ভাষাবিজ্ঞান ও তার শাখা-প্রশাখা

ভাষাবিজ্ঞান ও তার শাখা-প্রশাখা :

ভাষার বিজ্ঞানই হল ভাষাবিজ্ঞান। অন্যভাবে বললে, ভাষা নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত চর্চাই হল ভাষাবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য। ভাষাবিজ্ঞান বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতই নিত্য প্রগতিশীল এবং নিত্য সক্রিয় একটি বিদ্যা (Discipline)। বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতই ভাষাবিজ্ঞানের গতি হল বিশেষ (Particular) থেকে সাধারণ (General)-এর দিকে; এ পদ্ধতি হল আরোহমূলক। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভাষা সম্পর্কে আলোচনার প্রথম ধাপ হচ্ছে তথ্যসংগ্রহ (Data Collection) ও নথিভুক্তকরণ (Recording)। তারপর সেই প্রাপ্ত তথ্যকে বিশ্লেষণ (Analysis) করে তার যথাযথ বর্ণনা (Objective Description)।

ভাষাবিজ্ঞান মানুষের মুখের ভাষার চর্চা করে। লিখিত ভাষা ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় আসে না। লেখার শুরু হয়েছে পাঁচ ছয় কি সাত হাজার বছর আগে। মুখের ভাষাকে লিখন পদ্ধতি কখনও সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারে না। লিখিত ভাষার বহু সীমাবদ্ধতা আছে। দ্বিতীয় যে কারণে ভাষাবিজ্ঞান কেবল মৌখিক ভাষাকে গুরুত্ব দেয় তা এই যে, যেখানে বহু সহস্র কোটি মানুষ কথা বলে বা মৌখিকভাবে ভাষা ব্যবহার করে, সেখানে তার মাত্র কয়েক শতাংশ মানুষ লিখতে জানে। তাই মুখের ভাষাকেই ভাষাবিজ্ঞানীরা আসল ভাষা বলে মানেন। সুতরাং; ভাষাবিজ্ঞান হল সামগ্রিকভাবে ভাষার (অর্থাৎ মানুষের মুখের ভাষার) গঠন, প্রকৃতি, পদ্ধতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানসম্মত চর্চার নাম।

ভাষাবিজ্ঞান শুধু ভাষার ভিতরের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনাই নয়, ভাষা মানবসভ্যতাকে কীভাবে কাজ করে তাও সামগ্রিকভাবে ভাষাবিজ্ঞানের বিষয়।


তুলনামূলক, ঐতিহাসিক এবং বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান :

ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনা নানারকম হতে পারে। তার মধ্যে তিনটি বহুল প্রচলিত শাখা হল—তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান, ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান এবং বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান।

তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান :

তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রপাত করেছিলেন স্যার উইলিয়াম জোন্স (১৭৮৬)। জোন্স সংস্কৃত, গ্রিক, লাতিন, ফারসি ভাষার মধ্যে প্রচুর মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, এই ভাষাগুলির মধ্যে একটি ঐক্যসূত্র আছে কারণ এই ভাষাগুলি একটি মূলভাষা থেকে উৎপন্ন। সেটি হল ইন্দো-ইউরোপীয়। সমগ্র উনবিংশ শতাব্দী জুড়ে ইন্দো-ইউরোপ এবং পরবর্তীকালে আমেরিকায় তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের প্রচুর চর্চা হয়। একথা অনস্বীকার্য যে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান চর্চার সূত্রপাত তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান চর্চার হতে। তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান সমগোত্রজ ভাষাগুলির মধ্যে তুলনা করে এবং তাদের উৎস ভাষাকে বা মূলভাষাকে পুনর্নির্মাণ করে।

ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান :

প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা কীভাবে বিভিন্ন স্তর যেমন পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, অবহট্টের মধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষার জন্ম দিয়েছে তা মূলত ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার যে পরিবর্তন হয় এবং সেই বিবর্তনের ফলে যে পরিবর্তন ভাষার সংগঠনে দেখা যায় তা নির্দেশ করা ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের কাজ। বিশেষ করে শব্দ ও পদমধ্যে ধ্বনি পরিবর্তন ভাষার কালগত রূপান্তরের অন্যতম কারণ। ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান এই ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ ও বিভিন্ন ধরনের ধ্বনি পরিবর্তন যা ভাষার মধ্যে ক্রিয়া করে তা অনুসন্ধান করে।

বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান :

বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান সমকালীন প্রচলিত ভাষার গঠনরীতির বিচার বিশ্লেষণ করে। বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রপাত হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে প্রধানত ইন্দো-ইউরোপ এবং পরবর্তীকালে মার্কিন দেশে। যে ভাষার কোনো অতীত নিদর্শন নেই অথবা যে ভাষা এখনও পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয়নি সেই ভাষার আলোচনার জন্য বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। এই শাখার মতে কোনো ভাষার আলোচনার প্রধান বিষয় চারটি—ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব এবং শব্দার্থতত্ত্ব। ধ্বনিবিজ্ঞান আলোচনা করে কীভাবে বাগযন্ত্রের সাহায্যে ধ্বনিসমষ্টি উচ্চারিত হয়।

ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনায় আমরা পাই কোনো একটি বিশেষ ভাষায় ব্যবহৃত ধ্বনিগুলির বিচার বিশ্লেষণ। রূপতত্ত্বের বিষয় পদের গঠন, পদের চেয়ে ছোটো ভাষার একক রূপের নানা প্রকৃতি। বাক্যতত্ত্বের বিষয় হল বাক্যের সার্বিক আলোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ। শব্দার্থতত্ত্বের বিষয় শব্দের অর্থ পর্যালোচনা। বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান ভাষার সংগঠনে আলোচনার উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করে। ভাষাকে যদি মানবদেহের সঙ্গে কল্পনা করি তাহলে ভাষার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি হল ধ্বনি, ধ্বনিগুচ্ছ, রূপ, পদ, বাক্য ইত্যাদি।


ভাষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ও তাদের মধ্যে সম্পর্ক :

ভাষাবিজ্ঞানের মূল আলোচ্য বিষয় হল মানুষের ভাষা এবং ভাষার সঙ্গে জীবনের বিভিন্ন সংলগ্ন দিকগুলি। ভাষা বাস্তবে একটি অত্যন্ত জটিল বিষয়। ভাষার মধ্যে প্রবেশ করে ভাষার জটিল রহস্যকে উন্মোচন করা ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম উদ্দেশ্য। একদিকে ভাষা এবং অন্যদিকে ভাষার সঙ্গে অন্যান্য সংলগ্ন মানবজীবনের নানা দিক—এই দুই দিক সমান তালে আলোচনা করতে ভাষাবিজ্ঞানের গবেষকদের প্রধানত দু-দলে ভাগ হয়ে যেতে হয়। ক. প্রধান ভাষাবিজ্ঞান ও খ. ফলিত ভাষাবিজ্ঞান।

প্রধান ভাষাবিজ্ঞান :

ভাষার কেন্দ্রীয় চরিত্র, বিন্যাস এবং তার গঠন প্রণালী আলোচিত হয়। একে বলে প্রধান ভাষাবিজ্ঞান।

ফলিত ভাষাবিজ্ঞান :

ভাষার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক এবং ভাষার সঙ্গে অন্যান্য বিদ্যাচর্চার বিভিন্ন ক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার ও বিশ্লেষণ করা হয়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাষার অবদান বা প্রয়োগ (application) ফলিত ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

প্রধান ভাষাবিজ্ঞান ভাষার যে গঠনপ্রণালী বা ভাষার যে কেন্দ্রীয় বিন্যাস আলোচনা করে তা প্রধানত পাঁচটি শাখায় হয়। এই পাঁচটি শাখা হল ধ্বনিবিজ্ঞান (Phonetics), ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology), রূপতত্ত্ব (Morphology), বাক্যতত্ত্ব (Syntax) ও শব্দার্থতত্ত্ব (Semantics)।

ফলিত ভাষাবিজ্ঞানে আমরা আলোচনা করি বিদ্যাচর্চার বিভিন্ন শাখার সঙ্গে মানবভাষার কী সম্পর্ক। যেমন সমাজ বা সমাজবিজ্ঞানের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক যার নাম সমাজভাষাবিজ্ঞান, মানবমনের প্রকৃতি ও গতিপ্রকৃতির সঙ্গে মানব ভাষার সম্পর্ক যার নাম মনোভাষাবিজ্ঞান, মানব মস্তিষ্কের অত্যন্ত জটিল গঠনের ও তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মানবভাষার সম্পর্ক যার নাম স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান, নৃতত্ত্বের সঙ্গে মানবভাষার সম্পর্ক যার নাম নৃভাষাবিজ্ঞান প্রভৃতি। সাহিত্য বিশ্লেষণে অথবা সাহিত্যের নান্দনিক দিকটি ঠিকভাবে তুলে ধরতে যে ভাষাবিজ্ঞানের সাহায্য বিশেষ জরুরি সেটি হলে শৈলীবিজ্ঞান। এখানে ভাষা ও সাহিত্যের দিকটি আলোচিত হয়। যে শাখায় অভিধান তৈরিতে ভাষাবিজ্ঞানের প্রয়োগ আলোচনা করা হয় তার নাম অভিধানবিজ্ঞান।


