বাঙালির গানের ইতিহাস

— সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

 

ভূমিকা

বাংলার সংস্কৃতির ইতিহাসে গানের স্থান অত্যন্ত গভীর ও বিস্তৃত। বাংলা গান কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; বাঙালির ধর্মবিশ্বাস, প্রেম-বিরহ, লোকজীবন, সামাজিক অভিজ্ঞতা, স্বদেশচেতনা, রাজনৈতিক আন্দোলন, নাগরিক সংকট এবং মানবিক আকাঙ্ক্ষারও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশমাধ্যম।

বাংলা গানের ইতিহাস তাই একক কোনো ধারার ইতিহাস নয়। চর্যাপদের গূঢ় সাধনসংগীত থেকে বৈষ্ণব পদাবলি, কীর্তন, মঙ্গলকাব্যের গান, শাক্তসংগীত, বাউল, ভাটিয়ালি, কবিগান, আখড়াই, টপ্পা, ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, গণসংগীত, আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান এবং শেষ পর্যন্ত ব্যান্ড ও জীবনমুখী গানের মধ্য দিয়ে বাংলা গান ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে।

এই বিবর্তনের প্রতিটি পর্যায়ে পুরোনো সংগীতধারা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি; বরং তার সঙ্গে নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন সুরভাষার সংযোগ ঘটেছে। এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই বাঙালির সংগীত-সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য নির্মিত হয়েছে।


১. সংগীতের আদিম উৎস

সংগীতের আদিম উৎস সম্পর্কে নানা মত রয়েছে। মানুষের স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর, প্রকৃতির ধ্বনি, পশুপাখির ডাক, আনন্দ-বেদনার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ এবং দৈনন্দিন শ্রমের ছন্দ—এসবের মধ্য থেকেই সংগীতের আদিম রূপ বিকশিত হয়েছে বলে মনে করা হয়।

তাল সৃষ্টির আদিমতম উপায়গুলির মধ্যে তালি ও পায়ের আওয়াজ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পরে মানুষ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে।

ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রকে সাধারণভাবে চার ভাগে ভাগ করা হয়—

১. ততবাদ্য — তারের সাহায্যে বাজানো হয়।
২. অবনদ্ধ বা চর্মবাদ্য — চামড়া আবৃত থাকে।
৩. ঘনবাদ্য — আঘাতের ফলে নিজস্ব ধ্বনি উৎপন্ন হয়।
৪. সুষিরবাদ্য — ফুঁ দিয়ে বাজানো হয়।

বাঁশি সুষিরবাদ্যের একটি পরিচিত উদাহরণ।


২. বাংলা গানের প্রাচীনতম নিদর্শন : চর্যাগান

বাংলা গানের ইতিহাসে চর্যাপদ সর্বপ্রাচীন লিখিত সংগীত-নিদর্শন হিসেবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

চর্যাচর্যবিনিশ্চয়-এ ৫১টি চর্যাগানের উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলির রচয়িতা ছিলেন বৌদ্ধ সহজিয়া সাধক বা সিদ্ধাচার্যগণ।

চর্যাগানের বিষয়বস্তু মূলত সাধনতত্ত্ব ও দেহতত্ত্বনির্ভর। কিন্তু সেই গূঢ় তত্ত্ব প্রকাশের জন্য কবিরা ব্যবহার করেছেন সাধারণ মানুষের জীবন, প্রকৃতি, নদী, নৌকা, শিকার, কৃষিকাজ, নারী-পুরুষের সম্পর্ক প্রভৃতি পরিচিত উপমা।

চর্যাপদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—পদগুলির সঙ্গে রাগের নির্দেশ পাওয়া যায়। ফলে এগুলি নিছক পাঠযোগ্য কবিতা নয়; গাওয়ার জন্যই রচিত।

এই কারণে বাংলা গানের ইতিহাসের সূচনাবিন্দু হিসেবে চর্যাগানের গুরুত্ব অপরিসীম।


৩. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন

বাংলা গানের ইতিহাসে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হল বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’

রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমকে কেন্দ্র করে রচিত এই কাব্যে প্রেম, বিরহ, মান, অভিসার, মিলন প্রভৃতি মানবিক অনুভূতি সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর মধ্যে গীত, সংলাপ, নাট্যধর্মিতা ও আবেগের সমন্বয় লক্ষ করা যায়। ফলে বাংলা গীতিনাট্যধর্মী ঐতিহ্যের বিকাশে এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।


৪. বৈষ্ণব পদাবলি ও কীর্তন

বাংলা গানের ইতিহাসে বৈষ্ণব পদাবলি একটি যুগান্তকারী অধ্যায়।

রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে মানবিক প্রেমের নানা অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে বৈষ্ণব পদাবলিতে। প্রেম, বিরহ, মান, অভিসার, আকুলতা ও আত্মসমর্পণ—এসব মানবিক অনুভূতি ভক্তির সঙ্গে মিশে এক বিশেষ সংগীতধারা সৃষ্টি করেছে।

এই ধারার পেছনে জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’-এর প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কীর্তন

শ্রীচৈতন্যদেবের সময়ে কীর্তন বাংলার জনজীবনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

কীর্তনের প্রধান দুটি রূপ—

  • নামকীর্তন
  • লীলাকীর্তন

নামকীর্তনে ঈশ্বরের নাম ও মহিমা গাওয়া হয়; লীলাকীর্তনে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ও সংশ্লিষ্ট আখ্যান সংগীতের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়।


৫. মঙ্গলকাব্যের গান

বাংলার লোকধর্ম ও গ্রামীণ সমাজজীবনের সঙ্গে মঙ্গলকাব্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

চণ্ডী, মনসা, ধর্মঠাকুর প্রভৃতি লৌকিক দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যে রচিত মঙ্গলকাব্যের আখ্যানগুলি সাধারণ মানুষের কাছে পাঠ ও গানের মাধ্যমে পৌঁছে যেত।

মঙ্গলকাব্যের গানের সঙ্গে লাচাড়ি ছন্দের সম্পর্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এইভাবে মঙ্গলকাব্য বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা লোকসংগীতেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে ওঠে।


৬. পাঁচালি

পাঁচালি বাংলার প্রাচীন গীতিধারাগুলির অন্যতম।

অষ্টাদশ শতকে আবৃত্তি ও গানের সমন্বয়ে পাঁচালির একটি নতুন রূপ গড়ে ওঠে। পয়ার ও মহাপয়ার ছন্দে পাঁচালি রচিত ও পরিবেশিত হত।

আধুনিক পাঁচালির বিকাশে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন—

  • লক্ষ্মীকান্ত বিশ্বাস
  • গঙ্গানারায়ণ নস্কর
  • দাশরথি রায়
  • ঠাকুরদাস দত্ত
  • বাসিকচন্দ্র রায়
  • ব্রজমোহন রায়
  • আনন্দ শিরোমণি প্রমুখ।

