অধ্যায় : প্রকৃতি ও প্রত্যয়

১. ভূমিকা

বাংলা ভাষায় নতুন শব্দ গঠনের নানা পদ্ধতি রয়েছে। সমাস, সন্ধি, উপসর্গযোগ, প্রত্যয়যোগ প্রভৃতি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এদের প্রত্যেকটির কাজ ও গঠনপদ্ধতি আলাদা হলেও ভাষার শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে প্রত্যয়ের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

একটি ভাষার প্রকাশক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার শব্দভাণ্ডারের বৈচিত্র্যের উপর। নতুন ভাব, বস্তু, গুণ, ব্যক্তি, পেশা, সম্পর্ক, অবস্থা, ক্রিয়া কিংবা বিমূর্ত ধারণা প্রকাশের জন্য ভাষাকে প্রতিনিয়ত নতুন শব্দ তৈরি করতে হয়। এই শব্দগঠন-প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান উপায় হল প্রকৃতির সঙ্গে প্রত্যয়ের সংযোগ

যেমন—

  • লাজ + উক = লাজুক
  • বড় + আই = বড়াই
  • ঘর + আমি = ঘরামি
  • পড়্ + উয়া = পড়ুয়া
  • নাচ্ + উনে = নাচুনে
  • জিত্ + আ = জিতা
  • ধন + ঈ = ধনী
  • বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব
  • মধুর + তা = মধুরতা

এখানে মূল অংশের সঙ্গে একটি অতিরিক্ত অংশ যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ তৈরি হয়েছে। এই অতিরিক্ত অংশই প্রত্যয়।


২. প্রত্যয় কী?

শব্দ বা ধাতুর পরে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি, তাকে প্রত্যয় বলে।

সহজ সূত্র—

প্রকৃতি/ধাতু + প্রত্যয় → নতুন শব্দ

যেমন—

  • চল্ + আ = চলা
  • দেশ + ঈ = দেশী
  • লাজ + উক = লাজুক
  • বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব

এখানে ‘আ’, ‘ঈ’, ‘উক’, ‘ত্ব’—প্রত্যয়।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মত

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, ধাতু বা শব্দের পরে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি যুক্ত হয়ে শব্দ প্রস্তুত হয়, তাকে প্রত্যয় বলা হয়।

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মত

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, যা ধাতুর পরে যুক্ত হয়ে নামশব্দ বা নতুন ধাতু গঠন করে কিংবা নামশব্দের পরে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে প্রত্যয় বলা হয়।

এই সংজ্ঞাগুলির মূল কথা একটিই—

প্রত্যয় নিজে স্বাধীন শব্দ নয়; প্রকৃতি বা ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠনে সাহায্য করে।


৩. প্রত্যয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য

প্রত্যয়—

১. সাধারণত শব্দ বা ধাতুর পরে বসে।
২. নতুন শব্দ গঠনে সাহায্য করে।
৩. প্রত্যয় যুক্ত হলে শব্দের অর্থ, পদশ্রেণি বা শব্দের প্রকৃতি পরিবর্তিত হতে পারে।
৪. প্রত্যয় নিজে সাধারণত স্বাধীন অর্থবাহী শব্দ নয়।
৫. প্রত্যয়-সাধিত শব্দের মূল অংশকে প্রসঙ্গভেদে প্রকৃতি বলা হয়।
৬. ধাতুর সঙ্গে যুক্ত প্রত্যয়কে কৃৎ-প্রত্যয় এবং নামপ্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যয়কে তদ্ধিত-প্রত্যয় বলা হয়।


৪. প্রাতিপদিক কী?

বিভক্তিহীন নামশব্দকে প্রাতিপদিক বলে।

অর্থাৎ যে নামশব্দের সঙ্গে কোনো বিভক্তি যুক্ত নেই এবং যা নামপদের মূল রূপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, তাকে প্রাতিপদিক বলা হয়।

যেমন—

  • হাত
  • ঘর
  • দেশ
  • লাজ
  • বড়
  • বন্ধু
  • মিঠা

‘ঘরকে’ শব্দে ‘কে’ বিভক্তি যুক্ত হয়েছে; তাই ‘ঘর’ হল তার প্রাতিপদিক।

গুরুত্বপূর্ণ কথা

প্রাতিপদিক ও প্রকৃতি এক জিনিস নয়, যদিও অনেক ক্ষেত্রে একই শব্দ উভয় ভূমিকা পালন করতে পারে।

যেমন—

ঘর + আমি = ঘরামি

এখানে ‘ঘর’ একটি প্রাতিপদিক এবং একই সঙ্গে ‘ঘরামি’ শব্দটির প্রকৃতি।


৫. ধাতু বা ক্রিয়ামূল

ক্রিয়াপদের মূল অংশকে ধাতু বা ক্রিয়ামূল বলে।

যেমন—

  • পড়্
  • লিখ্
  • কর্
  • চল্
  • নাচ্
  • জিত্
  • খা
  • দে
  • যা
  • গাহ্
  • কৃ

ধাতুকে চিহ্নিত করার জন্য সাধারণত  চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।

যেমন—

  • √পড়্
  • √লিখ্
  • √কর্
  • √নাচ্
  • √জিত্

‘পড়ো’, ‘পড়বে’, ‘পড়ছি’, ‘পড়েছিলাম’, ‘পড়েছি’ ইত্যাদি ক্রিয়ার বিভিন্ন রূপের মূল হল পড়্ ধাতু।


৬. প্রকৃতি কী?

ধাতু বা প্রাতিপদিকের সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে নতুন শব্দ গঠিত হয়, সেই নতুন শব্দের মূল অংশকে প্রকৃতি বলা হয়।

সহজভাবে—

প্রত্যয়সাধিত শব্দের মূল অংশ = প্রকৃতি

যেমন—

  • লাজ + উক = লাজুক
  • বড় + আই = বড়াই
  • ঘর + আমি = ঘরামি
  • পড়্ + উয়া = পড়ুয়া
  • নাচ্ + উনে = নাচুনে
  • জিত্ + আ = জিতা

এখানে—

  • লাজ = প্রকৃতি
  • বড় = প্রকৃতি
  • ঘর = প্রকৃতি
  • পড়্ = প্রকৃতি
  • নাচ্ = প্রকৃতি
  • জিত্ = প্রকৃতি

প্রকৃতি সম্পর্কে একটি সূক্ষ্ম বিষয়

‘লাজ’, ‘ঘর’, ‘বড়’, ‘পড়্’ ইত্যাদি শব্দকে সব অবস্থায় প্রকৃতি বলা যায় না। কোনো প্রত্যয়সাধিত শব্দ বিশ্লেষণ করার সময় তার মূল অংশটি প্রকৃতি হিসেবে চিহ্নিত হয়।

অতএব—

প্রকৃতি একটি সম্পর্কনির্ভর ব্যাকরণিক ধারণা।


৭. প্রকৃতি কত প্রকার?

প্রধানত দুই প্রকার—

১. নামপ্রকৃতি

প্রাতিপদিক বা নামশব্দের সঙ্গে তদ্ধিত প্রত্যয় যুক্ত হলে সেই মূল নামশব্দকে নামপ্রকৃতি বলা হয়।

যেমন—

  • লাজ + উক = লাজুক
  • বড় + আই = বড়াই
  • ঘর + আমি = ঘরামি

এখানে ‘লাজ’, ‘বড়’, ‘ঘর’ নামপ্রকৃতি।

২. ক্রিয়াপ্রকৃতি

ধাতুর সঙ্গে কৃৎ-প্রত্যয় যুক্ত হলে সেই ধাতুকে ক্রিয়াপ্রকৃতি বলা হয়।

যেমন—

  • √পড়্ + উয়া = পড়ুয়া
  • √নাচ্ + উনে = নাচুনে
  • √জিত্ + আ = জিতা

এখানে ‘পড়্’, ‘নাচ্’, ‘জিত্’ ক্রিয়াপ্রকৃতি।


৮. প্রত্যয়ের প্রধান শ্রেণিবিভাগ

বাংলা ব্যাকরণে প্রত্যয়কে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়—

১. কৃৎ-প্রত্যয়

ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়।

২. তদ্ধিত-প্রত্যয়

নামপ্রকৃতি বা প্রাতিপদিকের সঙ্গে যুক্ত হয়।

অতএব—

ধাতু + কৃৎ-প্রত্যয় = কৃদন্ত শব্দ

নামপ্রকৃতি + তদ্ধিত-প্রত্যয় = তদ্ধিতান্ত শব্দ


৯. কৃৎ-প্রত্যয়

ধাতুর পরে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে কৃৎ-প্রত্যয় বলে।

যেমন—

  • √পড়্ + উয়া = পড়ুয়া
  • √নাচ্ + উনে = নাচুনে
  • √জিত্ + আ = জিতা
  • √চল্ + অন্ত = চলন্ত
  • √কাঁদ্ + অন = কাঁদন
  • √লড়্ + আই = লড়াই

কৃৎ-প্রত্যয়যুক্ত শব্দকে কৃদন্ত পদ/শব্দ বলা হয়।


১০. কৃদন্ত পদ

ধাতুর সঙ্গে কৃৎ-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে নামপদ বা বিশেষণপদ গঠিত হয়, তাকে কৃদন্ত পদ বলে।

যেমন—

  • পড়ুয়া
  • নাচুনে
  • জিতা
  • চলন্ত
  • কাঁদন
  • লড়াই
  • লেখক
  • পাঠক
  • করণীয়
  • কর্তব্য

সতর্কতা

কৃৎ-প্রত্যয় যোগে সব সময় একই ধরনের পদ হয় না। প্রসঙ্গ অনুযায়ী বিশেষ্য, বিশেষণ ইত্যাদি গঠিত হতে পারে।


১১. তদ্ধিত-প্রত্যয়

নামপ্রকৃতি বা প্রাতিপদিকের পরে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে তদ্ধিত-প্রত্যয় বলে।

যেমন—

  • লাজ + উক = লাজুক
  • বড় + আই = বড়াই
  • ঘর + আমি = ঘরামি
  • দেশ + ঈ = দেশী
  • বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব
  • মধুর + তা = মধুরতা

তদ্ধিত-প্রত্যয়যুক্ত শব্দকে তদ্ধিতান্ত পদ/শব্দ বলা হয়।


১২. তদ্ধিতান্ত পদ

নামপ্রকৃতির সঙ্গে তদ্ধিত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে নতুন শব্দ তৈরি হয়, তাকে তদ্ধিতান্ত পদ বলে।

যেমন—

  • লাজুক
  • বড়াই
  • ঘরামি
  • ধনী
  • দেশী
  • বন্ধুত্ব
  • গুরুত্ব
  • মধুরতা
  • রাজকীয়
  • বৈজ্ঞানিক

১৩. কৃৎ ও তদ্ধিতের পার্থক্য

বিষয়কৃৎ-প্রত্যয়তদ্ধিত-প্রত্যয়
যার সঙ্গে যুক্ত হয়ধাতুনামপ্রকৃতি/প্রাতিপদিক
ফলকৃদন্ত শব্দতদ্ধিতান্ত শব্দ
উদাহরণ√পড়্ + উয়া = পড়ুয়াঘর + আমি = ঘরামি
আরেকটি উদাহরণ√চল্ + অন্ত = চলন্তবন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব
চিহ্ন√ ব্যবহার করা হয়সাধারণত √ নয়

মনে রাখার সূত্র

ধাতু দেখলে—কৃৎ।

নামশব্দ দেখলে—তদ্ধিত।


১৪. বাংলা ভাষায় প্রত্যয়ের বিস্তৃত শ্রেণি

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত প্রত্যয়ের উৎস বিচার করলে প্রধানত—

১. বাংলা কৃৎ-প্রত্যয়
২. সংস্কৃত কৃৎ-প্রত্যয়
৩. বাংলা তদ্ধিত-প্রত্যয়
৪. সংস্কৃত তদ্ধিত-প্রত্যয়
৫. বিদেশি উৎসজাত প্রত্যয়/প্রত্যয়সদৃশ শব্দাংশ

