কলমে – অনিশ রায়
‘রুগ্ন কবির চিঠি’ কথাটা প্রথমেই বিশেষ একপ্রকার প্রত্যাশা তৈরি করে। ‘রুগ্ন’—অর্থাৎ ক্ষয়, অসুস্থতা, গ্লানি, ব্যর্থতা, শারীরিক বিপর্যয়; আর ‘চিঠি’— ব্যক্তিগত সম্বোধন, অন্তরঙ্গতা, একান্ত উচ্চারণে আত্মকথনের ব্যক্তিগত মাধ্যম। এই দুই শব্দ মিলে এমন একটি কাব্যিক পরিসরের সম্ভাবনা তৈরি করে যেখানে একজন কবি নিজের রুগ্নতা থেকে অন্য একজন মানুষের দিকে তাকাবেন, এবং সেই তাকানোয় ব্যক্তিগত অনুভব, ইতিহাস ও অস্তিত্বের কোনো অনির্দেশ্য সত্য আবিষ্কৃত হবে। কিন্তু কবিতাটি পড়তে পড়তে দেখা যায়, ‘রুগ্নতা’ এখানে আত্মসমীক্ষার কোনো গভীর অঞ্চল নয়, আত্মগ্লানিরও নয়, শারীরিক শ্রান্তি তো নয়ই; বরং প্রশস্তির জন্য নির্মিত বিশেষ নাটকীয় অবস্থান। আর ‘চিঠি’ ব্যক্তিগত সংলাপের পরিবর্তে এক ধরনের প্রকাশ্য অভিষিক্তকরণের দৃষ্টিগ্রাহ্য লিপির আয়োজন। কবিতার ‘আমি’ ক্রমশ নিজের মর্যাদা হ্রাস করতে থাকেন (যদিও ডিফেন্সিভ মেকানিজমের ভঙ্গিতে), আর ‘তুমি’ ক্রমশ মানবিক সীমা অতিক্রম করে মহাজাগতিক সত্তায় উন্নীত হয়। এই ঊর্ধ্বগমনের শেষ পরিণতিতে কবিতার প্রয়াস-ধন্য পত্রটি কোনোভাবেই কবিতা হয়ে ওঠে কিনা, তা সত্যিই ভাবার বিষয়। কিন্তু নিঃসন্দেহে তা হয়ে ওঠে এক ধরনের নন্দনতাত্ত্বিক বৈভবসমৃদ্ধ দরবারি ভাষ্য—যেখানে একজন বক্তা নিজের কণ্ঠকে আত্মতৃপ্তির আবেশে নত করে, অন্য একজনকে মহিমার সিংহাসনে বসিয়ে রাখতে চান।
এই রচনার মৌলিক সমস্যা তাই কোনো দুর্বল কবিতাপ্রয়াস নয়; আরও গুরুতর কিছু। সমস্যা হলো, প্রশস্তিকে কবিতার নন্দনতত্ত্ব দিয়ে বৈধতা দেওয়ার শিল্পিত সম্পাদন। এখানে ভাষা অনুভবের অনুসারী নয়, উদ্দেশ্যের সহযোগী। সহজেই অনুমেয় যে, এখানে উপমা-রূপক গভীর অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় না; বরং একটি পূর্বনির্ধারিত মহিমা নির্মাণের কাজেই নিযুক্ত হতে থাকে। লেখাটি যেন প্রথমেই উদ্দেশ্য স্থির করে রেখেছে যে, উল্লেখিত ‘তুমি’-কে ঠিক কোথায় পৌঁছে দিতে হবে। তারপর পৃথিবী, গ্যালাক্সি, ব্রহ্মাণ্ড, সুপারনোভা, আদিম মানুষ, অধিকার, নির্বাসন, নারীমুক্তি—এই সমস্ত বিশাল সাংস্কৃতিক ও মহাজাগতিক শব্দভাণ্ডারকে সেই আরোহণের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে কবিতার সমস্ত দিগন্ত শেষপর্যন্ত একজন ব্যক্তির দিকে এসে সংকুচিত হয়ে পড়ে। মহাবিশ্ব এখানে মহাবিশ্বই থাকে না; নিশ্চিতভাবে একজনের মহিমা মাপার যন্ত্র হয়ে ওঠে। আদিম মানবসভ্যতার ইতিহাস এখানে ইতিহাস নয়; একজনের রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতার যেন প্রাচীনতম মূল্যমান। নারীমুক্তির ইতিহাসও নারীচেতনার ভাবনায় জারিত নয়; হয়ে যায় ‘তুমি’ বলা নারীর ব্যক্তিগত মহত্ত্বের প্রাতিষ্ঠানিক-কণ্ঠস্বীকৃত সাংস্কৃতিক সার্টিফিকেট। নির্বাসন এখানে নির্বাসিত মানুষের শিকড়া-হারানো নিঃসঙ্গ পদক্ষেপকে অন্তর্ভুক্ত করে না: কেবল ‘তুমি’-কে মহিমান্বিত করার নৈবেদ্য হয়ে ওঠে, যা বিশেষ্য-বিশেষণ আর ক্রিয়ার স্তূপকেই ক্রমশ জমিয়ে তোলে।
এই কৌশল বোঝার জন্য কবিতার মাত্র কয়েকটি উচ্চারণই যথেষ্ট। ‘তুমি’ প্রথমে পৃথিবীর সীমা অতিক্রম করে গ্যালাক্সির দিকে চলে যায়; ব্রহ্মাণ্ডের অগ্নি, সুপারনোভার বিস্ফোরণ এসে তার শরীরে মিশে যায়। তারপর মৃত্তিকা, বসুন্ধরা, ধরিত্রী, নারী, ভাষার আদিম আর্কিটাইপ—সবকিছু একে একে তার সঙ্গে সংযুক্ত হয়। এ এক ধরনের রেটরিক্যাল অ্যাপোথিওসিস—মানুষকে দেবত্বে উন্নীত করার সেই অতি ব্যবহৃত হওয়া ভাষিক অনুষ্ঠান। যদিও এই স্বাভাবিক সমস্যা চিরকালই একটা উৎপাত তৈরি করে: কারণ দেবত্বের দিকে যত এগোনো হয়, মানুষ তত অদৃশ্য হয়। যে ‘তুমি’কে নিয়ে কবিতা লেখা হচ্ছে, তার কোনো নির্দিষ্ট মানবিক অভিজ্ঞতা, দ্বন্দ্ব, সীমাবদ্ধতা, নৈতিক জটিলতা বা অন্তর্গত বিরোধ আমরা একবারও দেখতে পাই না। পাই কেবল অভিধা। আর অভিধার পর অভিধা। আরও একটু বেশি হলে ক্ষতি কী— এই জাতীয় আয়েশে কখনো আবার একপ্রকার লক্ষণা।
একজন মানুষকে সরাসরি ‘মহৎ’ বলার চেয়ে, তাকে এমন দৃশ্যের মধ্যে স্থাপন করা অনেক বেশি কবিতাময় হতে পারে বলে মনে করি—যেখানে তার মহত্ত্ব পাঠক নিজে আবিষ্কার করে নেবেন বা হয়তো করতে পারবেন। এখানে সেই আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই; কবিতা পাঠকের হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। পাঠককে বলা হচ্ছে—এই মানুষটি মহৎ, সাহসী, নির্বাসনাতীত, আদিম অধিকারের ধারক, নারীমুক্তির উত্তরাধিকারী, মহাবিশ্বের নাগরিক। অর্থাৎ পাঠকের কল্পনাশক্তির কাছে কবি তার বক্তব্যকে সুরক্ষিত বলেই মনে করেননি, তাই পাঠকের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করার পরিবর্তে কবিতাটি পাঠকের বিচারবোধের জায়গাটির উপর নিজের ‘প্রভাবশালী’ ভূমিকাটি অক্ষুণ্ণ রাখে। ফলত ঘোষণার যথাযথ প্রচারের দিকেই আমরা কান রাখতে পেরেছি, আর তো তেমন কিছু করার নেই আমাদের! সায় দিতেও পারি, না-ও দিতে পারি। ব্যস…। সেইটুকুই যা করছি।