পাঁচালি গানে শাস্ত্রীয় রাগ ও তালের ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্মীকান্ত বিশ্বাসের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

পাঁচালির শ্রেষ্ঠ রচয়িতাদের মধ্যে দাশরথি রায় বিশেষভাবে স্মরণীয়।


৭. লোকসংগীত

বাংলার মাটি, নদী, কৃষিজীবন, শ্রম, প্রেম, বিরহ, উৎসব ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে যে সংগীতের সৃষ্টি, তাকে বৃহত্তর অর্থে লোকসংগীত বলা যায়।

বাংলার উল্লেখযোগ্য লোকসংগীতধারা—

  • বাউল
  • ভাটিয়ালি
  • ভাওয়াইয়া
  • সারিগান
  • জারি
  • ঝুমুর
  • গম্ভীরা
  • পালাগান
  • পাঁচালি প্রভৃতি।

ভাটিয়ালি

নদী ও মাঝির জীবনকে কেন্দ্র করে ভাটিয়ালি গড়ে উঠেছে। নদী, নৌকা, একাকিত্ব, দূরত্ব, প্রেম ও বিরহ এর প্রধান বিষয়।

সারিগান

সমবেত শ্রমের সঙ্গে সারিগানের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত নৌকা বাইবার সময় শ্রমের ছন্দ বজায় রাখতে এই গান গাওয়া হত।

জারি

‘জারি’ শব্দের অর্থ ক্রন্দন। কারবালার শোকাবহ কাহিনি ও মুসলিম সমাজের ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে জারি গানের বিকাশ।

বাউল

বাউলগানে মানবদেহ, মানবপ্রেম, গুরুতত্ত্ব, সহজিয়া সাধনা এবং অন্তর্লোকের অনুসন্ধান প্রধান হয়ে ওঠে।


৮. শাক্ত পদাবলি ও শ্যামাসংগীত

বাংলার ধর্মীয় সংগীতের আর-এক শক্তিশালী ধারা হল শাক্তসংগীত

কালী বা শক্তিকে কেন্দ্র করে রচিত গানের জনপ্রিয় রূপ শ্যামাসংগীত

রামপ্রসাদ সেন

শ্যামাসংগীতের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে রামপ্রসাদ সেন বিশেষভাবে স্মরণীয়।

তাঁর গানে কালী কখনও মা, কখনও বন্ধু, কখনও অভিমানিনী, আবার কখনও জীবনের একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠেন।

তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—

রামপ্রসাদী সুর।

কমলাকান্ত ভট্টাচার্য

পরবর্তী যুগের অন্যতম প্রধান শাক্তগীতিকার কমলাকান্ত ভট্টাচার্য

এ ছাড়াও শাক্তসংগীতের ধারায় উল্লেখযোগ্য—

  • বাল্মীকি মীর্জা
  • দাশরথি রায়
  • মহারাজা শিবচন্দ্র
  • আশুতোষ দেব
  • মহারাজা রামকৃষ্ণ
  • ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল
  • দেওয়ান নরূন্নাথ রায়
  • নরকচন্দ্র
  • গোপেশ্বর
  • অক্ষয়চন্দ্র সরকার
  • অতুলকুমার মিত্র
  • ঈশ্বরচন্দ্র গুহ
  • অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি
  • গিরিশচন্দ্র ঘোষ
  • নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়
  • রাম বসু
  • বুরুচাঁদ পণ্ডিত
  • হরিনাথ মজুমদার প্রমুখ।

৯. কবিগান

অষ্টাদশ শতক থেকে উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত কবিগান বাংলার জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটি প্রধান ধারা।

কবিগানে থাকে—

উক্তি → প্রত্যুক্তি → তাৎক্ষণিক রচনা → তর্ক → ব্যঙ্গ → সংগীত।

দুই কবিয়াল বা দুই দলের মধ্যে সংগীত ও কথার প্রতিযোগিতার কারণে একে ‘কবির লড়াই’-ও বলা হত।

কবিগানের সঙ্গে শান্তিপুরের সম্পর্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

উল্লেখযোগ্য কবিয়াল

  • গৌজলা গুই
  • ভোলা ময়রা
  • হরু ঠাকুর
  • রাম বসু
  • অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি
  • রাসু ও নৃসিংহ
  • নীলু ঠাকুর
  • গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
  • মাধব ময়রা
  • ঈশ্বরচন্দ্র গুহ
  • জননারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়
  • সাতুরায়
  • নীলমণি পাটনী
  • ভীমদাস মালাকার
  • উদয়চাঁদ প্রমুখ।

১০. আখড়াই গান

বাংলা গানের ইতিহাসে আখড়াই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আখড়াইয়ের উৎপত্তি সম্পর্কে দুটি মত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একটি মত অনুসারে, সেনযুগে নৃত্য ও গীতের সহযোগে যে শাস্ত্রীয় সংগীত প্রচলিত ছিল, তার একটি শাখা থেকে আখড়াইয়ের উদ্ভব।

অন্য মত অনুসারে, জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’-এ উল্লিখিত প্রবন্ধম-শৈলীর নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে নাট্যগীতির পথ ধরে আখড়াইয়ের বিকাশ ঘটে।

গৌড় অঞ্চল থেকে শান্তিপুর-কৃষ্ণনগর হয়ে আখড়াই কলকাতায় প্রবেশ করে।

প্রথমদিকে আখড়াই ছিল অপেক্ষাকৃত লোকজ ও আঞ্চলিক প্রকৃতির। পরে রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবু এবং তাঁর আত্মীয় কুলচন্দ্র সেন প্রমুখের উদ্যোগে আখড়াইয়ের সংস্কার ঘটে।

নিধুবাবুর প্রভাবে আখড়াই সংগীতে তানপুরা, বেহালা, সেতার, বাঁশি, জলতরঙ্গ, ঢোল প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার এবং বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর প্রয়োগ বৃদ্ধি পায়।


১১. হাফ-আখড়াই

আখড়াইয়ের পরবর্তী বিবর্তন হল হাফ-আখড়াই

নিধুবাবুর শিষ্য মোহনচাঁদ বসু কবিগানের আদলে আখড়াইয়ে উত্তর-প্রত্যুত্তরের ব্যবস্থা করেন।

এই নতুন রূপই হাফ-আখড়াই নামে পরিচিত হয়।

এখানে উত্তর-প্রত্যুত্তরকে বলা হত—

ধরতা-উতোর।


১২. টপ্পা ও নিধুবাবু

বাংলা গানের ইতিহাসে রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবু-র অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান বাংলা টপ্পার বিকাশ।

‘টপ্পা’ শব্দের অর্থ—

লাফ।

উত্তর ভারতীয় টপ্পার প্রভাব থাকলেও নিধুবাবু বাংলা ভাষার প্রেম ও আবেগকে টপ্পার সুররীতির সঙ্গে যুক্ত করে এক স্বতন্ত্র বাংলা টপ্পা নির্মাণ করেন।

