প্রশ্ন:১ ‘বহুরূপী’ গল্প অবলম্বনে হিমালয়বাসী সন্ন্যাসীর যে প্রসঙ্গ আছে, তার ভিত্তিতে সন্ন্যাসী চরিত্র বিশ্লেষণ করো।
উত্তর : বাংলা কথাসাহিত্যে এক উজ্জ্বল নাম সুবোধ ঘোষ। তাঁর ছোটগল্পে যে আলোকিত বলয় তৈরি হয়, তা বাস্তব জীবনবোধের গভীর চেতনায় নির্মিত। জীবনকে নানাভাবে দেখার মধ্য দিয়ে এবং অনুভবের গভীরতা শিল্পদৃষ্টিকে যে মহত্তর করে তুলতে পারে, তা বোঝা যায় সুবোধ ঘোষের গল্পের প্রেক্ষাপট ও চরিত্রকে অনুধাবন করলে।
বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে মানবমনের যে মেকি ও অন্ধকারাচ্ছন্নতা সমাজকে অন্যমাত্রায় চালিত করেছিল, সুবোধ ঘোষ তাকেই যেন সাংবাদিকসুলভ সন্ধানে তুলে আনেন তাঁর গল্পের অক্ষরমালায়। তেমনি এক চেনা অথচ অজানা চরিত্র হল ‘বহুরূপী’ গল্পের হিমালয়বাসী সন্ন্যাসী।
গল্প শুরু হয় এই সন্ন্যাসীর কথা প্রসঙ্গে। পাড়ার কিছু তরুণ হরিদার কাছে এসে এক সন্ন্যাসীর খবর জানায় উৎসাহের সঙ্গে। সেই বিবরণের মধ্য দিয়ে যে তথ্যগুলো উঠে আসে, তা হল—
১) সন্ন্যাসী জগদীশবাবুর বাড়িতে আসেন অতিথি হিসেবে। অতি আদর ও ভক্তি-প্লাবিত সেবা উপভোগ করে চলেন।
২) সন্ন্যাসীর প্রকৃত আবাস নাকি হিমালয়ের তুষারাবৃত অঞ্চলের কোনো এক গোপন গুহায়। সমতলের ধুলোমাটি তিনি তাঁর শ্রীচরণে ঠেকাতে আসেন মাঝে মাঝে।
৩) সারাবছর একটিমাত্র হরিতকি ছাড়া তিনি বিকল্প কোনো খাদ্য গ্রহণ করেন না। অর্থাৎ ওই একটি মাত্র হরিতকিতেই সন্ন্যাসীর সার্বিক পুষ্টিবিধান হয়ে থাকে। শরীর তথা পুষ্টিবিজ্ঞানের জগতে সন্ন্যাসী তাই এক ব্যতিক্রমী বিস্ময়।
৪) সুদীর্ঘ আয়ুর চিহ্ন তাঁর নধরকান্তি শরীরে কোনোরকম ছাপ না রাখলেও, কিংবদন্তি অনুযায়ী তিনি হাজার হাজার বছর বয়স্ক।
৫) অবশ্য এই সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, তাঁর কাঠের খড়মে জগদীশবাবু প্রদত্ত সোনার বল দর্শনমাত্র পদযুগলের গতি ত্বরান্বিত করে দেন। আবার গৃহত্যাগকালে জগদীশবাবুর প্রণামীস্বরূপ দেওয়া একশো টাকার থলিও আপ্লুত চিত্তে সহাস্যবদনে গ্রহণ করেন।
এই তথ্য এবং সন্ন্যাসীর আচরণের কথা শুনে তাঁর যে চারিত্রিক দিকগুলি উল্লেখ করা সম্ভব, সেগুলি হল—
১) সন্ন্যাসীর পরিচয় এবং জীবনাচরণে মিথ্যা ভণ্ডামির সমস্ত দিকগুলি প্রকট।
২) সন্ন্যাসীর মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা লোভী এবং প্রবঞ্চক মানুষের বিকৃত মুখটি বেরিয়ে আসে তাঁর ব্যবহারিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
৩) অলৌকিকত্বের বাতাবরণ সৃষ্টি করে মানুষকে ঠকাতে তাঁর জুড়ি নেই।
৪) সন্ন্যাস পালনের মিথ্যে ঢঙে তিনি সংকীর্ণ লালসাগ্রস্ত গৃহী জীবনকেই আসলে চরিতার্থ করে চলেন।
প্রশ্ন:২ ‘বহুরূপী’ গল্প অবলম্বনে হরিদা চরিত্রটি ব্যাখ্যা করো।
ভূমিকা
