বাংলা শব্দগঠন, পদগঠন, কারক-অন্বয় ও নির্দিষ্টতাবোধক রূপমূল
ভূমিকা
বাংলা ভাষায় শব্দ কীভাবে গঠিত হয়, শব্দ কীভাবে পদে পরিণত হয়, বাক্যের মধ্যে এক পদের সঙ্গে অন্য পদের সম্পর্ক কীভাবে প্রকাশিত হয় এবং কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়কে কীভাবে নির্দিষ্ট করে তোলা হয়—এই চারটি প্রশ্নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত উপসর্গ, অনুসর্গ, বিভক্তি ও নির্দেশক।
চারটির কাজ এক নয়।
- উপসর্গ শব্দ বা ধাতুর আগে বসে অর্থের পরিবর্তন, সম্প্রসারণ, সংকোচন বা নতুন অর্থের সৃষ্টি করে।
- বিভক্তি শব্দ বা ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পদ বা ক্রিয়াপদ গঠন এবং কারক, সম্বন্ধ, কাল ও পুরুষ নির্দেশে সাহায্য করে।
- অনুসর্গ পদের পরে স্বাধীনভাবে বসে পদের সঙ্গে বাক্যের অন্য পদের সম্পর্ক, বিশেষত কারক-সম্পর্ক, স্পষ্ট করে।
- নির্দেশক শব্দ বা পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্টতা ও বচন প্রকাশ করে।
এই কারণে চারটি বিষয়কে পাশাপাশি পড়লে বাংলা শব্দগঠন ও বাক্যগঠনের একটি সুসংহত ছবি পাওয়া যায়।
মনে রাখবে :
আগে বসে অর্থ বদলায় → উপসর্গ
লেগে থেকে কারক/পদ/ক্রিয়া গঠনে সাহায্য করে → বিভক্তি
পরে আলাদা বসে সম্পর্ক বোঝায় → অনুসর্গ
পদকে নির্দিষ্ট করে → নির্দেশক
প্রথম অধ্যায় : উপসর্গ
১. উপসর্গ কাকে বলে?
যে অব্যয় বা শব্দাংশ কোনো ধাতু বা শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়ে তার অর্থের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংকোচন, পূর্ণতা বা নতুন অর্থের সৃষ্টি করে, তাকে উপসর্গ বলে।
উদাহরণ
- প্র + কার = প্রকার
- উপ + কার = উপকার
- অপ + কার = অপকার
- প্রতি + কার = প্রতিকার
- আ + কার = আকার
এখানে ‘প্র’, ‘উপ’, ‘অপ’, ‘প্রতি’, ‘আ’—প্রতিটি মূল শব্দের আগে বসে মূল অর্থে পরিবর্তন বা নতুন অর্থের দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে।
সংজ্ঞার সূত্র
উপসর্গ = পূর্বে বসে + অর্থের পরিবর্তন/দ্যোতনা + নতুন শব্দ
২. ‘উপসর্গ’-এর অর্থ কী?
‘উপসর্গ’ শব্দটি সংস্কৃত ‘উপ’ এবং ‘সৃজ্’ ধাতু থেকে গঠিত। ব্যাকরণগত বিচারে উপসর্গ হলো এমন একটি পরাধীন রূপমূল, যা সাধারণত অন্য শব্দ বা ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থবৈচিত্র্য সৃষ্টি করে।
উপসর্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি সাধারণত একা স্বাধীন পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।
৩. ‘উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে’—ব্যাখ্যা
এটি উপসর্গ-সম্পর্কিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকরণীয় সূত্র।
উপসর্গের নিজস্ব স্বাধীন অর্থ সাধারণত থাকে না। অর্থাৎ, ‘প্র’, ‘উপ’, ‘অপ’, ‘পরি’ ইত্যাদি একা বসে পূর্ণ শব্দের মতো নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশ করে না। কিন্তু কোনো শব্দ বা ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে তারা সেই শব্দের অর্থে বিশেষ পরিবর্তন বা দ্যোতনা সৃষ্টি করে।
অর্থাৎ—
উপসর্গ নিজে অর্থ ‘বলে’ না; কিন্তু মূল শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশেষ অর্থ ‘দেখায়’ বা ‘দ্যোতিত’ করে।
উদাহরণ
‘হার’ শব্দের সঙ্গে বিভিন্ন উপসর্গ যুক্ত হলে—
- আ + হার = আহার → খাওয়া
- উদ্ + হার = উদ্ধার → রক্ষা/মুক্তি
- উপ + হার = উপহার → দান/উপঢৌকন
- প্র + হার = প্রহার → আঘাত
- পরি + হার = পরিহার → বর্জন
- বি + হার = বিহার → বিচরণ
- সং + হার = সংহার → ধ্বংস
এখানে ‘হার’-এর সঙ্গে উপসর্গ পরিবর্তিত হওয়ায় একই মূলের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দগুলির অর্থেও ব্যাপক পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।
৪. উপসর্গের প্রয়োজনীয়তা
উপসর্গ বাংলা শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। এর সাহায্যে—
১. নতুন শব্দ গঠিত হয়।
২. মূল শব্দের অর্থ পরিবর্তিত হয়।
৩. মূল অর্থের সম্প্রসারণ ঘটে।
৪. অর্থের সংকোচন ঘটে।
৫. মূল অর্থের পূর্ণতা আসে।
৬. বিপরীত বা নেতিবাচক অর্থ সৃষ্টি হতে পারে।
৭. একই মূল থেকে বহু অর্থবৈচিত্র্যপূর্ণ শব্দ তৈরি করা যায়।
উদাহরণ
প্র + ভাত = প্রভাত
সম্ + পূর্ণ = সম্পূর্ণ
প্র + দান = প্রদান
অ + ন্যায় = অন্যায়
৫. ভাষায় উপসর্গের ভূমিকা
উপসর্গের প্রধান কাজগুলি হলো—
ক. নতুন শব্দ গঠন
প্র + গতি = প্রগতি