প্রচারপত্র এবং কবিতার পার্থক্য রাজনৈতিক মতাদর্শে নয়, ভাষার স্বাধীনতায় কার্যকরী হয়। প্রচার আগে সিদ্ধান্ত নেয়, পরে তার পক্ষে ভাষা খোঁজে। কবিতা বরং ভাষার মধ্যে প্রবেশ করে এমন এক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করে, যেখানে বহু-সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচিত হতে পারে। এই কবিতাপ্রয়াসে সেই অনিশ্চয়তা আমি অন্তত খুঁজে পাইনি। ‘তুমি’ সম্পর্কে কবির রায় শুরুর আগেই চূড়ান্ত। ফলে কবিতার অন্তর্গত ভাবদ্বন্দ্বের ভরকেন্দ্রই সুস্থিত হলো কোথায়, সেটা দেখা সম্ভব হলো না। ফলে আত্মগত সংশয়ের প্রশ্নই ওঠে না; তাহলে কি কোনো বিপজ্জনক শিল্পনৈতিক মুহূর্ত? যখন কবি নিজের ভালোবাসার মানুষটির বিরুদ্ধেও সত্যের পক্ষে দাঁড়াবেন, অন্তত একবার। সেইদিকটাও কোনো অনুসন্ধানী নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন৷ বরং বক্তা নিজেকে ক্রমাগত ছোটো করছেন, যাতে সম্বোধিত ব্যক্তির উচ্চতা আরও বেশি দৃশ্যমান হয়। চেনা শরৎচন্দ্রীয় ভঙ্গি (তাতে অবশ্য শরৎচন্দ্র আপন শিল্পদক্ষতায় আজও আমাদের অবনত করার সক্ষমতা রাখেন)৷
“আমি তো ব্যর্থ কবি একজন”—এই আত্মঘোষণা সেই কৌশলের কেন্দ্রে। প্রতিদিনের দৃষ্টিতে নিশ্চয়ই বিনয়। আজকের সমাজদৃষ্টিতে তো অবশ্যই। কিন্তু শিল্পে বিনয় আর আত্ম-অবমাননার শিল্পিত ভান কি একেবারে অদেখা থাকতে পারে? এখানে ‘আমি ব্যর্থ’, ‘আমার লেখা শেষ’, ‘এই ভাঙা শরীরে ফার্নেসে শোবো’—এই আত্মবিলাপের ভাষা আসলে অন্য একজনের মহিমা নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। তার সঙ্গে নিজেরও নয় কি? সমান্তরাল বিপ্রতীপে? বক্তা নিজের কবিসত্তাকে প্রায় আত্মাহুতিই দিয়ে ফেলেছেন, যাতে ‘তুমি’-র পাদদেশে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট হয়। আর সেই আত্মাহুতির চূড়ান্ত চিত্র—“শেষ আগুনটি জ্বলামাত্রই তা দিয়ে তোমার চিরসাহসের চরণ ধোয়াব”—কবিতার প্রকৃত রাজনৈতিক ও নন্দনতাত্ত্বিক চরিত্রকে অনাবৃত করে দেয় বলেই মনে হয়। তা আর কোনো সূক্ষ্ম রূপক থাকতে পারে না; সরাসরি দরবারি ভক্তির ভাষার রূপ ধারণ করে। ‘চরণ ধোয়া’ আমাদের সাংস্কৃতিক কল্পনায় ভক্তি, আত্মসমর্পণ ও গুরুপূজার দীর্ঘ ঐতিহ্য বহন করে। সেই চরণধৌতিকে যখন আধুনিক কবিতার ভাষায়, ‘ফার্নেস’, ‘আগুন’, ‘চিরসাহস’, ‘মহাবিশ্ব’ ইত্যাদির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তখন ভক্তির পুরোনো কাঠামোটিই মাত্র আরেকটু কালচারাল প্রসাধন পায়—এর বাইরে কোনো ভাব জাগাতে পারে না। কিন্তু তাতেও ক্ষমতার মুখদর্শী সম্পর্কচিত্রটি একেবারেই বদলায় না।
