“এ পৃথিবী একবার তারে পায়, পায় নাকো আর…”
গোটা বিশ্ব যে পায়ের মুদ্রায় দেখেছিল নটরাজের নৃত্যবিভঙ্গ, সমস্ত সভ্যতার কানে কানে যে নামে বেজেছিল মহাকালের মন্দিরা, যে নামে শত শত জলঝর্ণা নেমে এসেছিল সভ্যতার শুষ্ক মরুতলে, বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর রক্তাক্ত শরীরে যে নাম শুশ্রূষার নির্জন হাতের মতো স্পর্শ রেখে গিয়েছিল— সেই ‘পেলে’ নামের মাহাত্ম্যেই একটি শতাব্দী পৃথুলতম তমসার রাত্রি অতিক্রম করার সাবলীল পদচিহ্নময় স্বপ্ন দেখতে শিখেছিল। নিম্নবর্গীয় কৃষ্ণাঙ্গ মাটি থেকে যে নাম এভারেস্টের তুষারাবৃত শিখরের শুভ্র উচ্চতায় আরোহণের মানবিক মন্ত্র দান করে গিয়েছিল, সেই নাম কেবল এক ব্যক্তির নাম নয়; সেই নাম মানবসভ্যতার দীর্ঘ যাত্রাপথে উচ্চারিত এক মহামন্ত্র।
বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত, সবচেয়ে আলোকিত, সবচেয়ে প্লাবিত, সবচেয়ে জাগরিত সেই নাম একবিংশ শতাব্দীতে এসে ইতিহাসের অক্ষরবৃত্ত সম্পন্ন করেছে। কিন্তু ইতিহাস কখনো বিশেষ মানুষের জীবনের শেষ উচ্চারণ হয়ে থাকে না। ইতিহাস তখন হয়ে যায় কালের বুকে তার উপস্থিতির স্বাক্ষর। মানুষ চলে যায়; অথচ তার ছায়া, তার পদচিহ্ন, তার দীপ্তি থেকে যায়। পেলে সেরকমই এক অনন্ত উচ্চারণ, যে উচ্চারণ সময়ের সীমা ভেদ করে মানুষের চেতনায় স্থায়ী হয়ে ওঠে।
পৃথিবীতে কিছু মানুষের জন্ম হয় না; তাঁদের আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা কোনো বিশেষ দেশ, বিশেষ সমাজ কিংবা বিশেষ ইতিহাসের সীমাবদ্ধ সন্তান নন; তাঁরা হয়ে ওঠেন সময়ের নিজস্ব উচ্চারণ। তাঁদের জীবন ব্যক্তিগত ঘটনাবলির সরল সমাবেশ নয়; বরং মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আকাঙ্ক্ষা, বেদনা, পরাজয় এবং মুক্তির বহুমাত্রিক প্রকাশ। এমন মানুষদের জীবনী কেবল জন্ম-মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়ের বিবরণ নয়; তা যুগোত্তীর্ণ যুগের আত্মপরিচয়ের নথি। পেলে সেই বিরলতম মানুষদের একজন।
তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন ফুটবল খেলতে— এই বাক্যটি যতটা সত্য, তার চেয়েও বেশি সত্য যে, তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন মানুষকে নতুনভাবে স্বপ্ন দেখাতে। কারণ কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কেবল কাজই করেন না; তাঁরা মানুষের চেতনার স্থাপত্যই বদলে দেন।
