দাসত্ব-উত্তর দেহের খেলা: ব্রাজিল ও জোগো বনিতো/ পর্ব- ৫/ পেলে ও গ্যারিঞ্চা
শুরুর আগের কথা:
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের প্রকৃত ইতিহাস শুরু হয় তখনই, যখন ফুটবল কেবল আমদানি করা ইউরোপীয় খেলা না থেকে নিজের শরীর খুঁজে পেতে শুরু করে। ১৯৩০ থেকে ১৯৫৮— এই সময়কাল ব্রাজিলীয় ফুটবলের ‘শিশুকাল’ নয়, বরং তার ভাষা-গঠনের যুগ। তখনও ‘জোগো বনিটো’ অত প্রচলিত বা বিখ্যাত শব্দবন্ধ নয়, কিন্তু তার ভাবনা ছিল পূর্ণ। সুন্দর খেলা ব্রাজিলের বিলাসিতা নয়; ছিল সাংস্কৃতিক প্রয়োজন। স্কিল এখানে এসেছিল সামাজিক উত্তর-দারিদ্র্যের ভেতর আনন্দের অধিকারে। এই পর্বে ব্রাজিল ফুটবল প্রথমবার বুঝতে শেখে— খেলাটাকে শুধু খেলতে হয় না, বলতেও হয়। আর সেই ভাষার ব্যাকরণ তৈরি হয় স্কিল দিয়ে। এই সময়কার খেলোয়াড়রা-ই ছিল ট্রফির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁরা তৈরি করেন এমন সব ভঙ্গি, যা পরে পুরো শতাব্দীর ফুটবলকে সংজ্ঞায়িত করবে। এরা ছিলেন শরীরের লেখক— যাঁরা পায়ের নড়াচড়ায় কাব্যিক বাক্য লিখেছেন। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কোনো অলৌকিক প্রতিভার ফল নয়। তা দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়ার ফসল— যেখানে নিপীড়িত দেহ নিজের জন্য ভাষা তৈরি করেছে। ‘জোগো বনিতো’ সেই ভাষার দার্শনিক নাম; ‘জোগা বনিতো’ সেই ভাষায় কথা বলার আহ্বান।
১৯৫০-এর ট্র্যাজেডি ও স্কিলের পুনর্বিচার:
১৯৫০ সালের মারাকানাসো— উরুগুয়ের কাছে হার— ব্রাজিলীয় ফুটবলের গভীর গভীরতর ক্ষত। এই পরাজয়ের পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন— স্কিল কি বেশি হয়ে যাচ্ছে? সৌন্দর্য কি তাহলে দুর্বলতা? এই প্রশ্নই স্কিলকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চায়। ব্রাজিল বুঝতে শেখে— স্কিল মানে বেপরোয়া নয়; স্কিল মানে আত্মবিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাস নিয়েই তারা এগোয় ১৯৫৮-এর দিকে।
১৯৫৮ থেকে ১৯৭০—এই বারো বছর ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে কেবল সফল অধ্যায়-ই নয়; তা সেই সময়, যখন ব্রাজিল ফুটবল নিজেকে বিশ্বের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। আগের পর্বে স্কিল জন্মেছিল দেহের মুক্তি থেকে; এই পর্বে সেই স্কিল, বুদ্ধি ও সাহস একত্র হয়ে পরিপূর্ণ নান্দনিকতা তৈরি করে। এখানেই জোগো বনিটো কেবল ধারণা থাকে না, দৃশ্যমান বাস্তবতা হয়ে ওঠে— আর জোগা বনিটো হয়ে ওঠে মাঠে নামার শৈল্পিক ও বৈপ্লবিক আদেশ। ১৯৫০-র মারাকানাসোর পর ব্রাজিল ভয় পেয়েছিল নিজের ছায়াকে। ১৯৫৮-তে এই দলটিই দেখাল— সৌন্দর্য ভয় পেলে নিজস্বতা হারিয়ে ফেলে; আর সাহসে ভর করলে নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে অর্জন করে এবং বিজয়ী হয়। এই বিশ্বকাপে ব্রাজিল ফুটবল প্রথমবার আনন্দকে দায়িত্বে পরিণত করল। খেলোয়াড়দের খেলা যেন বলছিল— আমরা সুন্দর খেলব, কারণ সেটাই আমাদের শক্তি। