ড. অনিশ রায়
‘কবিতা’—এই শব্দের ভিতর নৈঃশব্দ্যময় এক ভিন্ন প্রেক্ষিত উদ্ঘাটন করার তাগিদ রাখলে, আত্মপক্ষ উপলব্ধি থেকে দুটি শব্দ পেয়ে যাই যেন–‘কথা’ ও ‘বিতান’। আবার, ‘কবিতা’ শব্দের অক্ষর-যাপনে ‘কথা’, ‘বিতান’ ও ‘তাৎপর্যের’ বর্ণমালা
এসব তাত্ত্বিকতায় নয়; বরং চোখ রাখা যাক সোহারাবের কাব্য-কথালিপির শব্দমালার উপর। এবং এমনভাবে যেন তাতে সোহারাবের কাব্য-বয়ান সরাসরি পাঠকসত্তাকে বিদ্ধ, আলোড়িত ও একান্ত নিজস্ব মনশ্চর্যায় উদ্বুদ্ধ করে। সঙ্গে একথাও মনে রাখতে হবে, কবিতার শব্দ পাঠ কেবল বর্ণনাযোগ্য করে তোলার জন্যই নয়— বহুস্বরের গ্রন্থনায় চিহ্নায়কের স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই। আর সেই পাঠ-মাত্রায় এ-কথাও যেন বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপলব্ধ হয় যে, একজন কবির কবিতায়, সমগ্র রচনায় তাঁর জীবন-ই অগ্রন্থিত কাহিনির ক্রমবিস্তারে, বিচিত্র বিক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতার নিয়ন্ত্রিত নির্যাসে ব্যক্ত হয়ে চলে। কবিতার ক্রম বা অক্রম-বিন্যাসে ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় না ঠিকই, কিন্তু এক সময়-পার্বিক স্বর-স্রোতের সঙ্গে পূর্বতন বা পরবর্তীকালীন সময়ের স্বর এসেও মিলিত হয়—এভাবেই লেখা হয়ে চলে; এভাবেই নানা স্তরের সংগ্রহের বিন্যাসে জীবন রচিত হয়। একজন সত্যনিষ্ঠ কবি তাঁর সৃষ্টি-ভাবনার ভিতর এরকমভাবেই সমগ্র জীবনানুভূতির সংগ্রহগুলিকে গেঁথে চলেন। তাই এক-একটি শব্দ-বাক্য-পংক্তির গভীরে পাওয়া যায় জীবন-অরণ্যের মহীরুহের সন্ধান। ঐতিহ্য থেকে, শিকড় থেকে আধেয় সংগ্রহ করে অতীতের সেই আকরকে আগামির বিপুল সম্ভাবনার মধ্যে সঞ্চারিত করে দেওয়ার কাজ করেন একজন সচেতন কবি। কবিতার ভাষা দিয়ে এ অসাধ্য সাধন করতে চান যে কবি, তিনি জীবনের স্থায়ী মূল্যবোধগুলি সম্পর্কে নিঃসন্দেহে সচেতন থাকেন। তাঁর কাছে কবিতা মানে সেই মূল্য-সচেতনতা বা আত্মসচেতনতারই প্রগতি। যে প্রগতি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত, আবার একই সঙ্গে মানবিক। সোহারাব সেই অনুভূতিময় মূল্য-প্রগতিরই নিরুপম যাত্রী যেন।
অতীত থেকে যে কবির যাত্রা শুরু, তাঁর কাছে সময়ের অনিবার্য পটগুলি যে অভিজ্ঞতার সার-নির্যাসে জীবনের বর্ণময় প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে, তাতে আর সংশয় কোথায়? কবি অতীতের সেই নির্ঝরকে সকরুণ আবেদনে আরও একবার অনুভব করতে চান হৃদিজলে—
“সে কোন অতীত
ভঙ্গিল পর্বতের মতো
যার প্রতিচ্ছবি কাঁপে
উষ্ণ হৃদি জলে।
কাঁপা জলে মুখ দেখি রোজ
দেখি আর হাসি
এবং বিষদাঁতেরসবটুকু গরল মধু ভেবে
নিত্য পান করি চুমুকে চুমুকে।”
(অতীত)।
