বিশেষণ পদ

সংজ্ঞা, ধারণা, শ্রেণিবিভাগ ও প্রয়োগ

ভূমিকা

ভাষায় কোনো ব্যক্তি, বস্তু, প্রাণী, স্থান, ঘটনা, ক্রিয়া বা ভাবের পরিচয় শুধু তার নামের মধ্যেই সম্পূর্ণ হয় না। আমরা যখন বলি—‘ছেলে’, তখন শুধু একজন মানুষের পরিচয় পাওয়া যায়; কিন্তু ‘বুদ্ধিমান ছেলে’ বললে তার একটি গুণও জানা যায়। ‘লাল ফুল’ বললে ফুলটির রং জানা যায়; ‘তিনটি ফুল’ বললে সংখ্যা জানা যায়; ‘প্রথম ফুল’ বললে ক্রম জানা যায়; ‘অনেক ফুল’ বললে পরিমাণের ধারণা পাওয়া যায়। আবার ‘অত্যন্ত সুন্দর ফুল’ বললে ‘সুন্দর’ বিশেষণের মাত্রাও স্পষ্ট হয়।

অর্থাৎ কোনো পদ বা পদগুচ্ছ যখন অন্য কোনো পদের গুণ, দোষ, ধর্ম, অবস্থা, সংখ্যা, পরিমাণ, ক্রম, মাত্রা, বৈশিষ্ট্য, পরিচয় বা অন্য কোনো বিশেষত্ব প্রকাশ করে, তখন সেই পদ বা পদগুচ্ছ বিশেষণের কাজ করে।

এই কারণেই বিশেষণকে ভাষার বিশেষীকরণকারী পদ বলা যায়। বিশেষণ একদিকে যেমন কোনো নামপদের পরিচয়কে স্পষ্ট করে, অন্যদিকে তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বনাম, ক্রিয়া, বিশেষণ বা অব্যয়েরও অর্থকে নির্দিষ্ট বা তীব্র করে।


১. বিশেষণ পদ কাকে বলে?

সংজ্ঞা :
যে পদ বা পদগুচ্ছ কোনো পদ—বিশেষত বিশেষ্য বা সর্বনাম—এর গুণ, দোষ, ধর্ম, অবস্থা, সংখ্যা, পরিমাণ, ক্রম, মাত্রা, বৈশিষ্ট্য বা পরিচয় প্রকাশ করে, তাকে বিশেষণ পদ বলে।

সহজভাবে—

যে পদ অন্য কোনো পদের অর্থকে বিশেষ বা নির্দিষ্ট করে, তাকে বিশেষণ পদ বলে।

যেমন—

১. রাম ভালো ছেলে।
২. তাঁর চোখে ভাঙা চশমা।
৩. ট্রেনটির গতি তীব্র
৪. তুমি সহজ অঙ্কটি ভুল করেছ।
৫. ক্লাসের প্রথম ছাত্রটি অনুপস্থিত।
৬. বাজার থেকে দশ কিলো চাল আনবে।
৭. তুমি কতটা খাবার খাবে?
৮. মনোহরবাবু সৎ লোক নন।

এখানে ভালো, ভাঙা, তীব্র, সহজ, প্রথম, দশ কিলো, কতটা, সৎ—প্রতিটি পদ বা পদগুচ্ছ সংশ্লিষ্ট পদটির অর্থকে বিশেষ বা নির্দিষ্ট করছে।

মনে রাখবে

বিশেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—বিশেষণ নিজে কোনো কিছুর পূর্ণ পরিচয় না দিয়ে অন্য কিছুকে বিশেষিত করে।

‘ফুল’ একটি বিশেষ্য—এটি একটি সত্তার নাম।
‘সুন্দর’ সাধারণত বিশেষণ—এটি ফুলটির গুণ জানায়।

তাই বলা যায়—

বিশেষ্য নাম দেয়, বিশেষণ সেই নামের পরিচয়কে স্পষ্ট করে।

তবে এই ধারণাটি যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। কারণ একই শব্দ বাক্যভেদে কখনো বিশেষ্য, কখনো বিশেষণ, কখনো অন্য পদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই শব্দকে আলাদা করে নয়, বাক্যে তার প্রয়োগ ও ভূমিকা দেখে পদপরিচয় নির্ণয় করতে হয়।


২. বিশেষণের প্রধান বৈশিষ্ট্য

বিশেষণকে চেনার জন্য কয়েকটি প্রশ্ন মনে রাখা সুবিধাজনক—

কেমন? → সুন্দর, ভালো, লম্বা
কী ধরনের? → কাঠের, গ্রামের, বৈজ্ঞানিক
কতটি? → তিনটি, পাঁচটি
কততম? → প্রথম, দ্বিতীয়, দশম
কতটা/কতখানি? → অনেক, অল্প, প্রচুর
কী অবস্থায়? → ভাঙা, ফুটন্ত, চলমান
কত মাত্রায়? → খুব, অত্যন্ত, টকটকে
কোন পরিচয়ের? → কলকাতার, দেশীয়, বাঙালি

তবে এগুলিকে কেবল প্রশ্নোত্তরের সূত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে; প্রশ্নের উত্তর পেলেই যে পদটি বিশেষণ হবে, এমন নয়। বাক্যে তার ভূমিকা বিচার করাই চূড়ান্ত।


৩. বিশেষণের শ্রেণিবিভাগ

বিশেষণের শ্রেণিবিভাগ একটিমাত্র মাপকাঠিতে করা যায় না। বিশেষণকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করা যায়। প্রধানত—

ক. কোন পদকে বিশেষিত করছে—তার ভিত্তিতে

১. বিশেষ্যের বিশেষণ
২. সর্বনামের বিশেষণ
৩. বিশেষণের বিশেষণ
৪. ক্রিয়ার বিশেষণ বা ক্রিয়াবিশেষণ
৫. অব্যয়ের বিশেষণ

খ. কী ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করছে—তার ভিত্তিতে

১. গুণবাচক বিশেষণ
২. অবস্থাবাচক বিশেষণ
৩. সংখ্যাবাচক বিশেষণ
৪. পূরণবাচক/ক্রমবাচক বিশেষণ
৫. পরিমাণবাচক বিশেষণ