ব্রাজিলের ছোট্ট শহর ট্রেস কোরাসোয়েসে জন্ম হয়েছিল এক কৃষ্ণাঙ্গ দরিদ্র শিশুর। নাম রাখা হয়েছিল এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। কিন্তু পৃথিবী তাঁকে সেই নামে মনে রাখেনি। পৃথিবী তাঁকে নতুন নাম দিয়েছিল— পেলে। অনেক সময় ইতিহাস নিজেই ভবিষ্যৎ নির্বাচন করে নেয়। কারণ কিছু নাম ব্যক্তিগত থাকে না; তারা হয়ে ওঠে যুগের প্রতীক। শৈশবের সেই দিনগুলিতে অভাব ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। রুটির নিশ্চয়তা ছিল না, খেলনা ছিল না, আরাম ছিল না। কিন্তু মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাগুলির একটি হলো— কখনো কখনো অনুপস্থিতিই সর্বশ্রেষ্ঠ উপস্থিতিকে জন্ম দেয়। যেখানে পৃথিবী কোনো শিশুর হাত থেকে সবকিছু কেড়ে নেয়, সেখানে সে শিশুর কল্পনা অদ্ভুতভাবে বৃহৎ হয়ে ওঠে। কাপড়ের গুচ্ছ বেঁধে বল বানিয়ে যে শিশু খেলা শুরু করেছিল, সে জানত না যে একদিন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তার পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকবে। কারণ শিল্পের সূচনা সবসময় প্রাচুর্যের প্রাসাদে হয় না; শিল্প জন্ম নেয় প্রয়োজনের অন্ধকার গুহায়, অভাবের ধুলোয়, মানুষের গভীর আকাঙ্ক্ষার গোপন প্রদেশে। আধুনিক শিল্পচেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো— সৌন্দর্য কেবল নিখুঁত দক্ষতার মধ্যে থাকে না; সৌন্দর্য থাকে ভাঙনের মধ্যে, অসম্পূর্ণতার মধ্যে, সংগ্রামের মধ্যে। পেলের জীবন সেই সত্যের এক আশ্চর্য উদাহরণ। তিনি মাঠে নামতেন, কিন্তু তাঁর শরীরের ভেতর নামত বহু শতাব্দীর ইতিহাস। তাঁর দুই পায়ের মধ্যে যেন লুকিয়ে থাকত আফ্রিকার দীর্ঘ নির্বাসন, দাসজাহাজের অন্ধকার, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অপমান, বস্তির নিরানন্দ বিকেল এবং একইসঙ্গে মুক্তির আকূলতা।
তিনি যখন বল পায়ে দৌড়াতেন, তখন কেবল একজন ফুটবলারের শরীর দৌড়াত না; দৌড়াত এক সভ্যতার স্বপ্ন। তাঁর পায়ের ছন্দে মিশে থাকত বস্তির ধুলো, দারিদ্র্যের দীর্ঘশ্বাস, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের শতাব্দীব্যাপী বঞ্চনার ইতিহাস এবং তারই বিপরীতে উঠে দাঁড়ানোর এক অলৌকিক প্রত্যয়। পৃথিবী প্রথম উপলব্ধি করেছিল— শিল্পের ভাষা জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভূগোলের কোনো সীমারেখা মানে না। তাঁর খেলায় কেবল গতি ছিল না, কেবল কৌশল ছিল না, কেবল গোল করার মন্ত্রবিদ্যা ছিল না। তাঁর খেলার ভিতরে ছিল এক গূঢ় নান্দনিকতা। মনে হতো, তিনি বল নিয়ে দৌড়চ্ছেন না; বরং কোনো অদৃশ্য কবিতা লিখছেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ শব্দ দিয়ে সুর সৃষ্টি করেছিলেন, মোৎজার্ট সুর দিয়ে আলো নির্মাণ করেছিলেন, লিওনার্দো ভিঞ্চি রেখার ভিতরে মানবিক রহস্যের প্রতিচ্ছবি এঁকেছিলেন— তেমনি পেলে শরীর দিয়ে শিল্প সৃষ্টি করেছিলেন। কারণ শিল্পের মূল উপাদান মাধ্যম নয়; শিল্পের মূল উপাদান মানবিক বিস্ময়। পেলের খেলায় সেই বিস্ময়ের পরিপূর্ণ সজীবতা ছিল।