পাওয়া যায়।


১৫. বাংলা কৃৎ-প্রত্যয়

বাংলা ভাষার নিজস্ব কৃৎ-প্রত্যয়গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

অ, আ, অন, অনা, অক, আই, উ, উয়া, উক, ই, ইয়া/ইয়ে, আল, তি, না, আনি, আরু/আরি, আও, আন/আনো, অল, আইত, অন্ত, তা, অত প্রভৃতি।

এগুলি বিভিন্ন অর্থ ও শব্দগঠন-প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়।


১৫.১ অ-প্রত্যয়

কিছু ক্ষেত্রে অ-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে প্রবণতা, অসম্পূর্ণতা বা পুনরুক্তির ভাব প্রকাশ করে; ঐতিহাসিকভাবে এ ক্ষেত্রে দ্বিত্ব বা ধ্বনিগত পরিবর্তন দেখা যায়।

যেমন—

  • √কাঁদ্ + অ → কাঁদ-কাঁদ
  • √মর্ + অ → মরমর
  • √পড়্ + অ → পড়ো-পড়ো
  • √মার্ + অ → মার-মার

দ্রষ্টব্য

এ ধরনের উদাহরণে আধুনিক বানান ও উচ্চারণ সব ক্ষেত্রে প্রত্যয়ের সরাসরি দৃশ্যমান রূপ বজায় রাখে না।


১৫.২ আ-প্রত্যয়

ধাতুর সঙ্গে ‘আ’ যুক্ত হয়ে বহু নামপদ, বিশেষণ বা ক্রিয়ারূপ গঠিত হয়।

যেমন—

  • √ঝর্ + আ = ঝরা
  • √হাস্ + আ = হাসা
  • √খা + আ = খাওয়া
  • √শোন্ + আ = শোনা
  • √ভর্ + আ = ভরা
  • √কাঁচ্ + আ = কাঁচা
  • √কাট্ + আ = কাটা
  • √মর্ + আ = মরা
  • √ছাড়্ + আ = ছাড়া
  • √জান্ + আ = জানা
  • √দেখ্ + আ = দেখা
  • √ফুট্ + আ = ফোটা

১৫.৩ অন-প্রত্যয়

অন-প্রত্যয় সাধারণত ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য গঠনে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √বাঁধ্ + অন = বাঁধন
  • √সাজ্ + অন = সাজন
  • √হাঁট্ + অন = হাঁটন
  • √মর্ + অন = মরণ
  • √নাচ্ + অন = নাচন
  • √মাজ্ + অন = মাজন
  • √গড়্ + অন = গড়ন
  • √জীব্ + অন = জীবন
  • √কাঁদ্ + অন = কাঁদন
  • √ফল্ + অন = ফলন
  • √যোগ্ + অন = যোগান

আ-কারান্ত ধাতুতে ধ্বনিগত পরিবর্তন দেখা যায়—

  • খা + অন → খাওন
  • দে + অন → দেওন

১৫.৪ অক-প্রত্যয়

অক-প্রত্যয়ে বহু বিশেষ্যপদ গঠিত হয়।

যেমন—

  • √মুড়্ + অক = মোড়ক
  • √ঝল্ + অক = ঝলক
  • √ফাট্ + অক = ফাটক
  • √নাট্ + অক = নাটক
  • √ঘট্ + অক = ঘটক
  • √বৈঠ্ + অক = বৈঠক
  • √চট্ + অক = চটক
  • √দুল্ + অক = দোলক

১৫.৫ আই-প্রত্যয়

আই-প্রত্যয়ে সাধারণত কাজ, প্রক্রিয়া বা ভাববাচক বিশেষ্য গঠিত হয়।

যেমন—

  • √ফাড়্ + আই = ফাড়াই
  • √ছাঁট্ + আই = ছাঁটাই
  • √যাচ্ + আই = যাচাই
  • √খোদ্ + আই = খোদাই
  • √ঢাল্ + আই = ঢালাই
  • √মাড়্ + আই = মাড়াই
  • √সিল্ + আই = সেলাই
  • √লড়্ + আই = লড়াই
  • √চড়্ + আই = চড়াই

১৫.৬ উয়া-প্রত্যয়

কর্তৃবাচক অর্থে ব্যক্তি বা কর্তার পরিচয় দিতে উয়া-প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √পড়্ + উয়া = পড়ুয়া
  • √চল্ + উয়া = চলুয়া
  • √হাল্ + উয়া = হালুয়া
  • √সাজ্ + উয়া = সাজুয়া
  • √উড়্ + উয়া = উড়ুয়া

কিছু ক্ষেত্রে ধ্বনিগত পরিবর্তনে—

  • উড় + ও → উড়ো
  • ঝড় + উয়া → ঝড়ো

ইত্যাদি রূপ পাওয়া যায়।


১৫.৭ উ-প্রত্যয়

উ-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বিশেষ্য বা বিশেষণ গঠিত হতে পারে।

যেমন—

  • √ঢাল্ + উ = ঢালু
  • √ডাক্ + উ = ডাকু
  • √ঝাড়্ + উ = ঝাড়ু
  • √চাল্ + উ = চালু
  • √উড়্ + উ = উড়ু
  • √ডুব্ + উ = ডুবু

১৫.৮ উক-প্রত্যয়

স্বভাব, প্রবণতা বা কোনো গুণবিশিষ্ট ব্যক্তি বোঝাতে উক-প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √মিশ্ + উক = মিশুক
  • √হিংস্ + উক = হিংসুক
  • √ভা + উক = ভাবুক
  • √খা + উক = খাউক
  • √পিট্ + উক → পেটুক

১৫.৯ ই-প্রত্যয়

ই-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বিভিন্ন নামপদ বা ক্রিয়াজাত পদ তৈরি হতে পারে।

যেমন—

  • √হাস্ + ই = হাসি
  • √কর্ + ই = করি
  • √বুল্ + ই = বুলি
  • √বেড়্ + ই = বেড়ি
  • √হাঁচ্ + ই = হাঁচি
  • √খা + ই = খাই
  • √ভাজ্ + ই = ভাজি

এখানে মনে রাখতে হবে—সব ‘ই’ শেষাংশকে একই প্রকৃতির প্রত্যয় বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ক্রিয়ারূপ ও শব্দগঠন—দুই ক্ষেত্রেই ‘ই’ দেখা যেতে পারে; বিশ্লেষণের সময় শব্দটির গঠন ও ব্যাকরণিক ভূমিকা বিচার করতে হবে।


১৫.১০ ইয়া/ইয়ে-প্রত্যয়

কর্তৃবাচক অর্থে বা অসমাপিকা ক্রিয়ারূপে ইয়া/ইয়ে দেখা যায়।

কর্তৃবাচক অর্থে

  • √বাজ্ + ইয়ে = বাজিয়ে
  • √খেল্ + ইয়ে = খেলিয়ে
  • √গাহ্ + ইয়া → গাইয়ে
  • √নাচ্ + ইয়ে = নাচিয়ে
  • √লিখ্ + ইয়ে = লিখিয়ে

অসমাপিকা ক্রিয়ায়

  • √পড়্ + ইয়া = পড়িয়া
  • √বহ্ + ইয়া = বহিয়া
  • √চল্ + ইয়া = চলিয়া
  • √কাঁদ্ + ইয়া = কাঁদিয়া
  • √হাস্ + ইয়া = হাসিয়া
  • √শুন্ + ইয়া = শুনিয়া

১৫.১১ আল-প্রত্যয়

আল-প্রত্যয়ে কর্তা, গুণ বা সংশ্লিষ্ট অর্থে শব্দ গঠিত হয়।

যেমন—

  • √রাখ্ + আল = রাখাল
  • √মাত্ + আল = মাতাল
  • √বাচ্ + আল = বাচাল
  • √ধার্ + আল = ধারাল
  • √নাগ্ + আল = নাগাল
  • √মিশ্ + আল = মিশাল

১৫.১২ তি-প্রত্যয়

যেমন—

  • √চল্ + তি = চলতি
  • √ফির্ + তি = ফিরতি
  • √উঠ্ + তি = উঠতি
  • √ঘাট্ + তি = ঘাটতি
  • √বস্ + তি = বসতি
  • √বাড়্ + তি = বাড়তি
  • √কাট্ + তি = কাটতি

১৫.১৩ না-প্রত্যয়

যেমন—

  • √শুক্ + না = শুকনা
  • √বাট্ + না = বাটনা
  • √দুল্ + না = দোলনা
  • √ঝর্ + না = ঝরনা
  • √রাঁধ্ + না → রান্না
  • √ঢাক্ + না = ঢাকনা
  • √খেল্ + না = খেলনা
  • √মাগ্ + না = মাগনা

১৫.১৪ আনি-প্রত্যয়

যেমন—

  • √রাঙ্ + আনি = রাঙানি
  • √খাট্ + আনি → খাটুনি
  • √শাস্ + আনি = শাসানি
  • √চির্ + আনি → চিরুনি
  • √শুন্ + আনি = শুনানি
  • √জ্বাল্ + আনি = জ্বালানি
  • √উড়্ + আনি = উড়ানি
  • √হাঁপ্ + আনি = হাঁপানি

১৫.১৫ আরু/আরি/আরী-প্রত্যয়

কর্তার দক্ষতা, পেশা বা কাজের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √ডুব্ + আরু = ডুবুরি
  • √সাঁত্ + আরু = সাঁতারু
  • √খোঁজ্ + আরু = খোঁজারু
  • √ধুন্ + আরী = ধুনারী
  • পূজা + আরী = পূজারী
  • ভিখ্ + আরী = ভিখারী
  • শাঁখ্ + আরী = শাঁখারী

১৫.১৬ আও-প্রত্যয়

যেমন—

  • √বাঁচ্ + আও = বাঁচাও
  • √দুল্ + আও → দোলাও/দুলাও
  • √চড়্ + আও = চড়াও
  • √ঘির্ + আও = ঘিরাও
  • √সর্ + আও = সরাও
  • √পাকড়্ + আও = পাকড়াও

১৫.১৭ আন/আনো-প্রত্যয়

প্রযোজক বা causative অর্থে ‘আন’/‘আনো’ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন—

  • √জান্ + আনো = জানানো
  • √শুন্ + আনো = শোনানো
  • √ভাস্ + আনো = ভাসানো
  • √চাল্ + আন = চালান/চালানো
  • √মান্ + আন = মানান/মানানো
  • √নাচ্ + আনো = নাচানো
  • √বাঁধ্ + আনো = বাঁধানো
  • √কাঁদ্ + আনো = কাঁদানো
  • √দৌড়্ + আনো = দৌড়ানো
  • √দেখ্ + আন = দেখান
  • √খা + আন = খাওয়ান

১৫.১৮ অল-প্রত্যয়

যেমন—

  • √পিছ্ + অল = পিছল
  • √ফাট্ + অল = ফাটল
  • √জী + অল → জীয়ল/জীওল

১৫.১৯ আইত-প্রত্যয়

ঐতিহাসিকভাবে কিছু শব্দে আইত/আত ধরনের গঠন দেখা যায়।

যেমন—

  • √ডাক্ + আইত → ডাকাইত → ডাকাত
  • √সঙ্গ্ + আইত → সাঙ্গাইত → সাঙ্গাত
  • √সেব্ + আইত = সেবাইত

১৫.২০ অন্ত-প্রত্যয়

বর্তমান বা চলমান কর্ম বোঝাতে বিশেষণধর্মী পদ গঠনে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √চল্ + অন্ত = চলন্ত
  • √ডুব্ + অন্ত = ডুবন্ত
  • √ঝুল্ + অন্ত = ঝুলন্ত
  • √ঘুম্ + অন্ত = ঘুমন্ত
  • √ফুট্ + অন্ত = ফুটন্ত
  • √উড়্ + অন্ত = উড়ন্ত

