ফুটবল সভ্যতা: সংকটে নাকি স্বস্তিতে?

পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যতারই একটি প্রিয় মিথ আছে। যে মিথ তাকে সান্ত্বনা দেয়, যে মিথ তাকে বিজয়ের অনুভূতি দেয়, যে মিথ তাকে নিজের প্রতিচ্ছবির প্রেমে পড়তে শেখায়। ইতিহাসের দীর্ঘ করিডোরে ‘সত্য’ সর্বদা রাজা ছিল না; রাজা ছিল বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির নির্বাচিত বয়ান। ক্ষমতা কখনও কেবল আইন লেখে না, সে মানুষের স্মৃতির রূপরেখাও নির্ধারণ করে। আর যে স্মৃতি-নির্ধারণের গঠনক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে, সে ভবিষ্যৎও নিয়ন্ত্রণ করার পথ খোঁজে।
 
আমি তো ভাবি, ফুটবল সেই মানবসভ্যতারই ভাবগত ও প্রত্যক্ষ মিনিয়েচার।
 
অনেকে মনে করেন, ফুটবল বাইশজন মানুষের পায়ের ভাষা। আমিও শৈশবে মনে করেছিলাম, ফুটবল এক আনন্দ। তারপর কৈশোরে বুঝলাম, ফুটবল শিল্প; শিল্পের সেই আনন্দধারায় হাসি-কান্না, হীরা-পান্না অবিরাম দুলতে থাকে। ধীরে ধীরে বয়স যত বেড়েছে তত বুঝেছি, ফুটবল মানবসভ্যতায় সম্মিলিত অথচ স্বতন্ত্র জাতীয় ঐতিহ্যের এক ধারাবাহিক পরিচয়পত্র। তারপর বুঝলাম, ফুটবল এক প্রতীকী সংঘর্ষ; শাসকের শৃঙ্খলের বিপরীতে চির শাসিতের মুক্ত-আত্মপরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্র থেকে বর্তমানে জাতীয় চেতনার আস্তিত্বিকতা বনাম বিশ্বায়িত পণ্যায়ণের বিষম লড়াই। এখন আমি ক্রমশ বুঝতে পারছি, ফুটবল বর্তমানে কোটি কোটি মানুষের উচ্ছল চিন্তাহীন অগভীর বিশ্বাসের ভাষা। যে বিশ্বাস-ও আসলে নিয়ন্ত্রিত৷ উন্মাদনার ঝাঁ-চকচকে পোশাকে তাকে সুসজ্জিত করে তোলা হয়েছে। 
 
আগে জেনেছিলাম, মাঠে বল গড়ায় মাত্র নব্বই মিনিট; কিন্তু বল থেমে যাওয়ার পর যে কাহিনি লেখা শুরু হয়, তার স্থায়িত্ব কখনও কখনও শতাব্দীরও বেশি। খেলার ইতিহাসে গোলের চেয়ে, খেলার চেয়েও গল্পের আয়ু দীর্ঘ।
 
আর আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে সত্যকে হত্যা করার জন্য তাকে অস্বীকার করারও প্রয়োজন পড়ে না। বরং তার চারপাশে এত শব্দ সৃষ্টি করা হয় যে, সত্য নিজেই নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পায় না। মিথ্যার আধুনিক রূপ আর কেবল অসত্য নয়; মিথ্যার সবচেয়ে পরিণত রূপ হলো ‘নির্বাচিত সত্য’। যা বলা হবে বা লেখা হবে, তা-ই সত্য; যা বলা হবে না, তা কোনোদিন যেন ঘটেইনি। ফুটবলও এই নিয়তির বাইরে নয়।
 
এখন খেলার সাম্প্রতিক বয়ানে গোলের চেয়ে, খেলার চেয়ে, খেলায় প্রত্যক্ষ আদর্শের চেয়ে, নৈর্ব্যক্তিক বিচারের চেয়ে নিয়ন্ত্রিত বিশ্বাসের সামাজিক বিস্তৃতি বহুদূর। চমকপ্রদ স্ফুলিঙ্গ এখানে স্থায়ী আলোর চেয়ে আরামদায়ক। অধিক আকর্ষণীয়, তাই নির্বিচার সমর্থনযোগ্য৷ 
 
স্টেডিয়ামের ঘাসের প্রতিটি শিরা সমান সবুজ, কিন্তু ইতিহাসের পাতা কখনও সমান সবুজ নয়। সেখানে আলোও সমানভাবে পড়ে না। কিছু মুখ চিরকাল আলোকিত থাকে, কিছু মুখকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়। কিছু কান্না কিংবদন্তি হয়, কিছু কান্না পরিসংখ্যানেরও বাইরে ডাস্টবিনে জমা হয়। তাই প্রশ্ন জাগেই—বর্তমান ইতিহাস কি তবে কেবল ঘটনার সমষ্টি, নাকি ঘটনাকে ঘিরে নির্মিত ভাষ্যের আরেক নাম?
 