খ. অর্থের সম্প্রসারণ
প্র + দান = প্রদান
গ. অর্থের পরিবর্তন
আ + দান = আদান
ঘ. অর্থের পূর্ণতা
সম্ + পূর্ণ = সম্পূর্ণ
ঙ. নেতিবাচক বা বিপরীত অর্থের দ্যোতনা
অ + ন্যায় = অন্যায়
চ. অর্থের তীব্রতা বা বিশেষত্ব প্রকাশ
অতি + ভোজন = অতিভোজন
৬. উপসর্গের শ্রেণিবিভাগ
বাংলা ব্যাকরণে প্রচলিতভাবে উপসর্গকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়—
১. সংস্কৃত উপসর্গ
২. বাংলা উপসর্গ
৩. বিদেশি উপসর্গ
৭. সংস্কৃত উপসর্গ
সংস্কৃত ব্যাকরণে প্রচলিত উপসর্গের সংখ্যা ২০টি। এগুলি হল—
প্র, পরা, অপ, সম্, নি, অব, অনু, নির্/নিঃ, দুর্/দুঃ, বি, অধি, সু, উৎ/উদ্, পরি, প্রতি, অভি, অতি, অপি, উপ, আ।
উদাহরণসহ তালিকা
| উপসর্গ | উদাহরণ |
|---|---|
| প্র | প্রগতি, প্রকাশ, প্রখ্যাত |
| পরা | পরাজয়, পরাক্রম, পরাক্রান্ত |
| অপ | অপকর্ম, অপচয়, অপবাদ |
| সম্ | সমাদর, সংস্কার, সংকলন |
| নি | নিগ্রহ, নিয়োগ, নিবাস |
| অব | অবনতি, অবসর, অবসাদ |
| অনু | অনুতাপ, অনুগত, অনুমান |
| নিঃ/নির্ | নির্দেশ, নির্গমন, নির্দয় |
| দুর্/দুঃ | দুর্গম, দুর্বল, দুর্লভ |
| বি | বিজয়, বিজ্ঞান, বিবাদ |
| অধি | অধিকার, অধীন, অধিগ্রহণ |
| সু | সুকৃতি, সুগম, সুলভ |
| উৎ/উদ্ | উন্নতি, উৎকণ্ঠা, উদ্ধার |
| পরি | পরিপূর্ণ, পরিচয়, পরিশ্রম |
| প্রতি | প্রতিবাদ, প্রতিধ্বনি, প্রতিকার |
| অভি | অভিজ্ঞ, অভিযান, অভিজাত |
| অতি | অত্যাচার, অতিভোজন, অতিরিক্ত |
| অপি | অপিনিহিতি, অপিধান |
| উপ | উপকার, উপভোগ, উপহার |
| আ | আকাঙ্ক্ষা, আবেগ, আবাস |
বিশেষ দ্রষ্টব্য : সংস্কৃত উপসর্গের মূল রূপ ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সময় ধ্বনিগত পরিবর্তন ঘটতে পারে। যেমন—সম্ + কর = সংস্কার, উদ্ + হার = উদ্ধার, অতি + আচার = অত্যাচার। তাই উপসর্গের রূপ ও ব্যবহৃত শব্দের রূপ সবসময় হুবহু এক থাকে না।
৮. বাংলা উপসর্গ
বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দগঠনের ধারায় ব্যবহৃত উপসর্গগুলি বাংলা উপসর্গ নামে পরিচিত।
প্রচলিত কয়েকটি বাংলা উপসর্গ—
অ, আ, অনা, কু, সু, না, নি, বি, পাতি, হা, ভর, রাম প্রভৃতি।
উদাহরণ
- অ + চেনা = অচেনা
- অ + জানা = অজানা
- আ + কাল = আকাল
- অনা + বৃষ্টি = অনাবৃষ্টি
- কু + দৃষ্টি = কুদৃষ্টি
- সু + জন = সুজন
- না + রাজ = নারাজ
- নি + খরচা = নিখরচা
- পাতি + হাঁস = পাতিহাঁস
- ভর + পেট = ভরপেট
- রাম + দা = রামদা
৯. বিদেশি উপসর্গ
বাংলা ভাষায় আরবি, ফারসি, হিন্দি, ইংরেজি প্রভৃতি বিদেশি উৎস থেকে বহু উপসর্গধর্মী শব্দাংশ এসেছে।
যেমন—
- বদ — বদনাম, বদমেজাজ, বদহজম
- বে — বেদখল, বেসুরো, বেকায়দা
- হর — হরদিন, হররোজ
- নিম — নিমরাজি
- খাস — খাসমহল, খাসকামরা
- হেড — হেডমাস্টার, হেডক্লার্ক
- ফুল — ফুলহাতা, ফুলবাবু
- হাফ — হাফহাতা, হাফপ্যান্ট
- আম — আমজনতা, আমদরবার
- গর — গরহাজির, গরমিল
- ফি — ফিবছর, ফিহপ্তা
সতর্কতা : আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই সমস্ত উপাদানকে সবসময় সংস্কৃত ব্যাকরণের ‘উপসর্গ’-এর সঙ্গে একেবারে অভিন্ন বলে ধরা যায় না। স্কুল-কলেজের বাংলা ব্যাকরণে প্রচলিত শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এগুলিকে বিদেশি উপসর্গ বা উপসর্গজাতীয় শব্দাংশ হিসেবে পড়ানো হয়।
দ্বিতীয় অধ্যায় : বিভক্তি
১০. ‘বিভক্তি’ কথাটির সাধারণ অর্থ কী?
‘বিভক্তি’ শব্দের সাধারণ অর্থ বিভাজন, ভাগ বা পৃথকীকরণ।
ব্যাকরণে বিভক্তি বলতে সেই বর্ণ বা বর্ণসমষ্টিকে বোঝায়, যা শব্দ বা ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাক্যে তার ব্যাকরণগত ভূমিকা প্রকাশে সাহায্য করে।
১১. বিভক্তি কোন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়?
বাংলা ব্যাকরণে পদগঠন ও ক্রিয়াগঠন—এই দুই প্রসঙ্গে ‘বিভক্তি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
বিশেষ্য, সর্বনাম বা অন্যান্য নামপদের সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত হয়ে কারক, সম্বন্ধ ইত্যাদি প্রকাশে সাহায্য করে।
আবার ধাতুর সঙ্গে ক্রিয়াবিভক্তি যুক্ত হয়ে ক্রিয়াপদ গঠিত হয় এবং কাল, পুরুষ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়।
উদাহরণ
সে ভাত খায়।
এখানে ‘ভাত’ কর্মকারক; শূন্য বিভক্তির মাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়েছে।
ভাতে মাছি বসেছে।
এখানে ‘ভাত + এ = ভাতে’; ‘এ’ অধিকরণ-সম্পর্ক প্রকাশ করছে।
১২. বিভক্তি কাকে বলে?
যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি শব্দ বা ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পদ বা ক্রিয়াপদ গঠন করে এবং বাক্যে তার ব্যাকরণগত সম্পর্ক, ভূমিকা, কাল বা পুরুষ নির্দেশে সাহায্য করে, তাকে বিভক্তি বলে।
১৩. বিভক্তি কত প্রকার?
প্রধানত দুই প্রকার—
১. শব্দবিভক্তি
শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়।
২. ধাতুবিভক্তি বা ক্রিয়াবিভক্তি
ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্রিয়াপদ গঠনে সাহায্য করে।
১৪. শব্দবিভক্তি
যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাকে বাক্যে ব্যবহারের উপযোগী পদে পরিণত করে এবং কারক, সম্বন্ধ, বচন ইত্যাদি প্রকাশে সাহায্য করে, তাকে শব্দবিভক্তি বলে।
উদাহরণ
শ্যামলের মা শ্যামলকে একটি কলম দিলেন।
এখানে—
- শ্যামল + এর = শ্যামলের
- শ্যামল + কে = শ্যামলকে
‘এর’ ও ‘কে’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের বাক্যে বিশেষ সম্পর্ক প্রকাশ করেছে।
প্রচলিত শব্দবিভক্তি
কে, রে, র, এ, তে, য়/এ-জাতীয় রূপ এবং শূন্য বিভক্তি।
১৫. শূন্য বিভক্তি
কোনো দৃশ্যমান বিভক্তিচিহ্ন না থাকলেও যদি কোনো শব্দ বাক্যে নির্দিষ্ট কারকগত ভূমিকা গ্রহণ করে, তাকে শূন্য বিভক্তি বলা হয়।
উদাহরণ
রাম ভাত খায়।
এখানে ‘ভাত’ কর্মকারক। কিন্তু তার সঙ্গে কোনো দৃশ্যমান বিভক্তি নেই।
তাই—
ভাত + Ø = ভাত
এখানে Ø = শূন্য বিভক্তি।
ফর্মুলা :
দৃশ্যমান বিভক্তি নেই + তবু কারকগত ভূমিকা আছে = শূন্য বিভক্তি
১৬. ক্রিয়াবিভক্তি বা ধাতুবিভক্তি
যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি ধাতু বা ক্রিয়ামূলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্রিয়াপদ গঠন করে এবং কাল, পুরুষ ইত্যাদি প্রকাশে সাহায্য করে, তাকে ক্রিয়াবিভক্তি বা ধাতুবিভক্তি বলে।
উদাহরণ
তিনি প্রতিদিন গীতাঞ্জলি পড়েন।
‘পড়েন’ বিশ্লেষণ করলে—
পড়্ + এন = পড়েন
এখানে ‘পড়্’ ধাতু এবং ‘এন’ ক্রিয়াবিভক্তি।
আরও উদাহরণ—
- কর + ইল = করিল
- কর + লাম = করলাম
- কর + ই = করি
- কর + অ = কর
- কর + ও = করো
সতর্কতা : আধুনিক বাংলা ক্রিয়াপদের রূপবিশ্লেষণে ‘ক্রিয়াবিভক্তি’, ‘কালচিহ্ন’, ‘পুরুষচিহ্ন’ ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাকরণে ভিন্ন বিশ্লেষণ দেখা যায়। বিদ্যালয়-স্তরের প্রচলিত বিশ্লেষণে ‘পড়েন’-এর ‘এন’-কে ক্রিয়াবিভক্তি বলা হয়।
১৭. মৌলিক বিভক্তি
যে বিভক্তি অন্য কোনো বিভক্তির রূপান্তরিত রূপ নয়, তাকে মৌলিক বিভক্তি বলে।
প্রচলিত বাংলা ব্যাকরণে মৌলিক শব্দবিভক্তি হিসেবে সাধারণত—
কে, রে, র, এ, তে
—এই রূপগুলিকে ধরা হয়।
এর পাশাপাশি শূন্য বিভক্তি-রও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
১৮. সাধিত বিভক্তি
মৌলিক বিভক্তির সঙ্গে অন্য উপাদান যুক্ত হয়ে যে বিভক্তিরূপ গঠিত হয়, তাকে সাধিত বিভক্তি বলা হয়।
যেমন—
- কে → একে
- রে → এরে
- র → এর
- র → দের
- এ → য়ে/য়
- তে → এতে
তবে আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে সব ‘সাধিত বিভক্তি’-কে একই পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হয় না। বিদ্যালয়-স্তরের প্রচলিত রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী উপরোক্ত উদাহরণগুলি গ্রহণযোগ্য।
১৯. তির্যক বিভক্তি
সংস্কৃত ভাষায় বিভিন্ন কারকের জন্য নির্দিষ্ট বিভক্তি থাকলেও বাংলায় একটি বিভক্তি একাধিক কারকে ব্যবহৃত হতে পারে।
যে বিভক্তি একাধিক কারকে ব্যবহৃত হয় এবং একটি নির্দিষ্ট কারকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তাকে তির্যক বিভক্তি বলা হয়।
উদাহরণ
এ বিভক্তি—
- ঘরে বসে আছি। → অধিকরণ
- ছেলেতে ছেলেতে ঝগড়া। → করণ/পারস্পরিক সম্পর্কের বিশেষ প্রয়োগ
- হাতে কলম আছে। → অধিকরণ/অঙ্গ-সম্পর্ক
অতএব ‘এ’ কেবল একটি কারকের জন্য নির্দিষ্ট নয়।
মনে রাখো
এক বিভক্তি → একাধিক কারক = তির্যক বিভক্তি
প্রচলিত উদাহরণ হিসেবে কে, এ, তে ইত্যাদিকেও তির্যক ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখানো হয়।
২০. যথার্থ বিভক্তি
যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি শব্দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে তাকে বাক্যে ব্যবহারের উপযোগী করে এবং কারক বা সম্বন্ধ প্রকাশে সাহায্য করে, তাকে যথার্থ বিভক্তি বলা হয়।
উদাহরণ
ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে।
এখানে—
ঘর + এ/তে → ঘরেতে
‘তে’ শব্দটির সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত হয়ে পদটির ব্যাকরণগত সম্পর্ক প্রকাশ করেছে।
যথার্থ বিভক্তির উদাহরণ
কে, রে, র, এ, তে প্রভৃতি।
২১. বিভক্তি স্থানীয় পদ
বাংলায় সব কারকের জন্য পৃথক বিভক্তি নেই। তাই অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে এমন কিছু অব্যয় বা অনুসর্গ বসে, যা বিভক্তির মতো কারক-সম্পর্ক প্রকাশ করে।
এই ধরনের পদকে প্রচলিত ব্যাকরণে বিভক্তি স্থানীয় পদ বলা হয়।
উদাহরণ
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু।
এখানে ‘লাগিয়া’ শব্দটি ‘সুখের’ সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে উদ্দেশ্য/নিমিত্তের অর্থ প্রকাশ করছে।
তাই ‘লাগিয়া’ বিভক্তির মতো কাজ করলেও এটি নিজে একটি পৃথক পদ—এই কারণেই এটি বিভক্তি স্থানীয় পদ।
আরও উদাহরণ
- তার জন্য অপেক্ষা করছি।
- তোমার কাছে যাব।
- বন্ধুর সঙ্গে কথা বললাম।
- আমার দ্বারা কাজটি হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায় : অনুসর্গ
২২. অনুসর্গ কাকে বলে?
