সংজ্ঞা, ধারণা, শ্রেণিবিভাগ, বৈশিষ্ট্য ও নির্ণয়ের কৌশল
১. বিশেষ্য : শব্দটির ধারণা
‘বিশেষ্য’ শব্দটির মূল ধারণা নিহিত আছে নামকরণ ও পৃথক সত্তা নির্দেশের মধ্যে। বাস্তব জগতে কিংবা মানুষের চিন্তা, কল্পনা ও অনুভূতির জগতে যে-কোনো ব্যক্তি, প্রাণী, বস্তু, স্থান, শ্রেণি, সমষ্টি, গুণ, অবস্থা, ভাব, কাজ, সংখ্যা ইত্যাদিকে চিহ্নিত করার জন্য যে নাম ব্যবহৃত হয়, তা বিশেষ্য পদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
সহজ কথায়—
যে পদের দ্বারা কোনো কিছুর নাম বোঝায়, সেই পদ বিশেষ্য।
তবে এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে—বিশেষ্য হল নাম; যার নাম বলা হচ্ছে, সেটি নিজে বিশেষ্য নয়।
যেমন, ‘জল’ একটি বিশেষ্য পদ। ‘জল’ শব্দটি একটি নির্দিষ্ট ধ্বনিসমষ্টি ও ভাষাগত নাম। যে তরল পদার্থটি আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করে, সেই পদার্থটি ভাষাবিজ্ঞানের অর্থে ‘বিশেষ্য’ নয়; ‘জল’ তার নাম।
অতএব—
নাম = বিশেষ্য পদ
যার নাম = বিশেষ্য নয়
একইভাবে ‘রাম’ একটি বিশেষ্য পদ; কিন্তু রাম নামের বাস্তব মানুষটি বিশেষ্য পদ নয়।
২. বিশেষ্য কাকে বলে?
সংজ্ঞা
যে পদের দ্বারা কোনো ব্যক্তি, প্রাণী, বস্তু, স্থান, শ্রেণি, সমষ্টি, ভাব, গুণ, অবস্থা, কাজ, সংখ্যা বা অন্য কোনো সত্তার নাম বোঝানো হয়, তাকে বিশেষ্য পদ বলে।
উদাহরণ—
- রাম — ব্যক্তি
- গোরু — প্রাণি/শ্রেণি
- কলকাতা — স্থান
- বই — বস্তু
- শিক্ষক — শ্রেণি
- পরিবার — সমষ্টি
- লজ্জা — ভাব
- সততা — গুণ
- শৈশব — অবস্থা
- খাওয়া — কাজ
- সাত — সংখ্যা
এখানে ‘রাম’, ‘গোরু’, ‘কলকাতা’, ‘বই’, ‘শিক্ষক’, ‘পরিবার’, ‘লজ্জা’, ‘সততা’, ‘শৈশব’, ‘খাওয়া’, ‘সাত’—প্রতিটি পদই নিজ নিজ অর্থে বিশেষ্য।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
কোনো শব্দকে শুধু অভিধানগত অর্থ দেখে বিশেষ্য বলা সব সময় নিরাপদ নয়। বাক্যে তার ব্যবহার বা পদগত ভূমিকা বিচার করাও জরুরি।
যেমন—
খেলা খুব ভালো।
আমি খেলা দেখতে যাব।
দুই ক্ষেত্রেই ‘খেলা’ বিশেষ্য পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
আবার—
ছেলেরা মাঠে খেলছে।
এখানে ‘খেলছে’ ক্রিয়াপদ।
অর্থাৎ একই মূল শব্দ বা ধাতু থেকে গঠিত শব্দ ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন পদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
৩. শব্দ ও পদ : বিশেষ্য বোঝার আগে যে পার্থক্য জানা জরুরি
শব্দ হল অর্থবোধক ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি; আর পদ হল বাক্যে ব্যবহৃত শব্দ বা শব্দগুচ্ছ, যা বাক্যের সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্যাকরণগত সম্পর্ক স্থাপন করে।
যেমন—
রাম বই পড়ে।
এখানে ‘রাম’ একটি শব্দ এবং বাক্যে ব্যবহৃত হয়ে একটি পদ। ‘রাম’ কর্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং তাই এটি বিশেষ্য পদ।
আবার—
রামের বইটি নতুন।
এখানে ‘রাম’ শব্দটির সঙ্গে ‘এর’ বিভক্তি যুক্ত হয়ে ‘রামের’ হয়েছে। ‘রামের’ পুরো পদটি বিশেষ্যপদজাত পদ এবং বাক্যে সম্বন্ধ নির্দেশ করছে।
সুতরাং বিশেষ্য শেখার সময় শুধু শব্দের নাম নয়, বাক্যে তার ব্যবহার দেখতে হবে।
৪. বিশেষ্যের শ্রেণিবিভাগ
বাংলা ব্যাকরণে বিশেষ্যের শ্রেণিবিভাগ একেবারে একরকম নয়। বিভিন্ন ব্যাকরণগ্রন্থে শ্রেণিবিভাগের সংখ্যা ও নামের কিছু পার্থক্য দেখা যায়।
প্রচলিতভাবে বিশেষ্যকে প্রধানত—
১. সংজ্ঞাবাচক/নামবাচক
২. শ্রেণিবাচক বা জাতিবাচক
৩. সমষ্টিবাচক
৪. বস্তুবাচক
৫. ভাববাচক
৬. গুণবাচক
৭. অবস্থাবাচক
৮. ক্রিয়াবাচক
৯. সংখ্যাবাচক
১০. ধ্বন্যাত্মক
ইত্যাদি ভাগে আলোচনা করা হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, এগুলি সব সময় একই স্তরের বা পরস্পর সম্পূর্ণ পৃথক শ্রেণি নয়। বিশেষত ভাববাচক, গুণবাচক ও অবস্থাবাচক—এই তিনটিই মূলত বিমূর্ত বা Abstract noun-এর অন্তর্গত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