গ. গঠন অনুসারে

১. একপদী বিশেষণ
২. বহুপদী বা পদগুচ্ছগত বিশেষণ
৩. নাম-বিশেষণ
৪. ধ্বন্যাত্মক বিশেষণ
৫. সম্বন্ধসূচক বিশেষণ
৬. পদান্তরিত বিশেষণ
৭. শব্দদ্বৈতাশ্রয়ী বিশেষণ
৮. অব্যয়জাত বিশেষণ
৯. ক্রিয়াজাত বিশেষণ
১০. সর্বনামীয় বিশেষণ

ঘ. বাক্যে অবস্থান অনুসারে

১. সাক্ষাৎ/বিশেষ্যপূর্ব বিশেষণ
২. বিধেয় বিশেষণ

এই শ্রেণিগুলি পরস্পর-বিরোধী নয়। একই বিশেষণকে একাধিক মাপকাঠিতে একাধিক শ্রেণিতে ফেলা যেতে পারে।

যেমন—

তিনটি সুন্দর ফুল

এখানে ‘তিনটি’ সংখ্যাবাচক বিশেষণ এবং ‘সুন্দর’ গুণবাচক বিশেষণ।
আবার ‘সুন্দর’ গঠনগত দিক থেকে একপদী এবং বাক্যে অবস্থানগত দিক থেকে সাক্ষাৎ বিশেষণ।


প্রথম পর্ব : কোন পদকে বিশেষিত করছে তার ভিত্তিতে শ্রেণিবিভাগ

৪. বিশেষ্যের বিশেষণ

যে বিশেষণ কোনো বিশেষ্য পদের গুণ, দোষ, ধর্ম, অবস্থা, সংখ্যা, পরিমাণ, ক্রম বা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে, তাকে বিশেষ্যের বিশেষণ বলে।

উদাহরণ—

১. সায়ন বুদ্ধিমান ছেলে।
২. প্রীতম লাল জামা পরেছে।
৩. সে তিনটি বই কিনেছে।
৪. এটি ভাঙা চেয়ার।
৫. তিনি প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন।

এখানে—

  • বুদ্ধিমান → ছেলেকে বিশেষিত করছে।
  • লাল → জামাকে বিশেষিত করছে।
  • তিনটি → বইয়ের সংখ্যা জানাচ্ছে।
  • ভাঙা → চেয়ারের অবস্থা জানাচ্ছে।
  • প্রথম → ক্রম জানাচ্ছে।

অতএব এগুলি বিশেষ্যের বিশেষণ।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা : ‘গল্পের বই’

‘গল্পের বই’—এই ধরনের প্রয়োগে ‘গল্পের’ শব্দটি বইটির ধরন/বিষয়গত পরিচয় নির্দেশ করছে। শিক্ষণগতভাবে একে বিশেষণধর্মী ব্যবহার হিসেবে দেখানো যায়।

কিন্তু ‘রামের ভাই’, ‘দেশের মাটি’, ‘রাজার ছেলে’—এই ধরনের ক্ষেত্রে ‘রামের’, ‘দেশের’, ‘রাজার’ পদে মূলত সম্বন্ধ বা অধিকার-সম্পর্ক প্রকাশিত হয়। তাই এগুলিকে সরাসরি গুণবাচক বিশেষণ বলা ঠিক নয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র—

যেখানে প্রধান অর্থ সম্বন্ধ/অধিকার, সেখানে সম্বন্ধবাচক পদ; যেখানে কোনো নামপদের ধরন, উপাদান, বিষয় বা বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট করছে, সেখানে বিশেষণধর্মী ব্যবহার হতে পারে।

অর্থাৎ শুধু ‘-র/এর’ বিভক্তি দেখেই কোনো পদকে বিশেষণ বলা যাবে না।


৫. সর্বনামের বিশেষণ

যে বিশেষণ কোনো সর্বনাম পদের গুণ, দোষ, অবস্থা বা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে, তাকে সর্বনামের বিশেষণ বলে।

উদাহরণ—

১. অন্ধ আমি অন্তরে-বাহিরে।
২. তুমি ভালো, আমি তত ভালো নই।
৩. বোকা সে নিজের ভুল বুঝতে পারেনি।
৪. উনি অত্যন্ত সম্মানীয়

এখানে ‘অন্ধ’, ‘ভালো’, ‘বোকা’, ‘সম্মানীয়’—সর্বনাম ‘আমি’, ‘তুমি’, ‘সে’, ‘উনি’-কে বিশেষিত করছে।

বিশেষণ সবসময় বিশেষ্যের আগে বসে না

সাধারণত বিশেষণ বিশেষিত পদের আগে বসে—

ভালো ছেলে
লাল ফুল
বড় বাড়ি

কিন্তু অনেক সময় বিশেষণ পরে বসে—

ছেলেটি ভালো
মানুষটি সৎ
আকাশ নীল

এখানে বিশেষণটি বিধেয় অংশে অবস্থান করছে।


৬. বিশেষণের বিশেষণ

যে পদ অন্য একটি বিশেষণের মাত্রা, তীব্রতা বা বিশেষত্ব প্রকাশ করে, তাকে বিশেষণের বিশেষণ বলা যায়।

উদাহরণ—

১. দাদার গায়ে টকটকে লাল জামা।
২. বৌদির পরনে কালচে সবুজ শাড়ি।
৩. ছেলেটি ভারি চঞ্চল।
৪. ফুলটি অত্যন্ত সুন্দর।
৫. সে বেশ বুদ্ধিমান।

এখানে—

  • টকটকে → লাল-এর মাত্রা
  • কালচে → সবুজ-এর প্রকৃতি
  • ভারি → চঞ্চল-এর তীব্রতা
  • অত্যন্ত → সুন্দর-এর মাত্রা
  • বেশ → বুদ্ধিমান-এর মাত্রা

প্রকাশ করছে।

গুরুত্বপূর্ণ

প্রচলিত বাংলা ব্যাকরণে ‘বিশেষণের বিশেষণ’-এর একটি বড় অংশকে মাত্রাবাচক ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবেও বিশ্লেষণ করা হয়। যেমন ‘অত্যন্ত সুন্দর’-এ ‘অত্যন্ত’কে অনেক ব্যাকরণবিদ ক্রিয়াবিশেষণধর্মী পদ হিসেবে দেখান। তাই শিক্ষার্থীদের মনে রাখা উচিত—

একই পদকে কোন শ্রেণিতে রাখা হবে, তা ব্যাকরণিক বিশ্লেষণের পদ্ধতির উপর কিছুটা নির্ভর করতে পারে।


