শিক্ষকের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া

জ্ঞান, ক্ষমতা, নজরদারি ও প্রশ্নের কথকতা

অনিশ রায়

ক্ষমতা সব ধরনের মানুষকে নিয়ে সবসময় চিন্তিত থাকে না, ভয়ও পায় না। ক্ষমতা চিন্তিত থাকে বা কখনো ভয়ও পায় সেই মানুষকে, যে ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে পারে। আর সেদিক থেকে সমাজে প্রকৃত শিক্ষকের প্রকৃত কাজই হল মানুষের ভিতরে সেই প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলা। শিক্ষক কেবল পাঠ্যক্রম শেষ করেন না, কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি দেন না, কেবল নম্বরের হিসাব রাখেন না। একজন যথার্থ শিক্ষক মানুষের ভিতরে এমন এক সত্তার জন্ম দেন, যে প্রচলিত সত্যকে যাচাই করতে শেখে, প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্তের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতে শেখে, অন্যের কথাকে নিজের বুদ্ধির আলোয় বিচার করতে শেখে এবং প্রয়োজনে অবিশ্বাসীর মতো প্রশ্নের পরও আত্ম-জিজ্ঞাসায় মেতে উঠতে পারে— এই প্রশ্ন আর আত্ম-জিজ্ঞাসার মধ্যেই শিক্ষার গভীরতম স্বাধীনতা লুকিয়ে থাকে। আর সেই কারণেই শিক্ষককে নিয়ন্ত্রণ করার ইতিহাস আসলে কেবল শিক্ষাপ্রশাসনের ইতিহাস নয়। তা আসলে জ্ঞান, ক্ষমতা, রাষ্ট্র, সমাজ এবং স্বাধীন চিন্তার পারস্পরিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস।

শিক্ষকের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই একটা মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট করা দরকার। শিক্ষক স্বাধীন হওয়ার অর্থ শিক্ষক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে—এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনই শিক্ষককে জবাবদিহির নামে স্থায়ী সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখাও শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে সুস্থ ব্যবস্থা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে শিক্ষার মান নিশ্চিত করার। ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষা করার। শিক্ষকতার পেশাগত মান বজায় রাখার। অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার। বিদ্যালয় কোনও ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য নয়; শিক্ষক কখনোই আইন ও প্রতিষ্ঠানের বাইরে নন। কিন্তু জবাবদিহি আর নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস নয়। নজরদারি আর সন্দেহ এক জিনিস নয়। তদন্ত আর অপরাধী বিবেচনায় আভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করা এক বিষয় নয়। পেশাগত মূল্যায়ন আর পেশাগত মর্যাদাহানি কখনোই এক হতে পারে না। এই সূক্ষ্ম সীমারেখাই যখন মুছে যায়, তখন প্রশাসন আর শিক্ষার সহায়ক থাকে না; ধীরে ধীরে শিক্ষকের স্বাধীনতার উপর দীর্ঘ ছায়া ফেলতে শুরু করে।

গত দুই দশকের প্রশাসনিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে বারবার যে প্রশ্ন সামনে আসে, তা হল—কেন শিক্ষককে এত ঘন ঘন নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়? যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে, অবশ্যই। কিন্তু যোগ্যতা কি একবার প্রমাণ করার পরও বারবার নতুন করে সন্দেহের মুখে দাঁড় করানো হবে? শিক্ষককে প্রমাণ করতে হবে তিনি যোগ্য; তারপর প্রমাণ করতে হবে তিনি দক্ষ; তারপর প্রমাণ করতে হবে তিনি দায়িত্বশীল; তারপর প্রমাণ করতে হবে তিনি নিয়মিত; তারপর প্রমাণ করতে হবে তিনি নিষ্ঠাবান; তারপর প্রমাণ করতে হবে তিনি সৎ; তারপর প্রমাণ করতে হবে তিনি কাজ করছেন; তারপর সেই কাজের প্রমাণও দিতে হবে; আবার সেই প্রমাণের সত্যতা প্রমাণ করতে হবে। যেন শিক্ষকতা কোনও সাম্মানিক পেশা নয়, যেন শিক্ষক সারাজীবন এমন এক সন্দেহজনক পরীক্ষার্থী, যার পরীক্ষা কোনওদিন শেষ হয় না।

