অধ্যায় : শব্দার্থতত্ত্ব

ভূমিকা

ভাষাবিজ্ঞানের যে শাখায় ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ ও অন্যান্য অর্থবহ ভাষিক এককের অর্থ, অর্থের গঠন, পারস্পরিক সম্পর্ক, ব্যবহার এবং সময়ের সঙ্গে অর্থের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে শব্দার্থতত্ত্ব বলে। ইংরেজিতে শব্দার্থতত্ত্বের পরিভাষা Semantics

‘অর্থ’ বা ‘মানে’ শব্দটি সাধারণ ভাষায় নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন—‘মেঘ মানেই বৃষ্টি’, ‘জীবনের অর্থ কী?’ কিংবা ‘এ কথার মানে কী?’—এই সব ক্ষেত্রে ‘অর্থ’ শব্দটির ব্যবহার একরকম নয়। তাই সাধারণ অর্থে ‘অর্থ’ বলতে যা বোঝায়, তার সবটাই শব্দার্থতত্ত্বের আলোচ্য নয়।

শব্দার্থতত্ত্ব মূলত ভাষার অর্থবহ এককগুলির অর্থ এবং সেই অর্থের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে। শব্দার্থতত্ত্বের আলোচনায় শুধু একটি শব্দের অর্থ নয়, শব্দের সঙ্গে শব্দের সম্পর্ক, শব্দ ও বস্তু বা বিষয়ের সম্পর্ক, বাক্যের অর্থ, প্রসঙ্গনির্ভর অর্থ এবং অর্থের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।


১. শব্দার্থ কী?

সাধারণভাবে কোনো শব্দ বা শব্দগুচ্ছ যে ধারণা, বস্তু, ব্যক্তি, গুণ, ক্রিয়া বা বিষয়কে বোঝায়, তাকে সেই শব্দের অর্থ বলা হয়।

অভিধানে একটি শব্দের অর্থ সাধারণত অন্য শব্দ বা শব্দগুচ্ছের সাহায্যে প্রকাশ করা হয়।

যেমন—

আকাশ — গগন, অন্তরীক্ষ, ব্যোম, শূন্য।
সূর্য — রবি, আদিত্য, ভানু, দিবাকর।
বন — অরণ্য, কানন, বিপিন।

অর্থাৎ একটি শব্দের অর্থকে অন্য শব্দ বা শব্দগুচ্ছের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায়।


২. সাধারণ অর্থ ও নিদর্শন

শব্দের অর্থের আলোচনায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল—

(ক) সাধারণ অর্থ
(খ) নিদর্শন

সাধারণ অর্থ

অভিধানে একটি শব্দের যে অর্থ দেওয়া হয় এবং অন্য শব্দ বা শব্দগুচ্ছের সাহায্যে যে অর্থ প্রকাশ করা হয়, তাকে সাধারণ অর্থ বলা যায়।

যেমন—

পাখি — আকাশে উড়তে সক্ষম পক্ষীজাতীয় প্রাণী।

এখানে ‘পাখি’ শব্দটির সাধারণ অর্থ অন্য শব্দের সাহায্যে প্রকাশিত হয়েছে।

নিদর্শন

কোনো শব্দ যে বস্তু, ব্যক্তি, প্রাণী বা বিষয়কে নির্দেশ করে, সেই নির্দেশিত সত্তার সঙ্গে শব্দটির যে সম্পর্ক, তাকে নিদর্শন বলা হয়।

যেমন, ‘গাছ’ শব্দটি উচ্চারণ করলে একটি বিশেষ ধরনের উদ্ভিদ আমাদের মনে আসে। শব্দটি যে বাস্তব বস্তুকে নির্দেশ করছে, সেটিই তার নিদর্শন।

তবে সব শব্দের নিদর্শন থাকে না।

যেমন—এবং, কিন্তু, অথবা, অতএব ইত্যাদি শব্দের অর্থ আছে, কিন্তু এগুলি কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা ব্যক্তিকে নির্দেশ করে না।