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আবর্ভাব ঘটল ব্রাজিল তথা বিশ্ব-ফুটবলের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্যিক পূর্ণবাক্য– যার সাংকেতিক উচ্চারণ হলো ‘পেলে’।
পেলে: পূর্ণতা কীভাবে দায়িত্ব হয়
দেহ, সংযম ও ব্রাজিলীয় সৌন্দর্যের পরিণতির শিখর
পেলেকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই প্রথম যে বিপদটা ঘটে, তা হলো সীমাহীন বিস্ময়। আমরা এতদিন ধরে তাঁর চারপাশে অলৌকিকতার এমন বলয় তৈরি করেছি যে, মানুষটিকে আর দেখা যায় না— দেখা যায় তাঁর প্রতীক। অথচ পেলে নিজেই একসময় বুঝেছিলেন, প্রতীক হওয়া মানে স্বাধীনতা হারানো। যার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তাঁর সবচেয়ে গভীর ভূমিকা—পূর্ণতাকে দায়িত্বে রূপ দেওয়া।
পেলে যখন প্রথম বিশ্বমঞ্চে আসেন, তখন ব্রাজিলীয় ফুটবল ইতিমধ্যেই নিজের ভাষা খুঁজে পেয়েছে। সাম্বা, ক্যাপোইরা, কার্নিভাল— সব মিলিয়ে দেহ কথা বলতে শিখেছে। কিন্তু সেই ভাষা তখনও কিছুটা অস্থির। কখনো অতিরিক্ত ঝুঁকি, কখনো সংশয়। ১৯৫০-এর ক্ষত তখনও শুকোয়নি। সৌন্দর্য একবার ব্যর্থ হয়েছে— এই স্মৃতি দেহে রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে পেলের আবির্ভাব কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। তিনি যেন এক ধরনের উত্তর। প্রশ্নটা ছিল— সুন্দরভাবে খেলা কি সত্যিই দীর্ঘস্থায়ী? পেলে সেই প্রশ্নের উত্তর যুক্তি দিয়ে দেন না, দেন আচরণ দিয়ে। পেলের খেলায় প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ে, তা হলো সংযম। এই সংযম কোনো সংকোচ বা ভীতি নয়; তা আত্মবিশ্বাসের লক্ষণ। যিনি নিজের ক্ষমতা জানেন, তাঁকে প্রতিটি মুহূর্তে প্রমাণ দিতে হয় না। পেলে জানতেন— তিনি কী করতে পারেন। তাই তিনি সবসময় তা করেননি। এই না-করাটাই তাঁর সবচেয়ে বড়ো ফুটবল-বৃত্তির অবদান।
ব্রাজিলীয় ফুটবলে এর আগে স্কিল ছিল হয় উচ্ছ্বাস, নয় বিদ্রোহ। পেলে স্কিলকে দায়িত্বের কাঠামোর মধ্যে রাখলেন। এখানে দায়িত্ব মানে কোচের নির্দেশ মানা নয়। দায়িত্ব মানে— দলের ভার বোঝা। কখন নিজের আলো দরকার, আর কখন সেই আলো অন্যের দিকে ঘুরিয়ে দিতে হয়— এই বিচারবুদ্ধিই পেলের পূর্ণতা। পেলের পূর্ণতা তাই কেবল টেকনিক্যাল নয়। তা একইসঙ্গে নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। তিনি অবিরাম গোল করতেন, কিন্তু গোলের জন্য খেলতেন না। খেলতেন, কারণ খেলাটা ঠিকভাবে এগোতে হবে। এই ‘ঠিকভাবে’ শব্দ এক-অর্থে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে ঠিক মানে নিয়মমাফিক নয়; ঠিক মানে প্রয়োজনমাফিক। যে প্রয়োজনবোধই পেলের খেলাকে সময়ের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়, করে তোলে কালোত্তীর্ণ।
