#কল্যাণ_বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ব্যঙ্গ-মার্কা কথার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা না-বলে আর থাকতে পারলাম না।
“আমরা কবিতা লিখি না, আমরা রাস্তায় হাঁটি”— এই ঘোষণাটি শুনে প্রথমে হাসি পায়, পরে অবশ্য দুঃখ হয়। হাসি পায়, কারণ বাক্যটি এমন এক আত্মতৃপ্ত অজ্ঞতার নমুনা, যা নিজের সীমাবদ্ধতাকেই যোগ্যতা বলে চালাতে চায়। আর দুঃখ হয়, কারণ এই কথাগুলো এমন মানুষদের, এমন পেশাজীবীদের, এমন পদাধিকারীদের মুখে শোনা যায়, যাঁদের কাছ থেকে অন্তত ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তার বিষয়ে একটু গভীরতর বোধ বিগত পশ্চিমবঙ্গে আশা করা যেত।
বাক্যটির মধ্যে একটি বিপজ্জনক নিম্নগামী বিরোধ লুকিয়ে আছে (সেই বিপদ দেখেই কথাগুলো বলছি)। যেন কবিতা আর রাস্তা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। যেন কবিতা মানে অলস বিলাস, আর রাস্তা মানে বাস্তবতা। যেন কবিরা আরামকেদারায় বসে শব্দ নিয়ে খেলা করেন, আর পৃথিবীর আসল ইতিহাস লেখা হয় ধুলো, ঘাম, মিছিল আর সংঘর্ষের মধ্যে। অথচ এই প্রেক্ষিতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো বিদ্রূপ হলো— রাস্তায় যারা সত্যিই হেঁটেছেন, তাদের অধিকাংশই কোনো-না-কোনো অর্থে কবি ছিলেন। না-হলে তো জিজ্ঞাসা থাকে— রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, পাবলো নেরুদা, লোরকা, নাজিম হিকমত, গিন্সবার্গ— প্রমুখ তাহলে কি চেম্পারে বসে বড়ো কবিত্বের মেম্বারশিপ আদায় করেছেন?
যে রাস্তায় শ্রমিক হাঁটে, যে রাস্তায় কৃষক মিছিল করে, যে রাস্তায় স্বাধীনতার দাবিতে রক্ত ঝরে, যে রাস্তায় মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়— সেই সব রাস্তার ইতিহাস তো কবিরাই ভাষায় ধরে রেখেছেন। একমাত্র কবিরাই। কবিরাই পৃথিবীর সমস্ত মানবিক জাগরণ ও বিপ্লবের অগ্রদূত। কবি ছাড়া সভ্যতা কোনো নতুন চেতনা পায় না। পায়নি৷ নতুন দৃষ্টভঙ্গি জাগে না। জাগেনি। ফলত, কবিতা কোনো কাঁচঘেরা প্রদর্শনী নয়; কবিতা মানুষের অভিজ্ঞতাকে ভাষা দেওয়ার চিরকালীন অভিব্যক্তি। যে কৃষক খরার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, যে শ্রমিক সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফেরে, যে প্রতিবাদী মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়ে রক্তাক্ত হয়— তাদের জীবনই কবিতার আবহমান উপাদান। কবিতা ছাড়া এই সামগ্রিক কথাগুলো আর কোনোভাবে সেই-অর্থে যথাযথ বলা যায় না৷
