারক

উদাহরণ

সেলিম সাহেবের ছেলে সুমন গাছতলায় বসে বই পড়ছে।

এখানে—

সুমন → উদ্দেশ্য
সেলিম সাহেবের ছেলে → উদ্দেশ্যের প্রসারক

পড়ছে → বিধেয়ের ক্রিয়া
গাছতলায় বসে → বিধেয়ের প্রসারক
বই → বিধেয়ের পূরক

অর্থাৎ, বাক্যের মূল উদ্দেশ্য ও বিধেয়কে বিভিন্ন পদ ও পদগুচ্ছ প্রসারিত করতে পারে।


৬. বিধেয়ের পূরক

বিধেয়ের ক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বা অর্থপূর্ণ করতে যে বিশেষ্যজাতীয় অংশ প্রয়োজন হয়, তাকে বিধেয়ের পূরক বলে।

যেমন—

রফিক–সালাম–বরকত–জব্বার মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

এখানে—

রফিক–সালাম–বরকত–জব্বার → উদ্দেশ্য
জীবন → বিধেয়ের পূরক
উৎসর্গ করেছিলেন → বিধেয়ের ক্রিয়া

‘জীবন’ পদটি ‘উৎসর্গ করেছিলেন’ ক্রিয়ার অর্থকে সম্পূর্ণ করেছে।


৭. উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের অবস্থান

বাংলা বাক্যে উদ্দেশ্য সাধারণত বাক্যের প্রথম দিকে এবং বিধেয় পরে আসে। তবে এটি কোনো অনড় নিয়ম নয়।

প্রয়োজনে উদ্দেশ্য বাক্যের শেষে বা অন্য অবস্থানেও আসতে পারে।

যেমন—

এইসব মিলিয়ে তৈরি হয় চিনি বা শর্করা।

এখানে উদ্দেশ্য ‘চিনি বা শর্করা’ বাক্যের শেষে এসেছে।

অতএব—

বাংলা বাক্যে উদ্দেশ্যের অবস্থান পরিবর্তনশীল; প্রয়োজনে তা বাক্যের বিভিন্ন স্থানে বসতে পারে।

বিশেষত সাহিত্যিক ভাষা, কথ্য ভাষা বা বিশেষ জোর প্রকাশের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।


৮. বাক্যের পদক্রম

বাংলা বাক্যে পদের একটি স্বাভাবিক ক্রম রয়েছে।

সাধারণভাবে—

কর্তা + কর্ম + ক্রিয়া

যেমন—

রাহুল বই পড়ে।

এখানে—

রাহুল → কর্তা
বই → কর্ম
পড়ে → ক্রিয়া

তবে বাংলা ভাষায় পদক্রম সম্পূর্ণ অনমনীয় নয়। বিশেষ অর্থ, আবেগ, সাহিত্যিক প্রয়োগ কিংবা কোনো পদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপের প্রয়োজনে পদক্রম পরিবর্তিত হতে পারে।


৯. বাক্যের গঠনগত শ্রেণিবিভাগ

গঠনগত দিক থেকে বাংলা বাক্য প্রধানত তিন প্রকার—

১. সরল বাক্য
২. যৌগিক বাক্য
৩. জটিল বাক্য


৯.১ সরল বাক্য

যে বাক্যে একটি মাত্র প্রধান খণ্ডবাক্য থাকে এবং একটি সমাপিকা ক্রিয়াকেন্দ্রের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশিত হয়, তাকে সরল বাক্য বলে।

উদাহরণ

অঙ্কিতা কাল সকালে বহরমপুর যাবে।

এখানে—

অঙ্কিতা → উদ্দেশ্য
কাল সকালে বহরমপুর যাবে → বিধেয়
যাবে → সমাপিকা ক্রিয়া

সরল বাক্যে অসমাপিকা ক্রিয়া থাকতে পারে।

যেমন—

আমি বাড়ি গিয়ে তোমাকে ফোন করব।

এখানে ‘গিয়ে’ অসমাপিকা ক্রিয়া এবং ‘করব’ সমাপিকা ক্রিয়া। তবু বাক্যটি সরল।

সরল বাক্যে কর্তা উহ্যও হতে পারে।

যেমন—

ওকে কথাটা বলো।

এখানে ‘তুমি’ কর্তা উহ্য রয়েছে।


৯.২ যৌগিক বাক্য

দুই বা ততোধিক স্বাধীন খণ্ডবাক্য সংযোজক অব্যয়ের সাহায্যে যুক্ত হয়ে যে বাক্য তৈরি করে, তাকে যৌগিক বাক্য বলে।