তিনি যখন বল নিয়ন্ত্রণ করতেন, মনে হতো পৃথিবীর সমস্ত মাধ্যাকর্ষণ যেন মুহূর্তের জন্য নিজের নিয়ম ভুলে গেছে। তিনি যখন প্রতিপক্ষকে অতিক্রম করতেন, মনে হতো বাস্তবতা নিজেই কিছুক্ষণের জন্য কল্পনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আধুনিকতার আরেকটি সংকট হলো মানুষের ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে ওঠা। মানুষ সংখ্যা হয়ে যায়, পরিচয়পত্র হয়ে যায়, পরিসংখ্যান হয়ে যায়। অথচ পেলে পৃথিবীকে শিখিয়েছিলেন— মানুষ এখনো বিস্মিত হতে পারে। তাই তিনি শুধু ফুটবলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিল্পের পুনর্জন্মের এক আলোকদূত।
কারণ তাঁর পূর্বে পৃথিবী খেলাকে ভালোবাসত, কিন্তু খেলাকে সভ্যতার সর্বোচ্চ অভিব্যক্তির আসনে বসাতে শেখেনি। মানুষ যুদ্ধ করে সাম্রাজ্য গড়েছে, কবিতা লিখে অমরতা লাভ করেছে, দর্শন সৃষ্টি করে সময়ের পরিধি অতিক্রম করেছে, সুরের ভিতরে অনন্তের স্পর্শ পেয়েছে, বিজ্ঞানের মহিমা ব্যক্ত করে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পেয়েছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দ্বারা জগৎ নিয়ন্ত্রণ করেছেন; কিন্তু ফুটবল খেলে, একটি গোলাকার বলের সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক স্থাপন করে, সমগ্র মানবসভ্যতার উচ্চতম গৃহে নিজের নাম উৎকীর্ণ করে দেওয়া যায়— এই অভূতপূর্ব সত্য পৃথিবী প্রথম তাঁর মধ্য দিয়েই প্রত্যক্ষ করেছিল। তাঁর পূর্বে খেলার মাঠ ছিল মানুষের বিনোদনের স্থান; তাঁর পরে তা হয়ে উঠল মানবিক মহিমার আরেক মহাদেশ।
তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন— একজন মানুষ পায়ের সাহায্যে পৃথিবীর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠতে পারে। তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন— একটি ফুটবল কেবল চামড়া সেলাই করা গোলাকার বস্তু নয়; তা হতে পারে নিয়তির নতুন বর্ণমালা, মানুষের মুক্তির নতুন অভিধান, ইতিহাসের নতুন দরজা। কারণ তাঁর পূর্বে শিল্পী, কবি, বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও রাষ্ট্রনির্মাতারাই সভ্যতার সর্বোচ্চ আসনে বসতেন। তাঁদের হাতেই যেন মহাকালের অমৃতপাত্র ন্যস্ত ছিল। অথচ পেলে পৃথিবীকে বিস্মিত করে দিয়ে বলেছিলেন— খেলার মাঠও মানুষের আত্মপ্রকাশের সেই একই অনন্ত ভূখণ্ড। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, দুই পায়ের মাঝখানেও ঈশ্বর মানুষের জন্য মহাকাব্য লিখে রাখেন।
