সংজ্ঞা, শ্রেণিবিভাগ, বিভক্তিগ্রাহী রূপ ও প্রয়োগ
১. সর্বনাম : সংজ্ঞা ও ধারণা
‘সর্বনাম’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ—সকল নামের পরিবর্তে ব্যবহৃত নাম। সংস্কৃত সর্ব + নাম থেকে ‘সর্বনাম’ শব্দটির উৎপত্তি। কথাবার্তা বা লেখায় একই বিশেষ্য বা ব্যক্তিনাম বারবার ব্যবহার করলে ভাষা যেমন পুনরুক্তিদোষে ভারাক্রান্ত হয়, তেমনি বক্তব্যের স্বাভাবিকতা ও সৌন্দর্যও নষ্ট হয়। সেই পুনরাবৃত্তি এড়ানোর জন্য বিশেষ্যের পরিবর্তে যে পদ ব্যবহৃত হয়, তাকে সর্বনাম পদ বলে।
সংজ্ঞা
বিশেষ্য পদের পরিবর্তে যে পদ ব্যবহৃত হয়, তাকে সর্বনাম পদ বলে।
যেমন—
রাহুল আজ স্কুলে গেছে। রাহুল স্কুল থেকে ফিরে রাহুলের বইটি নিয়ে পড়তে বসবে।
এখানে ‘রাহুল’ নামটির পুনরাবৃত্তি হয়েছে। সর্বনাম ব্যবহার করলে—
রাহুল আজ স্কুলে গেছে। সে স্কুল থেকে ফিরে তার বইটি নিয়ে পড়তে বসবে।
এখানে ‘সে’ ও ‘তার’—দুটি সর্বনাম; এগুলি ‘রাহুল’-এর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে।
আরও একটি উদাহরণ—
মিতা একটি বই কিনেছে। বইটি খুব সুন্দর।
এখানে দ্বিতীয় বাক্যে ‘বইটি’ আর সর্বনাম নয়; এটি বিশেষ্যপদ। কিন্তু—
মিতা একটি বই কিনেছে। এটি খুব সুন্দর।
এখানে ‘এটি’ ‘বই’-এর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে, তাই ‘এটি’ সর্বনাম।
২. সর্বনামের প্রধান বৈশিষ্ট্য
সর্বনামকে শুধু ‘বিশেষ্যের পরিবর্তে ব্যবহৃত পদ’ বললে ধারণাটি সম্পূর্ণ হয় না। সর্বনামের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য মনে রাখা প্রয়োজন।
ক. সর্বনাম সাধারণত বিশেষ্যের পুনরাবৃত্তি রোধ করে
রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি বিশ্বসাহিত্যে বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন।
এখানে ‘তিনি’ = রবীন্দ্রনাথ।
খ. সর্বনাম ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, সমষ্টি বা অজ্ঞাত সত্তাকে নির্দেশ করতে পারে
সে এসেছে।
এটি আমার বই।
কে এসেছে?
কেউ দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
সবাই চলে গেছে।
গ. সর্বনামের সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত হতে পারে
আমি → আমাকে → আমার → আমায়
তুমি → তোমাকে → তোমার → তোমায়
সে → তাকে → তার → তাকে
ঘ. সর্বনামের সঙ্গে নির্দেশ, প্রশ্ন, অনির্দিষ্টতা, আত্মভাব, সমষ্টি ইত্যাদি অর্থ প্রকাশিত হতে পারে।
৩. সর্বনাম ও সর্বনামস্থানীয় পদের পার্থক্য
এটি সর্বনাম অধ্যায়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একটি পদ সর্বনাম হবে কি না, তা অনেক সময় তার বাক্যে ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে।
যেমন—
এই বইটি আমার।
এখানে ‘এই’ ‘বইটি’-কে নির্দেশ করছে; ‘এই’ নিজে বইয়ের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়নি। তাই এখানে ‘এই’ সর্বনাম নয়; সর্বনামস্থানীয় বিশেষণ/নির্দেশক বিশেষণ।
কিন্তু—
এটি আমার।
এখানে ‘এটি’ ‘বইটি’-র পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই ‘এটি’ সর্বনাম।
একইভাবে—
কোন বইটি তোমার?
এখানে ‘কোন’ ‘বই’-এর বিশেষত্ব জানতে চাইছে; এটি সর্বনামস্থানীয় বিশেষণ।
কিন্তু—
কোনটি তোমার?