জীবনকে বিচিত্র বিভঙ্গে দেখার মধ্য দিয়ে শিল্পদৃষ্টির যে মহত্তর পথ নির্মিত হতে পারে, তা উপলব্ধ হয় সুবোধ ঘোষের গল্পের প্রেক্ষাপট ও চরিত্রের স্বরূপকে অনুধাবন করলে। বিশ্বযুদ্ধকালীন সর্বগ্রাসী অন্ধকারের মধ্যেও যে কয়েকজন চৈতন্যের শুভ্র আলো নিয়ে জেগে থাকেন, তাঁদের মধ্যে থেকে কাউকে যেন আমরা হঠাৎ আবিষ্কার করি তাঁর গল্পে। এমনই এক চরিত্র ‘বহুরূপী’ গল্পের হরিদা।
হরিদার সামাজিক পরিচয়
হরিদা একজন বহুরূপী। অর্থাৎ সজ্জা-শিল্পের দ্বারা বহুরূপ ধারণ করে তিনি মানুষের বিস্মিত বাহবা আদায় করেন এবং লাভ করেন আর্থিক আনুকূল্য। বোঝা যায়, এই জীবিকার সূত্রেই তাঁর সামাজিক পরিচয়টি প্রতিষ্ঠিত।
আর্থিক অনটনেও উদাসীন মানসিকতা
হরিদা ছিলেন নিরাসক্ত স্বভাবের। শিল্পীর নির্লিপ্ত ভাব যেন তাঁর চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। শহরের সবচেয়ে ছোট গলির একটি ছোট ঘরে তাঁর বাস। নির্দিষ্ট কোনো আয়ের পথ তাঁর নেই। তাই কখনো তাঁর উনুনে ভাত ফোটে, কখনো শুধুই জল। তবে তা নিয়ে তাঁর হতাশা বা যন্ত্রণা নেই। বরং এক মুক্তির আনন্দে তিনি সর্বদাই মশগুল থাকেন।
পেশার প্রতি নিবেদিত প্রাণ
পেশার প্রতি হরিদা ছিল নিবেদিত প্রাণ। পেশাই ছিল তাঁর স্বাধীন ভাবের অবাধ-বিস্তারী নিজস্ব মনভূমি। তাই বাঁধা-নিয়মের চাকরি তাঁর কাছে ফাঁস বলে মনে হয়। বহুরূপীর পেশা থেকে সামান্য যা উপার্জন হতো, তা-ই ছিল হরিদার বেঁচে থাকার অবলম্বন। সুতরাং এক মুক্তমন, নির্লোভ ও নিস্পৃহ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন হরিদা।
দার্শনিক চেতনা-সম্পন্ন
বাহ্য পরিচয়ে হরিদার বিশেষত্ব কিছুই নেই—তিনি এক সামান্য ব্যক্তি। অথচ যখন জগদীশবাবুর গৃহে হরিদা বিরাগী সন্ন্যাসীর রূপ ধারণ করেন, তখন তাঁর মুখে উচ্চারিত অধ্যাত্মভাবনার বক্তব্যগুলির মধ্য দিয়ে প্রকৃত সন্ন্যাসীর জীবনদর্শনও ব্যক্ত হয়। নিখুঁত অভিনয়ে তত্ত্বজ্ঞানের মহিমা যেমন ফুটে ওঠে, তেমনি তাঁর অন্তর্নিহিত সত্তাও প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
জগদীশবাবু ভক্তিভরে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চাইলে হরিদা তা নিস্পৃহতায় প্রত্যাখ্যান করেন। এখানেই তাঁর সত্তা এক বিরাগীর স্তরে উন্নীত হয়।
যথার্থ শিল্পী
হরিদার হাড়িতে বহুদিনই চালের বদলে জল ফুটেছে। বাস্তবের এমন কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও তিনি শিল্পীর সত্য সত্তাকে বিসর্জন দেননি। দারিদ্র্যের জন্য তাঁকে হয়তো মানুষের কাছে হাত পাততে হয়েছে, কিন্তু তাঁর বহুরূপের ভিতরে ছিল এক সত্য মানুষের বিরাগী মন।
তাই অভিনয় ও রূপ-শিল্পের পারিশ্রমিক হিসেবে তিনি পুরস্কার চান, কিন্তু ভক্তির ভণিতাকে জড়িয়ে মহার্ঘ্য প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা করেন না। গল্পের শেষে হরিদার অমোঘ উক্তিটিই তাঁর চরিত্রের নির্ণায়ক হয়ে ওঠে—
“খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর চেয়ে বেশি কী আর আশা করতে পারে?”
এখানেই একজন সৎ শিল্পীর নির্লিপ্ত জীবনানুভূতি উপলব্ধ হয়। শিল্পচেতনার মহৎ চরিতার্থতাই তাঁকে শ্রেষ্ঠ মানবিক রূপের প্রতিনিধি করে তোলে।
প্রশ্ন:৩ ‘বহুরূপী’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
ভূমিকা
সাহিত্যে নামকরণ শুধু স্রষ্টার সৃজন-অভিপ্রায়কেই ব্যক্ত করে না, তা পাঠকের রসবোধ, মানবিক চেতনা এবং দার্শনিক অনুভবকেও উদ্দীপ্ত করে। সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পটি সেই মূল্যবোধ জাগানোরই প্রেরণা হয়ে ওঠে।
‘বহুরূপী’ শব্দের ব্যবহারিক পরিচয়
‘বহুরূপী’ বলতে বিভিন্ন রূপ ধারণে অভ্যস্ত বিশেষ ব্যক্তিকে বোঝায়। সদর্থে, বিশেষ সামাজিক পরিচয়ের বাইরে যিনি ছদ্মরূপে অবতীর্ণ হন, তিনিই বহুরূপী। আবার ব্যঙ্গার্থে ধূর্ত স্বভাবের ব্যক্তিকেও বহুরূপী বলা হয়।
আমাদের গ্রাম-শহরে এক বিশেষ জীবিকার মানুষও বহুরূপী নামে পরিচিত। তাঁরা বিভিন্ন রূপ ধারণ করে মানুষের বিস্ময় ও বাহবা কুড়িয়ে অর্থ উপার্জন করেন। আলোচ্য গল্পে সেই পেশারই মানুষ হরিদা, যিনি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। এদিক থেকে নামকরণ সার্থক।
বহুরূপীর পেশায় হরিদার দক্ষতা
গল্পের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই আছে বিভিন্ন সাজে হরিদার কৃতিত্বের কথা এবং পেশার কারণে তাঁর আত্মনিবেদনের বৃত্তান্ত। নিজের বৃত্তির প্রতি তিনি ছিলেন আস্থাশীল ও নিবেদিত প্রাণ। তাঁর সাজ ও অভিনয়ের শিল্পিত নিদর্শন গল্পে বহুবার দেখা যায়—
১) চকের বাসস্ট্যান্ডের পাগল
এই রূপে তাঁর মুখ থেকে লালা ঝরছে, চোখ রক্তলাল, কোমরে ছেঁড়া কম্বল, গলায় টিনের কৌটা। একটি থান ইট তুলে তিনি যাত্রীদের ধাওয়া করেন।
২) এক অপরূপ বাঈজি
সন্ধ্যার রাস্তায় ঝুমুর পায়ের মায়াবী ঝলক তুলে হেঁটে যায় সেই বাঈজি। সেদিন সর্বোচ্চ উপার্জন হিসেবে হরিদা পায় আট টাকা দশ আনা।
৩) দয়ালবাবুর লিচুবাগানের পুলিশ
এবার তিনি শুধু স্কুলছাত্রদের নয়, মাস্টারমশাইকেও বোকা বানিয়েছিলেন। এমনকি আট আনা ঘুষও পেয়েছিলেন।
৪) এক বৈরাগী সন্ন্যাসী
এখানে বহুরূপীর অন্তরালে উঁকি দিয়ে যায় একজন মুক্তমনের সত্য দার্শনিক। এই রূপে তাঁর উপার্জন হয়েছিল একশো এক টাকা, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
৫) এছাড়াও হরিদা কাপালিক, বাউল, কাবুলিওয়ালা এবং ফিরিঙ্গি সাজেও কৃতিত্ব দেখান।
এই বহুরূপ ধারণের প্রসঙ্গেও গল্পের নামকরণ সার্থক।
বহুরূপের আড়ালে সত্য মানব রূপের উন্মোচন