উদাহরণ

লোকটি দরিদ্র কিন্তু সৎ।

এখানে দুটি স্বাধীন বক্তব্য—

লোকটি দরিদ্র।
লোকটি সৎ।

‘কিন্তু’ অব্যয়ের সাহায্যে তারা যুক্ত হয়ে যৌগিক বাক্য তৈরি করেছে।

আরও উদাহরণ—

তুমি আসবে এবং আমি তোমার সঙ্গে যাব।

সে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি।


৯.৩ জটিল বাক্য

যে বাক্যে একটি প্রধান খণ্ডবাক্যের অধীনে এক বা একাধিক অপ্রধান বা আশ্রিত খণ্ডবাক্য থাকে, তাকে জটিল বাক্য বলে।

উদাহরণ

আমি জানতাম যে তুমি আসবে।

এখানে—

আমি জানতাম → প্রধান খণ্ডবাক্য
যে তুমি আসবে → আশ্রিত খণ্ডবাক্য

আরও উদাহরণ—

যে লঙ্কায় যায়, সে রাবণ হয়।

এখানে একটি অংশ অন্য অংশের ওপর নির্ভরশীল।


সরল, যৌগিক ও জটিল বাক্য : একনজরে

বাক্যের ধরনবৈশিষ্ট্যউদাহরণ
সরলএকটি প্রধান খণ্ডবাক্যরাহুল বই পড়ে।
যৌগিকদুই বা ততোধিক স্বাধীন খণ্ডবাক্যসে এল এবং আমি গেলাম।
জটিলএকটি প্রধান + এক/একাধিক আশ্রিত খণ্ডবাক্যআমি জানি যে সে আসবে।

১০. বাক্যের ভঙ্গিগত বা অর্থগত শ্রেণিবিভাগ

বক্তার উদ্দেশ্য ও বক্তব্য প্রকাশের ভঙ্গি অনুসারে বাক্যেরও পার্থক্য ঘটে। কখনও আমরা তথ্য জানাই, কখনও প্রশ্ন করি, কখনও নির্দেশ বা অনুরোধ করি, আবার কখনও আবেগ প্রকাশ করি।

এই ভঙ্গির ভিত্তিতে বাক্যকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।


১০.১ নির্দেশক বা উক্তিবাচক বাক্য

যে বাক্যের দ্বারা কোনো বিষয়, ঘটনা বা তথ্যকে স্বীকার বা অস্বীকার করে প্রকাশ করা হয়, তাকে নির্দেশক বা উক্তিবাচক বাক্য বলে।

উদাহরণ

আজ আকাশ পরিষ্কার।

সে আজ স্কুলে যায়নি।

প্রথমটি অস্তিবাচক এবং দ্বিতীয়টি নেতিবাচক বক্তব্য প্রকাশ করে।


১০.২ প্রশ্নবাচক বাক্য

যে বাক্যের মাধ্যমে কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তাকে প্রশ্নবাচক বাক্য বলে।

প্রশ্নবাচক বাক্য প্রধানত দুই ধরনের—

ক. হ্যাঁ–না প্রশ্ন

যে প্রশ্নের উত্তর সাধারণত ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে দেওয়া যায়।

তুমি যাবে কি?

তুমি কি আজ স্কুলে যাবে?

খ. বস্তুগত প্রশ্ন

যে প্রশ্নের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, কাল, কারণ ইত্যাদি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য জানতে চাওয়া হয়।

তুমি কী খাবে?

কোথায় যাচ্ছ?

কে তোমাকে ডাকল?


