বাংলা শব্দভাণ্ডার

ভূমিকা

ভাষার সম্মান নির্ভর করে তার প্রকাশক্ষমতার উপরে। যে ভাষা যত বিচিত্র ভাব ও বস্তু এবং যত গভীর অনুভূতি প্রকাশ করতে সক্ষম সে ভাষা তত উন্নত। ভাষার এই প্রকাশক্ষমতার মূল আধার হলো ভাষার শব্দসম্পদ। এটি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত প্রাচীন শব্দের সাহায্যে, অন্য ভাষা থেকে গৃহীত কৃতঋণ শব্দের সাহায্যে এবং নতুন সৃষ্ট শব্দের সাহায্যে। বাংলা ভাষারও শব্দভাণ্ডার এই তিনটি উপায়ে সমৃদ্ধ হয়েছে।

তিনভাবে সমৃদ্ধ হয় বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে উৎসগত বিচারে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি—

১) মৌলিক বা নিজস্ব
২) আগন্তুক বা কৃতঋণ শব্দ
৩) নবগঠিত শব্দ


১। মৌলিক বা নিজস্ব শব্দ

যেসব শব্দ প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা [বৈদিক ও সংস্কৃত] থেকে উত্তরাধিকার-সূত্রে বাংলায় এসেছে সেগুলোকে মৌলিক শব্দ বলা হয়।

মৌলিক শব্দগুলিকে চার ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যায়। যথা—

ক) তৎসম শব্দ
খ) অর্ধতৎসম শব্দ
গ) তদ্ভব শব্দ
ঘ) দেশি শব্দ


ক) তৎসম শব্দ

যেসব শব্দ সংস্কৃত থেকে অপরিবর্তিতভাবে বাংলায় এসেছে সেগুলোকে তৎসম শব্দ বলা হয়।

তৎ = সংস্কৃত, সম = সমান, অর্থাৎ তৎসম কথাটির অর্থ সংস্কৃতের সমান

যেমন—

জল, বায়ু, কৃষ্ণ, সূর্য, মিত্র, জীবন, মৃত্যু, বৃক্ষ, লতা, নারী, পুরুষ ইত্যাদি।

তৎসম শব্দগুলোকে আবার দুটো ভাগে ভাগ করা যায়—

১। সিদ্ধ তৎসম

যেসব শব্দ বৈদিক ও সংস্কৃত সাহিত্যে পাওয়া যায় এবং যেগুলো ব্যাকরণসিদ্ধ সেগুলো হলো সিদ্ধ তৎসম

যেমন—

সূর্য, মিত্র, নর, লতা ইত্যাদি।

২। অসিদ্ধ তৎসম

যেসব শব্দ বৈদিক বা সংস্কৃত সাহিত্যে পাওয়া যায় না ও সংস্কৃত ব্যাকরণসিদ্ধ নয় অথচ প্রাচীনকালে মৌখিক সংস্কৃতে প্রচলিত ছিল, সেগুলোকে ডঃ সুকুমার সেন অসিদ্ধ তৎসম শব্দ বলেছেন।

যেমন—

কৃষাণ, চাল, ডাল [বৃক্ষশাখা] ইত্যাদি।


খ) অর্ধতৎসম শব্দ

যেসব সংস্কৃত শব্দ বাংলায় এসে বাঙালির উচ্চারণে কিছুটা পরিবর্তন ও বিকৃতি লাভ করেছে, সেগুলোকে অর্ধতৎসম বা ভগ্নতৎসম শব্দ বলা হয়।

যেমন—

কেষ্ট, নিমন্ত্রণ > নেমন্তন্ন, ক্ষুধা > খিদে, রাত্রি > রাত্তির ইত্যাদি।


গ) তদ্ভব শব্দ

যেসব শব্দ সংস্কৃত থেকে সোজাসুজি বাংলায় আসেনি, মধ্যবর্তী পর্বে প্রাকৃতের মাধ্যমে পরিবর্তন লাভ করে বাংলায় এসেছে তাদের তদ্ভব শব্দ বলা হয়।