৭. ক্রিয়ার বিশেষণ বা ক্রিয়াবিশেষণ

যে পদ বা পদগুচ্ছ ক্রিয়ার সংঘটন-পদ্ধতি, সময়, স্থান, মাত্রা, কারণ, উদ্দেশ্য, পুনরাবৃত্তি, গতি বা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে, তাকে ক্রিয়াবিশেষণ বলে।

উদাহরণ—

১. গাড়িটি জোরে ছুটছে।
২. আমি প্রথমে এসেছি।
৩. তারা ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে।
৪. লোকটি হেঁটে হেঁটে আসছে।
৫. কাজটি সহজে করা যাবে না।
৬. তুমি আদৌ কিছু জানো না।
৭. সে কাল কলকাতায় যাবে।
৮. পাখিটি এখানে বসেছে।

এখানে জোরে, প্রথমে, ক্রমশ, হেঁটে হেঁটে, সহজে, আদৌ, কাল, এখানে—ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষত্ব প্রকাশ করছে।

ক্রিয়াবিশেষণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন

ক. রীতিবাচক/প্রকারবাচক
কীভাবে কাজটি ঘটছে—

ধীরে, দ্রুত, জোরে, সুন্দরভাবে

খ. কালবাচক
কখন কাজটি ঘটছে—

আজ, কাল, এখন, ভোরে, পরে

গ. স্থানবাচক
কোথায় কাজটি ঘটছে—

এখানে, সেখানে, বাইরে, সামনে

ঘ. মাত্রাবাচক
কতটা বা কী মাত্রায়—

খুব, অত্যন্ত, একেবারে, বেশ

ঙ. পুনরাবৃত্তিবাচক
কাজের পুনরাবৃত্তি—

বারবার, মাঝে মাঝে, প্রতিদিন

চ. অসমাপিকা ক্রিয়াজাত

হেসে, কেঁদে, দৌড়ে, হাঁটতে হাঁটতে

বিশেষ সতর্কতা

‘এখানে’, ‘সেখানে’, ‘বাড়িতে’, ‘কলকাতায়’ ইত্যাদি স্থানবাচক পদ সবক্ষেত্রে ক্রিয়াবিশেষণ নয়। বাক্যে এগুলি কখনো অধিকরণ কারক বা স্থান-সম্পর্কিত অন্য ভূমিকা পালন করতে পারে।

তাই—

শুধু স্থান বা কাল বোঝালেই ক্রিয়াবিশেষণ হবে না; ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক ও বাক্যে তার ভূমিকা বিচার করতে হবে।


৮. অব্যয়ের বিশেষণ

যে পদ কোনো অব্যয় বা অব্যয়জাত পদকে বিশেষিত করে, তাকে অব্যয়ের বিশেষণ বলা যেতে পারে।

উদাহরণ—

আমি তোমার ঠিক পাশে থাকব।
মন্দিরের একেবারে সামনে আমার বাড়ি।

এখানে ‘ঠিক’ ও ‘একেবারে’ পরবর্তী পদগুচ্ছের মাত্রা বা নির্দিষ্টতা বাড়াচ্ছে।

তবে এই শ্রেণিটি বাংলা ব্যাকরণে সর্বজনস্বীকৃত ও স্বতন্ত্র শ্রেণি নয়। প্রচলিত বিশ্লেষণে এর অনেক উদাহরণকে মাত্রাবাচক/রীতিবাচক ক্রিয়াবিশেষণ বা অব্যয়ধর্মী পদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।


দ্বিতীয় পর্ব : বৈশিষ্ট্য প্রকাশের ভিত্তিতে বিশেষণের শ্রেণিবিভাগ

৯. গুণবাচক বিশেষণ

যে বিশেষণ দ্বারা কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা পদের গুণ, দোষ, ধর্ম বা স্বভাব প্রকাশিত হয়, তাকে গুণবাচক বিশেষণ বলে।

উদাহরণ—

ভালো, মন্দ, সুন্দর, অসুন্দর, লম্বা, বেঁটে, সোজা, উঁচু, কঠিন, কোমল, বড়, ছোট, চ্যাপ্টা, মিষ্টি, তিক্ত, বুদ্ধিমান, সৎ, সাহসী।

যেমন—

ভালো ছেলে।
সুন্দর ফুল।
সৎ মানুষ।
কঠিন অঙ্ক।

একই শব্দের শ্রেণি প্রয়োগভেদে বদলাতে পারে

‘কঠিন’ শব্দটি—

কঠিন হৃদয় → গুণ/স্বভাব
কঠিন অঙ্ক → বৈশিষ্ট্য/দুরূহতা
কঠিন পদার্থ → অবস্থাগত বৈশিষ্ট্য

অতএব—

শব্দ নয়, বাক্যে শব্দটির ব্যবহারই পদটির প্রকৃতি নির্ধারণ করে।


১০. অবস্থাবাচক বিশেষণ

যে বিশেষণ কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা পদের অবস্থা, পরিস্থিতি, পরিবর্তিত দশা বা বর্তমান রূপ প্রকাশ করে, তাকে অবস্থাবাচক বিশেষণ বলে।

উদাহরণ—

তরল, কঠিন, দরিদ্র, ধনী, সুখী, প্রসন্ন, শান্ত, লুপ্ত, প্রকাশিত, ভস্মীভূত, ক্রুদ্ধ, তপ্ত, রিক্ত, বিপন্ন, চলমান, চলন্ত, ফুটন্ত, স্ফুটমান, বিকশিত, ভাঙা।

যেমন—

ফুটন্ত জল।
বিপন্ন মানুষ।
ভাঙা চেয়ার।
ক্রুদ্ধ রাজা।
চলমান গাড়ি।

গুণ ও অবস্থার সীমারেখা সবসময় কঠোর নয়। প্রয়োগ অনুসারে একটি বিশেষণ কখনো গুণবাচক, কখনো অবস্থাবাচক হতে পারে।


১১. সংখ্যাবাচক বিশেষণ

যে বিশেষণ কোনো বিশেষ্য বা বিশেষ্যধর্মী পদের সংখ্যা বা সংখ্যাগত পরিমাণ প্রকাশ করে, তাকে সংখ্যাবাচক বিশেষণ বলে।