১৫.২১ তা-প্রত্যয়

বিশেষণধর্মী রূপে কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √পড়্ + তা = পড়তা
  • √চল্ + তা = চলতা
  • √ফির্ + তা = ফিরতা

এ ধরনের অনেক শব্দ আধুনিক বাংলায় সীমিত বা ঐতিহাসিক ব্যবহারে রয়েছে; তাই প্রচলিত শব্দের সঙ্গে অপরিচিত রূপকে এক কাতারে না রাখাই শ্রেয়।


১৫.২২ অনা-প্রত্যয়

বিশেষ্যপদ গঠনে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √বাজ্ + অনা = বাজনা
  • √মাগ্ + অনা = মাগনা
  • √ঝর্ + অনা = ঝরনা
  • √খেল্ + অনা = খেলনা
  • √বঞ্চ্ + অনা = বঞ্চনা
  • √দুল্ + অনা = দোলনা

১৫.২৩ অত-প্রত্যয়

কিছু বিশেষণ বা বিশেষ্যধর্মী শব্দে অত-জাত প্রত্যয় দেখা যায়।

যেমন—

  • √বস্ + অত = বসত
  • √ফির্ + অত = ফেরত
  • √মান্ + অত = মানত

১৬. সংস্কৃত কৃৎ-প্রত্যয়

বাংলা ভাষায় বিপুল সংখ্যক তৎসম শব্দ সংস্কৃত প্রত্যয়যোগে গঠিত হয়েছে। সংস্কৃত প্রত্যয়ের মূল রূপ অনেক সময় বাংলা ব্যবহারে সম্পূর্ণ থাকে না; প্রত্যয়ের কিছু অংশ লোপ পায়।

এই লোপপ্রাপ্ত অংশকে ইৎ বলা হয়।

প্রধান সংস্কৃত কৃৎ-প্রত্যয়গুলির মধ্যে—

  • অনট
  • ক্ত
  • ক্তি
  • তব্য
  • অনীয়
  • তৃচ্
  • ণক
  • ঘ্যণ
  • ণিন্
  • শানচ্
  • ঘঞ্
  • প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

১৭. ইৎ কী?

সংস্কৃত প্রত্যয় মূল শব্দের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সময় প্রত্যয়ের যে অংশ উচ্চারিত বা ব্যবহৃত হয় না, তাকে ইৎ বা লোপপ্রাপ্ত অংশ বলা হয়।

যেমন—

স্থা + অনট → স্থান

এখানে ‘অনট’-এর ‘ট’ ব্যবহৃত হয়নি। তাই ‘ট’ ইৎ।

আবার—

পঠ্ + ক্ত → পঠিত

এখানে মূল প্রত্যয়ের সব বর্ণ সরাসরি দৃশ্যমান নয়।

গুরুত্বপূর্ণ

ইৎ ধারণাটি মূলত সংস্কৃত ব্যাকরণগত প্রত্যয়-প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। আধুনিক বাংলা প্রত্যয়ের প্রতিটি শেষাংশকে ইৎ বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।


১৮. ইৎ-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ

মূল প্রত্যয়ব্যবহৃত অংশলোপ/ইৎ অংশ
অনটঅন
ক্ত
ক্তিতি
ণকঅক
ঘ্যণয/্যঘ, ণ
শানচ্আনশ, চ
ণিন্ইন/ঈ
তৃচ্ত/তা
ঘঞ্ঘ, ঞ
ন্যৎঐ/য-জাত রূপন, ৎ

সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়ের ক্ষেত্রেও ইৎ-লোপ দেখা যায়।


১৯. সংস্কৃত কৃৎ-প্রত্যয় : অনট

অনট-প্রত্যয় যোগে বহু তৎসম শব্দ গঠিত হয়েছে।

যেমন—

  • √নী + অনট → নয়ন
  • √শু + অনট → শ্রবণ
  • √স্থা + অনট → স্থান
  • √ভুজ্ + অনট → ভোজন
  • √নৃত্ + অনট → নর্তন
  • √দৃশ্ + অনট → দর্শন
  • √নন্দ্ + অনট → নন্দন

এখানে প্রত্যয়ের ইৎ-লোপ ও ধ্বনিগত পরিবর্তনের ফলে শব্দের চেহারা মূল প্রত্যয় থেকে ভিন্ন হয়েছে।


২০. ক্ত-প্রত্যয়

ক্ত-প্রত্যয় কর্মবাচক অতীতার্থক বিশেষণ বা সংশ্লিষ্ট কৃদন্ত রূপ গঠনে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √পঠ্ + ক্ত = পঠিত
  • √লিখ্ + ক্ত = লিখিত
  • √বিদ্ + ক্ত = বিদিত
  • √বেষ্ট্ + ক্ত = বেষ্টিত
  • √চল্ + ক্ত = চলিত
  • √পত্ + ক্ত = পতিত
  • √লুণ্ঠ্ + ক্ত = লুণ্ঠিত
  • √ক্ষুধ্ + ক্ত = ক্ষুধিত
  • √শিক্ষ্ + ক্ত = শিক্ষিত

বিশেষ ধ্বনিগত পরিবর্তন

কিছু ধাতুর শেষে চ্/জ্ থাকলে ক্ত-প্রত্যয় যোগে রূপান্তর ঘটে—

  • √মুচ্ + ক্ত = মুক্ত
  • √ভুজ্ + ক্ত = ভুক্ত

২১. ক্ত-প্রত্যয়ের নিপাতনে সিদ্ধ রূপ

কিছু রূপ সাধারণ নিয়মে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না; প্রচলিত/শাস্ত্রসম্মত বিশেষ নিয়মে সিদ্ধ হয়েছে।

যেমন—

  • √গম্ + ক্ত = গত
  • √গ্রন্থ্ + ক্ত = গ্রথিত
  • √চুর্ + ক্ত = চূর্ণ
  • √ছিদ্ + ক্ত = ছিন্ন
  • √জন্ + ক্ত = জাত
  • √যুধ্ + ক্ত = যুদ্ধ
  • √হন্ + ক্ত = হত
  • √দা + ক্ত = দত্ত
  • √দহ্ + ক্ত = দগ্ধ
  • √লভ্ + ক্ত = লব্ধ
  • √বচ্ + ক্ত = উক্ত
  • √বপ্ + ক্ত = উপ্ত
  • √স্বপ্ + ক্ত = সুপ্ত
  • √সৃজ্ + ক্ত = সৃষ্ট

এগুলিকে প্রয়োজনে নিপাতনে সিদ্ধ বলে চিহ্নিত করা হয়।


২২. ক্তি-প্রত্যয়

ক্তি-প্রত্যয়ে ভাববাচক বা বিমূর্ত বিশেষ্য গঠিত হয়।

যেমন—

  • √গম্ + ক্তি = গতি
  • √মন্ + ক্তি = মতি
  • √রম্ + ক্তি = রতি
  • √দা + ক্তি = দিতি/দত্তজাত রূপ
  • √বচ্ + ক্তি = উক্তি
  • √মুচ্ + ক্তি = মুক্তি
  • √ভজ্ + ক্তি = ভক্তি

ধ্বনিগত পরিবর্তন

কিছু ক্ষেত্রে—

  • মূল ধাতুর অন্ত্যব্যঞ্জন লোপ পায়,
  • প্রথম ব্যঞ্জনে পরিবর্তন ঘটে,
  • চ্/জ্ → ক্ ধরনের রূপান্তর ঘটে,
  • অথবা নিপাতনে সিদ্ধ রূপ হয়।

উদাহরণ—

  • √বচ্ + ক্তি = উক্তি
  • √মুচ্ + ক্তি = মুক্তি
  • √ভজ্ + ক্তি = ভক্তি
  • √গৈ + ক্তি = গীতি
  • √সিধ্ + ক্তি = সিদ্ধি
  • √বুধ্ + ক্তি = বুদ্ধি
  • √শক্ + ক্তি = শক্তি

২৩. তব্য-প্রত্যয়

কর্তব্যতা বা উচিততা বোঝাতে তব্য-প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √কৃ + তব্য = কর্তব্য
  • √দা + তব্য = দাতব্য
  • √পঠ্ + তব্য = পঠিতব্য

২৪. অনীয়-প্রত্যয়

করণীয়তা, যোগ্যতা বা উচিততা বোঝাতে অনীয়-প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √কৃ + অনীয় = করণীয়
  • √রক্ষ্ + অনীয় = রক্ষণীয়
  • √দৃশ্ + অনীয় = দর্শনীয়
  • √পা + অনীয় = পানীয়
  • √শ্রু/শু + অনীয় = শ্রবণীয়
  • √পাল্ + অনীয় = পালনীয়

২৫. তৃচ্-প্রত্যয়

কর্তৃবাচক শব্দ গঠনে তৃচ্-প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √দা + তৃচ্ = দাতা
  • √মা + তৃচ্ = মাতা
  • √পঠ্ + তৃচ্ = পাঠক/পাঠিতা—ধাতু ও প্রত্যয়ভেদে রূপান্তর ঘটে
  • √ক্রী + তৃচ্ = ক্রেতা

২৬. ণক-প্রত্যয়

কর্তৃবাচক শব্দ গঠনে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √পঠ্ + ণক = পাঠক
  • √নী + ণক = নায়ক
  • √গৈ + ণক = গায়ক
  • √লিখ্ + ণক = লেখক
  • √পূজ্ + ণক = পূজক
  • √জন্ + ণক = জনক

২৭. ঘ্যণ-প্রত্যয়

বিভিন্ন বিশেষণ বা ভাববাচক শব্দে ঘ্যণ-প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √কৃ + ঘ্যণ = কার্য
  • √ধৃ/ধা + ঘ্যণ = ধার্য
  • √বচ্ + ঘ্যণ = বাচ্য
  • √ভুজ্ + ঘ্যণ = ভোজ্য
  • √যোগ্ + ঘ্যণ = যোগ্য
  • √হাস্ + ঘ্যণ = হাস্য
  • পরি + √হৃ + ঘ্যণ = পরিহার্য

বিশেষ নিয়ম

ধাতুর শেষে ই-কার থাকলে কখনও ই-কারের লোপ ঘটে—

  • √লিখ্/লেখ্ জাত রূপে লেখক ইত্যাদি ধ্বনিগত পরিবর্তন দেখা যায়।

আ-কারান্ত ধাতুতে অনেক ক্ষেত্রে ‘য়’-জাত ধ্বনি যুক্ত হয়।


২৮. য-প্রত্যয়

য-প্রত্যয়ে যোগ্যতা বা সম্পাদনীয়তার অর্থ প্রকাশ পায়।

যেমন—

  • অ + √জি + য = অজেয়
  • পরি + √মা + য = পরিমেয়
  • √গম্ + য = গম্য
  • অনু + √মা + য = অনুমেয়
  • √লভ্ + য = লভ্য

‘য’ কখনও য-ফলা বা ‘য়’-জাত রূপে প্রকাশিত হয়।


২৯. ণিন্-প্রত্যয়

কর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বোঝাতে ণিন্-প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √গ্রহ্ + ণিন্ = গ্রাহী
  • √পা + ণিন্ = পায়ী
  • √দ্রুহ্ + ণিন্ = দ্রোহী
  • √গম্ + ণিন্ = গামী
  • √শ্রম্ + ণিন্ = শ্রমী
  • সত্য + বাদ + ণিন্ = সত্যবাদী
  • ভাব + ণিন্ = ভাবী
  • √স্থা + ণিন্ = স্থায়ী
  • আত্ম + √হন্ + ণিন্ = আত্মঘাতী
  • √হন্ + ণিন্ = ঘাতী

৩০. শানচ্-প্রত্যয়

চলমান বা বর্তমান কর্ম বোঝাতে শানচ্-প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • √দীপ্ + শানচ্ = দীপ্যমান
  • √চল্ + শানচ্ = চলমান
  • √বৃধ্ + শানচ্ = বর্ধমান