যে সকল অব্যয় বিশেষ্য, সর্বনাম বা নামপদের পরে পৃথকভাবে বসে সেই পদের সঙ্গে বাক্যের অন্য পদের সম্পর্ক, বিশেষত কারক-সম্পর্ক, প্রকাশ করে, তাদের অনুসর্গ বা পরসর্গ বলে।
উদাহরণ
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়।
এখানে ‘ভিতর’ শব্দটি ‘খাঁচা’-র সঙ্গে ‘আসে যায়’ ক্রিয়ার সম্পর্ক স্থাপন করেছে।
অতএব ভিতর = অনুসর্গ।
আরও উদাহরণ—
- তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
- তার কাছে যাও।
- বন্ধুর সঙ্গে কথা বলো।
- পরিশ্রমের বিনা সাফল্য নেই।
২৩. অনুসর্গের প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. অনুসর্গ সাধারণত নামপদের পরে বসে।
২. অনুসর্গ পৃথক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৩. অনুসর্গের নিজস্ব অভিধানগত অর্থ থাকে।
৪. অনুসর্গ নিজে একটি অব্যয় পদ।
৫. এটি কারক বা সম্পর্ক প্রকাশে বিভক্তির মতো কাজ করতে পারে।
৬. অনুসর্গ সাধারণত ধাতুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয় না।
৭. অধিকাংশ অনুসর্গ পদের পরে বসে।
৮. কিছু অনুসর্গ পদের আগে বসতেও পারে।
৯. অনুসর্গ বাক্যে স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
১০. অনুসর্গের সাহায্যে কারক-সম্পর্ক অনেক সময় বিভক্তির তুলনায় স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়।
উদাহরণ
বিনা মেঘে বজ্রপাত।
এখানে ‘বিনা’ পদের আগে বসেছে।
অতএব—
অনুসর্গ সাধারণত পরে বসে, কিন্তু সর্বদা পরে বসতেই হবে—এমন নয়।
২৪. অনুসর্গের শ্রেণিবিভাগ
প্রচলিত বাংলা ব্যাকরণে অনুসর্গকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—
ক. শব্দজাত অনুসর্গ
যে অনুসর্গ মূলত স্বাধীন শব্দ থেকে অনুসর্গের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
যেমন—
প্রতি, জন্য, অপেক্ষা, নিমিত্ত, মধ্যে, বিনা, কাছে, সঙ্গে, সহ, উপর, নিচে, ভিতর ইত্যাদি।
খ. ক্রিয়াজাত অনুসর্গ
ক্রিয়া বা অসমাপিকা ক্রিয়ার রূপ থেকে অনুসর্গজাত ব্যবহার তৈরি হয়েছে।
যেমন—
করে, করিয়া, লাগিয়া, ধরে, বলে, বলিয়া, হতে ইত্যাদি।
গ. বিদেশি অনুসর্গ
যেমন—
বরাবর, বদলে, বাদে, দরুন ইত্যাদি।
২৫. অনুসর্গকে ‘কর্মপ্রবচনীয়’ বলা হয় কেন?
এখানে একটি ঐতিহাসিক ব্যাকরণীয় বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন।
পাণিনীয় সংস্কৃত ব্যাকরণে কর্মপ্রবচনীয় একটি বিশেষ ব্যাকরণীয় শ্রেণি। আধুনিক বাংলা ব্যাকরণে প্রচলিত অনুসর্গগুলির সঙ্গে তাকে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক নয়।
তবে ঐতিহাসিকভাবে সংস্কৃতের কর্মপ্রবচনীয় অব্যয় এবং বাংলার সম্পর্কসূচক অনুসর্গের মধ্যে কার্যগত সাদৃশ্য রয়েছে। বিশেষত কিছু ক্রিয়াজাত অনুসর্গ পূর্ববর্তী নামপদের সঙ্গে ক্রিয়াপদের সম্পর্ক প্রকাশ করে।
তাই বিদ্যালয়-স্তরের ব্যাখ্যায় অনুসর্গকে কখনও কর্মপ্রবচনীয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
কিন্তু পরীক্ষায় নিরাপদ বক্তব্য হলো :
অনুসর্গ ও পাণিনীয় কর্মপ্রবচনীয় অভিন্ন ব্যাকরণীয় শ্রেণি নয়; তাদের মধ্যে কার্যগত সাদৃশ্য আছে।
২৬. অনুসর্গকে ‘সম্বন্ধীয়’ বলা হয় কেন?
অনুসর্গ নিজে ক্রিয়াপদের অর্থ প্রকাশ করে না; বরং নামপদ ও ক্রিয়াপদ অথবা দুই নামপদের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক স্পষ্ট করে।
যেমন—
রাহুলের সঙ্গে শ্যাম গেল।
এখানে ‘সঙ্গে’ শব্দটি ‘রাহুল’ ও ‘গেল’ ক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্ট করেছে।
তাই অনুসর্গকে সম্বন্ধ-প্রকাশক বা সম্বন্ধীয় বলা যায়।
চতুর্থ অধ্যায় : নির্দেশক
২৭. নির্দেশক কাকে বলে?