১৯৫৮-তে পেলে ছিলেন বিস্ময়। ১৯৬২-তে তিনি ছিলেন অনুপস্থিত শিক্ষা। ১৯৭০-তে তিনি ছিলেন ভারসাম্য। এই তিনটি অবস্থান একসঙ্গে বুঝলে তবেই পেলের গভীরতা ধরা পড়ে। ১৯৫৮-তে তাঁর দেহ দেখিয়েছিল—কী সম্ভব। ১৯৬২-তে মাঝপথে তাঁর অনুপস্থিতি দেখিয়েছিল—কেন কেউ না-থেকেও অপরিহার্য হয়। ১৯৭০-এ তাঁর উপস্থিতি দেখিয়েছিল— কীভাবে সেই-অর্থে অপরিহার্য না-হয়েও কেন্দ্র হওয়া যায়। এই পরিণতিবোধই তাঁকে পূর্ণতা দেয়। পেলের খেলায় কোনো বিশেষ মুভ আলাদা করে ধরা যায় না। তাঁর হেডিং নিখুঁত, শট দুরন্ত ও পরিষ্কার, দু-পায়ের সমান দক্ষতা, পাস সময়োচিত, শরীরী ভারসাম্য, শক্তির ঘনত্ব, তড়িৎ গতি, সমস্ত স্কিলের সুদক্ষ্ম কারুকার্য, বাকি সবই শুধু নিখুঁত নয়– তারও অধিকতর। কিন্তু এগুলো আলাদা করে বিস্ময় জাগায় না। বিস্ময় জাগায় তাঁর সিদ্ধান্ত। বল পেলে তিনি খুব দ্রুত বুঝে নেন— এই মুহূর্তে খেলাটার কী দরকার। অর্থাৎ সিক্স সেন্স; শুধু তাঁর জন্য অবশ্য একে বলতে হয় সেভেন্থ সেন্স। এই বোধ কেবল প্রতিভা থেকে আসে না। আসে ইতিহাস থেকে। পেলে সেই ইতিহাস বহন করেছিলেন। সেই দাসত্ব-উত্তর সমাজের দেহ যখন প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে সম্মান পায়, তখন সেই সম্মানের ভার বহন করাও এক ধরনের শ্রম। পেলে সেই শ্রম স্বীকার করেছিলেন। তিনি জানতেন— তাঁর প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি গোল, প্রতিটি নীরবতা ব্রাজিলীয় ফুটবলের পরিচয় গড়ে দিচ্ছে। এই সচেতনতাই তাঁকে অনেক সময় সংযত করেছে। অনেক সময় কম আনন্দিত দেখিয়েছে। এই সংযমকে অনেকেই ভুল বুঝেছেন। বলেছেন— পেলে গ্যারিঞ্চার মতো মুক্ত নন। এই তুলনা ভুল। কারণ পেলের ভূমিকা ভিন্ন। গ্যারিঞ্চা আনন্দের প্রতীক, পেলে স্থায়িত্বের এবং দায়িত্বের। উভয়ের প্রতীকতা একে অপরের বিপরীত নয়; তারা পরিপূরক। পেলে জানতেন— যদি সৌন্দর্যকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তবে সৌন্দর্যকেই মাঝে মাঝে সংযত করতে হবে। এই সংযম ছাড়া সৌন্দর্য নিজেই নিজের শত্রু হয়ে ওঠে। এই উপলব্ধি ইউরোপীয় বাস্তববাদ থেকে আসেনি। এসেছে ব্রাজিলীয় অভিজ্ঞতা থেকে। যেখানে আনন্দ ও বিপর্যয় খুব কাছাকাছি থাকে। পেলের আরেকটি বড়ো অবদান— তিনি ব্যক্তিগত প্রতিভাকে দলগত ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর খেলায় ‘আমি’ খুব কম; সেখানে বেশি ‘আমরা’। এই ‘আমরা’ কোনো স্লোগান নয়। তা মাঠের বিন্যাসে দেখা যায়। পেলে প্রায়ই নিজের জায়গা ছেড়ে অন্যকে জায়গা দেন। এই দেওয়াটাই তাঁর নেতৃত্ব। এই নেতৃত্ব সোচ্চার নয়, প্রদর্শিত নয়। এই নেতৃত্ব নির্দেশ দেয় না। এই নেতৃত্ব উপস্থিত থাকে। আর এই উপস্থিতিই পেলের সবচেয়ে বড়ো শক্তি।