মানুষের সম্ভবত সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা, সে সত্যকে সবসময় ভালোবাসে না; কিন্তু সে নিজের ধারণাজাত অথবা প্রভাবিত বিশ্বাসকেই ভালোবাসে। তাই অনবরত নিজের বিশ্বাসের পক্ষ সন্ধান করতে থাকে৷ যেন কালেকটিভ কালচারে পক্ষমত তৈরি করা৷ তাই একটি মিথ্যাকে বারবার উচ্চারণ করলে, তা একসময় যুক্তিকে পরাজিত করে সাম্প্রতিক হয়তো-বা প্রসারিত স্মৃতিরও অংশ হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞান বহুদিন আগেই বলেছে—পুনরাবৃত্তিতে বিশ্বাস জন্মায়। দর্শন বলেছে—ক্ষমতা সত্য সৃষ্টি করে না, কিন্তু সত্যের সংজ্ঞা নির্ধারণের অধিকার দখল করতে চায়। আর ইতিহাস? ইতিহাস প্রায়ই সেই ভাষাতেই লেখা হয়, যে ভাষায় দখলদারি বিজয়ীরা কথা বলে।
 
ফুটবল তবে কি সেই অস্বস্তিকর প্রতিফলনই হয়ে উঠছে?
 
আমরা ভাবি, ম্যাচ শেষ হয়েছে। অথচ প্রকৃত ম্যাচটি তখনই শুরু হয়। ক্যামেরা, ভিডিও, ছবি, শিরোনাম, সামাজিক মাধ্যম, আবেগ, বিপণন, তথ্য, পরিসংখ্যান—সব মিলিয়ে আরেকটি অদৃশ্য টুর্নামেন্ট শুরু হয়। সেখানে গোলের বা খেলার নান্দনিক মূল্য নয়, গোলের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক-অর্থনৈতিক  অর্থ নির্ধারিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্তের বিচার কম, সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঘটনাগুলো নয়, ঘটনাকে দেখার পদ্ধতিই মানুষের সাম্প্রতিক স্মৃতিকে মজিয়ে তোলে এবং স্থায়ী আসনে বসতে চায়।
 
এ এক নতুন যুগ—পোস্ট-ট্রুথের যুগ। এখানে সত্যের সবচেয়ে বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বী মিথ্যা নয়; তার প্রতিদ্বন্দ্বী সুপরিকল্পিত কৌশলী বয়ান। কারণ মিথ্যা ধরা পড়ে, বয়ান ধরা পড়ে না। বয়ান কেবল দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে উঠে-পড়ে লাগে। দুটি বিপরীতমুখী বা আরও বেশি গোষ্ঠী তৈরি করে উসকে দিতে পারে। তখন সত্য তো বহুদূর, মানুষ তখন আর প্রকৃত তথ্যটাও দেখে না; তথ্যের জন্য তৈরি করা ফ্রেমটিই দেখে। ব্যস, সমর্থন পাওয়ার জন্য চলে বয়ান-নির্মাণের প্রতিযোগিতা। সত্যটাই আর সত্য পথ পায় না৷ 
 
মিশেল ফুকোঁ লিখেছিলেন, ক্ষমতা শুধু মানুষকে শাসন করে না; মানুষ কীভাবে পৃথিবীকে দেখবে, সেই চোখও নির্মাণ করে। ফুটবলও যেন আজ সেই পরীক্ষাগারের এক উজ্জ্বল সংস্করণ। এখানে খেলা যেমন আছে, তেমনি আছে ‘স্মৃতি-বর্তমান’ নির্মাণের কারখানা; এখানে আবেগ যেমন আছে, তেমনি আছে আবেগ পরিচালনার গোপন ধারালো শিল্প-ট্যাকটিক্স।
 