এই ‘প্রমাণ-সংস্কৃতি’র বিপদ খুব গভীরে। কারণ কাজের চেয়ে যখন কাজের প্রমাণ বড়ো হয়ে ওঠে, তখন মানুষ ধীরে ধীরে কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শিক্ষক তখন ভাবতে শুরু করেন, আমি কী পড়ালাম, এবং তার চেয়ে বড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, আমি কীভাবে দেখাব যে পড়িয়েছি। ছাত্রের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন, কোনও দুর্বল ছাত্রকে আলাদা করে সময় দেওয়া, কোনও কবিতার ভিন্নতর অর্থদ্যোতনা নিয়ে হঠাৎ আলোচনা শুরু করা, ইতিহাসের কোনও আবছা অধ্যায়ের প্রশ্ন নিয়ে ছাত্রদের স্বাধীনভাবে ভাবতে দেওয়া, বিজ্ঞানকে পাঠ্যবইয়ের বন্ধন থেকে মুক্ত করে বিস্ময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করানো—এই কাজগুলির অনেকটাই পরিমাপযোগ্য নয়। অথচ শিক্ষা মূলত এই অপরিমাপযোগ্য অঞ্চলের মধ্যেই তার গভীরতম শক্তি খুঁজে পায়।

যে শিক্ষক প্রতিদিন নিজের পেশাগত অস্তিত্বের বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যস্ত, তাঁর ভিতরে ধীরে ধীরে আরেক ধরনের পরিবর্তন ঘটে। তিনি ঝুঁকি নিতে চান না। নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে ভয় পান। বিতর্ক-সম্ভাব্য ভাবনাশ্রিত প্রশ্ন তুলতে চান না। ছাত্রের অপ্রত্যাশিত প্রশ্নকে স্বাগত জানানোর বদলে নিরাপদ উত্তর খুঁজতে থাকেন। কারণ স্বাধীন চিন্তার সঙ্গে অনিশ্চয়তা থাকে। আর প্রশাসনিক সন্দেহের পরিবেশে অনিশ্চয়তা হয়ে ওঠে ঝুঁকি। ফলে শিক্ষক এমন উত্তর দিতে শেখেন, যা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভুল প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু এমন প্রশ্ন করতে শেখান না, যা নতুন চিন্তার দরজা খুলে দিতে পারে। এইভাবে কোনও নির্দেশের দ্বারা সরাসরি সৃজনশীলতাকে নিষিদ্ধ না-করেও সৃজনশীলতার ভিতরে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া যায়।

ক্ষমতার এই পদ্ধতি সবসময় প্রকাশ্য হয় না। কখনও তা সরাসরি আদেশ, শাস্তি, কারণ দর্শানোর নোটিস, তদন্ত বা প্রশাসনিক বিধিনিষেধের ভাষায় আসে। কখনও আসে নিয়মের ক্রমবর্ধমান ভারে। কখনও আসে অনবরত রিপোর্ট, রেকর্ড, তথ্য, প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে। আবার কখনও আসে এমন সামাজিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে, যেখানে শিক্ষককে আগে থেকেই সম্ভাব্য অনিয়মকারী হিসেবে দেখা হয়। এই প্রকাশ্য ও নেপথ্য কৌশলের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ফল কখনও কখনও সম্ভবত একই—শিক্ষক নিজের কাজের চেয়ে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি ভাবতে শুরু করেন।

ক্ষমতা সেই শিক্ষককেই আদর্শ বানাতে চায়, যে শিক্ষক প্রশ্নহীন অনুচর হতে পারেন যথার্থভাবে। কারণ প্রশ্নহীন শিক্ষক ক্ষমতার জন্য সুবিধার বিশেষ মাত্রা। তাঁর কাছে নির্দেশই শেষ সত্য, কর্তৃত্বই শেষ যুক্তি, আর আনুগত্যই পেশাগত সাফল্যের মাপকাঠি। এমন শিক্ষককে সামনে রেখে প্রশাসন আদর্শ শিক্ষক মডেলের দেওয়ালচিত্রও টাঙাতে পারে। অথচ শিক্ষার ইতিহাস আমাদের অন্য কথা বলে। আদর্শ শিক্ষক তিনি নন, যিনি ক্ষমতার ভাষা নিখুঁতভাবে পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। আদর্শ শিক্ষক তিনি, যিনি ছাত্রকে ছাত্রের জাগ্রত চেতনার ভাষায় ভাবতে শেখান। ক্ষমতার প্রয়োজন হতে পারে অনুগত কর্মীর। সমাজের প্রয়োজন স্বাধীন শিক্ষক ও স্বাধীন নাগরিকের।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোঁ আধুনিক ক্ষমতার এক গভীর রূপ বোঝাতে ‘প্যান-অপ্টিকন’-এর ধারণাকে সামনে এনেছিলেন। কারাগারের এমন স্থাপত্য, যেখানে বন্দি জানে না কখন তাকে দেখা হচ্ছে, ফলে শেষপর্যন্ত সে নিজেই নিজের উপর নজরদারি করতে শুরু করে। ফুকোঁর কাছে তা কেবল কারাগারের স্থাপত্য নয়, আধুনিক ক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ রূপক। শিক্ষকের ক্ষেত্রেও এই মনস্তত্ত্ব কাজ করতে পারে। কে কখন দেখছে, কোন তথ্য কোথায় যাচ্ছে, কোন মন্তব্য কীভাবে ব্যাখ্যা হবে, কোন আচরণ প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়বে—এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাইরের নজরদারি ধীরে ধীরে ভিতরের আত্ম-নজরদারিতে পরিণত হয়। তখন আলাদা করে কাউকে চুপ করাতে হয় না। মানুষ নিজেই নিজের বাক্য সম্পাদনা করতে শুরু করে। নিজের প্রশ্ন সাবধানে নির্বাচন করে নেয়। নিজের স্বাধীনতাকে সীমিত করে।