মনে রাখবে :
শব্দের সঙ্গে শব্দের অর্থগত সম্পর্ক — অর্থ
শব্দের সঙ্গে নির্দেশিত বস্তু বা বিষয়ের সম্পর্ক — নিদর্শন


৩. শব্দার্থতত্ত্বের আলোচনার বিভিন্ন দিক

শব্দার্থতত্ত্বে ভাষার অর্থকে বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করা হয়। এর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্র হল—

১. ঐতিহাসিক শব্দার্থতত্ত্ব
২. শব্দভিত্তিক শব্দার্থতত্ত্ব
৩. বাক্যভিত্তিক শব্দার্থতত্ত্ব
৪. প্রয়োগতত্ত্ব

এ ছাড়াও শব্দের অর্থ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি তত্ত্ব হল—

১. উপাদানমূলক তত্ত্ব
২. সত্যসাপেক্ষ তত্ত্ব
৩. বিষয়মূলক তত্ত্ব


৪. ঐতিহাসিক শব্দার্থতত্ত্ব

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো ভাষার শব্দের অর্থও পরিবর্তিত হয়। একটি শব্দের পুরোনো অর্থের সঙ্গে নতুন অর্থ যুক্ত হতে পারে, অর্থ সংকুচিত হতে পারে অথবা সম্পূর্ণ নতুন অর্থের সৃষ্টি হতে পারে।

সময়ের সঙ্গে শব্দের অর্থের এই পরিবর্তন নিয়ে যে শাখায় আলোচনা করা হয়, তাকে ঐতিহাসিক শব্দার্থতত্ত্ব বলে।

উদাহরণ :

‘গবেষণা’ শব্দের আদি অর্থের সঙ্গে বর্তমান অর্থের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে ‘গবেষণা’ বলতে কোনো বিষয় সম্পর্কে নিয়মবদ্ধ অনুসন্ধান, বিচার ও বিশ্লেষণকে বোঝায়।


৫. শব্দভিত্তিক শব্দার্থতত্ত্ব

স্বতন্ত্র শব্দের অর্থ এবং একটি শব্দের সঙ্গে অন্য শব্দের অর্থগত সম্পর্ক নিয়ে যে আলোচনা করা হয়, তাকে শব্দভিত্তিক শব্দার্থতত্ত্ব বলা যায়।

এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচিত হয়—

  • সমার্থকতা
  • বিপরীতার্থকতা
  • ব্যাপকার্থকতা
  • অর্থান্তরভুক্তি
  • শব্দের অর্থের বিভিন্ন সম্পর্ক

৬. উপাদানমূলক তত্ত্ব

একটি শব্দের অর্থকে একটিমাত্র অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে না দেখে কয়েকটি ক্ষুদ্র অর্থ-উপাদানের সমষ্টি হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়—এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বকে উপাদানমূলক তত্ত্ব বলে।

অর্থাৎ—

শব্দের অর্থ = একাধিক ক্ষুদ্র অর্থ-উপাদানের সমষ্টি।

উদাহরণ

‘পুরুষ’, ‘নারী’ ও ‘শিশু’—এই তিনটি শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিছু অর্থ-উপাদান তাদের মধ্যে অভিন্ন, আবার কিছু উপাদান পৃথক।

পুরুষ
= মানবজাতীয় + প্রাপ্তবয়স্ক + পুরুষ

নারী
= মানবজাতীয় + প্রাপ্তবয়স্ক + নারী

শিশু
= মানবজাতীয় + অপ্রাপ্তবয়স্ক

এইভাবে শব্দের অর্থকে ক্ষুদ্র অর্থ-উপাদানে বিশ্লেষণ করা যায়।

উপাদানমূলক তত্ত্বের গুরুত্ব

এই তত্ত্বের সাহায্যে—

  • শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ-উপাদান চিহ্নিত করা যায়;
  • শব্দের মধ্যে অর্থগত সম্পর্ক নির্ণয় করা যায়;
  • অর্থের ভিত্তিতে শব্দকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

