ভূমিকা
ক্রীড়া মানুষের জীবনের এক প্রাচীন ও স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখার পাশাপাশি ক্রীড়া মানুষের সাহস, শৃঙ্খলা, সহিষ্ণুতা, সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলে। কিন্তু ক্রীড়ার তাৎপর্য কেবল শরীরচর্চা ও বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; একটি জাতির সামাজিক জীবন, লোকাচার, উৎসব, অবসরবিনোদন, সামষ্টিক চেতনা এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও ক্রীড়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতির ইতিহাসও তাই কেবল ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা কয়েকজন কৃতী খেলোয়াড়ের ইতিহাস নয়। এর বিস্তৃত পরিসরে রয়েছে দেশীয় ও লোকজ খেলা, মল্লযুদ্ধ, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, দাবা, শরীরচর্চা, ঔপনিবেশিক যুগে আধুনিক খেলার আগমন, ক্লাব-সংস্কৃতির বিকাশ, জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে ক্রীড়ার সংযোগ, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাঙালির সাফল্য এবং ক্রীড়ার সঙ্গে শিল্প, বিনোদন ও সংস্কৃতির সম্পর্ক।
বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতির ইতিহাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সাহিত্য, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতত্ত্ব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
১. বাঙালির দেশীয় ক্রীড়ার ঐতিহ্য
আধুনিক ফুটবল, ক্রিকেট, হকি কিংবা টেনিস বাংলায় আসার বহু আগে থেকেই বাঙালির নিজস্ব ক্রীড়াজগৎ ছিল। গ্রামবাংলার মাঠ, নদী, পাড়া, মেলা ও উৎসবকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের খেলাধুলার প্রচলন ছিল।
দেশীয় খেলাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
হা-ডু-ডু, কাবাডি, খো-খো, ডাংগুলি, গোল্লাছুট, কানামাছি, নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, কুস্তি প্রভৃতি।
এ ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত ছিল—
কুমির-কুমির, হরি-হরি, ঝিঁঝো ফুল কাঁকুড় কাঁকুড়, লোফালুফি, ঝাল-ঝাপটা, ফুঁ-দেওয়া-দেই, হুন-হুন, ছাগল-পাগল, নুড়ো, ছোঁড়াছুঁড়ি, সাঁকো, খুদ মাগবি, গাদাগাদি, হাঁস হাঁস, ডাব ডবা, পায়রা গন গন, ঝাঁশি চোর, কমরিয়া, উট্টা-বসা, চোর-ধরাধরি, গাছ-বাঘ, লোটা, সট-চলা, নৌডুবি, লবণ মাপানি, হাইসু ডুল, বুদ্ধিমস্ত, আখ ভাঙাগাঙি, ঝাপ-বলুটি, গিলা, ব্যাং ডিভিনি, পিপীলিকার সার, গগ্গা পারাপারি, ঠ্যাং লাঠি, ছি পাঁঠা, খেটে খেলা, ভেটা মারি, ছি বুড়ি, হাতাই, বট চিক প্রভৃতি।
এই বিপুল বৈচিত্র্য থেকেই বোঝা যায়, বাঙালির ক্রীড়াজীবন কত গভীরভাবে লোকসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
২. দেশীয় খেলাধুলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
দেশীয় খেলাগুলি নিছক অবসরবিনোদনের মাধ্যম ছিল না। এগুলির মধ্যে একসঙ্গে কাজ করত—
দৈহিক কসরত, নৃত্য, গান, ছড়া, ছন্দ, দলগত সহযোগিতা, সাহস, সহিষ্ণুতা ও সামাজিক সংহতি।
খেলার মধ্য দিয়ে শিশুরা শিখত নিয়ম মেনে চলা, দলগতভাবে কাজ করা, জয়-পরাজয়কে গ্রহণ করা এবং অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করা। অর্থাৎ দেশীয় খেলা ছিল এক ধরনের লোকশিক্ষার স্বাভাবিক পদ্ধতি।
আধুনিক খেলাধুলার প্রসারের ফলে বহু প্রাচীন লোকখেলা আজ বিলুপ্তির পথে। অথচ বাঙালির নিজস্ব ক্রীড়া-ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে এই খেলাগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।
৩. উপনিবেশিক যুগে আধুনিক খেলার আগমন