এই কারণেই ১৯৭০-এর দল এত ভারসাম্যপূর্ণ। কারণ পেলে কেন্দ্র হয়েও কেন্দ্র দখল করেননি। তিনি জানতেন— এই দলে তাঁর কাজ হাইলাইট হওয়া নয়; লাইট সর্বত্র ঠিকভাবে পড়তে দেওয়া। এখানেই তিনি ব্রাজিল ফুটবলের তথা ব্রাজিলের দেশীয় এনলাইটেনমেন্ট-এর যুগপুরুষ। এমন পরিণতিবোধ অর্জন করা সহজ নয়। কারণ জনপ্রিয়তা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। পেলে সেই ফাঁদে পড়েননি। অথবা বলা ভালো— তিনি সচেতনভাবে নিজেকে সেই ফাঁদ থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। এরজন্যই তাঁকে ইতিহাস আলাদা জায়গা দেয়। চিরকালই দেবে। পেলে তাই কেবল মহান খেলোয়াড় নন। তিনি একই সঙ্গে সূচনা ও সমাপ্তি অধ্যায়। তিনিই দেখান— পূর্ণতা মানে সবকিছু করা নয়। পূর্ণতা মানে সবকিছু জানার পরও, নির্দিষ্টকে নির্বাচন করা। একেই বলে সংযত শৈল্পিক দায়িত্ববোধ।
ব্রাজিলীয় ফুটবলের জন্য এই দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ গ্যারিঞ্চার আনন্দই যদি একক হয়ে থাকত, তা ক্ষণস্থায়ী হতো। ভাভার দৃঢ়তা যদি একক থাকত, তা রুক্ষ হতো। পেলের পূর্ণতা এই দুইয়ের মধ্যে সেতু রচনা করে। এই সেতু ছাড়া ১৯৭০ সম্ভব ছিল না। এবং ব্রাজিলও ফুটবলের বিশ্বমানদণ্ড হতে পারত না। পেলের সবচেয়ে বড়ো দান তাই কোনো গোল নয়, কোনো ট্রফিও নয়। তাঁর সবচেয়ে বড়ো অবদান— তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে সৌন্দর্য দায়িত্ব নিতে পারে। এই শিক্ষা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দ্বিমুখী। একদিকে তা অনুপ্রেরণা। অন্যদিকে তা অনুপায় চাপ। কারণ পেলের পরে যে-ই এসেছে, তাকে তুলনা করা হয়েছে পেলের সঙ্গে। এই তুলনা অনেক সময় নিষ্ঠুর। কিন্তু এই তুলনার নিষ্ঠুরতাও ইতিহাসের অংশ। ফলত পেলের উত্তরাধিকারের দাবিও দ্বিধাময়। তিনি যেমন পথ দেখিয়েছেন, তেমনই ভারী-বোঝাও রেখে গেছেন। এই বিপুল বোঝা নিয়েই ব্রাজিলীয় ফুটবল পরবর্তী দশকগুলিতে প্রবেশ করেছে। যেখানে আনন্দ আর দায়িত্ব আবার নতুন করে তর্কে জড়ায়। যে তর্কের সবচেয়ে স্পষ্ট কণ্ঠ গ্যারিঞ্চা নন, পেলে নন— বরং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম।
গ্যারিঞ্চা: আনন্দ-ও কেন দায়িত্বশীল