৩১. ঘঞ্-প্রত্যয়

ঘঞ্-প্রত্যয়ে ভাববাচক বা ক্রিয়াজাত বিশেষ্য গঠিত হয়।

যেমন—

  • √বস্ + ঘঞ্ = বাস
  • √ত্যজ্ + ঘঞ্ = ত্যাগ
  • √যুজ্ + ঘঞ্ = যোগ
  • √ক্রুধ্ + ঘঞ্ = ক্রোধ
  • √খদ্ + ঘঞ্ = খাদ/খাদ্যজাত রূপ
  • √ভিদ্ + ঘঞ্ = ভেদ
  • √পচ্ + ঘঞ্ = পাক
  • √শুচ্ + ঘঞ্ = শোক

এখানে গুণ-বৃদ্ধি ও অন্যান্য ধ্বনিগত পরিবর্তন লক্ষণীয়।


৩২. গুণ ও বৃদ্ধি

সংস্কৃত প্রত্যয়যোগে ধাতু বা প্রকৃতির স্বরে যে নির্দিষ্ট পরিবর্তন ঘটে তাকে গুণ ও বৃদ্ধি বলে।

গুণ

সাধারণ নিয়ম—

  • ই/ঈ → এ
  • উ/ঊ → ও
  • ঋ → অর্

উদাহরণ—

  • √চিন্ + আ → চেনা
  • √নী + আ → নেওয়া
  • √ধু + আ → ধোয়া
  • √কৃ + তা → কর্তা

বৃদ্ধি

সাধারণ নিয়ম—

  • অ → আ
  • ই/ঈ/এ → ঐ
  • উ/ঊ/ও → ঔ
  • ঋ → আর্

উদাহরণ—

  • √পচ্ + ণক → পাচক
  • শিশু + ষ্ণ → শৈশব
  • যুব + অন → যৌবন
  • √কৃ + ঘ্যণ → কার্য

মনে রাখুন

গুণ: ই→এ, উ→ও, ঋ→অর

বৃদ্ধি: অ→আ, ই/এ→ঐ, উ/ও→ঔ, ঋ→আর


৩৩. অন্তঃসন্ধি ও ধ্বনিগত পরিবর্তন

প্রকৃতি ও প্রত্যয় যুক্ত হওয়ার সময় শুধু প্রত্যয় সংযোজনই ঘটে না; ধ্বনিগত পরিবর্তনও হতে পারে।

যেমন—

  • রাঁধ্ + না → রান্না
  • কাঁদ্ + না → কান্না
  • মুচ্ + তি → মুক্তি
  • ভুজ্ + তি → ভুক্তি

কখনও—

১. ধ্বনি লোপ পায়,
২. ধ্বনি পরিবর্তিত হয়,
৩. স্বরধ্বনির গুণ বা বৃদ্ধি ঘটে,
৪. নতুন ধ্বনি আগমন করে,
৫. দুটি ধ্বনির সমন্বয়ে নতুন ধ্বনি সৃষ্টি হয়।


৩৪. অভিশ্রুতি

ধাতু বা শব্দের সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত হওয়ার সময় মধ্যবর্তী ধ্বনি বা স্বরের পরিবর্তনের ফলে নতুন উচ্চারণরূপ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলা শব্দগঠনে এর উদাহরণ—

  • যা + আ → যাওয়া
  • পা + আ → পাওয়া

এখানে মধ্যবর্তী ‘ওয়’/‘য়’-জাত ধ্বনির আগমন লক্ষ করা যায়।


৩৫. প্রত্যয় ও সন্ধির সম্পর্ক

প্রত্যয়যোগ এবং সন্ধি এক জিনিস নয়। তবে প্রত্যয় যুক্ত হওয়ার সময় ধ্বনিগত পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা অনেক সময় সন্ধির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

অতএব—

প্রত্যয় = শব্দগঠনের পদ্ধতি

সন্ধি = ধ্বনির মিলনজনিত পরিবর্তনের পদ্ধতি

দুটিকে এক করে দেখা উচিত নয়।


৩৬. বাংলা তদ্ধিত-প্রত্যয়

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এগুলি দ্বারা—

  • ব্যক্তি,
  • পেশা,
  • গুণ,
  • স্বভাব,
  • অবস্থা,
  • ভাব,
  • স্থান,
  • জাতি,
  • সম্পর্ক,
  • উপাদান,
  • উৎপন্ন বস্তু

ইত্যাদি বোঝানো হয়।


৩৬.১ আ-প্রত্যয়

যেমন—

  • চোর + আ = চোরা
  • জল + আ = জেলা
  • কেষ্ট + আ = কেষ্টা
  • গোদ + আ = গোদা
  • ডিঙি + আ = ডিঙা
  • রোগ + আ = রোগা
  • বাঘ + আ = বাঘা
  • চাল + আ = চালা
  • হাত + আ = হাতা
  • লুন + আ = লুনা/লোনা

৩৬.২ আই-প্রত্যয়

যেমন—

  • বড় + আই = বড়াই
  • চড়া + আই = চড়াই
  • কানু + আই = কানাই
  • নিম + আই = নিমাই
  • বোন + আই = বোনাই
  • ননদ + আই = নন্দাই
  • পাবনা + আই = পাবনাই
  • চোর + আই = চোরাই
  • মোগল + আই = মোগলাই
  • জেঠা + আই = জেঠাই
  • মিঠা + আই = মিঠাই
  • ঢাকা + আই = ঢাকাই

৩৬.৩ আমি/আমো/মি-প্রত্যয়

ভাব, স্বভাব বা আচরণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • ঘর + আমি = ঘরামি
  • চোর + আমি = চোরামি
  • পাগল + আমি = পাগলামি
  • ইতর + আমি = ইতরামি
  • বাঁদর + আমি = বাঁদরামি
  • ফাজিল + আমো = ফাজলামো
  • ঠিক + আমো = ঠকামো
  • জেঠা + মি = জেঠামি
  • ছেলে + মি = ছেলেমি

৩৬.৪ ই/ঈ-প্রত্যয়

পেশা, সম্পর্ক, জাতিগত বা অবস্থাগত অর্থে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • বাহাদুর + ই = বাহাদুরি
  • জমিদার + ঈ = জমিদারি
  • উমেদার + ই = উমেদারি
  • দোকান + ঈ = দোকানি
  • ডাক্তার + ঈ = ডাক্তারি
  • মোক্তার + ঈ = মোক্তারি
  • ভাগলপুর + ঈ = ভাগলপুরী
  • মাদ্রাজ + ঈ = মাদ্রাজী
  • পোদ্দার + ঈ = পোদ্দারি
  • ব্যাপার + ঈ = ব্যাপারি
  • রেশম + ঈ = রেশমি
  • সরকার + ঈ = সরকারি
  • চাষ + ঈ = চাষী

৩৬.৫ ইয়া/এ-প্রত্যয়

স্থান, সময়, বৈশিষ্ট্য বা সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • একাল + এ = একেলে
  • সেকাল + এ = সেকেলে
  • খুন + ইয়া = খুনিয়া → খুনে
  • ভাদর + ইয়া = ভাদরিয়া → ভাদুরে
  • পাথর + ইয়া = পাথুরিয়া → পাথুরে
  • মাটি + ইয়া = মেটে
  • বালি + ইয়া = বেলে
  • জাল + ইয়া = জালিয়া → জেলে
  • মোট + ইয়া = মুটে

৩৬.৬ এ-প্রত্যয়

যেমন—

  • দেমাক + এ = দেমাকে
  • টনটন + এ = টনটনে
  • কনকন + এ = কনকনে
  • গনগন + এ = গনগনে
  • চকচক + এ = চকচকে

৩৬.৭ উয়া/ওয়া → ও

যেমন—

  • জ্বর + উয়া = জ্বরুয়া → জ্বরো
  • বাত + উয়া = বাতুয়া → বাতো/বেতো
  • টাক + উয়া = টাকুয়া → টেকো
  • খড় + ও = খড়ো
  • ধান + উয়া = ধেনো
  • মাঠ + উয়া = মেঠো
  • ঢাল + উ = ঢালু

৩৬.৮ উক-প্রত্যয়

যেমন—

  • লাজ + উক = লাজুক
  • মিথ্যা + উক = মিথ্যুক
  • মিশ + উক = মিশুক

৩৬.৯ আল/আলি/আলো-প্রত্যয়

যেমন—

  • দাঁত + আল = দাঁতাল
  • দুধ + আল = দুধাল
  • লাঠি + আল = লাঠিয়াল
  • তেজ + আল = তেজাল
  • ধার + আল = ধারাল
  • শাঁস + আল = শাঁসাল
  • সিঁদ + আল = সিঁদেল
  • ঘটক + আলি = ঘটকালি
  • চতুর + আলি = চতুরালি
  • জমক + আল → জমকালো
  • গাঁজা + আল → গেঁজেল

৩৬.১০ উড়িয়া/উরিয়া-জাত প্রত্যয়

যেমন—

  • হাট + উরিয়া = হাটুরিয়া → হাটুরে
  • সাপ + উড়িয়া = সাপুড়িয়া → সাপুড়ে
  • কাঠ + উরিয়া = কাঠুরিয়া → কাঠুরে
  • উড় + উড়িয়া/জাত রূপে উড়িয়া

৩৬.১১ উয়া-প্রত্যয়

যেমন—

  • ঘর + ওয়া = ঘরোয়া
  • জল + উয়া = জলুয়া → জলো
  • গাঁ + উয়া = গাঁইয়া → গেঁয়ো
  • মাছ + উয়া = মাছুয়া → মেছো
  • দাঁত + উয়া = দেঁতো
  • ছাঁদ + উয়া = ছেঁদো
  • তেল + উয়া = তেলো
  • কুঁজ + উয়া = কুঁজো
  • কল + উ = কলু

৩৬.১২ আটিয়া/আট-জাত প্রত্যয়

যেমন—

  • তামা + আটিয়া = তামাটিয়া → তামাটে
  • ভাড়া + আটিয়া = ভাড়াটে
  • রোগা + আটিয়া = রোগাটে
  • ঝগড়া + আটিয়া = ঝগড়াটে
  • ভরা + ট = ভরাট
  • জমা + ট = জমাট

৩৬.১৩ লা-প্রত্যয়

যেমন—

  • মেঘ + লা = মেঘলা
  • আধ + লা = আধলা
  • এক + লা = একলা

৩৭. সংস্কৃত তদ্ধিত-প্রত্যয়

সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় বাংলা তৎসম শব্দভাণ্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

প্রধান প্রত্যয়গুলির মধ্যে—

ইত, ইমন, ইল, ইষ্ঠ, ইন/ঈ/ইনী, তা, ত্ব, তর, তম, নীন, নীয়, বতুপ, মতুপ, বিন, র, ল, য, ষ্ণ্য, ষ্ণিক, এয়, প্রভৃতি।


৩৮. ইত-প্রত্যয়

যেমন—

  • কুসুম + ইত = কুসুমিত
  • তরঙ্গ + ইত = তরঙ্গিত
  • কণ্টক + ইত = কণ্টকিত

৩৯. ইমন-প্রত্যয়

যেমন—

  • নীল + ইমন = নীলিমা
  • মহৎ + ইমন = মহিমা

৪০. ইল-প্রত্যয়

যেমন—

  • পঙ্ক + ইল = পঙ্কিল
  • ঊর্মি + ইল = ঊর্মিল
  • ফেন + ইল = ফেনিল

৪১. ইষ্ঠ-প্রত্যয়

তুলনামূলক সর্বোচ্চ মাত্রা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • গুরু + ইষ্ঠ = গরিষ্ঠ
  • লঘু + ইষ্ঠ = লঘিষ্ঠ

৪২. ইন/ঈ/ইনী-প্রত্যয়

যেমন—

  • জ্ঞান + ইন = জ্ঞানিন
  • সুখ + ইন = সুখিন
  • গুণ + ইন = গুণিন
  • মান + ইন = মানিন
  • জ্ঞান + ঈ = জ্ঞানী
  • গুণ + ঈ = গুণী
  • জ্ঞান + ইনী = জ্ঞানিনী
  • গুণ + ইনী = গুণিনী