এখানে ‘কোনটি’ সরাসরি কোনো বস্তুর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে; তাই এটি প্রশ্নবাচক সর্বনাম।
মনে রাখুন
বিশেষ্যের আগে বসে বিশেষ্যকে নির্দিষ্ট/প্রশ্ন/নির্দেশ করলে → সর্বনামস্থানীয় বিশেষণ।
বিশেষ্যের পরিবর্তে স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হলে → সর্বনাম।
৪. সর্বনামের শ্রেণিবিভাগ
বাংলা ব্যাকরণে অর্থ, ব্যবহার ও গঠন অনুসারে সর্বনামের বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ দেখা যায়। প্রচলিত ও শিক্ষার্থীবান্ধব শ্রেণিবিভাগে প্রধানত নিম্নলিখিত প্রকারগুলি উল্লেখ করা হয়—
১. ব্যক্তিবাচক বা পুরুষবাচক সর্বনাম
২. নির্দেশক সর্বনাম
৩. অনির্দেশক সর্বনাম
৪. প্রশ্নবাচক সর্বনাম
৫. সাপেক্ষ বা নিত্যসম্বন্ধী সর্বনাম
৬. আত্মবাচক সর্বনাম
৭. অন্যাদিবাচক সর্বনাম
৮. সাকল্যবাচক সর্বনাম
৯. যৌগিক বা সংযোগমূলক সর্বনাম
তবে মনে রাখতে হবে, ব্যাকরণগ্রন্থভেদে এই শ্রেণিবিভাগের নাম ও সংখ্যা কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। একই সর্বনাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ ও ব্যবহার অনুসারে একাধিক শ্রেণির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
৫. ব্যক্তিবাচক বা পুরুষবাচক সর্বনাম
সংজ্ঞা
ব্যক্তির নামের পরিবর্তে যে সর্বনাম ব্যবহৃত হয়, তাকে ব্যক্তিবাচক বা পুরুষবাচক সর্বনাম বলে।
যেমন—
আমি, আমরা, তুমি, তোমরা, তুই, তোরা, আপনি, আপনারা, সে, তারা, তিনি, তাঁরা ইত্যাদি।
উদাহরণ—
রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন চিন্তার সূচনা করেন।
এখানে ‘তিনি’ = রবীন্দ্রনাথ।
ব্যক্তিবাচক সর্বনামের পুরুষভেদ
বাংলা ভাষায় ব্যক্তিবাচক সর্বনামকে সাধারণত তিন পুরুষে ভাগ করা হয়।
ক. উত্তম পুরুষ
যে ব্যক্তি নিজের কথা বলে, তাকে বোঝায়।
একবচন: আমি
বহুবচন: আমরা
আমি আজ যাব।
আমরা আগামীকাল কলকাতায় যাব।
খ. মধ্যম পুরুষ
যাকে উদ্দেশ করে কথা বলা হয়, তাকে বোঝায়।
ঘনিষ্ঠ/অন্তরঙ্গ: তুই, তোরা
সাধারণ: তুমি, তোমরা
সম্মানসূচক: আপনি, আপনারা
তুমি কোথায় যাবে?
আপনি কেমন আছেন?
গ. নামপুরুষ বা তৃতীয় পুরুষ
যার সম্পর্কে কথা বলা হয়, তাকে বোঝায়।
সাধারণ: সে, তারা
সম্মানসূচক: তিনি, তাঁরা
সে আজ স্কুলে গেছে।
তিনি আজ বক্তৃতা দেবেন।
গুরুত্বপূর্ণ
‘পুরুষ’ শব্দটি এখানে জৈবিক লিঙ্গ বোঝায় না। ব্যাকরণে পুরুষ বলতে বক্তা, শ্রোতা ও আলোচ্য ব্যক্তির সম্পর্ক বোঝানো হয়।
৬. নির্দেশক সর্বনাম
সংজ্ঞা
নিকটবর্তী বা দূরবর্তী কোনো ব্যক্তি, বস্তু, স্থান বা বিষয়কে নির্দেশ করার জন্য যে সর্বনাম ব্যবহৃত হয়, তাকে নির্দেশক সর্বনাম বলে।
যেমন—
এ, এই, এটি, ইনি, ও, ওই, ওটি, উনি, ইহা, উহা ইত্যাদি।
নির্দেশক সর্বনাম প্রধানত দুই ধরনের—
ক. নিকট নির্দেশক
কাছের ব্যক্তি বা বস্তুকে নির্দেশ করে।
যেমন—
এ, এই, এটি, ইনি, এইটি
এটি আমার কলম।
ইনি আমাদের শিক্ষক।
খ. দূর নির্দেশক
দূরের ব্যক্তি বা বস্তুকে নির্দেশ করে।
যেমন—
ও, ওই, ওটি, উনি, উহা ইত্যাদি।
ওটি আমার বাড়ি।
উনি আমাদের প্রধান শিক্ষক।
আধুনিক বাংলায়
‘ইহা’, ‘উহা’ ইত্যাদি সাধুভাষায় বা আনুষ্ঠানিক ব্যবহারে বেশি দেখা যায়; চলিত ভাষায় ‘এটি’, ‘ওটি’, ‘এটা’, ‘ওটা’ বেশি প্রচলিত।
৭. অনির্দেশক সর্বনাম
সংজ্ঞা
যে সর্বনাম দ্বারা কোনো অনির্দিষ্ট ব্যক্তি, বস্তু বা সত্তাকে বোঝানো হয়, তাকে অনির্দেশক সর্বনাম বলে।
যেমন—
কেউ, কিছু, কেউ-কেউ, কিছু-কিছু, যে-কেউ, যা-কিছু, কারও, কোথাও ইত্যাদি।
উদাহরণ—
কেউ দরজায় এসেছে।
কিছু খেতে চাই।
কেউ-কেউ এখনও আসেনি।
যে-কেউ এই কাজটি করতে পারে।
এখানে ‘কেউ’ বা ‘কিছু’ দ্বারা নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তু বোঝানো হয়নি।
৮. প্রশ্নবাচক সর্বনাম
সংজ্ঞা
যে সর্বনামের সাহায্যে কোনো ব্যক্তি, বস্তু, পরিচয়, সংখ্যা, অধিকার বা বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তাকে প্রশ্নবাচক সর্বনাম বলে।
যেমন—
কে, কী, কার, কাকে, কাদের, কোনটি, কীটি ইত্যাদি।
উদাহরণ—
কে এসেছে?