প্রযুক্তি এই সমস্যার কারণ নয়। বায়োমেট্রিক উপস্থিতি, অনলাইন রেকর্ড, ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, পরিসংখ্যান—সবই শিক্ষাব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে সাহায্য করতে পারে। প্রশ্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে কি না, তা নয়; প্রশ্ন হল প্রযুক্তির পেছনে কোন দর্শন কাজ করছে। প্রযুক্তি যদি শিক্ষকের কাজকে বোঝার উপায় হয়, তা সহায়ক। কিন্তু প্রযুক্তি যদি শিক্ষককে কেবল সংখ্যায় পরিণত করে, তবে শিক্ষার মানবিক মাত্রা সংকুচিত হয়। একজন শিক্ষক কত ঘণ্টা উপস্থিত ছিলেন, কতক্ষণ ক্লাস করিয়েছেন, কখন ক্লাসে গেছেন, কতটা অধ্যায় এগিয়েছেন, কতগুলি তথ্য আপলোড করেছেন, কতগুলি ফর্ম পূরণ করেছেন—এসব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু একজন ছাত্রের ভিতরে আত্মবিশ্বাসের জন্ম হল কি না, কোনও হতাশ ছাত্র আবার উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাস পেল কি না, কোনও কিশোর প্রথমবার নিজের প্রশ্নকে মূল্যবান বলে মনে করল কি না—এই ঘটনাগুলির জন্য কোনও সহজ ড্যাশবোর্ড নেই।

শিক্ষার সবচেয়ে বড়ো সাফল্য অনেক সময় নথিভুক্ত হয় না। কোনও ছাত্র বহুবছর পরে তার শিক্ষককে মনে করে বুঝতে পারে, সেই মানুষের কোনও বিশেষ কথাই তার জীবন বদলে দিয়েছিল। কোনও মেয়ের ভিতরে শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠতে পারে কারণ শিক্ষক তাকে প্রথমবার এমন-কিছু বলেছিলেন, যেখান থেকে সে আত্মদর্শন লাভ করেছিল। কোনও দরিদ্র পরিবারের ছেলে বইকে নিজের পৃথিবীর দরজা বলে চিনতে পারে। কোনও ছাত্র প্রথমবার বুঝতে পারে যে ধর্ম, বর্ণ, জাত, ভাষা, পরিবার বা রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তার নিজের বিচারবুদ্ধিরও মূল্য আছে। এইসব ঘটনার কোনও তাৎক্ষণিক পরিমাপ নেই। অথচ সভ্যতার ইতিহাসে এই অপরিমেয় মুহূর্তগুলিই বহু-সময় সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তনের সূচনা করেছে।

ভারতীয় জ্ঞান-ঐতিহ্যের দিকে তাকালেও দেখা যায়, প্রশ্ন করার অধিকার শিক্ষার গভীরে বহুদিন ধরেই ছিল। উপনিষদের সংলাপধর্মী জগতে গুরু কেবল বক্তা নন, শিষ্যও কেবল শ্রোতা নন। নচিকেতা প্রশ্ন করে মৃত্যুর কাছে। গার্গী প্রশ্ন করেন যাজ্ঞবল্ক্যের কাছে। মৈত্রেয়ী জিজ্ঞাসা করেন জ্ঞান, সম্পদ ও অমরত্বের সম্পর্ক নিয়ে। প্রশ্নের মধ্য দিয়েই জ্ঞানের পথ তৈরি হয়। মহাভারতের নৈতিক জগতে বিদুরের কণ্ঠ ক্ষমতার সামনে বিবেকের কণ্ঠ হয়ে ওঠে। আবার একই মহাকাব্যের একলব্যের কাহিনি আমাদের অন্য দিকও দেখায়—জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেও সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির কাঠামোর বাইরে থাকা মানুষের কী পরিণতি হতে পারে। ফলে ভারতীয় ঐতিহ্যকে কেবল প্রশ্নের মুক্ত ঐতিহ্য হিসেবে রোমান্টিক করে দেখলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে; সেই ঐতিহ্যের ভিতরেই প্রশ্নের স্বাধীনতা এবং সামাজিক বর্জন—দুই বিপরীত প্রবণতা পাশাপাশি ছিল। এই দ্বন্দ্বকে উপলব্ধি করাই আমাদের জন্য বেশি জরুরি।