উদাহরণ—

পাঁচটি কলম
দুটো ছেলে
তিনজন ছাত্র
চারখানা বই
এক ডজন ডিম
দু-গুণ উপার্জন

সংখ্যাবাচক বিশেষণের প্রধান ধরন

১. নির্দিষ্ট সংখ্যাবাচক

এক, দুই, তিন, দশ, পঞ্চাশ

২. ভগ্নাংশবাচক

দেড়, আড়াই, সাড়ে তিন, পৌনে চার

৩. গুণিতকবাচক

দ্বিগুণ, তিনগুণ, দশগুণ

৪. অনির্দিষ্ট সংখ্যাবাচক

কয়েক, কয়েকটি, কতক, গোটাকতক, খানকয়েক

একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য

‘পাঁচটি’ → সংখ্যা
‘পাঁচ কিলো’ → সংখ্যা + পরিমাণের একক
‘পাঁচ কিলো চাল’ → মোট পরিমাণ নির্দেশ করছে

তাই সংখ্যাবাচক ও পরিমাণবাচকের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও দুটিকে এক করে দেখা উচিত নয়।


১২. পূরণবাচক বা ক্রমবাচক বিশেষণ

যে বিশেষণ কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর ক্রমিক অবস্থান প্রকাশ করে, তাকে পূরণবাচক বা ক্রমবাচক বিশেষণ বলে।

উদাহরণ—

প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, দশম, একাদশ, ঊনবিংশ, শততম।

যেমন—

প্রথম ছাত্র
দ্বিতীয় অধ্যায়
দশম শ্রেণি
শততম বর্ষ

গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন

‘দশের নামতা’ বা ‘পঁচিশে’ ধরনের পদকে পূরণবাচক বিশেষণের উদাহরণ হিসেবে দেওয়া যথাযথ নয়। ‘দশের’ এখানে সংখ্যার সম্বন্ধসূচক রূপ এবং ‘পঁচিশে’ প্রয়োগভেদে বিভক্তিযুক্ত সংখ্যা বা অন্য ভূমিকা পালন করতে পারে।

তাই পরীক্ষার জন্য নিরাপদ উদাহরণ—

প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, দশম, পঁচিশতম, শততম।


১৩. পরিমাণবাচক বিশেষণ

যে বিশেষণ কোনো পদার্থ বা বস্তুর পরিমাণ, পরিমাপ বা অমেয় ব্যাপ্তি প্রকাশ করে, তাকে পরিমাণবাচক বিশেষণ বলে।

উদাহরণ—

অনেক জল
অল্প দুধ
প্রচুর ধান
এক লিটার তেল
দুই কেজি চাল
একমুঠো চাল
একফোঁটা জল
অনেকটা খাবার

এখানে ‘দুই’ সংখ্যাকে বোঝালেও ‘দুই কেজি চাল’ পুরো পদগুচ্ছটি চালের পরিমাণ নির্দিষ্ট করছে।

সংখ্যা ও পরিমাণের সহজ পার্থক্য

কতটি? → সংখ্যাবাচক
কতটা? → পরিমাণবাচক

যেমন—

তিনটি বই → সংখ্যা
তিন কেজি চাল → পরিমাণ


তৃতীয় পর্ব : গঠনগত দিক থেকে বিশেষণের শ্রেণিবিভাগ

১৪. একপদী বিশেষণ

যে বিশেষণ একটি মাত্র পদে গঠিত, তাকে একপদী বিশেষণ বলে।

উদাহরণ—

রাম ভালো ছেলে।
তারা বড় মানুষ।
এটি লাল ফুল।

‘ভালো’, ‘বড়’, ‘লাল’—প্রতিটি একপদী বিশেষণ।


১৫. বহুপদী বা পদগুচ্ছগত বিশেষণ

যখন একাধিক পদ মিলে একটি বিশেষ্যকে একত্রে বিশেষিত করে, তখন সেই সমগ্র পদগুচ্ছটি বহুপদী বা পদগুচ্ছগত বিশেষণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

উদাহরণ—

বাপে তাড়ানো মায়ে খেদানো ছেলে।
ঘুম ভাঙানিয়া গান।
শহর থেকে আসা লোকটি আমার পরিচিত।

এখানে বিশেষ্যকে একক কোনো শব্দ নয়, সম্পূর্ণ পদগুচ্ছ বিশেষিত করছে।


১৬. নাম-বিশেষণ

কোনো নাম বা শ্রেণিবাচক বিশেষ্য যখন অন্য কোনো বিশেষ্যের পরিচয় নির্দিষ্ট করার কাজে ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে নাম-বিশেষণ বলা যায়।

উদাহরণ—

কলকাতা শহর।
গঙ্গা নদী।
ল্যাংড়া আম।
দশম শ্রেণি।

‘কলকাতা’, ‘গঙ্গা’, ‘ল্যাংড়া’ প্রভৃতি নিজস্ব নাম বা নামধর্মী পদ বিশেষণের কাজ করছে।

এখানেও প্রয়োগই মুখ্য। ‘কলকাতা’—

কলকাতা সুন্দর শহর। → বিশেষ্য
কলকাতা শহর → নাম-বিশেষণধর্মী ব্যবহার


১৭. ধ্বন্যাত্মক বিশেষণ

ধ্বন্যাত্মক শব্দ যখন কোনো বিশেষ্যের বৈশিষ্ট্য বা ধ্বনিগত পরিচয় প্রকাশ করে এবং বিশেষণের কাজ করে, তখন তাকে ধ্বন্যাত্মক বিশেষণ বলা যায়।

উদাহরণ—

খুকখুক কাশি।
ধুপধাপ শব্দ।
ঝমঝম বৃষ্টি।

এখানে ধ্বন্যাত্মক শব্দগুলি সংশ্লিষ্ট বিশেষ্যের বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট করছে।


১৮. সম্বন্ধসূচক বা সম্বন্ধীয় বিশেষণ

কোনো সম্বন্ধসূচক পদ যখন শুধু অধিকার-সম্পর্ক না জানিয়ে কোনো বিশেষ্যের উপাদান, উৎস, বিষয়, ধরন বা বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট করে, তখন তাকে বিশেষণধর্মী সম্বন্ধসূচক ব্যবহার বলা যায়।

উদাহরণ—

মাটির পুতুল।
শক্তিগড়ের ল্যাংচা।
ঘুমের দেশ।
কাজের মানুষ।
কাঠের দরজা।

তবে—

রামের ভাই।
মায়ের বই।
দেশের মাটি।

এই ধরনের ক্ষেত্রে অধিকার বা সম্বন্ধই যদি প্রধান অর্থ হয়, তবে এগুলিকে সরাসরি বিশেষণ না বলে সম্বন্ধসূচক পদ হিসেবে বিশ্লেষণ করাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।

