ভূমিকা
বাঙালির ইতিহাসে বিজ্ঞানচর্চা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলা নবজাগরণের সঙ্গে সঙ্গে যে নতুন যুক্তিবাদী, অনুসন্ধিৎসু ও প্রশ্নমুখর মানসিকতার জন্ম হয়েছিল, বিজ্ঞানচর্চা তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার সঙ্গে পরিচয়, আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা, মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার, বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ ও সাময়িকপত্র প্রকাশ এবং চিকিৎসা ও প্রযুক্তিশিক্ষার বিস্তার—সব মিলিয়ে বাংলায় আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার একটি নতুন পরিসর তৈরি হয়।
এই ইতিহাসে যেমন রয়েছেন মহেন্দ্রলাল সরকার, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ, তেমনই রয়েছেন মধুসূদন গুপ্ত, রাধানাথ শিকদার, কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, রাধাগোবিন্দ কর, নীলরতন সরকার, উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, মুরারিমোহন মুখোপাধ্যায়, নীলরতন ধর প্রমুখ।
আবার বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসকে কেবল গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, হেমেন্দ্রমোহন বসু, জগদানন্দ রায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, স্বর্ণকুমারী দেবী, গিরীন্দ্রশেখর বসু, গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রমুখের অবদান অনুল্লেখিত থেকে যায়।
অতএব বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস হল—বিজ্ঞান আবিষ্কার, বিজ্ঞানশিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, মুদ্রণ, শিল্প, বিজ্ঞান-সাহিত্য এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা বিস্তারের সম্মিলিত ইতিহাস।
১. আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার প্রাথমিক পরিবেশ
বাংলায় আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ গড়ে ওঠার পিছনে ঔপনিবেশিক যুগের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
এশিয়াটিক সোসাইটি
১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় স্যার উইলিয়াম জোন্স-এর উদ্যোগে এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতীয় ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, ভূগোল ও জ্ঞানচর্চার নানা বিষয় নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি হয় এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।
এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সভাপতি ছিলেন রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র।
বোটানিক্যাল গার্ডেন
১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে শিবপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রাথমিক নাম ছিল Royal Botanic Garden।
ড. উইলিয়াম রক্সবার্গ ভারতীয় উদ্ভিদবিদ্যার জনক হিসেবে পরিচিত। উদ্ভিদ সংগ্রহ, শ্রেণিবিন্যাস ও গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. আধুনিক বিজ্ঞানশিক্ষা ও হিন্দু কলেজ
১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। পাশ্চাত্য জ্ঞান, বিজ্ঞান, গণিত, যুক্তিবাদ ও আধুনিক দর্শনের প্রসারে এই প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে।
হিন্দু কলেজের ছাত্রদের মধ্যে রাধানাথ শিকদার বিশেষভাবে স্মরণীয়। পরবর্তীকালে হিন্দু কলেজের সিনিয়র বিভাগ প্রেসিডেন্সি কলেজ নামে পরিচিত হয়।
বাংলার আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতার বৌদ্ধিক ভিত্তি নির্মাণে হিন্দু কলেজের ভূমিকা তাই অনস্বীকার্য।
৩. বিজ্ঞানশিক্ষা ও বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ
আধুনিক বিজ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পাঠ্যপুস্তক ও জ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থের প্রয়োজন ছিল।
School Book Society এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রবার্ট মে-র মে-গণিত এবং ফেলিক্স কেরি-র বিদ্যাহারাবলী প্রভৃতি রচনা আধুনিক জ্ঞানকে বাংলা ভাষার পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টার নিদর্শন।
বাংলায় বিজ্ঞান রচনার প্রাথমিক ইতিহাসে দিগ্দর্শন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটিকে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক রচনার পথিকৃৎ পত্রিকা বলা হয়।
৪. বাংলা মুদ্রণ ও বিজ্ঞানচর্চা