তবে সব শব্দের অর্থকে একইভাবে ক্ষুদ্র উপাদানে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। বিশেষত বিমূর্ত, সাংস্কৃতিক ও আবেগনির্ভর শব্দের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।


৭. সত্যসাপেক্ষ তত্ত্ব

একটি বাক্যের অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে শুধু বাক্যের অন্তর্গত শব্দগুলির অর্থ জানা যথেষ্ট নয়; বাক্যটি বাস্তব জগতের কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন—

বাঘ ছাগল নিয়ে গেছে।
ছাগল বাঘ নিয়ে গেছে।

দুটি বাক্যেই একই শব্দ রয়েছে। কিন্তু শব্দগুলির অবস্থান ও পারস্পরিক সম্পর্ক পরিবর্তিত হওয়ায় বাক্য দুটির অর্থও সম্পূর্ণ আলাদা।

কোনো বাক্য বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হলে তা সত্য, আর অসঙ্গতিপূর্ণ হলে তা মিথ্যা হতে পারে। বাক্যের অর্থকে এই সত্য-মিথ্যার সম্পর্কের ভিত্তিতে বিচার করার তত্ত্বকে সত্যসাপেক্ষ তত্ত্ব বলা হয়।

উদাহরণ

‘দিল্লি ভারতের রাজধানী।’

এই বাক্যটি বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তাই এটি সত্য।

অন্যদিকে—

‘কলকাতা ভারতের রাজধানী।’

বাক্যটি বর্তমান বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই এটি মিথ্যা।


৮. বিষয়মূলক তত্ত্ব

একটি শব্দ বা বাক্যের অর্থ অনেক সময় তার প্রসঙ্গ, পরিস্থিতি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে। একই শব্দ বিভিন্ন প্রসঙ্গে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করতে পারে।

এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা তত্ত্বকে বিষয়মূলক তত্ত্ব বলা হয়।

‘মাথা’ শব্দের বিভিন্ন ব্যবহার

মাথায় টুপি পরো।
→ শরীরের একটি অঙ্গ।

মাথা খাটাও।
→ বুদ্ধি বা চিন্তাশক্তি।

মাথা খেও না।
→ বিরক্ত করা।

সে এই প্রতিষ্ঠানের মাথা।
→ প্রধান ব্যক্তি।

মাথা ধরেছে।
→ মাথাব্যথা হয়েছে।

একই ‘মাথা’ শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করেছে।

অতএব—

প্রসঙ্গ ছাড়া অনেক সময় কোনো শব্দের প্রকৃত অর্থ সম্পূর্ণভাবে নির্ণয় করা যায় না।


৯. সমার্থকতা

দুই বা ততোধিক শব্দের মধ্যে অর্থগত সাদৃশ্য বা কাছাকাছি অর্থের সম্পর্ক থাকলে তাকে সমার্থকতা বলে।

উদাহরণ

শব্দসমার্থক শব্দ
আকাশগগন, ব্যোম, অন্তরীক্ষ
সূর্যরবি, আদিত্য, ভানু
চোখচক্ষু, নয়ন, নেত্র
পর্বতপাহাড়, গিরি, শৈল
মামাতা, জননী
নদীতটিনী, সরিৎ
ঘোড়াঅশ্ব, ঘোটক
আনন্দহর্ষ, পুলক
বনঅরণ্য, কানন, বিপিন

সমার্থক শব্দের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য

দুটি শব্দ সমার্থক হলেও সব সময় তারা প্রত্যেক প্রসঙ্গে পরস্পরের সম্পূর্ণ বিকল্প হয় না।

যেমন—

জল ও পানি অর্থের দিক থেকে কাছাকাছি হলেও তাদের ব্যবহারিক ক্ষেত্র ও ভাষারীতি এক নয়।