১০.৩ অনুজ্ঞাবাচক বাক্য

যে বাক্যে আদেশ, নির্দেশ, অনুরোধ, উপদেশ, প্রার্থনা বা নিষেধ প্রকাশিত হয়, তাকে অনুজ্ঞাবাচক বাক্য বলে।

উদাহরণ

দরজাটা বন্ধ করো।

একটু অপেক্ষা করুন।

মন দিয়ে পড়ো।

এখানে এসো না।

অনুজ্ঞাবাচক বাক্যের কর্তা সাধারণত মধ্যম পুরুষ হয়।


১০.৪ বিস্ময়বাচক বা উচ্ছ্বাসবাচক বাক্য

যে বাক্যের মাধ্যমে বিস্ময়, আনন্দ, দুঃখ, রাগ, অভিমান বা অন্য কোনো তীব্র আবেগ প্রকাশিত হয়, তাকে বিস্ময়বাচক বা উচ্ছ্বাসবাচক বাক্য বলে।

উদাহরণ

আহা, কী সুন্দর দৃশ্য!

বাঃ, কী চমৎকার খেললে!

হায়, কী সর্বনাশ!


১১. বাক্যের গঠন ও অর্থ

বাক্যের গঠন এবং তার অর্থ পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

যেমন—

বাঘ ছাগলকে খেয়েছে।

এখানে ‘বাঘ’ কর্তা এবং ‘ছাগলকে’ কর্ম।

কিন্তু—

ছাগল বাঘকে খেয়েছে।

পদের অবস্থান ও পারস্পরিক সম্পর্ক পরিবর্তিত হওয়ায় বাক্যের অর্থও সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়েছে।

অতএব—

বাক্যের অর্থ নির্ধারণে পদের ক্রম ও পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


১২. বাক্যের গঠন : আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে বাক্যকে একটি বৃহত্তর গঠন হিসেবে দেখা হয় এবং সেই গঠনকে ক্রমশ ক্ষুদ্রতর উপাদানে বিশ্লেষণ করা হয়।

একটি বাক্যের গঠন হতে পারে—

বাক্য → উপবাক্য → পদগুচ্ছ → শব্দ → রূপমূল

এই স্তরভিত্তিক বিশ্লেষণের সাহায্যে বাক্যের অন্তর্গত সংগঠন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


১৩. বিশেষ্যজোট

বিশেষ্য বা সর্বনামকে কেন্দ্র করে যে পদগুচ্ছ গঠিত হয় এবং যা বাক্যে কর্তা, কর্ম ইত্যাদির ভূমিকা পালন করতে পারে, তাকে বিশেষ্যজোট বলে।

উদাহরণ

একদল ছাত্র বেরিয়ে গেল।

এখানে—

একদল ছাত্র → বিশেষ্যজোট

বিশেষ্যকে কেন্দ্র করে বিশেষণ, নির্দেশক, পরিমাণবাচক শব্দ ইত্যাদি যুক্ত হয়ে বৃহত্তর বিশেষ্যজোট গঠন করতে পারে।


১৪. অনুসর্গজোট

বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে অনুসর্গ বা পরসর্গ বসে যে জোট তৈরি হয়, তাকে অনুসর্গজোট বলে।

উদাহরণ

বড়ো পুকুরের পাশে ক্লাবঘর তৈরি হয়েছে।

এখানে—

বড়ো পুকুরের পাশে → অনুসর্গজোট


১৫. ক্রিয়াজোট

ক্রিয়াকে কেন্দ্র করে যে পদগুচ্ছ গঠিত হয়, তাকে ক্রিয়াজোট বা ক্রিয়াগুচ্ছ বলে।

উদাহরণ

তুমি তখন খাচ্ছিলে।

এখানে ‘খাচ্ছিলে’ ক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ক্রিয়াজোট গঠিত হয়েছে।

আবার—

সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর বসে পড়ল।

এখানে একাধিক ক্রিয়ার সমন্বয়ে বৃহত্তর ক্রিয়াগঠন তৈরি হয়েছে।


১৬. ক্রিয়াবিশেষণজোট

ক্রিয়ার সময়, স্থান, পদ্ধতি, কারণ ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য প্রদানকারী পদ বা পদগুচ্ছকে ক্রিয়াবিশেষণজোট হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