তবু আশার কথা অন্যত্র।
 
সভ্যতার ধারাবাহিক চলনে এ-কথা স্বীকৃত, সত্যের একটি অদ্ভুত অভ্যাস আছে। সে কখনও তাড়াহুড়ো করে না। মিথ্যা দৌড়ায়, সত্য হাঁটে। মিথ্যা মঞ্চ ভালোবাসে, সত্য নীরব নির্জনতা। মিথ্যা হাততালির শব্দে বাঁচে, সত্য টিকে থাকে সময়ের পরীক্ষাগারে। যে নদী পাহাড় ভাঙে, সে গর্জন করে না; নিঃশব্দে, নিজস্ব ছন্দে, প্রাণশক্তিতে প্রবাহিত হয়।
 
তাই প্রতিটি যুগেই কিছু মানুষ ছিলেন, হয়তো আছেন, যারা জনতার চিৎকারের চেয়ে নিজের বিবেককে বড়ো মনে করেছেন এবং করেন। তারা সংখ্যার পাশে নয়, সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কারণ সত্য কখনও ভোটে বা হুজুগের জোয়ারে জেতে না; সত্য জেতে সময়ের স্বতত প্রবাহে।
 
জানি না, কিন্তু বিশ্বাস রাখি—ফুটবলের ভবিষ্যৎও শেষপর্যন্ত প্রযুক্তি, অর্থ কিংবা ট্রফির ওপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে মানুষের নৈতিক কল্পনাশক্তির ওপর। প্রাণিত আত্মজিজ্ঞাসার ওপর। আমরা কি এখনও এমন দর্শক আছি, যারা নিজের বিশ্বাসকে বজায় রেখেও, সত্যের সৌন্দর্য দেখতে চাই? আমরা কি এখনও এমন মানুষ, যারা জনপ্রিয় মিথ্যা বয়ানের বিরুদ্ধে একটি প্রশ্ন তুলতে সাহস করি? আমরা কি এখনও নিজের বিশ্বাসকে সম্মান করেও, এই বিশ্বাস করি যে, ন্যায় কেবল ফলাফলের নাম নয়, প্রক্রিয়ারও নাম?
 
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামি ফুটবলের চরিত্র, দর্শকরুচি তথা সমর্থকরুচি নির্ধারণ করবে।
 
কারণ বলের গতি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে চলে, কিন্তু প্রকৃত বিশ্বাসের গতি চলে সভ্যতার অদৃশ্য মূল্যবোধের নিয়মে। ট্রফি একদিন বস্তু হয়ে যায়, রেকর্ড নতুন রেকর্ডে মুছে যায়, নায়কেরা ইতিহাসের পাতায় বিগ্রহ হয়ে যান। কিন্তু একটি প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই যা দেখেছি বা জেনেছি, সেটাই বিশ্বাস করেছি; নাকি যা বিশ্বাস করতে চেয়েছি, সেটাই দেখেছি, সেটাই জানতে চেয়েছি? কিংবা, ফুটবল আর তার ইতিহাস কি কেবল তথ্যের জাদুঘর, নাকি নির্বাচনের শিল্প?—এই প্রশ্নগুলোও কোনোদিন আগামির আকূলতা হতে পারে।
 
সম্ভবত ফুটবল আমাদের শেষপর্যন্ত এই শিক্ষাটিই দেয়: মাঠের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেখাটি গোললাইনও নয়, তা সভ্যতার বিবেকরেখা। গোললাইন প্রযুক্তি দিয়ে দেখা যায়; বিবেকরেখা দেখা যায় না। কিন্তু ইতিহাস, শেষপর্যন্ত, সেই অদৃশ্য রেখার বিচারেই বারবার উদ্বর্তিত ও বিবর্তিত হয়ে চলেছে— একথা অস্বীকার করি কোন সাহসে? 
 
সবশেষে তিনজন মহৎ ও অতি প্রিয় মানুষের অতি অতি বিখ্যাত কথা অপ্রাসঙ্গিকের প্রাসঙ্গিকতাতেই একটু মনে পড়ে যাচ্ছে। তাই এমনিই উল্লেখ করছি—
 
@“মিথ্যারও মহত্ত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল করিয়া দিতে পারে মিথ্যার মোহ। চিরকালের জন্যে সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা।” (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)
 
@“অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;…
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।” (জীবনানন্দ দাশ)
 
@“সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম/ সে কখনো করে না বঞ্চনা” (রবীন্দ্রনাথ)
 
### অনিশ রায়
 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top