সূত্র

সম্বন্ধ প্রধান → সম্বন্ধসূচক পদ
ধরন/উপাদান/বৈশিষ্ট্য প্রধান → বিশেষণধর্মী ব্যবহার


১৯. পদান্তরিত বিশেষণ

একটি পদ তার মূল পদপরিচয় পরিবর্তন করে যখন বিশেষণের কাজ করে, তাকে পদান্তরিত বিশেষণ বলা যায়।

উদাহরণ—

গেছো বিড়াল।
ঘরোয়া খাবার।
দেশি মুরগি।
পথের মানুষ।

‘ঘরোয়া’ মূলত ‘ঘর’ শব্দজাত; কিন্তু ‘খাবার’-এর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করছে বলে বিশেষণের কাজ করছে।


২০. শব্দদ্বৈতাশ্রয়ী বিশেষণ

কোনো শব্দের পুনরুক্তি বা দ্বিত্বের মাধ্যমে বিশেষণের অর্থ জোরালো হলে তাকে শব্দদ্বৈতাশ্রয়ী বিশেষণ বলা যায়।

উদাহরণ—

লাল লাল ফুল।
বড় বড় গাছ।
ছোট ছোট ছেলে।
নীল নীল আকাশ।

এখানে পুনরুক্তি শুধু সংখ্যা নয়; অনেক ক্ষেত্রে বহুত্ব, বিস্তার, বৈচিত্র্য বা তীব্রতার ভাবও প্রকাশ করে।


২১. অব্যয়জাত বিশেষণ

অব্যয় বা অব্যয়ধর্মী শব্দ যখন বাক্যে কোনো বিশেষ্যের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে বিশেষণের ভূমিকা গ্রহণ করে, তখন তাকে অব্যয়জাত বিশেষণ বলা যায়।

যেমন—

আচ্ছা বিপদে পড়া গেল!

তবে এই শ্রেণিটিও প্রয়োগনির্ভর এবং সব ব্যাকরণে স্বতন্ত্র শ্রেণি হিসেবে স্বীকৃত নয়। তাই শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বাক্যে শব্দটির কার্যকরী ভূমিকা বিচার করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


২২. ক্রিয়াজাত বিশেষণ

ক্রিয়ামূল বা ধাতুজাত শব্দ যখন কোনো বিশেষ্যকে বিশেষিত করে, তখন তাকে ক্রিয়াজাত বিশেষণ বলা হয়।

বাংলায় ‘আ’ প্রত্যয়যুক্ত কিছু রূপ এ কাজে ব্যবহৃত হয়।

উদাহরণ—

দেখা সিনেমা আবার দেখছি।
পড়া বইটি আবার পড়ছি।
লেখা চিঠিটি এখনও আছে।
কেনা জামাটি নতুন।

এখানে—

দেখা → সিনেমার বিশেষণ
পড়া → বইয়ের বিশেষণ
লেখা → চিঠির বিশেষণ
কেনা → জামার বিশেষণ

কিন্তু সতর্কতা

‘পড়া’, ‘লেখা’, ‘দেখা’ সবক্ষেত্রেই বিশেষণ নয়।

পড়া শেষ হয়েছে। → ‘পড়া’ বিশেষ্যধর্মী
পড়া বইটি ভালো। → ‘পড়া’ বিশেষণধর্মী

অতএব—

একই শব্দের পদপরিচয় নির্ধারণে তার প্রয়োগই চূড়ান্ত।


২৩. সর্বনামীয় বিশেষণ

যে বিশেষণরূপ সর্বনামমূল থেকে গঠিত, তাকে সর্বনামীয় বিশেষণ বলা হয়।

উদাহরণ—

যত টাকা চাই, দেব।
যেই ছেলে এসেছিল, সে চলে গেছে।
কী উপায় বের করবে?
কেমন লোক উনি?
তেমন মানুষ আমি দেখিনি।

এখানে ‘যত’, ‘যেই’, ‘কী’, ‘কেমন’, ‘তেমন’ প্রভৃতি সর্বনামজাত বা সর্বনামমূলক বিশেষণধর্মী রূপ।

সর্বনামের বিশেষণ বনাম সর্বনামীয় বিশেষণ

এই দুইটি এক নয়।

সর্বনামের বিশেষণ
→ যে বিশেষণ কোনো সর্বনামকে বিশেষিত করে।

আমি ভালো
তুমি সৎ

এখানে ‘ভালো’, ‘সৎ’ → সর্বনামের বিশেষণ।

সর্বনামীয় বিশেষণ
→ যে বিশেষণরূপের উৎপত্তি সর্বনাম থেকে।

কেমন মানুষ?
যত টাকা চাই।
তেমন লোক দেখিনি।

এখানে ‘কেমন’, ‘যত’, ‘তেমন’ → সর্বনামমূলক বিশেষণ।

সহজ সূত্র

সর্বনামকে বিশেষিত করলে → সর্বনামের বিশেষণ
সর্বনাম থেকে তৈরি হলে → সর্বনামীয় বিশেষণ


চতুর্থ পর্ব : বাক্যে অবস্থান অনুসারে বিশেষণ

২৪. সাক্ষাৎ বিশেষণ

যে বিশেষণ তার বিশেষিত পদের সরাসরি আগে বসে, তাকে সাক্ষাৎ বিশেষণ বা বিশেষ্যপূর্ব বিশেষণ বলা যায়।

উদাহরণ—

ভালো ছেলে।
লাল জামা।
বয়স্ক লোক।
তিনটি বই।

এখানে বিশেষণগুলি সরাসরি বিশেষিত পদের আগে রয়েছে।


২৫. বিধেয় বিশেষণ

যে বিশেষণ বাক্যের বিধেয় অংশে অবস্থান করে উদ্দেশ্যের গুণ, দোষ, অবস্থা বা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে, তাকে বিধেয় বিশেষণ বলে।

উদাহরণ—

তুমি বড়
আমি ছোট
ছেলেটা ভালো
লোকটা সুখী
আকাশ নীল

এখানে ‘বড়’, ‘ছোট’, ‘ভালো’, ‘সুখী’, ‘নীল’—সবই বিধেয় বিশেষণ।

তুলনা

ভালো ছেলে → সাক্ষাৎ বিশেষণ
ছেলেটি ভালো → বিধেয় বিশেষণ

অর্থাৎ একই ‘ভালো’ শব্দ, কিন্তু বাক্যে অবস্থান বদলানোর সঙ্গে তার বাক্যগত ভূমিকা বদলে গেছে।


পঞ্চম পর্ব : বিশেষণের অতিশায়ন বা তারতম্য

২৬. অতিশায়ন কী?