৫. সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য
সংজ্ঞা
যে বিশেষ্যের দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, স্থান, নদী, পর্বত, গ্রহ, প্রতিষ্ঠান, গ্রন্থ, মাস, বার, উৎসব বা অন্য কোনো স্বতন্ত্র সত্তার নাম বোঝায়, তাকে সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য বলে।
ইংরেজিতে একে Proper Noun বলা হয়।
উদাহরণ
- ব্যক্তি — রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সঞ্জয়
- দেশ — ভারত, বাংলাদেশ
- শহর — কলকাতা, বাঁকুড়া
- নদী — গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র
- পর্বত — হিমালয়
- গ্রহ — পৃথিবী, মঙ্গল
- গ্রন্থ — গীতাঞ্জলি
- প্রতিষ্ঠান — কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
- মাস — বৈশাখ, জানুয়ারি
- বার — রবিবার, সোমবার
একটি সূক্ষ্ম বিষয়
‘সঞ্জয়’ নামটি পৃথিবীতে একাধিক মানুষের হতে পারে। তবুও কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তাঁর নাম ‘সঞ্জয়’ দিয়ে চিহ্নিত করলে সেটি সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য।
অর্থাৎ—
একটি নাম পৃথিবীতে একাধিক ব্যক্তির হলেও, প্রত্যেক ক্ষেত্রে তা সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম হিসেবে ব্যবহৃত হলে তা সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য।
উদাহরণ বাক্য
সঞ্জয় আজ স্কুলে আসেনি।
কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী।
গঙ্গা ভারতের একটি প্রধান নদী।
৬. শ্রেণিবাচক বা জাতিবাচক বিশেষ্য
সংজ্ঞা
যে বিশেষ্যের দ্বারা একই জাতি, শ্রেণি বা গোত্রের অন্তর্গত একাধিক ব্যক্তি, প্রাণী, বস্তু বা সত্তার সাধারণ নাম বোঝায়, তাকে শ্রেণিবাচক বা জাতিবাচক বিশেষ্য বলে।
ইংরেজিতে একে Common Noun বলা হয়।
উদাহরণ
- মানুষ
- ছাত্র
- শিক্ষক
- ডাক্তার
- উকিল
- গোরু
- হরিণ
- পাখি
- গাছ
- আমগাছ
- দেশ
- শহর
- জেলা
- নদী
- গ্রহ
- নক্ষত্র
- শিশু
- টিয়া
উদাহরণ বাক্য
গোরু একটি গৃহপালিত প্রাণী।
শিক্ষক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
শহর সাধারণত জনবহুল হয়।
এখানে ‘গোরু’ কোনো একটি নির্দিষ্ট গোরুর নাম নয়; গোটা শ্রেণির সাধারণ নাম। একইভাবে ‘শিক্ষক’ কোনো একজন নির্দিষ্ট শিক্ষকের নাম নয়; একটি শ্রেণির নাম।
সংজ্ঞাবাচক ও শ্রেণিবাচকের পার্থক্য
| সংজ্ঞাবাচক | শ্রেণিবাচক |
|---|---|
| নির্দিষ্ট সত্তার নাম | একটি শ্রেণির সাধারণ নাম |
| রবীন্দ্রনাথ | কবি |
| কলকাতা | শহর |
| গঙ্গা | নদী |
| ভারত | দেশ |
| রাম | ব্যক্তি |
সহজ সূত্র—
নির্দিষ্ট নাম = সংজ্ঞাবাচক
সাধারণ নাম = শ্রেণিবাচক/জাতিবাচক
৭. সমষ্টিবাচক বিশেষ্য
সংজ্ঞা
যে বিশেষ্যের দ্বারা একাধিক ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর সমষ্টি, দল বা যূথকে একত্রে বোঝায়, তাকে সমষ্টিবাচক বিশেষ্য বলে।
ইংরেজিতে একে Collective Noun বলা হয়।
উদাহরণ
- দল
- পাল
- গোষ্ঠী
- পরিবার
- সমাজ
- সভা
- সমিতি
- গণ
- জাতি
- বৃন্দ
- যূথ
- ঝাঁক
- সারি
- পংক্তি
- সংসদ
বাক্যে প্রয়োগ
দল মাঠে নেমেছে।
আকাশে পাখির ঝাঁক উড়ছে।
আমাদের পরিবার ছোট।
একটি গোষ্ঠী সভায় উপস্থিত হয়েছিল।
গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন
‘জোড়া’, ‘ডজন’, ‘আঁটি’, ‘গোছা’, ‘বোঝা’ ইত্যাদি শব্দ কখনো সমষ্টি বা পরিমাণ নির্দেশ করে; কিন্তু সব প্রসঙ্গে এগুলিকে কঠোর অর্থে Collective Noun বলা ঠিক নয়। বাক্যে ব্যবহারের প্রকৃতি অনুসারে এগুলি পরিমাণ, সমষ্টি বা গণনাসূচক পরিমাপক হিসেবেও কাজ করতে পারে।
যেমন—
এক জোড়া জুতো।
এখানে ‘জোড়া’ মূলত দুটি বস্তুর নির্দিষ্ট সমন্বিত পরিমাণ নির্দেশ করছে।
