“ তথ্য হলো গাধা”

নেভিল কার্ডাস

“There ought to be some other means of reckoning quality in this the best and loveliest of games; the scoreboard is an ass.”
— নেভিল কার্ডাস

ক্রিকেট নিয়ে বলা এই একটি বাক্য যেন সমগ্র বিশ্বায়নোত্তর সভ্যতার বিরুদ্ধে এক ভিন্নস্বর প্রতিবাদ হয়ে ওঠে। প্রথম শুনলে মনে হয়, এ কেবল কৌতুক; অবশ্য একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, এই বাক্য আসলে সংখ্যার একাধিপত্যের বিরুদ্ধে মানবিক আত্মবোধের সমান্তরাল ঘোষণা।

গাধা চিরকাল ভারবাহী প্রাণি হিসেবেই মর্যাদা (মতান্তরে অমর্যাদা) পেয়ে এসেছে। তবু সে নিজস্ব উদ্ববর্তনেও বোঝা বহন করে জীবন কাটিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বোঝার অর্থ সেই প্রাণির বোঝা হয়ে উঠল না। তথ্যও একপ্রকার তাই না কি? তথ্য স্মৃতি বহন করে, কিন্তু স্মৃতির ব্যথা-বেদনা নয়; ঘটনা বহন করে, কিন্তু ঘটনার দর্শন নয়; ফল বহন করে, কিন্তু ফলের নৈতিক আদর্শ নয়। তথ্যের সক্ষমতাই হল বহন করা, বিবেচনা বা বিচার করার অধিকার বা গৌরব তার নেই। তাই হয়তো এই বাক্য সৎ এবং সত্য। তথ্য হলো গাধা।

চিন্তাবিদ দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘What Is History?’-তে দেখিয়েছিলেন, তথ্য নিজের থেকে কিছু বলে না; ইতিহাসবিদ অথবা জিজ্ঞাসু তথ্যকে প্রশ্ন করেন, বিশ্লেষণ করেন, ব্যাখ্যা করেন, তথ্যের শরীরকে সন্ধান করেন, তারপরই তা ইতিহাসের ভাষ্যে পরিণত হয়। তথ্য তো নিজে কিছু ব্যক্ত করে না, আত্মপরিচয়ের স্বকীয়তাও ধার্য করে না; মানুষই তাকে ভাষা বা পরিচয় দেয়। একটি ঘটনা নিজেই ইতিহাস হয় না; তা ইতিহাস হয় তখনই, যখন সেই ঘটনার ভিতরকার অর্থ-চেতনা উদ্ভাবিত হয় ও তার প্রেক্ষিত আবিষ্কার করা সম্ভব হয়।

এই কারণেই তথ্যের অহংকার বিপজ্জনক। কারণ তথ্য নিরপেক্ষ হতে পারে, কিন্তু তথ্যের ব্যবহার কখনও নিরপেক্ষ নয়। একই তথ্য দিয়ে ন্যায়ও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, অন্যায়ও। একই সংখ্যা দিয়ে সত্যও নির্মিত হতে পারে, আবার বিভ্রমও। সংখ্যা কখনও মিথ্যা বলে না, কিন্তু সংখ্যা অনেক সময় আংশিকতা-চালিত খণ্ড-সত্য বলে। আর ইতিহাস বহুযুগ ধরে নিজস্ব উচ্চারণ-বৈচিত্র‍্যে জানিয়ে আসছে যে, খণ্ড সত্য, বেশিরভাগ সময় সুস্পষ্ট মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর।

রবীন্দ্রনাথ সে-কথা সমস্ত চৈতন্যে উপলব্ধি করেই জীবনের অন্তিম-পর্বে বলেছিলেন, “সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।” সত্যের এই ‘কঠিন’ অভিযোজন সংখ্যায় ধরা পড়ে না। কারণ সত্যের শরীরে থাকে প্রসঙ্গ, ইতিহাস, অভিপ্রায়, মানবিক নৈতিকতা এবং মানুষের অনন্ত অভিজ্ঞতা। একটি সংখ্যা বলে দিতে পারে কে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে ছিল; কিন্তু বলতে পারে না, কে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিল, কে মানুষের কল্পনাকে মুক্ত করেছিল, কে পরাজিত হয়েও মানুষের স্মৃতিতে অমরতার বিজয়মাল্য পেয়েছিল।

এলিয়টের প্রশ্ন যদি টেনে আনি, তাহলে একটা যুক্তি দাঁড় করাতে পারি—

“Where is the wisdom we have lost in knowledge? Where is the knowledge we have lost in information?”

তথ্যের বিস্ফোরণের যুগে মানুষ যত বেশি জানছে, তত বেশি ভুলে যাচ্ছে এই কথা যে— কীভাবে কোনো কিছু বুঝতে হয়। আমাদের চোখের সামনে তথ্যের পাহাড় জমছে, অথচ প্রজ্ঞার নদী ক্রমশ ক্ষীয়মান। নীৎশেও যখন বলেন, “There are no facts, only interpretations.” তখন একথা অসুবিধা না-জমিয়েই বুঝিয়ে ছাড়ে যে, এখানে তথ্যকে অস্বীকার করা হয় না; বরং এই বক্তব্য মনে করিয়ে দেয়, তথ্য কখনও অর্থহীন নয়, আবার স্বয়ংসম্পূর্ণও নয়। প্রতিটি তথ্য মানুষের নিজস্ব চেতনার মধ্য দিয়ে অর্থ-ইশারা লাভ করে। সেই অর্থ নির্ভর করে প্রসারিত সংস্কৃতি, সমাজ-নৈতিকতা, স্থান-কাল ও সাপেক্ষ সক্ষমতার উপর।