ইংরেজদের আগমনের সঙ্গে বাংলায় ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, টেনিস, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল প্রভৃতি আধুনিক খেলার প্রবেশ ঘটে।
প্রথমদিকে এগুলি ছিল মূলত ইউরোপীয়দের খেলা। কিন্তু বাঙালি অল্প সময়ের মধ্যেই এই খেলাগুলিকে আত্মস্থ করে। গড়ে ওঠে দেশীয় ক্লাব, প্রতিযোগিতা ও ক্রীড়া-সংগঠন।
বিদেশি খেলাকে বাঙালি নিছক অনুকরণ করেনি; ধীরে ধীরে তাকে নিজের সামাজিক ও জাতীয় জীবনের অংশ করে তুলেছে।
৪. হিন্দুমেলা ও শরীরচর্চা
১৮৬৭ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতায় প্রথম হিন্দুমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, মনোমোহন বসু এবং ঠাকুর পরিবারের কয়েকজন সদস্য।
হিন্দুমেলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তোলা, দেশীয় শিল্প ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করা এবং বাঙালির মধ্যে স্বদেশচেতনা সৃষ্টি করা।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শরীরচর্চা। ব্যায়াম, ক্রীড়া ও শারীরিক সক্ষমতাকে জাতীয় শক্তির অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ভাবা হতে থাকে।
এইভাবেই উনিশ শতকের জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে বাঙালির শরীরচর্চা ও ক্রীড়ার সম্পর্ক দৃঢ় হয়।
৫. মল্লযুদ্ধ ও কুস্তি
ভারতীয় ঐতিহ্যে কুস্তির প্রাচীন নাম মল্লযুদ্ধ। রাজা, জমিদার ও বিত্তবান ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন অঞ্চলে আখড়া গড়ে উঠেছিল।
বাংলার কুস্তির ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাম গোবর গুহ। তাঁর প্রকৃত নাম যতীন্দ্রচরণ গুহ।
তিনি বাংলার কুস্তিকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। কুস্তির বিভিন্ন কৌশলের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। ঢাক, ধোঁকা, ধোবাপাট প্রভৃতি কুস্তির প্যাঁচ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আরও একজন উল্লেখযোগ্য কুস্তিগির হলেন ফণীন্দ্রকৃষ্ণ গুপ্ত।
৬. দাবা
দাবা বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতিতে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রীড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এতে শারীরিক শক্তির পরিবর্তে পরিকল্পনা, কৌশল, ধৈর্য ও দূরদৃষ্টির পরীক্ষা হয়।
আধুনিক যুগে বাংলার বহু দাবাড়ু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
দিব্যেন্দু বড়ুয়া, সূর্যশেখর গাঙ্গুলী, নীলোৎপল দাস, দীপ সেনগুপ্ত, সপ্তর্ষি রায়চৌধুরী, দীপ্তায়ন ঘোষ প্রমুখ।
৭. ফুটবল : বাংলার ক্রীড়াজীবনের নতুন অধ্যায়
আধুনিক বাংলার ক্রীড়াসংস্কৃতিতে ফুটবলের প্রভাব গভীরতম।
বাংলায় ফুটবলের প্রসারে নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী-র ভূমিকা স্মরণীয়। তিনি বিভিন্ন শ্রেণির যুবকদের একত্র করে শরীরচর্চার সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন।
তিনি ওয়েলিংটন ক্লাব-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানে সামাজিক বিভাজনের কারণে দেশীয় খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণে আপত্তি দেখা দিলে তিনি ক্লাবটি ভেঙে দেন।
ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল। তাঁর উদ্যোগে Harrison Shield প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং সাহেবদের প্রতিষ্ঠিত ক্লাবে ভারতীয় খেলোয়াড়দের প্রবেশের পথ প্রশস্ত হয়।
১৮৮৩ সালে তিনি কলকাতায় ভারতীয়দের নিয়ে বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
৮. নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী
নগেন্দ্রপ্রসাদ ছিলেন একজন ক্রীড়াবিদ, সংগঠক ও উদ্যোক্তা। ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেট, রাগবি, হকি ও টেনিসের প্রসারেও তাঁর ভূমিকা ছিল।
IFA Shield গঠনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র ভারতীয়।
বাঙালি ফুটবলারদের মধ্যে তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়, কারণ তিনি বিদেশি খেলাকে গ্রহণ করেও তাকে ভারতীয় সমাজের নিজস্ব ক্রীড়া-পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন।
তাঁর ডাকনাম ছিল—
‘জুজুর’।
৯. ফুটবল ক্লাবের বিকাশ
উনিশ শতকের শেষভাগে কলকাতায় একের পর এক দেশীয় ফুটবল ক্লাব গড়ে উঠতে থাকে।
১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শোভাবাজার ক্লাব।
এরপর গড়ে ওঠে—
- কুমারটুলি ক্লাব
- ওরেলিয়ন ক্লাব
- টাউন ক্লাব
- ন্যাশনাল ক্লাব
১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মোহনবাগান ক্লাব।
১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব।
১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় Indian Football Association (IFA) এবং শুরু হয় IFA Shield।
১৮৯৮ সালে শুরু হয় কলকাতা ফুটবল লিগ।
১০. ১৯১১ : মোহনবাগানের ঐতিহাসিক বিজয়
বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতির ইতিহাসে ১৯১১ একটি অবিস্মরণীয় বছর।
মোহনবাগান IFA Shield-এর ফাইনালে East Yorkshire Regiment-কে পরাজিত করে।
এই বিজয় ছিল ঔপনিবেশিক ভারতে ক্রীড়াক্ষেত্রে ভারতীয় আত্মমর্যাদার এক প্রতীকী বিজয়। ব্রিটিশ দলের বিরুদ্ধে একটি ভারতীয় দলের সাফল্য সাধারণ মানুষের মনে গভীর জাতীয়তাবাদী আবেগ সৃষ্টি করেছিল।
তাই ১৯১১-এর মোহনবাগান শুধু একটি ফুটবল দল নয়; তা হয়ে ওঠে—
বাঙালির আত্মমর্যাদা ও স্বদেশচেতনার প্রতীক।
১১. মহামেডান স্পোর্টিং ও ইস্টবেঙ্গল
১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত মহামেডান স্পোর্টিং কলকাতার ফুটবল সংস্কৃতিকে বহুসামাজিক ও বহুসাংস্কৃতিক চরিত্র দেয়।
১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইস্টবেঙ্গল ক্লাব পূর্ববঙ্গ থেকে আগত মানুষের সামাজিক স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে।
এই তিন ক্লাব—মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও মহামেডান স্পোর্টিং—কলকাতার ফুটবল-সংস্কৃতিকে এক স্বতন্ত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মাত্রা দিয়েছে।
১২. বাংলার উল্লেখযোগ্য ফুটবলার
বাংলার ফুটবল-ঐতিহ্যে বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের আবির্ভাব ঘটেছে।
উল্লেখযোগ্য নাম—
শিবদাস ভাদুড়ি, গোষ্ঠ পাল, শৈলেন মান্না, চুনী গোস্বামী, পিটার থঙ্গরাজ, ভাস্কর গাঙ্গুলি, শিবাজি ব্যানার্জি, সুব্রত ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, অলোক মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
১৩. ক্রিকেট
বাংলায় ক্রিকেটের ইতিহাসও ঔপনিবেশিক যুগের সঙ্গে যুক্ত। ইংরেজদের খেলা হিসেবে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই বাঙালি সমাজে এর বিস্তার ঘটে।
Calcutta Cricket Club ক্রিকেটের প্রাথমিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলায় ক্রিকেটের সংগঠিত প্রসারের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নাম—
সারদারঞ্জন রায়চৌধুরী।
১৪. সারদারঞ্জন রায়চৌধুরী
সারদারঞ্জন রায়চৌধুরীকে বলা হয়—
‘বাংলার ক্রিকেটের জনক’।
ক্রিকেটের প্রচার, প্রশিক্ষণ ও সংগঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য।
তিনি ঢাকা কলেজ ক্রিকেটের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর রচিত—
