অনিশ রায়
আমরা আসলে কেউ কথা বলছি না।
অনেকদিন হলো শব্দেরা
তাদের অর্থ হারিয়ে ফেলেছে—
শুধু মুখের কাছে এসে
মৃতপ্রায় মাছির মতো ভনভন করে কিছুক্ষণ,
তারপর আবর্জনার অন্ধকারে পড়ে যায়।
আমরা কেউ কাউকে শুনছি না।
শোনার জন্য যে নীরবতা লাগে,
সে বহুদিন আগে
শহরের কোনো পুরোনো গলিতে
ধুলো হয়ে উড়ে গেছে।
আমরা— কথার পোশাক পরিয়ে
নিজেদের ঘৃণা, ভয়, ক্ষুধা আর ক্ষত
একে অপরের দিকে ছুঁড়ে দিই।
প্রতিদিন নতুন নতুন অস্ত্র আবিষ্কার হয়;
চোখের ভেতর,
ঠোঁটের কোণে,
হাত মেলানো উষ্ণ বিনয়ের নিচে
অনেক গোপন আস্তিন লুকিয়ে থাকে।
আমি হয়তো মনে মনে ভাবি—
আমার উর্বরতা তোমার চেয়ে বেশি,
আমার আকাশ অনেকটা উঁচু,
আমার আলো অনেক উজ্জ্বল।
আমার বাড়ি আর ইন্টেরিয়র যেমন।
আর তুমি হয়তো
আড়চোখে আমার সমস্ত পতনের মানচিত্র এঁকে
নিজেকে নিঃশব্দে সান্ত্বনা দাও।
দুর্দান্ত প্রতিযোগিতা!
ক্ষুদ্র এক ছিদ্র ছিল—
হয়তো কোনোদিন সূঁচের মতো;
ক্রমে বড়ো হতে হতে
এক অদৃশ্য জাল হয়ে গেছে।
এখন আমরা সবাই
সেই জালের ভিতরে হাত দিয়ে
তাদের অপরাধের ফসিল খুঁজি
অব্যর্থ অপরিহার্য উৎসাহে।
অথচ কোথাও তাই
কোনো ক্লান্ত প্রাণ নেই,
কোনো দারুচিনি-বিকেল নেই,
নেই কোনো ঘাসের ভেতর
শিশির জমে ওঠার নৈঃশব্দটুকুও।
শুধু রোদ আসে—
মাটির গায়ে হাত রেখে
আবার চলে যায়।
আর সেই রোদের নিচে
আমরা ঝলসে উঠি;
আরও উজ্জ্বল, আরও সতেজ হয়ে
রাতের গোপন শরীরের পাশে গিয়ে দাঁড়াব বলে।
আমলকির পাতা ঝরে পড়ে।
চারদিকে ঝকঝকে কাচের দেয়াল,
কফিশপে মানুষের আনাগোনা বাড়ে;
নোনা জল আরও ঘন হয়—
অনেক আঠালো চিৎকার
ধীরে ধীরে বাতাসে জমাট বাঁধে।
তবু বিশ্বাস করো—
আমি কোনো কথা শুনিনি।
তোমরা কি সত্যিই কথা বলছো?
কিছু বলতে চাও?
আমি হাজার বছর ধরে
অন্তহীন পথের ভিতর দিয়ে হেঁটে এসেছি।
একটা কথা শোনার জন্য৷
অনেক মৃত নক্ষত্রের নিচে,
অনেক শীতের কুয়াশা পেরিয়ে,
অনেক মানুষের মুখ ভুলে গিয়ে।
পাখির নীড়ের শান্তি নয়,
কোনো শঙ্খমালার রূপও নয়—
কোনো কমলা রঙের রোদের আশাও নয়—
শুধু কেউ
নীরব কথার উষ্ণতা দেবে।
যার হয়তো কোনো শব্দ নেই,
কোনো উচ্চারণ নেই—
শুধু
একটুখানি আলো থাকে।
নিদ্রাহীন অক্লান্ত আমি
সেই কথার নরম আলো মেখে,
অন্ধকারে বাকি জীবনটুকু
ক্লান্তি জড়িয়ে ঘুমিয়ে যেতে চাই।
১৪/৭/২০২৪