আবার—

মৃত্যু, মরণ, প্রয়াণ, দেহত্যাগ, নিধন

এই শব্দগুলির মূল অর্থ কাছাকাছি হলেও তাদের আবেগ, প্রয়োগ ও তাৎপর্য এক নয়।


১০. বিপরীতার্থকতা

দুই বা ততোধিক শব্দের মধ্যে অর্থগত বৈপরীত্য থাকলে তাকে বিপরীতার্থকতা বলে।

বিভিন্নভাবে বিপরীতার্থক শব্দ তৈরি হয়

ক) উপসর্গের সাহায্যে

  • ইচ্ছুক — অনিচ্ছুক
  • আবশ্যক — অনাবশ্যক
  • অভিজ্ঞ — অনভিজ্ঞ
  • শান্তি — অশান্তি
  • আত্মীয় — অনাত্মীয়

খ) বিপরীতার্থক উপসর্গের সাহায্যে

  • সক্ষম — অক্ষম
  • সবল — দুর্বল
  • সসীম — অসীম
  • সচল — অচল
  • সঠিক — বেঠিক

গ) সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দের মাধ্যমে

  • ভালো — মন্দ
  • সুখ — দুঃখ
  • আলো — অন্ধকার
  • দিন — রাত
  • জীবন — মৃত্যু
  • অগ্রজ — অনুজ
  • উত্তর — দক্ষিণ

১১. ব্যাপকার্থকতা বা অর্থান্তরভুক্তি

একটি শব্দের অর্থ যখন অন্য একটি বা একাধিক শব্দের অর্থকে নিজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে, তখন সেই সম্পর্ককে ব্যাপকার্থকতা বা অর্থান্তরভুক্তি বলে।

উদাহরণ

ফুল → গোলাপ, জবা, পদ্ম, জুঁই

এখানে ‘ফুল’ একটি ব্যাপক অর্থের শব্দ; ‘গোলাপ’, ‘জবা’, ‘পদ্ম’, ‘জুঁই’ তার অন্তর্ভুক্ত।

আবার—

ফল → আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা

পাখি → কাক, চড়ুই, ময়ূর, কোকিল

রং → লাল, নীল, হলুদ, সবুজ

আসবাবপত্র → টেবিল, চেয়ার, খাট, আলমারি

এখানে ব্যাপক অর্থের শব্দের মধ্যে অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ অর্থের শব্দগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অধিনাম ও উপনাম

ব্যাপকার্থকতার ক্ষেত্রে—

ব্যাপকতর অর্থের শব্দকে — অধিনাম
অন্তর্ভুক্ত সংকীর্ণ অর্থের শব্দকে — উপনাম

যেমন—

ফুল → গোলাপ

এখানে—

ফুল — অধিনাম
গোলাপ — উপনাম


১২. থিসরাস

Thesaurus শব্দটির অর্থ রত্নাগার বা ভাণ্ডার। অর্থ-সম্পর্কের ভিত্তিতে শব্দগুলিকে সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত করা গ্রন্থকে থিসরাস বলা হয়।

সাধারণ অভিধানে শব্দ সাধারণত বর্ণানুক্রমে সাজানো হয়। কিন্তু থিসরাসে শব্দগুলি অর্থ, ভাব বা বিষয়ের সম্পর্ক অনুযায়ী সাজানো থাকে।

অভিধান ও থিসরাসের পার্থক্য

অভিধান :
শব্দ → অর্থ

থিসরাস :
অর্থ/ভাব → সংশ্লিষ্ট শব্দসমূহ

যেমন ‘ফুল’ ধারণাটির সঙ্গে সম্পর্কিত—

গোলাপ, জবা, পদ্ম, জুঁই, টগর, বেলি ইত্যাদি শব্দ একত্রে পাওয়া যেতে পারে।

সংস্কৃত ভাষার ‘অমরকোষ’ একটি প্রাচীন থিসরাসধর্মী গ্রন্থ। আধুনিক যুগে Peter Mark Roget-এর Roget’s Thesaurus বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।