উদাহরণ

সে খুব মন দিয়ে পড়ছে।

এখানে—

খুব মন দিয়ে → ক্রিয়াবিশেষণজোট

আরও উদাহরণ—

সে আজ সকালে খুব তাড়াতাড়ি চলে গেল।

এখানে ‘আজ সকালে’ এবং ‘খুব তাড়াতাড়ি’ ক্রিয়ার কাল ও পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছে।


১৭. পদগুচ্ছের সংগঠন

বাক্যের প্রতিটি পদগুচ্ছ বা জোটের ভিতরেও একটি নির্দিষ্ট সংগঠন থাকে। কোনো জোটের একটি প্রধান পদ থাকে, যাকে মাথা (Head) বলা হয়; অন্যান্য পদ সেই প্রধান পদকে কেন্দ্র করে যুক্ত হয়।

অধীনস্থ অন্তর্মুখী সংগঠন

যে জোটে একটি প্রধান পদ তার বর্ধক বা সহায়ক উপাদানের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাকে অধীনস্থ অন্তর্মুখী সংগঠন বলা হয়।

যৌগিক অন্তর্মুখী সংগঠন

যে জোটে একাধিক প্রধান পদ বা মাথা থাকে, তাকে যৌগিক অন্তর্মুখী সংগঠন বলা হয়।


১৮. অব্যবহিত উপাদান

বাক্যতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণ

ইংরেজিতে—

Immediate Constituent — IC

বাক্যকে যখন ধাপে ধাপে বড়ো থেকে ছোটো অর্থপূর্ণ গঠনগত উপাদানে ভাগ করা হয়, তখন প্রতিটি স্তরে যে সরাসরি গঠনকারী অংশগুলি পাওয়া যায়, সেগুলিই অব্যবহিত উপাদান।


১৯. অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণের প্রবর্তক

বাক্যের অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণকে সুসংবদ্ধভাবে বিকশিত করেন মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী লেওনার্ড ব্লুমফিল্ড (Leonard Bloomfield)

এই বিশ্লেষণ মার্কিন গঠনবাদী বা Structuralist ভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।


২০. অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণের উদাহরণ

ধরা যাক—

আমরা যখন ফুটবল খেলছিলাম, তখন বাইচুং দর্শকাসনে বসেছিলেন।

প্রথমে সম্পূর্ণ বাক্যটিকে দুটি বৃহৎ অংশে ভাগ করা যায়—

আমরা যখন ফুটবল খেলছিলাম
+
তখন বাইচুং দর্শকাসনে বসেছিলেন

এরপর এই অংশগুলিকে আরও ক্ষুদ্র উপাদানে ভাগ করা যায়।

এইভাবে—

বৃহত্তর গঠন → ক্ষুদ্রতর গঠন → আরও ক্ষুদ্র গঠন

এই ক্রমে বাক্যের অন্তর্গত সংগঠন প্রকাশ করা হয়।


২১. অব্যবহিত উপাদান বিভাজনের তিনটি নীতি

অব্যবহিত উপাদান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—

১. অভ্যন্তরীণ ঐক্য
২. অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য
৩. স্বাধীনতা


২১.১ অভ্যন্তরীণ ঐক্য

কোনো জোটের অন্তর্গত পদগুলির মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ উপাদানগত সম্পর্ক থাকে, তাকে অভ্যন্তরীণ ঐক্য বলে।

এই ঐক্য থেকেই বোঝা যায় কোন পদগুলি একসঙ্গে একটি গঠন তৈরি করেছে।


২১.২ অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য

একটি জোটের অন্তর্গত পদগুলির মধ্যে যেমন ঐক্য থাকে, তেমনি তাদের কাজ ও প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্যও থাকে। এই বৈচিত্র্য পৃথক উপাদান চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।


