কার্নিভাল ও জোগা বনিটো: অস্থায়ী স্বাধীনতার স্থায়ী ছাপ
কার্নিভালকে সাধারণত আমরা ভুল ব্যাখ্যা করে ফেলি। মনে করি— কার্নিভাল আনন্দের সময়, বিশ্রামের সময়, দৈনন্দিন জীবনের বাইরে থাকা কিছুদিনের স্ফুর্তি-বিলাস। যেন বছরভর যে কঠোর বাস্তবতা চলে, কার্নিভাল তার বিপরীত মেরু। কিন্তু ব্রাজিলীয় সমাজে কার্নিভাল বাস্তবতার বাইরে নয়; তা বাস্তবতার ভেতরের এক বিশেষ ফাঁক। এমন এক সময়, যখন নিয়ম সাময়িকভাবে শিথিল হয়, কিন্তু স্মৃতি শিথিল হয় না। এই সাময়িকতাই কার্নিভালের আসল শক্তি।
সেই কার্নিভাল জানে— স্থায়ী স্বাধীনতা সহজ নয়। তাই সে অস্থায়ী স্বাধীনতার আয়োজন করে। কয়েকদিনের জন্য শ্রেণি, শালীনতা, ভদ্রতা, কাজের সময়সূচি— সবকিছু ঢিলে হয়। দেহ নিজের মতো করে চলতে পারে। মুখোশ পরে, রঙ মাখে, গলায় আওয়াজ তোলে। কিন্তু এই উন্মুক্ততা কোনো পলায়ন নয়। এ এক ধরনের অনুশীলন— স্বাধীন হলে দেহ কীভাবে আচরণ করবে, তার মহড়া। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। কারণ দাসত্ব-উত্তর সমাজে দেহের সবচেয়ে বড়ো সংকট ছিল— সে নিজের মতো হতে জানে কি না। শাসন শুধু দেহকে নিয়ন্ত্রণ করেনি; দেহের কল্পনাকেও তো সংকুচিত করেছিল। কার্নিভাল সেই সংকোচনের বিরুদ্ধে দেহকে আবার প্রসারণশীল করে তোলে। এর মধ্যেই আছে জোগা বনিটোর নৈতিক বীজ।
জোগা বনিটোকে আমরা প্রায়ই ‘সুন্দরভাবে খেলা’ বলে অনুবাদ করি। যদিও এই অনুবাদ অসম্পূর্ণ। কারণ এখানে ‘সুন্দর’ মানে কেবল শোভন নয়; ‘সুন্দর’ মানে সাহসী-ও। সুন্দরভাবে খেলা মানে এমনভাবে খেলা, যেখানে দেহ নিজের উপস্থিতি অস্বীকার করে না। কার্নিভাল দেহকে শেখায়— দেখা দিতে ভয় পেও না। প্রকাশ হতে লজ্জা কোরো না। (তাই ব্রাজিলে নর-নারীর উন্মুক্ত দেহ-প্রদর্শনের মধ্যেও থাকে তাদের আস্তিত্বিকতার প্রদর্শন, ইতিহাসের নির্মমতার বাইরে বেরিয়ে অন্য ইতিহাসে নিজেদের অস্তিত্বমাত্রিক সৌন্দর্য নির্মাণেরই আয়োজন)।
এই শিক্ষা ফুটবলে ঢুকলে, মাঠ আর কেবল প্রতিযোগিতার জায়গা থাকল না। মাঠ হয়ে উঠল প্রকাশের, অস্তিত্ব প্রকাশের স্থান। এখানে খেলোয়াড় শুধু গোল করার জন্য দৌড়ায় না; সে নিজেকে দৃশ্যমান করে তোলে। এই দৃশ্যমানতা ফলাফলের বাইরে কিছু দাবি করে— সম্মান, আনন্দ, মর্যাদা। এই কারণেই ব্রাজিলীয় ফুটবলে আনন্দ কখনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়। আনন্দ নিজেই লক্ষ্য। তবে এই আনন্দ ভোগবাদী নয়। তা আত্মরক্ষার আনন্দ। দারিদ্র্যের ভেতর জন্মানো সমাজ জানে— আনন্দ না থাকলে দেহ ভেঙে পড়ে। কার্নিভাল সেই আনন্দকে বৈধতা দেয়। বলে— কিছুদিনের জন্য হলেও, দেহ নিজের হবে। এই সাময়িক বৈধতাই ফুটবলে স্থায়ী হয়ে যায়। কারণ ফুটবল প্রতি সপ্তাহে ফিরে আসে। কার্নিভাল যেখানে বছরে একবার, ফুটবল সেখানে নিয়মিত। নিয়মিত এই কার্নিভালই ব্রাজিলীয় ফুটবলের মৌলিক চরিত্র।
এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি হয়। ইউরোপীয় ফুটবলে উৎসব আসে জয়ের পরে। ট্রফি তোলার পর। ব্রাজিলীয় ফুটবলে উৎসব খেলার ভেতরেই। জয় হোক বা না হোক, দেহ তার ভাষা বলবে। এই অবস্থান অনেক সময় ভুল বোঝা হয়। বলা হয়— এতে দায়িত্বহীনতা আছে। কিন্তু এই আনন্দ আসলে দায়িত্ব এড়ানো নয়; দায়িত্ব পুনর্নির্ধারণ। জোগা বনিটোর দায়িত্ব হলো— খেলা যেন দেহকে অপমান না করে। যে ভাবনার শিকড় কার্নিভালে। কার্নিভালে দেহ কাজের যন্ত্র নয়। দেহ নিজেই উদ্দেশ্য। ফুটবলে এই ধারণা, খেলোয়াড় আর কেবল কোচের পরিকল্পনার বাহক হয়ে থাকে না। সে নিজেই পরিকল্পনার অংশ হয়ে ওঠে। কখনো পরিকল্পনা ভাঙে, কখনো পরিকল্পনাকে বিস্তৃত করে। মনে রাখতে হয়, এ কিন্তু বিশৃঙ্খলা নয়। এক ধরনের ছন্দভাঙা, যা নতুন ছন্দ তৈরি করে। যেমন কার্নিভালে দেখা যায়— হঠাৎ কোনো নিয়ম ভেঙে গেলে উৎসব থামে না; উৎসব আরও উন্মুক্ত হয়। যা দেহের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। দেহ তো জানেই— ভুল করলে পৃথিবী ভেঙে পড়বে না। এই বিশ্বাস ছাড়া স্কিল জন্মায় না। স্কিল মানে শুধু দক্ষতা নয়; স্কিল মানে ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা।
কার্নিভালই এমন মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেয়। মুখোশের আড়ালে দেহ এমন কিছু করে, যা দৈনন্দিন জীবনে করতে সাহস পায় না। ফুটবলে মুখোশ নেই, কিন্তু একই সাহস কাজ করে। খেলোয়াড় জানে— এই মাঠে সে নিজের মতো হতে পারে।
এই স্বাধীনতার আরেকটি দিক আছে— সামষ্টিকতা। কার্নিভাল কখনো একার উৎসব নয়। এখানে দেহ একা নাচে না; দেহের সঙ্গে দেহ মেশে। এই সমষ্টিগত দোল ফুটবলে দলগত খেলায় রূপ নেয়। ব্রাজিলীয় ফুটবলে ব্যক্তিত্ব যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, সে কখনো সম্পূর্ণ একা নয়। তার ড্রিবলের পেছনে থাকে দলের ছন্দ। যা আলাদা করে শেখানো যায় না। পরিবেশ থেকে আসে। উঠোন, রাস্তা, উৎসব— সব মিলিয়ে দেহ শিখে নেয়, কখন এগোতে হবে, কখন থামতে হবে। এই কারণেই ব্রাজিলীয় ফুটবলকে পুরোপুরি পদ্ধতিতে বাঁধা যায় না। যতই আধুনিক প্রশিক্ষণ আসুক, দেহ পুরনো স্মৃতি ভুলে যায় না। কার্নিভালের স্মৃতি তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়— খেলা মানে কেবল কাজ নয়।