বাংলা টপ্পার বৈশিষ্ট্য—

  • দ্রুত সুরগতি,
  • গিটকিরি,
  • অলংকার,
  • প্রেমভাব,
  • আবেগ,
  • কাব্যমাধুর্য।

১৩. বাংলায় উচ্চাঙ্গ-সংগীতের বিকাশ

উনিশ শতকে বাংলা ভাষায় উচ্চাঙ্গসংগীতচর্চার পরিসর ক্রমশ বিস্তৃত হয়।

রামনিধি গুপ্ত, কালী মির্জা, রঘুনাথ রায়, রামশঙ্কর ভট্টাচার্য প্রমুখ বাংলা ভাষায় ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা প্রভৃতি রাগসংগীতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।


১৪. বাংলা ধ্রুপদ ও রামশঙ্কর ভট্টাচার্য

বাংলা ভাষায় ধ্রুপদ রচনার ইতিহাসে রামশঙ্কর ভট্টাচার্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তাঁর মাধ্যমে বাংলা ভাষায় ধ্রুপদচর্চার একটি শক্তিশালী ধারা গড়ে ওঠে, যার পরিণত বিকাশ ঘটে বিষ্ণুপুর ঘরানায়


১৫. বিষ্ণুপুর ঘরানা

বাংলার নিজস্ব শাস্ত্রীয় সংগীত-ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান নিদর্শন হল বিষ্ণুপুর ঘরানা

এই ঘরানার ভিত্তি প্রধানত ধ্রুপদ

এর বৈশিষ্ট্য—

  • রাগের বিশুদ্ধতা,
  • সংযম,
  • স্বচ্ছতা,
  • তুলনামূলক সরলতা,
  • অলংকারের সংযত ব্যবহার।

উল্লেখযোগ্য শিল্পী

  • যদুভট্ট
  • রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী
  • গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়
  • জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী বা জ্ঞান গোসাই প্রমুখ।

১৬. যদুভট্ট

যদুভট্ট বাংলা উচ্চাঙ্গসংগীতের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী।

তিনি ধ্রুপদ ও রাগসংগীতে অসাধারণ দক্ষ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সংগীতশিক্ষার ইতিহাসেও তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।


১৭. বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্তী

বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্তী বাংলা রাগসংগীত ও ব্রহ্মসংগীতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রবীন্দ্রনাথের সংগীতশিক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর নাম স্মরণীয়।

ব্রাহ্মসমাজে বাংলা ব্রহ্মসংগীতের প্রচলনের সঙ্গে তাঁর ভূমিকা যুক্ত।


১৮. খেয়াল

‘খেয়াল’ শব্দটির উৎস আরবি শব্দে।

বাংলায় খেয়ালচর্চার সূচনার ক্ষেত্রে রঘুনাথ রায়-এর নাম উল্লেখযোগ্য।

পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষায় খেয়াল রচনার ও পরিবেশনার একটি স্বতন্ত্র পরিসর তৈরি হয়।


১৯. ঠুংরি

বাংলায় ঠুংরির প্রসারের সঙ্গে নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ-এর কলকাতায় আগমন বিশেষভাবে যুক্ত।

১৮৫৬ সালে তিনি কলকাতায় এসে মেটিয়াবুরুজে বসবাস শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে লখনউয়ের সংগীত ও নৃত্যসংস্কৃতির নানা উপাদান কলকাতায় আসে।

এর ফলে ঠুংরি-সহ উত্তর ভারতীয় সংগীতের বিভিন্ন রীতি বাংলার সংগীতজগতে নতুন গুরুত্ব লাভ করে।


২০. ঢপকীর্তন ও রূপচাঁদ পক্ষী

কীর্তনের একটি বিশেষ রূপ হল ঢপকীর্তন

এই ধারার সঙ্গে রূপচাঁদ পক্ষী-র নাম বিশেষভাবে যুক্ত।

কৃষ্ণলীলা এই ধারার অন্যতম প্রধান বিষয়।


২১. যাত্রাগান

বাংলার লোকনাট্য ও সংগীতের ইতিহাসে যাত্রার গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রথমদিকে—

  • কৃষ্ণলীলা,
  • রামায়ণ,
  • পুরাণ

প্রধান বিষয় ছিল। পরে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও প্রেমের বিষয়ও যাত্রায় স্থান পায়।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব—

  • গোবিন্দ অধিকারী
  • কৃষ্ণকমল গোস্বামী
  • নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়
  • রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
  • গোপাল উড়ে
  • মদনমোহন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ১৮৪৯ সালের ‘নন্দবিদায়’ পালায় আখড়াই ও হাফ-আখড়াইয়ের ব্যবহার করেন।

মদনমোহন চট্টোপাধ্যায় যাত্রায় ‘জুড়ির গান’-এর সঙ্গে রাগ-রাগিণীর ব্যবহার করেন।

গোপাল উড়ে বিদ্যাসুন্দর যাত্রায় খ্যাতি অর্জন করেন এবং দক্ষ টপ্পাগায়ক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।


২২. উনিশ শতকের নাট্যসংগীত

বাংলা নাটকের বিকাশের সঙ্গে গানের সম্পর্ক গভীর।

কবিচন্দ্র ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলা’-র জন্য গান রচনা করেন।

বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্তী ‘নবনাটক’-এর সংগীত পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

গিরিশচন্দ্র ঘোষ নাটকের প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক গান রচনা করেন। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা পাঠ্যসূত্রে প্রায় ১৩৭০ বলে উল্লেখিত।

ফলে উনিশ শতকের বাংলা নাটকে গান কেবল অলংকার নয়; নাট্যকাঠামোরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


২৩. স্বরলিপির বিকাশ

গানের সংরক্ষণ, শিক্ষা ও প্রচারের ক্ষেত্রে স্বরলিপির গুরুত্ব অপরিসীম।

বাংলায় আকারমাত্রিক স্বরলিপি প্রবর্তনের সঙ্গে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর নাম যুক্ত।

স্বরলিপির ফলে মৌখিকভাবে প্রচলিত গানকে লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।


২৪. দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

বাংলা গানের ইতিহাসে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর গানে—

  • দেশপ্রেম,
  • ইতিহাসচেতনা,
  • নাট্যরস,
  • হাস্যরস

বিশেষভাবে প্রকাশিত।

তাঁর বিখ্যাত গান—

‘ধনধান্য পুষ্পভরা’

স্বদেশচেতনার অন্যতম জনপ্রিয় গান।

তাঁর নাটক ‘সোরাব ও রুস্তম’ অপেরাধর্মী সংগীতনাট্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।


২৫. রবীন্দ্রনাথ : বাংলা সংগীতের নবযুগ

বাংলা গানের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব একটি নতুন যুগের সূচনা।

তিনি বাংলা গানের পূর্ববর্তী বহু ধারাকে আত্মস্থ করে তাদের সঙ্গে আধুনিক কাব্যচেতনা, ব্যক্তিমানস ও বিশ্বমানবতার ভাবনা যুক্ত করেন।