কী চাও?
কার বইটি?
কাকে ডাকছ?
কোনটি তোমার?
‘কি’ ও ‘কী’—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বাংলা বানানে ‘কি’ এবং ‘কী’ এক নয়।
‘কি’
‘কি’ সাধারণত এমন প্রশ্নে ব্যবহৃত হয় যার উত্তর হ্যাঁ/না হতে পারে। এটি অব্যয়জাতীয় প্রশ্নসূচক পদ।
তুমি কি আজ যাবে?
উত্তর হতে পারে—
হ্যাঁ, যাব।
না, যাব না।
‘কী’
‘কী’ কোনো ব্যক্তি/বস্তু/বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যবহৃত হয় এবং সর্বনাম হিসেবে কাজ করতে পারে।
তুমি কী খাবে?
সে কী বলেছে?
কী হয়েছে?
এখানে ‘কী’-এর উত্তরে কোনো নির্দিষ্ট বস্তু, বিষয় বা পরিচয় আসবে।
সহজ সূত্র
হ্যাঁ/না-উত্তর → ‘কি’
কোন জিনিস/কোন বিষয়/কী পরিচয়—এর উত্তর চাই → ‘কী’
তবে মনে রাখতে হবে, ‘কী’ সব ক্ষেত্রেই সর্বনাম নয়। যেমন—
কী সুন্দর দৃশ্য!
এখানে ‘কী’ বিস্ময়সূচক/পরিমাণসূচক অর্থে ব্যবহৃত; তাই শুধু বানান দেখে পদ নির্ণয় করা যাবে না—বাক্যে তার কাজ দেখতে হবে।
৯. সাপেক্ষ বা নিত্যসম্বন্ধী সর্বনাম
সংজ্ঞা
যে সর্বনাম সাধারণত একটি সাপেক্ষ পদ বা অংশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং একটি অংশের সঙ্গে অন্য অংশের সম্বন্ধ নির্দেশ করে, তাকে সাপেক্ষ বা নিত্যসম্বন্ধী সর্বনাম বলে।
এর প্রচলিত রূপ—
যে—সে
যিনি—তিনি
যাঁরা—তাঁরা
যা—তা
যারা—তারা
যে—সে
যত—তত
যেমন—তেমন
উদাহরণ—
যে পরিশ্রম করে, সে সফল হয়।
যিনি সত্য বলেন, তিনি সম্মানিত হন।
যারা পরিশ্রমী, তারা জীবনে সফল হয়।
যেমন কর্ম, তেমন ফল।
এখানে প্রথম অংশটি দ্বিতীয় অংশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে।
মনে রাখুন
যে → সে
যিনি → তিনি
যা → তা
যারা → তারা
যেমন → তেমন
যত → তত
এই সম্পর্কই ‘সাপেক্ষতা’র মূল বৈশিষ্ট্য।
১০. আত্মবাচক সর্বনাম
সংজ্ঞা
যে সর্বনাম দ্বারা কোনো ব্যক্তি নিজের সত্তা, নিজস্বতা বা আত্মপরিচয়কে বিশেষভাবে নির্দেশ করে, তাকে আত্মবাচক সর্বনাম বলে।
যেমন—
নিজ, নিজে, নিজেকে, নিজের, স্বয়ং, খোদ ইত্যাদি।
উদাহরণ—
সে নিজে কাজটি করেছে।
আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছি।
তিনি স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন।
প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন করো।
‘আপনি’ সম্পর্কে সতর্কতা
‘আপনি’ প্রধানত সম্মানসূচক মধ্যম পুরুষের ব্যক্তিবাচক সর্বনাম—
আপনি কেমন আছেন?