সেই প্রথম পৃথিবী বুঝেছিল— ফুটবল খেলে শুধু বিশ্বকাপ জেতা যায় না; মানুষের হৃদয়ের স্থায়ী ভূগোলেও স্থান পাওয়া যায়। শুধু গোল করা যায় না; মহাকালের শরীরেও নিজের নাম খোদাই করা যায়। শুধু কিংবদন্তি হওয়া যায় না; সভ্যতার অন্তর্গত চিরকালীন উচ্চারণে পরিণত হওয়া যায়। ১৯৫৮ সালে পৃথিবী প্রথম সেই অলৌকিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিল। মাত্র সতেরো বছরের এক কিশোর বিশ্বমঞ্চে এসে দাঁড়াল। এবং তারপর যা ঘটল, তা কেবল কোনো প্রতিযোগিতার ফলাফল ছিল না; তা ছিল শিল্পের এক আকস্মিক বিস্ফোরণ। সেই দিন আবার মানুষ দেখল— বয়স নয়, অভিজ্ঞতা নয়, প্রতিষ্ঠিত কাঠামো নয়; মানুষের গভীরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাই শেষ সত্য।
তাঁর পায়ের স্পর্শে ফুটবল এক নতুন শিল্প-ব্যাকরণ আবিষ্কার করল। তাঁর পূর্বে ফুটবল ছিল খেলা; তাঁর পরে ফুটবল হয়ে উঠল ভাষা। আর খেলা হয়ে উঠল শিল্প, শিল্প হয়ে উঠল মানবিক মুক্তির রূপক। একজন মানুষ কবে মহামানব হয়ে ওঠেন? যখন তিনি নিজের ব্যক্তিগত সাফল্যকে অতিক্রম করে মানবজাতির যৌথ স্মৃতির অংশ হয়ে যান। পেলেই প্রথম সেখানে পৌঁছেছিলেন। তিনি কেবল ব্রাজিলের ছিলেন না। ব্রাজিল তাঁকে জন্ম দিয়েছিল; কিন্তু পৃথিবী তাঁকে গ্রহণ করেছিল। কৃষ্ণাঙ্গ শিশু তাঁকে নিজের স্বপ্ন মনে করেছে, দরিদ্র মানুষ তাঁকে নিজের সম্ভাবনা মনে করেছে, শিল্পী তাঁকে নিজের ভাষা মনে করেছে, আর সাধারণ মানুষ তাঁকে নিজের আত্মিক আনন্দের সুরেলা প্রতিচ্ছবি মনে করেছে। তাঁর মধ্যে পৃথিবী নিজের বহু বিচ্ছিন্ন সত্তাকে একত্রে খুঁজে পেয়েছিল।
খেলা, সদর্থে ফুটবল খেলাও যে নান্দনিক ভুবনের জন্য স্বর্গীয় নির্বাচন— সেই দৈববাণীর ধারক ও বাহক ছিলেন তিনিই। তাঁর পায়ের অনুষ্টুপ ছন্দেই ফুটবলের আদি ও শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য লিখিত হয়েছিল। তিনিই আদিকবি, তিনিই শ্রেষ্ঠ শিল্পী। বাকিরা তাঁরই পদাঙ্ক-অনুসরণকারী মাত্র; তাঁরই শিল্পময় বাণীর প্রচারক। পরিসংখ্যান, পুরস্কারের ইতিকথা তাঁকে ভিত্তি করেই অবধারিত হয়। তিনিই ফুটবল পরিভ্রমণে বিশ্বজয়ের কাণ্ডারী। তিনিই পরিব্রাজক। তিনিই অনাবিষ্কৃত ভূখণ্ডের আবিষ্কারক। ফুটবলের মহাদেশে মাইলফলক নির্ধারিত ও প্রোথিত হয়েছে তাঁর পদক্ষেপেই। কিন্তু পরিসংখ্যান কখনো মানুষকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। সংখ্যা কেবল হিসাব রাখে; মানুষের বিস্ময়কে ধারণ করতে পারে না। তিনশো, পাঁচশো কিংবা হাজার গোলের সংখ্যা হয়তো লেখা যায়; কিন্তু যে মুহূর্তে একটি শিশুর চোখ প্রথম ফুটবলকে ভালোবাসতে শেখে, যে মুহূর্তে কোনো দরিদ্র কিশোর মনে করে— “আমিও পারি”— সেই মুহূর্তের কোনো পরিসংখ্যান হয় না। পেলে সেই অগণন মুহূর্তের নাম।