বিজ্ঞানচর্চার প্রসারের সঙ্গে মুদ্রণপ্রযুক্তির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বিজ্ঞানবিষয়ক বই, পত্রিকা ও চিত্র প্রকাশের জন্য উন্নত মুদ্রণপ্রযুক্তির প্রয়োজন ছিল।
পঞ্চানন কর্মকার
বাংলা মুদ্রাক্ষর নির্মাণের ইতিহাসে পঞ্চানন কর্মকার অন্যতম পথিকৃৎ।
বাংলা অক্ষরকে মুদ্রণের উপযোগী করে তোলার কাজে তাঁর অবদান বাংলা জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. মধুসূদন গুপ্ত : চিকিৎসাবিজ্ঞানে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য মানবদেহ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অপরিহার্য। কিন্তু তৎকালীন সমাজে শবব্যবচ্ছেদ নিয়ে প্রবল ধর্মীয় ও সামাজিক আপত্তি ছিল।
মধুসূদন গুপ্ত এই বাধা অতিক্রম করে শবব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে আধুনিক চিকিৎসাশিক্ষার পথ প্রশস্ত করেন।
এটি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস নয়—বিজ্ঞান ও সামাজিক কুসংস্কারের সংঘাতের ইতিহাসও।
৬. রাধানাথ শিকদার
রাধানাথ শিকদার ছিলেন হিন্দু কলেজের ছাত্র এবং অসাধারণ গণিতজ্ঞ।
Great Trigonometrical Survey of India-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা নির্ণয়ের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা নির্ণয়ের সঙ্গে তাঁর নাম ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত।
৭. চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশ
বাংলার আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞান।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে। এর ফলে ভারতীয়দের মধ্যে আধুনিক চিকিৎসাশিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হয়।
এই ধারায় পরবর্তীকালে উঠে আসেন—
মহেন্দ্রলাল সরকার, লালমাধব মুখোপাধ্যায়, রাধাগোবিন্দ কর, নীলরতন সরকার, কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, বনবিহারী মুখোপাধ্যায়, উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, চুনীলাল বসু, বিধানচন্দ্র রায়, মুরারিমোহন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
৮. মহেন্দ্রলাল সরকার
ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার বাংলার জাতীয় বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।
তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি—
Indian Association for the Cultivation of Science
অর্থাৎ IACS বা ভারতীয় বিজ্ঞানসভা।
১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান ভারতীয়দের নিজস্ব উদ্যোগে বিজ্ঞান গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
মহেন্দ্রলালের উদ্দেশ্য ছিল—বিজ্ঞানকে কেবল সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বিষয় না রেখে ভারতীয়দের নিজেদের গবেষণা ও পরীক্ষার বিষয় করে তোলা।
তাঁকে তাই জাতীয় বিজ্ঞানচর্চার জনক বলা হয়।
৯. লালমাধব মুখোপাধ্যায়
লালমাধব মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিশিষ্ট চক্ষুচিকিৎসক।
জয়পুরের মহারাজার চোখের সফল অস্ত্রোপচারের পর তাঁর চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি Calcutta Medical Association-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে স্মরণীয়। পরবর্তীকালে এই সংগঠনের সঙ্গে Indian Medical Association-এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিষয়ক জ্ঞানচর্চাতেও তাঁর অবদান রয়েছে।
১০. রাধাগোবিন্দ কর
ডা. রাধাগোবিন্দ কর চিকিৎসাশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান পরবর্তীকালে R. G. Kar Medical College and Hospital নামে পরিচিত হয়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ—
- ধাত্রীসহায়
- স্ত্রীরোগ চিকিৎসা
- সংক্ষিপ্ত ভেষজ তত্ত্ব
- অ্যানাটমি
- সংক্ষিপ্ত শিশু ও বালক চিকিৎসা
চিকিৎসাশিক্ষাকে দেশীয় সমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
১১. কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়
কাদম্বিনী বসু গঙ্গোপাধ্যায় ভারতীয় নারী চিকিৎসাশিক্ষার ইতিহাসে পথিকৃৎ।
১৮৮২ সালে কাদম্বিনী বসু ও চন্দ্রমুখী বসু স্নাতক হন।
কাদম্বিনী কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন এবং পরে বিদেশে গিয়ে উচ্চতর চিকিৎসাশিক্ষা গ্রহণ করেন।
নারী যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো পেশাগত ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে সমান দক্ষতায় প্রবেশ করতে পারে—তাঁর জীবন তার ঐতিহাসিক প্রমাণ।
১২. বনবিহারী মুখোপাধ্যায়