কোনো গুণ বা ধর্মের কম-বেশি মাত্রা প্রকাশ করাকে বিশেষণের অতিশায়ন বা তারতম্য বলে।

যেমন—

সুন্দর → সুন্দরতর → সুন্দরতম

এখানে—

  • সুন্দর → সাধারণ মাত্রা
  • সুন্দরতর → দুইয়ের মধ্যে তুলনায় অধিক
  • সুন্দরতম → বহুজন/বহুবস্তুর মধ্যে সর্বাধিক

‘তর’ ও ‘তম’

সাধারণভাবে—

তর → তুলনামূলক অধিক
তম → সর্বাধিক

উদাহরণ—

সুন্দর → সুন্দরতর → সুন্দরতম
বৃহৎ → বৃহত্তর → বৃহত্তম
ক্ষুদ্র → ক্ষুদ্রতর → ক্ষুদ্রতম
দ্রুত → দ্রুততর → দ্রুততম
সফল → সফলতর → সফলতম

তবে বাংলা ভাষায় ‘তর’ ও ‘তম’-এর ব্যবহার সংস্কৃতের তুলনায় সীমিত; আধুনিক বাংলায় তুলনা প্রকাশের জন্য অনেক সময়—

বেশি সুন্দর
আরও সুন্দর
সবচেয়ে সুন্দর
সবচেয়ে বড়

—এই ধরনের গঠন বেশি স্বাভাবিক।


২৭. তৎসম বিশেষণের বিশেষ অতিশায়িত রূপ

কিছু তৎসম শব্দে প্রচলিত বিশেষ রূপ দেখা যায়।

উদাহরণ—

গুরু → গরীয়ান → গরিষ্ঠ
লঘু → লঘীয়ান → লঘিষ্ঠ
বৃদ্ধ → বরীয়ান → বরিষ্ঠ
শ্রেয়স্/শ্রেয় → শ্রেয়ান → শ্রেষ্ঠ

এগুলি সাধারণ ‘তর-তম’ যোগের সরল নিয়মে তৈরি নয়; ঐতিহাসিক ও সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রভাবে এদের রূপ গড়ে উঠেছে।

তাই শিক্ষার্থীদের জন্য সূত্র—

সাধারণ বিশেষণ → তর/তম
কিছু তৎসম বিশেষণ → প্রচলিত বিশেষ অতিশায়িত রূপ


ষষ্ঠ পর্ব : বিশেষণ চেনার সহজ পদ্ধতি

কোনো বাক্যে বিশেষণ খুঁজে বের করতে হলে পাঁচটি ধাপে কাজ করা যায়।

ধাপ ১ : প্রথমে বিশেষ্য বা সর্বনাম খুঁজে বের করো

যেমন—

সুন্দর ফুলটি ফুটেছে।

বিশেষ্য → ফুল

ধাপ ২ : ফুলটি সম্পর্কে কী বলা হয়েছে দেখো

কেমন ফুল?

→ সুন্দর

ধাপ ৩ : শব্দটি কি ফুলটির কোনো বৈশিষ্ট্য জানাচ্ছে?

হ্যাঁ।

ধাপ ৪ : তাহলে ‘সুন্দর’ বিশেষণ।

ধাপ ৫ : কোন ধরনের?

গুণ প্রকাশ করছে → গুণবাচক
বিশেষ্যকে বিশেষিত করছে → বিশেষ্যের বিশেষণ
একটি শব্দ → একপদী
বিশেষ্যের আগে → সাক্ষাৎ বিশেষণ

অর্থাৎ একই শব্দের একাধিক পরিচয় হতে পারে।


২৮. একটি বাক্যে একই সঙ্গে একাধিক শ্রেণির বিশেষণ

উদাহরণ—

তিনটি সুন্দর লাল ফুল ফুটেছে।

এখানে—

তিনটি
→ সংখ্যাবাচক বিশেষণ
→ বিশেষ্যের বিশেষণ
→ একপদী
→ সাক্ষাৎ বিশেষণ

সুন্দর
→ গুণবাচক বিশেষণ
→ বিশেষ্যের বিশেষণ
→ একপদী
→ সাক্ষাৎ বিশেষণ

লাল
→ গুণ/বৈশিষ্ট্যবাচক বিশেষণ
→ বিশেষ্যের বিশেষণ
→ একপদী
→ সাক্ষাৎ বিশেষণ

এ থেকে বোঝা যায়—

বিশেষণের শ্রেণিবিভাগগুলি পরস্পরকে বাতিল করে না; ভিন্ন ভিন্ন মাপকাঠিতে একই বিশেষণের একাধিক পরিচয় হতে পারে।


২৯. বিশেষণ ও বিশেষ্যের পার্থক্য

বিশেষ্যবিশেষণ
নাম বা সত্তার পরিচয় দেয়গুণ/বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে
ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, ভাব ইত্যাদির নামসেই ব্যক্তি/বস্তু/ভাবকে বিশেষিত করে
‘কে?’ ‘কী?’ ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর হতে পারে‘কেমন?’ ‘কতটি?’ ‘কতটা?’ ‘কততম?’ ইত্যাদির উত্তর হতে পারে
যেমন—ফুল, মানুষ, নদীযেমন—সুন্দর, ভালো, তিনটি, প্রথম

তবে শুধু প্রশ্নের সাহায্যে চূড়ান্ত পদপরিচয় নির্ধারণ করা যাবে না। বাক্যে পদটির ভূমিকা অবশ্যই দেখতে হবে।


৩০. বিশেষণ ও ক্রিয়াবিশেষণের পার্থক্য

এটি ছাত্রছাত্রীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলির একটি।

সে দ্রুত ছেলে।
সে দ্রুত দৌড়ায়।

প্রথম বাক্যে ‘দ্রুত’ → ছেলের বৈশিষ্ট্য → বিশেষণধর্মী।

দ্বিতীয় বাক্যে ‘দ্রুত’ → দৌড়ানোর ধরন → ক্রিয়াবিশেষণ।

আরও সহজভাবে—

নামপদের বৈশিষ্ট্য → বিশেষণ
ক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য → ক্রিয়াবিশেষণ


৩১. বিশেষণ ও সম্বন্ধসূচক পদের পার্থক্য

রামের ভাই।
মাটির পুতুল।

‘রামের’ → কার ভাই? → সম্বন্ধ
‘মাটির’ → কী দিয়ে/কী ধরনের পুতুল? → উপাদান/বিশেষণধর্মী ব্যবহার

তাই ‘-র/এর’ দেখেই বিশেষণ বলা যাবে না।

সূত্র

কার? → সম্বন্ধ
কেমন/কী ধরনের/কী দিয়ে তৈরি? → বিশেষণধর্মী


৩২. বিশেষণ ও সর্বনামীয় বিশেষণের পার্থক্য

আমি ভালো।
কেমন ছেলে?