‘ক্রিকেট খেলা’
বাংলা ভাষায় ক্রিকেটবিষয়ক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
১৫. বাংলা ক্রিকেটের উত্তরাধিকার
পরবর্তী সময়ে বাংলার ক্রিকেটে বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের আবির্ভাব ঘটে।
উল্লেখযোগ্য—
পঙ্কজ রায়, সৌরভ গাঙ্গুলী, লক্ষ্মীরতন শুক্ল, ঋদ্ধিমান সাহা প্রমুখ।
বাংলার ক্রিকেট ভারতীয় ক্রিকেটের বৃহত্তর ইতিহাসের সঙ্গে ক্রমশ একীভূত হয়।
১৬. সৌরভ গাঙ্গুলী
বাংলার ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে সৌরভ গাঙ্গুলী-র ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ভারতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তিনি ভারতীয় ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাস, আগ্রাসী মানসিকতা ও নেতৃত্বের নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন।
একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর মোট রান—
১১,৩৬৩।
১৭. মহিলা ক্রিকেট : ঝুলন গোস্বামী
বাংলার মহিলা ক্রিকেটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি ঝুলন গোস্বামী।
তিনি ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের অন্যতম সফল পেস বোলার।
২০১০ সালে তিনি অর্জুন পুরস্কার লাভ করেন।
১৮. হকি
ভারতের ক্রীড়াসংস্কৃতিতে হকির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
১৯২৮ সালে আমস্টারডাম অলিম্পিকে ভারত প্রথম হকিতে স্বর্ণপদক লাভ করে।
এরপর ভারত পরপর ছয়টি অলিম্পিকে—
১৯২৮, ১৯৩২, ১৯৩৬, ১৯৪৮, ১৯৫২ ও ১৯৫৬
স্বর্ণপদক অর্জন করে।
কলকাতার বেটন কাপ ভারতীয় হকির প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক।
১৯. সাঁতার
বাংলার ক্রীড়া-ইতিহাসে সাঁতার একটি বিশেষ উজ্জ্বল অধ্যায়। এই ক্ষেত্রে তিনটি নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়—
মিহির সেন — আরতি সাহা — বুলা চৌধুরী।
১৯.১ মিহির সেন
মিহির সেন প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের ঐতিহাসিক কৃতিত্ব অর্জন করেন।
১৯৫৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন।
১৯৫৯ সালে তিনি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন।
পরবর্তীকালে পাঁচটি মহাদেশ-সংলগ্ন মহাসাগরে সাঁতার কাটার বিরল কৃতিত্বও তিনি অর্জন করেন।
১৯.২ আরতি সাহা
বাংলার নারী ক্রীড়া-ইতিহাসে আরতি সাহা এক অনন্য নাম।
১৯৪৫ সাল থেকে তিনি প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে সাফল্য অর্জন করতে থাকেন এবং ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ২২ বার রাজ্য চ্যাম্পিয়ন হন।
১৯৫৯ সালে তিনি এশিয়ার প্রথম মহিলা হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন।
এই ঐতিহাসিক কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬০ সালে তিনি পদ্মশ্রী লাভ করেন।
১৯.৩ বুলা চৌধুরী
বুলা চৌধুরী বাংলার অন্যতম খ্যাতনামা দীর্ঘদূরত্বের সাঁতারু।
অল্প বয়স থেকেই তিনি প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে সাফল্য অর্জন করেন এবং পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিতি লাভ করেন।
২০. টেবিল টেনিস
‘পিং পং’ নামে পরিচিত খেলাটির প্রকৃত নাম টেবিল টেনিস।
বাংলায় এই খেলার সাংগঠনিক বিকাশে Bengal Table Tennis Association গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উল্লেখযোগ্য বাঙালি খেলোয়াড়—
ভারতী ঘোষ, পৌলোমী ঘটক প্রমুখ।
উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি টেবিল টেনিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
২১. ব্যাডমিন্টন
কলকাতায় ব্যাডমিন্টনের প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে।