বনবিহারী মুখোপাধ্যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্য ও শিল্পের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে তিনি সাহিত্যিক বনফুল-এর শিক্ষক ছিলেন।
বনফুল তাঁর শিক্ষককে কেন্দ্র করে ‘অগ্নীশ্বর’ রচনা করেন। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও চলচ্চিত্র—তিনটি ক্ষেত্রের মধ্যে একটি অনন্য সংযোগ তৈরি হয়।
১৩. উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী
স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষক।
তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কার—
Urea Stibamine
কালাজ্বরের চিকিৎসায় এই ওষুধ অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করে।
ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর ও অন্যান্য ক্রান্তীয় রোগ নিয়েও তাঁর গবেষণা ছিল।
কালাজ্বরের চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর অবদান ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেয়।
১৪. চুনীলাল বসু
চুনীলাল বসু চিকিৎসা ও রসায়নের সংযোগস্থলে কাজ করেন।
বহুমূত্র রোগ নিয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
কুষ্ঠরোগের চিকিৎসার জন্য ইনজেকশন প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল।
১৫. নীলরতন সরকার
স্যার নীলরতন সরকার ছিলেন চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী।
শিশুদের লিভারের সিরোসিস নিয়ে তাঁর গবেষণা উল্লেখযোগ্য—
Cirrhosis of Liver in Children
চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে তাঁর অবদান ছিল ব্যাপক।
১৬. বিধানচন্দ্র রায়
ডা. বিধানচন্দ্র রায় চিকিৎসক ও প্রশাসক হিসেবে স্মরণীয়।
১৯৬১ সালে তিনি ভারতরত্ন লাভ করেন।
তাঁর জন্মদিন ১ জুলাই চিকিৎসক দিবস হিসেবে পালিত হয়।
স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
১৭. মুরারিমোহন মুখোপাধ্যায়
ভারতে প্লাস্টিক সার্জারির বিকাশের ইতিহাসে ডা. মুরারিমোহন মুখোপাধ্যায় অগ্রগণ্য।
তাঁকে ভারতীয় প্লাস্টিক সার্জারির জনক বলা হয়।
১৮. মনোবিজ্ঞান : গিরীন্দ্রশেখর বসু
গিরীন্দ্রশেখর বসু বাংলায় মনোবিজ্ঞান ও মনোবিশ্লেষণচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ—
‘স্বপ্ন’
মনোবিশ্লেষণ ও মনস্তত্ত্বকে ভারতীয় ও বাঙালি বৌদ্ধিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।
১৯. রসায়ন ও দেশীয় শিল্প : প্রফুল্লচন্দ্র রায়
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসের এক মহীরুহ।
তাঁর প্রধান পরিচয়—
রসায়নবিদ + গবেষক + শিক্ষক + শিল্পোদ্যোগী + বিজ্ঞান-ইতিহাসবিদ + বিজ্ঞানপ্রচারক।
তাঁর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত—
Mercurous Nitrite
তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ—
History of Hindu Chemistry
বিজ্ঞান ও স্বদেশি শিল্পকে একত্রিত করার তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্যোগ—
Bengal Chemical and Pharmaceutical Works
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা—
- Life and Experiences of a Bengali Chemist
- বাঙালির মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার
- প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞানচর্চার নিদর্শন
বিজ্ঞানকে জাতীয় আত্মনির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অসামান্য।
২০. জগদীশচন্দ্র বসু
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু বিশ্ববিজ্ঞানে বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি।
তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র—
পদার্থবিদ্যা, বেতারবিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞান।
উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা ও বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রতি প্রতিক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণা বিজ্ঞানজগতে যুগান্তকারী।
তাঁর বিখ্যাত বাংলা গ্রন্থ—
অব্যক্ত
তিনি প্রতিষ্ঠা করেন—
বসু বিজ্ঞান মন্দির — ১৯১৭
বিজ্ঞানকে ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, মানবজাতির সম্মিলিত জ্ঞান হিসেবে দেখার তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
২১. মেঘনাদ সাহা
মেঘনাদ সাহা আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে বিশ্বমানের বিজ্ঞানী।
তাঁর গবেষণার বিষয়—
- Relativity
- Pressure of Light
- Astrophysics
- Ionization
তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদান—
Saha Ionization Equation
নক্ষত্রের বর্ণালির সাহায্যে নক্ষত্রের তাপমাত্রা ও আয়ননের অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব যুগান্তকারী।
তিনি বিজ্ঞানকে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
দামোদর উপত্যকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী পরিকল্পনা, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয়েও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
ভারতীয় বর্ষপঞ্জি সংস্কারের জন্য গঠিত Calendar Reform Committee-র সভাপতিও ছিলেন তিনি।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ—
- Treatise on Heat
- The Principle of Relativity
২২. সত্যেন্দ্রনাথ বসু
সত্যেন্দ্রনাথ বসু আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী।
তাঁর নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত—
Bose–Einstein Statistics
তাঁর নাম থেকেই—
Boson
শব্দটির উৎপত্তি।
বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ
১৯৪৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ—
বিশ্বপরিচয়
সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন।
২৩. প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ
প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ আধুনিক ভারতীয় রাশিবিজ্ঞানের জনক।
তিনি প্রতিষ্ঠা করেন—
Indian Statistical Institute
নৃবিজ্ঞানে রাশিবিজ্ঞানের প্রয়োগ করতে গিয়ে তিনি উদ্ভাবন করেন—
Mahalanobis Distance
১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম রাশিবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর ভূমিকা যুক্ত।
বাংলা সরকার তাঁকে রাশিবিজ্ঞান-সংক্রান্ত উপদেষ্টা হিসেবেও ব্যবহার করে।
পরবর্তীকালে তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মান লাভ করেন এবং পদ্মভূষণ পান।
২৪. নীলরতন ধর
নীলরতন ধর ছিলেন বিশিষ্ট ভৌত রসায়নবিদ।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও জগদীশচন্দ্র বসু-র সংস্পর্শে এসে তাঁর গবেষণার ভিত তৈরি হয়।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা শেষে তিনি ভৌত রসায়নে অসংখ্য মৌলিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।
তাঁর গবেষণাপত্রের সংখ্যা ছয় শতাধিক।
১৯৩৮, ১৯৪৭ ও ১৯৫২ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার কমিটির বিচারক ছিলেন।
Indian Academy of Sciences-এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যেও তাঁর নাম রয়েছে।
জীবনের শেষ পর্বে তিনি কৃষিবিজ্ঞান ও সার ব্যবহারের ওপর গবেষণা করেন।
২৫. দেশীয় প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান
বাঙালির বিজ্ঞানচর্চা কেবল তত্ত্ব ও গবেষণায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশীয় প্রযুক্তি নির্মাণের ক্ষেত্রেও নানা উদ্যোগ দেখা যায়।
গোলকচন্দ্র নন্দী
ভারতে প্রথম বাষ্পীয় ইঞ্জিন নির্মাণের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত।
শিবচন্দ্র নন্দী
টেলিগ্রাফ ও বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির প্রাথমিক বিকাশে তাঁর নাম স্মরণীয়।
সীতানাথ ঘোষ
বস্ত্রবয়ন যন্ত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বৈদ্যুতিক চিকিৎসা নিয়েও তিনি আলোচনা করেছিলেন।
মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দী
হোমিও চিকিৎসায় খ্যাতির জন্য তিনি—
‘ধন্বন্তরী’
নামে পরিচিত হন।
তাঁকে আবার—
‘টলস্টয় অব বেঙ্গল’
বলা হত।
কালিদাস শীল
কলকাতায় বিজলিবাতির প্রাথমিক প্রযুক্তিগত উদ্যোগের ইতিহাসে তাঁর নাম যুক্ত।
রাজকৃষ্ণ কর্মকার
দেশীয় কারিগরি দক্ষতা ও আগ্নেয়াস্ত্র নির্মাণের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত।
ইন্দুমাধব মল্লিক
তাঁর উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন—
ইকমিক কুকার।
২৬. হেমেন্দ্রমোহন বসু
হেমেন্দ্রমোহন বসু ছিলেন বহুমুখী শিল্পোদ্যোগী ও প্রযুক্তিচর্চার অন্যতম অগ্রণী বাঙালি।
তাঁর কর্মকাণ্ডের বিস্তার ছিল—
- মোটরগাড়ি
- বাইসাইকেল
- টর্চলাইট
- আলোকচিত্র
- সুগন্ধি তেল
- গ্রামোফোন
- রেকর্ড নির্মাণ
প্রভৃতি ক্ষেত্রে।
তিনি কুন্তলীন পুরস্কার প্রবর্তন করেন।
ভারতীয় রঙিন আলোকচিত্রের ইতিহাসেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরির কারখানা স্থাপন করে তিনি ভারতীয় সংগীতের রেকর্ড-সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২৭. উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