‘ভালো’ → ‘আমি’ সর্বনামকে বিশেষিত করছে → সর্বনামের বিশেষণ

‘কেমন’ → সর্বনামমূলক রূপ, যা ‘ছেলে’-কে বিশেষিত করছে → সর্বনামীয় বিশেষণ


৩৩. বিশেষণের প্রয়োগগত চরিত্র

বিশেষণকে বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি—

“শব্দ নয়, পদ; পদ নয়, প্রয়োগ।”

একই শব্দ বিভিন্ন বাক্যে বিভিন্ন পদ হতে পারে।

যেমন—

‘ভালো’

ভালো ছেলে। → বিশেষণ
ভালোকে সবাই চায়। → বিশেষ্যধর্মী ব্যবহার
সে ভালো গায়। → ক্রিয়াবিশেষণধর্মী ব্যবহার

‘পড়া’

পড়া বইটি দাও। → বিশেষণ
পড়া শেষ করো। → বিশেষ্যধর্মী

‘কলকাতা’

কলকাতা একটি মহানগর। → বিশেষ্য
কলকাতা শহর বড়। → নাম-বিশেষণধর্মী ব্যবহার

অতএব—

শব্দের অভিধানগত পরিচয়ের চেয়ে বাক্যে তার কার্যকরী ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


৩৪. বিশেষণের একটি সমন্বিত উদাহরণ

বাক্যটি দেখো—

অত্যন্ত সুন্দর তিনটি ছোট্ট লাল ফুল আজ ফুটেছে।

এখানে—

তিনটি
→ সংখ্যাবাচক
→ বিশেষ্যের বিশেষণ

সুন্দর
→ গুণবাচক
→ বিশেষ্যের বিশেষণ

ছোট্ট
→ গুণ/আকারবাচক
→ বিশেষ্যের বিশেষণ

লাল
→ গুণ/বর্ণবাচক
→ বিশেষ্যের বিশেষণ

অত্যন্ত
→ ‘সুন্দর’-এর মাত্রা বাড়াচ্ছে
→ মাত্রাবাচক/বিশেষণের বিশেষণধর্মী ব্যবহার

এই একটি বাক্য থেকেই বোঝা যায় যে বিশেষণ শুধু একটি শ্রেণির নয়; একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার পরিচয় নির্ণয় করা যায়।


৩৫. বিশেষণ নির্ণয়ের স্বর্ণসূত্র

কোনো পদ দেখে প্রথমেই তার নাম মুখস্থ না করে এই প্রশ্নগুলি করো—

১. কাকে বিশেষিত করছে?

  • বিশেষ্য?
  • সর্বনাম?
  • বিশেষণ?
  • ক্রিয়া?
  • অন্য কোনো পদ?

২. কী প্রকাশ করছে?

  • গুণ?
  • দোষ?
  • অবস্থা?
  • সংখ্যা?
  • ক্রম?
  • পরিমাণ?
  • মাত্রা?
  • পরিচয়?

৩. কীভাবে গঠিত?

  • একপদী?
  • বহুপদী?
  • নামজাত?
  • ধ্বন্যাত্মক?
  • ক্রিয়াজাত?
  • সর্বনামজাত?

৪. কোথায় বসেছে?

  • বিশেষিত পদের আগে?
  • বিধেয় অংশে?

এই চারটি প্রশ্নের উত্তর পেলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশেষণের পূর্ণ পরিচয় নির্ণয় করা যায়।


৩৬. পরীক্ষার জন্য বিশেষণের পূর্ণ শ্রেণিবিন্যাস : এক নজরে

ক. বিশেষিত পদের ভিত্তিতে

বিশেষ্য → বিশেষ্যের বিশেষণ
সর্বনাম → সর্বনামের বিশেষণ
বিশেষণ → বিশেষণের বিশেষণ
ক্রিয়া → ক্রিয়াবিশেষণ
অব্যয় → অব্যয়ের বিশেষণধর্মী ব্যবহার

খ. অর্থের ভিত্তিতে

গুণ → গুণবাচক
অবস্থা → অবস্থাবাচক
সংখ্যা → সংখ্যাবাচক
ক্রম → পূরণবাচক/ক্রমবাচক
পরিমাণ → পরিমাণবাচক

গ. গঠনের ভিত্তিতে

একটি পদ → একপদী
একাধিক পদ → বহুপদী/পদগুচ্ছগত
নাম → নাম-বিশেষণ
ধ্বনি → ধ্বন্যাত্মক
সম্বন্ধসূচক রূপ → সম্বন্ধধর্মী বিশেষণ
পদান্তর → পদান্তরিত
পুনরুক্তি → শব্দদ্বৈতাশ্রয়ী
অব্যয়জাত → অব্যয়জাত
ক্রিয়াজাত → ক্রিয়াজাত
সর্বনামজাত → সর্বনামীয়

ঘ. বাক্যে অবস্থানের ভিত্তিতে

আগে → সাক্ষাৎ/বিশেষ্যপূর্ব
বিধেয় অংশে → বিধেয় বিশেষণ


৩৭. বিশেষণের অতিশায়ন : এক নজরে

সাধারণ

সুন্দর

তুলনামূলক

সুন্দরতর / আরও সুন্দর

সর্বোচ্চ

সুন্দরতম / সবচেয়ে সুন্দর

সূত্র

তর = তুলনায় বেশি
তম = সর্বাধিক


৩৮. বিশেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুলগুলি

ভুল ১

সব ‘-র/এর’ যুক্ত পদকে বিশেষণ ভাবা।

সঠিক:
রামের বই → সম্বন্ধ
মাটির পুতুল → উপাদান/বিশেষণধর্মী

ভুল ২

সব ‘দুই, তিন, চার’কে সংখ্যাবাচক বিশেষণ বলা।

‘তিন’ বাক্যে কী কাজ করছে তা দেখতে হবে।

ভুল ৩

সব স্থানবাচক পদকে ক্রিয়াবিশেষণ বলা।

স্থান বোঝানো এবং ক্রিয়াকে বিশেষিত করা এক জিনিস নয়।

ভুল ৪

‘পড়া’, ‘লেখা’, ‘দেখা’ সব সময় বিশেষণ ভাবা।

প্রয়োগ অনুযায়ী এগুলি বিশেষ্যও হতে পারে।

ভুল ৫

সর্বনামের বিশেষণ ও সর্বনামীয় বিশেষণকে এক মনে করা।

সর্বনামকে বিশেষিত করে → সর্বনামের বিশেষণ
সর্বনাম থেকে গঠিত → সর্বনামীয় বিশেষণ

ভুল ৬

একটি শব্দের একটিমাত্র পদপরিচয় আছে ভাবা।

পদপরিচয় প্রয়োগনির্ভর।


৩৯. বিশেষণ শেখার মহাসূত্র

বিশেষণ অধ্যায়টি মনে রাখার জন্য এই সূত্রটি সবচেয়ে কার্যকর—

“কাকে – কী – কত – কোথায় – কীভাবে”