৪৩. তা ও ত্ব

ভাব, অবস্থা, গুণ বা সম্পর্কের বিমূর্ত ধারণা প্রকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তা

  • বন্ধু + তা = বন্ধুতা
  • শত্রু + তা = শত্রুতা

ত্ব

  • বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব
  • গুরু + ত্ব = গুরুত্ব
  • ঘন + ত্ব = ঘনত্ব
  • মহৎ + ত্ব = মহত্ত্ব

৪৪. তর ও তম

তুলনা ও সর্বোচ্চ মাত্রা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

তর

  • মধুর + তর = মধুরতর
  • প্রিয় + তর = প্রিয়তর

তম

  • প্রিয় + তম = প্রিয়তম

৪৫. নীন-প্রত্যয়

যেমন—

  • সর্বজন + নীন = সর্বজনীন
  • কুল + নীন = কুলীন
  • নব + নীন = নবীন

৪৬. নীয়-প্রত্যয়

যেমন—

  • জল + নীয় = জলীয়
  • বায়ু + নীয় = বায়বীয়
  • বর্ষ + নীয় = বর্ষীয়
  • পর + নীয় = পরকীয়
  • স্ব + নীয় = স্বকীয়
  • রাজা + নীয় = রাজকীয়

৪৭. বতুপ/মতুপ

অধিকার, গুণ বা বৈশিষ্ট্য বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

বতুপ

  • গুণ + বতুপ = গুণবান
  • দয়া + বতুপ = দয়াবান

মতুপ

  • শ্রী + মতুপ = শ্রীমান
  • বুদ্ধি + মতুপ = বুদ্ধিমান

৪৮. বিন-প্রত্যয়

যেমন—

  • মেধা + বিন = মেধাবী
  • মায়া + বিন = মায়াবী
  • তেজঃ + বিন = তেজস্বী
  • যশঃ + বিন = যশস্বী

৪৯. র ও ল-প্রত্যয়

যেমন—

  • মধু + র = মধুর
  • মুখ + র = মুখর
  • শীত + ল = শীতল
  • বৎস + ল = বৎসল

৫০. য/ষ্ণ্য-জাত প্রত্যয়

বিভিন্ন জাতি, মত, ধর্ম, সম্পর্ক বা ভাব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

যেমন—

  • শিব + য = শৈব
  • জিন + য = জৈন
  • শক্তি + য = শাক্ত
  • বুদ্ধ + য = বৌদ্ধ
  • বিষ্ণু + য = বৈষ্ণব
  • গুরু + য = গৌরব
  • শিশু + ষ্ণ্য = শৈশব

নিপাতনে সিদ্ধ বা বিশেষ রূপ

  • সূর্য + য = সৌর
  • কিশোর + য = কৈশোর
  • পৃথিবী + য = পার্থিব
  • দেব + য = দৈব
  • চিত্র + য = চৈত্র

৫১. স্ন্য/য-জাত প্রত্যয়

যেমন—

  • মনু + ষ্য = মনুষ্য
  • জমদগ্নি + য = জামদগ্ন্য
  • সুন্দর + য = সৌন্দর্য
  • শূর + য = শৌর্য
  • ধীর + য = ধৈর্য
  • কুমার + য = কৌমার্য
  • পর্বত + য = পার্বত্য
  • বেদ + য = বৈদ্য

৫২. ইক-প্রত্যয়

স্থান, বিষয়, সম্পর্ক বা সংশ্লিষ্টতা বোঝাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন—

  • সাহিত্য + ইক = সাহিত্যিক
  • বেদ + ইক = বৈদিক
  • বিজ্ঞান + ইক = বৈজ্ঞানিক
  • সমুদ্র + ইক = সামুদ্রিক
  • নগর + ইক = নাগরিক
  • মাস + ইক = মাসিক
  • ধর্ম + ইক = ধার্মিক
  • সমর + ইক = সামরিক
  • সমাজ + ইক = সামাজিক
  • হেমন্ত + ইক = হৈমন্তিক
  • অকস্মাৎ + ইক = আকস্মিক

৫৩. এয়-প্রত্যয়

যেমন—

  • ভগিনী + এয় = ভাগিনেয়
  • অগ্নি + এয় = আগ্নেয়
  • বিমাতৃ + এয় = বৈমাত্রেয়

৫৪. বিদেশি উৎসজাত প্রত্যয়/শব্দাংশ

বাংলা ভাষায় আরবি, ফারসি, হিন্দি, উর্দু প্রভৃতি ভাষার প্রভাবে বহু শব্দগঠনকারী শব্দাংশ ব্যবহৃত হয়েছে। আধুনিক বাংলা ব্যাকরণে এগুলিকে সব ক্ষেত্রে সংস্কৃত অর্থে ‘প্রত্যয়’ বলা না হলেও শব্দগঠনে এদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।


৫৪.১ ওয়ালা

  • বাড়ি + ওয়ালা = বাড়িওয়ালা
  • দিল্লি + ওয়ালা = দিল্লিওয়ালা
  • মাছ + ওয়ালা = মাছওয়ালা
  • দুধ + ওয়ালা = দুধওয়ালা

৫৪.২ ওয়ান

  • গাড়ি + ওয়ান = গাড়োয়ান
  • দার + ওয়ান = দারোয়ান

৫৪.৩ আনা/আনি

  • মুনশি + আনা = মুনশিয়ানা
  • বিবি + আনা = বিবিয়ানা
  • হিন্দু + আনি = হিন্দুআনি/হিন্দুয়ানি

৫৪.৪ পনা

  • ছেলে + পনা = ছেলেপনা
  • গিন্নি + পনা = গিন্নিপনা
  • বেহায়া + পনা = বেহায়াপনা

৫৪.৫ সা

  • পানি + সা = পানিসা → পানসে
  • এক + সা = একসা
  • কাল + সা = কালসা → কালসে

৫৪.৬ গর

  • কারি + গর = কারিগর
  • সওদা + গর = সওদাগর
  • বাজি + গর = বাজিগর/বাজিকর

৫৪.৭ দার

  • খবর + দার = খবরদার
  • দেনা + দার = দেনাদার
  • তাঁবে + দার = তাঁবেদার
  • চৌকি + দার = চৌকিদার
  • বুটি + দার = বুটিদার
  • পাহারা + দার = পাহারাদার

৫৪.৮ বাজ

  • ধোঁকা + বাজ = ধোঁকাবাজ
  • কলম + বাজ = কলমবাজ
  • গলা + বাজ = গলাবাজ
  • ধড়ি + বাজ = ধড়িবাজ
  • গলাবাজ + ই = গলাবাজি

৫৪.৯ বন্দী/বন্দ

  • জবান + বন্দী = জবানবন্দী
  • নজর + বন্দী = নজরবন্দী
  • সারি + বন্দী = সারিবন্দী
  • কোমর + বন্দ = কোমরবন্দ

৫৪.১০ সই

‘সই’ শব্দাংশটি কিছু ক্ষেত্রে শব্দগঠনে যুক্ত হয়—

  • জুত + সই = জুতসই
  • মানান + সই = মানানসই
  • চলন + সই = চলনসই
  • টেক + সই = টেকসই

গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য

‘টিপসই’ ও ‘নামসই’-এর ‘সই’ সব ক্ষেত্রে প্রত্যয় হিসেবে বিশ্লেষণ করা সমীচীন নয়; ‘সই’ স্বাধীন শব্দ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।


৫৫. প্রত্যয় ও বিভক্তির পার্থক্য

এখানে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

বিভক্তি প্রত্যয় নয়—এটি নামপদ বা ক্রিয়াপদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাক্যে তার কারকগত/ব্যাকরণিক সম্পর্ক নির্দেশ করে।

যেমন—

রামকে দেখেছি।

এখানে ‘কে’ নতুন শব্দ সৃষ্টি করেনি; ‘রাম’ শব্দটির বাক্যগত সম্পর্ক নির্দেশ করেছে।

অন্যদিকে—

দেশ + ঈ = দেশী

এখানে ‘ঈ’ নতুন শব্দ তৈরি করেছে।

প্রত্যয়বিভক্তি
নতুন শব্দ গঠন করেবাক্যের সম্পর্ক নির্দেশ করে
শব্দগঠনের উপাদানপদগঠনের/কারকসম্পর্কের চিহ্ন
ধাতু বা নামপ্রকৃতির পরে বসেপদের সঙ্গে যুক্ত হয়
লাজ + উক = লাজুকরাম + কে = রামকে
দেশ + ঈ = দেশীঘর + এ = ঘরে

পরীক্ষার সূত্র

নতুন শব্দ হলে → প্রত্যয়।

শুধু বাক্যের সম্পর্ক হলে → বিভক্তি।


৫৬. প্রত্যয় ও উপসর্গের পার্থক্য

উপসর্গপ্রত্যয়
শব্দ/ধাতুর আগে বসেশব্দ/ধাতুর পরে বসে
অর্থের পরিবর্তন/সম্প্রসারণ ঘটায়নতুন শব্দ গঠন করে
যেমন: প্র + হার = প্রহারযেমন: দেশ + ঈ = দেশী
আগে বসেপরে বসে

উদাহরণ—

উপসর্গ:
প্র + হার = প্রহার

প্রত্যয়:
কৃ + তব্য = কর্তব্য

মনে রাখার সূত্র

আগে বসে = উপসর্গ

পরে বসে = প্রত্যয়


৫৭. প্রত্যয় ও সমাসের পার্থক্য

সমাসে সাধারণত দুই বা ততোধিক স্বাধীন শব্দ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নতুন পদ গঠন করে।

যেমন—

  • রাজা + পুত্র = রাজপুত্র
  • নীল + কমল = নীলকমল

অন্যদিকে প্রত্যয়ে—

  • ধন + ঈ = ধনী
  • বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব

সূত্র

শব্দ + শব্দ = সমাস

শব্দ/ধাতু + প্রত্যয় = প্রত্যয়সাধিত শব্দ


৫৮. প্রত্যয় ও সন্ধির পার্থক্য

সন্ধি মূলত ধ্বনির মিলনজনিত পরিবর্তন; প্রত্যয় শব্দগঠনের পদ্ধতি।

যেমন—

প্রত্যয়:
বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব

সন্ধি:
বিদ্যা + আলয় → বিদ্যালয়

তবে প্রত্যয়যোগের সময় সন্ধিসদৃশ ধ্বনিগত পরিবর্তন হতে পারে।


৫৯. প্রত্যয় ও প্রকৃতির পার্থক্য

প্রকৃতিপ্রত্যয়
প্রত্যয়সাধিত শব্দের মূল অংশমূলের সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত অংশ
নিজস্ব অর্থ থাকেসাধারণত স্বাধীন অর্থ থাকে না
শব্দ/ধাতুবর্ণ/বর্ণসমষ্টি
ধন + ঈ = ধনী → ধন প্রকৃতিঈ প্রত্যয়
লাজ + উক = লাজুক → লাজ প্রকৃতিউক প্রত্যয়

৬০. প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয়ের পদ্ধতি

পরীক্ষায় প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় করার সময় চারটি বিষয় লক্ষ করতে হবে—

ধাপ ১

শব্দটিকে সম্ভাব্য মূল অংশ ও প্রত্যয়ে ভাঙতে হবে।

ধাপ ২

মূল অংশটি ধাতু হলে তার আগে  চিহ্ন দিতে হবে।

ধাপ ৩

প্রত্যয় আলাদা করে দেখাতে হবে।

ধাপ ৪

প্রত্যয়টি কৃৎ না তদ্ধিত তা নির্ণয় করতে হবে।


উদাহরণ ১ : পড়ুয়া

√পড়্ + উয়া = পড়ুয়া

এখানে—

  • √পড়্ = ক্রিয়াপ্রকৃতি
  • উয়া = কৃৎ-প্রত্যয়
  • পড়ুয়া = কৃদন্ত পদ

উদাহরণ ২ : মিঠাই

মিঠা + আই = মিঠাই

এখানে—

  • মিঠা = নামপ্রকৃতি
  • আই = তদ্ধিত-প্রত্যয়
  • মিঠাই = তদ্ধিতান্ত পদ

উদাহরণ ৩ : লাজুক

লাজ + উক = লাজুক

উক = তদ্ধিত প্রত্যয়।


উদাহরণ ৪ : লড়াই

√লড়্ + আই = লড়াই

আই = কৃৎ-প্রত্যয়।


উদাহরণ ৫ : লেখক

√লিখ্/লেখ্ + ণক → লেখক

এখানে সংস্কৃত কৃৎ-প্রত্যয়জাত ধ্বনিগত পরিবর্তন ঘটেছে।


উদাহরণ ৬ : বন্ধুত্ব

বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব

ত্ব = সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়।


উদাহরণ ৭ : বৈজ্ঞানিক

বিজ্ঞান + ইক = বৈজ্ঞানিক

ইক = সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়; মূল শব্দে গুণ/বৃদ্ধিজাত পরিবর্তন হয়েছে।


৬১. উন্নত প্রকৃতি-প্রত্যয় বিশ্লেষণ

শুধু শব্দ ভেঙে দুটি অংশ দেখালেই প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয় সম্পূর্ণ হয় না। উচ্চতর স্তরে চারটি প্রশ্ন করতে হবে—

১. মূল অংশটি কী?