এর ফলে কখনো সমস্যাও তৈরি করে। বিশ্ব ফুটবল যখন ফলাফলকেন্দ্রিক হয়, তখন ব্রাজিলীয় আনন্দকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। বলা হয়— অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি। এই সন্দেহ থেকেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের দ্বন্দ্ব। কিন্তু এই মুহূর্তে বোঝা দরকার— কার্নিভাল ছাড়া জোগা বনিটো বোঝা অসম্ভব। কারণ জোগা বনিটো কোনো টেকনিক্যাল নীতি নয়। একটি নৈতিক ও আস্তিত্বিক অবস্থান। যা বলেই চলে— দেহকে ভুলে খেলো না। ভাবনাটা সহজে আসে না। এ দীর্ঘ ইতিহাসের ফল।
এই রূপান্তরের মধ্যেই ব্রাজিলীয় ফুটবলের বিশেষত্ব।
কার্নিভাল শেষ হয়। ফুটবল ম্যাচও শেষ হয়। কিন্তু যে ছাপ থেকে যায়, তা স্থায়ী। দেহ বুঝে নেয়— কীভাবে আনন্দকে অস্ত্র বানাতে হয়। কীভাবে প্রকাশকে রক্ষা করতে হয়। কীভাবে সাহসকে শোভায় পরিণত না করে দায়িত্বে রূপ দিতে হয়। এই শিক্ষাই পরবর্তী যুগে স্কিলে রূপ নেবে। যখন দেহ শুধু নাচবে না, সমস্যার সমাধানও দেবে। যখন আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হবে কার্যকারিতা।
স্কিল: অলংকার নয়— প্রয়োজনের নান্দনিকতা
স্কিলকে আমরা প্রায়ই অলংকার দক্ষতা বা ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ভাবি। মনে করি— খেলার মধ্যে বা শেষে যোগ হওয়া একটি বাড়তি সৌন্দর্য, যেমন ছবির ফ্রেম, গানের আলাপের শেষে তান, নাটকের শেষে আলোর ঝলক। এই ধারণাটা আরামদায়ক ও নিরাপদ, কিন্তু ভুল। কারণ ব্রাজিলীয় ফুটবলে স্কিল কোনো সংযোজন নয়। স্কিল হলো সূচনা। প্রয়োজনের প্রথম উত্তর।
দারিদ্র্যের ভেতর জন্মানো সমাজে কোনো কিছুরই বাড়তি জায়গা থাকে না। যা আছে, তা দরকারি। মাঠ অসমান, বল ভারী, জুতো সস্তা, শরীর ক্লান্ত— এই বাস্তবতায় ফুটবল খেলতে হলে দেহকে নিজের পথ নিজেকেই বানাতে হয়। এখানে কৌশল মানে পরিকল্পনা নয়; কৌশল মানে তাৎক্ষণিক সমাধান। স্কিল সেই সমাধানের ভাষা। ব্রাজিলীয় স্কিল ইউরোপীয় স্কিলের মতো নয়। ইউরোপে স্কিল শেখানো হয় শৃঙ্খলার ভেতরে। কখন ড্রিবল করা যাবে, কখন যাবে না— এই সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া থাকে। স্কিল সেখানে নিয়ন্ত্রিত। ব্রাজিলে স্কিল জন্মায় অনিয়মের ভেতর। কখন কী করতে হবে, তা পরিস্থিতি ঠিক করে। স্কিল এখানে স্বাধীন। যে স্বাধীনতা কোনো রোমান্টিক আদর্শ নয়। নিবিড় বাস্তবতার ফল। যেখানে জায়গা কম, সেখানে দেহ জায়গা তৈরি করে। যেখানে সময় কম, সেখানে দেহ সময় ছিনিয়ে নেয়। এই পদ্ধতিই স্কিল।
এইখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে— স্কিল কি শেখানো যায়? একাডেমিতে শেখানো স্কিল আর রাস্তায় জন্মানো স্কিল এক নয়। একাডেমি দেহকে ঠিক করে, ছাঁদে ফেলে। রাস্তা দেহকে বাঁচতে শেখায়। এই দুই শিক্ষার পার্থক্য ব্রাজিলীয় ফুটবলের ইতিহাসে গভীরভাবে কাজ করেছে। রাস্তায় খেলতে গেলে নিয়মের নিশ্চয়তা থাকে না। কখন গাড়ি আসবে, কখন ঝগড়া হবে, কখন আলো নিভে যাবে— কিছুই জানা নেই। এই অনিশ্চয়তা দেহকে প্রস্তুত রাখে। দেহ শিখে নেয়— সব পরিকল্পনা ভেঙে যেতে পারে। এই ভাঙন থেকেই স্কিল আসে। স্কিল এখানে ট্রিক নয়। ট্রিক দেখানোর জন্য জায়গা দরকার, সময় দরকার। স্কিল দরকার তখন, যখন জায়গা নেই, সময় নেই। এই পার্থক্য না-বুঝলে ব্রাজিলীয় ফুটবলের আত্মা ধরা পড়ে না।
এইখানে নৃত্যের সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক আবার ফিরে আসে। নাচে যেমন শরীর আগে জানে, পরে মন বোঝে, ফুটবলেও তাই। খেলোয়াড় অনেক সময় জানেই না, সে কী করেছে। দেহ করে ফেলেছে। এই দেহগত বুদ্ধি দীর্ঘ অনুশীলনের ফল, কিন্তু সেই জীবন-চর্যার অনুশীলন। তাই ব্রাজিলীয় স্কিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। একই পরিস্থিতিতে দুই খেলোয়াড় ভিন্ন সমাধান বের করে। কারণ তাদের দেহের স্মৃতি আলাদা। এই বৈচিত্র্য কোনো বিশৃঙ্খলা নয়। এক বহুস্বরিক শৃঙ্খলা। এর মধ্যেই ব্রাজিলীয় ফুটবল দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। দর্শক শুধু ফল দেখেন না। তিনি দেখেন— দেহ কীভাবে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এই দেখাটাই আনন্দের উৎস। যাকে অনেক সময় ভুলভাবে ‘ফ্লেয়ার’ বলা হয়। ফ্লেয়ার মানে বাহারি। কিন্তু ব্রাজিলীয় স্কিল বাহারি নয়; তা কার্যকর। একটি ‘এলাস্টিকো’ সুন্দর, কারণ সেটি কাজ করে। একটি ‘হিল-পাস’ আনন্দ দেয়, কারণ সেটিই তখন সেই মুহূর্তের সমাধান। সৌন্দর্য এখানে ফলাফল থেকে আলাদা নয়।
এই বাস্তববাদী নান্দনিকতাই ব্রাজিলীয় ফুটবলের মূল। এখানে সৌন্দর্য মানে অপ্রয়োজনীয় জিনিস যোগ করা নয়; সৌন্দর্য মানে অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দেওয়া। স্কিলের মাধ্যমে দেহ পরিস্থিতিকে সহজ করে। তার মধ্যেই আছে সাহস। কারণ সহজ সমাধান সবসময় নিরাপদ নয়। ঝুঁকি নিতে হয়। কিন্তু বেপরোয়া নয়। হিসেব করা ঝুঁকি। দেহের হিসেব।