এখানে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নাম—
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।
তিনি শুধু শিশুসাহিত্যিক নন; তিনি ছিলেন মুদ্রণপ্রযুক্তিবিদ, আলোকচিত্রবিদ ও প্রযুক্তি-উদ্ভাবক।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁর পরিচিতির অন্যতম কারণ—
মুদ্রণশিল্পে তাঁর বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অবদান।
তিনি ভারতবর্ষে হাফটোন ব্লক-এর প্রবর্তন ও উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ও যন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেন—
- Ray Screen Adjuster
- Ray Tint System
- Duotype
- Tint Process
- Skin Adjuster
প্রভৃতি।
ব্রিটিশ মুদ্রণবিশ্বেও তাঁর গবেষণা প্রশংসিত হয়েছিল। Penrose Annual-এ তাঁর মুদ্রণবিষয়ক গবেষণা প্রকাশিত হয়।
অর্থাৎ উপেন্দ্রকিশোরের বিজ্ঞানচর্চা ছিল মুদ্রণপ্রযুক্তির বিজ্ঞান।
২৮. সুকুমার রায়
সুকুমার রায় বাংলা সাহিত্যে ননসেন্স ধারার প্রবর্তক হিসেবে বিখ্যাত হলেও তাঁর শিক্ষা ও কর্মজীবনের একটি বড় অংশ ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত।
তিনি রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় B.Sc. করেন।
১৯১১ সালে উচ্চতর আলোকচিত্র ও মুদ্রণপ্রযুক্তি শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান।
তিনি—
Royal Photographic Society
-এর সদস্য হন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিবিষয়ক রচনা—
Halftone Facts Summarized
এটি Penrose Annual-এ প্রকাশিত হয়।
এছাড়াও—
Standardizing the Original
এবং Pin-hole theory নিয়ে তাঁর গবেষণামূলক লেখা প্রকাশিত হয়।
এই সময়েই উপেন্দ্রকিশোর রঙিন হাফটোন ব্লক তৈরি ও মুদ্রণের উপযোগী আধুনিক ছাপাখানা গড়ে তোলেন এবং ‘সন্দেশ’ প্রকাশ শুরু করেন।
অতএব সুকুমার রায়ের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সাহিত্য একই সত্তার তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত দিক।
২৯. বিপিনবিহারী দাস
দেশীয় প্রযুক্তিতে মোটরগাড়ি নির্মাণের ইতিহাসে বিপিনবিহারী দাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি দেশীয় প্রযুক্তির সাহায্যে একটি মোটরগাড়ি নির্মাণ করেন এবং তার নাম দেন—
‘স্বদেশী’।
এই উদ্যোগ ছিল প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার একটি প্রতীক।
তাঁকে কলকাতার—
‘বিশ্বকর্মা’
বলা হত।
৩০. প্রমথনাথ বসু
প্রমথনাথ বসু ছিলেন ভূতত্ত্ববিদ।
ময়ূরভঞ্জের গুরুমহিষানি অঞ্চলে লৌহখনির সন্ধান পাওয়ার সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত।
দেশীয় প্রযুক্তিশিক্ষার প্রসারে তিনি Bengal Technical Institute-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
৩১. রসিকলাল দত্ত
রসায়ন গবেষণায় রসিকলাল দত্ত বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন।
তিনি—
ক্লোরোপিক্রিন
প্রস্তুতির একটি নতুন প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন।
রাসায়নিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে D.Sc. উপাধি প্রদান করে।
৩২. বিজ্ঞান ও প্রাণিবিজ্ঞান
বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল প্রাণিবিজ্ঞান।
রামব্রহ্ম সান্যাল
রামব্রহ্ম সান্যাল আলিপুর চিড়িয়াখানার রূপকার হিসেবে স্মরণীয়।
প্রাণী সংরক্ষণ, প্রাণীর জীবন ও চিড়িয়াখানার বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য
ক্ষুদ্র প্রাণী ও কীটপতঙ্গের জীবন নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তিনি।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ—
বাংলার কীটপতঙ্গ
বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
৩৩. জগদানন্দ রায়
বাংলায় জনপ্রিয় বিজ্ঞানরচনার ক্ষেত্রে জগদানন্দ রায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ—
গ্রহ-নক্ষত্র
এছাড়াও বাংলার পাখী তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা।
জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিজ্ঞানকে শিশু-কিশোর ও সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
৩৪. রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানমনস্ক গদ্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের অন্যতম রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।
বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তিকে সহজ অথচ গভীর ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্ব অনন্য।