অতীতের ভ্রমকে নিত্যকার প্রেক্ষাপটে আবারও আবিষ্কার করেন কবি। দেখেন ভ্রান্তির ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হয়ে চলে আমাদেরই মধুবিলাসী আস্বাদে। আর সেই বিষ-ভ্রান্তিকেই পান করে আজ আমরা সকলেই যে বিষকন্ঠ; ভূমাভ্রষ্ট। তবু সেই উল্লম্ফন পর্বের দ্রোহকালে রচিত হয় অন্তিমের পরা-আখ্যান–“অতঃপর মরণ যন্ত্রণার মোকাবিলায় নামতেই/ প্রেমশুদ্ধ দেহশুদ্ধ অতীত আবার অতীত হয়ে যায়।” যে অতীতের ভবিষ্যৎ তাই অলিখিতই থেকে যাবে হয়তো । যন্ত্রণার এমন অভিব্যক্তিতেই সোহারাবে রস্বরান্তরের ধ্বনি বাজে তাঁর কবিতার বর্ণমালায়।
যন্ত্রণা যেমন সোহারাবের কবিস্বরে সুর হয়ে বাজে, তেমনি তিনি নিশ্চিত চিত্তে জানেন যে, যন্ত্রণার মধ্যেই আমাদের আসা, আমাদের বেড়ে ওঠা, আমাদের যাওয়া-আসার নিত্য চলমানতা। তাই যন্ত্রণার উত্তপ্ত বালিতেও আমাদের সমবেত পথযাত্রার অকলঙ্ক গীতিকাব্য রচনা করতে হবে। আমাদের হেঁটে যেতে হবে আল্পনা কাটা খোলামেলা আকাশের নীচে; প্রিয় সাথিকে যদি দিতে পারি অন্তঃপুরের সন্ধান দাতার মতো। প্রেমিকের মতো। দু-কূল যন্ত্রণার মাঝে সনাতনী চাঁদের নীল ছায়ার মতো এক আঁজলা প্রেমের জীবন। নিখাদ সেই চলার প্রবাহে তবে সেই মুহূর্ত-ই তো হবে মানুষ কিংবা অমানুষের ভালোবাসার অভিজ্ঞান। সেই মুহূর্তের দাতা হবেন কবি; আর হতে চান বলেই বলতে পারেন—“ফের আবার/ফিরতে হল/চমকাতে হল স্বাভাবিক নিয়মে। …আবার ফের/ফের আবার হাঁটতে হল একসাথে/….ফের আবার/আবার ফের/হাঁটতেই হবে একসাথে একপথে সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে”।
এই অন্তহীন পথ যাত্রার অভিলাষেই কবি নব-জন্মান্তর লাভ করতে চান।পেতে চান সত্য মানুষের জীবন—“যদি জন্মাতে পারি জীবন নিয়ে”। এখানে এই‘যদি’ উচ্চারণ যে কতখানি আবেগদীপ্ত, কতখানি আকূলতাময়—তা অনুভববেদ্য পাঠক মাত্রই অনুভব করতে পারেন।
জন্মান্তরের সত্য জীবনের বাসনায় মানুষের নিঃশ্বাস ঘিরে অন্ধের মতো অপেক্ষায় থাকেন কবি। কারণ মানুষ ছাড়া জীবন নেই, মুক্তি নেই, জন্মও নেই। কবি জানেন, মানুষের সঙ্গ হারালে শ্মশানের ভূতের মতো কেবল দেহটাই থাকে। তাই কোনো এক জ্বলন্ত সময়ের মুদ্রাদোষে কবি হঠাৎই অনুভব করেন—“এখন শুধু অবিশ্বাস আর অপেক্ষা/এখন শুধু বুকের ভিতর নাড়া খাওয়া একলা এবং একা”(সমর্পণ)। একা এই মনুষ্যগ্রহে তবুও কবি মাটি হতে চান, কারো আগমনের পথ চেয়ে। চিহ্নিত করেন সঙ্গ-বিসঙ্গের রূপকথার ভিতরে আকস্মিকের অভিঘাত—“হঠাৎ বৃষ্টি আসে/হঠাৎ রৌদ্র ওঠে/হৃদয়টা ভেঙে যায় হঠাৎ/এমনি হঠাৎ-হঠাৎই/ জীবনের শেষ এবং শুরু/হঠাৎ করেই তুমি আসো না/অপেক্ষায় আর কতকাল।” (অপেক্ষায়)। এভাবে মরণের হাত ধরেই স্বপ্নের অপেক্ষায় কবি বেঁচে থাকেন।