তাঁর সংগীতে পাওয়া যায়—

  • ধ্রুপদ,
  • খেয়াল,
  • টপ্পা,
  • ঠুংরি,
  • কীর্তন,
  • বাউল,
  • ভাটিয়ালি,
  • রামপ্রসাদী সুর,
  • পাশ্চাত্য সংগীত

প্রভৃতির প্রভাব।

কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত কোনো ধারার অনুকরণমাত্র নয়; তিনি গ্রহণ করা উপাদানগুলিকে নিজস্ব সুরভাষায় রূপান্তর করেছেন।


২৫.১ রবীন্দ্রসংগীতের প্রধান বিষয়

রবীন্দ্রসংগীতে—

পূজা

ঈশ্বর, আত্মসমর্পণ, বিশ্বচেতনা ও আধ্যাত্মিকতার প্রকাশ।

উদাহরণ—

‘অন্তর মম বিকশিত করো।’

প্রেম

প্রেম, বিরহ, মিলন, আকাঙ্ক্ষা ও বিচ্ছেদের অনুভূতি।

প্রকৃতি ও ঋতু

বর্ষা, বসন্ত, শরৎ, হেমন্ত প্রভৃতি ঋতুকে কেন্দ্র করে অসংখ্য গান।

বর্ষাকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথের ঋতুগানের সংখ্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

স্বদেশ

দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদার চেতনা।

আনুষ্ঠানিক গান

বিবাহ, জন্মদিন, নববর্ষ, বর্ষশেষ, বৃক্ষরোপণ, হলকর্ষণ প্রভৃতি উপলক্ষে গান।

শিশু সংগীত

শিশুদের জন্য রচিত গান।

হাস্যরসাত্মক গান

নাটক ও গীতিনাট্যের প্রয়োজনে রচিত।


২৬. রবীন্দ্রনাথের সুরের উৎস

রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় ও পাশ্চাত্য উভয় সংগীতের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।

হিন্দুস্থানি সংগীতের ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুংরি প্রভৃতি থেকে তিনি গ্রহণ করেছেন।

তাঁর মৌলিক খেয়ালের সংখ্যা পাঠ্যধারায় ৫৫টি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া তিনি প্রায় ২৫ ধরনের নতুন তাল উদ্ভাবন করেছিলেন বলে পাঠ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে।


২৭. রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংগীত

রবীন্দ্রনাথ বাংলার লোকসংগীতকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন।

বিশেষত—

  • বাউল
  • ভাটিয়ালি
  • কীর্তন

তাঁর সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে।

‘আমার সোনার বাংলা’-র সুরে বাউলগানের প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

‘গ্রামছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ’-এর সুরেও ভাটিয়ালি প্রভাবের কথা আলোচিত হয়।


২৮. ভানুসিংহের পদাবলি

রবীন্দ্রনাথ ‘ভানুসিংহ’ ছদ্মনামে ব্রজবুলি ভাষায় রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ রচনা করেন।

এর মধ্য দিয়ে তিনি বৈষ্ণব পদাবলির ঐতিহ্যকে আধুনিক কবিচেতনায় পুনর্নির্মাণ করেন।


২৯. রবীন্দ্রনাথের মন্ত্রগান

বেদ, উপনিষদ ও পালি মন্ত্রের সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথ সংগীতের সম্পর্ক স্থাপন করেন।

ঋগ্বেদের মন্ত্রকে সুরারোপ করার উদাহরণ—

‘শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ।’

পালি মন্ত্রেও তিনি সুর সংযোজন করেছিলেন।


৩০. রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তা

রবীন্দ্রসংগীতকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্মের বহু শিল্পীর ভূমিকা রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য—

  • পঙ্কজকুমার মল্লিক
  • কানন দেবী
  • হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
  • সুচিত্রা মিত্র
  • দেবব্রত বিশ্বাস
  • কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।

৩১. রজনীকান্ত সেন

রজনীকান্ত সেন পরিচিত—

কান্তকবি

নামে।

তাঁর গানে ভক্তি, স্বদেশচেতনা, মানবতা ও হাস্যরসের সমন্বয় ঘটেছে।

তাঁর বিখ্যাত স্বদেশী গান—

‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই।’

তাঁর উল্লেখযোগ্য গানের সংকলন—

  • বাণী
  • কল্যাণী

৩২. অতুলপ্রসাদ সেন

বাংলা গানের স্বতন্ত্র ধারার অন্যতম নির্মাতা অতুলপ্রসাদ সেন

তাঁর গানে—

  • গজল,
  • টপ্পা,
  • ঠুংরি,
  • রাগসংগীত,
  • প্রেম,
  • স্বদেশ,
  • প্রকৃতি

মিলিত হয়েছে।

বাংলা গজল রচনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গান—

‘উঠগো ভারতলক্ষ্মী।’


৩৩. কাজী নজরুল ইসলাম

রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা গানের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম সর্বাধিক বহুমুখী প্রতিভাদের অন্যতম।

পাঠ্যসূত্রে ১৯২৮ থেকে ১৯৪২-এর মধ্যে তাঁর প্রায় ৩২৪৯টি গান রচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর সংগীতের পরিসর—

  • ইসলামি গান
  • গজল
  • শ্যামাসংগীত
  • কীর্তনধর্মী গান
  • রাগাশ্রয়ী গান
  • প্রেমের গান
  • ঋতুসংগীত
  • স্বদেশী গান
  • গীতিনাট্য
  • চলচ্চিত্রের গান

প্রভৃতি।


৩৩.১ নজরুলের ইসলামি গান

বাংলা ভাষায় ইসলামি সংগীতের জনপ্রিয় ধারাকে সমৃদ্ধ করেন নজরুল।

তাঁর বিখ্যাত গান—

‘রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ।’


৩৩.২ নজরুলের গজল

আরবি-ফারসি শব্দভাণ্ডার, উর্দু-ফারসি ভাবধারা এবং ভারতীয় সুররীতির সংমিশ্রণে নজরুল বাংলা গজলকে নতুন মাত্রা দেন।


৩৩.৩ নজরুলের শ্যামাসংগীত

নজরুলের শ্যামাসংগীতে শাক্ত ভাবধারার সঙ্গে তাঁর নিজস্ব কাব্যিকতা যুক্ত হয়েছে।

এর ফলে বাংলা শ্যামাসংগীত নতুন যুগের ভাষা লাভ করে।


৩৩.৪ নজরুলের রাগাশ্রয়ী ও ঋতুসংগীত

নজরুল বিভিন্ন রাগের ভিত্তিতে গান রচনা করেছেন।

ঋতুসংগীতেও তাঁর স্বাতন্ত্র্য রয়েছে।


৩৩.৫ নজরুলের স্বদেশী গান

তাঁর বিখ্যাত গান—

‘কারার ঐ লৌহকপাট’

স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিপুল প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।