তৎ = সংস্কৃত, ভব = উৎপন্ন, অর্থাৎ তদ্ভব কথাটির অর্থ সংস্কৃত থেকে উৎপন্ন

যেমন—

সংস্কৃত ইন্দ্রাগার > প্রাকৃত ইন্দাআর > বাংলা ইন্দারা

প্রা. কন্হ > বাং. কানু, কানাই

ধর্ম > ধৰ্ম্ম > ধাম

মৎস > মচ্ছ > মাছ

কার্য > কজ্জ > কাজ


তদ্ভব শব্দের শ্রেণিবিভাগ

তদ্ভব শব্দকে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়—

১। নিজস্ব তদ্ভব
২। কৃতঋণ তদ্ভব

নিজস্ব তদ্ভব শব্দ

যেসব তদ্ভব শব্দ যথার্থই বৈদিক বা সংস্কৃতের নিজস্ব শব্দের পরিবর্তনের ফলে এসেছে সেগুলোকে নিজস্ব তদ্ভব শব্দ বলা হয়।

যেমন—

ইন্দ্রাগার > ইন্দাআর > ইন্দারা

উপাধ্যায় > উজঝাঅ > ওঝা ইত্যাদি।

কৃতঋণ তদ্ভব

যেসব শব্দ প্রথমে সংস্কৃত ভাষায় ইন্দো-ইউরোপীয় বংশের অন্য ভাষা থেকে কৃতঋণ শব্দ হিসাবে এসেছিল এবং পরে প্রাকৃতের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে বাংলায় এসেছে সেসব শব্দকে কৃতঋণ তদ্ভব বা বিদেশী তদ্ভব শব্দ বলা হয়।

যেমন—

গ্রীক দ্রাখমে > সং. দ্রম্য > প্রা. দম্ম > বাং. দাম।


ঘ) দেশি শব্দ

বঙ্গদেশের প্রাচীনতম অধিবাসী কোল, ভিল প্রভৃতি অনার্যজাতির ভাষা থেকে যেসব শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে সেগুলোকে দেশি শব্দ বলে।

যেমন—

কুলো, কুকুর, খোকা, ঘোড়া, চাউল, চিংড়ি, ঝাঁটা, ঝিঙে, ডাগর, ডাব, ডিঙি, ঢোল, তেঁতুল, মুড়ি প্রভৃতি।


২। আগন্তুক বা কৃতঋণ শব্দ

যে সমস্ত শব্দ সংস্কৃতের নিজস্ব উৎস থেকে বা অন্য ভাষা থেকে সংস্কৃত হয়ে আসেনি, অন্য ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে সেই শব্দগুলোকে আগন্তুক বা কৃতঋণ শব্দ বলা হয়।

কৃতঋণ শব্দের অর্থ—যা ধার নেওয়া হয়েছে।

আগন্তুক বা কৃতঋণ শব্দকে দু ভাগে ভাগ করা হয়—

ক) ভারতীয়
খ) বিদেশী


ক) ভারতীয় শব্দ

যেসব শব্দ এদেশেরই অন্য ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে সেই শব্দগুলোকে ভারতীয় বা প্রাদেশিক শব্দ বলে।

যেমন—

হিন্দি থেকে

লগাতার, বাতাবরণ, সেলাম, দোস্ত, ওস্তাদ, মস্তান, ঘেরাও, জাঠা, খানা, কাহিনি প্রভৃতি।

গুজরাতি থেকে

হরতাল, খাদি


খ) বিদেশী শব্দ

যেসব শব্দ এদেশের বাইরের কোনো ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে সেগুলোকে বিদেশী শব্দ বলা হয়।

যেমন—

ইংরেজি থেকে

স্কুল, কলেজ, কেয়ার, টেবিল, ফাইল, টিকিট, কোর্ট, লাট, < lord, সিনেমা, থিয়েটার, হোটেল, কমিটি ইত্যাদি।