২১.৩ স্বাধীনতা

কোনো পদগুচ্ছ যদি বাক্যের অন্য অংশ থেকে কিছুটা পৃথক হয়ে অন্য পরিবেশেও ব্যবহৃত হতে পারে, তবে তার গঠনগত স্বাতন্ত্র্য বোঝা যায়। তাই অব্যবহিত উপাদান নির্ণয়ে স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ।


২২. অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা

এই পদ্ধতির সাহায্যে—

  • বাক্যের অন্তর্গত গঠন স্পষ্ট হয়;
  • কোন পদ কোন পদগুচ্ছের অংশ তা বোঝা যায়;
  • পদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা যায়;
  • বাক্যের গঠনগত স্তরগুলি শনাক্ত করা যায়;
  • বিশেষ্যজোট, অনুসর্গজোট, ক্রিয়াজোট ইত্যাদি চিহ্নিত করা যায়।

অর্থাৎ বাক্যকে শুধু শব্দের সারি হিসেবে না দেখে একটি সুশৃঙ্খল গঠন হিসেবে বোঝার সুযোগ দেয় অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণ।


২৩. অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতা

এই পদ্ধতি বাক্যের গঠন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

১. দ্ব্যর্থকতার সমস্যা

একটি বাক্যের একাধিক অর্থ থাকলে শুধু উপাদান বিভাজনের মাধ্যমে সব সময় তার প্রকৃত অর্থ নির্ণয় করা যায় না।

২. অর্থগত সমস্যার সীমা

বাক্যের অন্তর্গত গঠন বিশ্লেষণ করলেও সব সময় তার রূপক বা গভীর অর্থ ধরা যায় না।

৩. প্রয়োগগত সমস্যা

কথ্য ভাষায় অনেক সময় কিছু পদ উহ্য থাকে কিংবা প্রসঙ্গের ওপর অর্থ নির্ভর করে। সে ক্ষেত্রে শুধু গঠনগত বিশ্লেষণ যথেষ্ট নয়।

অতএব, বাক্যের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যার জন্য গঠন, অর্থ ও প্রয়োগ—তিনটি দিকই বিবেচনা করা প্রয়োজন।


২৪. স্যোসুরের ভাষাবৈজ্ঞানিক সম্পর্ক

ফের্দিনাঁ দ্য স্যোসুর ভাষার উপাদানগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলেছেন—

১. সিনট্যাগম্যাটিক (Syntagmatic) সম্পর্ক
২. প্যারাডাইগম্যাটিক (Paradigmatic) সম্পর্ক

সিনট্যাগম্যাটিক সম্পর্ক

বাক্যে উপাদানগুলি যখন পাশাপাশি অবস্থান করে এবং পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, তখন তাকে সিনট্যাগম্যাটিক সম্পর্ক বলে।

যেমন—

আমি বাংলা পড়ি।

এখানে ‘আমি’, ‘বাংলা’ ও ‘পড়ি’ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাক্য তৈরি করেছে।

প্যারাডাইগম্যাটিক সম্পর্ক

একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে সম্ভাব্য একাধিক উপাদানের মধ্যে কোনো একটি নির্বাচন বা প্রতিস্থাপনের সম্পর্ককে প্যারাডাইগম্যাটিক সম্পর্ক বলে।

যেমন—

আমি বাংলা পড়ি।

এখানে ‘বাংলা’-র পরিবর্তে—

ইতিহাস / বিজ্ঞান / ইংরেজি / দর্শন

ইত্যাদি বসতে পারে।


২৫. কমপিটেন্স ও পারফরম্যান্স

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে Competence ও Performance—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা নোয়াম চমস্কির সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত।

কমপিটেন্স

একজন ভাষাভাষীর মনের মধ্যে তার ভাষার নিয়ম ও গঠন সম্পর্কে যে অন্তর্নিহিত জ্ঞান থাকে এবং যার সাহায্যে সে অসংখ্য নতুন বাক্য তৈরি ও বুঝতে পারে, তাকে কমপিটেন্স বলে।

পারফরম্যান্স

বাস্তব জীবনে সেই ভাষাজ্ঞান ব্যবহার করে যে ভাষিক আচরণ বা ভাষা-প্রয়োগ ঘটে, তাকে পারফরম্যান্স বলে।