৩৩.৬ নজরুলের গীতিনাট্য

উল্লেখযোগ্য গীতিনাট্য—

  • আলেয়া
  • মধুমালা
  • বনের বেদে

প্রভৃতি।


৩৩.৭ নজরুল ও চলচ্চিত্র

নজরুল চলচ্চিত্রের সঙ্গে গীতিকার ও সুরকার হিসেবে যেমন যুক্ত ছিলেন, তেমনই চলচ্চিত্রের অন্যান্য সৃজনশীল কাজেও যুক্ত ছিলেন।


৩৪. মুকুন্দদাস : চারণকবি

মুকুন্দদাস পরিচিত—

চারণকবি

নামে।

স্বদেশী আন্দোলনের যুগে গান ও যাত্রাকে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক জাগরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য পালা—

‘মাতৃপূজা।’

তাঁর জনপ্রিয় গানগুলির মধ্যে—

  • ‘ছেড়ে দাও কাচের চুড়ি’
  • ‘বান এসেছে মরা গাঙে’

প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।


৩৫. দিলীপকুমার রায়

দিলীপকুমার রায় ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সংগীতের তুলনামূলক সম্পর্ক নিয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন।

পাশ্চাত্য সংগীতের বিভিন্ন সুররীতি ও ভারতীয় সংগীতের সম্ভাব্য সাদৃশ্য নিয়ে তিনি আলোচনা ও পরীক্ষা করেছিলেন।


৩৬. রাগপ্রধান গান

বাংলা ভাষায় রাগভিত্তিক গানের একটি স্বতন্ত্র ধারা হল রাগপ্রধান গান

এই ধারার বিকাশে সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী-র ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।


৩৭. রেডিয়োর আগমন

রেডিয়োর প্রসার বাংলা গানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটায়।

পাঠ্যসূত্রে ১৯৩১ সাল থেকে রেডিয়োর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

রেডিয়োর ফলে গান—

মঞ্চ থেকে ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।

শিল্পীর জনপ্রিয়তা আর শুধু সরাসরি অনুষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল থাকে না।


৩৮. আধুনিক বাংলা গানের সূচনা

বাংলা আধুনিক গানের সুসংহত বিকাশ তিরিশের দশক থেকে

এই সময়ে গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীর পৃথক পেশাগত পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আধুনিক বাংলা গান পুরোনো ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করে তার সঙ্গে নতুন সুর, নতুন যন্ত্র এবং নতুন নাগরিক অভিজ্ঞতার সংযোগ ঘটায়।


৩৯. বাংলা চলচ্চিত্রের গান

বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশের সঙ্গে গান নতুন শ্রোতাসমাজ লাভ করে।

চলচ্চিত্রে গান হয়ে ওঠে—

  • কাহিনির অংশ,
  • চরিত্রের আবেগের প্রকাশ,
  • বিনোদনের মাধ্যম,
  • জনপ্রিয় সংস্কৃতির অন্যতম বাহন।

এই ধারায় গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন—

  • পঙ্কজকুমার মল্লিক
  • রাইচাঁদ বড়াল
  • কৃষ্ণচন্দ্র দে
  • কানন দেবী
  • শচীনদেব বর্মন
  • হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
  • মান্না দে
  • সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়
  • গীতা দত্ত
  • শ্যামল মিত্র প্রমুখ।

৪০. শচীনদেব বর্মন

শচীনদেব বর্মন পূর্ববঙ্গের লোকসংগীত ও বিশেষত নদী-জীবনের সুরকে আধুনিক গান ও চলচ্চিত্রসংগীতে ব্যবহার করেন।

তাঁর সংগীতে—

  • ভাটিয়ালি,
  • লোকসুর,
  • কীর্তন,
  • আধুনিক সুর

একত্রিত হয়েছে।


৪১. হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বাংলা আধুনিক ও চলচ্চিত্রসংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী।

তিনি একই সঙ্গে ছিলেন—

  • গায়ক,
  • সুরকার,
  • সংগীত পরিচালক।

তাঁর কণ্ঠ বাংলা গানের এক স্বতন্ত্র মাধুর্য নির্মাণ করেছে।


৪২. মান্না দে

মান্না দে বাংলা চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানে শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিতকে জনপ্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত করেন।

তাঁর গানে রাগ, তান, লয় ও অলংকারের দক্ষ ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।


৪৩. সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়

বাংলা আধুনিক ও চলচ্চিত্রসংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়

প্রেম, বিরহ ও আবেগঘন বাংলা গানের ক্ষেত্রে তাঁর কণ্ঠ বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।


৪৪. শ্যামল মিত্র

শ্যামল মিত্র ছিলেন গায়ক ও সুরকার।

বাংলা আধুনিক গানের কোমল, সহজ ও মেলোডিনির্ভর ধারাকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।


৪৫. অখিলবন্ধু ঘোষ

অখিলবন্ধু ঘোষ বাংলা গানের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠশিল্পী।

তাঁর গানের মধ্যে—

‘ও দয়াল, বিচার করো’

বিশেষভাবে জনপ্রিয়।


৪৬. হৈমন্তী শুক্লা

হৈমন্তী শুক্লা বাংলা গানের জগতে বিশেষভাবে পরিচিত।

পাঠ্যসূত্রে তাঁর সংগীতজগতে আত্মপ্রকাশের সাল ১৯৭২ এবং প্রথম রেকর্ড হওয়া গান হিসেবে—

‘এ তো কান্না নয় আমার’

-এর উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর সংগীতগুরু ছিলেন পণ্ডিত হরিহর শুক্লা


৪৭. কিশোর কুমার

কিশোর কুমার বাংলা ও হিন্দি উভয় চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী।

অভিনয়, গান, সুরারোপ ও চলচ্চিত্র নির্মাণ—বহু ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছে।


৪৮. ভূপেন হাজারিকা

ভূপেন হাজারিকা মূলত অসমিয়া সংগীতের শিল্পী হলেও বাংলা ভাষাভাষী সমাজেও তাঁর গান অত্যন্ত জনপ্রিয়।

তাঁর গানে আঞ্চলিকতার সীমা অতিক্রম করে মানবতা, শ্রম, সাম্য ও সামাজিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্মান—

  • দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার — ১৯৯২
  • মরণোত্তর পদ্মবিভূষণ — ২০১২

৪৯. গণসংগীত

বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে গান গভীরভাবে যুক্ত।

স্বাধীনতা সংগ্রাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন এবং সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পরিবেশে গণসংগীত একটি শক্তিশালী ধারায় পরিণত হয়।

এখানে গান কেবল বিনোদন নয়—

গান হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, সংগঠন ও সামাজিক জাগরণের ভাষা।

গণসংগীতের বিকাশের সঙ্গে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ-এর সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।


৫০. গণসংগীতের বৈশিষ্ট্য

গণসংগীতের বিষয়—

  • সাধারণ মানুষের জীবন,
  • শ্রম,
  • দারিদ্র্য,
  • শোষণ,
  • যুদ্ধ,
  • প্রতিবাদ,
  • সাম্য,
  • স্বাধীনতা।