কাকে বিশেষিত করছে?

→ বিশেষ্য / সর্বনাম / বিশেষণ

কী বলছে?

→ গুণ / দোষ / অবস্থা

কত?

→ সংখ্যা / পরিমাণ / মাত্রা

কততম?

→ ক্রম

কীভাবে গঠিত?

→ একপদী / বহুপদী / ক্রিয়াজাত / সর্বনামীয় / নামজাত

কোথায় আছে?

→ সাক্ষাৎ / বিধেয়


৪০. এক লাইনের মহাফর্মুলা

বিশেষণ = অন্য পদের বিশেষত্ব প্রকাশকারী পদ।

আর শ্রেণিবিভাগ মনে রাখো—

“পদ – অর্থ – গঠন – অবস্থান”

পদ অনুযায়ী → বিশেষ্যের, সর্বনামের, বিশেষণের, ক্রিয়ার, অব্যয়ের
অর্থ অনুযায়ী → গুণ, অবস্থা, সংখ্যা, ক্রম, পরিমাণ
গঠন অনুযায়ী → একপদী, বহুপদী, নামজাত, ধ্বন্যাত্মক, ক্রিয়াজাত, সর্বনামীয় ইত্যাদি
অবস্থান অনুযায়ী → সাক্ষাৎ, বিধেয়


৪১. মাত্র ৩০ সেকেন্ডে বিশেষণ অধ্যায়

পরীক্ষার আগে শুধু এটুকু মনে রাখলেই পুরো অধ্যায়ের কাঠামো মনে পড়বে—

বিশেষণ কী?

অন্য পদের গুণ/দোষ/অবস্থা/সংখ্যা/পরিমাণ/ক্রম/বিশেষত্ব প্রকাশ করে।

প্রধান পাঁচ প্রশ্ন

কাকে? → বিশেষিত পদ
কী? → গুণ/অবস্থা
কতটি? → সংখ্যা
কততম? → ক্রম
কতটা? → পরিমাণ/মাত্রা

চারটি শ্রেণিবিভাগের চাবি

পদ → অর্থ → গঠন → অবস্থান

গুরুত্বপূর্ণ জোড়া

বিশেষণ ↔ বিশেষ্য/সর্বনাম
ক্রিয়াবিশেষণ ↔ ক্রিয়া
সর্বনামের বিশেষণ ↔ সর্বনামকে বিশেষিত করে
সর্বনামীয় বিশেষণ ↔ সর্বনাম থেকে তৈরি
সাক্ষাৎ ↔ আগে
বিধেয় ↔ বিধেয় অংশে
তর ↔ তুলনামূলক
তম ↔ সর্বোচ্চ


৪২. শেষকথা : বিশেষণ বোঝার মূল দর্শন

বিশেষণকে শুধু ‘ভালো, মন্দ, সুন্দর, লাল’—এই কয়েকটি শব্দের তালিকা হিসেবে শেখা উচিত নয়। বিশেষণ আসলে ভাষার সেই শক্তি, যার সাহায্যে একটি সাধারণ পরিচয় নির্দিষ্ট, সূক্ষ্ম, বহুমাত্রিক ও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‘মানুষ’ একটি পরিচয়।
‘ভালো মানুষ’ একটি গুণসম্পন্ন পরিচয়।
‘তিনজন ভালো মানুষ’ সংখ্যাসহ পরিচয়।
‘প্রথম তিনজন ভালো মানুষ’ ক্রম ও সংখ্যাসহ পরিচয়।
‘অত্যন্ত ভালো তিনজন মানুষ’ আবার সেই গুণের মাত্রাও প্রকাশ করে।

অর্থাৎ—

বিশেষ্য আমাদের বলে ‘কী’; বিশেষণ বলে ‘কেমন’, ‘কত’, ‘কতটা’, ‘কোনটি’, ‘কততম’ এবং ‘কী অবস্থায়’।

আর বিশেষণ অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল—

শব্দকে মুখস্থ করে পদ চেনা যায় না; বাক্যে তার ভূমিকা বুঝে পদ চেনা যায়।

এই কারণে বিশেষণ অধ্যায়ের শেষ সূত্রটি হওয়া উচিত—

“শব্দ দেখো না—প্রয়োগ দেখো; শুধু গুণ দেখো না—কাকে বিশেষিত করছে দেখো।”

অধ্যায়ের চূড়ান্ত স্মরণসূত্র

বিশেষণ = বিশেষত্ব প্রকাশ
বিশেষ্যের বিশেষণ = নামকে বিশেষিত করে
সর্বনামের বিশেষণ = সর্বনামকে বিশেষিত করে
বিশেষণের বিশেষণ = বিশেষণের মাত্রা বাড়ায়/কমায়
ক্রিয়াবিশেষণ = ক্রিয়ার ধরন/সময়/স্থান/মাত্রা জানায়
গুণ = কেমন
অবস্থা = কী অবস্থায়
সংখ্যা = কতটি
ক্রম = কততম
পরিমাণ = কতটা
তর = বেশি
তম = সর্বাধিক
একপদী = এক পদ
বহুপদী = বহু পদ
সাক্ষাৎ = আগে
বিধেয় = বিধেয় অংশে
সর্বনামের বিশেষণ = সর্বনামকে বিশেষিত করে
সর্বনামীয় বিশেষণ = সর্বনাম থেকে গঠিত
চূড়ান্ত নিয়ম = প্রয়োগই পদপরিচয়ের বিচারক।


### পরিবেশনে-  ড. অনিশ রায়

 
 
 

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top