বুদ্ধের শিক্ষাতেও অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে পরীক্ষা, অভিজ্ঞতা ও বিচারবোধের গুরুত্ব দেখা যায়। শঙ্করের দার্শনিক ঐতিহ্যে বিতর্ক ও তর্কের স্থান ছিল অপরিসীম। তক্ষশিলা, নালন্দা প্রভৃতি জ্ঞানকেন্দ্রের স্মৃতি ভারতীয় বৌদ্ধিক সংস্কৃতিতে এমন এক শিক্ষাজগতের ধারণা বহন করে— যেখানে নানা মত, নানা শাস্ত্র ও নানা অনুসন্ধান পাশাপাশি অবস্থান করতে পারত। এই ঐতিহ্য নিখুঁত ছিল না, সামাজিক বর্ণবিভাজন ও লিঙ্গবৈষম্যের বাস্তবতা তার ভিতরেও ছিল। কিন্তু তার বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার আমাদের অন্তত এই শিক্ষা দেয় যে, জ্ঞান কখনও কেবল নির্দেশ গ্রহণের নাম নয়। জ্ঞান মানে অনুসন্ধান, বিতর্ক, সংশয়, পুনর্বিবেচনা এবং সত্যের সন্ধানে নিজের অবস্থানও বদলানোর ক্ষমতা। এবং অবিরাম আরও অন্য সত্যের দিকে যাত্রা করা।

বিশ্বের ইতিহাসেও শিক্ষকের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার সম্পর্ক বহুবার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। সক্রেটিসের বিচার কেবল এক ব্যক্তির বিচার ছিল না; তা ছিল প্রশ্ন করার অধিকার বনাম প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সংঘাতের এক স্মরণীয় উদাহরণ। গ্যালিলিওর ঘটনা দেখায়, জ্ঞান যখন প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে সংঘাতে আসে, তখন সত্যের প্রশ্ন কত দ্রুত কর্তৃত্বের প্রশ্নে পরিণত হতে পারে। আধুনিক ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের সময় বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীদের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জ্ঞানের স্বাধীনতাকে কীভাবে ধ্বংস করতে পারে, তার ভয়াবহ নজির ইতিহাস রেখে দিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঔপনিবেশিক শাসনও শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল জ্ঞান বিতরণের মাধ্যম হিসেবে দেখেনি; তাদের শিক্ষা ছিল শাসন, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

বাংলার নবজাগরণে শিক্ষকের ভূমিকা তাই বিশেষভাবে স্মরণীয়। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ডেভিড হেয়ার, বেথুন সাহেব প্রমুখের শিক্ষা-চিন্তা কেবল বিদ্যালয় নির্মাণ ও পাঠ্যসূচির ভাবনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা নিয়ত সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বিদ্যাসাগরের কাছে শিক্ষা-ভাবনা ছিল নারীশিক্ষা, বিধবাবিবাহ, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ শিক্ষা যখন সত্যিকার অর্থে সমাজকে স্পর্শ করে, তখন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী থাকেন না। তিনি সামাজিক পরিবর্তনেরও প্রধান রূপকারদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের বাংলায় জাতীয় শিক্ষার আন্দোলন, স্বদেশি পর্বের শিক্ষাচিন্তা এবং রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ আমাদের দেখিয়েছে, বিদ্যালয়কে কেবল পরীক্ষার কারখানা হিসেবে ভাবা যায় না। শান্তিনিকেতনের ধারণায় শিক্ষা প্রকৃতি, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, শ্রম, কৌতূহল ও স্বাধীন চিন্তার সঙ্গে যুক্ত ছিল। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শের মূলে যে মুক্ত আকাশের আকাঙ্ক্ষা ছিল, তার অর্থ ছিল মানুষের মনকে সংকীর্ণতার বাইরে নিয়ে যাওয়া। সেখানে শিক্ষক ও ছাত্রসমাজের সম্পর্ক ছিল মুক্ত-পথের পথপ্রদর্শক, পথিক এবং সহযাত্রীর। সেই মুক্তির বিপরীত হল এমন শিক্ষা, যেখানে শিক্ষক ও ছাত্র উভয়েই কেবল নির্দেশ পালন করবে। নির্দিষ্ট সিলেবাসের ভিতর নিশ্চিন্ত বসবাস করবে। নতুন অচেনা পথে হাঁটতে সংকোচ করবে কিংবা ভয় পাবে। এবং নতুন চিন্তার সুতীক্ষ্ণ প্রশ্নকে বিপজ্জনক বলে মনে করে তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবে।

জ্যোতিরাও ফুলে ও সাবিত্রীবাঈ ফুলের শিক্ষা-আন্দোলন আরও এক গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। শিক্ষা কেবল মধ্যবিত্ত বা সুবিধাভোগী সমাজের সাংস্কৃতিক সম্পদ নয়; শিক্ষা সামাজিক অসমতার বিরুদ্ধে মানুষের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার অস্ত্রও হতে পারে। গান্ধীর ‘নাই তালিম’-এর ভাবনা শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিল। আম্বেদকরের চিন্তায় শিক্ষা সামাজিক মুক্তি, মর্যাদা ও অধিকারবোধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে ভারতীয় আধুনিকতার ইতিহাসে শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থা কখনও নিছক প্রশাসনিক কাঠামো ছিল না। তা ছিল সমাজের ভিতরের ক্ষমতার সম্পর্ক বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাও।