১৩. প্রয়োগতত্ত্ব

ভাষা শুধু শব্দ ও বাক্যের সমষ্টি নয়। বাস্তব জীবনে ভাষা ব্যবহারের সময় বক্তা, শ্রোতা, পরিস্থিতি, সামাজিক সম্পর্ক, স্থান-কাল, পূর্বজ্ঞান ইত্যাদি নানা বিষয় অর্থ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভাষার এই ব্যবহারিক ও প্রসঙ্গনির্ভর অর্থ নিয়ে যে আলোচনা করা হয়, তাকে প্রয়োগতত্ত্ব বলা হয়।

উদাহরণ

কেউ যদি বলে—

‘দরজাটা খোলা।’

এটি আপাতভাবে একটি বিবৃতিবাক্য। কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতে এই বাক্যটি আসলে ‘দরজাটা বন্ধ করো’—এই অনুরোধের অর্থও প্রকাশ করতে পারে।

আবার—

প্রশ্ন : কটা বাজে?
উত্তর : রবি তো বাড়ি এসে গেছে।

শুধু শব্দের অর্থ দিয়ে এই উত্তরটি প্রশ্নের সঙ্গে অসংলগ্ন মনে হবে। কিন্তু যদি বক্তা ও শ্রোতা দুজনেই জানেন যে রবি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ি ফেরে, তাহলে ‘রবি বাড়ি এসে গেছে’ কথাটিই সময়ের একটি অর্থবহ উত্তর হয়ে উঠতে পারে।

অতএব, ভাষার অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ


১৪. শব্দার্থের পরিবর্তন

ভাষা পরিবর্তনশীল। সমাজ, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, জীবনযাত্রা ও চিন্তাধারার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের অর্থও পরিবর্তিত হয়।

শব্দার্থের পরিবর্তনকে প্রধানত তিন ভাগে আলোচনা করা যায়—

১. শব্দার্থের প্রসার
২. শব্দার্থের সংকোচ
৩. শব্দার্থের রূপান্তর বা সংশ্লেষ


১৪.১ শব্দার্থের প্রসার

কোনো শব্দের পূর্বতন অর্থের সঙ্গে যখন নতুন অর্থ যুক্ত হয় এবং শব্দটির অর্থের পরিসর বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে শব্দার্থের প্রসার বলে।

উদাহরণ

কালি
প্রথমে মূলত কালো রঙের তরল পদার্থ বোঝাত। বর্তমানে বিভিন্ন রঙের লেখার তরল পদার্থকেও কালি বলা হয়।

কুমোর
আদি অর্থে কুম্ভ বা কলসি প্রস্তুতকারী বোঝালেও বর্তমানে মাটির বিভিন্ন জিনিস প্রস্তুতকারীকেও কুমোর বলা হয়।

অর্থাৎ পূর্বের অর্থের সঙ্গে নতুন অর্থ যুক্ত হয়ে শব্দটির অর্থের পরিসর বৃদ্ধি পেয়েছে।


১৪.২ শব্দার্থের সংকোচ

কোনো শব্দের আদি অর্থের তুলনায় পরবর্তীকালের অর্থের পরিসর কমে গেলে তাকে শব্দার্থের সংকোচ বলে।

উদাহরণ

অন্ন
আদি অর্থে খাদ্য বোঝালেও বর্তমানে প্রধানত ভাত অর্থে ব্যবহৃত হয়।

মৃগ
আদি অর্থে বন্য জন্তু বোঝাত; বর্তমানে প্রধানত হরিণ অর্থে ব্যবহৃত হয়।

মুনিশ
আদি অর্থে মানুষ বা মনুষ্য অর্থে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে মূলত শ্রমিক বা মজুর অর্থে ব্যবহৃত হয়।


১৪.৩ শব্দার্থের রূপান্তর বা সংশ্লেষ

কোনো শব্দের আদি অর্থ থেকে পরবর্তীকালে এমন নতুন অর্থের সৃষ্টি হলে, যার সঙ্গে আদি অর্থের সরাসরি সম্পর্ক সহজে বোঝা যায় না, তাকে শব্দার্থের রূপান্তর বা সংশ্লেষ বলে।