তাঁর ‘মহাশক্তি’ প্রবন্ধ ‘নবজীবন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
৩৫. স্বর্ণকুমারী দেবী
বিজ্ঞানকে সাহিত্যিক ভাষায় প্রকাশের ধারায় স্বর্ণকুমারী দেবী-র নামও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ—
পৃথিবী
বিজ্ঞান ও সাহিত্যকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
৩৬. অক্ষয়কুমার দত্ত
বাঙালির যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক গদ্যের অন্যতম প্রাচীন পথিকৃৎ—
অক্ষয়কুমার দত্ত।
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল।
প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজকে যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের আলোকে দেখার যে আধুনিক মানসিকতা উনিশ শতকে তৈরি হয়, তার অন্যতম নির্মাতা তিনি।
৩৭. চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য
বিজ্ঞানপ্রচার ও বিজ্ঞানসম্পাদনার ক্ষেত্রে চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য-র ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তাঁর রচনা—
বাঙালির খাদ্য
প্রভৃতি বিজ্ঞানমনস্ক আলোচনায় খাদ্য, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনের বৈজ্ঞানিক দিককে সামনে আনা হয়েছে।
রবীন্দ্র-রচনার সংরক্ষণ ও প্রকাশের সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত।
৩৮. মৃত্যুঞ্জয় প্রসাদ গুহ
বিজ্ঞানমনস্ক বাংলা লেখার ক্ষেত্রে মৃত্যুঞ্জয় প্রসাদ গুহ-র নামও উল্লেখযোগ্য।
তাঁর গ্রন্থ—
আকাশ ও পৃথিবী
রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়।
বিজ্ঞানকে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার ধারায় তাঁর রচনা গুরুত্বপূর্ণ।
৩৯. শিশিরকুমার মিত্র
শিশিরকুমার মিত্র বেতারবিজ্ঞান ও বায়ুমণ্ডলীয় গবেষণার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ—
The Upper Atmosphere
বেতার তরঙ্গ ও ঊর্ধ্ববায়ুমণ্ডলের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।
৪০. জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
রসায়ন গবেষণায় জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়-এর বিশেষ আগ্রহ ছিল—
কোলয়েডের মধ্যে তড়িৎ উদ্ভবের ক্রিয়া।
ভৌত রসায়নের ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করে।
৪১. নগেন্দ্রনাথ ধর
দেশীয় বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নির্মাণের ইতিহাসে নগেন্দ্রনাথ ধর বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তাঁকে এদেশের প্রথম দূরবীন নির্মাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
৪২. বিজ্ঞান ও জাতীয় প্রতিষ্ঠান
বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে প্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।
উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান
এশিয়াটিক সোসাইটি — ১৭৮৪
বোটানিক্যাল গার্ডেন — ১৭৮৭
হিন্দু কলেজ — ১৮১৭
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ — ১৮৩৫
IACS — ১৮৭৬
Bose Institute — ১৯১৭
Indian Chemical Society — ১৯২৪
Indian Statistical Institute — ১৯৩১
বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ — ১৯৪৮
এই প্রতিষ্ঠানগুলি প্রমাণ করে যে বাঙালির বিজ্ঞানচর্চা ব্যক্তিগত প্রতিভার উপর দাঁড়িয়ে থাকেনি; ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো গড়ে উঠেছিল।
৪৩. ঠাকুর পরিবারের বিজ্ঞানভাবনা
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
দ্বারকানাথ ঠাকুর
দ্বারকানাথ ঠাকুর সরাসরি বিজ্ঞানী ছিলেন না। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা, পাশ্চাত্য জ্ঞান ও সমাজসংস্কারের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিজ্ঞান ও মানবদেহসম্পর্কিত নানা পাশ্চাত্য ধারণার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর গভীর আগ্রহের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ—
বিশ্বপরিচয়
গ্রন্থে।
এই গ্রন্থটি তিনি সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেন।
রবীন্দ্রনাথের কাছে বিজ্ঞান ছিল শুধু তথ্যের সমষ্টি নয়; বিশ্বজগতকে জানার একটি সৃজনশীল পদ্ধতি।
৪৪. বিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা
বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম স্বাতন্ত্র্য হল—মাতৃভাষায় বিজ্ঞান প্রকাশের চেষ্টা।
এই ধারায় একদিকে আছেন—