এই জায়গাতেই ক্ষমতা ও শিক্ষকের সম্পর্কের আসল দ্বন্দ্ব এবং আসল দৃষ্টিভঙ্গিগত চেতনার ব্যবধান। রাষ্ট্রের প্রয়োজন একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজন কি কেবল অনুগত শিক্ষক? দুয়ের মধ্যে তফাত আকাশ-পাতাল। অনুগত শিক্ষক নির্দেশ পালন করেন। দায়িত্বশীল শিক্ষক নির্দেশের উদ্দেশ্য বোঝেন, নিজের পেশাগত বিবেচনা প্রয়োগ করেন, ভুল দেখলে সংশোধনের কথা বলেন এবং প্রয়োজনে প্রশ্ন তোলেন। রাষ্ট্র যদি কেবল অনুগত্য চায়, তবে সে প্রশাসনিক কর্মী তৈরি করতে পারে; কিন্তু স্বাধীন নাগরিক তৈরির জন্য প্রয়োজন স্বাধীন চিন্তার শিক্ষক। শিক্ষক নিজেও অবশ্য এই স্বাধীনতার দায়িত্ব থেকে মুক্ত নন। স্বাধীনতা মানে যা খুশি বলা নয়; পেশাগত স্বাধীনতা মানে প্রমাণ, যুক্তি, নৈতিকতা ও দায়িত্বের ভিতরে থেকে বিচার করার নির্ভার অধিকার। শিক্ষক যদি নিজের ক্ষমতাকে ছাত্রের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহার করেন, তবে তিনিও সেই একই ক্ষমতা-সংস্কৃতির অংশ হয়ে যান, যার সমালোচনা তিনি করছেন। একজন শিক্ষককে যেমন রাষ্ট্রের অযৌক্তিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, তেমনই তাঁকে নিজের শ্রেণিকক্ষের ভিতরেও ছাত্রের প্রশ্ন, মতভেদ ও মর্যাদাকে উপলব্ধি করতে হবে। স্বাধীন শিক্ষকতার প্রথম শর্ত তাই নিজের ভিতরের কর্তৃত্ববাদকেও চিনতে পারা।

সমস্যা আরও গভীর হয় যখন সামাজিক ধারণার সঙ্গে প্রশাসনিক সন্দেহ যুক্ত হয়। সমাজে শিক্ষককে কখনও দেবতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়, আবার কখনও তাঁকে অলস, দায়িত্বহীন বা সুবিধাভোগী সরকারি কর্মচারী হিসেবে সাধারণীকরণ করা হয়। দুই চিত্রই বাস্তব শিক্ষকতার জটিলতাকে আড়াল করে। শিক্ষক মানুষ; তাঁর ভুল হতে পারে, ব্যর্থতা থাকতে পারে, অসততা থাকতে পারে, আবার অসাধারণ নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা ও আত্মত্যাগও থাকতে পারে। তাই কোনও শিক্ষক ভুল করলে ব্যক্তিগতভাবে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু একজনের বা কয়েকজনের ভুলের দায় গোটা পেশার উপর চাপিয়ে দেওয়া বা গোটা পেশাকে স্থায়ী সন্দেহের চোখে দেখা ন্যায়সংগত জবাবদিহি হতে পারে না।

এই জায়গায় প্রশাসনিক ব্যবস্থার সবচেয়ে অস্বস্তিকর রূপ হল ‘সন্দেহের পূর্বধারণা’। যেখানে প্রত্যেক শিক্ষককে আগে বিশ্বাসযোগ্য নাগরিক ও পেশাজীবী হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য অনিয়মকারী হিসেবে দেখা হয়, সেখানে প্রশাসনিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিশ্বাস থেকে সন্দেহের দিকে সরে যায়। তখন শিক্ষক ভাবেন, আমাকে কাজ করতে হবে—কিন্তু তার চেয়েও বেশি, আমাকে সাবধানে চলতে হবে। আমাকে ছাত্র পড়াতে হবে—কিন্তু এমনভাবে, যাতে পরে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে। আমাকে নতুন কিছু করতে হবে—কিন্তু নতুন কিছু করলে যদি ভুল হয়? এই ‘যদি’ শব্দটাই সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড়ো শত্রু। কারণ ভয় সৃষ্টিশীলতাকে প্রথমেই হত্যা করে না; তার আগে হত্যা করে পরীক্ষা করার সাহসকে। শিক্ষক তখন নিরাপদ পদ্ধতির আশ্রয় নেন। ছাত্রের সঙ্গে গভীর আলোচনা কমে যায়। সাহিত্য হয়ে ওঠে সম্ভাব্য উত্তর লেখার বিষয়, ইতিহাস হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট তথ্যের তালিকা, বিজ্ঞান হয়ে ওঠে পরীক্ষার নম্বর পাওয়ার কৌশল। শিক্ষার জায়গায় পরীক্ষামুখীতা বাড়তে থাকে। আর প্রশ্ন করার সংস্কৃতি সংকুচিত হয়। বাইরে থেকে দেখলে বিদ্যালয় ঠিকই চলছে—ক্লাস হচ্ছে, পরীক্ষা হচ্ছে, ফল প্রকাশ হচ্ছে, তথ্য জমা পড়ছে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে শিক্ষার প্রাণশক্তি যে ক্ষয়ে যাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ বা অনুধাবন করবে কে?