ভাষাবিজ্ঞান

প্রধান ভাষাবিজ্ঞানফলিত ভাষাবিজ্ঞান
ধ্বনিবিজ্ঞানসমাজভাষাবিজ্ঞান
ধ্বনিতত্ত্বমনোভাষাবিজ্ঞান
রূপতত্ত্বস্নায়ুভাষাবিজ্ঞান
বাক্যতত্ত্বনৃভাষাবিজ্ঞান
শব্দার্থতত্ত্বশৈলীবিজ্ঞান প্রভৃতি

ফলিত ভাষাবিজ্ঞান

সমাজভাষাবিজ্ঞান :

ভাষা কীভাবে সমাজে কাজ করে এবং সমাজ কীভাবে ভাষার ওপর প্রভাব বিস্তার করে, ভাষাবিজ্ঞানের যে শাখাটি এই নিয়ে চর্চা করে তাকেই আমরা সমাজভাষাবিজ্ঞান বলি। এককথায় বলা যায় সমাজভাষাবিজ্ঞান হল ভাষা ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়।

সমাজভাষাবিজ্ঞানের মূল ভাগ তিনটি—

১. বর্ণনাত্মক সমাজভাষাবিজ্ঞান (Descriptive Sociolinguistics)
২. পরিবর্তমান সমাজভাষাবিজ্ঞান (Dynamic Sociolinguistics)
৩. প্রয়োগমূলক সমাজভাষাবিজ্ঞান (Applied Sociolinguistics)

বর্ণনাত্মক সমাজভাষাবিজ্ঞান :

বর্ণনাত্মক সমাজভাষাবিজ্ঞান প্রধানত ভাষা বৈচিত্র্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। ভাষার বক্তা, ভাষার বিশেষ রূপ, শ্রোতা, ভাষা ব্যবহারের বিশেষ কারণ—এসব প্রশ্নই বর্ণনাত্মক সমাজভাষাবিজ্ঞানের প্রধান বিবেচ্য। কোনো ভাষার চরিত্র নির্ভর করে বক্তা (Sender), শ্রোতা (Receiver), এবং উপলক্ষ (Setting)-এর ওপর। সুতরাং প্রথমেই প্রয়োজন বক্তার সামাজিক পরিচয়। এরপর আসে শ্রোতার বা Receiver-এর সামাজিক পরিচয়। বর্ণনামূলক সমাজবিজ্ঞানের তৃতীয় মাত্রা হল উপলক্ষ বা Setting। অর্থাৎ পরিস্থিতি বা পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী ভাষা যে পালটে যায়, তা ধরা পড়ে এই অংশের আলোচনায়।

সভা সমিতির ভাষা, শ্রেণিকক্ষের ভাষা, বন্ধুর ভাষা, আইনের ভাষা, খবরের কাগজের ভাষা প্রত্যেকটি ভাষার ধরন আলাদা। উপভাষা অঞ্চলে বাঙালি ছাত্ররা স্কুলে মান্য বাংলা বললেও, বাড়িতে তারা বাংলার কোনো একটি উপভাষাতেই কথা বলেন। সুতরাং, কোথায় কথা বলা হচ্ছে, এটি ভাষার ক্ষেত্রে একটা বড়ো ভূমিকা গ্রহণ করে। এই যে উপলক্ষ অনুযায়ী ভাষার বা উপভাষার বদল হয় তাকে সমাজভাষাবিজ্ঞানীরা রেজিস্টার (Register) বলেন। কোনো ব্যক্তির বিশেষ উপভাষা যে বিশেষ রীতি ব্যবহার করে তাকে বলে কোড (code)। সেই ব্যক্তির ভাষা যদি পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে নেয় তবে এই প্রক্রিয়াটিকে বলে কোড-বদল (code-switching)।

পরিবর্তমান সমাজভাষাবিজ্ঞান :

সচল বা পরিবর্তমান সমাজভাষাবিজ্ঞান সমাজভাষাকে মূলত ইতিহাসের দিক থেকে দেখে। কোনো বিশেষ সমাজ ভাষার উত্তর বিবর্তন বিস্তার ও সংকোচনের ধারা নিয়ে ভাষা-বিজ্ঞানের এই শাখাটি কাজ করে। দ্বিভাষিকতা বা Bilingualism, ক্রেওল এবং পিজিনের কথা এই ভাগের মধ্যে পড়ে।