জার্মান থেকে

জার, নাৎসী ইত্যাদি।

পোর্তুগীজ থেকে

আনারস, আলপিন, আলকাতরা, আলমারি, পেয়ারা, পাউরুটি, জানালা, বালতি, বোতাম ইত্যাদি।

স্পেনীয়

কমরেড, ডেঙ্গু

ইতালীয়

কোম্পানী, গেজেট ইত্যাদি।

ওলন্দাজ

ইসকাবন, হরতন, রুইতন, তুরুপ ইত্যাদি।

চিনা

চা, চিনি, লুচি, লিচু।

বর্মী

ঘুগনি, লুঙ্গি, ফুঙ্গি।

ফারসী

সরকার, দরবার, বিমা, আমীর, উজীর, ওমরাহ, বাদশা, খেতাব।

আরবী

আক্কেল, কেতাব, ফসল, মুহুরী, হজম, তামাসা, জিলা।


৩। নবগঠিত শব্দ

নতুন করে গড়ে-ওঠা শব্দকে নবগঠিত শব্দ বলে।

এই শ্রেণির শব্দগুলি নীচে আলোচনা করা হলো—


ক) মিশ্র বা সংকর শব্দ

একশ্রেণির শব্দের সঙ্গে অন্য শ্রেণির উপসর্গ প্রত্যয় ইত্যাদির যোগে অথবা বিভিন্ন শ্রেণির শব্দের পারস্পরিক সংযোগে যেসব নতুন শব্দ সৃষ্টি হয় তাকে মিশ্র শব্দ বলে।

যেমন—

হেড [ইং] + পণ্ডিত [বাং] = হেডপণ্ডিত

হেড + মৌলবী [আরবী] = হেডমৌলবী

ফি [ফারসী] + বছর [বাংলা] = ফি-বছর।

পুলিশসাহেব (বি+বি)

বাবুগিরি (বিদেশি প্রত্যয় যুক্ত)

বেআক্কেল (বিদেশি উপসর্গ যুক্ত)


খ) অনূদিত শব্দ

অনুবাদের মাধ্যমে যেসব শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে সেগুলিকে অনূদিত শব্দ বলে।

যেমন—

দূরদর্শন (Television)
শ্বেতপত্র (White paper)
কালোবাজার (Black market)


গ) খণ্ডিত শব্দ

কোনো শব্দের বিশেষ অংশ বাদ দিয়ে উচ্চারণ করলেও যদি অর্থের পরিবর্তন না হয় তবে তাকে খণ্ডিত শব্দ বলে।

যেমন—

প্লেন < এরোপ্লেন

মাইক < মাইক্রোফোন

ফ্রিজ < রেফ্রিজারেটর।


বিভিন্ন ভাষার শব্দ মনে রাখার কৌশল

১। পোর্তুগিজ শব্দ মনে রাখার কৌশল

গির্জার পাদরি পিস্তল নিয়ে গুদামের বড় কামারার আলমারির চাবি খুলে বালতি ভর্তি পাউরুটি, আনারস, আতা, আচার, পেয়ারা, কাবাব এবং কেরাণিকে দিয়ে ইস্পাতের অন্য বাসনে আলকাতরা, আলপিন, ফিতা নিয়ে বেরিয়ে এসে সাবান মার্কা তোয়ালে পেতে বসলেন।

ব্যাখ্যা

গির্জা, কামরা, পাদরি, পিস্তল, গুদাম, আলমারি, চাবি, বালতি, পাউরুটি, আনারস, আতা, আচার, পেয়ারা, কাবাব, কেরানী, ইস্পাত, বাসন, আলকাতরা, আলপিন, ফিতা, সাবান, মার্কা এবং তোয়ালে পর্তুগিজ শব্দ।


২। ফারসি শব্দ মনে রাখার কৌশল

ফারসি এই শব্দটা এসেছে পার্সি থেকে। পার্সি এসেছে পারস্য থেকে। পারস্য হলো ইরানের আদি নাম। অর্থাৎ ফারসি শব্দগুলো ইরানি শব্দ।

ক) আইন সংক্রান্ত সকল শব্দ আরবি কিন্তু ‘আইন’ শব্দটিই ফারসি শব্দ।

যেমন—

আদালত, এজলাস, হাকিম, মুহুরি, ইশতেহার ইত্যাদি আইন বিষয়ক শব্দ তাই এগুলো আরবি শব্দ।