ফলত বিজ্ঞান এসে পড়ে খুব স্বাভাবিকভাবে। দেহ যখন বলের গতি, প্রতিপক্ষের ভারসাম্য, নিজের অবস্থান— সব একসঙ্গে বিচার করে, তখন সে এক ধরনের তাৎক্ষণিক গণনা করে। এই গণনা কাগজে লেখা যায় না। এ অনুভূতির গণিত। এই গণিতই ব্রাজিলীয় ফুটবলকে আলাদা করে। ইউরোপীয় ফুটবল সংখ্যায় বিশ্বাস করে— পজেশন, পাসের সংখ্যা, দৌড়ের দূরত্ব। ব্রাজিলীয় ফুটবল বিশ্বাস করে মুহূর্তে। কখনো একটি মুহূর্তই পুরো ম্যাচ বদলে দেয়।
এই মুহূর্ত-নির্ণায়ক বিশ্বাসই স্কিলের জন্ম দেয়। কারণ স্কিল মুহূর্তের শিল্প। যে শিল্পের আরেকটি দিক হলো ভুলের সঙ্গে সম্পর্ক। ব্রাজিলীয় ফুটবলে ভুল লজ্জার বিষয় নয়। ভুল মানে পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছে। পরের পরীক্ষায় অন্য সমাধান আসবে। এই মানসিকতা ছাড়া স্কিল টিকে থাকে না। কারণ স্কিল সবসময় সফল হবে— এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর ফলেই স্কিল নৈতিকতার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। কোচ যদি খেলোয়াড়কে বলে— ভুল কোরো না— তাহলে স্কিল মরে যায়। দেহ সংকুচিত হয়। জোগা বনিটোর নৈতিকতা এখানে স্পষ্ট— ঝুঁকি নেওয়া তার ইতিহাসসিদ্ধ অধিকার। এই অধিকার কার্নিভাল দিয়েছে। ক্যাপোইরা শিখিয়েছে। ফুটবল তাকে বড়ো মঞ্চে সেই অধিকার দিয়েছে। এইখানে আমরা বুঝতে পারি— স্কিল কোনো একক খেলোয়াড়ের সম্পত্তি নয়। এ সাংস্কৃতিক সম্পদ। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যায়। কখনো নিখুঁত হয়ে, কখনো অসম্পূর্ণ হয়ে। আর এই অসম্পূর্ণতাই তো স্কিলকে জীবন্ত রাখে। কারণ সম্পূর্ণ স্কিল মানে স্থিরতা। স্থিরতা মানে মৃত্যু। ব্রাজিলীয় ফুটবল বারবার নিজের স্কিল নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কখনো কমায়, কখনো বাড়ায়। কখনো হারায়, কখনো ফিরে পায়। এই ওঠানামাই তার ইতিহাস।
এই পর্বে স্কিল কেবল প্রয়োজন নয়; এক অপরিহার্য পরিচয়। কিন্তু এই পরিচয় সামনে গিয়ে আরও পরীক্ষিত হবে। কারণ বিশ্ব ফুটবল বদলাচ্ছে। শৃঙ্খলা বাড়ছে। জায়গা কমছে। সময় কমছে। এই পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়ে স্কিলকে নতুনভাবে কথা বলতে হবে।
লিওনিদাস: আকাশে ওঠা দেহ ও ঝুঁকির অধিকার
কিছু মুহূর্ত ইতিহাসের মতো আচরণ করে না। তারা দলিল রেখে যায় না, নথি বানায় না, কোনো পরিষ্কার তত্ত্ব উপহার দেয় না। তারা হঠাৎ আসে— একটি দেহের ভেতর দিয়ে— এবং তারপর দীর্ঘদিন ধরে ব্যাখ্যা চায়। লিওনিদাস দা সিলভার আবির্ভাব তেমনই এক মুহূর্ত। ব্রাজিলীয় ফুটবলের ইতিহাসে তাঁর নাম কোনো পরিসংখ্যানের মারফত আসে না; বরং আসে এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের দরুন— দেহ কি মাটির সঙ্গেই বাঁধা থাকবে?