কবিতা জন্ম-ই নেয় সেই রাস্তা থেকে, যেখানে মানুষ হাঁটে, পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। তাই “আমরা কবিতা লিখি না” বলে যদি কেউ নিজের বাস্তবতাবোধের সনদ দেখাতে চান, তাহলে তা অনেকটা এইরকম শোনায়— “আমরা তো চিন্তা করি না, আমরা শুধু আবাল কথা বলি।” অথবা— “আমরা সঙ্গীত বুঝি না, আমরা শুধু মাথা ঝাকাই আর পালটা চিৎকার করি।”
কবিতা লিখতে না-পারা কোনো অপরাধ তো নয়ই, কারণ অনেক মহান কবিও স্বীকার করেছেন, কবিতা ঠিক লিখে উঠতে পারেননি। পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই কবিতা লেখেন না। কতিপয় অতি-মানব কবিতা লিখতে পেরেছেন। ফলে অল্প-বোধসম্পন্ন মানুষও জানে, ‘হাম্বা-হাম্বা’ মন্ত্রধারীরা জীবন ফাটিয়ে চেষ্টা করলেও, তারা হালে পানি পাবে না। কিন্তু কবিতাকে তুচ্ছ-জ্ঞান করা মানে মানুষের কল্পনাশক্তি, অনুভূতি, ভাষাবোধ এবং সভ্যতার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা। এই উদ্ধত প্রকাশ কীসের নমুনা? আর “আমাদের ফ্যান হয়ে যেতে হবে”— এই বাক্যটি তো আরও বিস্ময়কর। কবিতা কি কোনো ক্রিকেট দল? কবি কি কোনো সিনেমার নায়ক? সাহিত্য কি কোনো নির্বাচনী প্রচারসভা? কবিতার কাজ কখনোই কাউকে ‘ফ্যান’ বা ‘অন্ধ ফ্যান’ বানানো নয়। কবিতা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্ধ অনুসরণ নয়। কবিতা ভক্ত তৈরি করে না; তৈরি করে সচেতন সপ্রাণ মানবিক অস্তিত্ব। যে কবিতার কথা শুনেই ‘ফ্যান ক্লাব’-এর কথা ভাবে, তার আসলে সাহিত্য-ভাবনা ছাড়ুন, সামান্য কালচাটুকুও কোন চড়ে পড়ে আছে, তা খুঁজে বের করা দুষ্কর। ধরলাম, নেহাৎ প্রচারকেই নিজের মাপকাঠি বানিয়েছে, তাও সে ‘মাপ’ আর ‘কাঠি’ মস্তিষ্কের ম্যাপকেই তো ইঙ্গিত করে গেল।
আসলে এখানে সমস্যাটা কেবল রুচির নয়, শিক্ষারও। যে সমাজে কবিতাকে অপ্রয়োজনীয় বলে ভাবা হয়, সেই সমাজ ধীরে ধীরে কল্পনাশক্তি হারায়। আর যে সমাজ কল্পনাশক্তি হারায়, সে সমাজ খুব দ্রুতই মনুষ্যত্বের উপাদানগুলো হারায়। তখন মানুষের মুখে শুধু স্লোগানধর্মী বুলি থাকে, ভাষা থাকে না; শুধু আওয়াজ থাকে, সুর থাকে না; শুধু ক্ষমতার প্রদর্শন থাকে, আত্মসমালোচনার পরিচ্ছদটুকুও থাকে না। একেবারে পোশাকহীন নির্লজ্জতার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু একে ভাবা যায় না৷
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো— যাঁরা কবিতাকে অপ্রয়োজনীয় বলে হাসেন, তাদের নিজেদেরই প্রায়শ ভাষার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়। বক্তৃতা ফুটানো, স্লোগান ঠোকা, বিবৃতি ঘঁষা, আবেগ ফলানো, জনমত জাগানোর কেত্তন করা। অথচ ভাষার সর্বোচ্চ শিল্পরূপটিকেই অবজ্ঞা করে গেলেন এমন কার্টুন-জাতীয় সাবলীলতায়! এ তো মাছ খেতে খেতে ঘোষণা করা— সব জলাশয় বুজিয়ে দাও। কিংবা গানের সুর করতে করতে বলা— স্বরলিপি মুছে দাও৷