মানুষের অপেক্ষায় অপেক্ষায় কবি মনের মধ্যে এক নতুন বৃক্ষময় জগৎ গড়েন। যেখানে আলো জ্বলে জীবন-আস্বাদময় জিভের উষ্ণতায়। স্পষ্ট হয় মূর্তি; নৈঃশব্দ্যের লতা-বৃক্ষতলে‘অরব অন্ধকার’ মোচন করে অবধারিত হয়‘মানুষ’। জেগে ওঠে পরিচিত অভিজ্ঞতার শব্দরাজি। কবি আলো ফেলেন তাঁর আকাঙ্ক্ষিত রূপের সর্বাঙ্গে। আর অপেক্ষা-ক্লান্ত কবির চোখ তখন নৈরাশ্যের নিরালোকে ডুবে যায়। কারণ, মানুষ নিজেই যখন নিজের ঘাতক মূর্তি আবিষ্কার করে, তখন সংবেদনশীল কবির আলোকিত মানব আকাঙ্ক্ষাও বিবিক্ত অভিমানে গাছের গায়ে হারিয়ে যায়। এমন-ই এক আশা-যন্ত্রণার অনুভূতির কথা ফুটে ওঠে কবির‘গাছের গল্প, মানুষের গল্প’ কবিতায়—“জিভের চাপে জ্বালালাম আলো/আলো ফেললাম গাছের গায়ে,/স্পষ্ট হল মূর্তি।শব্দ হল কে কে?/ মানুষ!/তারপর নৈঃশব্দে জগতের পারাপার!/আলো ফেললাম মানুষের গায়ে,/স্পষ্ট হল মূর্তি! শব্দ হল কে কে?/মানুষ!/আর আলো চুরি হল আমার হৃদয় থেকে।”
তবু মানুষের কথা বলতে, মানুষের বাদামি বুকে পাকা ধানের সৃজনসত্তা জাগিয়ে তুলতে কবি যেন ক্লান্তিহীন, অনর্গল।তাঁর এই সংবেদী কণ্ঠস্বর জেগে থাকে স্বপ্ন-চেতনার পাণ্ডুলিপি ঘিরে—
“দু-একটা ঘাসফড়িং তবু লাফায়
গাদা দেওয়া ধানের ভিতর
চাষির বুকের ভেতর
পাকা ধানের মতো বাদামি বুকের পরিসরে।”
কবি জানেন, এই সময় সংশয়ের, বিমূঢ়তার, পথহীনতার। আবা
“স্বামীহারা নারীর সিঁথির মতো ধবধবে সাদা পথ
লাঙল টানা বলদের, ঘামঝরাচাষির, গন্ধ ছাড়িয়ে
সরু হতে হতে… সরু হতে হতে…
খইয়ে বাবলা কাঁটানটে খেজুর পেরিয়ে
মিশে গেছে পাটকিলে মেঘের সীমানায়…
এ পথ ভালোবাসে জোয়াল কাঁধে বলদকে–মরদচাষিকে।
(এ পথ ভালবাসে)
এখানে কবি যেন বিশ্বায়নের বি-মানবায়নে মগ্ন মানুষের নবদৃষ্টিকে কৃষিজীবিকার দিকে ফেরাতে চাইছেন। বোঝাতে চাইছেন, কৃষিজীবনের প্রাণস্পন্দন উপেক্ষা করলে সভ্যতার সব পথ-ই ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। তাই রাজনীতি, সমাজনীতি, বিপ্লবপ্রী
“বক্তৃতা জনগণ চায়ের কাপ ইত্যাদিতে
অদ্ভুত সূর্য আকাশে উঠল জেগে…
মনোযোগী ভাঁড়ের জল ঢালছে লঙ্কা চারা
ভিজে ক্ষেতে এ কোন্ ইশারায়
মিটিং মিছিল ময়দানে নয়
বিপ্লবী তেজ জেগে ওঠে লোকটির গায়।”
এমন সৃষ্টিধর্মী মানব-বন্দনায় মগ্ন কবির দৃষ্টি থেকে কিন্তু এড়িয়ে যায় না সভ্যতার আত্মবিনাশী অন্ধকার এবং কূটাভাসগত আয়োজন। নিজেকে এই আয়োজনের আড়ম্বর থেকে বিযুক্ত করে নিতে চান কবি। ক্লান্তিদীর্ণ প্রাত্যহিকতার ঘেরাটোপে প্রতিনিয়ত যে ভ্রষ্টতা ও কুশ্রীতার ফাঁদ তৈরি হয়; অস্তিত্বের শেকড় ছিঁড়ে নেয় উৎকণ্ঠা, অবসাদ আর আতঙ্ক— এই দাহ ও অপমান থেকে কবি সরে এসে শুদ্ধ অশ্রুর জন্য যান শ্মশানের নীরবতার কাছে—
“প্রভু, শ্মশানের নীরবতা আমাকে কাঁদায়
ঘোর অনুরাগে আমি কাঁদি।
বড়ো মায়ায় পাঠ করি জীবনের ব্যাকরণ।”
(শ্মশানের নীরবতা আমাকে কাঁদায়)।