প্রশ্নটি শুনতে কাব্যিক লাগতে পারে। কিন্তু আদতে ঐতিহাসিক প্রশ্ন। কারণ ফুটবল দীর্ঘদিন ধরে দেহকে মাটির সঙ্গে শর্তবদ্ধ রেখেছিল। দৌড়াবে, লড়বে, ঠেলবে— সবই অনুভূমিক। খেলোয়াড়ের কল্পনাও ছিল অনুভূমিক। আক্রমণ এগোবে সামনে, পাস যাবে পাশে। শূন্যতা বা মাটি-হারানো আকাশে ভাসা সেখানে ছিল নিয়মের দুর্ঘটনা— বল লাফালে, মাথা উঠলে, গোলপোস্টমুখী উঁচ্চতায় উঠলে। লিওনিদাস সেই দুর্ঘটনাকে ইচ্ছায় রূপ দেন। ইউরোপীয় ফুটবলের অনুভূমিক খেলার বিপরীতে লিওনিদাস ফুটবলকে দিলেন উল্লম্ব সাহস। শরীর উল্টে, পিঠ দিয়ে বাতাস চিরে বল মারার মধ্যে ছিল এক ধরনের বিদ্রোহ— নিয়মের বিরুদ্ধে নয়, মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে। এ নিছক অ্যাক্রোবেটিক কৌশল নয়; এখানেই ব্রাজিলীয় ফুটবলের প্রথম বড়ো শিল্পঘোষণা।
বাইসাইকেল কিককে আমরা আজ প্রায় স্বাভাবিকভাবে দেখি। কিন্তু সেই সময় এই ভঙ্গি ছিল এক অদ্ভুত বিপ্লবী ঘোষণা। দেহ হঠাৎ উল্টে যায়, পা উঠে যায়, মাটি সরে যায়, আকাশ নেমে আসে। এই উল্টে যাওয়া কোনো কৌশলগত চাতুর্য নয়। সম্পূর্ণ দেহের কল্পনা। সেখানে দেহ বলছে— আমি শুধু সামনে এগোতে পারি না; আমি উপরে উঠতেও পারি। উপরে ওঠার সেই ইচ্ছার ভেতরে লুকিয়ে আছে দাসত্ব-উত্তর দেহের পুরনো স্মৃতি। যে দেহ দীর্ঘদিন নিচু থাকতে বাধ্য হয়েছে, সে জানে— নিচু থাকা কৌশল হতে পারে, কিন্তু চিরকাল নয়। একসময় দেহ নিজেই জানতে চায়— আমি কতটা উঁচুতে উঠতে পারি? লিওনিদাসের কিক সেই প্রশ্নের দৃশ্যমান-উত্তর শুধু নয়, প্রশ্নেরও দৃশ্যমানতা। যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফুটবল মাঠে যা দেখা যায়, তাই বৈধ। যা দেখা যায় না, তা সন্দেহজনক। লিওনিদাস আকাশে উঠে দেখিয়ে দেন— ঝুঁকি নেওয়া বৈধ। শুধু বৈধ নয়; প্রয়োজনীয়।
এই প্রয়োজনীয়তার কথা বুঝতে গেলে সময়টাকে একটু দেখতে হয়। ত্রিশের দশকের ব্রাজিল ফুটবল তখনও নিজের ভাষা পুরোপুরি খুঁজে পায়নি। ইউরোপীয় ছায়া রয়ে গেছে। নিয়ম, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা— সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের চাপানো সংযম কাজ করছিল। এই সংযমের ভেতরেই লিওনিদাস হঠাৎ এমন এক ভঙ্গি নিয়ে এলেন, যা কোনো ভাবনা-পাঠ্যতে ছিল না। এই পাঠ্য-বহির্ভূত আচরণই তাঁকে আলাদা করে।
কিন্তু এই আলাদা হওয়াকে আমরা ভুলভাবে কেবল নান্দনিক চমক বলে ধরে নিই। আসলে লিওনিদাসের সবচেয়ে বড়ো অবদান বাইসাইকেল কিক নয়। তাঁর অবদান ঝুঁকির অধিকার প্রতিষ্ঠা। তিনি মাঠে এমন কিছু করলেন, যা ব্যর্থ হতে পারত। এবং সেই ব্যর্থতার সম্ভাবনাকেই তিনি গ্রহণ করলেন। এর মধ্যেই জোগা বনিটোর নৈতিকতা জন্ম নিল আর প্রতিষ্ঠা পেল। কারণ সুন্দরভাবে খেলা মানে কেবল সফলভাবে খেলা নয়। সুন্দরভাবে খেলা মানে এমন কিছু চেষ্টা করা, যার ফল নিশ্চিত নয়। এই অনিশ্চয়তাকে স্বীকার না করলে সৌন্দর্য সম্ভব নয়। লিওনিদাস এই সত্যটাকে দেহ দিয়ে বললেন।
একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তনও ঘটে গেল। ফুটবল তখন আর শুধু ফলাফলের হিসেব থাকল না। ফুটবল হয়ে ওঠে সিদ্ধান্তের নৈতিকতা। কী চেষ্টা করা যাবে, কী করা যাবে না— এই প্রশ্নটা বদলে যায়। আগে যেখানে নিরাপত্তা ছিল মানদণ্ড, সেখানে সাহস জায়গা নিতে শুরু করে। কোনো বেপরোয়া উন্মাদনা নয়। দেহের সাহস। দেহ জানে— সবসময় মাটিতে থাকলে দেহও একসময় ভারী হয়ে যায়। কখনো কখনো দেহকে হালকা হতে হয়। লিওনিদাসের খেলায় তা-ই বারবার দেখা যায়। তিনি শুধু আকাশে ওঠেননি; তিনি খেলার ভারসাম্য বদলে দিয়েছিলেন। ডিফেন্ডাররা তখনো মাটির হিসেব করছিল। তারা জানত— কোথায় দাঁড়ালে বল আটকানো যাবে। কিন্তু লিওনিদাসের আকাশে ওঠা দেহ সেই হিসেবকে অকার্যকর করে দেয়। বিপরীত দিকে কার্যকর হয়ে গেল ব্রাজিলীয় স্কিলের প্রথম বৈশ্বিক ঘোষণা।
যা দেখাল, দেহ শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়। দেহ কল্পনাশীল। দেহ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয় না শুধু; পরিস্থিতি তৈরি করে। এই ধারণা ফুটবলের জন্য বিপ্লবী। কারণ এতদিন পর্যন্ত ফুটবল-কৌশল মানে ছিল— পরিস্থিতির সর্বোচ্চ ব্যবহার। লিওনিদাস দেখালেন— পরিস্থিতির বাইরে গিয়েও কিছু করা যায়। তাতে ঝুঁকি আছে। ব্যর্থতার ঝুঁকি। হাসির ঝুঁকি। অপমানের ঝুঁকি। কিন্তু দাসত্ব-উত্তর সমাজে অপমান নতুন কিছু নয়। নতুন ছিল সম্মানের অনুভব। লিওনিদাস সেই সম্মানের একটি নতুন রাস্তা দেখালেন— সাহসী হওয়া। আবার দেহের ইতিহাস ফিরে আসে। যে দেহ দীর্ঘদিন অন্যের চোখে মূল্যায়িত হয়েছে, সে একসময় নিজেই নিজের মানদণ্ড বানাতে চায়। লিওনিদাস সেই মানদণ্ড বানানোর অংশ। এই কারণে তাঁর খেলাকে আলাদা করে ‘স্টাইল’ বলা যায় না। তা অবস্থান। তিনি বললেন— আমি এই খেলাটা এভাবেই খেলব। ফল যাই হোক। এই অবস্থান পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দিশা হয়ে ওঠে। কারণ এখান থেকেই ব্রাজিলীয় ফুটবলে ব্যর্থতার ধারণা বদলায়। ব্যর্থতা আর লজ্জার বিষয় থাকে না। ব্যর্থতা হয়ে ওঠে পথের অংশ।
এই মানসিক পরিবর্তন ছাড়া স্কিল কখনোই বিকশিত হতে পারে না। কারণ স্কিল মানেই এমন কিছু করা, যার সাফল্য নিশ্চিত নয়। লিওনিদাস সেই অনিশ্চয়তাকে বৈধতা দিলেন। বিশাল গুরুত্বের সঙ্গে। কারণ দারিদ্র্যের সমাজে ভুল করার সুযোগ খুব কম। একবার ভুল মানে বড়ো ক্ষতি। কিন্তু খেলায় যদি ভুল করার জায়গা তৈরি হয়, তাহলে দেহ সেখানে নিজের সীমা পরীক্ষা করতে পারে। ফুটবল সেই পরীক্ষার জায়গা হয়ে ওঠে। সেই পরীক্ষার প্রথম দৃশ্যমান উদাহরণ লিওনিদাস।