এইখানেই ‘তৈলদান’-এর প্রকৃত রূপটি ধরা পড়ে। তৈলদান কখনও কেবল প্রশংসা নয়। তৈলদান হলো অন্যের মহিমা নির্মাণের বিনিময়ে নিজের অবস্থান নির্ধারণের একটি ক্ষমতাকৌশল। যে প্রশংসা প্রকাশ্যে উচ্চারিত হচ্ছে, তার ভিতরে আরেক সম্পর্কও প্রকাশিত হচ্ছে—কে কাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, কে কাকে মহৎ ঘোষণা করার অধিকার রাখছে, কে কার সামনে নিজের কণ্ঠ নত করছে। এই কবিতায় বক্তা নিজের ব্যর্থতা, ক্ষয়, আসন্ন মৃত্যু ও ভগ্ন শরীরকে সামনে এনে সেই ক্ষমতার বিন্যাসকে আবেগময় করে তুলেছেন। ফলে ‘তুমি’ শুধু একজন মানুষ নন; তিনি হয়ে উঠেছেন এমন এক কেন্দ্র, যার সামনে বক্তার আত্ম-অবমাননাও পবিত্রতার রূপ নেয়। এখানে কবিতার ব্যক্তিগত সম্বোধন আসলে প্রকাশ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এ কারণেই এই রচনাকে নিছক ব্যক্তিগত আবেগের পত্র হিসেবে পড়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এর সমস্ত উপকরণ প্রকাশ্য সাংস্কৃতিক অভিধান থেকে নেওয়া। সিমোন দ্য বোভোয়ারের নাম আসে; আসে আদিম মানুষের অধিকার; আসে নির্বাসন; আসে মহাবিশ্ব। এইসব নাম ও ধারণার প্রত্যেকটির নিজস্ব ঐতিহাসিক ভার আছে। কবিতার কাজই হলো সেই ভারের সঙ্গে লড়াই করা। কিন্তু এখানে তারা মূলত আলংকারিক কর্তৃত্ব তৈরি করছে। সিমোন দ্য বোভোয়ার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। “তুমি তো নতুন সিমন দ্য বোভোয়া”—এই উচ্চারণে ভাবনার অস্তিত্ববাদকে বিচ্ছুরণের জন্য অপর কোনো শব্দই বিশেষ অন্বয়ে সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠে না, বরং নামটি সাংস্কৃতিক ব্যাজ হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে কেবল। ফলে এই বৃদ্ধিবৃত্তিকতা বিশেষ চিহ্ন আনতে চাইলেও, চিন্তার আভ্যন্তরীণ সংঘাত সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়।
‘আদিমের অধিকার’ প্রসঙ্গটিও একই কারণে সমস্যাজনক। ভাষা ও শব্দের পূর্বে শিশুর কান্না, গোঙানি, চিৎকার—এগুলিকে মানবিক অধিকারের আদিম প্রকাশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ধারণাটি নিশ্চয়ই শক্তিশালী। কিন্তু কবিতাটি সেই সম্ভাবনার পথে পা বাড়ায় না। তাৎক্ষণিকভাবে সেই আদিম আর্তিকে সম্বোধিত ব্যক্তির রাজনৈতিক মহিমার প্রমাণে পরিণত করে। একে শুধু বৌদ্ধিক সরলীকরণ ছাড়া আর কী বলা যায়? এর মধ্যে কি এক ধরনের মহিমান্বিত আত্মকেন্দ্রিকতাও কাজ করছে না?