এর সুরভাণ্ডারে লোকসুর, রাগসংগীত, পাশ্চাত্য সংগীত ও বিভিন্ন প্রাদেশিক সুরের সমন্বয় ঘটেছে।


৫১. গণসংগীতের প্রধান ব্যক্তিত্ব

উল্লেখযোগ্য—

  • জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র
  • সলিল চৌধুরী
  • হেমাঙ্গ বিশ্বাস
  • নিবারণ পণ্ডিত
  • দেবব্রত বিশ্বাস
  • সুচিত্রা মিত্র
  • হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
  • প্রতুল মুখোপাধ্যায়
  • অজিত পাণ্ডে প্রমুখ।

৫২. জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র

গণসংগীতের ক্ষেত্রে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর বিখ্যাত গণসংগীত—

‘নবজীবনের গান।’

সমবেত কণ্ঠ ও কোরাসের মাধ্যমে সামাজিক চেতনাকে সংগীতে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।


৫৩. সলিল চৌধুরী

বাংলা গণসংগীত ও আধুনিক সংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা সলিল চৌধুরী

তাঁর সংগীতে—

  • লোকসুর,
  • পাশ্চাত্য হারমনি,
  • ভারতীয় রাগ,
  • কোরাস,
  • রাজনৈতিক চেতনা

অভূতপূর্বভাবে মিলিত হয়েছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গণসংগীত—

‘হেই সামালো।’

সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতায় সুরারোপ করেও তিনি গণসংগীতের একটি অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করেন।


৫৪. সলিল চৌধুরী ও চলচ্চিত্র

সলিল চৌধুরীর চলচ্চিত্রসংগীতের ক্ষেত্রও অত্যন্ত বিস্তৃত।

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে—

  • বাঁশের কেল্লা — ১৯৫৩
  • বাড়ি থেকে পালিয়ে — ১৯৫৯
  • গঙ্গা — ১৯৬০
  • কিনু গোয়ালার গলি — ১৯৬৪
  • রক্তাক্ত বাংলা — ১৯৭২

প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

হিন্দি চলচ্চিত্রেও তাঁর সাফল্য ছিল বিপুল। দো বিঘা জমিন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির একটি।


৫৫. ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার

সমবেত সংগীত ও গণসংগীতের ইতিহাসে ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

এর সঙ্গে রুমা গুহঠাকুরতা-র নাম বিশেষভাবে যুক্ত।

১৯৭৪ সালে কোপেনহেগেন বিশ্ব যুব উৎসবে তাদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য।


৫৬. বাংলা গানের স্বর্ণযুগ ও পরিবর্তন

বাংলা চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানের একটি দীর্ঘ সময়কে জনপ্রিয়তার স্বর্ণযুগ বলা যায়।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে সমাজের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে প্রচলিত গানের ভাষার দূরত্ব তৈরি হয়।

শহর, পরিবার, প্রেম, রাজনীতি, যুবসমাজ ও ব্যক্তিমানসের পরিবর্তন নতুন ধরনের গান দাবি করে।

এই পরিবর্তনের ভিতর থেকেই বাংলা গানে নতুন প্রবাহের জন্ম হয়।


৫৭. মহীনের ঘোড়াগুলি

সত্তরের দশকে বাংলা গানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের নাম—

মহীনের ঘোড়াগুলি।

দলনেতা—

গৌতম চট্টোপাধ্যায়।

দলটির আত্মপ্রকাশ—

১৯৭৬।

প্রথম অ্যালবাম—

‘সংবিগ্ন পাখিকুল ও কলকাতা বিষয়ক গান।’

পরবর্তী অ্যালবাম—

  • অজানা উড়ন্ত বস্তু বা উ-বা — ১৯৭৮
  • দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি — ১৯৭৯

৫৮. মহীনের সংগীতের বৈশিষ্ট্য

মহীনের গান বাংলা সংগীতে নিয়ে আসে নতুন নাগরিক অভিজ্ঞতা—

  • শহুরে একাকিত্ব,
  • যুবসমাজের অস্থিরতা,
  • সামাজিক সংকট,
  • মধ্যবিত্তের বিচ্ছিন্নতা,
  • প্রেম,
  • রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ।

তাদের সংগীতে পাশ্চাত্য রক ও সাইকেডেলিক রক-এর প্রভাব লক্ষ করা যায়।

পরবর্তী জীবনমুখী বাংলা গান-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূত্র হিসেবে মহীনের ঘোড়াগুলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।


৫৯. মহীনের পুনরাগমন

পরবর্তী সময়ে মহীনের সংগীত নতুন প্রজন্মের কাছে পুনরায় জনপ্রিয় হয়।

উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা—

  • আবার বছর কুড়ি পরে — ১৯৯৫
  • বরা সময়ের গান — ১৯৯৬
  • মায়া — ১৯৯৭
  • খ্যাপার গান — ১৯৯৯
  • গৌতম — ২০০০

৬০. প্রতুল মুখোপাধ্যায়

বাংলা গানের অন্যধারায় প্রতুল মুখোপাধ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

তাঁর গান নাগরিক জীবন, সামাজিক অসাম্য, মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত।

তাঁর সরল সুর ও সরাসরি বক্তব্য বাংলা গানে একটি স্বতন্ত্র নাগরিক কণ্ঠ নির্মাণ করে।


৬১. জিংগল বা বিজ্ঞাপনী গান

রেডিয়ো ও পরে টেলিভিশনের প্রসারের সঙ্গে বিজ্ঞাপনী গান বা জিংগল বাংলা সংস্কৃতির একটি নতুন উপাদান হয়ে ওঠে।

জিংগলের বৈশিষ্ট্য—

  • স্বল্প দৈর্ঘ্য,
  • সহজ সুর,
  • সহজে মনে থাকার মতো বাণী,
  • পণ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক।

৬২. সুমন চট্টোপাধ্যায় : নতুন নাগরিক গানের যুগ

নব্বইয়ের দশকে বাংলা গানে নতুন পরিবর্তন আনেন সুমন চট্টোপাধ্যায়

তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অ্যালবাম—

‘তোমাকে চাই।’

এই অ্যালবাম বাংলা গানে নতুন নাগরিক আত্মস্বরের প্রকাশ ঘটায়।

এখানে শিল্পী একই সঙ্গে—

গীতিকার + সুরকার + গায়ক।

ফলে ব্যক্তিমানস, নাগরিক জীবন, প্রেম, রাজনৈতিক সচেতনতা ও মধ্যবিত্তের সংকট সরাসরি গানের বিষয় হয়ে ওঠে।


৬৩. সুমনের গান

সুমনের গানে—

  • নগরজীবন,
  • ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা,
  • প্রেম,
  • রাজনৈতিক চেতনা,
  • সামাজিক সংকট,
  • সম্পর্কের টানাপোড়েন