শুধুমাত্র ‘আইন’ নিজেই ফারসি শব্দ।

খ) শব্দের শেষে যদি কর/গর থাকে এবং তা পেশা বোঝায় তাহলে সেই শব্দগুলো ফারসি শব্দ।

যেমন—

কারিগর, জাদুকর, সওদাগর ইত্যাদি।

গ) ছয়টি প্রত্যয়

দায়, বাজ, বন্দি, সই, চি, নবীশ

এই শব্দগুলো যদি শব্দের শেষে থাকে তবে সেই শব্দগুলো ফারসি শব্দ।

যেমন—

দুর্নীতিবাজ, ঝাড়ুদার, চৌকিদার, অংশীদার, চাপাবাজ, ধোকাবাজ, রাজবন্দি, গৃহবন্দি, নজরবন্দি, কারাবন্দি, টেকসই, জুতসই, মানানসই, চলনসই, উদিচী, শিক্ষানবিশ ইত্যাদি।

ঘ) চারটি রং

নীল — তৎসম শব্দ
চকলেট — ম্যাক্সিকাম শব্দ
কালো — দেশি শব্দ
ম্যাজেন্টা — ইতালি শব্দ

বাদে পৃথিবীর সকল রংয়ের শব্দগুলোই ফারসি শব্দ।


৩। ওলন্দাজ শব্দ মনে রাখার কৌশল

ওলন্দাজদের তাস খেলতে টেক্কা তুরুপ হরতন রুইতন ইস্কাপন লাগে।

ব্যাখ্যা

ইস্কাপন, টেক্কা, তুরুপ, হরতন ও রুইতন।


৪। তুর্কি শব্দ মনে রাখার কৌশল

সুলতান দারোগার বাবা আলখেল্লা পরে বেগম রহিমা খাতুন ও চাকরকে সাথে নিয়ে শিকারে গেলেন। তার বন্দুকের গুলিতে চাকুওয়ালা বাবুর্চি এবং কুলির লাশ পড়লে সাজা ভোগ শেষে মুচলেকা দিয়ে জনগনের বারুদ নেভালেন।

ব্যাখ্যা

বাবা, দারোগা, কুলি, লাশ, চাকু, বাবুর্চি, সুলতান, বন্দুক, বারুদ, চাকর, মুচলেকা, খাতুন, বেগম, আলখেল্লা ইত্যাদি তুর্কি শব্দ।


৫। আরবি শব্দ মনে রাখার কৌশল

আদালত ইসলাম উকিলের ইশারায় ইহুদি আসামী গাফিলতি কবুল করে খাজনার খারাপ দলিলের খবর জবাব দিয়ে জামিন পেল। এদিকে দোয়াত কলমের দৌলতে গরিব শৌখিন নবাব জেলা মহকুমার মসজিদে শরবত আদায়ের হিসাব তালিকা দাখিল করল।


৬। জাপানি শব্দ মনে রাখার কৌশল

হাসনাহেনা ক্যারাটে ও জুডো শিখতে রোজ রিকসায় যায়।

ব্যাখ্যা

হাসনাহেনা, ক্যারাটে, জুডো, রিকসা।


৭। চিনা শব্দ মনে রাখার কৌশল

চা, চিনি, লিচু ও লুচি চীনাদের প্রিয় খাবার।

ব্যাখ্যা

চা, চিনি, লিচু ও লুচি চীনা শব্দ।


৮। বর্মী শব্দ মনে রাখার কৌশল

বর্মীরা লুঙ্গি ও ফুঙ্গি পরে ঘুগনি খায়।

ব্যাখ্যা

লুঙ্গি, ফুঙ্গি, ঘুগনি।


বাংলা শব্দভাণ্ডার : একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণাচিত্র