কবিতা নিয়ে ঠাট্টা করা সহজ। কারণ কবিতা বন্দুক নয়, লাঠি নয়, ভোটের মঞ্চ নয়। কবিতা কাউকে মন্ত্রী বানায় না, ক্ষমতার সিঁড়ি তৈরি করে না, নির্বাচনী ফল বদলায় না।কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রায় অস্ত্রের চেয়ে কবিতাই বেশি দিন টিকে থাকে। সুদীর্ঘ কাল। আবহমানকাল ধরে। রাজদণ্ড ভেঙে যায়, সিংহাসন উল্টে যায়, পতাকা বদলে যায়, দল বদলে যায়, ক্ষমতার মানচিত্র পাল্টে যায়— কিন্তু একটি সত্যিকারের কবিতার পঙ্ক্তি শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। একটা পংক্তি আবার নতুন সভ্যতার পথে মানুষকে অগ্রসর করে।
ফলত, জানি যে, ক্ষমতালিপ্সু মানসিকতা কবিতাকে কোনোদিন বুঝতে পারে না। পারবেও না। কারণ কবিতা তো মানুষের ভেতরের মুক্ত-চেতনাকে জাগায়। আর এরা তো যন্ত্রতন্ত্র ব্যবস্থার বদ্ধ জীব।
আর হ্যাঁ, মুক্ত-চেতন মানুষ কখনও কারও ‘অন্ধ ফ্যান’ হয় না। আর যদি হয়, তাকে আলোকিত অন্ধত্ব বলে। অন্ধশিক্ষার কালীঘাটের হাটে অবশ্য এসব পাওয়া যায় না। তাই যখন কেউ গর্ব করে বলেন, “আমরা কবিতা লিখি না”, তখন উত্তর দিতে ইচ্ছে করে—
“সে বোঝাই যাচ্ছে। অলটাইম বোঝা যায়। অত ফলাও করে না-বললেও সবাই বুঝতে পারি৷ কবিতা লিখতে গেলে যে আগে মানুষ হতে হয়”।
যাই হোক, কবিতা না-লিখলেও চলত। কিন্তু কবিতার চিরাশ্রয় কেন চাই, সেটুকুও না-বুঝে গর্ব করা— সেটাই এখন একটা পচা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ধ্বস্ত জাতির বহু-অংশের আসল ট্র্যাজেডি। সভ্যতার ইতিহাসে অপদার্থতার সবচেয়ে নির্ভুল সংজ্ঞা সম্ভবত এটাই— যে মানুষ নিজের অজ্ঞতাকে উপলব্ধি না-করে, তাকে কৃতিত্ব বলে ঘোষণা করে। আর ডিগ্রিধারীর কুশিক্ষার সবচেয়ে ভয়ংকর লক্ষণ? যখন কেউ মনে করে রাস্তা আর কবিতা পরস্পরের শত্রু। কারণ সত্যিটা যে তার উল্টো-মাথায় আঁটেনি। সত্যিটা যারা বোঝার তারা জানেন, রাস্তা মানুষকে চলতে শেখায়। কবিতা মানুষকে মানুষ হওয়ার পথে হাঁটায়। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ গন্তব্যে পৌঁছায়; কিন্তু কবিতা ছাড়া মানুষ নিজের ভেতরের পথে, সভ্যতার চিরকালীন-চেতনার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। পারেনি আজ অবধি। আর যে মানুষ নিজের ভেতরে পৌঁছাতে পারে না, সে যতই রাস্তায় হাঁটুক, আসলে সে পথগুলোকেই বেপথু করে, নষ্ট করে, পথকেই হারিয়ে ফেলে। আপনাদের এই বেপথু হওয়ার যাত্রায় গুড়-বাতাসা দিয়ে উৎসাহ জুগিয়ে গেলাম অবিরাম। শুধু বলব, কষ্ট করে হলেও, ডিজে বাজিয়ে আপনাদের নির্বাণের পথটুকু এবার নিজেরাই তৈরি করে ফেলুন৷ হাঁটি হাঁটি পা পা করেও পৌঁছে যাবেন খুব তাড়াতাড়ি।
#অনিশ রায়