অতএব পরীক্ষায় সমষ্টিবাচক বিশেষ্যের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে দল, পাল, ঝাঁক, গোষ্ঠী, পরিবার, সমিতি, বৃন্দ, যূথ ইত্যাদি ব্যবহার করা অধিক নিরাপদ।
৮. বস্তুবাচক বিশেষ্য
সংজ্ঞা
যে বিশেষ্যের দ্বারা কোনো জড় বস্তু, পদার্থ বা উপাদানের নাম বোঝায়, তাকে বস্তুবাচক বিশেষ্য বলে।
উদাহরণ
- জল
- মাটি
- চিনি
- চাল
- পাথর
- কাঠ
- মাংস
- গ্যাস
- ধুলো
- কাদা
- সোনা
- তামা
- লোহা
- দুধ
- তেল
বাক্যে প্রয়োগ
জল জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য।
সোনা একটি মূল্যবান ধাতু।
মাটি দিয়ে নানা জিনিস তৈরি হয়।
বস্তুবাচক বিশেষ্যের ক্ষেত্রে কোনো কোনো শব্দ গণনাযোগ্য নয় বা পদার্থের সাধারণ নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
যেমন—
এক গ্লাস জল।
এক কেজি চাল।
এক টুকরো সোনা।
এখানে ‘জল’, ‘চাল’, ‘সোনা’ পদার্থের নাম।
৯. ভাববাচক বা বিমূর্ত বিশেষ্য
সংজ্ঞা
যে বিশেষ্যের দ্বারা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনো নির্দিষ্ট বস্তু নয়, বরং মানুষের মন, অনুভূতি, চিন্তা বা চেতনার কোনো বিমূর্ত ভাবের নাম বোঝায়, তাকে ভাববাচক বিশেষ্য বলে।
উদাহরণ
- প্রেম
- ভয়
- লজ্জা
- ঘৃণা
- ক্রোধ
- সুখ
- আনন্দ
- দুঃখ
- শোক
- শান্তি
- আদর্শ
- নীতি
- স্নেহ
- মায়া
বাক্যে প্রয়োগ
ভয় মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি।
তার মনে আনন্দ দেখা দিল।
প্রেম মানুষের জীবনের একটি গভীর অনুভূতি।
১০. গুণবাচক বিশেষ্য
সংজ্ঞা
যে বিশেষ্যের দ্বারা কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর গুণ, ধর্ম, বৈশিষ্ট্য বা গুণগত অবস্থার নাম বোঝানো হয়, তাকে গুণবাচক বিশেষ্য বলে।
উদাহরণ
- সততা
- সৌন্দর্য
- ভদ্রতা
- সরলতা
- বড়ত্ব
- হীনতা
- উচ্চতা
- মহত্ত্ব
- নিষ্ঠা
- সাহস
- মাধুর্য
বাক্যে প্রয়োগ
সততা মানুষের মহৎ গুণ।
তার সৌন্দর্য সকলকে আকৃষ্ট করেছিল।
সাহস বিপদের সময় মানুষকে শক্তি দেয়।
বিশেষ্য ও বিশেষণের পার্থক্য
এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার।
সৎ মানুষ।
এখানে ‘সৎ’ শব্দটি ‘মানুষ’-এর গুণ প্রকাশ করছে। তাই ‘সৎ’ বিশেষণ।
কিন্তু—
সততা মানুষের মহৎ গুণ।
এখানে ‘সততা’ কোনো মানুষের গুণের নাম। তাই ‘সততা’ বিশেষ্য।
অতএব—
যে শব্দ অন্য পদের গুণ প্রকাশ করে = বিশেষণ
যে শব্দ গুণটির নাম প্রকাশ করে = গুণবাচক বিশেষ্য
এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১১. অবস্থাবাচক বিশেষ্য
সংজ্ঞা
যে বিশেষ্যের দ্বারা কোনো ব্যক্তি, প্রাণী, সমাজ বা বস্তুর কোনো অবস্থা, পরিস্থিতি, কালগত দশা বা অবস্থানগত পরিস্থিতির নাম বোঝায়, তাকে অবস্থাবাচক বিশেষ্য বলে।
উদাহরণ
- শৈশব
- কৈশোর
- যৌবন
- বার্ধক্য
- দারিদ্র্য
- বিপদ
- সংকট
- নৈরাজ্য
- গোলমাল
- হট্টগোল
- সুপ্তি
- সকাল
- রাত্রি
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক সতর্কতা আছে। সকাল, রাত্রি ইত্যাদি শব্দকে সব ব্যাকরণবিদ অবস্থাবাচক বিশেষ্য বলবেন না; এগুলিকে কালবাচক বিশেষ্য হিসেবেও শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। বাংলা ব্যাকরণে শ্রেণিবিভাগের এই পার্থক্য স্বাভাবিক।
ভাববাচক, গুণবাচক ও অবস্থাবাচক : সম্পর্ক
এই তিন শ্রেণির মধ্যে সীমারেখা সব সময় কঠোর নয়। কারণ—
- ‘প্রেম’ — ভাব
- ‘সততা’ — গুণ
- ‘বার্ধক্য’ — অবস্থা
কিন্তু তিনটিই মূলত বিমূর্ত সত্তার নাম।
ইংরেজি ব্যাকরণে এদের বৃহত্তর শ্রেণি Abstract Noun।
তাই বৃহত্তর দৃষ্টিতে বলা যায়—
ভাববাচক + গুণবাচক + অবস্থাবাচক = বিমূর্ত/Abstract বিশেষ্যের বিভিন্ন উপশ্রেণি।
এই কারণে ‘ভাববাচক’ শব্দটি কখনো কখনো সমগ্র Abstract Noun-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। তাই শিক্ষাবিজ্ঞানের দিক থেকে ‘বিমূর্ত বিশেষ্য’ একটি বৃহত্তর ধারণা হিসেবে ব্যবহার করা অধিক পরিষ্কার।
১২. ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য