প্রয়োগমূলক সমাজভাষাবিজ্ঞান :

মাতৃভাষা শেখানোর পদ্ধতি, অন্য ভাষা শেখার পদ্ধতির উদ্ভাবন, অনুবাদনীতি, লিপি প্রণালীর উদ্ভাবন, পরিভাষা ও সংশোধন, বানান সংস্কার, ভাষা পরিকল্পনার দিক থেকে রাষ্ট্রভাষা ও যোগাযোগের ভাষা ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এসবই প্রয়োগমূলক সমাজভাষাবিজ্ঞানের অন্তর্গত।


মনোভাষাবিজ্ঞান :

ভাষার সঙ্গে মনের যোগ নিবিড়। মনোভাষাবিজ্ঞানীরা ভাষা ও মনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা করেন। মনোভাষাবিজ্ঞান সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে শিশুর ভাষার ক্ষেত্রে; কীভাবে তারা কথা বলে, কীভাবে বাক্য তৈরি করে তার ধারাবাহিক বিশ্লেষণ করে মনোভাষাবিজ্ঞান।

মানুষ কীভাবে ভাষা শেখে এ সম্পর্কে প্রাথমিক অনুমান ছিল যে মানুষ ভাষিক পরিবেশ থেকে অনুকরণের মাধ্যমে ভাষা আয়ত্ত করে। নোয়াম চমস্কি এই তত্ত্বের থেকে সরে এসে বললেন যে মানুষের মধ্যেই থাকে ভাষা শেখার সামর্থ্য। মানব মস্তিষ্কেই রয়েছে সেই সামর্থ্যের কেন্দ্র। সে-কারণে চমস্কি প্রথমে মস্তিষ্ককে বললেন ভাষা শেখার যন্ত্র বা (Language Acquisition Device (LAD)। পরে তিনি ‘যন্ত্র’ কথাটির পরিবর্তে ‘ব্যবস্থা’ বা (System) কথাটি ব্যবহার করলেন। ব্যাকরণ যাকে সর্বজনীন ব্যাকরণ বা (Universal Grammar) বলে চিহ্নিত করেন। এই (LAD-LAS)-এর মাধ্যমেই শিশুরা ভাষামিশ্রণ অনুকরণধর্মিতা থেকে সৃষ্টিশীলতার এক বিশাল ভাণ্ডারে পৌঁছেছে।

বিভিন্ন প্রকার ভাষাগত পশ্চাদপরতা (Language disorder), স্মৃতির অবনতি এগুলি মনোভাষাবিজ্ঞানের পাশাপাশি স্নায়ুভাষাবিজ্ঞানেরও বিষয়।


স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান :

ভাষার সঙ্গে মানবমস্তিষ্কের সম্পর্ক এবং ভাষাব্যবহারগত সমস্যা—এই দুই-ই স্নায়ুভাষাবিজ্ঞানের আলোচনার মধ্যে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত অসুস্থ মানুষের ভাষা ব্যবহারের সমস্যা এবং স্নায়ুবিক বিকাশের চর্চায় ভাষাব্যবস্থায় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের পৃথক দায়িত্ব এবং মস্তিষ্ক বিকাশের সঙ্গে ভাষাগত দক্ষতার সম্পর্ক নিয়ে বহু অজানা বিষয় নিত্যনতুন গবেষণায় জানা যাচ্ছে। পরোক্ষভাবে মস্তিষ্ক কীভাবে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে ভাষার প্রয়োগ করে তাও বুঝতে পারা যায় স্নায়ুভাষাবিজ্ঞানের দৌলতে। প্রযুক্তিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফাংশনাল নিউরো-ইমেজিং বা ব্যবহারিক স্নায়ুচিত্রণে আজকাল Positron Emission Tomography (PET) বা Functional Magnetic Resonance Imaging (FMRI) জাতীয় যন্ত্রের ব্যবহার হয়। এই সমস্ত আধুনিক যন্ত্রের কল্যাণে ভাষাবিজ্ঞানের এই শাখাটি প্রতিদিনই বিস্তৃত হয়ে চলেছে।