কিন্তু প্রাচীন/কাব্যিক/বিশেষ প্রয়োগে ‘আপনি’ কখনও ‘নিজে’ অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে—
আপনি সে কাজ করলেন।
তাই ‘আপনি’ দেখেই আত্মবাচক সর্বনাম বলা ঠিক নয়। বাক্যে তার অর্থ ও ভূমিকা বিচার করতে হবে।
১১. অন্যাদিবাচক সর্বনাম
সংজ্ঞা
যে সর্বনামের দ্বারা কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর পরিবর্তে অন্য, অপর, বিকল্প বা ভিন্ন ব্যক্তি/বস্তুকে বোঝানো হয়, তাকে অন্যাদিবাচক সর্বনাম বলে।
যেমন—
অন্য, অপর, অন্যান্য, অপরে ইত্যাদি।
উদাহরণ—
অপরে কী বলবে, তা ভেবে কাজ করা যায় না।
একজন চলে গেল, অপরজন এসে দাঁড়াল।
তবে ‘অন্য’, ‘অপর’ ইত্যাদি শব্দ অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ্যের আগে বসে বিশেষণরূপেও ব্যবহৃত হতে পারে। তাই এখানেও ব্যবহারভেদে পদ নির্ণয় করতে হবে।
১২. সাকল্যবাচক সর্বনাম
সংজ্ঞা
যে সর্বনাম দ্বারা কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর সমষ্টির সকল সদস্যকে একত্রে বোঝানো হয়, তাকে সাকল্যবাচক সর্বনাম বলে।
যেমন—
সবাই, সকলে, সকল, সব, উভয়, প্রত্যেকে ইত্যাদি।
উদাহরণ—
সবাই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল।
সকলে তাকে অভিনন্দন জানাল।
উভয়েই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন করল।
বিশেষ সতর্কতা
‘সব’, ‘সকল’, ‘প্রত্যেক’ ইত্যাদি শব্দ কখনও বিশেষ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশেষণ/নির্ধারকসুলভ কাজ করতে পারে—
সব ছাত্র এসেছে।
কিন্তু—
সবাই এসেছে।
দ্বিতীয় বাক্যে ‘সবাই’ স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হয়ে ব্যক্তিসমষ্টির পরিবর্তে দাঁড়িয়েছে; তাই এটি সর্বনাম।
১৩. যৌগিক বা সংযোগমূলক সর্বনাম
সংজ্ঞা
একাধিক সর্বনামজাতীয় উপাদান বা সর্বনামমূলক অংশের সংযোগে যে সর্বনামধর্মী রূপ গঠিত হয়, তাকে যৌগিক বা সংযোগমূলক সর্বনাম বলা হয়।
যেমন—
যে-কেউ, যা-কিছু, যে-সে, কেউ-একজন, কেউ-কেউ ইত্যাদি।
উদাহরণ—
যে-কেউ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
যা-কিছু ঘটেছে, সব আমাকে বলো।
কেউ-একজন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
শুধু একই সর্বনাম পরপর দুবার বসালেই তাকে যৌগিক সর্বনাম বলা যাবে না।
যেমন—
কে কে যাবে?
যারা যারা আসতে চায়, তারা আসুক।
এখানে ‘কে কে’, ‘যারা যারা’—দ্বিত্বপ্রয়োগ ঘটেছে; এগুলিকে শুধুমাত্র দ্বিত্বের কারণে যৌগিক সর্বনাম বলা ঠিক নয়।
দ্বিত্ব ≠ যৌগিকতা।
১৪. সর্বনামের বিভক্তিগ্রাহী রূপ
বাংলা ভাষার সর্বনাম-ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—বিভক্তি যুক্ত হলে বহু সর্বনামের মূল রূপ পরিবর্তিত হয়।
সংজ্ঞা
কোনো সর্বনামের সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত হওয়ার ফলে সর্বনামটির যে পরিবর্তিত রূপ প্রকাশ পায়, তাকে সেই সর্বনামের বিভক্তিগ্রাহী রূপ বলা হয়।
যেমন—
আমি + কে = আমাকে
তুমি + কে = তোমাকে
সে + কে = তাকে
এখানে—
আমি → আমা
তুমি → তোমা
সে → তা
এই পরিবর্তিত রূপগুলিই বিভক্তিগ্রাহী রূপ।
১৫. ‘কারক’ ও বিভক্তিগ্রাহী রূপ : একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন
অনেক ব্যাকরণগ্রন্থে বলা হয়—