সংজ্ঞা
যে বিশেষ্যের দ্বারা কোনো কাজ বা ক্রিয়ার নাম বোঝানো হয়, তাকে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য বলে।
উদাহরণ
- খাওয়া
- যাওয়া
- আসা
- দেখা
- বলা
- পড়া
- শোনা
- হাঁটা
- খেলা
- পড়ানো
- দেখানো
- শোনানো
- গ্রহণ
- বর্জন
- দর্শন
- পঠন
- পাঠ
- ভোজন
- শ্রবণ
বাক্যে প্রয়োগ
খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়।
হাঁটা শরীরের পক্ষে ভালো।
পড়াশোনা জীবনের উন্নতিতে সাহায্য করে।
আমরা খেলা দেখতে যাব।
এখানে কাজটি করা হচ্ছে না; কাজটির নাম বলা হচ্ছে।
১২.১ ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য ও ক্রিয়াপদের পার্থক্য
এটি বিশেষ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তুলনা করুন—
রাহুল খায়।
এখানে ‘খায়’ দ্বারা কাজটি করা বোঝাচ্ছে। তাই এটি ক্রিয়াপদ।
আবার—
খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়।
এখানে ‘খাওয়া’ দ্বারা কাজটির নাম বোঝানো হয়েছে। তাই এটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য।
আরও—
সে প্রতিদিন পড়ে। — ক্রিয়াপদ
পড়া তার অভ্যাস। — ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য
অতএব সূত্র—
কাজ করা বোঝালে = ক্রিয়া
কাজের নাম বোঝালে = ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য
১৩. ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য গঠনের পদ্ধতি
বাংলায় ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য গঠনে বিভিন্ন প্রত্যয় ও গঠনপদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
‘আ’ যোগে
- দেখ্ + আ = দেখা
- পড়্ + আ = পড়া
- খা + আ = খাওয়া
- যা + আ = যাওয়া
‘আনো’ জাতীয় গঠনে
- দেখ্ + আনো = দেখানো
- শোন্ + আনো = শোনানো
- পড়্ + আনো = পড়ানো
‘অন’ জাতীয় সংস্কৃত উৎসের প্রত্যয়ে
- দৃশ্ + অন = দর্শন
- গৃহ্ + অন = গ্রহণ
- ভুজ্ + অন = ভোজন
- শ্রু + অন = শ্রবণ
তবে ‘আ’, ‘আনো’, ‘অন’ যোগ হলেই যে শব্দ সব ক্ষেত্রে বিশেষ্য হবে—এমন সরল নিয়ম করা যাবে না। শব্দটির বাক্যগত ব্যবহারও বিচার করতে হবে।
১৪. সংখ্যাবাচক বিশেষ্য
সংজ্ঞা
যে বিশেষ্যের দ্বারা কোনো সংখ্যার নাম বোঝায় এবং যা নিজে অন্য কোনো পদের সংখ্যা নির্দেশ না করে সংখ্যাটিকেই একটি স্বতন্ত্র ধারণা হিসেবে প্রকাশ করে, তাকে সংখ্যাবাচক বিশেষ্য বলা যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
তিনটি বই।
এখানে ‘তিন’ বইয়ের সংখ্যা নির্দেশ করছে। এটি সংখ্যাবাচক বিশেষণ/সংখ্যাবাচক নির্ধারক হিসেবে কাজ করছে।
কিন্তু—
তিন আর চারে সাত।
এখানে ‘তিন’, ‘চার’ ও ‘সাত’ নিজ নিজ সংখ্যার নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই এগুলি সংখ্যাবাচক বিশেষ্য।
আরও—
আমি সাত-পাঁচ বুঝি না।
এখানে ‘সাত-পাঁচ’ একটি সংখ্যাগত ধারণাকে নামের মতো ব্যবহার করছে।
সূত্র
অন্য কিছুর সংখ্যা প্রকাশ করলে → সংখ্যাবাচক বিশেষণ/সংখ্যাসূচক নির্ধারক
নিজেই সংখ্যার নাম হলে → সংখ্যাবাচক বিশেষ্য
১৫. ধ্বন্যাত্মক বিশেষ্য
সংজ্ঞা
ধ্বনি বা শব্দের অনুকরণ থেকে গঠিত কোনো শব্দ যখন বাক্যে একটি ধ্বনি, শব্দ বা শব্দজাত ঘটনাকে নাম হিসেবে নির্দেশ করে এবং বিশেষ্যের কাজ করে, তখন তাকে ধ্বন্যাত্মক বিশেষ্য বলা যায়।
উদাহরণ
মেঘের কড়কড় শোনা গেল।
তার বুকের ধুকপুকুনি বেড়ে গেল।
বৃষ্টির ঝমঝমানি কমছে না।
এখানে ‘কড়কড়’, ‘ধুকপুকুনি’, ‘ঝমঝমানি’ ইত্যাদি ধ্বনি বা ধ্বনির অনুকরণ থেকে গঠিত এবং বাক্যে নামের মতো ব্যবহৃত হয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে—
ধ্বন্যাত্মক হওয়া একটি শব্দের গঠনগত বৈশিষ্ট্য; আর বিশেষ্য হওয়া তার বাক্যগত পদগত ভূমিকা।
অতএব কোনো অনুকার শব্দকে কেবল ধ্বনি অনুকরণ করে তৈরি হয়েছে বলে সর্বত্র বিশেষ্য বলা যাবে না।
১৬. বিশেষ্যের আরও কিছু অর্থগত শ্রেণি