যে ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ শব্দ বা পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্টতা ও বচন প্রকাশ করে, তাকে নির্দেশক বলে।
নির্দেশক একটি পরাধীন রূপমূল। অর্থাৎ এটি সাধারণত একা স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে না।
উদাহরণ
ঐ যে লোকটা পার হয়ে যায় কাঁসাই নদীর সাঁকো।
এখানে—
লোক + টা = লোকটা
‘টা’ ‘লোক’ শব্দটিকে নির্দিষ্ট করেছে এবং একবচন অর্থ প্রকাশে সাহায্য করেছে।
অতএব ‘টা’ নির্দেশক।
২৮. নির্দেশকের বৈশিষ্ট্য
১. নির্দেশক স্বাধীন অর্থ প্রকাশ করে না।
২. একা সাধারণত বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে না।
৩. শব্দ বা পদের সঙ্গে যুক্ত হয়।
৪. পদকে নির্দিষ্ট করে।
৫. বচন প্রকাশে সাহায্য করে।
৬. নির্দেশকের পরে বিভক্তি যুক্ত হতে পারে।
৭. নির্দেশক প্রত্যয়ের মতো নতুন শব্দ তৈরি করে না।
৮. নির্দেশক অব্যয় নয়।
৯. কিছু ক্ষেত্রে নির্দেশক ক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
১০. কিছু ক্ষেত্রে নির্দেশক পদের পূর্বেও ব্যবহৃত হতে পারে।
উদাহরণ
কাজ করবে না তো খাবেটা কী?
এখানে ‘টা’ ক্রিয়াজাত রূপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশেষ তাৎপর্য সৃষ্টি করেছে।
আবার—
খান দশেক লুচি খেলাম।
এখানে ‘দশেক’-এর ‘-এক’ সংখ্যার আনুমানিকতা প্রকাশ করছে; এটি নির্দেশকের বিশেষ ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।
২৯. নির্দেশক কত প্রকার?
প্রচলিত বাংলা ব্যাকরণে নির্দেশক প্রধানত দুই প্রকার—
১. পদাশ্রিত নির্দেশক
পদের সঙ্গে যুক্ত হয়।
যেমন—
টা, টি, খানা, খানি, জন, জনা, গুলি, গুলো প্রভৃতি।
২. শব্দাশ্রিত নির্দেশক
শব্দ বা সংখ্যাবাচক/পরিমাণবাচক উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্টতা, সংখ্যা বা আনুমানিকতা প্রকাশ করে।
যেমন—
দশেক, পাঁচটি, দুজন প্রভৃতি ব্যবহারে নির্দেশক-জাত রূপ দেখা যায়।
পরীক্ষার জন্য মনে রাখবে : ‘টা’, ‘টি’, ‘খানা’, ‘খানি’, ‘জন’, ‘গুলি’, ‘গুলো’—এসব নির্দেশকের সবচেয়ে নিরাপদ ও প্রচলিত উদাহরণ।
৩০. নির্দেশক ও বিভক্তির পার্থক্য
| বিভক্তি | নির্দেশক |
|---|---|
| কারক/সম্বন্ধ প্রকাশে সাহায্য করে | নির্দিষ্টতা ও বচন প্রকাশ করে |
| শব্দ ও ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে | প্রধানত শব্দ/পদের সঙ্গে যুক্ত হয় |
| পদ বা ক্রিয়াপদ গঠনে ভূমিকা রাখে | পদকে নির্দিষ্ট করে |
| অনুসর্গ দ্বারা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপিত হতে পারে | একইভাবে অনুসর্গ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় না |
| বিভক্তির নিজস্ব স্বাধীন অর্থ নেই | নির্দেশকেরও স্বাধীন অর্থ নেই |
| নির্দেশকের পরে বিভক্তি যুক্ত হতে পারে | বিভক্তির পরে নির্দেশক সাধারণত যুক্ত হয় না |
| ‘কে’, ‘র’, ‘এ’, ‘তে’ ইত্যাদি | ‘টা’, ‘টি’, ‘গুলি’, ‘গুলো’ ইত্যাদি |
উদাহরণ
ছেলেটিকে ডাকো।
বিশ্লেষণ—
ছেলে + টি + কে
- ‘টি’ = নির্দেশক
- ‘কে’ = বিভক্তি
এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
ফর্মুলা :
ছেলে + টি + কে = ছেলেটিকে
নির্দেশক আগে, বিভক্তি পরে।
৩১. অনুসর্গ ও নির্দেশকের পার্থক্য
| অনুসর্গ | নির্দেশক |
|---|---|
| স্বাধীন শব্দ | পরাধীন রূপমূল |
| নিজস্ব অর্থ আছে | নিজস্ব স্বাধীন অর্থ নেই |
| পৃথকভাবে ব্যবহৃত হয় | একা সাধারণত ব্যবহৃত হয় না |
| অব্যয় পদ | অব্যয় নয় |
| পদের পরে বসে | শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয় |
| কারক/সম্পর্ক প্রকাশ করে | নির্দিষ্টতা/বচন প্রকাশ করে |
| ‘জন্য’, ‘সঙ্গে’, ‘কাছে’, ‘মধ্যে’ | ‘টা’, ‘টি’, ‘গুলি’, ‘গুলো’ |
উদাহরণ
ছেলেটির সঙ্গে কথা বললাম।
- ‘টি’ → নির্দেশক
- ‘র’ → বিভক্তি
- ‘সঙ্গে’ → অনুসর্গ
পঞ্চম অধ্যায় : উপসর্গ, অনুসর্গ ও বিভক্তির তুলনা
৩২. উপসর্গ ও অনুসর্গের পার্থক্য
১. উপসর্গ পূর্বে বসে; অনুসর্গ পরে বসে।
২. উপসর্গ মূল শব্দের অর্থে পরিবর্তন ঘটায়; অনুসর্গ মূল শব্দের অর্থ পরিবর্তন না করে তার সঙ্গে অন্য পদের সম্পর্ক প্রকাশ করে।
৩. উপসর্গ সাধারণত স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হয় না; অনুসর্গ স্বাধীন পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৪. উপসর্গ নতুন শব্দ গঠনে সাহায্য করে; অনুসর্গ সাধারণত নতুন শব্দ গঠন করে না।