আজকের পৃথিবী ফলাফলের প্রতি এমন এক মোহে আক্রান্ত, যেখানে যাত্রার চেয়ে গন্তব্য, সৃষ্টির চেয়ে সাফল্য, শিল্পের চেয়ে পরিসংখ্যান, মানুষের চেয়ে পরিমাপ বড়ো হয়ে উঠেছে। একটি তালিকা, একটি সংখ্যা, একটি অতি প্রচারিত বা প্রচারমুখী ঘোষণাই যেন শেষ সত্য। অথচ সভ্যতার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলি জন্ম নিয়েছে সেইসব মানুষের হাতে, যাদের প্রথম পরিচয়পত্রেই লিপিবদ্ধ ছিল ব্যর্থতা। তাদের জীবনের হিসাব যদি কেবল সংখ্যায় করা হতো, তাহলে মানবসভ্যতা আজ অনেক দরিদ্র ও দীন-বুদ্ধি হতো।

আলবেয়ার কাম্যুর কথায়,

“The struggle itself toward the heights is enough to fill a man’s heart.”

সংগ্রাম কখনও সংখ্যায় ধরা পড়ে না। ফলাফল তার শেষ দৃশ্য; কিন্তু মানুষের প্রতিভা, বোধার্জিত মহত্ত্ব তার সম্পূর্ণ নাটক। নেভিল কার্ডাস তাই স্কোরবোর্ডকে অপমান করেননি; তিনি তাকে তার সীমা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। স্কোরবোর্ডের কাজ হিসাব রাখা, ইতিহাসের বয়ান লেখা নয়। সে বলতে পারে কী ঘটেছে; কিন্তু কেন ঘটেছে, কীভাবে ঘটেছে, তার মানবিক মূল্য কতখানি, তার স্মৃতি-নির্মাণ প্রক্রিয়া কোন কৌণিকতায় হয়েছে বা হতে পারে—এসব তার ক্ষমতার বাইরে। স্কোরবোর্ড একটি নথি; আর ইতিহাস স্বতত বিবর্তনশীল দীর্ঘ ব্যাখ্যা। তথ্য যদি ইটের এক সমষ্টি হয়; সত্য তবে সম্পূর্ণ স্থাপত্য। সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা ইটের কিছুটা স্তূপকেই প্রাসাদ ভ্রমে প্রচার করি এবং আত্মপ্রবোধে সর্বত্র চাপিয়ে দিতে চাই। আজ পৃথিবীর বহুক্ষেত্রেই তথ্যের পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে, অথবা জমিয়ে তোলা হচ্ছে, কিন্তু সত্যের জন্য মানুষকে এখনও তার ভিতর ‘খননক্রিয়া’ চালাতে হয়। কারণ সত্য কখনও উপরের স্তরে থাকে না; সে লুকিয়ে থাকে নিজস্ব প্রেক্ষাপটে, সময়ের নীরব সরণীতে, অনুচ্চারিতের গর্ভে। তথ্য চোখে পড়ে; আর সত্য ধরা দেয় চেতনা ও হৃদয়ে। তথ্য স্মৃতিকে পূর্ণ করে; সত্য বৌদ্ধিক বিবেককে জাগিয়ে তোলে।

“তথ্য হলো গাধা”—এই বাক্যটির মধ্য দিয়ে তাই তথ্যের বিরুদ্ধতা করা নয় কোনোভাবেই, তার উদ্দেশ্যেগত যাওয়া তথ্যের প্রতি অন্ধভক্তির বিরুদ্ধে। যা আমাদের বলতে চায়, তথ্যকে সম্মান করো, কিন্তু তার দাস হয়ো না। সংখ্যাকে গ্রহণ করো, কিন্তু সংখ্যার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করো না। কারণ শেষপর্যন্ত মানুষকে হিসেবী নিপুণতা বড়ো করে তোলে না। মানুষ স্মৃতি হয়ে ওঠে তার অর্থবোধের বহুমাত্রিকতায়। আমরা কী পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করলাম সভ্যতার ভবিষ্যৎ তার উপর নির্ভর করবে না; বরং সেই তথ্য থেকে কতখানি সত্য উদ্ধার করতে পারলাম তার উপর নির্ভর করবে। কারণ তথ্য বহন করতে পারে যে-কেউ; কিন্তু সত্য বহন করার জন্য প্রয়োজন বিবেকবোধ, কল্পনাশক্তি, নৈতিক সাহস এবং মানবিক প্রজ্ঞা।

সেই কারণেই নেভিল কার্ডাসের বাক্যটি কেবল ক্রীড়া-জগতের জন্য নয়, সম্ভবত সাম্প্রতিক মানবচেতনার প্রতিও এক নিরন্তর সতর্কবাণী হয়ে যায় এইভাবে—স্কোরবোর্ডের দিকে তাকাও, কিন্তু তাকেই ইতিহাস ভেবে ফেলো না; সংখ্যাকে পড়ো, কিন্তু সংখ্যার আড়ালে থাকা মানবিক ও শিল্পিত ‘প্রক্রিয়া’ বিস্মৃত হয়ো না। কারণ সেই প্রক্রিয়াই চিরকালীন চলন-ক্রিয়ার উদ্দীপন।


— অনিশ রায়

 
 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top