উপরের প্রচলিত শ্রেণিগুলির পাশাপাশি বাংলা ভাষায় বিশেষ্যকে অর্থের দিক থেকে আরও সূক্ষ্মভাবে দেখা যায়।
কালবাচক বিশেষ্য
যে শব্দ দ্বারা সময় বা কালের নাম বোঝায়।
উদাহরণ—
- সকাল
- সন্ধ্যা
- রাত্রি
- দিন
- মাস
- বছর
- শৈশব
- যৌবন
স্থানবাচক বিশেষ্য
যে শব্দ দ্বারা কোনো স্থান বা অবস্থানের নাম বোঝায়।
- দেশ
- শহর
- গ্রাম
- বিদ্যালয়
- বাজার
- নদী
- পাহাড়
তবে এগুলির অনেকগুলিই আবার বৃহত্তর অর্থে শ্রেণিবাচক বিশেষ্য হতে পারে। যেমন ‘শহর’ একটি স্থানবাচক ধারণা, আবার Common Noun বা শ্রেণিবাচক বিশেষ্যও।
এখানেই বিশেষ্যের শ্রেণিবিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়—
একটি বিশেষ্যকে তার অর্থের একাধিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একাধিকভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা সম্ভব।
যেমন ‘শহর’—
- স্থানবাচক
- শ্রেণিবাচক
‘কলকাতা’—
- স্থানবাচক
- সংজ্ঞাবাচক
‘শৈশব’—
- কালবাচক
- অবস্থাবাচক
- বিমূর্ত বিশেষ্য
অতএব শ্রেণিবিভাগকে সব সময় একটি মাত্র বাক্সে বন্দি করা যায় না।
১৭. বিশেষ্য পদ চেনার সহজ ও নির্ভরযোগ্য উপায়
বিশেষ্য চেনার জন্য কয়েকটি পরীক্ষামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। তবে কোনো একটি সূত্রকে একমাত্র নিয়ম মনে করা উচিত নয়।
কৌশল ১ : ‘নাম’ খুঁজে বের করো
প্রথমে প্রশ্ন করো—
এটি কি কোনো ব্যক্তি, প্রাণী, বস্তু, স্থান, সমষ্টি, ভাব, গুণ, অবস্থা, কাজ বা সংখ্যার নাম?
যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে সেটি বিশেষ্য হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
কৌশল ২ : ‘কে?’ বা ‘কী?’ প্রশ্ন করো
বাক্যে কোনো পদকে দেখে প্রশ্ন করো—
কে?
কী?
উত্তর যদি কোনো নাম নির্দেশ করে, তবে তা বিশেষ্য বা সর্বনামজাত পদ হতে পারে।
যেমন—
রাহুল বই পড়ে।
কে বই পড়ে?
উত্তর—রাহুল।
‘রাহুল’ বিশেষ্য।
কৌশল ৩ : বিভক্তি গ্রহণের ক্ষমতা
বাংলায় বিশেষ্য ও সর্বনাম নানা বিভক্তি গ্রহণ করতে পারে।
যেমন—
- রাম + কে = রামকে
- রাম + এর = রামের
- রাম + এ = রামে
- রাম + থেকে = রাম থেকে
- বই + টি = বইটি
- বই + এর = বইয়ের
তবে সতর্কতা—
বিভক্তি গ্রহণ করলেই শব্দটি অবশ্যই বিশেষ্য—এমন নয়।
কারণ বিশেষণ, সংখ্যাবাচক শব্দ বা অন্য শব্দও বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত হলে বিভক্তি গ্রহণ করতে পারে।
যেমন—
ভালোকে সবাই ভালোবাসে।
এখানে ‘ভালো’ মূলত বিশেষণ; কিন্তু ‘ভালো মানুষকে’ সংক্ষেপ করে বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত হয়েছে।
অতএব বিভক্তি হল সহায়ক পরীক্ষা, চূড়ান্ত পরীক্ষা নয়।
১৮. কারক দ্বারা বিশেষ্য নির্ণয়
বাংলা বাক্যে বিশেষ্য ও সর্বনাম নানা কারকে ব্যবহৃত হয়।
যেমন—
রাহুল বই পড়ে। — কর্তৃকারক
আমি রাহুলকে ডাকলাম। — কর্মকারক
রাহুলের বই। — সম্বন্ধ
রাহুল দিয়ে কাজটি করানো হলো। — করণধর্মী ব্যবহার
তাই কোনো পদ কারক-সম্পর্কে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা বিশেষ্য নির্ণয়ে সাহায্য করে।
তবে এখানেও মনে রাখতে হবে—
কারকপদ হিসেবে ব্যবহৃত পদ সব সময় কেবল বিশেষ্যই হবে না; সর্বনামও কারকপদ হতে পারে।
যেমন—
সে বই পড়ে।
আমি তাকে ডাকলাম।
‘সে’, ‘তাকে’—সর্বনাম।
অতএব—
কারকপদ = বিশেষ্য অথবা সর্বনাম—এটি সাধারণ সূত্র।
১৯. অস্তিত্ব ও কল্পনার সূত্র
বিশেষ্য শুধু চোখে দেখা জিনিসের নাম নয়।
বাস্তব জগতে যার অস্তিত্ব আছে—
মানুষ, গাছ, নদী, ঘর, বই
সেগুলি বিশেষ্য।
আবার বাস্তবে স্পর্শ বা প্রত্যক্ষ করা না গেলেও মানুষের চিন্তা, অনুভূতি বা কল্পনার জগতে যার অস্তিত্ব আছে—
প্রেম, সুখ, দুঃখ, আদর্শ, ন্যায়, শান্তি, সৌন্দর্য
সেগুলিও বিশেষ্য।
অতএব—
বাস্তব সত্তার নাম যেমন বিশেষ্য, বিমূর্ত সত্তার নামও বিশেষ্য।
২০. বিশেষ্য ও বিশেষণের পার্থক্য