৫. উপসর্গ শব্দ বা ধাতুর আগে যুক্ত হয়; অনুসর্গ সাধারণত বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে বসে।
৬. উপসর্গ শব্দগঠনের উপাদান; অনুসর্গ বাক্যগত সম্পর্ক প্রকাশের উপাদান।
উদাহরণ
প্র + কার = প্রকার
এখানে ‘প্র’ উপসর্গ।
রামের জন্য বইটি কিনলাম।
এখানে ‘জন্য’ অনুসর্গ।
৩৩. বিভক্তি ও অনুসর্গের পার্থক্য
১. বিভক্তি পদের সঙ্গে যুক্ত থাকে; অনুসর্গ পৃথকভাবে পরে বসে।
২. বিভক্তির স্বাধীন অর্থ নেই; অনুসর্গের নিজস্ব অর্থ আছে।
৩. বিভক্তি নিজে কোনো পৃথক পদ নয়; অনুসর্গ নিজে অব্যয় পদ।
৪. বিভক্তি শব্দ ও ধাতু—উভয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে; অনুসর্গ প্রধানত নামপদের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়।
৫. বিভক্তি পদগঠন ও কারক-সম্বন্ধ প্রকাশে সাহায্য করে; অনুসর্গ প্রধানত সম্পর্ক প্রকাশ করে।
৬. বিভক্তি শব্দের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকে; অনুসর্গকে আলাদা করে লেখা যায়।
উদাহরণ
ছেলেকে → ‘কে’ বিভক্তি
ছেলের জন্য → ‘জন্য’ অনুসর্গ
৩৪. বিভক্তি ও নির্দেশকের পার্থক্য
১. বিভক্তি কারক/সম্বন্ধ প্রকাশে সাহায্য করে; নির্দেশক নির্দিষ্টতা ও বচন প্রকাশ করে।
২. নির্দেশকের পরে বিভক্তি যুক্ত হতে পারে।
ছেলে + টি + কে = ছেলেটিকে
৩. বিভক্তি ধাতুর সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে; নির্দেশক সাধারণত ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয় না।
৪. বিভক্তি পদ বা ক্রিয়াপদ গঠনে ভূমিকা রাখে; নির্দেশক শব্দকে নির্দিষ্ট করে।
৫. নির্দেশক যুক্ত হওয়ার পরেও বিভক্তি প্রয়োজন হতে পারে।
বই + টি + র = বইটির
এখানে ‘টি’ নির্দেশক এবং ‘র’ বিভক্তি।
৩৫. উপসর্গ ও বিভক্তির পার্থক্য
১. উপসর্গ শব্দ/ধাতুর আগে বসে; বিভক্তি শব্দ/ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়।
২. উপসর্গ অর্থের পরিবর্তন ঘটায়; বিভক্তি প্রধানত ব্যাকরণগত সম্পর্ক প্রকাশ করে।
৩. উপসর্গ নতুন শব্দ গঠনে সাহায্য করে; বিভক্তি পদ বা ক্রিয়াপদ গঠনে সাহায্য করে।
৪. উপসর্গ শব্দার্থের দ্যোতক; বিভক্তি ব্যাকরণগত সম্পর্কের নির্দেশক।
উদাহরণ
প্র + হার = প্রহার
‘প্র’ = উপসর্গ
ছেলে + কে = ছেলেকে
‘কে’ = বিভক্তি
ষষ্ঠ অধ্যায় : একটি বাক্যে চারটির পরিচয়
৩৬. একই বাক্যে উপসর্গ, বিভক্তি, অনুসর্গ ও নির্দেশক
অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে ছেলেগুলোকে প্রতিবাদ করতে হবে।
এখানে—
- অন্যায় → ‘অ’ উপসর্গ
- কারীদের → ‘দের’ বিভক্তি-জাত রূপ
- ছেলেগুলোকে → ‘গুলো’ নির্দেশক + ‘কে’ বিভক্তি
- বিরুদ্ধে → ‘বিরুদ্ধে’ সম্পর্কসূচক অনুসর্গজাত পদ
- প্রতিবাদ → ‘প্রতি’ উপসর্গ
এভাবে একটি বাক্যেই চারটি ব্যাকরণীয় উপাদানের কার্যকারিতা বোঝা যায়।
৩৭. ‘ছেলেটিকে’ বিশ্লেষণ
ছেলেটিকে = ছেলে + টি + কে
এখানে—
- ছেলে = মূল শব্দ
- টি = নির্দেশক
- কে = বিভক্তি
অতএব—
নির্দেশক + বিভক্তি পাশাপাশি থাকতে পারে।
৩৮. ‘ছেলেদের জন্য’ বিশ্লেষণ
ছেলেদের জন্য
- ছেলে = মূল শব্দ
- দের = বিভক্তি/সাধিত বিভক্তিরূপ
- জন্য = অনুসর্গ
অতএব—
বিভক্তি + অনুসর্গ পাশাপাশি থাকতে পারে।
৩৯. ‘প্রতিবাদ’ বিশ্লেষণ
প্রতি + বাদ = প্রতিবাদ
এখানে—
- প্রতি = উপসর্গ
- বাদ = মূল শব্দ
উপসর্গ মূল শব্দের আগে বসে নতুন অর্থবোধক শব্দ গঠন করেছে।
সপ্তম অধ্যায় : পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ধারণা
৪০. উপসর্গের অর্থবাচকতা বনাম অর্থদ্যোতকতা
অর্থবাচকতা = নিজের স্বাধীন অর্থ প্রকাশ করার ক্ষমতা।
অর্থদ্যোতকতা = অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশেষ অর্থের ইঙ্গিত বা দ্যোতনা সৃষ্টি করার ক্ষমতা।
উপসর্গের ক্ষেত্রে—
স্বাধীন অর্থবাচকতা নেই; কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে।
৪১. অনুসর্গের স্বাধীনতা
অনুসর্গের নিজস্ব অভিধানগত অর্থ আছে।
যেমন—
- জন্য = উদ্দেশ্য/নিমিত্ত
- সঙ্গে = সহিত
- কাছে = নিকট
- মধ্যে = ভিতরে
- বিনা = ব্যতীত
তাই অনুসর্গ স্বাধীনভাবে পদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
৪২. নির্দেশকের পর বিভক্তি
এটি পরীক্ষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম।
সূত্র
মূল শব্দ + নির্দেশক + বিভক্তি
উদাহরণ
- ছেলে + টি + কে = ছেলেটিকে
- বই + টি + র = বইটির
- মানুষ + জন + কে = মানুষজনকে
- ফুল + গুলি + র = ফুলগুলির
অতএব—
নির্দেশক আগে, বিভক্তি পরে।
৪৩. বিভক্তির পর নির্দেশক বসে না—কেন?