বাংলা শব্দভাণ্ডারের উৎসগত শ্রেণিবিন্যাসকে সংক্ষেপে এভাবে মনে রাখা যায়—

বাংলা শব্দভাণ্ডার

→ মৌলিক বা নিজস্ব শব্দ
 → তৎসম
  → সিদ্ধ তৎসম
  → অসিদ্ধ তৎসম
 → অর্ধতৎসম / ভগ্নতৎসম
 → তদ্ভব
  → নিজস্ব তদ্ভব
  → কৃতঋণ তদ্ভব
 → দেশি

→ আগন্তুক / কৃতঋণ শব্দ
 → ভারতীয় / প্রাদেশিক
 → বিদেশী

→ নবগঠিত শব্দ
 → মিশ্র / সংকর
 → অনূদিত
 → খণ্ডিত


অতিরিক্ত তথ্য ও উন্নততর আলোচনা

১। ‘মৌলিক’, ‘কৃতঋণ’ ও ‘নবগঠিত’—এই তিনটি ধারণা এক জিনিস নয়

বাংলা শব্দভাণ্ডারকে বোঝার ক্ষেত্রে প্রথমেই তিনটি প্রশ্ন আলাদা করে দেখা দরকার—

শব্দটি কোথা থেকে এসেছে?
শব্দটি কীভাবে বাংলায় প্রবেশ করেছে?
শব্দটি বাংলায় এসে কীভাবে গঠিত বা পরিবর্তিত হয়েছে?

এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর এক নয়। কোনো শব্দের উৎস সংস্কৃত হতে পারে, কিন্তু বাংলায় তার রূপ পরিবর্তিত হতে পারে। আবার কোনো শব্দ সরাসরি বিদেশি ভাষা থেকে আসতে পারে। আবার একাধিক ভাষার উপাদান মিলিয়েও নতুন শব্দ তৈরি হতে পারে।

তাই বাংলা শব্দভাণ্ডার আসলে একটি ভাষাগত সংমিশ্রণের ইতিহাস


২। তৎসম ও তদ্ভবের মূল পার্থক্য

তৎসম শব্দ সংস্কৃত থেকে বাংলায় মূলত অপরিবর্তিত রূপে এসেছে।

অন্যদিকে তদ্ভব শব্দ সংস্কৃত বা প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার শব্দ থেকে প্রাকৃত, অপভ্রংশ/অবহট্ট প্রভৃতি মধ্যবর্তী স্তর অতিক্রম করে ধ্বনিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলায় এসেছে।

উদাহরণ—

সংস্কৃত — হস্ত → প্রাকৃত — হত্থ → বাংলা — হাত

সংস্কৃত — কর্ণ → প্রাকৃত — কণ্ণ → বাংলা — কান

সংস্কৃত — মৎস্য → প্রাকৃত — মচ্ছ → বাংলা — মাছ

এখানে শব্দের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষার নিজস্ব ধ্বনিগত স্বভাবও প্রকাশ পেয়েছে।


৩। অর্ধতৎসম কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অর্ধতৎসম শব্দ বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী স্তরকে চিহ্নিত করে। সংস্কৃত শব্দ বাংলায় প্রবেশ করার পরে সাধারণ কথ্য উচ্চারণের প্রভাবে তার রূপ সামান্য বদলে গেলে তা অর্ধতৎসম হয়ে ওঠে।

যেমন—

নিমন্ত্রণ → নেমন্তন্ন

রাত্রি → রাত্তির

ক্ষুধা → খিদে

এখানে শব্দের মূল উৎস সংস্কৃত, কিন্তু বাংলা উচ্চারণ তাকে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখেনি।


৪। দেশি শব্দ বাংলা ভাষার মাটির সঙ্গে যুক্ত

দেশি শব্দের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রাক্-আর্য বা অনার্য ভাষাগত স্তরের বহু স্মৃতি নিহিত আছে। বিশেষত কৃষি, খাদ্য, গৃহস্থালি, প্রকৃতি, লোকজ জীবন ও দৈনন্দিন ব্যবহারের বহু শব্দে এই দেশজ ঐতিহ্যের পরিচয় পাওয়া যায়।

এই কারণে বাংলা শব্দভাণ্ডারকে কেবল সংস্কৃতজাত শব্দের ভাণ্ডার হিসেবে দেখলে বাংলা ভাষার প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় না।