শব্দ, প্রাতিপদিক না ধাতু?

২. কী যোগ হয়েছে?

প্রত্যয়টি কী?

৩. কী পরিবর্তন হয়েছে?

স্বরপরিবর্তন, ব্যঞ্জনপরিবর্তন, লোপ, আগম, গুণ, বৃদ্ধি, অন্তঃসন্ধি ইত্যাদি।

৪. নতুন শব্দটির অর্থ কী?

অর্থ জানলে প্রত্যয় নির্ণয় অনেক সহজ হয়।


৬২. উদাহরণ : গাইয়ে

গাইয়ে শব্দটির ঐতিহাসিক ব্যুৎপত্তি সরল ‘গা + ইয়ে’ হিসেবে ধরলে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হয় না। এর সঙ্গে ‘গাহ্’ ধাতু, ধ্বনিগত পরিবর্তন ও অভিশ্রুতির বিষয় যুক্ত।

শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ বিশ্লেষণ—

√গাহ্ + ইয়া/ইয়ে → গাইয়ে

অর্থ—যে গান করে।

এটি কৃৎ-প্রত্যয়জাত।


৬৩. উদাহরণ : অভিনীত

অভি + √নী + ক্ত → অভিনীত

এখানে—

  • অভি = উপসর্গ
  • √নী = ধাতু
  • ক্ত = কৃৎ-প্রত্যয়
  • অভিনীত = কৃদন্ত

অতএব এখানে উপসর্গ ও প্রত্যয়—দুই প্রক্রিয়াই কাজ করেছে।


৬৪. উদাহরণ : বৈচিত্র্য

বিচিত্র + ষ্ণ্য → বৈচিত্র্য

এখানে—

  • বিচিত্র = নামপ্রকৃতি
  • ষ্ণ্য = তদ্ধিত প্রত্যয়
  • বৈচিত্র্য = তদ্ধিতান্ত পদ
  • প্রকৃতির স্বরপরিবর্তন ঘটেছে।

৬৫. ‘প্রত্যয়’ শব্দটি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

বাংলা ব্যাকরণের বিভিন্ন গ্রন্থে প্রত্যয়, বিকৃতি, বিভক্তি, ক্রিয়ারূপ-প্রত্যয় ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার একরকম নয়।

কিছু প্রাথমিক বা প্রথাগত বইয়ে—

  • বিভক্তিকে প্রত্যয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হয়,
  • ক্রিয়ার কাল বা পুরুষচিহ্নকে প্রত্যয় বলা হয়,
  • ‘বিকৃতিপ্রত্যয়’ নামে একটি পৃথক শ্রেণি দেওয়া হয়।

কিন্তু শব্দগঠনমূলক প্রত্যয় আলোচনা করতে গেলে পরীক্ষার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও প্রচলিত কাঠামো হল—

প্রত্যয় → কৃৎ + তদ্ধিত

আর—

বিভক্তি → কারক/বাক্যগত সম্পর্কের চিহ্ন

এবং—

ক্রিয়ারূপ → ক্রিয়ার রূপগঠন/বিভক্তি/প্রত্যয়-জাত ব্যাকরণিক উপাদান, পাঠ্যবইভেদে পরিভাষার পার্থক্য থাকতে পারে।

সুতরাং ‘রা’, ‘কে’, ‘তে’, ‘ল’, ‘বে’ ইত্যাদিকে একসঙ্গে ‘প্রত্যয়ের চার প্রকার’-এর অন্তর্ভুক্ত করা বৈজ্ঞানিকভাবে বিভ্রান্তিকর। এই অধ্যায়ে সেগুলিকে প্রত্যয়সাধিত শব্দগঠন থেকে পৃথক রাখা হয়েছে।


৬৬. ‘প্রত্যয়সাধিত হয়ে সবসময় নামপদ তৈরি হয়’—এই ধারণার সংশোধন

প্রত্যয়যোগে কেবল নামপদই তৈরি হয় না। প্রসঙ্গ ও প্রত্যয়ের প্রকৃতি অনুযায়ী—

  • বিশেষ্য,
  • বিশেষণ,
  • ক্রিয়াজাত পদ,
  • বিমূর্ত পদ,
  • কর্তা-নির্দেশক পদ,
  • গুণবাচক পদ

ইত্যাদি তৈরি হয়।

যেমন—

  • লেখক — বিশেষ্য
  • চলন্ত — বিশেষণ
  • বন্ধুত্ব — ভাববাচক বিশেষ্য
  • মধুরতর — বিশেষণ
  • করণীয় — বিশেষণ/নামধর্মী পদ
  • পাঠক — বিশেষ্য

৬৭. কৃদন্ত ও তদ্ধিতান্ত চেনার মহাসূত্র

কৃদন্ত

যদি মূল অংশ ধাতু হয়—

√ধাতু + কৃৎ-প্রত্যয় = কৃদন্ত

যেমন—

  • √চল্ + অন্ত = চলন্ত
  • √পড়্ + উয়া = পড়ুয়া
  • √লড়্ + আই = লড়াই

তদ্ধিতান্ত

যদি মূল অংশ নামশব্দ/প্রাতিপদিক হয়—

নামপ্রকৃতি + তদ্ধিত = তদ্ধিতান্ত

যেমন—

  • ঘর + আমি = ঘরামি
  • বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব
  • মধুর + তা = মধুরতা

৬৮. দ্রুত উদাহরণ-ব্যাংক

শব্দবিশ্লেষণপ্রত্যয়ধরন
পড়ুয়া√পড়্ + উয়াউয়াকৃৎ
নাচুনে√নাচ্ + উনেউনেকৃৎ
লড়াই√লড়্ + আইআইকৃৎ
কাঁদন√কাঁদ্ + অনঅনকৃৎ
চলন্ত√চল্ + অন্তঅন্তকৃৎ
লেখক√লিখ্ + ণক → লেখকণককৃৎ
করণীয়√কৃ + অনীয়অনীয়কৃৎ
কর্তব্য√কৃ + তব্যতব্যকৃৎ
লাজুকলাজ + উকউকতদ্ধিত
বড়াইবড় + আইআইতদ্ধিত
ঘরামিঘর + আমিআমিতদ্ধিত
চাষীচাষ + ঈতদ্ধিত
বন্ধুত্ববন্ধু + ত্বত্বতদ্ধিত
গুরুত্বগুরু + ত্বত্বতদ্ধিত
মধুরতামধুর + তাতাতদ্ধিত
বৈজ্ঞানিকবিজ্ঞান + ইকইকতদ্ধিত
রাজকীয়রাজা + নীয়নীয়তদ্ধিত
শীতলশীত + লতদ্ধিত
মেধাবীমেধা + বিনবিনতদ্ধিত
বাড়িওয়ালাবাড়ি + ওয়ালাওয়ালাবিদেশি উৎসজাত

৬৯. প্রত্যয় নির্ণয়ের পরীক্ষামূলক ছক

যে কোনো শব্দ এভাবে লিখতে হবে—

প্রকৃতি + প্রত্যয় = সাধিত শব্দ

তারপর—

প্রত্যয়ের নাম = কৃৎ/তদ্ধিত

উদাহরণ—

√পড়্ + উয়া = পড়ুয়া — কৃৎ-প্রত্যয়

ঘর + আমি = ঘরামি — তদ্ধিত-প্রত্যয়

বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব — তদ্ধিত-প্রত্যয়

√লড়্ + আই = লড়াই — কৃৎ-প্রত্যয়


৭০. প্রত্যয় চেনার ‘শেষ অংশ’ সূত্র—কিন্তু সতর্কভাবে

শিক্ষার্থীদের জন্য ‘শেষ অংশ দেখো’ একটি কার্যকর প্রাথমিক কৌশল। কিন্তু এটি চূড়ান্ত নিয়ম নয়

যেমন ‘তা’ দেখলেই প্রত্যয় হবে না।

কারণ—

  • কর্তা
  • পাতা
  • কথা

ইত্যাদির শেষ ‘তা’ সব ক্ষেত্রে একই প্রত্যয় নয়।

তাই—

শুধু শেষ অংশ দেখে নয়; মূল শব্দ, অর্থ, ধাতু/প্রাতিপদিক এবং শব্দগঠন—সব বিচার করে প্রত্যয় নির্ণয় করতে হবে।


৭১. প্রত্যয় নির্ণয়ের ৬ প্রশ্ন

কোনো শব্দ দেখলে পরপর এই ছয়টি প্রশ্ন করুন—

প্রশ্ন ১

শব্দটি কি সাধিত?

প্রশ্ন ২

মূল অংশটি কি স্বাধীন শব্দ/প্রাতিপদিক?

প্রশ্ন ৩

নাকি মূল অংশটি ধাতু?

প্রশ্ন ৪

শেষে যুক্ত অংশটি কি নতুন শব্দ তৈরি করেছে?