আর মহাবিশ্বের ব্যবহার? “এ-ব্রহ্মাণ্ড তোমার এলাকা”—এই ধরনের উচ্চারণের মধ্যে যে অতিরঞ্জন আছে, তা নিছক কাব্যিক hyperbole(মূল উদ্দেশ্য সত্য দাবি করা নয়, অতিরঞ্জনের মাধ্যমে অর্থ বা আবেগকে তীব্র করা) হিসেবে মেনে নেওয়া যেত, যদি তার সঙ্গে কোনো-না-কোনো অস্তিত্বগত বৈপরীত্য তৈরি হতো। কিন্তু এখানে অতিরঞ্জনই বক্তব্য। মহাবিশ্বের বিস্তার ‘তুমি’-র বিস্তারকে বৈধতা দেয়। “কে তোমাকে দেবে বহিষ্কারের আদেশ?”— আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে নির্বাসন আর রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; মহাজাগতিক নাগরিকত্বের সমস্যা। পৃথিবী যদি তোমার না-ও হয়, মহাবিশ্ব তোমার; অতএব কোনো রাষ্ট্র, সমাজ বা ইতিহাস তোমাকে নির্বাসিত করতে পারে না। শুনতে চমৎকার। কিন্তু কবিতার সমস্যা এখানেই—চমৎকার শোনার সঙ্গে সত্যের দাম্পত্য খুব পেলব বা মসৃণ নয়। ইতিহাসে নির্বাসন হলো ক্ষমতার এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। সেই বাস্তবতাকে মহাবিশ্বের রোমান্টিক নাগরিকত্ব দিয়ে অতিক্রম করা যায় না। বরং এতে নির্বাসনের রাজনৈতিক বাস্তবতাই নরম হয়ে যায়। ‘নির্বাসিতা’ তখন আর যন্ত্রণার পরিচয় লাভ করে না; হয়ে ওঠে এক মহিমান্বিত পরিচয়। যে মানুষকে বাস্তব ক্ষমতা বহিষ্কার করতে পারে, তাকে মহাবিশ্বে পুনর্বাসিত করে কবিতা যেন সেই ক্ষমতার হিংস্রতাকে প্রতিহত করছে— দেখতে এমন লাগলেও, বাস্তবে আসলে ব্যক্তিপূজার পৌরাণিক আবহকেই নির্মাণ করা হচ্ছে।
এইখানেই রাজনৈতিক কবিতার সঙ্গে রাজনৈতিক রোমান্টিসিজমের পার্থক্য। রাজনৈতিক কবিতা ক্ষমতার বাস্তব রূপকে দৃশ্যমান করে; রাজনৈতিক রোমান্টিসিজম ক্ষমতার বিরুদ্ধে নিজের নায়ককে মিথে পরিণত করে। প্রথমটি পাঠককে সচেতন করে, দ্বিতীয়টি পাঠককে ভক্ত করে। এই কবিতাটি দ্বিতীয়টির দিকে ঝুঁকে যায়। আর ভক্তি যখন আধুনিক ভাষার ভিতর প্রবেশ করে, তখন তা আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে; কারণ তার পুরোনো ধর্মীয় চেহারা থাকে না। ‘চরণ ধোয়া’ সরাসরি ভক্তির ভাষা; কিন্তু ‘সুপারনোভা’, ‘গ্যালাক্সি’, ‘আত্মজীবনী’, ‘সিমোন দ্য বোভোয়ার’, ‘অধিকার’, ‘নির্বাসন’ ইত্যাদির সঙ্গে মিশে গেলে তা আধুনিক বুদ্ধিজীবীর নব্য-সংস্কৃতির ভাষা হয়ে ওঠে। ফলে পাঠক সহজে বুঝতে পারেন না যে, রচনার ভিতরের কাঠামোটি আসলে কতটা প্রাচীন—রাজাকে মহিমান্বিত করা দরবারি কবিতার কাঠামোই এখানে একুশ শতকীয় শব্দভাণ্ডারে পুনর্লিখিত।
এ কারণেই এই কবিতাপ্রয়াসকে কেবল শৈল্পিক ব্যর্থতা হিসেবে বিচার করাই যথেষ্ট হয় না, সমকালীন এক সাংস্কৃতিক প্রবণতার প্রস্তাবিত নথি বলেও মানতে হয়। যে প্রবণতায় সাহিত্য ব্যক্তিত্বকে প্রশ্ন না-করে তাকে ‘আলোকিত আবেষ্টন’ প্রদান করে; যেখানে রাজনৈতিক অবস্থানকে বিশ্লেষণ না-করে তার চারপাশে নৈতিক জ্যোতি এঁকে দেয়; যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে চিন্তার উপাদান হিসেবে নয়, মর্যাদার অলংকার হিসেবে ব্যবহার করা হয়; যেখানে কবির আত্ম-অবমাননাও হয়ে ওঠে অন্যের মহিমার পাদপীঠ।কবিতার সবচেয়ে বড়ো সংকট এখানেই: তার ভাষা যত বড়ো হতে থাকে, তার জগত তত ছোটো হয়ে আসে। সুতরাং আপত্তি এই নয় যে কবিতাটি অতিরঞ্জিত। কবিতা অতিরঞ্জিত হতেই পারে। আপত্তি এই যে অতিরঞ্জনের কোনো অন্তর্গত নৈতিক বা অস্তিত্বগত প্রয়োজন এখানে অনুভূত হয় না। যা অভিজ্ঞতার অতিরিক্ত সম্পদ হয়ে আসে না, আসে উদ্দেশ্যের অতিরিক্ত ব্যবহার্যতাকে সিলমোহর দিতে।