এটি পরীক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ্য
কোনো কিছুর নাম বোঝায়।
সততা মহৎ গুণ।
এখানে ‘সততা’ = গুণের নাম → বিশেষ্য।
বিশেষণ
কোনো বিশেষ্য বা সর্বনামের গুণ, দোষ, সংখ্যা, পরিমাণ, অবস্থা ইত্যাদি প্রকাশ করে।
সে সৎ মানুষ।
এখানে ‘সৎ’ = মানুষের গুণ প্রকাশ করছে → বিশেষণ।
আরও—
সুন্দর ফুল। — সুন্দর = বিশেষণ
ফুলের সৌন্দর্য অপরূপ। — সৌন্দর্য = বিশেষ্য
উচ্চ পাহাড়। — উচ্চ = বিশেষণ
পাহাড়ের উচ্চতা বেশি। — উচ্চতা = বিশেষ্য
ভদ্র ছেলে। — ভদ্র = বিশেষণ
তার ভদ্রতা সকলকে মুগ্ধ করেছে। — ভদ্রতা = বিশেষ্য
মূল সূত্র
গুণ প্রকাশ করে = বিশেষণ
গুণের নাম প্রকাশ করে = গুণবাচক বিশেষ্য
২১. বিশেষ্য ও সর্বনামের পার্থক্য
বিশেষ্য কোনো কিছুর নাম প্রকাশ করে; সর্বনাম বিশেষ্যের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়।
রাহুল স্কুলে গেল।
সে পড়াশোনা করল।
এখানে—
- রাহুল = বিশেষ্য
- সে = সর্বনাম
আবার—
কলকাতা একটি বড় শহর।
এটি ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মহানগর।
‘কলকাতা’ বিশেষ্য; ‘এটি’ সর্বনাম।
সূত্র
নাম বললে = বিশেষ্য
নামের পরিবর্তে ব্যবহৃত হলে = সর্বনাম
২২. বিশেষ্য ও ক্রিয়ার পার্থক্য
রাহুল খেলছে।
খেলা তার প্রিয়।
প্রথম বাক্যে ‘খেলছে’ কাজটি সংঘটিত হওয়া বোঝাচ্ছে → ক্রিয়া।
দ্বিতীয় বাক্যে ‘খেলা’ কাজটির নাম → বিশেষ্য।
আরও—
সে প্রতিদিন পড়ে।
পড়া তার অভ্যাস।
তারা হাঁটে।
হাঁটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো।
অতএব—
কাজ সংঘটিত হওয়া = ক্রিয়া
কাজের নাম = ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য
২৩. বিশেষ্য ও সংখ্যাবাচক শব্দ
একই ‘তিন’ শব্দ দুইভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তিনটি বই কিনেছি।
এখানে ‘তিন’ বইয়ের সংখ্যা নির্ধারণ করছে। এটি সংখ্যাসূচক বিশেষণ/নির্ধারক হিসেবে ব্যবহৃত।
কিন্তু—
তিন একটি মৌলিক সংখ্যা।
এখানে ‘তিন’ নিজেই একটি সংখ্যার নাম। তাই এটি সংখ্যাবাচক বিশেষ্য।
অতএব—
অন্য পদের সংখ্যা বলে = সংখ্যাসূচক বিশেষণ/নির্ধারক
নিজের নাম হিসেবে সংখ্যা বোঝায় = সংখ্যাবাচক বিশেষ্য
২৪. বিশেষ্যের সঙ্গে বিশেষণ যুক্ত হওয়া
বিশেষ্যকে বিশেষণ নানা দিক থেকে নির্দিষ্ট বা বর্ণিত করে।
যেমন—
ভালো ছেলে
লাল ফুল
তিনটি বই
বড় বাড়ি
সৎ মানুষ
এখানে—
- ছেলে = বিশেষ্য
- ফুল = বিশেষ্য
- বই = বিশেষ্য
- বাড়ি = বিশেষ্য
- মানুষ = বিশেষ্য
এবং—
- ভালো = বিশেষণ
- লাল = বিশেষণ
- তিনটি = সংখ্যাসূচক বিশেষণ/নির্ধারক
- বড় = বিশেষণ
- সৎ = বিশেষণ
২৫. একই শব্দের পদপরিবর্তন
বাংলায় একই শব্দ সব বাক্যে একই পদ হিসেবে ব্যবহৃত হবে—এমন নয়।
যেমন—
‘খেলা’
খেলা শুরু হয়েছে। — বিশেষ্য
ছেলেরা মাঠে খেলছে। — ক্রিয়া
‘ভালো’
সে ভালো ছেলে। — বিশেষণ
ভালো সবাই পছন্দ করে। — বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত
‘সাত’
সাতটি বই আছে। — সংখ্যাসূচক নির্ধারক
সাত একটি বিজোড় সংখ্যা। — সংখ্যাবাচক বিশেষ্য
অতএব—
শব্দের পদপরিচয় অনেক সময় বাক্যে তার ব্যবহারের উপর নির্ভর করে।
এটি বিশেষ্য নির্ণয়ের অন্যতম মৌলিক নীতি।
২৬. বিশেষ্য পদের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
বিশেষ্য সাধারণত—
১. কোনো কিছুর নাম প্রকাশ করে।
২. ব্যক্তি, প্রাণী, বস্তু, স্থান, শ্রেণি বা সমষ্টি নির্দেশ করতে পারে।
৩. ভাব, গুণ, অবস্থা, কাজ ও সংখ্যা নির্দেশ করতে পারে।
৪. বিভক্তি গ্রহণ করতে পারে।
৫. কারক-সম্পর্কে ব্যবহৃত হতে পারে।
৬. বহুবচন গ্রহণ করতে পারে—যেমন মানুষরা, ছাত্ররা, বইগুলি।
৭. নির্দেশক গ্রহণ করতে পারে—যেমন বইটি, মানুষটি, ছেলেটি।
৮. বিশেষণ দ্বারা বিশেষিত হতে পারে—যেমন ভালো ছেলে, লাল ফুল।
৯. সর্বনাম দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে।
১০. অনেক ক্ষেত্রে সম্বন্ধপদ তৈরি করতে পারে—যেমন রামের বই, কলকাতার মানুষ।