লক্ষ করতে হবে, কীভাবে কবির ব্যক্তি-অস্তিত্ব নৈর্ব্যক্তিকতায় উত্তীর্ণ হচ্ছে।‘জীবনের ব্যাকরণ’– এই শব্দবন্ধে তো মানবিক বিশ্বের আদিকল্পগুলির নব-পাঠকৃতি গড়ে উঠতে চাইছে। আবার একথাও সত্য ব্যক্তি-অস্তিত্বের সবেদন শুদ্ধিকরণের পথ ধরেই যে রচিত হতে পারে সমষ্টির প্রশান্তি—তা কবি জানেন। আর জানেন বলেই আত্মশুদ্ধির নিরন্তর প্রেরণা জাগিয়ে রাখতে মনে মনে চলে যেতে চান পৃথিবীর আদিমাতা গাছের কাছে—
“গাছটা দাঁড়িয়ে আছে একা
আমি গাছটার কাছে যাবো।
নিবিড় আলিঙ্গনে
চেপে রাখা কথাগুলো বলব
শিকড়ে রেখে অন্তর দীর্ঘ কাঁদব।”
(গাছটা)
পাপের-তাপের এই নিঃসংশয় স্বীকরণে কবির সত্যবোধ যেমন স্পষ্টতা পায়, তেমনি তাঁর অব্যক্ত যন্ত্রণার অনুচ্চকিত স্বরটিও গোপন থাকে না। কারণ, জীবন আর ভালোবাসা সমার্থক হলে অস্তিত্বটাই হয়ে যায় এক সরল নিঃসঙ্গ রহস্যের ভাণ্ডার। কিন্তু কবি জানেন—“এই গাছ বোধিবৃক্ষ/ যদিও বুদ্ধদেব আর নেই।” তাই শুরু হয় মানুষ ধ্যানের জীবন্ত সংকল্পগুলির সঙ্গে আত্মের সংস্কার প্রক্রিয়া—
“আমার মাথার খুলি উল্টে ফেল প্রিয় মানুষ
শ্রাবণ কেশে ঢেকে দাও ক্ষতস্থান
তোমার চুলের গন্ধ এখন বড়ো প্রয়োজন
রাখাল-বালকের পদধূলিতে চাঁদ লুকিয়ে
আমার করোটিতে আঘাত করো
পাল্টে দাও আমার ভূ-বলয়।”
(একবিংশ শতাব্দীর পরিবার)
ব্যক্তি থেকে মানুষ হবার এই রূপান্তরকামী সাধ নিয়ে কবি জলবেষ্টিত মানবময়‘দ্বীপের কাছে’ পৌঁছে যান। জীবনকে চেনার এক অদ্ভুত রহস্যে হন রোমাঞ্চিত। অনুসন্ধানের দীর্ঘ পরিক্রমায় বুঝতে পারেন, মানুষকে চেনা যায় না, কিন্তু চিনতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটাই হল আসল কথা। মানুষ, সর্বতোময় মানুষের অভিজ্ঞতাকে চিনতে চেয়েই কবি বলেন— “একটা দ্বীপের কাছে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ/গোল হৃদয় তার সুখ খুঁজে চলে/আমি তার পরিচয় নেবে—এই ছিল উজ্জীবন/তাই কালপ্রবাহে একান্ত নির্ভরতার কলম ভ্রাম্যমান।” (দ্বীপের কাছে)। কবি তাঁর ভ্রাম্য উজ্জীবনে মানুষকে চিনতে চান বলেই স্ব-ভাষণে সম্পন্ন করে তোলেন আত্মগত প্রশ্নের আততিগুলিকে—“দু-একটা বজ্রপাতে মানুষের বোধের মৃত্যু ঘটে কি?/দু-একটা বৃষ্টির দুপুরে মানুষের বোধেরা জেগে ওঠে কি?” এ জিজ্ঞাসা আত্মগত নিম্নকণ্ঠ উচ্চারণ হলেও, আসলে হয়তো মানুষের সঙ্গে মানুষের, সময়ের, পরিসরের সম্পর্ক নিয়ে। শেষ পর্যন্ত কবি যৌথ নিশ্চেতনার বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মাটিতে দাঁড়িয়েও বিশ্বাস রাখতে পারেন সমবেত মানুষের অপরিমেয় মুক্ত চেতনার প্রতি— “একসময়/ চর্মগন্ধ ঝুলি থেকে বেরিয়ে আসবে দ্বীপের মানুষ’’। এভাবেই সোহারাবের মানবসন্ধান গণ্ডি-ভাঙা আত্মানুসন্ধানের অনুমেয় কর্কটক্রান্তি ধরে প্রদক্ষিণ করে চলে।