এখানেই শিক্ষকের স্বাধীনতার প্রশ্ন আসলে ছাত্রের স্বাধীনতার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। শিক্ষক যদি প্রশ্ন করতে ভয় পান, ছাত্রও প্রশ্ন করতে শেখে না। শিক্ষক যদি কেবল নির্ধারিত উত্তর দেন, ছাত্রও উত্তরকে সত্য বলে ধরে নেয়। শিক্ষক যদি ভুল স্বীকার করতে ভয় পান, ছাত্রও ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে না। অথচ সত্যিকারের শিক্ষা ভুলকে ভয় পায় না; ভুলকে বিশ্লেষণ করে। প্রশ্নকে ভয় পায় না; প্রশ্নকে গভীর করে। মতভেদকে ধ্বংস করে না; মতভেদের ভিতর দিয়ে যুক্তির শক্তি তৈরি করে। গণতন্ত্রের ভিতও আসলে এই শিক্ষাগত সংস্কৃতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নয়। গণতন্ত্র এমন এক সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা যায়, যুক্তি চাওয়া যায়, তথ্য যাচাই করা যায়, ভিন্নমত প্রকাশ করা যায়। এবং প্রয়োজন হলে নিজের মতও সংশোধন করা যায়। যে বিদ্যালয় এই সংস্কৃতি তৈরি করে, সে কেবল পরীক্ষার্থী তৈরি করে না; নাগরিক তৈরি করে। আর যে রাষ্ট্র এমন নাগরিক চায়, সেখানে শিক্ষককে শুধু নিয়ম মানানো নয়, স্বাধীনভাবে চিন্তা করার পরিসরও দিতে হবেই।

রাজনৈতিক দল বা সরকার বদলালেই এই প্রশ্নের উত্তর বদলে যায় না। ক্ষমতার চরিত্র অনেক সময় দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বড়ো। যে কোনও সরকার, যে কোনও প্রশাসন, যে কোনও রাজনৈতিক সংগঠন—ক্ষমতার কেন্দ্রে গেলে তার সামনে একই প্রলোভন আসে: প্রশ্নকে অসুবিধা হিসেবে দেখা, সমালোচনাকে বিরোধিতা হিসেবে দেখা, স্বাধীন বিচারকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখা। তাই শিক্ষক-স্বাধীনতার প্রশ্ন কোনও নির্দিষ্ট দল বা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং ক্ষমতার প্রতি সার্বজনীন সতর্কতার প্রশ্ন। আজ যে প্রশাসনিক পদ্ধতি নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, কাল অন্য কোনও রাজনৈতিক শক্তিও সেই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে। গণতান্ত্রিক নীতির শক্তি এখানেই যে আমরা পদ্ধতিকে ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে বিচার করি।

শিক্ষকের উপর নজরদারি যত বাড়ে, ততই একটা মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র ঠিক কোন মুহূর্তে একজন শিক্ষককে বিশ্বাস করবে? যখন তাঁর সমস্ত কাগজপত্র পূর্ণ হবে? যখন তাঁর সমস্ত উপস্থিতি নথিভুক্ত হবে? যখন তাঁর প্রতিটি কাজের ডিজিটাল প্রমাণ থাকবে? যখন প্রতিটি ক্লাস কোনও ড্যাশবোর্ডে পরিসংখ্যানে ধরা পড়বে? নাকি তখন, যখন রাষ্ট্র বুঝবে যে শিক্ষককে পেশাগত মর্যাদা দেওয়া মানে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনও বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার ভিতকে শক্তিশালী করা? বিশ্বাস মানে নজরদারি বন্ধ করা নয়। বিশ্বাস মানে নজরদারির উদ্দেশ্য বদলে দেওয়া। যেখানে জবাবদিহি থাকবে, কিন্তু অপমান থাকবে না। মূল্যায়ন থাকবে, কিন্তু পূর্বনির্ধারিত সন্দেহ থাকবে না। তদন্ত থাকবে, কিন্তু আগে থেকেই অপরাধী বা অযোগ্য বানিয়ে ফেলার প্রবণতা থাকবে না। প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু মানুষ সংখ্যায় পরিণত হবে না। নিয়ম থাকবে, কিন্তু নিয়মের প্রয়োগে পেশাগত বিবেচনার কোনও স্থান থাকবে না—এমনও নয়। বরং শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থায় নিয়ম ও স্বাধীনতা কখনো পরস্পরের শত্রু নয়; তারা পরস্পরকে ভারসাম্য দেয়।