২৭. বিশেষ্যের বচন
বিশেষ্য একবচন বা বহুবচন নির্দেশ করতে পারে।
একবচন
ছেলে, বই, মানুষ, পাখি
বহুবচন
ছেলেরা, বইগুলি, মানুষজন, পাখিরা
বাংলায় বহুবচন প্রকাশে ব্যবহৃত হয়—
- -রা
- -গুলি
- -গুলো
- -দিগ
- -জন
- -বৃন্দ
- -সমূহ
- -কুল
- -গণ
যেমন—
ছাত্ররা
বইগুলি
মানুষজন
শিক্ষকবৃন্দ
লোকসমূহ
তবে সব নির্দেশক সব বিশেষ্যের সঙ্গে সমানভাবে ব্যবহৃত হয় না।
২৮. নির্দেশক ও বিশেষ্য
বাংলায় বিশেষ্যের সঙ্গে ‘টি’, ‘টা’, ‘খানা’, ‘জন’, ‘জনি’, ‘গুলি’, ‘গুলো’ ইত্যাদি নির্দেশক যুক্ত হতে পারে।
যেমন—
- বইটি
- ছেলেটি
- ঘরটা
- লোকজন
- মানুষগুলো
- দুটি বই
- একখানা চিঠি
এগুলি বিশেষ্যের অর্থকে নির্দিষ্ট, পরিমাণগত বা গণনাযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে।
২৯. বিশেষ্যের সঙ্গে বিভক্তির ব্যবহার
বিশেষ্য বিভিন্ন বিভক্তি গ্রহণ করতে পারে।
যেমন—
শূন্য বিভক্তি
রাম যায়।
কে
রামকে ডাকো।
র/এর
রামের বই।
এ/তে
ঘরে বসো।
স্কুলে যাও।
থেকে/হতে
কলকাতা থেকে এলাম।
দিয়ে
কলম দিয়ে লিখি।
এখানে বিশেষ্য বাক্যের বিভিন্ন সম্পর্ক প্রকাশ করছে।
৩০. বিশেষ্য শণাক্ত করার ‘পাঁচ পরীক্ষা’
কোনো শব্দ বিশেষ্য কি না বুঝতে দ্রুত পাঁচটি প্রশ্ন করা যায়—
১. নামের পরীক্ষা
এটি কি কোনো কিছুর নাম?
২. ‘কে/কী’ পরীক্ষা
বাক্যে ‘কে?’ বা ‘কী?’ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে কি?
৩. বিভক্তির পরীক্ষা
কে, র, এর, এ, তে, থেকে, দিয়ে ইত্যাদি গ্রহণ করতে পারছে কি?
৪. কারক পরীক্ষা
কর্তা, কর্ম, করণ, অপাদান, অধিকরণ ইত্যাদি সম্পর্ক গ্রহণ করছে কি?
৫. বিশেষণের পরীক্ষা
এর আগে/পরে কোনো বিশেষণ বসিয়ে অর্থপূর্ণ পদবন্ধ তৈরি করা যায় কি?
যেমন—
সুন্দর ফুল
বড় বাড়ি
ভালো মানুষ
এখানে ‘ফুল’, ‘বাড়ি’, ‘মানুষ’ বিশেষ্য।
তবে এই পরীক্ষাগুলির কোনোটিই এককভাবে চূড়ান্ত নয়; বাক্যে শব্দটির অর্থ ও ব্যবহারই শেষ বিচার।
৩১. বিশেষ্য নির্ণয়ের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
বিশেষ্য চেনার ক্ষেত্রে নিচের ভুলগুলি করা যাবে না।
ভুল ১
“যার অস্তিত্ব আছে, সেটিই বিশেষ্য।”
এটি পুরোপুরি ঠিক নয়।
সঠিক—
যার নাম আছে এবং সেই নামটি পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি বিশেষ্য হতে পারে।
কারণ বিমূর্ত ধারণারও নাম আছে।
ভুল ২
“যে শব্দ বিভক্তি নেয়, সেটিই বিশেষ্য।”
এটিও সর্বাংশে ঠিক নয়।
কারণ অন্য পদও বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত হলে বিভক্তি নিতে পারে।
ভুল ৩
“যে শব্দ কারক হয়, সেটিই বিশেষ্য।”
এটিও অসম্পূর্ণ।
কারণ সর্বনামও কারকপদ হতে পারে।
ভুল ৪
“আ/আনো/অন থাকলেই ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য।”
এটিও যান্ত্রিক নিয়ম নয়।
শব্দটির অর্থ ও বাক্যগত ব্যবহার বিচার করতে হবে।
ভুল ৫
“গুণের নাম ও গুণবাচক বিশেষণ একই।”
ভুল।
সৎ — বিশেষণ
সততা — বিশেষ্য
সুন্দর — বিশেষণ
সৌন্দর্য — বিশেষ্য
৩২. বিশেষ্যের শ্রেণিবিভাগ : এক নজরে
| প্রকার | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সংজ্ঞাবাচক | নির্দিষ্ট নাম | রাম, কলকাতা, গঙ্গা |
| শ্রেণিবাচক/জাতিবাচক | সাধারণ শ্রেণির নাম | মানুষ, গোরু, শহর |
| সমষ্টিবাচক | সমষ্টি বা দল | দল, পাল, ঝাঁক, গোষ্ঠী |
| বস্তুবাচক | বস্তু/পদার্থ | জল, মাটি, সোনা |
| ভাববাচক | বিমূর্ত ভাব | প্রেম, দুঃখ, আনন্দ |
| গুণবাচক | গুণের নাম | সততা, সৌন্দর্য |
| অবস্থাবাচক | অবস্থা/দশার নাম | শৈশব, বার্ধক্য, দারিদ্র্য |
| ক্রিয়াবাচক | কাজের নাম | খাওয়া, দেখা, হাঁটা |
| সংখ্যাবাচক | সংখ্যার নাম | তিন, সাত |
| ধ্বন্যাত্মক | ধ্বনি-অনুকরণজাত নাম | কড়কড়, ঝমঝমানি |
৩৩. বিশেষ্যের শ্রেণিবিভাগ মনে রাখার সহজ পদ্ধতি
বিশেষ্যের শ্রেণিগুলিকে অর্থের ভিত্তিতে চারটি বড় দলে মনে রাখা যায়।
ক. ‘নাম’ কী?