উদাহরণ

উজবুক
আদি অর্থে উজবেগ জাতির মানুষ; বর্তমানে বোকা বা নির্বোধ ব্যক্তি।

সহসা
আদি অর্থে ‘সবলে’; বর্তমানে ‘হঠাৎ’ বা ‘আকস্মিকভাবে’।

গোষ্ঠী
আদি অর্থে গবাদি পশুর থাকার স্থান; বর্তমানে দল বা সমষ্টি।

কলম
আদি অর্থে শর বা খাগজাতীয় লেখার উপকরণ; বর্তমানে লেখনী।

গবেষণা
আদি অর্থের সঙ্গে ‘গরু খোঁজা’র সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে এর অর্থ কোনো বিষয়ের নিয়মবদ্ধ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ।

দারুণ
আদি অর্থের সঙ্গে দারু বা কাঠের সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে ‘অত্যন্ত’, ‘প্রচণ্ড’ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়।


একনজরে শব্দার্থতত্ত্ব

শব্দার্থতত্ত্বের ইংরেজি পরিভাষা : Semantics

শব্দার্থতত্ত্বের আলোচ্য : ভাষার অর্থবহ এককের অর্থ ও অর্থগত সম্পর্ক।

শব্দার্থের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা : সাধারণ অর্থ ও নিদর্শন।

সাধারণ অর্থ : শব্দের সঙ্গে শব্দের অর্থগত সম্পর্ক।

নিদর্শন : শব্দ ও নির্দেশিত বস্তু/বিষয়ের সম্পর্ক।

ঐতিহাসিক শব্দার্থতত্ত্ব : সময়ের সঙ্গে শব্দের অর্থের পরিবর্তনের আলোচনা।

উপাদানমূলক তত্ত্ব : শব্দের অর্থকে ক্ষুদ্র অর্থ-উপাদানে বিশ্লেষণ।

সত্যসাপেক্ষ তত্ত্ব : বাক্যের অর্থ ও সত্য-মিথ্যার সম্পর্কের আলোচনা।

বিষয়মূলক তত্ত্ব : প্রসঙ্গ বা পরিপ্রেক্ষিতের ভিত্তিতে অর্থের বিশ্লেষণ।

সমার্থকতা : অর্থগত সাদৃশ্য।

বিপরীতার্থকতা : অর্থগত বৈপরীত্য।

ব্যাপকার্থকতা : একটি শব্দের অর্থের মধ্যে অন্য শব্দের অর্থ অন্তর্ভুক্ত থাকা।

অধিনাম : ব্যাপকতর অর্থের শব্দ।

উপনাম : অধিনামের অন্তর্ভুক্ত সংকীর্ণ অর্থের শব্দ।

থিসরাস : অর্থ বা বিষয়ের সম্পর্ক অনুসারে শব্দের ভাণ্ডার।

প্রয়োগতত্ত্ব : বাস্তব পরিস্থিতি ও ভাষাব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ নির্ধারণের আলোচনা।

শব্দার্থের প্রসার : অর্থের পরিসর বৃদ্ধি।

শব্দার্থের সংকোচ : অর্থের পরিসর হ্রাস।

শব্দার্থের রূপান্তর : আদি অর্থ থেকে অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী নতুন অর্থের সৃষ্টি।


প্রশ্নোত্তর

১। শব্দার্থতত্ত্ব কাকে বলে?

উত্তর— ভাষাবিজ্ঞানের যে শাখায় ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ ও অন্যান্য অর্থবহ ভাষিক এককের অর্থ, অর্থগত সম্পর্ক, ব্যবহার এবং অর্থের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে শব্দার্থতত্ত্ব বলে।


২। শব্দার্থতত্ত্বের ইংরেজি পরিভাষা কী?

উত্তর— শব্দার্থতত্ত্বের ইংরেজি পরিভাষা Semantics


৩। নিদর্শন কাকে বলে?

উত্তর— কোনো শব্দ যে বস্তু, ব্যক্তি, প্রাণী বা বিষয়কে নির্দেশ করে, সেই নির্দেশিত সত্তার সঙ্গে শব্দটির যে সম্পর্ক, তাকে নিদর্শন বলে।


৪। সব শব্দের কি নিদর্শন থাকে?