গ্যারিঞ্চাকে নিয়ে কথা বলতে গেলেও বেশ ভুল হয়ে যায়। আমরা বেশিরভাগই তাঁকে খুশির মানুষ ও মজার শিল্পী বলে ধরে নিয়েছিলাম। তাঁকে নিয়ে আজও ভেবে বসি— তিনি খেলতেন আনন্দের জন্য, দায়মুক্তভাবে, প্রায় শিশুসুলভ এক মুক্ত-মেজাজে। এই ভাবনাটা নিশ্চিতভাবেই বিপজ্জনক ও সীমাবদ্ধ। কারণ এতে গ্যারিঞ্চার সবচেয়ে গভীরতার দিকটাই অগ্রাহ্য করা হয়ে যায়— তা হলো তাঁর নির্লিপ্ততার ভিতরের গভীর মূল্যবোধ। গ্যারিঞ্চার আনন্দ কখনোই দায়হীন ছিল না। বরং বলা ভালো— তিনিই দেখিয়েছিলেন, দায়িত্ব কেবল সংযমের নাম নয়। দায়িত্বের আরেকটি রূপ আছে— আনন্দকে বাঁচিয়ে রাখা, মূল্যবোধের পরিশীলনের মধ্য দিয়ে। কথাটা সহজ নয়। কাজটা আরও কঠিন। বিশেষ করে সেই সমাজে, যেখানে চূড়ান্ত দারিদ্র্য আনন্দকেই প্রায় অপরাধের মাত্রায় দাঁড় করায়। ব্রাজিলীয় দাসত্ব-কাটানো সেই সমাজে আনন্দ মানে ছিল সাময়িক ভুলে থাকা। কিন্তু গ্যারিঞ্চার আনন্দ ভুলে থাকা নয়; গ্যারিঞ্চার আনন্দ মানে মনে রাখা। মনে রাখা যে, মানুষ দেহের শৈলী দিয়েও স্বাধীন হতে পারে।
গ্যারিঞ্চার দেহ শুরু থেকেই বলা যায় একপ্রকার ‘ভুল’। সম্ভবত শৈশবে পোলিও বা অপুষ্টির কারণে ডান পা ৬ সেমি. ছোটো এবং বাঁকা, মেরুদণ্ডও ‘S’-র মতো বাঁকা, অসম ভারসাম্য, শারীরিক সীমাবদ্ধতা। এই দেহকে যে-কোনো প্রশিক্ষণ পদ্ধতি বাতিল করে দেয়। কিন্তু ব্রাজিলীয় ফুটবল এই দেহকেই গ্রহণ করেছিল এবং আশ্রয় দিয়েছিল। কারণ ব্রাজিলীয় ফুটবলই বোধহয় জানতে পেরেছিল— দেহের ত্রুটিও কখনো কখনো দেহের ভাষা হয়ে ওঠে। গ্যারিঞ্চার গতি ও ড্রিবল সেই ভাষা। একই দিক, একই কাট, বারবার। এই পুনরাবৃত্তি দেখে ইউরোপীয় চোখে শিশুসুলভ ঠেকেছিল। কিন্তু সেই পুনরাবৃত্তির ভেতরেই যে ছিল গভীর বুদ্ধি, তা তারা ধরতে পারেনি। গ্যারিঞ্চা জানতেন— মানুষ নতুনত্বে নয়, অভ্যাসে বিশ্বাস করে। ডিফেন্ডারও জানত, কী আসছে— কিন্তু তবু সে আটকাতে পারত না। এই না-পারাটাই ম্যাজিক হয়ে উঠত।
কারণ এখানে স্কিল মানে সবসময় নতুন কিছু করা নয়। স্কিল মানে সিস্টেমিক প্রত্যাশাকেও ভেঙে দেওয়া। গ্যারিঞ্চা ভাঙতেন প্রত্যাশার সেই মনস্তত্ত্ব। তিনি দেখাতেন— জানলেও, তোমরা আসলে জানো না। এভাবেই তিনি বল আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে ছেলেখেলা করতেন। আবার ‘ভুল’ গঠনের সেই শরীরে তিনিই হয়ে গেলেন বিশ্ব-ফুটবলের ‘উড়ন্ত পাখি’। এই ধারণাই হয়ে গেল ব্রাজিলীয় ফুটবলের আনন্দমূলক ভিত্তি। কারণ এখানে আনন্দ বিস্ময় থেকে আসে না; আসে ক্ষমতা থেকে। অবশ্য ক্ষমতা মানে এখানে কোনো শারীরিক বা অন্য আধিপত্য নয়। সেই ক্ষমতা মানে দেহের বিশ্বাসযোগ্য সক্ষমতা। গ্যারিঞ্চা সর্বদা বিশ্বাস করতেন— তিনি পারবেন। যা তাঁকে প্রতিবার ঝুঁকি নিতে সাহায্য করেছে। ঝুঁকি নেওয়া তাঁর কাছে আলাদা করে সিদ্ধান্ত ছিল না। তা ছিল তাঁর স্বভাব। আসলে তাঁর দেহ জানত— নিরাপদ খেলা এই