কোনো এক স্নিগ্ধ মায়াবী সন্ধ্যায় হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সন্ন্যাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তাঁর ভাগবত-বাণীর সম্মোহনে জগদীশবাবু অভিভূত হয়ে পড়েন এবং ভক্তির আতিশয্যে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চান। কিন্তু বিরাগী রূপী হরিদা সেই টাকা নিতে অস্বীকার করেন।
এখানে যেন শিল্পীসত্তা ও ত্যাগধর্ম একসূত্রে গাঁথা হয়ে যায়। অভিনয়ের সীমা অতিক্রম করে তাঁর সত্য মানবিক পরিচয় উন্মোচিত হয়। বোঝা যায়, বহুরূপের মধ্য দিয়েই শিল্পী ও সন্ন্যাসীর সত্তার মধ্যে সেতুবন্ধন ঘটে। শিল্পীর সততা এবং সন্ন্যাসীর বিরাগ মিলেমিশে তাঁর প্রকৃত মানবিক রূপকে প্রকাশ করে।
সমাজের সর্বস্তরে মুখোশপরা ভণ্ড বহুরূপীর ভিড়ে পেশাগত বহুরূপী হরিদাই একজন সত্য মানুষের মুখ হয়ে ওঠেন। এখানেই গল্পের নামকরণের সুদূরপ্রসারী ব্যঞ্জনা নিহিত।
উপসংহার
সুতরাং বলা যায়, গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের পেশাগত পরিচয়, তাঁর বহুরূপ ধারণের দক্ষতা এবং বহুরূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত মানবিক সত্তার উন্মোচন—সবদিক থেকেই ‘বহুরূপী’ নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক ও তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রশ্ন:৪ “হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে”— হরিদার জীবনে নাটকীয় বৈচিত্র্যের পরিচয় দাও।
ভূমিকা
বাংলা ভাষার মহান সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পটির নামকরণ শুধু স্রষ্টার সৃজন-অভিপ্রায়কেই ব্যক্ত করেনি; বরং একই সঙ্গে তা পাঠকের রসবোধ, মানবিক চেতনা ও দার্শনিক অনুভবকেও উদ্দীপ্ত করেছে। এটি মানবিক মূল্যবোধ জাগানোর প্রেরণাও হয়ে উঠেছে শিল্পিত অভিব্যক্তিতে।
বহুরূপী শব্দের ব্যবহারিক পরিচয়
‘বহুরূপী’ বলতে বিভিন্ন রূপ ধারণে অভ্যস্ত বিশেষ ব্যক্তিকে বোঝায়। সদর্থে, বিশেষ সামাজিক পরিচয়ের বাইরে যিনি ছদ্মরূপে অবতীর্ণ হন, তিনিই বহুরূপী। কথাটি ব্যঙ্গাত্মকভাবেও ধূর্ত স্বভাবের ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়। আবার আমাদের গ্রাম-শহরে বিশেষ জীবিকা পালনকারী ব্যক্তিদেরও বহুরূপী বলা হয়, যারা রূপ পরিবর্তন করে মানুষের বিস্মিত-বাহবা কুড়িয়ে অর্থ উপার্জন করেন। আলোচ্য গল্পে দেখি, সেই পেশারই মানুষ হরিদা, গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। এবং হরিদা চরিত্রটি সজ্জাশিল্প ও অভিনয়দক্ষতার মিশেলে সত্যিই নাটকীয় বৈচিত্র্যের আধার হয়ে উঠেছে।
বহুরূপীর পেশায় হরিদার দক্ষতা ও নাটকীয় বৈচিত্র্য
গল্পের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই আছে ‘বহুরূপী’র বিভিন্ন সাজে হরিদার কৃতিত্বের কথা এবং পেশার কারণে তাঁর মহৎ আত্মত্যাগের বৃত্তান্ত। নিজের বৃত্তির প্রতি তিনি ছিলেন আস্থাশীল ও নিবেদিত প্রাণ। তাঁর সাজ ও অভিনয়ের শিল্পিত নিদর্শন আছে গল্পে—