বিশেষভাবে প্রকাশ পায়।

‘ব’সে আঁকো’-ও তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ।


৬৪. নচিকেতা চক্রবর্তী

নচিকেতা চক্রবর্তীর গান বাংলা জীবনমুখী সংগীতের ধারাকে আরও জনপ্রিয় করে।

তাঁর গানে—

  • মধ্যবিত্তের সংকট,
  • সামাজিক অসাম্য,
  • মানুষের যন্ত্রণা,
  • প্রেম,
  • ব্যক্তিমানস

সরাসরি প্রকাশিত।

‘কে যায়’-এর মতো গানে মানুষের যন্ত্রণা ও সামাজিক বাস্তবতা বিশেষভাবে উঠে আসে।


৬৫. ফিউশন সংগীত

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও পাশ্চাত্য সংগীতের মিলনে যে নতুন সুরভাষার সৃষ্টি, তাকে সাধারণভাবে ফিউশন সংগীত বলা হয়।

ভারতীয় সংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে সংলাপে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রবিশংকর-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়েহুদি মেনুহিন-এর সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা বিশেষভাবে স্মরণীয়।


৬৬. নতুন বাংলা ব্যান্ড

মহীনের ঘোড়াগুলির পর বাংলা ব্যান্ডসংগীত আরও বিস্তৃত হয়।

পরবর্তী প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য ব্যান্ড—

  • লক্ষ্মীছাড়া
  • চন্দ্রবিন্দু
  • ভূমি
  • ফসিলস
  • কালপুরুষ
  • শহর

প্রমুখ।


৬৭. বাংলা গানের ক্রমবিবর্তন

বাংলা গানের দীর্ঘ ইতিহাসকে সংক্ষেপে এভাবে দেখা যায়—

চর্যাগান

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন

বৈষ্ণব পদাবলি

কীর্তন

মঙ্গলকাব্যের গান

পাঁচালি

লোকসংগীত

শাক্ত পদাবলি ও শ্যামাসংগীত

কবিগান

আখড়াই

হাফ-আখড়াই

টপ্পা

ধ্রুপদ

বিষ্ণুপুর ঘরানা

খেয়াল

ঠুংরি

যাত্রাগান ও নাট্যসংগীত

স্বরলিপির যুগ

রবীন্দ্রসংগীত

দ্বিজেন্দ্রলাল–রজনীকান্ত–অতুলপ্রসাদ

নজরুলসংগীত

স্বদেশী ও চারণসংগীত

রাগপ্রধান গান

রেডিয়ো ও আধুনিক গান

চলচ্চিত্রের গান

গণসংগীত

সলিল চৌধুরী ও ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার

মহীনের ঘোড়াগুলি

প্রতুল মুখোপাধ্যায়

সুমন চট্টোপাধ্যায়

নচিকেতা

ফিউশন

নতুন বাংলা ব্যান্ড।


৬৮. গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের অবদান

ব্যক্তিত্ব প্রধান অবদান
সিদ্ধাচার্যগণ চর্যাগান
বড়ু চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
জয়দেব গীতগোবিন্দ
শ্রীচৈতন্য কীর্তনের প্রসার
রামপ্রসাদ সেন শ্যামাসংগীত
কমলাকান্ত ভট্টাচার্য শাক্তসংগীত
দাশরথি রায় পাঁচালি
লক্ষ্মীকান্ত বিশ্বাস আধুনিক পাঁচালি
গৌজলা গুই কবিগান
ভোলা ময়রা কবিগান
হরু ঠাকুর কবিগান
রাম বসু কবিগান
অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি কবিগান
ঈশ্বরচন্দ্র গুহ কবিগান
রামনিধি গুপ্ত আখড়াই ও বাংলা টপ্পা
মোহনচাঁদ বসু হাফ-আখড়াই
রামশঙ্কর ভট্টাচার্য বাংলা ধ্রুপদ
যদুভট্ট বিষ্ণুপুর ঘরানা
রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী ধ্রুপদ
বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্তী রাগসংগীত ও ব্রহ্মসংগীত
ওয়াজেদ আলি শাহ ঠুংরির প্রসার
রূপচাঁদ পক্ষী ঢপকীর্তন
গোপাল উড়ে যাত্রা ও টপ্পা
গিরিশচন্দ্র ঘোষ নাট্যসংগীত
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বরলিপি
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বরলিপি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রসংগীত
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় দেশাত্মবোধক ও ঐতিহাসিক গান
রজনীকান্ত সেন কান্তগীতি
অতুলপ্রসাদ সেন বাংলা গজল
কাজী নজরুল ইসলাম বহুমুখী বাংলা গান
মুকুন্দদাস চারণ ও স্বদেশী সংগীত
দিলীপকুমার রায় সংগীততাত্ত্বিক ও তুলনামূলক সংগীতচর্চা
সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী রাগপ্রধান গান
পঙ্কজকুমার মল্লিক রবীন্দ্রসংগীত ও চলচ্চিত্র
শচীনদেব বর্মন লোকসুরভিত্তিক আধুনিক ও চলচ্চিত্রসংগীত
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গান
মান্না দে শাস্ত্রীয় ভিত্তিসম্পন্ন জনপ্রিয় গান
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গান
হৈমন্তী শুক্লা আধুনিক গান
ভূপেন হাজারিকা মানবিক ও গণমুখী সংগীত
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র গণসংগীত
হেমাঙ্গ বিশ্বাস গণসংগীত
সলিল চৌধুরী গণসংগীত ও চলচ্চিত্রসংগীত
রুমা গুহঠাকুরতা ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার
প্রতুল মুখোপাধ্যায় নাগরিক ও প্রতিবাদী গান
গৌতম চট্টোপাধ্যায় মহীনের ঘোড়াগুলি
সুমন চট্টোপাধ্যায় নতুন নাগরিক গান
নচিকেতা চক্রবর্তী জীবনমুখী গান
রবিশংকর ফিউশন সংগীত

৬৯. গুরুত্বপূর্ণ সাল

সাল ঘটনা
প্রাচীন যুগ চর্যাগানের উদ্ভব
অষ্টাদশ শতক কবিগান, পাঁচালি, আখড়াই প্রভৃতির বিকাশ
১৮৪৯ ‘নন্দবিদায়’-এ আখড়াই ও হাফ-আখড়াইয়ের ব্যবহার
১৮৫৬ ওয়াজেদ আলি শাহের কলকাতায় আগমন
১৯৩১ রেডিয়োর প্রসার
১৯২৮–১৯৪২ নজরুলের বিপুল গান রচনার সময়কাল
১৯৫৩ ‘বাঁশের কেল্লা’
১৯৫৯ ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’
১৯৬০ ‘গঙ্গা’
১৯৬৪ ‘কিনু গোয়ালার গলি’
১৯৭২ ‘রক্তাক্ত বাংলা’
১৯৭৪ ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের আন্তর্জাতিক সাফল্য
১৯৭৬ মহীনের ঘোড়াগুলির আত্মপ্রকাশ
১৯৭৮ ‘অজানা উড়ন্ত বস্তু বা উ-বা’
১৯৭৯ ‘দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি’
১৯৯২ ভূপেন হাজারিকার দাদাসাহেব ফালকেসম্মান
১৯৯৫ ‘আবার বছর কুড়ি পরে’
১৯৯০-এর দশক জীবনমুখী ও নতুন নাগরিক গানের বিস্তার