২৬. LAD

LAD-এর পূর্ণরূপ—

Language Acquisition Device

বাংলায়—ভাষা-অধিগ্রহণ যন্ত্র

চমস্কির ভাষাতাত্ত্বিক ধারণায় মানুষের ভাষা অর্জনের সহজাত সামর্থ্য বোঝাতে এই পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়।


২৭. সঞ্জননী ব্যাকরণ

নির্দিষ্ট নিয়মের সাহায্যে মানুষের অসংখ্য বাক্য কীভাবে উৎপন্ন বা সঞ্জাত হতে পারে, তার ব্যাখ্যা যে ব্যাকরণে দেওয়া হয়, তাকে সঞ্জননী ব্যাকরণ বলে।

ইংরেজিতে—

Generative Grammar

এটি নোয়াম চমস্কির ভাষাতাত্ত্বিক চিন্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।


২৮. সংবর্তনী ব্যাকরণ

একটি বাক্যগঠনকে নির্দিষ্ট নিয়মে অন্য একটি গঠনে পরিবর্তিত করার প্রক্রিয়াকে সংবর্তন বা Transformation বলা হয়।

সঞ্জননী ব্যাকরণের সঙ্গে এই রূপান্তর-প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। তাই চমস্কির ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনায় সঞ্জননী–সংবর্তনী ব্যাকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা।


২৯. বাক্যতত্ত্বের সামগ্রিক পরিসর

বাক্যতত্ত্বের আলোচনায় তাই শুধু সরল, যৌগিক ও জটিল বাক্যের পার্থক্য জানলেই বিষয়টি সম্পূর্ণ হয় না। এর বিস্তৃত পরিসরে রয়েছে—

বাক্য → উদ্দেশ্য–বিধেয় → প্রসারক–পূরক → পদক্রম → পদগুচ্ছ → জোট → অব্যবহিত উপাদান → গঠন বিশ্লেষণ → স্যোসুরের সম্পর্ক → চমস্কির ভাষাতত্ত্ব

এই কারণেই বাক্যতত্ত্ব ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্রীয় ও গুরুত্বপূর্ণ শাখা।


একনজরে বাক্যতত্ত্ব

বাক্যতত্ত্বের ইংরেজি পরিভাষা : Syntax

সার্থক বাক্যের গুণ : আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি, যোগ্যতা

বাক্যের প্রধান দুটি অংশ : উদ্দেশ্য ও বিধেয়

যার সম্পর্কে বলা হয় : উদ্দেশ্য

উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বলা হয় : বিধেয়

উদ্দেশ্য ও বিধেয়কে বিস্তৃত করে : প্রসারক

বিধেয়ের ক্রিয়ার অর্থ সম্পূর্ণ করে : পূরক

গঠন অনুসারে বাক্য : সরল, যৌগিক, জটিল

প্রধান + আশ্রিত খণ্ডবাক্য : জটিল বাক্য

স্বাধীন + স্বাধীন খণ্ডবাক্য : যৌগিক বাক্য

বাংলা বাক্যের সাধারণ পদক্রম : কর্তা + কর্ম + ক্রিয়া

অব্যবহিত উপাদান : Immediate Constituent বা IC

অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত : লেওনার্ড ব্লুমফিল্ড

অব্যবহিত উপাদান বিভাজনের নীতি : অভ্যন্তরীণ ঐক্য, অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য, স্বাধীনতা

প্রধান জোট : বিশেষ্যজোট, অনুসর্গজোট, ক্রিয়াজোট, ক্রিয়াবিশেষণজোট

সিনট্যাগম্যাটিক ও প্যারাডাইগম্যাটিক সম্পর্ক : স্যোসুর

কমপিটেন্স ও পারফরম্যান্স : চমস্কি

LAD : Language Acquisition Device

সঞ্জননী ব্যাকরণ : Generative Grammar

সংবর্তন : Transformation


নির্বাচিত প্রশ্নোত্তর

১। বাক্যতত্ত্ব কাকে বলে?