প্রশ্ন ৫

মূল অংশ ধাতু হলে → কৃৎ।

প্রশ্ন ৬

মূল অংশ নামপ্রকৃতি হলে → তদ্ধিত।


৭২. প্রত্যয় শেখার ‘ধাতু না নাম’ পরীক্ষা

এটি সবচেয়ে কার্যকর সূত্র।

উদাহরণ—

পড়ুয়া

‘পড়’ ক্রিয়ার মূল → ধাতু।

তাই—

√পড়্ + উয়া → কৃৎ

ঘরামি

‘ঘর’ ক্রিয়ার মূল নয়; এটি নামশব্দ।

তাই—

ঘর + আমি → তদ্ধিত


৭৩. প্রত্যয় ও বিভক্তি চেনার মহাসূত্র

দেশী

দেশ + ঈ → নতুন শব্দ।

প্রত্যয়

দেশে

দেশ + এ → নতুন শব্দ নয়; বাক্যে সম্পর্ক।

বিভক্তি

বন্ধুত্ব

বন্ধু + ত্ব → নতুন শব্দ।

প্রত্যয়

বন্ধুকে

বন্ধু + কে → বাক্যগত সম্পর্ক।

বিভক্তি


৭৪. প্রত্যয় ও উপসর্গ চেনার মহাসূত্র

আগে বসলে উপসর্গ।

পরে বসলে প্রত্যয়।

যেমন—

  • প্র + হার = প্রহার → উপসর্গ
  • দেশ + ঈ = দেশী → প্রত্যয়

তবে ‘আগে-পরে’ ছাড়াও অর্থ ও শব্দগঠন বিচার করতে হবে।


৭৫. প্রত্যয়ের সঙ্গে ধ্বনিপরিবর্তনের প্রধান ধরন

প্রত্যয় যোগের সময় প্রধানত—

১. লোপ
২. আগম
৩. আদেশ/পরিবর্তন
৪. গুণ
৫. বৃদ্ধি
৬. সন্ধি/অন্তঃসন্ধিসদৃশ পরিবর্তন
৭. অভিশ্রুতি
৮. দ্বিত্ব

ঘটতে পারে।


৭৬. লোপ

কোনো ধ্বনি বা অংশ বাদ পড়লে লোপ।

যেমন—

রাঁধ্ + না → রান্না

এখানে মূল ধ্বনির পরিবর্তন ও সমীভবন ঘটেছে।


৭৭. আগম

দুটি ধ্বনির সংযোগ সহজ করার জন্য অতিরিক্ত ধ্বনি এলে তাকে আগম বলা যায়।

যেমন—

  • পা + আ → পাওয়া
  • যা + আ → যাওয়া

এখানে ‘ওয়/য়’-জাত মধ্যবর্তী ধ্বনি এসেছে।


৭৮. দ্বিত্ব

একই বা সমজাতীয় ধ্বনির পুনরাবৃত্তি হলে দ্বিত্ব।

যেমন—

  • কাঁদ + না → কান্না
  • রাঁধ + না → রান্না
  • মরমর
  • কাঁদ-কাঁদ

৭৯. গুণ

ই/ঈ → এ

উ/ঊ → ও

ঋ → অর

উদাহরণ—

  • নী → নে
  • ধু → ধো
  • কৃ → কর

৮০. বৃদ্ধি

অ → আ

ই/ঈ/এ → ঐ

উ/ঊ/ও → ঔ

ঋ → আর

উদাহরণ—

  • পচ্ → পাচক
  • শিশু → শৈশব
  • যুব → যৌবন
  • কৃ → কার্য

৮১. নিপাতনে সিদ্ধ

কিছু শব্দ সাধারণ নিয়মে ব্যাখ্যা না হয়ে ঐতিহ্যগত বা বিশেষ নিয়মে সিদ্ধ হয়।

যেমন—

  • গম্ + ক্ত = গত
  • দা + ক্ত = দত্ত
  • লভ্ + ক্ত = লব্ধ
  • সৃজ্ + ক্ত = সৃষ্ট
  • বচ্ + ক্ত = উক্ত

এসব ক্ষেত্রে জোর করে সাধারণ গুণ-বৃদ্ধির সূত্র প্রয়োগ না করে নিপাতনে সিদ্ধ হিসেবে মনে রাখা নিরাপদ।


৮২. প্রকৃতি-প্রত্যয় অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল-সংশোধন

ভুল ১

‘প্রত্যয় চার প্রকার—বিভক্তি, বিকৃতি, তদ্ধিত, ক্রিয়া’—এভাবে সব ব্যাকরণে একসঙ্গে বলা যায় না।

সংশোধন

শব্দগঠনমূলক প্রত্যয়ের প্রধান বিভাজন—

কৃৎ + তদ্ধিত

ভুল ২

‘বিভক্তি প্রত্যয়’-কে কৃৎ/তদ্ধিতের সঙ্গে একই স্তরে রাখা।

সংশোধন

বিভক্তি পৃথক ব্যাকরণিক উপাদান; এটি শব্দগঠন নয়, বাক্যগত সম্পর্ক নির্দেশ করে।

ভুল ৩

যে কোনো শব্দের শেষ অংশই প্রত্যয়।

সংশোধন

মূল শব্দ ও অর্থ বিচার করতে হবে।

ভুল ৪

প্রত্যয় যোগে সব সময় নামপদ হয়।

সংশোধন

বিশেষ্য, বিশেষণসহ বিভিন্ন ধরনের কৃদন্ত/তদ্ধিতান্ত পদ তৈরি হতে পারে।

ভুল ৫

বাংলা ও সংস্কৃত প্রত্যয়কে একই নিয়মে বিশ্লেষণ করা।

সংশোধন

সংস্কৃত প্রত্যয়ের ক্ষেত্রে ইৎ, গুণ, বৃদ্ধি, ধাতুরূপান্তর ইত্যাদি বিশেষ নিয়ম থাকে।

ভুল ৬

বিদেশি শব্দাংশকে সব ক্ষেত্রেই সংস্কৃত ব্যাকরণের অর্থে ‘প্রত্যয়’ বলা।

সংশোধন

এগুলিকে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি উৎসজাত প্রত্যয় বা প্রত্যয়সদৃশ শব্দাংশ বলা অধিক নির্ভুল।


৮৩. শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জন্য প্রত্যয় শেখানোর ধাপ

প্রথম ধাপ : প্রকৃতি চিনুন

শব্দটি কোন মূল থেকে এসেছে?

দ্বিতীয় ধাপ : ধাতু না নাম?

ধাতু হলে কৃৎ-এর দিকে যান।

নাম হলে তদ্ধিতের দিকে যান।

তৃতীয় ধাপ : প্রত্যয় আলাদা করুন

যেমন—

ঘর + আমি

চতুর্থ ধাপ : অর্থ দেখুন

ঘর → ঘরামি

অর্থ ও পদ—দুটিই বদলেছে।

পঞ্চম ধাপ : ধ্বনিগত পরিবর্তন খুঁজুন

যেমন—

কৃ + ঘ্যণ → কার্য

ষষ্ঠ ধাপ : প্রত্যয়ের শ্রেণি লিখুন

কৃৎ/তদ্ধিত + বাংলা/সংস্কৃত/বিদেশি উৎসজাত।


৮৪. ‘প্রত্যয় ধরার’ মাস্টার টেকনিক

সূত্র–১ : আগে মূল খুঁজুন

শব্দ → মূল + অবশিষ্ট অংশ

সূত্র–২ : মূলটি ধাতু কি না দেখুন

ধাতু → কৃৎ

সূত্র–৩ : মূলটি নামশব্দ হলে

নামপ্রকৃতি → তদ্ধিত

সূত্র–৪ : নতুন শব্দ তৈরি হয়েছে কি?

হ্যাঁ → প্রত্যয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

না, শুধু বাক্যগত সম্পর্ক → বিভক্তি।

সূত্র–৫ : আগে বসেছে?

হ্যাঁ → উপসর্গের সম্ভাবনা।

সূত্র–৬ : ধ্বনি বদলেছে?

তাহলে গুণ, বৃদ্ধি, লোপ, আগম, দ্বিত্ব, অভিশ্রুতি ইত্যাদি খুঁজুন।


৮৫. এক মিনিটে কৃৎ ও তদ্ধিত

ধাতু + প্রত্যয় = কৃৎ

নাম + প্রত্যয় = তদ্ধিত

উদাহরণ—

√চল্ + অন্ত = চলন্ত → কৃৎ

বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব → তদ্ধিত


৮৬. এক মিনিটে প্রত্যয় ও বিভক্তি

নতুন শব্দ = প্রত্যয়

বাক্যে সম্পর্ক = বিভক্তি

দেশ + ঈ = দেশী → প্রত্যয়

দেশ + এ = দেশে → বিভক্তি


৮৭. এক মিনিটে প্রত্যয় ও উপসর্গ

আগে = উপসর্গ

পরে = প্রত্যয়

প্র + হার = প্রহার

হার + উক = হারুক—প্রত্যয়জাত উদাহরণে উত্তরাংশ।


৮৮. এক মিনিটে গুণ ও বৃদ্ধি

গুণ

ই → এ
উ → ও
ঋ → অর

বৃদ্ধি

অ → আ
ই/এ → ঐ
উ/ও → ঔ
ঋ → আর


৮৯. এক মিনিটে ইৎ

প্রত্যয়ের যে অংশ ব্যবহারে থাকে না = ইৎ

অনট → অন + ট ইৎ

ক্ত → ত + ক ইৎ

ণক → অক + ণ ইৎ

ঘ্যণ → য/্য + ঘ, ণ ইৎ


৯০. এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ বাংলা কৃৎ-প্রত্যয়

প্রত্যয়উদাহরণ
কাঁদ-কাঁদ
চলা, হাসা
অনবাঁধন, নাচন
অকনাটক, মোড়ক
আইলড়াই, সেলাই
ঢালু, চালু
উয়াপড়ুয়া
উকমিশুক, ভাবুক
হাসি, ভাজি
ইয়া/ইয়েপড়িয়া, গাইয়ে
আলরাখাল, মাতাল
তিচলতি, ঘাটতি
নাখেলনা, ঝরনা
আনিজ্বালানি, শুনানি
আরুসাঁতারু
আওচড়াও
আন/আনোজানান, নাচানো
অলপিছল, ফাটল
অন্তচলন্ত, উড়ন্ত
তাফিরতা
অনাবাজনা, খেলনা
অতফেরত

৯১. এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃত কৃৎ-প্রত্যয়

প্রত্যয়উদাহরণ
অনটস্থান, ভোজন, দর্শন
ক্তলিখিত, গত, উক্ত
ক্তিগতি, মুক্তি, ভক্তি
তব্যকর্তব্য, দাতব্য
অনীয়করণীয়, দর্শনীয়
তৃচ্দাতা, মাতা
ণকপাঠক, লেখক
ঘ্যণকার্য, যোগ্য
গম্য, লভ্য
ণিন্গামী, গ্রাহী
শানচ্চলমান, বর্ধমান
ঘঞ্ত্যাগ, যোগ, ক্রোধ

৯২. এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ বাংলা তদ্ধিত-প্রত্যয়

প্রত্যয়উদাহরণ
চোরা, রোগা
আইবড়াই, মিঠাই
আমি/মিঘরামি, ছেলেমি
ই/ঈচাষী, সরকারি
ইয়া/এসেকেলে, পাথুরে
উয়া/ওঘরোয়া, মেঠো
উকলাজুক
আলদাঁতাল
আলিঘটকালি
উড়িয়াকাঠুরিয়া
আটিয়াভাড়াটে
লামেঘলা
ত্ববন্ধুত্ব
তাশত্রুতা
ইকবৈজ্ঞানিক, সামাজিক
নীয়রাজকীয়
বিনমেধাবী
তরপ্রিয়তর
তমপ্রিয়তম

৯৩. এক নজরে বিদেশি উৎসজাত শব্দাংশ

শব্দাংশউদাহরণ
ওয়ালাবাড়িওয়ালা
ওয়ানগাড়োয়ান
আনা/আনিমুনশিয়ানা
পনাছেলেপনা
সাপানসে
গরকারিগর
দারচৌকিদার
বাজধোঁকাবাজ
বন্দীজবানবন্দী
সইটেকসই

৯৪. পরীক্ষায় প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয়ের আদর্শ উত্তর

প্রশ্ন : ‘পড়ুয়া’ শব্দের প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় করো।

উত্তর :

√পড়্ + উয়া = পড়ুয়া

এখানে ‘পড়্’ ক্রিয়াপ্রকৃতি এবং ‘উয়া’ কৃৎ-প্রত্যয়। অতএব ‘পড়ুয়া’ কৃদন্ত পদ।


প্রশ্ন : ‘ঘরামি’ শব্দের প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় করো।

উত্তর :

ঘর + আমি = ঘরামি

এখানে ‘ঘর’ নামপ্রকৃতি এবং ‘আমি’ তদ্ধিত-প্রত্যয়। অতএব ‘ঘরামি’ তদ্ধিতান্ত পদ।


প্রশ্ন : ‘বন্ধুত্ব’ শব্দের প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় করো।

উত্তর :

বন্ধু + ত্ব = বন্ধুত্ব

‘বন্ধু’ নামপ্রকৃতি; ‘ত্ব’ সংস্কৃত তদ্ধিত-প্রত্যয়।


প্রশ্ন : ‘কর্তব্য’ শব্দের প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় করো।