যেমন পৃথিবী মাঝে মাঝে কিছু মানুষের মধ্যে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে। বাল্মীকি যেমন ভাষার মধ্যে মহাকাব্য খুঁজে পেয়েছিলেন, বেদব্যাস যেমন মানবিকতার বহুরূপী নদীকে ইতিহাসে রূপ দিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ যেমন মানুষকে বিশ্ব-আত্মার সংগীত শুনিয়েছিলেন, শেক্সপীয়র যেমন মানুষের অন্তর্জগতের অসীম গোলকধাঁধা উন্মোচন করেছিলেন, মোৎজার্ট যেমন সুরের ভিতরে ঈশ্বরের শ্বাসপ্রশ্বাস শুনেছিলেন, ভিঞ্চি যেমন শিল্প ও বিজ্ঞানের মধ্যবর্তী অলৌকিক অঞ্চল স্পর্শ করেছিলেন, আইনস্টাইন যেমন সময়ের গোপন ব্যাকরণ আবিষ্কার করেছিলেন— তেমনি পেলে মানুষের শরীরের মধ্যে শিল্পের অনন্ত সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করেছিলেন।
বাল্মীকি, বেদব্যাস, রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপীয়র, মোৎজার্ট, ভিঞ্চি, কোপারনিকাস, আইনস্টাইন, গ্যালিলিও, আইজেনস্টাইন, চার্লি চ্যাপলিন, বব ডিলান, মাইকেল জ্যাকসন, গদার, সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মার্লোন ব্রান্ডো, উত্তমকুমার— বিশ্বসভ্যতায় অথবা জাতীয় জীবনে যে সকল মানুষ তাঁদের অসামান্য অবদানে কোনো নতুন অধ্যায়ের প্রথম দেবদূতের মর্যাদা অর্জন করেছেন, পেলেই একমাত্র খেলার মাঠ থেকে তাঁদের প্রাণের দোসর হয়েছেন। তাঁদের উজ্জ্বল হাত থেকে মহাকালের দৈব আমলকি গ্রহণ করেছেন একমাত্র তিনিই। কারণ তাঁরা প্রত্যেকে নিজ নিজ শিল্পমাধ্যমে মানুষের আত্মাকেই প্রসারিত করে গেছেন; আর পেলে ফুটবল নামের এক গোলাকার পৃথিবীর ভিতরে মানুষের আনন্দ, বিস্ময় ও মুক্তির নতুন কাব্য-দর্শন লিখেছিলেন।
এই কারণেই পেলে কেবল একজন খেলোয়াড় নন; একটি যুগের রূপক, মানবিক সম্ভাবনার এক চিরকালীন প্রতীক। তিনি সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁদের কোনো নির্দিষ্ট পেশা দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না। কারণ তাঁরা তাঁদের ক্ষেত্রের সীমানা অতিক্রম করে গেছেন। তাঁরা হয়ে ওঠেন সভ্যতার আভ্যন্তরীণ শক্তি, মানুষের সম্মিলিত কল্পনার অংশ। পেলে ফুটবলের সীমানা অতিক্রম করেছিলেন বহু-আগেই।