৭০. পরীক্ষার জন্য একনজরে

বাংলা সংগীতের আদিতম লিখিত নিদর্শন — চর্যাপদ
চর্যাগানের সংখ্যা — ৫১
চর্যাগানের রচয়িতা — বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রচয়িতা — বড়ু চণ্ডীদাস
গীতগোবিন্দের রচয়িতা — জয়দেব
পাঁচালির প্রধান ছন্দ — পয়ার ও মহাপয়ার
মঙ্গলকাব্যের গানের সঙ্গে যুক্ত ছন্দ — লাচাড়ি
কবিগানের একটি নাম — কবির লড়াই
কবিগানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র — শান্তিপুর
পাঁচালির উল্লেখযোগ্য রচয়িতা — দাশরথি রায়
আধুনিক পাঁচালির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব — লক্ষ্মীকান্ত বিশ্বাস
আখড়াইয়ের সংস্কারক — নিধুবাবু
হাফ-আখড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত — মোহনচাঁদ বসু
হাফ-আখড়াইয়ের উত্তর-প্রত্যুত্তর — ধরতা-উতোর
বাংলা টপ্পার শ্রেষ্ঠ নির্মাতা — নিধুবাবু
‘টপ্পা’ শব্দের অর্থ — লাফ
বাংলা ধ্রুপদের গুরুত্বপূর্ণ নাম — রামশঙ্কর ভট্টাচার্য
বাংলার নিজস্ব শাস্ত্রীয় ঘরানা — বিষ্ণুপুর ঘরানা
বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রধান ভিত্তি — ধ্রুপদ
বাংলায় খেয়ালের প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ নাম — রঘুনাথ রায়
ঠুংরির প্রসারের সঙ্গে যুক্ত — ওয়াজেদ আলি শাহ
ঢপকীর্তনের সঙ্গে যুক্ত — রূপচাঁদ পক্ষী
আকারমাত্রিক স্বরলিপি — দ্বিজেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ
কান্তকবি — রজনীকান্ত সেন
বাংলা গজলের অন্যতম পথিকৃৎ — অতুলপ্রসাদ সেন
চারণকবি — মুকুন্দদাস
নজরুলের উল্লেখিত গানের সংখ্যা — প্রায় ৩২৪৯
গণসংগীতের প্রধান উদ্দেশ্য — গণচেতনা ও সামাজিক জাগরণ
‘নবজীবনের গান’ — জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র
‘হেই সামালো’ — সলিল চৌধুরী
‘রানার’ — সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা; সলিলের সুর
ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার — রুমা গুহঠাকুরতা
মহীনের ঘোড়াগুলি — গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ব্যান্ড
মহীনের আত্মপ্রকাশ — ১৯৭৬
মহীনের প্রথম অ্যালবাম — ‘সংবিগ্ন পাখিকুল ও কলকাতা বিষয়ক গান’
‘তোমাকে চাই’ — সুমন চট্টোপাধ্যায়
জীবনমুখী গানের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূত্র — মহীনের ঘোড়াগুলি
ফিউশন সংগীতের আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব — রবিশংকর
ভূপেন হাজারিকার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার — ১৯৯২
ভূপেন হাজারিকার মরণোত্তর পদ্মবিভূষণ — ২০১২


উপসংহার

বাঙালির গানের ইতিহাস আসলে বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের শ্রুতিময় ইতিহাস

চর্যার গূঢ় সাধনা থেকে বৈষ্ণবের প্রেম, মঙ্গলকাব্যের লোকবিশ্বাস থেকে বাউলের দেহতত্ত্ব, ভাটিয়ালির নদী থেকে শাক্তের মাতৃভাব, কবিগানের তর্ক থেকে আখড়াইয়ের বৈঠকী রস—বাংলা গান প্রথম থেকেই জীবন ও সমাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

নিধুবাবুর টপ্পা বাংলা ভাষাকে রাগসংগীতের নতুন সম্ভাবনা দিয়েছে; বিষ্ণুপুর ঘরানা বাংলার নিজস্ব শাস্ত্রীয় সংগীত-ঐতিহ্য নির্মাণ করেছে। রবীন্দ্রনাথ পূর্ববর্তী সমস্ত সংগীত-অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করে তাকে এক আধুনিক, মানবিক ও বিশ্বজনীন নন্দনতত্ত্বে উন্নীত করেছেন। রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ ও দ্বিজেন্দ্রলাল বাংলা গানকে স্বদেশ, ভক্তি, প্রেম ও ইতিহাসের নতুন ভাষা দিয়েছেন। নজরুল বাংলা গানকে আরও বহুধর্মী, বহুসাংস্কৃতিক ও বিদ্রোহী করে তুলেছেন।

পরবর্তীকালে রেডিয়ো, গ্রামোফোন ও চলচ্চিত্র গানকে গণমাধ্যমে রূপান্তরিত করেছে। গণসংগীত গানকে সংগ্রামের ভাষা করেছে। সলিল চৌধুরী লোকসুর, পাশ্চাত্য হারমনি ও রাজনৈতিক চেতনাকে একত্র করেছেন। আর মহীনের ঘোড়াগুলি, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, সুমন চট্টোপাধ্যায় ও নচিকেতার হাত ধরে বাংলা গান প্রবেশ করেছে নতুন নাগরিক বাস্তবতায়।

অতএব বাংলা গানের ইতিহাসের মূল সুরটি হল পরম্পরা ও পরিবর্তনের সহাবস্থান। নতুন বাংলা গান পুরোনোকে মুছে দিয়ে তৈরি হয়নি; বরং চর্যা, কীর্তন, বাউল, শাক্ত, টপ্পা, ধ্রুপদ, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লোকসংগীত ও গণসংগীতের দীর্ঘ স্মৃতি বহন করেই তার আধুনিক রূপ নির্মাণ করেছে।

চর্যা থেকে মহীন, রামপ্রসাদ থেকে নজরুল, নিধুবাবু থেকে অতুলপ্রসাদ, রবীন্দ্রনাথ থেকে সুমন—এই দীর্ঘ সংগীতযাত্রাই বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তার এক অনন্য শ্রুতিময় ইতিহাস।

পাঠভিত্তি: পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সাহিত্যানুশীলন—বাংলা ক, দ্বাদশ শ্রেণি, ‘বাংলা গানের ইতিহাস—সংক্ষিপ্ত রূপরেখা’ অধ্যায়। 

 
### পরিবেশনে- ড. অনিশ রায়
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top