উত্তর :

√কৃ + তব্য = কর্তব্য

‘কৃ’ ধাতু; ‘তব্য’ সংস্কৃত কৃৎ-প্রত্যয়।


৯৫. ছাত্রছাত্রীদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ‘৪ বাক্যের সূত্র’

প্রত্যয় অধ্যায়ের বিশাল অংশকে চারটি বাক্যে মনে রাখা যায়—

১. ধাতুর সঙ্গে কৃৎ।

২. নামপ্রকৃতির সঙ্গে তদ্ধিত।

৩. নতুন শব্দ হলে প্রত্যয়; শুধু বাক্যগত সম্পর্ক হলে বিভক্তি।

৪. আগে বসলে উপসর্গ, পরে বসলে প্রত্যয়।


৯৬. ‘প্রত্যয়’ শেখার ১০টি সোনার সূত্র

সূত্র ১

ধাতু দেখলে √ চিহ্ন।

সূত্র ২

ধাতু + প্রত্যয় = কৃদন্ত।

সূত্র ৩

নামপ্রকৃতি + প্রত্যয় = তদ্ধিতান্ত।

সূত্র ৪

নতুন শব্দ = প্রত্যয়।

সূত্র ৫

কারক/সম্পর্ক = বিভক্তি।

সূত্র ৬

আগে বসে = উপসর্গ।

সূত্র ৭

ই→এ, উ→ও, ঋ→অর = গুণ।

সূত্র ৮

অ→আ, ই/এ→ঐ, উ/ও→ঔ, ঋ→আর = বৃদ্ধি।

সূত্র ৯

সংস্কৃত প্রত্যয়ের লোপপ্রাপ্ত অংশ = ইৎ।

সূত্র ১০

শুধু শেষাংশ নয়—মূল + অর্থ + গঠন বিচার করে প্রত্যয় নির্ণয়।


৯৭. প্রত্যয় শেখার ‘৩ প্রশ্নের মহাসূত্র’

যে কোনো শব্দ দেখেই শুধু তিনটি প্রশ্ন করুন—

প্রশ্ন ১ : কী থেকে তৈরি?

ধাতু?

→ কৃৎ।

নাম?

→ তদ্ধিত।

প্রশ্ন ২ : নতুন শব্দ হয়েছে?

হ্যাঁ?

→ প্রত্যয়।

না, শুধু বাক্যের সম্পর্ক?

→ বিভক্তি।

প্রশ্ন ৩ : শব্দে কোনো পরিবর্তন হয়েছে?

হ্যাঁ?

→ লোপ/আগম/গুণ/বৃদ্ধি/দ্বিত্ব/সন্ধি-জাত পরিবর্তন খুঁজুন।


৯৮. প্রত্যয় শেখার ‘শব্দ ভাঙো’ পদ্ধতি

যেমন—

বন্ধুত্ব

বন্ধু | ত্ব

বন্ধু = মূল

ত্ব = প্রত্যয়

নামপ্রকৃতি + তদ্ধিত


পড়ুয়া

পড়্ | উয়া

ধাতু + কৃৎ

কৃদন্ত


রামকে

রাম | কে

নতুন শব্দ নয়

বাক্যগত সম্পর্ক

বিভক্তি


৯৯. ভুল প্রত্যয় ধরার ৫টি কারণ

১. শুধু শব্দের শেষ অক্ষর দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
২. ধাতু ও নামপ্রকৃতির পার্থক্য না বোঝা।
৩. বিভক্তিকে প্রত্যয় ভাবা।
৪. উপসর্গকে প্রত্যয় ভাবা।
৫. সংস্কৃত প্রত্যয়ের ইৎ-লোপ ও ধ্বনিপরিবর্তন না জানা।


১০০. শিক্ষক-শিক্ষিকার জন্য পাঠদানের সেরা ক্রম

প্রত্যয় অধ্যায় পড়ানোর সময় এই ক্রম অনুসরণ করলে শিক্ষার্থীর কাছে বিষয়টি অনেক সহজ হয়—

ধাতু → প্রাতিপদিক → প্রকৃতি → প্রত্যয় → কৃৎ → কৃদন্ত → তদ্ধিত → তদ্ধিতান্ত → ইৎ → গুণ → বৃদ্ধি → ধ্বনিপরিবর্তন → বিভক্তি থেকে পার্থক্য → উপসর্গ থেকে পার্থক্য → প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয়।

এভাবে পড়ালে শিক্ষার্থী প্রথমে ধারণা, পরে শ্রেণিবিভাগ, তারপর উদাহরণ এবং শেষে পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণ শিখতে পারে।


১০১. পূর্ণাঙ্গ ধারণা : একটি শব্দকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

যেমন ‘বৈজ্ঞানিক’ শব্দটি নিন।

বিজ্ঞান + ইক → বৈজ্ঞানিক

এখানে—

১. ‘বিজ্ঞান’ নামপ্রকৃতি।
২. ‘ইক’ তদ্ধিত প্রত্যয়।
৩. সংস্কৃত প্রত্যয়যোগে শব্দের স্বরপরিবর্তন ঘটেছে।
৪. নতুন শব্দের অর্থ—বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৫. অতএব এটি তদ্ধিতান্ত।

এই ধরনের বিশ্লেষণই প্রকৃতি-প্রত্যয় অধ্যায়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য।


১০২. চূড়ান্ত ‘মাস্টার চার্ট’

                    প্রত্যয়
                       │
             ┌─────────┴─────────┐
             │                   │
          কৃৎ-প্রত্যয়        তদ্ধিত-প্রত্যয়
             │                   │
          ধাতুর সঙ্গে          নামপ্রকৃতির সঙ্গে
             │                   │
          কৃদন্ত               তদ্ধিতান্ত

আর বিভক্তি—

বিভক্তি
  ↓
বাক্যে সম্পর্ক/কারক নির্দেশ
  ↓
নতুন শব্দ সৃষ্টি করে না

উপসর্গ—

উপসর্গ
  ↓
শব্দ/ধাতুর আগে
  ↓
অর্থের পরিবর্তন/সম্প্রসারণ

১০৩. সর্বশেষ স্মরণসূত্র : ‘ধা–না–পরে–নতুন’

প্রত্যয় মনে রাখার জন্য সবচেয়ে ছোট সূত্র—

ধা–না–পরে–নতুন

ধা = ধাতু হলে → কৃৎ
না = নামপ্রকৃতি হলে → তদ্ধিত
পরে = প্রত্যয় পরে বসে
নতুন = নতুন শব্দ তৈরি করে

আর বিভক্তি—

নতুন নয়, সম্পর্কময়।


১০৪. এক লাইনের মহাসূত্র

“ধাতুর পরে কৃৎ, নামের পরে তদ্ধিত; পরে বসে নতুন শব্দ গড়ে প্রত্যয়, আর বাক্যের সম্পর্ক দেখায় বিভক্তি।”


১০৫. পরীক্ষার আগে শেষ মুহূর্তের ‘প্রত্যয় মন্ত্র’

প্রকৃতি + প্রত্যয় = সাধিত শব্দ।

ধাতু + কৃৎ = কৃদন্ত।

নামপ্রকৃতি + তদ্ধিত = তদ্ধিতান্ত।

নতুন শব্দ = প্রত্যয়।

কারক/সম্পর্ক = বিভক্তি।

আগে = উপসর্গ।

ই→এ, উ→ও, ঋ→অর = গুণ।

অ→আ, ই→ঐ, উ→ঔ, ঋ→আর = বৃদ্ধি।

লোপপ্রাপ্ত সংস্কৃত প্রত্যয়াংশ = ইৎ।

শুধু শেষাংশ নয়—মূল, অর্থ ও গঠন বিচার করো।


১০৬. পরিশিষ্ট : অতি-সংক্ষিপ্ত পুনরাবৃত্তি

প্রকৃতি

প্রত্যয়সাধিত শব্দের মূল অংশ।

প্রাতিপদিক

বিভক্তিহীন নামশব্দ।

ধাতু

ক্রিয়ার মূল।

প্রত্যয়

ধাতু বা শব্দের পরে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠনকারী বর্ণ/বর্ণসমষ্টি।

কৃৎ-প্রত্যয়

ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়।

কৃদন্ত

কৃৎ-প্রত্যয়সাধিত শব্দ।

তদ্ধিত-প্রত্যয়

নামপ্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়।

তদ্ধিতান্ত

তদ্ধিত-প্রত্যয়সাধিত শব্দ।

ইৎ

সংস্কৃত প্রত্যয়ের লোপপ্রাপ্ত অংশ।

গুণ

ই→এ, উ→ও, ঋ→অর।

বৃদ্ধি

অ→আ, ই/এ→ঐ, উ/ও→ঔ, ঋ→আর।

উপসর্গ

আগে বসে।

বিভক্তি

বাক্যগত সম্পর্ক নির্দেশ করে।


১০৭. সমগ্র অধ্যায়ের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ ফর্মুলা’

প্রকৃতি চেনো → ধাতু না নাম দেখো → প্রত্যয় আলাদা করো → কৃৎ/তদ্ধিত নির্ণয় করো → ধ্বনিপরিবর্তন দেখো → বিভক্তি/উপসর্গ থেকে আলাদা করো।

আর একেবারে মুখস্থ করার মতো করে—

ধাতু → কৃৎ → কৃদন্ত

নাম → তদ্ধিত → তদ্ধিতান্ত

আগে → উপসর্গ

পরে → প্রত্যয়

নতুন শব্দ → প্রত্যয়

বাক্যের সম্পর্ক → বিভক্তি

ই→এ, উ→ও, ঋ→অর → গুণ

অ→আ, ই/এ→ঐ, উ/ও→ঔ, ঋ→আর → বৃদ্ধি

সংস্কৃত প্রত্যয়ের লোপ → ইৎ


উপসংহার

প্রত্যয় কেবল একটি ব্যাকরণিক সংজ্ঞা নয়; এটি বাংলা শব্দভাণ্ডার সৃষ্টির এক শক্তিশালী প্রক্রিয়া। একটি ধাতু থেকে ‘চলন্ত’, ‘চলতি’, ‘চালক’, ‘চালনা’, ‘চলন’—বিভিন্ন অর্থ ও পদ তৈরি হতে পারে; আবার একটি নামশব্দ থেকে ‘বন্ধু’, ‘বন্ধুত্ব’, ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ ইত্যাদি বহু নতুন শব্দের জন্ম হয়। ফলে প্রত্যয় জানার অর্থ শুধু কয়েকটি প্রত্যয়ের তালিকা মুখস্থ করা নয়—শব্দ কীভাবে জন্ম নেয়, কীভাবে তার অর্থ বদলে যায়, কীভাবে ধ্বনি রূপান্তরিত হয় এবং কীভাবে ভাষার শব্দভাণ্ডার ক্রমে বিস্তৃত হয়—সেই সৃষ্টিশীল ব্যাকরণিক প্রক্রিয়াকে বোঝা।

প্রকৃতি হল শব্দগঠনের ভিত্তি; প্রত্যয় সেই ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দের জন্ম দেয়। কৃৎ-প্রত্যয় ধাতুকে শব্দে রূপান্তরিত করে, তদ্ধিত-প্রত্যয় নামপ্রকৃতিকে নতুন অর্থ ও নতুন রূপ দেয়; আর গুণ, বৃদ্ধি, লোপ, আগম, দ্বিত্ব, অভিশ্রুতি প্রভৃতি ধ্বনিগত প্রক্রিয়া সেই শব্দগঠনকে আরও সমৃদ্ধ করে।

সুতরাং প্রকৃতি ও প্রত্যয় অধ্যায়ের সারকথা একটিই—

“শব্দের মূলকে চেনো, তার সঙ্গে যুক্ত অংশকে চিনো, পরিবর্তনের নিয়ম বোঝো; তাহলেই শব্দের অন্তর্গত ব্যাকরণকে পড়া যায়।”

 
### পরিবেশনে- ড. অনিশ রায়
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top