উত্তর— না। সব শব্দের নিদর্শন থাকে না। যেমন—‘এবং’, ‘কিন্তু’, ‘অথবা’, ‘অতএব’ ইত্যাদি শব্দের অর্থ আছে, কিন্তু এগুলি কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা ব্যক্তিকে নির্দেশ করে না।


৫। উপাদানমূলক তত্ত্ব কী?

উত্তর— শব্দের অর্থকে কয়েকটি ক্ষুদ্র অর্থ-উপাদানে বিশ্লেষণ করার তত্ত্বকে উপাদানমূলক তত্ত্ব বলে।


৬। সত্যসাপেক্ষ তত্ত্ব কী?

উত্তর— বাক্যের অর্থকে তার সত্য বা মিথ্যা হওয়া এবং বাস্তব জগতের ঘটনার সঙ্গে তার সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করার তত্ত্বকে সত্যসাপেক্ষ তত্ত্ব বলে।


৭। বিষয়মূলক তত্ত্ব কী?

উত্তর— ভাষার অর্থ নির্ধারণে প্রসঙ্গ বা পরিপ্রেক্ষিতের গুরুত্বকে প্রধান করে যে তত্ত্ব, তাকে বিষয়মূলক তত্ত্ব বলে।


৮। সমার্থকতা কাকে বলে?

উত্তর— দুই বা ততোধিক শব্দের মধ্যে অর্থগত সাদৃশ্য বা কাছাকাছি অর্থের সম্পর্ক থাকলে তাকে সমার্থকতা বলে।

উদাহরণ :
আকাশ—গগন, ব্যোম।
সূর্য—রবি, আদিত্য।


৯। বিপরীতার্থকতা কাকে বলে?

উত্তর— দুই বা ততোধিক শব্দের মধ্যে অর্থগত বৈপরীত্যের সম্পর্ক থাকলে তাকে বিপরীতার্থকতা বলে।

উদাহরণ :
সুখ—দুঃখ, আলো—অন্ধকার, দিন—রাত।


১০। ব্যাপকার্থকতা কাকে বলে?

উত্তর— একটি শব্দের অর্থের মধ্যে অন্য একটি বা একাধিক শব্দের অর্থ অন্তর্ভুক্ত থাকলে তাকে ব্যাপকার্থকতা বা অর্থান্তরভুক্তি বলে।

উদাহরণ :
ফুল—গোলাপ।
এখানে ‘ফুল’ অধিনাম এবং ‘গোলাপ’ উপনাম।


১১। অধিনাম কাকে বলে?

উত্তর— ব্যাপকার্থকতার ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ব্যাপক অর্থযুক্ত শব্দকে অধিনাম বলে।

উদাহরণ : ‘ফুল’ শব্দটি ‘গোলাপ’-এর অধিনাম।


১২। উপনাম কাকে বলে?

উত্তর— ব্যাপকতর অর্থের শব্দের অন্তর্ভুক্ত অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ অর্থযুক্ত শব্দকে উপনাম বলে।

উদাহরণ : ‘গোলাপ’ শব্দটি ‘ফুল’-এর উপনাম।


১৩। থিসরাস কী?

উত্তর— অর্থ বা বিষয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসারে শব্দগুলিকে সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত করা রেফারেন্স গ্রন্থকে থিসরাস বলে।


১৪। থিসরাসের সঙ্গে অভিধানের পার্থক্য কী?

উত্তর— অভিধানে সাধারণত শব্দ বর্ণানুক্রমে সাজানো হয় এবং তার অর্থ দেওয়া হয়। কিন্তু থিসরাসে শব্দগুলি অর্থ, ভাব বা বিষয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসারে গুচ্ছবদ্ধ থাকে।


১৫। প্রয়োগতত্ত্ব কী?