বাংলার শব্দভাণ্ডার গড়ে উঠেছে—

আর্য + অনার্য + প্রাদেশিক + বিদেশি + আধুনিক সৃষ্টিশীলতার সম্মিলনে।


৫। কৃতঋণ শব্দ বাংলা ভাষার দুর্বলতা নয়

অন্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করা কোনো ভাষার দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং একটি জীবন্ত ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার গ্রহণক্ষমতা

বাংলায়—

আরবি ও ফারসি এসেছে প্রধানত প্রশাসন, আইন, রাজনীতি, ধর্ম, বাণিজ্য ও সামাজিক জীবনের নানা পরিসর দিয়ে।

পর্তুগিজ এসেছে উপনিবেশিক যোগাযোগ, খাদ্য, গৃহস্থালি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত নানা প্রসঙ্গে।

ইংরেজি এসেছে আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, আইন, শিল্প, ক্রীড়া ও নগরজীবনের মধ্য দিয়ে।

ফলে শব্দভাণ্ডার আসলে একটি জাতির যোগাযোগের ইতিহাসের ভাষাগত দলিল


৬। বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দের বিশেষ প্রভাব

আধুনিক যুগে ইংরেজি বাংলা শব্দভাণ্ডারে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে—

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, ব্যবসা, পরিবহণ, খেলাধুলা ও আধুনিক নগরজীবন—এই সমস্ত ক্ষেত্রে ইংরেজি থেকে বহু শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে।

যেমন—

স্কুল, কলেজ, টেবিল, ফাইল, টিকিট, কোর্ট, সিনেমা, থিয়েটার, হোটেল, কমিটি ইত্যাদি।

অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি শব্দ বাংলা ব্যাকরণের নিয়মেও ব্যবহৃত হয়। যেমন—

ফাইলগুলি, টিকিটটা, স্কুলে, কলেজের, মিটিংয়ে ইত্যাদি।

অর্থাৎ বিদেশি শব্দ বাংলায় এসে শুধু অভিধানে পড়ে থাকে না; প্রয়োজনে বাংলা ভাষার ব্যাকরণগত ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।


৭। মিশ্র বা সংকর শব্দের তাৎপর্য

মিশ্র শব্দ বাংলা ভাষার সৃজনশীলতার একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন উৎসের শব্দ একত্রিত হয়ে একটি নতুন অর্থবাহী একক তৈরি করতে পারে।

যেমন—

হেড + পণ্ডিত = হেডপণ্ডিত

ফি + বছর = ফি-বছর

এখানে শব্দের উৎস আলাদা হলেও বাংলা ব্যবহারের পরিসরে তারা একটি নতুন শব্দগত একক তৈরি করেছে।


৮। অনূদিত শব্দের গুরুত্ব

আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু ধারণাকে বাংলা ভাষায় প্রকাশ করার জন্য অনুবাদ ও পরিভাষা নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন—

Television → দূরদর্শন

White Paper → শ্বেতপত্র

Black Market → কালোবাজার

এই ধরনের শব্দ বাংলা ভাষাকে নতুন ধারণা প্রকাশের সক্ষমতা দেয়।

অতএব, শব্দভাণ্ডারের সমৃদ্ধি শুধু পুরোনো শব্দ সংরক্ষণে নয়; নতুন জ্ঞানকে নিজের ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতার মধ্যেও নিহিত।


৯। খণ্ডিত শব্দ ও আধুনিক কথ্যভাষা

আধুনিক জীবনে দীর্ঘ বিদেশি শব্দকে সংক্ষিপ্ত করে ব্যবহারের প্রবণতা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

যেমন—

এরোপ্লেন → প্লেন

মাইক্রোফোন → মাইক

রেফ্রিজারেটর → ফ্রিজ

এ ধরনের শব্দ ব্যবহারের ফলে ভাষা দ্রুত, সহজ ও কথ্য যোগাযোগের উপযোগী হয়।


পরীক্ষার জন্য একনজরে

প্রশ্ন : বাংলা শব্দভাণ্ডারকে উৎসগত বিচারে কয় ভাগে ভাগ করা যায়?