১) চকের বাসস্ট্যান্ডের পাগল
(এক্ষেত্রে তাঁর মুখ থেকে লালা ঝরছে, চোখ রক্তলাল, কোমরে ছেঁড়া কম্বল, গলায় টিনের কৌটা। একটা থান ইট তুলে যাত্রীদের ধাওয়া করেন পাগলরূপী হরিদা।)
২) এক অপরূপ বাঈজি
(এবার সন্ধ্যার রাস্তায় ঝুমুর পায়ের মায়াবী ঝলক তুলে হেঁটে যায় সেই বাঈজি। সেদিন সর্বোচ্চ উপার্জনস্বরূপ হরিদা পায় আট টাকা দশ আনা।)
৩) দয়ালবাবুর লিচুবাগানের পুলিশ
(সেবার শুধু স্কুলছাত্রদের নয়, মাস্টারমশাইকেও তিনি বোকা বানিয়েছিলেন। আট আনা ঘুষও পেয়েছিলেন।)
৪) এক বৈরাগী সন্ন্যাসী
(এখানে বহুরূপীর অন্তরালে উঁকি দিয়ে যায় একজন মুক্তমনের সত্য দার্শনিক। এবারে উপার্জন একশো এক টাকা। কিন্তু হরিদা তা প্রত্যাখ্যান করেন।)
৫) এছাড়াও হরিদা কাপালিক, বাউল, কাবুলিওয়ালা, ফিরিঙ্গি সাজেও কৃতিত্ব দেখান।
উপসংহার
এইভাবে বহুরূপ ধারণের মধ্য দিয়ে হরিদার জীবন নাটকীয় বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর অভিনয়শৈলী, সজ্জাশিল্পে দক্ষতা এবং বিভিন্ন চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার ক্ষমতা তাঁকে এক অনন্য শিল্পীর মর্যাদা দিয়েছে। তাই হরিদার জীবনে নাটকীয় বৈচিত্র্যের বহুরৈখিকতা লেখক ও পাঠককুলের দৃষ্টিতে খুব সহজেই প্রতিফলিত হয়ে যায়।
প্রশ্নঃ৫ ‘আমার বুকের ভিতরেই যে সব তীর্থ।’— বক্তার এ উপলব্ধির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।
উত্তর : সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পে বিরাগীর ছদ্মবেশধারী হরিদা জগদীশবাবুকে উদ্দেশ্য করে উক্ত কথাটি বলেছিলেন। হরিদার বিরাগীসাজ, জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে জগদীশবাবু তাঁকে তীর্থভ্রমণের জন্য অর্থসাহায্য করতে চাইলে বিরাগীরূপী হরিদা তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন— “আমার বুকের ভিতরেই যে সব তীর্থ।”
এই উক্তির মধ্যে প্রকৃত সন্ন্যাসধর্মের গভীর উপলব্ধি নিহিত রয়েছে। বিরাগীর মতে, ঈশ্বরকে বাহ্যিক তীর্থক্ষেত্রে নয়, মানুষের নিজের অন্তরের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। মায়া-মোহ, লোভ ও জাগতিক আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে আত্মার গভীরে ঈশ্বরচেতনার সন্ধান করাই প্রকৃত সাধনার পথ। তাই তীর্থভ্রমণের জন্য অর্থব্যয়ের প্রয়োজন নেই; বরং আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়েই পরম সত্যকে উপলব্ধি করা সম্ভব।
আসলে এই উক্তির মাধ্যমে বিরাগীরূপী হরিদা ধনগর্বে আচ্ছন্ন জগদীশবাবুকে প্রকৃত ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। এখানেই তাঁর দার্শনিক মনন ও মানবিক চেতনার পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে।