Calcutta Badminton Club ভারতের প্রাচীন ব্যাডমিন্টন প্রতিষ্ঠানগুলির অন্যতম।
বাংলার উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড়দের মধ্যে মধুমিতা গোস্বামী-র নাম স্মরণীয়।
২২. কবাডি
কবাডি বাংলার দেশীয় ক্রীড়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
পশ্চিমবঙ্গে কবাডির প্রসারে নারায়ণচন্দ্র ঘোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৩৮ সালে কলকাতায় কবাডি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
২৩. খো-খো
খো-খো ভারতের প্রাচীন দলগত খেলাগুলির অন্যতম।
১৯৭১ সালে পাটিয়ালার NSNIS কেন্দ্রে খো-খো প্রশিক্ষক তৈরির প্রথম Orientation Course অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম কোর্সে বাংলার প্রণব রায় অংশ নেন।
১৯৮২ সালের দিল্লি এশিয়ান গেমসে খো-খো প্রদর্শনী খেলা হিসেবে স্থান পায়।
১৯৮৫ সালে খেলাটি Indian Olympic Association-এর স্বীকৃতি লাভ করে।
১৯৮৭ সালে রাশিয়ায় ভারত উৎসব উপলক্ষে ভারতীয় খো-খো দল প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নেয়।
২৪. ভলিবল
YMCA-র উদ্যোগে ভলিবলের প্রসার ঘটে।
পশ্চিমবঙ্গে ১৯২৭ সালে YMCA-র উদ্যোগে ভলিবল খেলা শুরু হয়।
১৯৩৩ সালে বাগবাজার জিমনাসিয়াম ক্লাব প্রতিযোগিতামূলক ভলিবল খেলার প্রচলন করে।
১৯৩৬ সালে Bengal Volleyball Federation গঠিত হয়।
ভারতীয় ভলিবল দলের সঙ্গে যুক্ত বাঙালিদের মধ্যে সুনীল চ্যাটার্জি-র নাম উল্লেখযোগ্য।
২৫. অ্যাথলেটিকস
বাংলার অ্যাথলেটিকস-ঐতিহ্যে জ্যোতির্ময়ী শিকদার বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য অর্জন করে ভারতীয় অ্যাথলেটিকসকে পরিচিতি দিয়েছেন।
২৬. তিরন্দাজি
আধুনিক বাংলার তিরন্দাজিতে উল্লেখযোগ্য নাম—
দোলা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাঁদের সাফল্য বাংলার ক্রীড়া-পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে।
২৭. শুটিং
বাংলার ক্রীড়াসংস্কৃতির আলোচনায় শুটিংয়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ক্রীড়াবিদদের প্রসঙ্গ আসে।
যশপাল রানা ভারতীয় শুটিংয়ের অন্যতম পরিচিত নাম।
২৮. পর্বতারোহণ
বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতির এক স্বতন্ত্র অধ্যায় হল পর্বতারোহণ।
১৯৫০ সালে এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে প্রথম এভারেস্ট আরোহণ করেন।
এর পর ১৯৫৪ সালে দার্জিলিংয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়—
Himalayan Mountaineering Institute (HMI)।
এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জওহরলাল নেহরু ও বিধানচন্দ্র রায়-এর উদ্যোগ যুক্ত ছিল।
বাংলার পর্বতারোহণের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য নাম—
বিশ্বদেব বিশ্বাস, অনন্য সেন, সতব্রত দাম, প্রশেনজিৎ চক্রবর্তী, বসন্ত সিংহ রায়, দেবাশিস বিশ্বাস, দেবরাজ দত্ত, কুঞ্জা ভুটিয়া, মেজর শিপ্রা মজুমদার, ছন্দা গায়েন, দীপঙ্কর ঘোষ প্রমুখ।
পর্বতারোহণকে সাহিত্যেও জনপ্রিয় করে তুলেছেন—
উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, প্রবোধকুমার সান্যাল, শঙ্কু মহারাজ, গৌরবিকাশ ঘোষ প্রমুখ।
২৯. ব্রতচারী আন্দোলন
বাংলার ক্রীড়া ও শরীরচর্চার ইতিহাসে গুরুসদয় দত্ত (১৮৮৮–১৯৪১)-এর ব্রতচারী আন্দোলন এক অনন্য ঘটনা।
ব্রতচারী কেবল শরীরচর্চা নয়; এর মধ্যে রয়েছে—
নৃত্য, গীত, শারীরিক অনুশীলন, নৈতিক শিক্ষা, দেশপ্রেম ও সমাজসেবা।
১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রতচারী লোকনৃত্য সমিতি।
১৯৪১ সালে জোকায় প্রতিষ্ঠিত হয়—
- ব্রতচারী গ্রাম