অক্ষয়কুমার দত্ত → রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী → জগদানন্দ রায় → স্বর্ণকুমারী দেবী
অন্যদিকে—
জগদীশচন্দ্র বসু → প্রফুল্লচন্দ্র রায় → গিরীন্দ্রশেখর বসু → গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য → চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য → মৃত্যুঞ্জয় প্রসাদ গুহ
এই ধারাটি পরে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ-এর মাধ্যমে আরও সুসংগঠিত হয়।
বিজ্ঞানকে মাতৃভাষায় প্রকাশ করার এই উদ্যোগের ফলে বিজ্ঞান আর কেবল বিশেষজ্ঞের জ্ঞান থাকেনি; তা ধীরে ধীরে সাধারণ শিক্ষিত বাঙালির সাংস্কৃতিক সম্পদে পরিণত হয়।
৪৫. বিজ্ঞান, সাহিত্য ও প্রযুক্তির অনন্য মিলন
বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—এখানে বিজ্ঞান ও সাহিত্য পরস্পরের বিরোধী নয়।
উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন মুদ্রণপ্রযুক্তিবিদ এবং সাহিত্যিক।
সুকুমার ছিলেন প্রযুক্তিবিদ এবং ননসেন্স-সাহিত্যের স্রষ্টা।
রাজশেখর বসু ছিলেন রসায়নের সঙ্গে যুক্ত এবং একই সঙ্গে অসাধারণ সাহিত্যিক।
গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন প্রকৃতি ও কীটপতঙ্গের পর্যবেক্ষক এবং বিজ্ঞানলেখক।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কবি, অথচ লিখেছেন বিশ্বপরিচয়।
এই ধারাই প্রমাণ করে—বাঙালির কাছে বিজ্ঞান ও মানবিক বিদ্যা পরস্পরবিচ্ছিন্ন ছিল না।
৪৬. একনজরে বিজ্ঞানী ও তাঁদের অবদান
| ব্যক্তিত্ব | প্রধান পরিচয় / অবদান |
|---|---|
| উইলিয়াম জোন্স | এশিয়াটিক সোসাইটি |
| উইলিয়াম রক্সবার্গ | ভারতীয় উদ্ভিদবিদ্যার জনক |
| রাজেন্দ্রলাল মিত্র | এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সভাপতি |
| পঞ্চানন কর্মকার | বাংলা মুদ্রাক্ষর |
| রাধানাথ শিকদার | পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা নির্ণয় |
| মধুসূদন গুপ্ত | শবব্যবচ্ছেদবিদ্যা |
| মহেন্দ্রলাল সরকার | IACS |
| লালমাধব মুখোপাধ্যায় | চক্ষুচিকিৎসা |
| রাধাগোবিন্দ কর | চিকিৎসাশিক্ষা |
| কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় | নারী চিকিৎসাশিক্ষা |
| নীলরতন সরকার | চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য |
| উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী | Urea Stibamine |
| চুনীলাল বসু | বহুমূত্র রোগ গবেষণা |
| মুরারিমোহন মুখোপাধ্যায় | প্লাস্টিক সার্জারি |
| প্রফুল্লচন্দ্র রায় | রসায়ন ও Bengal Chemical |
| জগদীশচন্দ্র বসু | বেতার ও উদ্ভিদবিজ্ঞান |
| মেঘনাদ সাহা | Ionization Theory |
| সত্যেন্দ্রনাথ বসু | Bose-Einstein Statistics |
| প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ | রাশিবিজ্ঞান |
| নীলরতন ধর | ভৌত রসায়ন |
| জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় | কোলয়েড রসায়ন |
| শিশিরকুমার মিত্র | ঊর্ধ্ববায়ুমণ্ডল |
| নগেন্দ্রনাথ ধর | দূরবীন |
| রামব্রহ্ম সান্যাল | আলিপুর চিড়িয়াখানা |
| গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য | কীটপতঙ্গ |
| উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী | মুদ্রণপ্রযুক্তি |
| সুকুমার রায় | আলোকচিত্র ও মুদ্রণপ্রযুক্তি |
| হেমেন্দ্রমোহন বসু | প্রযুক্তি ও শিল্পোদ্যোগ |
| রসিকলাল দত্ত | ক্লোরোপিক্রিন |
| প্রমথনাথ বসু | ভূতত্ত্ব |
| গোলকচন্দ্র নন্দী | বাষ্পীয় ইঞ্জিন |
| বিপিনবিহারী দাস | ‘স্বদেশী’ মোটরগাড়ি |
| সীতানাথ ঘোষ | বস্ত্রবয়ন যন্ত্র |
| ইন্দুমাধব মল্লিক | ইকমিক কুকার |
| জগদানন্দ রায় | গ্রহ-নক্ষত্র |
| রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী | বিজ্ঞানমনস্ক প্রবন্ধ |
| স্বর্ণকুমারী দেবী | পৃথিবী |
| গিরীন্দ্রশেখর বসু | মনোবিজ্ঞান |
| চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য | বিজ্ঞানপ্রচার |
| মৃত্যুঞ্জয় প্রসাদ গুহ | আকাশ ও পৃথিবী |
৪৭. গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ও রচয়িতা
| গ্রন্থ / রচনা | রচয়িতা |
|---|---|
| দিগ্দর্শন | জন ক্লার্ক মার্শম্যান |
| বিদ্যাহারাবলী | ফেলিক্স কেরি |
| অক্ষিতত্ত্ব | লালমাধব মুখোপাধ্যায় |
| ধাত্রীসহায় | রাধাগোবিন্দ কর |
| স্ত্রীরোগ চিকিৎসা | রাধাগোবিন্দ কর |
| অব্যক্ত | জগদীশচন্দ্র বসু |
| History of Hindu Chemistry | প্রফুল্লচন্দ্র রায় |
| Life and Experiences of a Bengali Chemist | প্রফুল্লচন্দ্র রায় |
| The Principle of Relativity | মেঘনাদ সাহা |
| Treatise on Heat | মেঘনাদ সাহা |