শিক্ষককে দুর্বল করে কোনও শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘকাল শক্তিশালী থাকতে পারে না। কারণ শিক্ষক কেবল রাষ্ট্রের কর্মী নন; তিনি রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যবর্তী এক গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সেতু। রাষ্ট্র তাঁকে বেতন দেয়, প্রতিষ্ঠান তাঁকে দায়িত্ব দেয়, কিন্তু ছাত্রের চোখে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় তাঁর জ্ঞান, চরিত্র, আচরণ ও মানবিকতার ভিতর দিয়ে। তিনি একদিকে সরকারি নীতির বাস্তবায়নকারী, অন্যদিকে সেই নীতির সামাজিক অর্থ বোঝার মানুষ। তিনি একই সঙ্গে নাগরিক, পেশাজীবী এবং মুক্ত চিন্তক। তাই তাঁর পেশাগত বিবেচনাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দিলে শিক্ষাব্যবস্থারই ক্ষতি হয়।

আজকের পৃথিবীতে এই প্রশ্ন আরও জরুরি, কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি জ্ঞানের প্রচলিত কাঠামোকেই বদলে দিচ্ছে। ছাত্রের হাতে তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে। যন্ত্র উত্তর দিতে পারছে, তথ্য সাজিয়ে দিতে পারছে, ভাষা তৈরি করতে পারছে, এমনকি যুক্তির কাঠামোও নির্মাণ করতে পারছে। এই পৃথিবীতে শিক্ষক যদি কেবল তথ্য সরবরাহকারী হন, তবে তাঁর ভূমিকা ক্রমশ সংকুচিত হবে। শিক্ষক তখন আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবেন সেই মানুষ হিসেবে, যিনি শেখাবেন কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, কোন যুক্তি দুর্বল, কোন প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কোন উত্তর অসম্পূর্ণ, কোন জ্ঞান নৈতিকভাবে ব্যবহার করা উচিৎ এবং কোথায় মানুষের নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োজন। অর্থাৎ ভবিষ্যতের শিক্ষকতার কেন্দ্রে থাকবে আরও বেশি স্বাধীন চিন্তা, আরও বেশি নৈতিক বিচার এবং আরও বেশি প্রশ্ন করার ক্ষমতা।

এই কারণেই শিক্ষকের স্বাধীনতা কোনও পেশাগত সুবিধার দাবি নয়; তা জ্ঞানসমাজের মৌলিক অবকাঠামো। শিক্ষককে সম্মান করা মানে তাঁর সময়কে সম্মান করা, তাঁর পেশাগত বিচারকে সম্মান করা, তাঁর সৃজনশীলতাকে সম্মান করা, তাঁর ভুল সংশোধনের সুযোগ রাখা, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে তাঁর কাছ থেকেও উচ্চ নৈতিক মান দাবি করা—এই সব মিলিয়েই প্রকৃত সম্মান তৈরি হয়।

ক্ষমতার কাছে সবচেয়ে সহজ শিক্ষক হলেন সেই শিক্ষক, যিনি কোনও প্রশ্ন করেন না। প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে সুবিধাজনক শিক্ষক হলেন সেই শিক্ষক, যিনি প্রতিটি নির্দেশকে কেবল পালন করেন। কিন্তু সমাজের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষক তিনি, যিনি ছাত্রকে শেখান—কর্তৃত্বকে সম্মান করা যায়, কিন্তু অন্ধভাবে মানতে হয় না। প্রতিষ্ঠিত সত্যকে জানা দরকার, কিন্তু পরীক্ষা করাও দরকার। নিজের মতকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করাও জ্ঞানের অংশ। রাষ্ট্র প্রয়োজনীয়, প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয়, আইন প্রয়োজনীয়—কিন্তু কোনও প্রতিষ্ঠানই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সুতরাং শিক্ষকের স্বাধীনতা মানে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শিক্ষকের স্বাধীনতা নয়; বরং রাষ্ট্রকেও আরও দায়িত্বশীল করে তোলার জন্য চাই শিক্ষকের স্বাধীনতা। কারণ যে শিক্ষক প্রশ্ন করতে পারেন, তিনি ছাত্রকে প্রশ্ন করতে শেখান। যে ছাত্র প্রশ্ন করতে শেখে, সে নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার বুঝতে শেখে। আর যে নাগরিক প্রশ্ন করতে শেখে, সে রাষ্ট্রকেও আরও স্বচ্ছ, আরও ন্যায়সংগত, আরও জবাবদিহির জায়গায় অবতীর্ণ হতে বাধ্য করে। এই অর্থে শিক্ষককে স্বাধীন রাখা মানে কেবল একজন পেশাজীবীকে স্বাধীন রাখা নয়; ভবিষ্যতের নাগরিকের স্বাধীনতার সম্ভাবনাকেও রক্ষা করা।