এ-তো গেল আত্মগত সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে মানবিক সত্তার নিঃশব্দ সন্ধান; কিন্তু আজকের বিশ্বের পটভূমিতে সর্ব-মানবিক অস্তিত্বের বিপন্নতাকে চিনে নিতেও সোহারাব অচঞ্চল, আন্তরিক। কবি লক্ষ করেন, বর্ণ-রক্তময় ইতিহাসের উদ্ভুত ধারাবাহিকতায় আজকের মানুষও কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাবানের হাতে ক্রীড়নক হয়ে যায়। তাদের হীন চক্রান্ত এবং স্থূল লুব্ধতায় মানুষ মানুষেরই মৌল মানবিকতাকে ধ্বস্ত ও ছিন্নমূল করে হননবৃত্তান্তের পরাসন্দর্ভকে নির্বাধে প্রতিষ্ঠা করে যেতে মত্ত।‘চর দখলের লড়াইয়ে নেমে’ কবিতাটি সেই রক্তাক্ত-ইতিহাসের চলমানতারই সাক্ষ্য হয়ে ওঠে—
“ওরা চর-দখলের লড়াইয়ে নামে…
সন্তানের মুখে চুমু না খেয়ে ওরা মসকেটে চুমা দেয়
এবং রিরংসার অন্তিমে
বোম বাঁধে বোম ফাটায়… মানুষ মারে।
ওরা হাতে তুলে নেয় বেহিসেবীমসকেট
অস্ত্র ধরে অস্ত্র ওড়ায়—মানুষ মারে আলোর উল্টোদিকে হেঁটে।
কুশলী শিল্পী হয়ে মালিক-ভগবান
মেয়ে মানুষ মৌতাতে আর বাড়ির ছত্রছায়ায় মজিয়ে ওদের তাড়িত করে।
এবং
হুকুমের গোলাম হয়ে হায়নার চোখ নিয়ে
কখনও সাঁঝ-সকালে দিনের আলোতে, রাত আঁধারে
বাপ-দাদাদের আমল থেকে ওরা চর দখলের লড়াইয়ে নামে।”
এই কবিতায় ভাষার সহজতাই ইঙ্গিতে কার্যকরী হয়ে উঠেছে। এবং কবির সমাজ-সংবিদের এই উপরিকাঠামো থেকেই প্রতিবাদের স্পৃহা এবং বেপরোয়া আক্রমণের বিপরীত প্রতিক্রিয়াটিও যেন স-চালিত হয়েছে। প্রতিস্পর্ধিতার এই প্রতিবেদনেই সোহারাবের সামাজিক-দৃষ্টি অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠতে চেয়েছে। তবু, বহুকাল এই হিংস্র চক্রান্তের স্বরূপ লক্ষ করে কবি হাজারো ভ্রষ্ট স্মৃতির ধারক হতে পেরেছেন মাত্র; আত্মগত প্রেরণায় বিদ্রোহী সত্তাকে জাগিয়ে রাখলেও চারিপাশের জগতে কোথাও কোনো পাপবোধ, অনুশোচনার কণ্ঠ তিনি শোনেন না। তাই এমন অস্বস্তির থেকে নিজেকে আড়াল করতে ঘুমাতে চান মৌন শীতলতায়—“অনেককাল ঘুম হয়নি স্বস্তিতে/চোখের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে নষ্ট নরক/…চোখের ওপর রক্ত—একটু স্বস্তি চাই/আস্ত হিমালয় চাই একটা/মা আমার এসো হিমালয়ের শীতলতা নিয়ে/তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাবো খানিক।” (ঘুম)। এখানে জীবনানন্দীয় কাব্যদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্য খোঁজা কি একেবারেই বেমানান হবে? কেননা, জীবনানন্দও তো‘সূর্যের রৌদ্র আক্রান্ত’ এই পৃথিবীতে‘কোটি কোটি শুয়োরের আর্তনাদ’ ঘেরা উৎসব দেখে বলেছিলেন–
“হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিয়ে ফেলে আবার ঘুমাতে চেয়েছি আমি।” ‘অবিরল অন্ধকার’ আর‘হিমালয়ের শীতলতা’—এই দুটি শব্দবন্ধের ভাবগত দুরত্ব কি খুব বেশি আছে?