“কর্তৃকারক ছাড়া অন্য কারকে সর্বনাম পদে বিভক্তি যোগ করলে সর্বনামের যে রূপান্তর ঘটে, তাকে বিভক্তিগ্রাহী রূপ বলে।”
এই সংজ্ঞাটি সর্বক্ষেত্রে যথাযথ নয়।
কারণ সর্বনামের বিভক্তিগ্রাহী রূপ নির্ধারণের মূল বিষয় কারক নয়; মূল বিষয় হল বিভক্তি যুক্ত হওয়ার ফলে সর্বনামের রূপান্তর।
বিশেষ করে ভাববাচ্যের বাক্যে কর্তৃকারকেও বিভক্তিযুক্ত সর্বনামের পরিবর্তিত রূপ দেখা যায়।
যেমন—
আমাকে যেতে হবে।
এখানে ‘আমাকে’-এর ‘কে’ বিভক্তি কর্তৃকারকের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আবার—
আমার যাওয়া হবে না।
এখানে ‘আমার’-এর ‘র’ বিভক্তিযুক্ত রূপও কর্তৃকারক-সম্পর্কিত।
অতএব—
মূল সূত্র
কারক নয়, বিভক্তি-প্রয়োগের ফলে সর্বনামের রূপান্তরই এখানে মুখ্য।
১৬. কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সর্বনামের বিভক্তিগ্রাহী রূপ
‘আমি’
আমি → আমাকে → আমার → আমায়
উদাহরণ—
আমি যাব।
আমাকে ডাকো।
আমার বই।
আমাকে আমায় বলে ডাকো। — কাব্যিক/বিশেষ প্রয়োগে।
‘তুমি’
তুমি → তোমাকে → তোমার → তোমায়
‘সে’
সে → তাকে → তার → তাতে/তাকে প্রভৃতি প্রসঙ্গভেদে
‘তিনি’
তিনি → তাঁকে → তাঁর
‘তারা’
তারা → তাদের → তাদেরকে/তাদেরই ইত্যাদি
‘যে’
যে → যাকে → যার → যাদের
‘যিনি’
যিনি → যাঁকে → যাঁর → যাঁরা
‘যা’
যা → যাকে → যার → যাতে
‘কে’
কে → কাকে → কার → কাদের
১৭. সর্বনামের রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ছক
| মূল সর্বনাম | বিভক্তিযুক্ত রূপ |
|---|---|
| আমি | আমাকে, আমার |
| তুমি | তোমাকে, তোমার |
| তুই | তোকে, তোর |
| সে | তাকে, তার |
| তিনি | তাঁকে, তাঁর |
| আমরা | আমাদের |
| তোমরা | তোমাদের |
| তারা | তাদের |
| যে | যাকে, যার |
| যিনি | যাঁকে, যাঁর |
| যা | যাকে, যার |
| কে | কাকে, কার |
| কেউ | কাউকে, কারও |
| কী | কীকে নয়; প্রসঙ্গভেদে কী, কিসে, কিসের ইত্যাদি |
‘কেউ’-এর বিশেষ রূপ
কেউ → কাউকে → কারও/কারো → কারওকে নয়
উদাহরণ—
কেউ আসেনি।
কাউকে দেখিনি।
কারও সঙ্গে কথা বলিনি।
১৮. ‘এই’, ‘ওই’, ‘সে’, ‘তা’—সবসময় একই ধরনের সর্বনাম নয়
বাংলায় সর্বনাম নির্ণয়ের সময় শুধু শব্দ মুখস্থ করলে চলবে না; বাক্যে তার কাজ দেখতে হবে।
তুলনা করুন—
এই বইটি আমার।
এখানে ‘এই’ বইকে নির্দেশ করছে; তাই এটি বিশেষণের কাজ করছে।
এটি আমার।
এখানে ‘এটি’ বইয়ের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে; তাই এটি সর্বনাম।
আবার—
সে ভালো ছেলে।
এখানে ‘সে’ = একজন ব্যক্তি; সর্বনাম।
সেই ছেলে আমার বন্ধু।
এখানে ‘সেই’ ‘ছেলে’-কে নির্দিষ্ট করছে; সর্বনামস্থানীয় বিশেষণ।
পরীক্ষার সূত্র
শব্দ নয়—বাক্যে কাজ দেখে পদ নির্ণয় করো।
১৯. সর্বনামের লিঙ্গ
বাংলা ভাষায় সর্বনামে সংস্কৃতের মতো পুংলিঙ্গ-স্ত্রীলিঙ্গের পৃথক রূপ সাধারণত নেই।
যেমন—
সে এসেছে।
‘সে’ পুরুষ বা নারী—উভয়কেই বোঝাতে পারে।
কিন্তু সম্মানসূচক সর্বনামে—
তিনি
পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়।
অতএব বাংলা সর্বনামের প্রধান বিভাজন পুরুষ, সংখ্যা, সম্মান, নৈকট্য ও অর্থগত সম্পর্কের ভিত্তিতে, লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়।
২০. সর্বনামের বচন
সর্বনামেও একবচন ও বহুবচনের পার্থক্য প্রকাশ পায়।
উত্তম পুরুষ
আমি → আমরা
মধ্যম পুরুষ
তুমি → তোমরা
তুই → তোরা