প্রশ্নঃ৬ ‘বহুরূপী’ গল্পে মোহ ও আসক্তিহীন জীবনের জন্য বিরাগী কোন্ কোন্ কথা বলেছেন?
উত্তর : সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে বিরাগীর ছদ্মবেশে হরিদা জগদীশবাবুকে মোহ ও আসক্তিহীন জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য বোঝানোর চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, মানুষের জীবনে ধন, জন, যশ, যৌবন কিংবা পার্থিব ঐশ্বর্য— কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এগুলি কেবল ক্ষণস্থায়ী মোহ, যা মানুষকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করে।
বিরাগী বলেন, জাগতিক সুখ, দেহসুখ, মায়া-মমতা ও ভোগবিলাসের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারলেই প্রকৃত শান্তি লাভ করা যায়। ঈশ্বরপ্রেম ও আত্মোপলব্ধিই মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। তিনি আরও বোঝান যে, বাহ্যিক তীর্থপরিক্রমার চেয়ে নিজের অন্তরে ঈশ্বরকে অনুভব করাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই পরম সত্যের বাস।
এইভাবে বিরাগীর বক্তব্যে সংসারবিমুখতা, বৈরাগ্য, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক মুক্তির আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর কথাগুলি শুধু সন্ন্যাসজীবনের দর্শন নয়, বরং মানবজীবনের গভীর সত্যকেও প্রকাশ করে।
প্রশ্নঃ৭ ‘বহুরূপী’ গল্পের শেষ অংশে বিরাগীর চরিত্রের কোন্ কোন্ দিক প্রতিফলিত হয়েছে?
উত্তর : সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের শেষ অংশে বিরাগীরূপী হরিদার চরিত্রের এক মহৎ ও গভীর মানবিক রূপ উন্মোচিত হয়েছে। জগদীশবাবু পুণ্যলাভের আশায় তাঁকে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চাইলে তিনি তা সসম্মানে প্রত্যাখ্যান করেন। এই ঘটনাতেই তাঁর নির্লোভ, নির্মোহ ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।
বিরাগীরূপী হরিদা উপলব্ধি করেছিলেন যে, অর্থ গ্রহণ করলে তাঁর বক্তব্য ও আচরণের মধ্যে অসঙ্গতি দেখা দেবে। তাই তিনি অভিনীত চরিত্রের আদর্শকে অক্ষুণ্ণ রাখেন। এখানেই একজন প্রকৃত শিল্পীর নিষ্ঠা ও সততার পরিচয় ফুটে ওঠে। তিনি শুধু বহুরূপী নন, চরিত্রের সঙ্গে আত্মিকভাবে একাত্ম হয়ে যাওয়ার বিরল ক্ষমতার অধিকারী।
একই সঙ্গে তাঁর দার্শনিক মনন, সংসারবিরাগ, অর্থলোভহীনতা এবং সত্যের প্রতি অটল নিষ্ঠাও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে গল্পের শেষে হরিদা কেবল একজন বহুরূপী শিল্পী নন, বরং একজন প্রকৃত বিরাগীসুলভ, নির্মোহ ও মহৎ মানবিক সত্তার প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
১। হরিদা পুলিশ সেজে কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন? তিনি কীভাবে মাস্টারমশাইকে বোকা বানিয়েছিলেন?