একটি সত্যিকারের কবিতা তার সম্বোধিত মানুষটিকেও এমন কোনো নিরাপদ পাদবেদীতে বসায় না, যেখানে প্রশ্ন পৌঁছতে পারে না। কারণ কবিতা জানে—যাকে প্রশ্ন করা যায় না, তাকে মানুষও বলা যায় না। আর যে কবিতা একজন মানুষকে মানুষ থেকে প্রতীকে, প্রতীক থেকে মিথে, মিথ থেকে প্রায় দেবত্বে উন্নীত করে, তার সঙ্গে প্রশস্তির দূরত্ব শেষপর্যন্ত খুব সামান্য। এই কারণে ‘রুগ্ন কবির চিঠি’-কে আমার প্রকাশ্য প্রশস্তি-প্রকল্প হিসেবেই বেশি অর্থবহ মনে হয়। এর ভাষায় কাব্যিক দীপ্তির চেষ্টা আছে, কিন্তু সেই দীপ্তি অভিজ্ঞতার অন্তর্গত চৈতন্যপ্রদেশ থেকে আসে না; আসে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আরোপিত ভাষা-মর্যাদায়। তাই এক্ষেত্রে বলতে ইচ্ছে হয়, কবিতার মর্যাদা তার আরোপিত উচ্চারণের মহিমায় উজ্জ্বলতা পায় না, পায় তার সত্যের কঠিনতায়।
অতএব এই রচনার বিরুদ্ধে আপত্তি কোনো ব্যক্তিগত রুচির আপত্তি নয়। এক্ষেত্রে তা অবশ্যই কবিতার স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে। যে মুহূর্তে কবিতা কোনো ব্যক্তির সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যক্তিমহিমা বা রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণের যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন তার ভাষা যতই চমকপ্রদ হোক না কেন, শিল্পের ভিতরে তার দায় নিয়ে সাধ্যমতো প্রশ্ন তোলাও জরুরি বলে মনে করি। কারণ সাহিত্যের ইতিহাসে দরবারি কবিতাও সর্বদা কবিতাহীন ছিল না; তারও অন্তরালনির্ভর ইঙ্গিতময় নিজস্ব ভাষা ছিল, ছন্দ ছিল, অলংকার ছিল, উপমা ছিল। কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই তার ক্ষমতাশ্রয়ী নির্ভরতার শিল্পনৈতিক সীমাও ছিল।
কবিতার কাজ দরবারি প্রকৌশলে ভাষা সাজানো নয়। কবিতার কাজ দরবারের ভিতরে ও বাইরে দাঁড়িয়ে এমন এক ভাষা তৈরি করা— যেখানে রাজা, কবি, নায়ক, বিপ্লবী, নির্বাসিত, পৃষ্ঠপোষক আর পাঠক-শ্রোতা সকলেই আত্মগত প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন। এই প্রশ্ন না-থাকলে কবিতা যতই দুর্দান্ত স্থাপত্যকর্ম হোক, তার ভিতরে বিস্ময় জাগানো অন্ধকার জড়িয়ে থাকে না। আর অন্ধকারহীন কবিতা, যতই মহাজাগতিক শব্দে নিজেকে আলোকসজ্জা দান করুক, শেষপর্যন্ত তার দ্বারা বড়োজোর গভীরতার অভিনয়ই পরিবেশন করা হয়ে যায়। কবিতার বিরুদ্ধে তাই অভিযোগ নয়—কবিতার পক্ষেই এই আপত্তি। তৈলদানকে কবিতা বলা কোনোকালেই যায় না। প্রশস্তিকে মহাকাব্যিক রূপক দিলেও তা শিল্পে উত্তীর্ণ হয় না। আর একজন মানুষকে, স্বার্থ ও সামর্থের আয়োজনে, মহাবিশ্বের কেন্দ্রে বসিয়ে দিয়ে ‘আমিই তাকে বৃহৎ ও মহৎ বানিয়ে দিলাম বলে’ গৌরবও আদায় করা যায় না; বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কবিতার পৃথিবীটাকেই ক্ষুদ্র ও তাচ্ছিল্য করা হয়ে যায়।