ক্ষমতা তাই শিক্ষককে ভয় পায় কি না—প্রশ্নটা হয়তো সেখানেই শেষ হয় না। বরং আরও গভীর প্রশ্ন হল, ক্ষমতা কি এমন শিক্ষক চায়, যিনি শুধু নির্দেশ পালন করবেন, নাকি এমন শিক্ষকও চায়, যিনি প্রয়োজন হলে ক্ষমতার দিকেও তাকিয়ে প্রশ্ন করবেন? ইতিহাসের দীর্ঘ পথ আমাদের দেখিয়েছে, জ্ঞান কখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। প্রশ্নকে সাময়িকভাবে থামানো যায়, কিন্তু প্রশ্নের জন্ম বন্ধ করা যায় না। কোনও বিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ করে, কোনও শিক্ষককে নীরব করে, কোনও বইকে নিষিদ্ধ করে, কোনও পাঠকে নির্দিষ্ট উত্তর দিয়ে বেঁধে দিয়ে মানুষের ভিতরের অনুসন্ধিৎসাকে চিরকাল আটকে রাখা যায় না।

ফলত শিক্ষার সবচেয়ে বড়ো সম্পদ বই নয়, প্রযুক্তি নয়, ভবন নয়, এমনকি পরীক্ষার ফলও নয়—তার সবচেয়ে বড়ো সম্পদ হল স্বাধীনভাবে ভাবতে পারা মানুষ। আর সেই মানুষ তৈরির প্রথম শর্ত হল এমন শিক্ষক, যিনি নিজেও প্রশ্ন করতে পারেন, নিজেও নিজের সঙ্গে প্রশ্নের পর প্রশ্নের দ্বন্দ্ব পেরিয়ে এখানে এসেছেন। তাই শিক্ষকের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে শিক্ষকের ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করা যেমন, তেমনই সমাজের বৌদ্ধিক ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। জবাবদিহি থাকবে, শৃঙ্খলা থাকবে, আইন থাকবে, মূল্যায়ন থাকবে, প্রয়োজন হলে কঠোর ব্যবস্থাও থাকবে; কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে বিশ্বাস, পেশাগত স্বায়ত্তশাসন, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এবং প্রশ্ন করার অধিকার। কারণ শিক্ষককে যদি সারাজীবন শুধু নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়, তবে একদিন হয়তো তিনি যোগ্যতার প্রমাণ দিতে দিতে শিক্ষার আসল কাজটাই ভুলে যাবেন। আর যে দিন শিক্ষক নিজের স্বাধীন প্রশ্ন হারিয়ে ফেলবেন। সেই দিন শ্রেণিকক্ষের ভিতর থেকেও ধীরে ধীরে স্বাধীন নাগরিকের জন্মের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাবে।

তাই শিক্ষা শেষপর্যন্ত মানুষকে শুধু উত্তর শেখায় না, উত্তরের ভিতরেও প্রশ্ন খুঁজে নিতে শেখায়। প্রচলিত সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে সংশয়, অনুসন্ধান ও আত্মজিজ্ঞাসাকে বাঁচিয়ে রাখার এই প্রশ্ননির্ভর স্বাধীনতাই শিক্ষার প্রাণ। শিক্ষক সেই প্রশ্ন ছাত্রের চেতনায় পৌঁছে দেন। রাষ্ট্রের কাজ হওয়া উচিৎ সেই প্রশ্নের জন্মকে ভয় না পেয়ে এমন সমাজ তৈরি করা— যেখানে প্রশ্ন থাকলেও প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে না, মতভেদ থাকলেও সম্পর্ক নষ্ট হয় না, সমালোচনা থাকলেও গণতন্ত্র দুর্বল হয় না। কারণ শক্তিশালী ক্ষমতার সবচেয়ে বড়ো পরিচয় কতজন মানুষকে চুপ করানো গেল, তা নয়; কতজন মানুষকে স্বাধীনভাবে কথা বলতে দেওয়া যায়, তার মধ্যেই তার প্রকৃত পরিণতিবোধের পরিচয়। আর শিক্ষকের স্বাধীনতাই হলো সেই স্বাধীন কথা-কাঠামোর প্রথম বিদ্যাশ্রয়। আসলে মানুষের ভিতরে যে স্বাধীন মানুষ জন্ম নিতে চায়, শিক্ষক আসলে সেই ভূমিষ্ট হওয়া মানুষেরই প্রথম সহযাত্রী।

 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top