| The Upper Atmosphere | শিশিরকুমার মিত্র |
| গ্রহ-নক্ষত্র | জগদানন্দ রায় |
| বাংলার পাখী | জগদানন্দ রায় |
| মহাশক্তি | রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী |
| পৃথিবী | স্বর্ণকুমারী দেবী |
| স্বপ্ন | গিরীন্দ্রশেখর বসু |
| বিশ্বপরিচয় | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| বাংলার কীটপতঙ্গ | গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য |
| আকাশ ও পৃথিবী | মৃত্যুঞ্জয় প্রসাদ গুহ |
| Halftone Facts Summarized | সুকুমার রায় |
৪৮. গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সাল
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১৭৮৪ | এশিয়াটিক সোসাইটি |
| ১৭৮৭ | বোটানিক্যাল গার্ডেন |
| ১৮১৭ | হিন্দু কলেজ |
| ১৮৩৫ | কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ |
| ১৮৭৬ | IACS |
| ১৯১৭ | বসু বিজ্ঞান মন্দির |
| ১৯২৪ | Indian Chemical Society |
| ১৯৩১ | Indian Statistical Institute |
| ১৯৪৮ | বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ |
৪৯. কয়েকটি বিশেষ তথ্য
বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীর পরিচয়
‘জাতীয় বিজ্ঞানচর্চার জনক’ — মহেন্দ্রলাল সরকার
‘ভারতীয় উদ্ভিদবিদ্যার জনক’ — উইলিয়াম রক্সবার্গ
‘টলস্টয় অব বেঙ্গল’ — মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দী
‘কলকাতার বিশ্বকর্মা’ — বিপিনবিহারী দাস
বাংলায় বিজ্ঞান রচনার পথিকৃৎ পত্রিকা — দিগ্দর্শন
ভারতে হাফটোন ব্লকের প্রবর্তক — উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
বাংলা সাহিত্যে ননসেন্স-এর প্রবক্তা — সুকুমার রায়
ভারতীয় রঙিন আলোকচিত্রের পথিকৃৎ — হেমেন্দ্রমোহন বসু
কুন্তলীন পুরস্কারের প্রবর্তক — হেমেন্দ্রমোহন বসু
কালাজ্বরের প্রতিষেধক Urea Stibamine — উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী
Bengal Chemical — প্রফুল্লচন্দ্র রায়
Saha Ionization Equation — মেঘনাদ সাহা
Bose-Einstein Statistics — সত্যেন্দ্রনাথ বসু
Mahalanobis Distance — প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ
বাংলার কীটপতঙ্গ — গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য
গ্রহ-নক্ষত্র — জগদানন্দ রায়
The Upper Atmosphere — শিশিরকুমার মিত্র
বিশ্বপরিচয় — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিশ্বপরিচয় উৎসর্গ — সত্যেন্দ্রনাথ বসু
উপসংহার
বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস আসলে কয়েকজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের ইতিহাস নয়। এটি একটি সমগ্র সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তরের ইতিহাস।
একদিকে এশিয়াটিক সোসাইটি, হিন্দু কলেজ, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ আধুনিক জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক দরজা খুলেছে; অন্যদিকে মহেন্দ্রলাল সরকার, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মহালানবিশ সেই জ্ঞানকে মৌলিক গবেষণার আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে গেছেন।
আবার মধুসূদন গুপ্ত সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে প্রতিষ্ঠা করেছেন; কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় নারীর জন্য বিজ্ঞানশিক্ষার দরজা খুলেছেন; উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী বিজ্ঞানকে মানুষের জীবনরক্ষার শক্তিতে পরিণত করেছেন।
আর উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, হেমেন্দ্রমোহন, জগদানন্দ, রামেন্দ্রসুন্দর, স্বর্ণকুমারী, গিরীন্দ্রশেখর, গোপালচন্দ্র, চারুচন্দ্র প্রমুখ দেখিয়েছেন—বিজ্ঞানকে কেবল গবেষণাগারের মধ্যে আবদ্ধ রাখলে চলে না; তাকে ভাষায়, সাহিত্যে, মুদ্রণে, শিল্পে, প্রযুক্তিতে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বোধের মধ্যে নিয়ে যেতে হয়।
এই কারণেই বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হয়তো কোনো একটি আবিষ্কার নয়; বরং বিজ্ঞানকে একটি সংস্কৃতির অংশে পরিণত করার দীর্ঘ সাধনা।
আর সেই সাধনার ধারাবাহিকতায় রক্সবার্গ থেকে রাধানাথ, মধুসূদন থেকে মহেন্দ্রলাল, প্রফুল্লচন্দ্র থেকে জগদীশচন্দ্র, মেঘনাদ থেকে সত্যেন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রকিশোর থেকে সুকুমার, জগদানন্দ থেকে গোপালচন্দ্র—প্রত্যেকেই বৃহত্তর একটি বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের নির্মাতা।
###পরিবেশনে- ড. অনিশ রায়