সময় যখন বন্ধ্যা হয়, তখন কবন্ধের মতো শরীরময় হয়ে ওঠে মানবিক অস্তিত্ব। মানুষ সেখানে বিভাজিত হয়ে যায় দুটি শ্রেণিতে—নারী ও পুরুষ; ভোগ্য এবং ভোগী। ভোগবাদী এই সময়ের বড় পণ্য হল নারী। নারীর কোমলতাকে তাই নিদাঘের রুক্ষতায় শুষে নেওয়াই হয়ে ওঠে পৌরুষের শ্রেষ্ঠ প্রদর্শন। কবি দেখেন, নারীমুক্তি শুধু কেতাবি বুলি আওড়েই ক্ষান্ত হয়ে গেছে বহুকাল ধরে। তিনি বোঝেন, যুগের এই নব-হুজুগে পুরুষতন্ত্র এক নতুন ফাঁদের খেলায় মেতেছে। তাই নারীকে নিজের জন্য এক মুক্ত-বিশ্ব গড়তে হবে; তার জন্য নারীকে সমস্ত মোহবন্ধন ছিঁড়ে পালাতে হবে। পালিয়ে যাওয়ার এক নতুন দেশের সন্ধান দিয়ে দিতে চান কবি; সে দেশ হল—নিরুদ্দেশ। কবি বলেন—“পালিয়ে যা তুই অবুঝ নারী/এই দুনিয়ার যেথায় সেথায়/রেস্টুরেন্টের নাচওয়ালি পালিয়ে গেছে/তুইও পালা নিরুদ্দেশ/…মত্ত দিনের রঙ-রঙিলার অবশেষে/নাচওয়ালি বসত করে নিরুদ্দেশে/অমনি করে মুখোশধারীর বুকের খাঁচায়/বিষ ঢেলে দে তুইও পালা।” (তুইও পালা)।
আজ যখন দেখি অধিকাংশ কবিরা নিজেদের সযত্ন-রচিত শৈলীতে ও অভ্যস্ত দৃষ্টিকোণের বিন্যাসে স্বেচ্ছাবন্দিত্ব বরণ করেছেন, কবিতা থেকে ঝরে যাচ্ছে অনন্যতা; কিংবা, বিষয়ের দৈন্যকে আড়াল করার সুতীব্র তাগিদে আঙ্গিক চাতুর্য ও মেকী বুদ্ধিবাদ প্রদর্শনের প্রবণতা হচ্ছে নিরঙ্কুশ—তখন সামান্য মনন বীক্ষণেই উপলব্ধি করা যায় যে, আত্মবিনির্মাণ-ই সময়ের স্বরে সম্পৃক্ত থাকার একমাত্র পথ। সোহারাব সেই আত্মপথেরই চির পথিক। আর তাঁর এই পথ তৈরি হয়েছে গভীর ঐহিত্যমনস্কতা এবং চলমান জীবনের বৃক্ষ-লতার ছায়ায়। সোহারাবের কবিতায় তাই দেখা যায়, ঐহিত্যবোধের বিপুলায়তনে গ্রহণ ও বর্জনের দ্বান্দ্বিকতায় নিয়ত বহমান ধারা। যেমন—“নিরন্তর হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেছে তেপান্তরের মাঠে।/অতঃপর পেয়েছে স্বপ্নদেশ—নদীর পিছনে ছুটে জীবনটা আর কোরো না শেষ, এবার ভূমি হও।” (সৃষ্টিমন্ত্র : এক)। লোককথা-উপকথার চেনা পথ ধরে স্ব-কাল, স্ব-সমাজকে কবি এইভাবেই ব্যক্তির আত্ম-উন্মোচনের ক্রমিকতার সাথে গেঁথে দেন। এবং এই উন্মোচিত প্রক্রিয়া আত্ম-সংস্কৃতি নির্মাণেরও এক নির্ভরশীল বহুমাত্রিক প্রেরণা হয়ে ওঠে। যা বিচিত্র