(১+২) [মাধ্যমিক ২০১৭]
উত্তর : সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে বহুরূপী হরিদা দয়ালবাবুর পিছনের বাগানে পুলিশ সেজে দাঁড়িয়েছিলেন।
স্কুলের চারজন ছেলে দয়ালবাবুর পিছনের বাগানে কচু চুরি করতে গিয়েছিল। সেখানে আগে থেকেই হরিদা পুলিশ সেজে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পুলিশ দেখে ছেলেরা ভয়ে কেঁদে ফেলেছিল। পরে মাস্টারমশাই এসে নকল পুলিশ হরিদার কাছে ক্ষমা চান এবং ছেলেদের ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু পুলিশ সেজে থাকা হরিদা মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে আট আনা ঘুষ নিয়েই ছেলেদের ছেড়ে দেন। এভাবেই তিনি মাস্টারমশাইকে বোকা বানিয়েছিলেন।
২। “সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস।” — কোন জিনিসের কথা বলা হয়েছে? তা দুর্লভ কেন? (১+২) [মাধ্যমিক ২০২০]
উত্তর : সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলোর কথা বলা হয়েছে। একে ‘ভয়ানক দুর্লভ জিনিস’ বলা হয়েছে।
জগদীশবাবু অত্যন্ত ধর্মবিশ্বাসী ও পুণ্যলোভী ছিলেন। তাঁর বাড়িতে যে সন্ন্যাসী এসেছিলেন, তিনি নাকি হিমালয়ের গুহায় থাকেন এবং বারো বছরে মাত্র একটি হরীতকী খান। তাই তাঁর পায়ের ধুলো লাভ করলে মহাপুণ্য হবে—এই বিশ্বাসে জগদীশবাবু সোনার বোল লাগানো কাঠের খড়ম সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরেন এবং সন্ন্যাসী খড়ম পরামাত্র সেই পদধূলি গ্রহণ করেন। তাই সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলোকে ‘ভয়ানক দুর্লভ জিনিস’ বলা হয়েছে।
৩। “হরিদার উনুনের হাঁড়িতে অনেক সময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না।” — হরিদার জীবিকা কী? কেন তাঁর হাঁড়িতে শুধু জল ফোটে? (১+২)
উত্তর : হরিদা ছিলেন একজন বহুরূপী। নানা রকম সাজসজ্জা করে মানুষের মনোরঞ্জন করাই ছিল তাঁর জীবিকা।
হরিদার জীবনদর্শন ছিল অন্যরকম। বাঁধাধরা চাকরি করতে তাঁর ভালো লাগত না। তিনি সপ্তাহে মাত্র একদিন বহুরূপী সেজে বের হতেন এবং সামান্য যা উপার্জন করতেন, তা দিয়েই দিন কাটাতেন। ফলে উপার্জন খুব কম হওয়ায় অনেক সময় তাঁর উনুনের হাঁড়িতে শুধু জল ফুটত, ভাত ফুটত না।
৪। “কিন্তু দোকানদার হেসে ফেলল।” — কার কী কাণ্ড দেখে দোকানদার হেসে ফেলেছিল? (১+২)
উত্তর : সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদার কাণ্ড দেখে দোকানদার হেসে ফেলেছিল।
সেদিন হরিদা এক রূপসী বাঈজির সাজে পথে বেরিয়েছিলেন। তাঁর পায়ের নূপুরের রিনিঝিনি শব্দে তিনি নাচতে নাচতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। হাতে ছিল ফুলের তোড়া। একটি দোকানের সামনে গিয়ে তিনি মুচকি হেসে চোখ টিপে দোকানদারের দিকে ফুলের তোড়া বাড়িয়ে দেন। এই অভিনয় ও অঙ্গভঙ্গি দেখে দোকানদার হেসে ফেলেছিল।