সংজ্ঞাবাচক + শ্রেণিবাচক
খ. ‘সমষ্টি’ কী?
সমষ্টিবাচক
গ. ‘কী ধরনের সত্তা?’
বস্তুবাচক + বিমূর্ত
বিমূর্তের মধ্যে—
- ভাব
- গুণ
- অবস্থা
ঘ. ‘কাজ/সংখ্যা/ধ্বনি’ কী?
ক্রিয়াবাচক + সংখ্যাবাচক + ধ্বন্যাত্মক
৩৪. বিশেষ্যের পূর্ণাঙ্গ ধারণা : একটি ধারণাচিত্র
বিশেষ্যকে মনে রাখা যায় এইভাবে—
বিশেষ্য = নাম
↓
কিসের নাম?
→ ব্যক্তি/নির্দিষ্ট সত্তা → সংজ্ঞাবাচক
→ শ্রেণি/জাতি → শ্রেণিবাচক
→ সমষ্টি → সমষ্টিবাচক
→ বস্তু/পদার্থ → বস্তুবাচক
→ ভাব → ভাববাচক
→ গুণ → গুণবাচক
→ অবস্থা → অবস্থাবাচক
→ কাজ → ক্রিয়াবাচক
→ সংখ্যা → সংখ্যাবাচক
→ ধ্বনি → ধ্বন্যাত্মক
৩৫. বিশেষ্য শেখার সর্বশ্রেষ্ঠ সূত্র
বিশেষ্য শেখার জন্য একটি মাত্র সূত্র মনে রাখতে হলে—
“নামকে খুঁজে নাও—বিশেষ্যকে পেয়ে যাবে।”
আরও বিস্তৃত সূত্র—
ব্যক্তি + প্রাণী + বস্তু + স্থান + শ্রেণি + সমষ্টি + ভাব + গুণ + অবস্থা + কাজ + সংখ্যা = বিশেষ্য
এটি মনে রাখলে বিশেষ্যের প্রায় সমস্ত মৌলিক ক্ষেত্র ধরা যায়।
৩৬. পরীক্ষার জন্য ‘এক মিনিটের সূত্র’
বিশেষ্য = নাম
নির্দিষ্ট নাম → সংজ্ঞাবাচক
সাধারণ নাম → শ্রেণিবাচক
দলের নাম → সমষ্টিবাচক
পদার্থের নাম → বস্তুবাচক
ভাবের নাম → ভাববাচক
গুণের নাম → গুণবাচক
অবস্থার নাম → অবস্থাবাচক
কাজের নাম → ক্রিয়াবাচক
সংখ্যার নাম → সংখ্যাবাচক
ধ্বনির অনুকরণে তৈরি নাম → ধ্বন্যাত্মক
৩৭. বিশেষ্য চেনার ‘গোল্ডেন ফর্মুলা’
শেষবারের মতো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করে—
নাম = বিশেষ্য
নির্দিষ্ট নাম = সংজ্ঞা
সাধারণ নাম = শ্রেণি
দল/সমষ্টির নাম = সমষ্টি
পদার্থের নাম = বস্তু
মনের ভাবের নাম = ভাব
গুণের নাম = গুণ
দশার নাম = অবস্থা
কাজের নাম = ক্রিয়া
সংখ্যার নাম = সংখ্যা
ধ্বনির নাম = ধ্বন্যাত্মক
এবং তিনটি পার্থক্য অবশ্যই মনে রাখতে হবে—
গুণ প্রকাশ করলে → বিশেষণ
গুণের নাম হলে → গুণবাচক বিশেষ্য
কাজ করলে → ক্রিয়াপদ
কাজের নাম হলে → ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য
নামের পরিবর্তে বসলে → সর্বনাম
নামটি নিজে হলে → বিশেষ্য
৩৮. চূড়ান্ত স্মরণসূত্র
**“নাম, জাত, দল, বস্তু—ভাব, গুণ, দশা;
কাজ, সংখ্যা, ধ্বনি—বিশেষ্যের ভাষা।”**
অথবা পরীক্ষার খাতায় লেখার মতো এক লাইনের সূত্র—
যে পদের দ্বারা কোনো ব্যক্তি, প্রাণী, বস্তু, স্থান, শ্রেণি, সমষ্টি, ভাব, গুণ, অবস্থা, কাজ, সংখ্যা বা ধ্বনির নাম বোঝায়, সেই পদ বিশেষ্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি
বিশেষ্য চেনার ক্ষেত্রে শুধু শব্দের চেহারা নয়, তার অর্থ এবং বাক্যে তার ব্যবহার—এই তিনটিকেই একসঙ্গে বিচার করতে হবে।
এই নীতিটিই বিশেষ্যপদ অধ্যায়ের প্রকৃত চাবিকাঠি।