আপনি → আপনারা
তৃতীয় পুরুষ
সে → তারা
তিনি → তাঁরা
তবে সব সর্বনামের ক্ষেত্রে বচন একইভাবে প্রকাশিত হয় না। ‘কেউ’, ‘কিছু’, ‘সবাই’, ‘সকলে’ ইত্যাদির অর্থগত সংখ্যা আলাদাভাবে বিচার করতে হয়।
২১. সর্বনামের সম্মানসূচক ব্যবহার
বাংলা ভাষার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল সর্বনামের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক ও সম্মান প্রকাশ করা।
অন্তরঙ্গ
তুই
সাধারণ/ঘনিষ্ঠ
তুমি
সম্মানসূচক
আপনি
তৃতীয় পুরুষে—
সে → সাধারণ
তিনি → সম্মানসূচক
উদাহরণ—
সে আজ এসেছে।
তিনি আজ এসেছেন।
এখানে শুধু সর্বনাম নয়, ক্রিয়ার রূপও বদলে গেছে।
২২. সর্বনাম ও ক্রিয়ার সম্পর্ক
সর্বনাম বাক্যে ক্রিয়ার রূপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তুলনা করুন—
আমি যাই।
তুমি যাও।
সে যায়।
আপনি যান।
তিনি যান।
এখানে সর্বনামের পুরুষ ও সম্মানসূচকতার সঙ্গে ক্রিয়ার রূপের সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে।
২৩. সর্বনাম দিয়ে পুনরুক্তি রোধ
সর্বনামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হল পুনরুক্তি এড়ানো।
অসুন্দর—
অরিন্দম আজ কলেজে গেছে। অরিন্দম কলেজে গিয়ে অরিন্দমের অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করেছে।
সুন্দর—
অরিন্দম আজ কলেজে গেছে। সে সেখানে গিয়ে তার অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করেছে।
সর্বনাম ভাষাকে শুধু সংক্ষিপ্ত করে না; বাক্যের গতি, স্বাভাবিকতা ও সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করে।
২৪. সর্বনাম ব্যবহারে অস্পষ্টতা
সর্বনাম ব্যবহারের সময় একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সর্বনামের পূর্বপদ স্পষ্ট হওয়া দরকার।
যেমন—
রাহুল সুমনকে বলল যে সে পরীক্ষায় ভালো করেছে।
এখানে ‘সে’ রাহুল না সুমন—তা স্পষ্ট নয়।
সংশোধিত রূপ—
রাহুল সুমনকে বলল যে রাহুল পরীক্ষায় ভালো করেছে।
অথবা—
রাহুল সুমনকে বলল, সে নিজে পরীক্ষায় ভালো করেছে।
অতএব সর্বনাম পুনরুক্তি রোধ করে ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত বা অস্পষ্ট সর্বনাম ব্যবহার করলে অর্থদ্ব্যর্থতা সৃষ্টি হতে পারে।
২৫. সর্বনাম নির্ণয়ের সহজ পদ্ধতি
কোনো বাক্যে সর্বনাম আছে কি না বুঝতে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলি করুন—
প্রথম প্রশ্ন
পদটি কি কোনো ব্যক্তি/বস্তু/বিশেষ্যের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে?
যদি হ্যাঁ → সর্বনাম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
দ্বিতীয় প্রশ্ন
পদটির পরে কোনো বিশেষ্য আছে কি?
যদি থাকে, তবে সেটি অনেক সময় সর্বনামস্থানীয় বিশেষণ হতে পারে।
তৃতীয় প্রশ্ন
পদটি কি প্রশ্ন করছে?
→ কে, কী, কার, কোনটি ইত্যাদি হলে প্রশ্নবাচক সর্বনাম হতে পারে।
চতুর্থ প্রশ্ন
পদটি কি কাউকে/কিছুকে নির্দেশ করছে?
→ এ, ও, এটি, ওটি ইত্যাদি হলে নির্দেশক সর্বনাম হতে পারে।
পঞ্চম প্রশ্ন
পদটি কি অনির্দিষ্ট কাউকে বা কিছুকে বোঝাচ্ছে?
→ কেউ, কিছু, যে-কেউ ইত্যাদি হলে অনির্দেশক সর্বনাম।
ষষ্ঠ প্রশ্ন
পদটি কি ‘নিজে’, ‘স্বয়ং’ অর্থ প্রকাশ করছে?
→ আত্মবাচক সর্বনাম।
সপ্তম প্রশ্ন
পদটি কি ‘যে—সে’, ‘যিনি—তিনি’, ‘যা—তা’ ইত্যাদি সম্পর্ক তৈরি করছে?