উত্তর : বাক্যের গঠন, পদের বিন্যাস, পদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বাক্যগঠনের নিয়ম নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানের যে শাখায় আলোচনা করা হয়, তাকে বাক্যতত্ত্ব বলে।

২। বাক্যতত্ত্বের ইংরেজি পরিভাষা কী?

উত্তর : Syntax

৩। সার্থক বাক্যের তিনটি গুণ কী?

উত্তর : আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা।

৪। আকাঙ্ক্ষা কাকে বলে?

উত্তর : বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ করার জন্য এক পদের পর অন্য পদ শোনার যে স্বাভাবিক প্রত্যাশা তৈরি হয়, তাকে আকাঙ্ক্ষা বলে।

৫। আসত্তি কাকে বলে?

উত্তর : বাক্যের পদগুলির মধ্যে অর্থের সঙ্গতি বজায় রাখার জন্য তাদের সুশৃঙ্খল বিন্যাস ও যথাযথ নৈকট্যকে আসত্তি বলে।

৬। যোগ্যতা কাকে বলে?

উত্তর : বাক্যে ব্যবহৃত পদগুলির মধ্যে অর্থগত ও ভাবগত সামঞ্জস্যকে যোগ্যতা বলে।

৭। বাক্যের প্রধান দুটি অংশ কী?

উত্তর : উদ্দেশ্য ও বিধেয়।

৮। উদ্দেশ্য কাকে বলে?

উত্তর : বাক্যে যাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলা হয়, তাকে উদ্দেশ্য বলে।

৯। বিধেয় কাকে বলে?

উত্তর : উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বলা হয়, তাকে বিধেয় বলে।

১০। প্রসারক কী?

উত্তর : উদ্দেশ্য বা বিধেয়কে যে শব্দ বা পদগুচ্ছ বিস্তৃত বা প্রসারিত করে, তাকে প্রসারক বলে।

১১। বিধেয়ের পূরক কী?

উত্তর : বিধেয়ের ক্রিয়ার অর্থকে সম্পূর্ণ করতে যে বিশেষ্যজাতীয় অংশ ব্যবহৃত হয়, তাকে বিধেয়ের পূরক বলে।

১২। গঠনগত দিক থেকে বাক্য কত প্রকার?

উত্তর : তিন প্রকার—সরল, যৌগিক ও জটিল।

১৩। সরল বাক্য কী?

উত্তর : যে বাক্যে একটি মাত্র প্রধান খণ্ডবাক্য থাকে এবং একটি সমাপিকা ক্রিয়াকেন্দ্রের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশিত হয়, তাকে সরল বাক্য বলে।

১৪। যৌগিক বাক্য কী?

উত্তর : দুই বা ততোধিক স্বাধীন খণ্ডবাক্য সংযোজক অব্যয়ের সাহায্যে যুক্ত হয়ে যে বাক্য গঠন করে, তাকে যৌগিক বাক্য বলে।

১৫। জটিল বাক্য কী?

উত্তর : একটি প্রধান খণ্ডবাক্যের অধীনে এক বা একাধিক আশ্রিত খণ্ডবাক্য থাকলে তাকে জটিল বাক্য বলে।

১৬। অব্যবহিত উপাদান কী?

উত্তর : বাক্যকে ধাপে ধাপে বৃহত্তর থেকে ক্ষুদ্রতর গঠনগত উপাদানে বিভক্ত করার সময় প্রতিটি স্তরে যে সরাসরি গঠনকারী অংশ পাওয়া যায়, তাকে অব্যবহিত উপাদান বলে।

১৭। অব্যবহিত উপাদানের ইংরেজি কী?

উত্তর : Immediate Constituent (IC)

১৮। অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণের সঙ্গে কার নাম যুক্ত?

উত্তর : মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী লেওনার্ড ব্লুমফিল্ড-এর নাম অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত।

১৯। অব্যবহিত উপাদান বিভাজনের তিনটি নীতি কী?

উত্তর : অভ্যন্তরীণ ঐক্য, অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য এবং স্বাধীনতা।

২০। বিশেষ্যজোট কী?