উত্তর: তিন ভাগে—

১। মৌলিক বা নিজস্ব শব্দ
২। আগন্তুক বা কৃতঋণ শব্দ
৩। নবগঠিত শব্দ।

প্রশ্ন : মৌলিক শব্দ কয় প্রকার?

উত্তর: চার প্রকার—

১। তৎসম
২। অর্ধতৎসম
৩। তদ্ভব
৪। দেশি।

প্রশ্ন : তৎসম শব্দ কাকে বলে?

উত্তর: যেসব শব্দ সংস্কৃত থেকে অপরিবর্তিতভাবে বাংলায় এসেছে সেগুলিকে তৎসম শব্দ বলে।

প্রশ্ন : তদ্ভব শব্দ কাকে বলে?

উত্তর: যেসব শব্দ সংস্কৃত থেকে সোজাসুজি বাংলায় আসেনি, মধ্যবর্তী প্রাকৃত প্রভৃতি স্তরের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে বাংলায় এসেছে, সেগুলিকে তদ্ভব শব্দ বলে।

প্রশ্ন : অর্ধতৎসম শব্দ কাকে বলে?

উত্তর: যেসব সংস্কৃত শব্দ বাংলায় এসে বাঙালির উচ্চারণে কিছুটা পরিবর্তন ও বিকৃতি লাভ করেছে, সেগুলিকে অর্ধতৎসম বা ভগ্নতৎসম শব্দ বলে।

প্রশ্ন : দেশি শব্দ কাকে বলে?

উত্তর: বঙ্গদেশের প্রাচীন অধিবাসীদের অনার্য ভাষা থেকে যেসব শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে, সেগুলিকে দেশি শব্দ বলে।

প্রশ্ন : কৃতঋণ শব্দ কী?

উত্তর: অন্য ভাষা থেকে ধার করে গ্রহণ করা শব্দকে কৃতঋণ শব্দ বলে।

প্রশ্ন : নবগঠিত শব্দ কী?

উত্তর: নতুন করে গড়ে ওঠা শব্দকে নবগঠিত শব্দ বলে।

প্রশ্ন : মিশ্র বা সংকর শব্দ কী?

উত্তর: বিভিন্ন শ্রেণির শব্দ, উপসর্গ বা প্রত্যয়ের পারস্পরিক সংযোগে যে নতুন শব্দ সৃষ্টি হয় তাকে মিশ্র বা সংকর শব্দ বলে।

প্রশ্ন : অনূদিত শব্দ কী?

উত্তর: অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় আগত শব্দকে অনূদিত শব্দ বলে।

প্রশ্ন : খণ্ডিত শব্দ কী?

উত্তর: কোনো শব্দের বিশেষ অংশ বাদ দিয়ে উচ্চারণ করলেও যদি অর্থের পরিবর্তন না হয়, তবে তাকে খণ্ডিত শব্দ বলে।


মনে রাখার মূল সূত্র

বাংলা শব্দভাণ্ডার = উত্তরাধিকার + ধার + সৃষ্টি

অর্থাৎ—

উত্তরাধিকার → মৌলিক / নিজস্ব
ধার → আগন্তুক / কৃতঋণ
সৃষ্টি → নবগঠিত

আর মৌলিক শব্দের ভিতরে—

তৎসম + অর্ধতৎসম + তদ্ভব + দেশি

এই চারটি স্তম্ভ বাংলা শব্দভাণ্ডারের ঐতিহাসিক ভিত্তি।

সুতরাং বাংলা শব্দভাণ্ডার কোনো একক উৎসের ফল নয়; এটি বহু শতাব্দীর ভাষাসংস্পর্শ, ধ্বনিপরিবর্তন, সামাজিক পরিবর্তন, বাণিজ্য, রাজনীতি, ধর্ম, শিক্ষা, উপনিবেশ, বিজ্ঞান ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সম্মিলিত ইতিহাস

### পরিবেশনে- ড. অনিশ রায়
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top