স্বরন্যাসে অভিব্যক্ত হয়ে চলে—“অ-য় অজগর আসছে ছলে/শব ভূমিটি খাবে বলে।” (মৃত্যু হে)। এখানে স্বরবৃত্ত ছড়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসের মোহময় বলয়গ্রাসকে কবি চিহ্নিত করে যান। আবার কবি যখন বলেন—“দেখি পৃথিবীর সব দেবতার অমৃত পানে মানুষের রক্ত লাগে প্রচুর”; তখন বুঝতে পারি, মিথ্ ভেঙে এক নব-মিথ সৃষ্টির কথাই কবি ভাবেন। সেখানে ঐহিত্যের ধারাবাহিকতাই যেন দ্বান্দ্বিক সংশ্লেষে পুনর্মূল্যায়িত হয়ে চলে। পূর্বজ কবিদের উচ্চারণও ফিরে আসে নতুন সম্পর্ক ও তাৎপর্যের গ্রন্থনা নিয়ে। বাক্ভঙ্গির এই রূপান্তর আসলে সময়শীলিত অনুভবেরই স্বরান্তর— “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম বলে নেচে উঠবো না কখনো/বরং নদীর কাছে যাবো –সাগরে।” (মৃত্যু হে)।
সোহারাবের কবিতায় আপাতদৃষ্টিতে যৌনতার কথা লক্ষণীয় ভাবে চোখে পড়ে। কিন্তু অভ্যস্তগ্রাহ্যতার স্বতঃসিদ্ধতায় দ্বিরালাপকে মান্যতা দিলে সহজেই সেই ছদ্ম-যৌনতার বিভ্রম ঘুঁচে যায় ।পৌঁছনো যায় শব্দের অন্বিষ্ট ইশারায়। বোঝা যায়, যৌনতার ছদ্মবেশে জীবন ও সমাজ-বাস্তবের গভীর ও চলিষ্ণুতাকেই কবি ইঙ্গিতময় করে তুলতে চাইছেন। আর এই প্রয়াসের উচ্চস্তরীয় দৃষ্টিকোণে যেন ধরা পড়ে যায় সময়তাড়িত অস্তিত্বের আর্তি, যন্ত্রনা, বিকৃতি ও অভিমান। কয়েকটি দৃষ্টান্ত—
(১) “দশআঙুল কামনার গণগণে আঁচে সেঁকে নিয়ে মনে মনেরূপবতী নারীদের নিষিদ্ধ অঙ্গে উষ্ণ পরশ রেখে গোপন ধর্ষক সাজি প্রত্যহ।ছোট বড় আরও কত পাপে আমি নিয়ম করে নষ্ট হয়ে যাই।” (পাপপদাবলী-চার)।
(২) “তুমি তেপান্তরের নারী/তোমায় চিনতে কি রোজ পারি/দুঃসাহসে যায় নাকি গো তোমার দেহ ছোঁয়া/রোজ সকালের দৃষ্টি তোমার স্রোতস্বিনী ভরাট পুণ্যতোয়া/তুই কলঙ্কিনী নারী/পাপ দেহটায় ঢেউ তুলে রোজ তোর কাছেতে হারি।” (পাপপদাবলী-তিন)
(৩) “এ সময়ে/বিশ্রামে যায় স্খলিত পত্র, নগরের উদ্দাম জীবনের ছাতা ধরা প্রেম, এক যুবতী চেটেপুটে চিনে নেয় শহরের লুপ্ত পিপাসা।” (এসময়ে)।
এমন অসংখ্য বাচনের কোষে কোষে ছড়িয়ে আছে সময়ের বিভঙ্গ থেকে অর্জিত উপলব্ধির স্পন্দন, স্বর ও স্বরান্তর।