উত্তর— বাস্তব সামাজিক ও ভাষিক পরিস্থিতিতে ভাষার ব্যবহার কীভাবে অর্থ নির্মাণে প্রভাব ফেলে, তার আলোচনা প্রয়োগতত্ত্বের অন্তর্গত।


১৬। শব্দার্থের প্রসার কী?

উত্তর— কোনো শব্দের পূর্বতন অর্থের সঙ্গে নতুন অর্থ যুক্ত হয়ে যখন তার অর্থের পরিসর বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে শব্দার্থের প্রসার বলে।


১৭। শব্দার্থের সংকোচ কী?

উত্তর— কোনো শব্দের আদি অর্থের তুলনায় পরবর্তীকালের অর্থের পরিসর কমে গেলে তাকে শব্দার্থের সংকোচ বলে।


১৮। শব্দার্থের রূপান্তর বা সংশ্লেষ কী?

উত্তর— কোনো শব্দের অর্থ এমনভাবে পরিবর্তিত হলে যে তার আদি অর্থের সঙ্গে বর্তমান অর্থের সরাসরি সম্পর্ক সহজে বোঝা যায় না, তাকে শব্দার্থের রূপান্তর বা সংশ্লেষ বলে।


১৯। শব্দার্থের পরিবর্তন কত প্রকার?

উত্তর— শব্দার্থের পরিবর্তন প্রধানত তিন প্রকার—

১. শব্দার্থের প্রসার
২. শব্দার্থের সংকোচ
৩. শব্দার্থের রূপান্তর বা সংশ্লেষ।


২০। ‘গবেষণা’ শব্দটি শব্দার্থের পরিবর্তনের কোন্ দৃষ্টান্ত?

উত্তর— ‘গবেষণা’ শব্দটি শব্দার্থের রূপান্তর বা সংশ্লেষের দৃষ্টান্ত। এর আদি অর্থের সঙ্গে গরু খোঁজার ধারণা যুক্ত থাকলেও বর্তমানে গবেষণা বলতে কোনো বিষয়ের নিয়মবদ্ধ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণকে বোঝায়।


২১। ‘অন্ন’ শব্দটি শব্দার্থের পরিবর্তনের কোন্ দৃষ্টান্ত?

উত্তর— ‘অন্ন’ শব্দটি শব্দার্থের সংকোচের দৃষ্টান্ত। আদি অর্থে ‘অন্ন’ বলতে খাদ্য বোঝালেও বর্তমানে প্রধানত ভাত অর্থে ব্যবহৃত হয়।


২২। ‘কালি’ শব্দটি শব্দার্থের পরিবর্তনের কোন্ দৃষ্টান্ত?

উত্তর— ‘কালি’ শব্দটি শব্দার্থের প্রসারের দৃষ্টান্ত। আগে প্রধানত কালো রঙের লেখার তরল পদার্থ বোঝালেও বর্তমানে বিভিন্ন রঙের লেখার তরল পদার্থকেও কালি বলা হয়।


পরীক্ষার জন্য মনে রাখার সূত্র

অর্থের সাদৃশ্য → সমার্থকতা
অর্থের বৈপরীত্য → বিপরীতার্থকতা
ব্যাপক অর্থের মধ্যে সংকীর্ণ অর্থ → ব্যাপকার্থকতা
ব্যাপক শব্দ → অধিনাম
সংকীর্ণ অন্তর্ভুক্ত শব্দ → উপনাম
অর্থের ভাণ্ডার → থিসরাস
প্রসঙ্গনির্ভর অর্থ → বিষয়মূলক তত্ত্ব
সত্য-মিথ্যার ভিত্তিতে অর্থ → সত্যসাপেক্ষ তত্ত্ব
ক্ষুদ্র অর্থ-উপাদানে বিশ্লেষণ → উপাদানমূলক তত্ত্ব
অর্থের পরিসর বাড়ে → প্রসার
অর্থের পরিসর কমে → সংকোচ
আদি অর্থ থেকে নতুন অর্থে দূরবর্তী পরিবর্তন → রূপান্তর/সংশ্লেষ

### পরিবেশনে- ড. অনিশ রায়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top