→ সাপেক্ষ/নিত্যসম্বন্ধী সর্বনাম।
২৬. সর্বনাম বনাম বিশেষ্য : একটি তুলনা
| বিশেষ্য | সর্বনাম |
|---|---|
| রাহুল | সে |
| মিতা | সে |
| রবীন্দ্রনাথ | তিনি |
| বই | এটি |
| ব্যক্তি | কেউ |
| বস্তু | কিছু |
| অজ্ঞাত ব্যক্তি | কে |
| অজ্ঞাত বস্তু | কী |
| সমষ্টি | সবাই |
বিশেষ্য কোনো ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, গুণ, ভাব বা সত্তার নাম প্রকাশ করে; সর্বনাম সেই নামের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়ে বাক্যে তার কাজ সম্পাদন করে।
২৭. সর্বনামের একটি সমন্বিত উদাহরণ
নিচের অনুচ্ছেদটি লক্ষ করো—
সুমিতা আজ বিদ্যালয়ে গিয়েছিল। সে সেখানে গিয়ে তার শিক্ষিকার সঙ্গে দেখা করে। তিনি তাকে একটি বই দেন। এটি একটি মূল্যবান বই। যে মন দিয়ে পড়বে, সে অনেক কিছু শিখতে পারবে। কেউ যদি বইটি হারিয়ে ফেলে, অন্য কেউ সেটি খুঁজে দেবে। সবাই বইটির যত্ন নেবে।
এখানে—
- সে → ব্যক্তিবাচক সর্বনাম
- তার → ব্যক্তিবাচক সর্বনামের বিভক্তিযুক্ত রূপ
- তিনি → সম্মানসূচক ব্যক্তিবাচক সর্বনাম
- তাকে → ব্যক্তিবাচক সর্বনামের বিভক্তিযুক্ত রূপ
- এটি → নির্দেশক সর্বনাম
- যে—সে → সাপেক্ষ সর্বনাম
- কেউ → অনির্দেশক সর্বনাম
- অন্য কেউ → অন্যাদিবাচক + অনির্দেশক অর্থ
- সবাই → সাকল্যবাচক সর্বনাম
এভাবে একটি ছোট অনুচ্ছেদেও সর্বনামের একাধিক শ্রেণি একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
২৮. পরীক্ষায় বিশেষভাবে মনে রাখার বিষয়
১.
সর্বনাম = বিশেষ্যের পরিবর্তে ব্যবহৃত পদ।
২.
‘আমি, তুমি, সে, তিনি’ → ব্যক্তিবাচক।
৩.
‘এ, এই, ও, ওই, এটি, ওটি’ → নির্দেশক।
৪.
‘কেউ, কিছু, যে-কেউ’ → অনির্দেশক।
৫.
‘কে, কী, কার, কোনটি’ → প্রশ্নবাচক।
৬.
‘যে—সে, যিনি—তিনি, যা—তা’ → সাপেক্ষ।
৭.
‘নিজে, নিজ, স্বয়ং’ → আত্মবাচক।
৮.
‘অন্য, অপর, অন্যান্য’ → অন্যাদিবাচক।
৯.
‘সবাই, সকলে, উভয়, প্রত্যেকে’ → সাকল্যবাচক।
১০.
‘যে-কেউ, যা-কিছু’ → যৌগিক/সংযোগমূলক সর্বনামধর্মী রূপ।
১১.
দ্বিত্বপ্রয়োগ ≠ যৌগিক সর্বনাম।
‘কে কে’, ‘যারা যারা’—শুধু দ্বিত্বের কারণে যৌগিক নয়।
১২.
‘কি’ ≠ ‘কী’
‘কি’ → হ্যাঁ/না-প্রশ্ন
‘কী’ → বিষয়/বস্তু/পরিচয় জানতে চাওয়া প্রশ্নে সর্বনাম হতে পারে।
১৩.
‘এই বই’ ≠ ‘এটি’
‘এই’ → বিশেষ্যের আগে, সর্বনামস্থানীয় বিশেষণ
‘এটি’ → বিশেষ্যের পরিবর্তে, সর্বনাম।
১৪.
কারক নয়, বিভক্তির ফলে রূপান্তরই বিভক্তিগ্রাহী রূপের মূল বিষয়।
১৫.