ফলে লিওনিদাসকে শুধু একজন স্ট্রাইকার হিসেবে পড়লে ভুল হবে। তিনি ছিলেন এক ধরনের সেতু। পুরনো সংযমী ফুটবল আর ভবিষ্যতের মুক্ত স্কিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক দেহ। এক সেতুবন্ধনকারী। কাজটা সহজ ছিল না। কারণ দুই দিক থেকেই চাপ আসে। একদিকে বলা হয়— এটা অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি। অন্যদিকে বলা হয়— এটাই ফুটবলের ভবিষ্যৎ। লিওনিদাস এই দুই চাপের মাঝখানে খেলেছেন। এর মধ্যে খেলাতেই তাঁর গুরুত্ব। লিওনিদাসের আকাশে ওঠা দেহ কোনো স্থায়ী উল্লাস নয়। এ তো ক্ষণিক। কিকের মুহূর্তে দেহ আকাশে থাকে, তারপর আবার মাটিতে ফিরে আসে। এই ফিরে আসাটা-ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তা বলে— সাহস মানে বাস্তবতা থেকে পালানো নয়। সাহস মানে বাস্তবতার সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক তৈরি করা। এই নতুন সম্পর্কের নামই জোগা বনিটো। জোগা বনিটো মানে এখানে শুধু সুন্দর খেলা নয়। মানে— খেলা যেন দেহের সম্ভাবনাকে ছোটো না করে। দেহ যদি আকাশে উঠতে চায়, তাকে সেই সুযোগ দিতে হবে। এই সুযোগ দেওয়া এক নৈতিক, এমনকি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত-ও।
য়েখান থেকেই ব্রাজিলীয় ফুটবল একটু একটু করে বদলে যায়। স্কিল তখন আর লুকিয়ে করার জিনিস থাকে না। স্কিল প্রকাশ পায়। এবং এই প্রকাশ পায় বলেই দর্শক নতুনভাবে খেলা দেখতে শেখে। দর্শক তখন শুধু গোল গণনা করে না। দর্শক দেখে— কীভাবে গোল করা হলো। এই ‘কীভাবে’-র প্রশ্নটাই নান্দনিকতার জন্ম দেয়। যা কোনো শৌখিন বিলাস নয়। যা দেহের সম্মানের প্রশ্ন। দাসত্ব-উত্তর সমাজে দেহকে সম্মান দেওয়া সহজ নয়। ফুটবল সেই সম্মানের এক অদ্ভুত মঞ্চ হয়ে গেল। লিওনিদাস সেই মঞ্চের প্রথম দেবতুল্য কুশীলব, যিনি দেখালেন— দেহ কেবল কাজ করে না; দেহ কল্পনাও করে। এই কল্পনার ধারাবাহিকতাই পরবর্তী যুগে আরও গভীর হবে। লিওনিদাস আকাশে উঠেছিলেন একবার। পরবর্তী প্রজন্ম শিখবে আকাশে থাকার ভাষা। স্কিল তখন আর বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত হয়ে থাকবে না; হয়ে উঠবে ধারাবাহিক চিন্তা। এই চিন্তার নামই পূর্ণতা। তবু সেখানে পৌঁছানোর আগে ফুটবলকে আরও কিছু শিখতে হবে। কেবল সাহস থাকলেই চলবে না; দরকার হবে বুদ্ধি। কেবল ঝুঁকি থাকলেই চলবে না; দরকার হবে নিয়ন্ত্রণ।
সেই গল্পই পরের পর্বের বিষয়।
(চলবে…)
### ড. অনিশ রায়