দেহের জন্য নয়। এই দেহ বাঁচে তখনই, যখন নিজের অনুকূলে তা চলে। এইখানেই গ্যারিঞ্চার আত্মিক আনন্দ নৈতিক ও আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে। এই নৈতিকতা মানে কিন্তু সামাজিক বিধি মানা নয়। নিজের অস্তিত্ব অস্বীকার না-করা। তিনি নিজের দেহ অস্বীকার করেননি। তিনি তা বদলাতে চাননি। না-বদলে তাকে নিজের মতো দুলতে ও খেলতে দিয়েছেন। এখানেই তাঁর দায়িত্ববোধ। কারণ তাঁর দেহ সেই ইতিহাসে একা খেলেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষের হয়ে খেলেছে— যাদের দেহও ‘ভুল’, যাদের জীবনও ‘অসম’, যাদের কোনো নিরাপদ পথটুকু পর্যন্ত নেই। গ্যারিঞ্চা মাঠে নেমে যেন তাদের হয়ে বলতেন— অসমতা মানেই অক্ষমতা নয়। তাই গ্যারিঞ্চার খেলা দর্শকের কাছে এত ঘনিষ্ঠ। তিনি দূরের নায়ক নন। তিনি প্রতিবেশী, পাশের বাড়ির মানুষ। যে ভুল করে, হোঁচট খায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। এই মানবিকতাই তাঁকে পেলের থেকে ভিন্ন জগতের শিল্পী করেছে। পেলে যদি পূর্ণতার পীঠস্থান হন, তাহলে গ্যারিঞ্চা অসম্পূর্ণতার নির্ভরযোগ্য স্থায়ী অবস্থান।
এই অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ১৯৬২-তে। পেলে নেই। দলের ভার গ্যারিঞ্চার কাঁধে। এই ভার তাঁকে ভারী ও গম্ভীর করে তোলে না। বরং তাঁকে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় থেকে আরও অবিস্মরণীয় শিল্পী করে তোলে। তিনি জানতেন— সেই বিষণ্ণ মুহূর্তে তাঁর আনন্দ থামলে ব্রাজিলই থেমে যাবে। এই উপলব্ধি সেই মুহূর্তেই তাঁর ভিতরের মূল্যবোধকে উসকে দায়িত্ববান করে তোলে। ১৯৬২-র সেমিফাইনাল বা ফাইনালে গ্যারিঞ্চার ড্রিবল কোনো প্রদর্শনী ছিল না। ছিল জায়মান অস্তিত্বের উত্তাল ঘোষণা। তিনি খেলছেন, আর যেন বলছেন— “তবে একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে … যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয়— তবে পরান খুলে ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা একলা বলো রে …”। এই ভয়হীন চলাটাই ব্রাজিলীয় ফুটবলের শৈল্পিক ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানে যে-কথা না-বললেই নয়, তা হলো, বিশ্ব-ফুটবলের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো খেলোয়াড় প্রায় একক নৈপুণ্যে নিজস্ব সক্ষমতায় বিশ্বকাপ জয় করলেন। একাই দলকে করে তুললেন চাম্পিয়ান৷ এর ২৪ বছর পর মারাদোনা সম্পর্কে এই জাতীয় সংগত দাবি ওঠে। তবু সেখানে কিন্তু প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। মারাদোনার আর্জেন্টিনার উপর তখন চাম্পিয়ানশিপের প্রবল মানসিক চাপ ছিল না, আর্জেন্টিনা বরং ডার্ক-হর্স হিসেবেই সেইবার বিশ্বজয় করেছিল। কিন্তু ১৯৬২-তে ব্রাজিলের উপর ছিল প্রবল মনস্তাত্ত্বিক চাপ, আবার সেরা খেলোয়াড় পেলের আঘাতজনিত ঘাটতি; এই সব চাপ ও অভাব একার কাঁধে বয়ে নিয়ে গ্যারিঞ্চা ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জয়ের পথে পরিচালিত করেছিলেন। এই ঘটনা বিশ্ব-ফুটবলে এক বৈপ্লবিক এবং অভাবনীয় দিকচিহ্ন বলে স্বীকৃত। গ্যারিঞ্চাই ছিলেন সেই বিপ্লবের প্রথম উজ্জ্বল মুখ এবং পরিপূর্ণ মূর্তি।
অথচ গ্যারিঞ্চার জীবনের ট্র্যাজেডিও কিন্তু এইখানেই হয়েছে তীব্র। কারণ মাঠে তিনি যে আনন্দের ভুবন গড়েছিলেন ও বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, মাঠের বাইরের সমাজ তা জাতীয় জীবনে বাঁচাতে পারেনি। এই বিপরীতের অভিঘাত তাঁর খেলাকে আরও গভীর করে তোলে। কারণ এতে বোঝা যায়— আনন্দ কোনো বিলাসিতা নয়; তা টিকে থাকারই উপায়। গ্যারিঞ্চা তাই কোনো ক্লাউন নন। তিনি ‘নাইভ জিনিয়াস’ হয়েও পুরোপুরি তা-ও নন। তিনি আসলে ভিন্ন এক দার্শনিক, যিনি তত্ত্ব লেখেননি। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে দুলতে দুলতে দেখিয়ে দিয়েছেন— মুক্ত স্বাধীনতার স্বাদ চলমান দেহ-মনে কেমন অনুভূতি জাগায়! এই স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারী অরাজক নয়। কিন্তু সংক্রামক। তা দলে ছড়িয়ে পড়ে। তা ছড়িয়ে পড়ে দর্শকের হৃদস্পন্দনে। এই কারণেই গ্যারিঞ্চার খেলা শেষ হওয়ার পরেও স্মৃতিতে অনুরণন হয়ে থেকে যায়। কারণ তা যে কৌশল নয়; তা গাঢ় অনুভূতি। এই অনুভূতির নামই জোগা বনিটো। বিশ্বাসে ভর করে দেহের ওপর গড়ে তোলা স্মৃতির সম্ভার। গ্যারিঞ্চাই ছিলেন সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে আদিতম সচল উজ্জ্বলতা।
আবার এই বিশ্বাসই কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক ধরনের চাপ তৈরি করেছে। কারণ আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী ধরে রাখা সবচেয়ে কঠিন কাজ। শৃঙ্খলা শেখানো যায়। আনন্দের কোনো বিধিবদ্ধ প্রণালী নেই। এই কারণেই গ্যারিঞ্চার উত্তরাধিকার সবচেয়ে নাজুক (ব্যতিক্রমীভাবে কেবল রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহো, ডেনিলসন আর নেইমারের মধ্যে সেই ধারার উত্তর-প্রবাহ লক্ষিত হয়েছে)। কেননা তা অনুকরণযোগ্য নয়। কিন্তু তা এড়িয়ে যাওয়াও যায় না। ব্রাজিলীয় ফুটবল তাই গ্যারিঞ্চাকে ভুলে থাকতে পারে না। কারণ তাঁকে ভুলে গেলে ফুটবল আবার কেবল ট্যাকটিক্যাল হয়ে যাবে, নতুবা সংযমী কার্যকরী মাঠের কাজ। এই কাজ-হয়ে-যাওয়া ঠেকানোর লড়াইটাই পরবর্তী ব্রাজিল ফুটবলের সবচেয়ে গভীর দ্বন্দ্ব, সংকট এনেছিল কিংবা হয়তো নব-উদ্ভাবনের পথকেই প্রসারিত করেছিল। সেই গল্পই থাকবে পরের পর্বে।
(চলবে…)
ড. অনিশ রায়