‘আমি → আমা’, ‘তুমি → তোমা’, ‘সে → তা’—এগুলি বিভক্তিগ্রাহী রূপের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
২৯. সর্বনামের এক নজরে পূর্ণ ছক
| প্রকার | প্রধান অর্থ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ব্যক্তিবাচক | ব্যক্তি | আমি, তুমি, সে, তিনি |
| নির্দেশক | নিকট/দূর নির্দেশ | এ, এই, ও, ওই, এটি, ওটি |
| অনির্দেশক | অনির্দিষ্ট ব্যক্তি/বস্তু | কেউ, কিছু, যে-কেউ |
| প্রশ্নবাচক | প্রশ্ন | কে, কী, কার, কোনটি |
| সাপেক্ষ | পারস্পরিক সম্পর্ক | যে—সে, যিনি—তিনি |
| আত্মবাচক | নিজ সত্তা | নিজে, নিজ, স্বয়ং |
| অন্যাদিবাচক | অন্য/অপর | অন্য, অপর, অপরে |
| সাকল্যবাচক | সমষ্টির সকল | সবাই, সকলে, উভয় |
| যৌগিক | একাধিক উপাদানের সংযোগ | যে-কেউ, যা-কিছু |
৩০. সর্বনাম অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা
সর্বনামকে শুধু ‘বিশেষ্যের বদলে বসে’—এই একটি সংজ্ঞায় আটকে রাখলে বাংলা ব্যাকরণের প্রকৃত সৌন্দর্য বোঝা যায় না। সর্বনাম একই সঙ্গে—
- পুনরুক্তি রোধ করে,
- ব্যক্তি ও সম্পর্ক নির্দেশ করে,
- নৈকট্য ও দূরত্ব প্রকাশ করে,
- প্রশ্ন তৈরি করে,
- অনির্দিষ্টতা প্রকাশ করে,
- আত্মপরিচয় নির্দেশ করে,
- পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করে,
- সমষ্টিকে নির্দেশ করে,
- এবং বিভক্তি গ্রহণের সময় নিজস্ব রূপান্তর ঘটায়।
অতএব সর্বনাম কেবল ‘নামের বিকল্প’ নয়; বাক্যের অর্থসংগঠন ও ভাবসম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকরণিক উপাদান।
৩১. চূড়ান্ত স্মরণসূত্র : ‘সর্বনাম ফর্মুলা’
সর্বনাম শেখার সবচেয়ে সহজ সূত্র—
ব্যক্তি–দিক–অজানা–প্রশ্ন–সম্ পর্ক–নিজ–অন্য–সব–যোগ
এগুলির সঙ্গে উদাহরণ মিলিয়ে নাও—
ব্যক্তি → আমি, তুমি, সে
দিক → এ, ও, এই, ওই
অজানা → কেউ, কিছু
প্রশ্ন → কে, কী, কার
সম্পর্ক → যে—সে, যিনি—তিনি
নিজ → নিজে, স্বয়ং
অন্য → অন্য, অপর
সব → সবাই, সকলে
যোগ → যে-কেউ, যা-কিছু
এক লাইনের মহাসূত্র
“কে বলছে—কাকে বলছে—কার কথা বলছে; কাছে না দূরে—জানা না অজানা—প্রশ্ন না সম্পর্ক—নিজ না অন্য—এক না সব—যোগে গঠিত কি না; এই প্রশ্নগুলির উত্তরই সর্বনামের শ্রেণি নির্ণয় করে।”
৩২. সর্বনাম শনাক্ত করার ১০-সেকেন্ডের ফর্মুলা
কোনো শব্দ দেখলে দ্রুত এই ক্রমে ভাবো—
নামের বদলে? → সর্বনাম।
তারপর—
ব্যক্তি? → ব্যক্তিবাচক
নির্দেশ? → নির্দেশক
অনির্দিষ্ট? → অনির্দেশক
প্রশ্ন? → প্রশ্নবাচক
যে-সে সম্পর্ক? → সাপেক্ষ
নিজ? → আত্মবাচক
অন্য? → অন্যাদিবাচক
সবাই/সকলে? → সাকল্যবাচক
একাধিক উপাদানের যোগ? → যৌগিক
আর একটি শেষ পরীক্ষা—
“শব্দটির পরে কোনো বিশেষ্য আছে কি?”
থাকলে অনেক সময় সেটি সর্বনাম নয়, সর্বনামস্থানীয় বিশেষণ।
যেমন—
এই বই → ‘এই’ সর্বনাম নয়।
এটি → সর্বনাম।
কোন বই → ‘কোন’ সর্বনাম নয়।
কোনটি → সর্বনাম।
শেষকথা
সর্বনাম অধ্যায়ের মূল শিক্ষা তাই তিনটি স্তরে মনে রাখা যায়—
প্রথম স্তর — পরিচয়
বিশেষ্যের পরিবর্তে ব্যবহৃত পদ = সর্বনাম।
দ্বিতীয় স্তর — শ্রেণি
ব্যক্তি–নির্দেশ–অনির্দিষ্ট–প্
তৃতীয় স্তর — প্রয়োগ
বাক্যে পদটির কাজ দেখো; শুধু শব্দের চেহারা দেখে পদ নির্ণয় করো না।
এই তিনটি স্তর আয়ত্ত করতে পারলে সর্বনাম শুধু মুখস্থ করার বিষয় থাকে না; বাক্যের ভিতরে সর্বনামকে শণাক্ত, শ্রেণিবদ্ধ এবং সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়।