৫। “আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?” — কাকে এ কথা বলা হয়েছিল? এমন উক্তির কারণ কী? (১+২)
উত্তর : সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে বহুরূপী হরিদা, বৈরাগীর ছদ্মবেশে জগদীশবাবুকে এই কথা বলেছিলেন।
একদিন হরিদা বৈরাগীর বেশে জগদীশবাবুর বাড়িতে যান। সেই সময় জগদীশবাবু বারান্দায় চেয়ারে বসেছিলেন। ভগবানের প্রতিনিধি বলে মনে করা এক বৈরাগী বাড়িতে এসেছেন, অথচ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে তিনি নিচে নামলেন না; উপর থেকেই ‘আসুন’ বলে ডাকলেন। এই ঔদ্ধত্য ও অহংকার দেখে হরিদা ব্যঙ্গ করে বলেন— “আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?”
৬। “পরম সুখ কাকে বলে জানেন?” — কার উক্তি? ‘পরম সুখ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? (১+২)
উত্তর : উদ্ধৃত উক্তিটি বৈরাগীর বেশে আসা হরিদার।
হরিদা ছিলেন একজন দক্ষ বহুরূপী। তিনি শুধু পোশাকে নয়, মনেও যে চরিত্রের অভিনয় করতেন, সেই চরিত্রে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে মিশিয়ে দিতেন। তাঁর মতে, জাগতিক লোভ, মোহ ও ভোগের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াই পরম সুখ। অর্থাৎ সংসারের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে বৈরাগ্যের জীবন গ্রহণ করাই প্রকৃত সুখ।
৭। “অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।” — ‘অদৃষ্ট’ শব্দের অর্থ কী? এমন মন্তব্যের কারণ কী? (১+২)
উত্তর : ‘অদৃষ্ট’ শব্দের অর্থ ভাগ্য বা নিয়তি।
বৈরাগীর বেশে হরিদা যখন জগদীশবাবুর বাড়ি যান, তখন জগদীশবাবু তাঁকে ১০১ টাকা প্রণামী দিতে চান। ওই টাকা নিলে হরিদার কয়েক দিনের খাদ্যের ব্যবস্থা হয়ে যেত। কিন্তু বৈরাগীর চরিত্রে সম্পূর্ণ মগ্ন হয়ে থাকায় তিনি সেই টাকা স্পর্শ করেননি। ফলে অর্থকষ্ট থেকেই গেল। তাই বলা হয়েছে— “অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।”
৮। “তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়।” — কার ঢং নষ্ট হয়ে যেত? এমন মনে হওয়ার কারণ কী? (১+২)
উত্তর : এখানে হরিদার ঢং নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
হরিদা যখন যে চরিত্রে অভিনয় করতেন, তখন মন-প্রাণ দিয়ে সেই চরিত্রে নিজেকে বিলিয়ে দিতেন। পুলিশ সেজে তিনি মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে ঘুষ নিতে পারলেও, বৈরাগীর বেশে তিনি জগদীশবাবুর দেওয়া ১০১ টাকা গ্রহণ করতে পারেননি। কারণ, টাকা নিলে বৈরাগ্যের আদর্শ ও চরিত্র ভেঙে যেত। তাই তাঁর মনে হয়েছিল, টাকা নিলে তাঁর ‘বৈরাগীর ঢং’ নষ্ট হয়ে যাবে।