যাই হোক, বিশ শতকের অন্তিম প্রহরে এবং একবিংশের প্রথম লগ্নে যখন দেখি, নানা সংশয়ের ছায়ায় ম্লান ও ধূসর মানুষের উপার্জন; অনুভবের গভীরতা যখন অবাস্তব ও অবান্তর; যখন সর্বত্র ব্যাপ্ত বস্তুত্বের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে অস্তিত্ব; যখন পা রাখার সত্য-ভূমি খুঁজে পাচ্ছে না মানুষ — তখন এমন জটপাকানো প্রতিজগতে নিজেদের ফিরে পাওয়ার জন্য কবি সোহারাব যেন আমাদের হাত ধরে নিয়ে যেতে চান সূক্ষ্মতার কাছে, সংবেদনশীলতার কাছে। কবি যেন পালন করেন মানব-অস্তিত্বের বেদনাময় রূপের সংবেদনশীল ভাষ্যকরের ভূমিকা। তাই মানব জীবনের অনুভূতিময় আস্বাদ গ্রহণের জন্য তিনি কখনো কখনো সমাজের বিষ পান করে ফেলেন; আর তখন-ই সেই বিষকে অন্তঃশায়ী পরিস্থিতিতে জারিত করে আমাদের জন্য বয়ে আনেন শুশ্রুষার জল। বিভ্রমের জটিল কৃৎকৌশলগত রৈখিকতা ভেঙে তিনি বিবরণের মধ্যে সারল্যের আশ্চর্য লাবণ্য ও গভীরতার ছবি ফুটিয়ে তোলেন। সবচেয়ে কঠিন যে কাজ, অর্থাৎ সহজ আন্তরিক ভঙ্গিতে ভাষা-ব্যবহার, তা অনায়াস দক্ষতায় করে দেখিয়েছেন কবি। মনোমৈত্রী ও সুরসাম্য তো একেই বলে।
সবশেষে বলব, কবি সোহারাব তাঁর কবিতার পর কবিতার মধ্যে দিয়ে মূলত দেখাতে চেয়েছেন যে, মানুষের প্রবৃত্তি কী ভয়ংকর! প্রবৃত্তির রূঢ় আয়োজনে মানুষ কত জান্তব! আর যে সত্য সুন্দর, তার নগ্নতাও সুন্দর—মহীয়ান। ‘মানুষ’ নামের ভিতরে সেই সুন্দরেরই হোক আবাহন। অশান্তি, অসুন্দর, ক্লেদ ও বিকৃতির দীর্ঘ কোলাহলময় উচ্চৈঃস্বরের ভিতরে মানবের আত্ম-উন্মোচনের এমন স্বর প্রতিস্থাপিত করেই সোহারাব তাঁর কবিতায় গেঁথে যেতে চান সমীকৃত দ্বান্দ্বিক ঐক্যের সূত্র। আর সেই সমীকরণের চিহ্ন-বাহক‘শব্দ’-ই যেন অবিরাম আমৃত্যু খুঁজে চলেন কবি—
“একটা শব্দ চাই আমার।
শব্দটির জন্য রাত্রিদিন হিমালয়-গর্ভা নারী খুঁজছি
রক্তপোকা হচ্ছি রক্তপোকা।
নষ্ট হচ্ছি পাপে পাপেরক্তপোকা।
কে আছো জেগে হে পবিত্র দেবদাসী একটা শব্দ চাই আমার।
চিন্তার শরীরে জন্ম দিয়েছোবটগাছ-শব্দ।
আমার শব্দ মানে মৌমাছি-শীতকাল, ডালপালার ব্যাপ্তি
আমার শব্দ মানে দেবদাসীর উলঙ্গ হাত, অ-আ-ক-খ শিশু
তরুণ কবির আগামী মৃত্যুবার্ষিকী।
অব্যর্থ শব্দ চাই আমার সৃষ্টিকর্তা—শব্দ
কবির মৃত্যুদিনের কবিতা লেখা হবে এখন।” (শব্দ)
#২০১৫_সালে_সোহারাব_হোসেনের_বিশেষ_সংখ্যায়_মুদ্রিত