উত্তর : বিশেষ্য বা সর্বনামকে কেন্দ্র করে গঠিত যে পদগুচ্ছ বাক্যে কর্তা, কর্ম ইত্যাদির ভূমিকা পালন করতে পারে, তাকে বিশেষ্যজোট বলে।

২১। অনুসর্গজোট কী?

উত্তর : বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে অনুসর্গ বা পরসর্গ বসে যে জোট তৈরি হয়, তাকে অনুসর্গজোট বলে।

২২। ক্রিয়াজোট কী?

উত্তর : ক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গঠিত পদগুচ্ছকে ক্রিয়াজোট বলে।

২৩। সিনট্যাগম্যাটিক সম্পর্ক কী?

উত্তর : বাক্যে পাশাপাশি অবস্থানকারী ভাষিক উপাদানগুলির পারস্পরিক সম্পর্ককে সিনট্যাগম্যাটিক সম্পর্ক বলে।

২৪। প্যারাডাইগম্যাটিক সম্পর্ক কী?

উত্তর : কোনো নির্দিষ্ট অবস্থানে সম্ভাব্য একাধিক ভাষিক উপাদানের মধ্যে নির্বাচন বা প্রতিস্থাপনের সম্পর্ককে প্যারাডাইগম্যাটিক সম্পর্ক বলে।

২৫। কমপিটেন্স কী?

উত্তর : ভাষাভাষীর মনের মধ্যে নিহিত ভাষার নিয়ম ও গঠন সম্পর্কে অন্তর্নিহিত জ্ঞানকে কমপিটেন্স বলে।

২৬। পারফরম্যান্স কী?

উত্তর : বাস্তব ভাষাব্যবহারে সেই অন্তর্নিহিত ভাষাজ্ঞানের প্রয়োগকে পারফরম্যান্স বলে।

২৭। LAD-এর পূর্ণরূপ কী?

উত্তর : Language Acquisition Device

২৮। সঞ্জননী ব্যাকরণ কী?

উত্তর : নির্দিষ্ট নিয়মের সাহায্যে অসংখ্য বাক্য কীভাবে উৎপন্ন বা সঞ্জাত হয়, তার ব্যাখ্যা যে ব্যাকরণে দেওয়া হয়, তাকে সঞ্জননী ব্যাকরণ বলে।

২৯। সংবর্তন কী?

উত্তর : একটি বাক্যগঠনকে নির্দিষ্ট নিয়মে অন্য একটি গঠনে পরিবর্তিত করার প্রক্রিয়াকে সংবর্তন বা Transformation বলে।


পরীক্ষার জন্য স্মরণীয় সূত্র

Syntax → বাক্যতত্ত্ব

আকাঙ্ক্ষা → প্রত্যাশা

আসত্তি → সুশৃঙ্খল পদবিন্যাস

যোগ্যতা → অর্থগত মেলবন্ধন

উদ্দেশ্য → যার সম্পর্কে বলা হয়

বিধেয় → উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বলা হয়

প্রসারক → উদ্দেশ্য/বিধেয়কে প্রসারিত করে

পূরক → বিধেয়ের ক্রিয়ার অর্থ সম্পূর্ণ করে

সরল → একটি প্রধান খণ্ডবাক্য

যৌগিক → স্বাধীন + স্বাধীন

জটিল → প্রধান + আশ্রিত

IC → অব্যবহিত উপাদান

IC বিশ্লেষণ → ব্লুমফিল্ড

IC-এর নীতি → ঐক্য + বৈচিত্র্য + স্বাধীনতা

সিনট্যাগম্যাটিক → পাশাপাশি সম্পর্ক

প্যারাডাইগম্যাটিক → বিকল্প/প্রতিস্থাপন সম্পর্ক

Competence → অন্তর্নিহিত ভাষাজ্ঞান

Performance → বাস্তব ভাষাপ্রয়োগ

LAD → Language Acquisition Device

Generative Grammar → সঞ্জননী ব্যাকরণ

Transformation → সংবর্তন

### পরিবেশনে- ড. অনিশ রায়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top