- ব্রতচারী জনশিক্ষা প্রতিষ্ঠান
ব্রতচারীর পাঁচটি মূল ব্রত—
জ্ঞান — শ্রম — সত্য — একতা — আনন্দ।
ব্রতচারী নৃত্যে শ্রমজীবনের নানা ভঙ্গি, যেমন নৌকা বাইবার ভঙ্গি, কোদাল চালানোর ভঙ্গি, এবং ঐতিহাসিক বীরত্বের অভিনয় স্থান পেয়েছে।
৩০. বাঙালির সার্কাস
বাঙালির ক্রীড়া ও বিনোদন-সংস্কৃতিতে সার্কাস একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে।
উনিশ শতকের শেষভাগে শরীরচর্চা ও জাতীয় চেতনার পরিবেশে বাঙালির নিজস্ব সার্কাস গড়ে ওঠে।
৩০.১ ন্যাশনাল সার্কাস
১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়—
National Circus
এটি বাঙালিদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রথম দিকের স্বদেশীয় সার্কাস।
এর সঙ্গে নবগোপাল মিত্র-র নাম যুক্ত।
৩০.২ গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস
ন্যাশনাল সার্কাসের পর গড়ে ওঠে Great Indian Circus।
এই সার্কাসের বিভিন্ন উপকরণ পরবর্তীকালে প্রিয়নাথ বসুর সার্কাস-উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩১. প্রিয়নাথ বসু ও গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস
প্রিয়নাথ বসু বাঙালির সার্কাস ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।
তিনি গড়ে তোলেন—
Great Bengal Circus
তাঁর সার্কাস দ্রুত সারা ভারতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সেকালে সার্কাসের পরিচালকদের ‘প্রফেসর’ বলা হতো। সেই সূত্রে প্রিয়নাথ বসু পরিচিত হন—
‘Professor Bose’
নামে।
তাঁর সার্কাসে বাঘসহ নানা প্রাণীর প্রদর্শন বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
৩২. বাদল চাঁদ
প্রিয়নাথ বসুর সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত বাদল চাঁদ শারীরিক কসরত ও প্রদর্শনের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
সার্কাসের শারীরিক দক্ষতা, সাহস ও কৌশলনির্ভর প্রদর্শনের ধারায় তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।
৩৩. সুশীলাসুন্দরী
বাংলার সার্কাসের ইতিহাসে সুশীলাসুন্দরী এক কিংবদন্তিতুল্য নারী।
তিনি বাঘের খাঁচায় প্রবেশ করে বিপজ্জনক খেলা দেখানোর জন্য খ্যাতি অর্জন করেন।
সার্কাসে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়াও মুমূর্ষী নামে এক নারী হাতির পিঠে খেলা দেখানোর জন্য পরিচিত ছিলেন।
৩৪. সার্কাস : ক্রীড়া ও বিনোদনের সংযোগ
সার্কাসে একত্রিত হয়েছিল—
শরীরচর্চা, কসরত, সাহস, পশু প্রশিক্ষণ, অভিনয়, নাটকীয়তা ও বিনোদন।
ফলে বাঙালির সার্কাস কেবল বিনোদনের ইতিহাস নয়; এটি শরীরচর্চা ও ক্রীড়া-সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
৩৫. জাদুবিদ্যা ও গণপতি চক্রবর্তী
সার্কাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিনোদনধারার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল জাদুবিদ্যা।
এই ক্ষেত্রে গণপতি চক্রবর্তী বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তাঁর রচিত গ্রন্থ—
‘যাদুবিদ্যা’
জাদুবিদ্যার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য।
৩৬. পি. সি. সরকার
বাংলার জাদুবিদ্যাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে পি. সি. সরকার-এর ভূমিকা অসামান্য।
তাঁর প্রকৃত নাম—
প্রতুলচন্দ্র সরকার।
তিনি জাদুকে মঞ্চশিল্পের মর্যাদায় উন্নীত করেন। আলো, সংগীত, অভিনয়, নাটকীয়তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার তাঁর জাদু প্রদর্শনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছিল।
৩৭. ক্রীড়া ও জাতীয়তাবাদ
বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতির ইতিহাসে জাতীয়তাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