বিভক্তি শব্দের ব্যাকরণগত সম্পর্ক নির্দিষ্ট করে। নির্দেশক তার আগে থাকা মূল শব্দকে নির্দিষ্ট করে।
তাই বাংলা পদগঠনের স্বাভাবিক বিন্যাস—
মূল শব্দ → নির্দেশক → বিভক্তি
যেমন—
বই + টি + কে
‘বইকে’ এবং ‘বইটি’ উভয়ই সম্ভব; কিন্তু যখন নির্দিষ্ট বইকে কর্মকারক হিসেবে বোঝাতে হবে তখন—
বইটিকে
হয়।
৪৪. বিভক্তি স্থানীয় পদ বনাম অনুসর্গ
দুটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও পার্থক্য আছে।
বিভক্তি স্থানীয় পদ—বিভক্তির মতো কারক-সম্পর্ক প্রকাশ করে।
অনুসর্গ—স্বাধীন অব্যয় পদ হিসেবে নামপদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে।
উদাহরণ
তোমার জন্য
এখানে ‘জন্য’ স্বাধীন অব্যয় এবং অনুসর্গ।
ঘরেতে
এখানে ‘তে’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত; এটি বিভক্তি।
৪৫. কারক ও বিভক্তির সম্পর্ক
কারক ও বিভক্তি এক জিনিস নয়।
কারক
বাক্যে বিশেষ্য বা সর্বনামের সঙ্গে ক্রিয়ার যে সম্পর্ক, তাকে কারক বলে।
বিভক্তি
সেই সম্পর্ক প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকরণীয় উপাদান।
অর্থাৎ—
কারক = সম্পর্ক
বিভক্তি = সেই সম্পর্ক প্রকাশের চিহ্ন/উপাদান
বাংলায় একই বিভক্তি একাধিক কারকে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই শুধু বিভক্তি দেখে সবসময় কারক নির্ণয় করা যায় না; বাক্যের অর্থ ও ক্রিয়ার সঙ্গে পদের সম্পর্কও বিচার করতে হয়।
৪৬. বিভক্তি দেখে কারক নির্ণয়ের বিপদ
একটি বিভক্তি একাধিক কারকে ব্যবহৃত হতে পারে।
যেমন ‘এ’—
- ঘরে বসে আছি। → অধিকরণ
- হাতে কলম আছে। → অধিকরণ/অঙ্গ-সম্পর্ক
- ভাতে মাছি বসেছে। → অধিকরণ
তাই—
শুধু বিভক্তি দেখে কারক নির্ণয় নয়; অর্থ ও ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বিচার করতে হবে।
৪৭. সাধারণ ভুল ও সংশোধন
ভুল ১
‘অনুসর্গ শুধু শব্দের পরে বসে।’
সংশোধন
অনুসর্গ সাধারণত পরে বসে, তবে কিছু ক্ষেত্রে পদের পূর্বেও বসতে পারে।
বিনা মেঘে বজ্রপাত।
ভুল ২
‘উপসর্গের কোনো অর্থ নেই।’
সংশোধন
উপসর্গের স্বাধীন অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু মূল শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে অর্থদ্যোতকতা সৃষ্টি করে।
ভুল ৩
‘বিভক্তি মানেই কারক।’
সংশোধন
বিভক্তি ও কারক এক নয়। বিভক্তি কারক-সম্পর্ক প্রকাশের একটি উপাদান।
ভুল ৪
‘নির্দেশক শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে।’
সংশোধন
নির্দেশক মূলত শব্দকে নির্দিষ্ট করে এবং বচন প্রকাশে সাহায্য করে; উপসর্গের মতো মূল শব্দের অভিধানগত অর্থ পরিবর্তন করে না।
ভুল ৫
‘টি বিভক্তি।’
সংশোধন
টি = নির্দেশক।
যেমন—
বইটি
ভুল ৬
‘কে নির্দেশক।’
সংশোধন
কে = বিভক্তি।
যেমন—
বইটিকে = বই + টি + কে
ভুল ৭
‘জন্য বিভক্তি।’
সংশোধন
‘জন্য’ সাধারণত অনুসর্গ।
তোমার জন্য।
৪৮. এক নজরে চারটি
| বিষয় | অবস্থান | প্রধান কাজ | স্বাধীনতা | উদাহরণ |
|---|---|---|---|---|
| উপসর্গ | আগে | অর্থবৈচিত্র্য/শব্দগঠন | স্বাধীন নয় | প্র-, উপ-, অপ- |
| বিভক্তি | শব্দ/ধাতুর সঙ্গে যুক্ত | পদগঠন, কারক/সম্বন্ধ, ক্রিয়াগত সম্পর্ক | স্বাধীন নয় | কে, র, এ, তে |
| অনুসর্গ | সাধারণত পরে | সম্পর্ক/কারক প্রকাশ | স্বাধীন | জন্য, সঙ্গে, কাছে |
| নির্দেশক | শব্দের সঙ্গে যুক্ত | নির্দিষ্টতা ও বচন | স্বাধীন নয় | টি, টা, গুলি |
৪৯. চারটির মূল পার্থক্য—এক লাইনে
উপসর্গ শব্দের আগে গিয়ে অর্থে কাজ করে; বিভক্তি শব্দের সঙ্গে লেগে ব্যাকরণে কাজ করে; অনুসর্গ শব্দের পরে আলাদা বসে সম্পর্কে কাজ করে; নির্দেশক শব্দকে নির্দিষ্ট করে।
৫০. পরীক্ষার জন্য শ্রেষ্ঠ উদাহরণ
‘ছেলেটির সঙ্গে কথা বললাম।’
বিশ্লেষণ:
ছেলে + টি + র + সঙ্গে
- ছেলে = মূল শব্দ
- টি = নির্দেশক
- র = বিভক্তি
- সঙ্গে = অনুসর্গ
এটি একসঙ্গে নির্দেশক + বিভক্তি + অনুসর্গ বোঝানোর সবচেয়ে কার্যকর উদাহরণগুলির একটি।
৫১. উপসর্গ বোঝার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ
প্র + হার = প্রহার
উপ + হার = উপহার
আ + হার = আহার
পরি + হার = পরিহার
বি + হার = বিহার
সং + হার = সংহার
একটি ধাতু/মূলের সঙ্গে বিভিন্ন উপসর্গ যুক্ত হয়ে কীভাবে অর্থবৈচিত্র্য সৃষ্টি করে—এই উদাহরণটি তা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখায়।
৫২. বিভক্তি বোঝার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ
রামকে ডাকো।
রাম + কে
→ ‘কে’ = বিভক্তি
রামের বই।
রাম + এর
→ ‘এর’ = বিভক্তি
ঘরে বসো।
ঘর + এ
→ ‘এ’ = বিভক্তি
৫৩. অনুসর্গ বোঝার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ
রামের সঙ্গে শ্যাম গেল।
‘সঙ্গে’ আলাদা শব্দ, নিজস্ব অর্থ আছে এবং ‘রাম’-এর সঙ্গে ‘গেল’ ক্রিয়ার সম্পর্ক স্থাপন করেছে।
→ ‘সঙ্গে’ = অনুসর্গ।
৫৪. নির্দেশক বোঝার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ
বইটি টেবিলে আছে।
বই + টি
→ ‘টি’ = নির্দেশক।
বইটিকে আনো।
বই + টি + কে
→ ‘টি’ = নির্দেশক
→ ‘কে’ = বিভক্তি
৫৫. স্মরণযোগ্য চূড়ান্ত সূত্র
সূত্র ১ : অবস্থান
আগে = উপসর্গ
গায়ে লেগে = বিভক্তি
পরে আলাদা = অনুসর্গ
গায়ে লেগে নির্দিষ্ট করে = নির্দেশক
সূত্র ২ : কাজ
উপসর্গ → অর্থ বদলায়
বিভক্তি → সম্পর্ক/পদ গড়ে
অনুসর্গ → সম্পর্ক বোঝায়
নির্দেশক → নির্দিষ্ট করে
সূত্র ৩ : স্বাধীনতা
উপসর্গ → স্বাধীন নয়
বিভক্তি → স্বাধীন নয়
অনুসর্গ → স্বাধীন
নির্দেশক → স্বাধীন নয়
সূত্র ৪ : ‘ছেলেটির জন্য’
ছেলে + টি + র + জন্য
এখানে—
টি = নির্দেশক
র = বিভক্তি
জন্য = অনুসর্গ
এই একটি উদাহরণ মনে রাখলে তিনটি বিষয় একসঙ্গে মনে থাকবে।
৫৬. সর্বশ্রেষ্ঠ স্মরণ-ফর্মুলা
“আগে অর্থ, গায়ে সম্পর্ক, পরে সম্বন্ধ, শেষে নির্দিষ্টতা।”
আরও নির্দিষ্ট করে—
উপসর্গ আগে—অর্থে আঘাত।
বিভক্তি গায়ে—ব্যাকরণে সম্পর্ক।
অনুসর্গ পরে—সম্বন্ধ প্রকাশ।
নির্দেশক গায়ে—নির্দিষ্টতা প্রকাশ।
৫৭. ৩০ সেকেন্ডে পুরো অধ্যায়
উপসর্গ → শব্দের/ধাতুর আগে → অর্থ পরিবর্তন/নতুন শব্দ।
বিভক্তি → শব্দ/ধাতুর সঙ্গে যুক্ত → পদ/ক্রিয়াপদ, কারক-সম্বন্ধ, কাল-পুরুষ।
অনুসর্গ → পদের পরে পৃথকভাবে → সম্পর্ক/কারক প্রকাশ।
নির্দেশক → পদের সঙ্গে যুক্ত → নির্দিষ্টতা/বচন।
এক লাইনের উদাহরণ:
প্রতিবাদে ছেলেটির সঙ্গে আমিও ছিলাম।
- প্রতি → উপসর্গ
- এ → বিভক্তি
- টি → নির্দেশক
- র → বিভক্তি
- সঙ্গে → অনুসর্গ
- ও → সংযোজক/অনুসর্গ নয়
৫৮. পরীক্ষার আগে শেষবার যা মনে রাখবে
উপসর্গ
পূর্বে বসে → নতুন অর্থ/অর্থবৈচিত্র্য।
বিভক্তি
লেগে থাকে → পদ/ক্রিয়াপদ ও ব্যাকরণগত সম্পর্ক।
অনুসর্গ
আলাদা বসে → সম্পর্ক প্রকাশ।
নির্দেশক
লেগে থাকে → নির্দিষ্টতা ও বচন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্রম
মূল শব্দ + নির্দেশক + বিভক্তি + অনুসর্গ
উদাহরণ—
ছেলে + টি + র + সঙ্গে
অর্থাৎ—
ছেলেটির সঙ্গে
উপসংহার
উপসর্গ, বিভক্তি, অনুসর্গ ও নির্দেশক—এই চারটি বিষয়কে আলাদা আলাদা সংজ্ঞা হিসেবে মুখস্থ করলে বাংলা ব্যাকরণ কেবল পরীক্ষার বিষয় হয়ে থাকে; কিন্তু তাদের অবস্থান, কাজ, স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝে পড়লে শব্দ থেকে বাক্য পর্যন্ত বাংলা ভাষার গঠনপ্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উপসর্গ ভাষার শব্দভাণ্ডার নির্মাণ করে, বিভক্তি শব্দকে ব্যাকরণগত সম্পর্কে যুক্ত করে, অনুসর্গ সেই সম্পর্ককে অনেক সময় স্বাধীন শব্দের মাধ্যমে স্পষ্ট করে, আর নির্দেশক কোনো পদকে নির্দিষ্ট সত্তায় পরিণত করে।
তাই শেষ সূত্রটি মনে রাখাই যথেষ্ট—
উপসর্গ—আগে, অর্থে পরিবর্তন।
বিভক্তি—লেগে, ব্যাকরণগত সম্পর্ক।
অনুসর্গ—পরে, স্বাধীন সম্বন্ধ।
নির্দেশক—লেগে, নির্দিষ্টতা ও বচন।
এক নজরে মহাসূত্র
উপসর্গ = আগে + অর্থ
বিভক্তি = যুক্ত + সম্পর্ক
অনুসর্গ = পরে + সম্বন্ধ
নির্দেশক = যুক্ত + নির্দিষ্টতা
এই চারটি সূত্র আয়ত্ত করতে পারলে উপসর্গ–অনুসর্গ–বিভক্তি–নির্দে