এই কারণেই তিনি পরিসংখ্যানের মানুষ নন। গোলের সংখ্যা, ট্রফির সংখ্যা, পুরস্কারের সংখ্যা— এসব তাঁর জীবনের ক্ষুদ্র প্রান্তর মাত্র। তাঁর প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে আছে সেইসব মানুষের চোখে, যারা তাঁকে দেখে প্রথমবার ভাবতে পেরেছে— “অসম্ভব বলে কিছু নেই।” আজ তিনি শরীরের অনুপস্থিতিতে অনন্তের বাসিন্দা। কিন্তু কিছু মানুষ চলে যান না। কারণ তাঁরা মাটির নন; তাঁরা সময়ের। সভ্যতার পর সভ্যতা নতুন আলোয়, নতুন ভাষায়, নতুন অভিজ্ঞতায় তাঁকে আবিষ্কার করবে। ভবিষ্যৎ পৃথিবীর প্রতিটি কালবেলায় কোনো শিশু প্রথমবার যখন ফুটবল পায়ে নেবে, তখন সে পেলের নাম জানুক বা না-জানুক, তবুও অদ্ভুতভাবে, অদৃশ্য কোনো উত্তরাধিকার তার শরীরে প্রবাহিত হবে। কারণ শিল্পের প্রকৃত উত্তরাধিকার যে তথ্য নয়; চেতনা ও অনুভূতি। আর পেলে— মানবসভ্যতায় সেই বিশেষ চেতনার শাশ্বত নাম।
অন্য আরেক প্রসঙ্গে বলব, সেই-অর্থে পল রোবসনের পরে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের বিশ্বজয়, আত্মমর্যাদা ও চিরস্থায়িত্বের পথনির্মাণ পেলের পদযুগলেই সবচেয়ে ব্যাপকভাবে সম্ভব হয়েছিল। তাঁর সাফল্য কেবল একজন মানুষের সাফল্য ছিল না; তা ছিল ইতিহাসের প্রান্তিক মানুষের পুনরুত্থানের এক মহাকাব্যিক মুহূর্ত। তাঁর প্রতিটি গোলে, প্রতিটি দৌড়ে, প্রতিটি হাসিতে পৃথিবীর কোটি কোটি বঞ্চিত মানুষ নিজেদের মুক্তির, সম্মিলিত জাগরণের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছিল।
তাই জানি, তাই বিশ্বাস করি— নিথর স্বর্গীয় যাত্রার পরও পেলের নন্দনকলা ছুঁয়ে থাকবে ফুটবল হয়ে ফুটে থাকা শিল্পের আপেল-শরীর। বিশ্ব সেই স্পর্শে অনন্তের স্বাদ পেতে থাকবে। এই স্পর্শ-মায়া বিশ্বের শরীরে অবিকল্প ফসিল হয়ে জেগে থাকবে পৃথিবীর আয়ুর শেষদিন পর্যন্ত। সভ্যতার পর সভ্যতা সময়ের নিজস্ব অভিজ্ঞানে নিরবচ্ছিন্নভাবে আবিষ্কার করে চলবে এই মহাপার্বিক অধ্যায়। নতুন প্রজন্ম আসবে। নতুন খেলোয়াড় জন্ম নেবে। কেউ দ্রুততর হবে, কেউ শক্তিশালী হবে, কেউ হয়তো পরিসংখ্যানে তাঁকে অতিক্রমও করবে। কিন্তু কিছু মানুষ এমন থাকেন, যাঁদের অতিক্রম করা যায় না; কারণ তাঁরাই শুরুর চিরসত্য ও আবহমান মানদণ্ড।
শেষে বলি, পেলের শরীরী মৃত্যু আসলে শিল্প-সভ্যতার এক মধ্যবর্তী শূন্য সময়। নিশ্চল, নির্বাক, আহত প্রহরটুকুতে সিক্ত চোখ মেলে কেবল দেখা স্বরলোপের উদযাপন। আর সেই দীর্ঘ স্তব্ধতায় মনে হয়, কোনো বিশাল গির্জার ঘণ্টা আচমকা থেমে গেছে; অথচ তার প্রতিধ্বনি এখনও বাতাসে কাঁপছে। তবু মৃত্যু কখনো শেষ উচ্চারণ নয়। কারণ কিছু মানুষ মৃত্যুর পরেও জীবিত থাকেন— স্মৃতির ভেতর, শিল্পের ভেতর, ভালোবাসার ভেতর, মানুষের অনন্ত বিস্ময়ের ভেতর। সেই অন্তহীন স্মৃতিময় ভালোবাসামাখা শিল্পিত-বিস্ময়ের নামই — পেলে৷ পেলে। এবং পেলে৷
ড. অনিশ রায়