হিন্দুমেলার শরীরচর্চা থেকে শুরু করে ফুটবল মাঠে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দলের বিজয়—সব ক্ষেত্রেই ক্রীড়া আত্মমর্যাদার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
১৯১১ সালের মোহনবাগান বিজয় তার শ্রেষ্ঠ প্রতীক।
খেলার মাঠে এই বিজয় সাধারণ মানুষের মনে যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল, তা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় চেতনার বিকাশে সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করে।
৩৮. ক্রীড়া ও নারী
বাঙালির ক্রীড়াক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ একসময় সীমিত ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নারী ক্রীড়াবিদদের সাফল্য সেই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দেয়।
আরতি সাহা আন্তর্জাতিক ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
বুলা চৌধুরী দীর্ঘদূরত্বের সাঁতারে কৃতিত্ব অর্জন করেন।
ঝুলন গোস্বামী ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেস বোলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
সুশীলাসুন্দরী সার্কাসে বিপজ্জনক ক্রীড়াকৌশল প্রদর্শন করে নারী-সক্ষমতার এক অন্যতর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
৩৯. বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য
বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতির কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল—
১. লোকজ ভিত্তি
গ্রামীণ ও দেশীয় খেলাধুলা এর প্রাচীন ভিত্তি।
২. শরীর ও মনের সমন্বয়
মল্লযুদ্ধ, শরীরচর্চা ও ব্রতচারীতে যেমন শরীর গুরুত্বপূর্ণ, তেমন দাবা ও ক্রীড়া-কৌশলে মানসিক দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।
৩. সামাজিক সংহতি
ক্লাব, পাড়া ও আখড়া সামাজিক সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে।
৪. জাতীয়তাবাদ
১৯১১-এর মোহনবাগান জয় তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
৫. নারী-অংশগ্রহণ
আরতি সাহা, বুলা চৌধুরী, ঝুলন গোস্বামী ও সুশীলাসুন্দরীর সাফল্য এই ধারার পরিচায়ক।
৬. আন্তর্জাতিকতা
পর্বতারোহণ, সাঁতার, ক্রিকেট, ফুটবল, দাবা ইত্যাদির মাধ্যমে বাঙালি আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চে পৌঁছেছে।
৪০. গুরুত্বপূর্ণ সাল : একনজরে
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১৮৬৭ | প্রথম হিন্দুমেলা |
| ১৮৮০ | ন্যাশনাল সার্কাস |
| ১৮৮৩ | নগেন্দ্রপ্রসাদের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান |
| ১৮৮৬ | শোভাবাজার ক্লাব |
| ১৮৮৯ | মোহনবাগান |
| ১৮৯২ | মহামেডান স্পোর্টিং |
| ১৮৯৩ | IFA ও IFA Shield |
| ১৮৯৮ | কলকাতা ফুটবল লিগ |
| ১৯১১ | মোহনবাগানের IFA Shield জয় |
| ১৯২০ | ইস্টবেঙ্গল |
| ১৯২৬ | ব্রতচারী লোকনৃত্য সমিতি |
| ১৯২৭ | পশ্চিমবঙ্গে YMCA-র উদ্যোগে ভলিবল |
| ১৯২৮ | অলিম্পিকে ভারতের প্রথম হকি স্বর্ণপদক |
| ১৯৩৩ | বাগবাজার জিমনাসিয়ামে প্রতিযোগিতামূলক ভলিবল |
| ১৯৩৬ | Bengal Volleyball Federation |
| ১৯৩৮ | কলকাতায় কবাডি প্রতিযোগিতা |
| ১৯৫০ | হিলারি-তেনজিংয়ের এভারেস্ট আরোহণ |
| ১৯৫৪ | HMI প্রতিষ্ঠা |
| ১৯৫৮ | মিহির সেনের ইংলিশ চ্যানেল জয় |
| ১৯৫৯ | আরতি সাহার ইংলিশ চ্যানেল জয় |
| ১৯৬০ | আরতি সাহার পদ্মশ্রী |
| ১৯৭১ | খো-খো Orientation Course |
| ১৯৮২ | এশিয়ান গেমসে খো-খো প্রদর্শনী |
| ১৯৮৫ | খো-খোর IOA স্বীকৃতি |
| ১৯৮৭ | রাশিয়ায় ভারতীয় খো-খো দলের প্রদর্শনী |
