—অনিশ রায়—
তারা একে খেলল—
আর আমরা বুঝলাম,
শরীর কেবল বর্তমান নয়,
স্মৃতি-ভাণ্ডারের সজীব ভাণ্ড।
তারা একে খেলল—
আর ছন্দ মিলে গেল,
যুক্তির পথ সোজা নয় সর্বদা।
জগৎ এবারও জানল।
ক্ষমতা চোখ নামাতে বাধ্য হল,
কারণ তারা দোলা জানত—
জানত দোলের গভীর কৌশলও।
তারা দেখাল—
ছলনা মানে লুকোনো নয়,
সময় আর স্থান খোঁজার অব্যয়।
ঝুঁকি মানে হঠকারিতা নয়,
ঝুঁকি মানে দায় স্বীকার।
ঝুঁকি মানে নিজেদের উদ্ধার।
ড্রিবল মানে অন্যকে পিছনে ফেলে যাওয়া নয়,
ড্রিবল মানে নিজেকে
এক মুহূর্তও
অস্বীকৃত হতে না-দেওয়া।
জগতের আনন্দধারায় অবাধ ভেসে যাওয়া।
একদিন ওই শরীরকে বলা হয়েছিল—
চলো, কাজ করো, চুপ থাকো।
শরীর কিছু বলেনি।
কেবলই চলেছিল।
আর ভিতরে ভিতরে দুলেছিল।
এই দোলের ভেতর ছিল
নাচের অক্লান্ত বিভঙ্গ,
লড়াইয়ের ধৈর্য,
আর অপেক্ষার প্রবোধ।
সাম্বা সেদিনও নিছক উৎসব ছিল না,
ক্যাপোইরা তখনও নিছক যুদ্ধ ছিল না।
ছিল প্রতিরোধের নাচ৷
নাচের মধ্যে যুদ্ধ।
যুদ্ধের মধ্যে সংগীত।
সংগীতে ছন্দের দোলা।
ছন্দে ছন্দে ললিত নাচের তাল।
তারপর সেই দোলের বহমান অভ্যাস
পেল একটি চামড়ার বল।
প্রতিষ্ঠান দিয়েছিল নাম, ফুটবল।
বলটা খুব ভারী ছিল,
আর মাঠ ছিল অসমান,
কিন্তু শরীর কেমন করে যেন বুঝেছিল—
এভাবে মেনে নিয়ে সোজা চলে যাওয়া,
শুরুর আগেই হেরে যাওয়া নিশ্চয়৷
তাই তারা বাঁক নিল।
তাই তারা থামল।
তাই তারা হাসল।
এমন সময়ে;
যখন হাসাই অপরাধ। নিষিদ্ধ।
সেদিন থেকেই,
ফুটবলের চেনা-নিয়ম ভেঙে পড়ল,
তারা ফুটবলকেও শরীরের ছন্দে, ইশারায় নাচাল।
গিঙ্গা স্টেপ নয় তখন, না কোনো ভান—
গিঙ্গা হয়ে গেল এক অবস্থান।
আমি তোমার মতো হব না।
আমি তোমার নির্দেশ মানি না। চলব না তোমার প্রত্যাশা মেনে।
— স্পর্ধাও উঠেছিল দুলে।
কেউ এসে ডাক দিল—‘জোগো বনিতো’ ব’লে।
শরীর তো আগেই জানত—
তবু নাম নয়,
এ-যে এক নৈতিক কারুকর্মের দায়।
তাই সুন্দরভাবে খেলো—
কারণ কুৎসিতভাবে বাঁচা,
সেই থেকে আমাদের হয়েছে শেখানো।
ভুল করো—
কারণ নিখুঁত হলেই যে,
আর কিছু জন্মাবে না কোনোদিনও।
ঝুঁকি নাও—
ভয় কোনো উত্তরাধিকার নয় জেনো।
সময় এল।
বিশ্ব তাকাল।
কেউ উড়ল,
কেউ থামল।
কেউ ভাঙল।
কেউ জিতল—
কেউ হারল।
কিন্তু শরীর হল না নিশ্চল।
আরও আরও প্রাণ পেয়ে গেল।
যখন সৌন্দর্য জিতল,
তাকে বলা হলো ভাগ্য।
যখন সৌন্দর্য হারল,
তাকে বলা হলো বোকামি।
কিন্তু সেই পায়ে পায়ে নৃত্যরত শরীর এতদিনে জানে—
সৌন্দর্য উত্তর নয়,
সৌন্দর্য প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা যত।
বিস্ময় আর আনন্দই সৌন্দর্য।
আজ সমতল মাঠে
সংখ্যা আছে।
ডেটা আছে।
গ্রাফ আছে।
কিন্তু নটরাজ শরীর এখনো মনে রাখে—
একদিন নাচ ছিল প্রতিরোধ,
একদিন ছন্দ ছিল আশ্রয়,
একদিন পবিত্র ছলনাই ছিল— বেঁচে থাকার অপর পরিচয়।
তার জীবনের অশ্রু-আনন্দ-ঘাম।
জোগা বনিতো— এই স্মৃতির বিপ্লবী নাম।
আজ ঝুঁকি অপরাধ,
আজ আনন্দ সন্দেহ,
আজ সৌন্দর্য ব্যয়।
তবুও—
একটি পা যদি হঠাৎ থেমে যায়,
তারপর চকিতে ওঠে ঝলসে;
একটি চোখ যদি মুহূর্তের জন্য হাসে,
একটি দেহ যদি বলে—
এখন নয় তো নাই-বা,
এইখানেই,
এ-ভাবেই সবুজ ঘাসে, হলুদ আলোতে, মাটিতে মিশে থাকো।
শিরায় শিরায় নীল জলের মতো ছলাৎ ছলাৎ দুলে চলো।
তখন ফুটবল আবার মানুষের হয়।
এই রূপকথা তাই আর হয় না শেষ।
এ-যে খেলা নয়।
বিধি-নিয়ম নয়।
নৈতিকতা নয়।
ইতিহাসও নয়।
এ এক সচল জায়মান দুরন্ত দেহ—
যে এখনো ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে
নির্মল সভ্যতার ভার মৃদু বাতাসে বয়ে নিয়ে চলে…