৪১. ব্যক্তি ও ক্রীড়াক্ষেত্র : একনজরে
| ব্যক্তিত্ব | ক্ষেত্র |
|---|---|
| নবগোপাল মিত্র | হিন্দুমেলা, শরীরচর্চা, সার্কাস |
| নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী | ফুটবল ও ক্রীড়াসংগঠন |
| গোবর গুহ / যতীন্দ্রচরণ গুহ | কুস্তি |
| সারদারঞ্জন রায়চৌধুরী | ক্রিকেট |
| পঙ্কজ রায় | ক্রিকেট |
| সৌরভ গাঙ্গুলী | ক্রিকেট |
| ঝুলন গোস্বামী | মহিলা ক্রিকেট |
| মিহির সেন | সাঁতার |
| আরতি সাহা | সাঁতার |
| বুলা চৌধুরী | সাঁতার |
| জ্যোতির্ময়ী শিকদার | অ্যাথলেটিকস |
| দোলা বন্দ্যোপাধ্যায় | তিরন্দাজি |
| রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় | তিরন্দাজি |
| দিব্যেন্দু বড়ুয়া | দাবা |
| সূর্যশেখর গাঙ্গুলী | দাবা |
| প্রণব রায় | খো-খো |
| সুনীল চ্যাটার্জি | ভলিবল |
| বিশ্বদেব বিশ্বাস | পর্বতারোহণ |
| ছন্দা গায়েন | পর্বতারোহণ |
| গুরুসদয় দত্ত | ব্রতচারী |
| প্রিয়নাথ বসু | সার্কাস |
| বাদল চাঁদ | সার্কাস |
| সুশীলাসুন্দরী | সার্কাস |
| গণপতি চক্রবর্তী | জাদু |
| পি. সি. সরকার | জাদু |
পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত তথ্য
হিন্দুমেলা — ১৮৬৭
হিন্দুমেলার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা — নবগোপাল মিত্র
বাংলার ফুটবলের অন্যতম পথিকৃৎ — নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী
শোভাবাজার ক্লাব — ১৮৮৬
মোহনবাগান — ১৮৮৯
মহামেডান স্পোর্টিং — ১৮৯২
IFA — ১৮৯৩
কলকাতা ফুটবল লিগ — ১৮৯৮
মোহনবাগানের ঐতিহাসিক IFA Shield জয় — ১৯১১
ইস্টবেঙ্গল — ১৯২০
বাংলার ক্রিকেটের জনক — সারদারঞ্জন রায়চৌধুরী
‘ক্রিকেট খেলা’ — সারদারঞ্জন রায়চৌধুরী
মিহির সেন — ইংলিশ চ্যানেল, ১৯৫৮
আরতি সাহা — ইংলিশ চ্যানেল, ১৯৫৯
এশিয়ার প্রথম মহিলা ইংলিশ চ্যানেলজয়ী — আরতি সাহা
HMI — দার্জিলিং, ১৯৫৪
ব্রতচারী আন্দোলন — গুরুসদয় দত্ত
ব্রতচারী লোকনৃত্য সমিতি — ১৯২৬
ব্রতচারী গ্রাম — জোকা
ব্রতচারীর পঞ্চব্রত — জ্ঞান, শ্রম, সত্য, একতা, আনন্দ
National Circus — ১৮৮০
Great Bengal Circus — প্রিয়নাথ বসু
Professor Bose — প্রিয়নাথ বসু
সুশীলাসুন্দরী — বাঘের খাঁচায় খেলা
‘যাদুবিদ্যা’ — গণপতি চক্রবর্তী
পি. সি. সরকার — প্রতুলচন্দ্র সরকার
খো-খো — প্রণব রায়
ভলিবল — YMCA
বেটন কাপ — হকি
দোলা বন্দ্যোপাধ্যায় — তিরন্দাজি
দিব্যেন্দু বড়ুয়া — দাবা
জ্যোতির্ময়ী শিকদার — অ্যাথলেটিকস
উপসংহার
বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতির ইতিহাস আসলে শরীর, সমাজ ও আত্মপরিচয়ের ইতিহাস। গ্রামবাংলার ডাংগুলি ও গোল্লাছুট, নদীর নৌকাবাইচ, আখড়ার মল্লযুদ্ধ, হিন্দুমেলার শরীরচর্চা, কলকাতার ফুটবল মাঠ, ১৯১১-এর মোহনবাগান, সারদারঞ্জনের ক্রিকেটচর্চা, মিহির সেন ও আরতি সাহার ইংলিশ চ্যানেল জয়, হিমালয়ের দুর্গম শিখর, ব্রতচারীর নৃত্য এবং প্রিয়নাথ বসুর সার্কাস—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতির দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক ইতিহাস।
ক্রীড়া এখানে কখনও লোকসংস্কৃতির বাহক, কখনও শরীরচর্চার মাধ্যম, কখনও সামাজিক সংহতির উপায়, কখনও জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীক, আবার কখনও আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাঙালির পরিচয়ের বাহন।
এই কারণেই বাঙালির ক্রীড়াসংস্কৃতিকে কেবল মাঠের খেলা হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এর গভীরে রয়েছে বাঙালির শরীরচেতনা, সামাজিকতা, স্বদেশচেতনা, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং বিশ্বজনীনতার দিকে ক্রমশ অগ্রসর হওয়ার ইতিহাস।