১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে পল ব্রোকা অ্যানথ্রোপলজিক্যাল সোসাইটি অফ প্যারিসে এক রোগীর প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেন যিনি একুশ বছর ‘তাল’ ধ্বনি ছাড়া কিছুই উচ্চারণ করতে পারতেন না। এই মানুষটির চিকিৎসা প্রসঙ্গেই প্রথমে জানা গেল ভাষাসিদ্ধি যুক্তি, পরিকল্পনা, আত্মপ্রকাশ, বাচিক সৃজন ক্ষমতা তথা ভাষার মৌলিক বিষয়গুলি, অর্থাৎ অনুভব ও জ্ঞান আহরণ, বলা, পড়া, লেখা—সবই মস্তিষ্কেরই বিভিন্ন অংশের সঙ্গে তাত্ত্বিকভাবে সম্পর্কিত।

মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধমস্তিষ্কের ডান গোলার্ধ
বলাসামগ্রিক বিকাশ
লেখাঅ-ভাষা প্রস্তুতি, রোমহর্ষণ
ভাষা 
পড়া 
গণনা 
বিশ্লেষণ 
চিন্তা 

ভাষার সৃষ্টিতে, প্রয়োগে এবং যোগাযোগ স্থাপনে মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধ বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নানা ধারাবাহিক গবেষণায় মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অঞ্চলের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যে শাখায় মানবশরীরে ভাষার প্রকৃতি ও গঠনগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান (Neuro linguistics) বলে। স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান আসলে বৌদ্ধিক স্নায়ুবিজ্ঞানেরই একটি শাখাবিশেষ। আজকের বিজ্ঞানীরা একমত যে মানুষের মস্তিষ্কের বামগোলার্ধের সুনির্দিষ্ট স্নায়ুর গঠন ভাষা এবং কথার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।

স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান শুধুমাত্র ভাষা নিয়েই চর্চা বা গবেষণা করে না। তার সঙ্গে ভাষার ব্যবস্থাগত (Systemic), চলন (movement), ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য (Sensory) এবং কোষীয় (Cellular) এবং অন্যান্য নানা বৃহৎ শাখার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। স্নায়ুভাষাবিজ্ঞানকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

ভাষাবিজ্ঞান ও তার শাখা-প্রশাখা

স্নায়ুভাষাবিজ্ঞানের দুটি প্রধান দিক :

১। ভাষা শেখা (Language acquisition) এবং প্রক্রিয়াকরণ (Processing)

২। ভাষাগত সমস্যার সংস্কার (Language impairment)

মস্তিষ্ক কীভাবে আমাদের ভাষা এবং কথার বিকাশে সাহায্য করে তা নিয়ে নানা গবেষণা আছে। মস্তিষ্ক ভাষায় এন-কোডিং এবং ডি-কোডিং নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনেই হয়। এ ব্যাপারে মস্তিষ্কের থ্যালামাস বেসাল গ্যাংলিয়া ও ধূসর বস্তু Grey Matter অঞ্চল বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে।

স্নায়ুবিজ্ঞানের ধারাবাহিক চর্চার মধ্যে দিয়ে স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান সমৃদ্ধ হয়েছে। ভাষার সৃষ্টি, প্রয়োগ এবং তার সংস্কারের নানাদিক নিয়ে ধারাবাহিক চর্চার অবকাশ রয়েছে স্নায়ুভাষাবিজ্ঞানে।


নৃভাষাবিজ্ঞান :

ভাষার উৎপত্তি ভাষাবিজ্ঞানীদের কাছে আজও রহস্যে ঢাকা। মানুষের বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার উৎপত্তি ও তার বিবর্তন ঘটেছে। ভাষার গঠনের সঙ্গে সমাজ ও সংস্কৃতির যোগ আছে, যোগ আছে সামাজিক সংস্কার ও বিশ্বাসের সঙ্গেও। প্রতিটি সভ্যতা তাদের নিজের মতো করে ব্যবহার্য জিনিসকে চিহ্নিত করে। এর ফলে ভাষার মধ্যে সৃষ্টি হয় নানা বৈচিত্র্য।

পৃথিবীতে এমন অনেক ভাষা আছে যাদের কোনো লিপি নেই। সেইসব ভাষাও যে আলোচনা ও বিশ্লেষণের দাবি রাখে তা ভাষাবিজ্ঞান বুঝতে পেরেছে নৃতত্ত্বের সংস্পর্শে এসে। পৃথিবীর এই আদিম জনগোষ্ঠীর ভাষার বিশ্লেষণে ভাষাবিজ্ঞান মনোযোগ দিয়েছে বিংশ শতকের প্রথম দিক থেকে। মুখের ভাষায় তথ্য সংগ্রহ ও বিচারবিশ্লেষণ তখন থেকে গুরুত্ব পেতে থাকে। এর ফলে ভাষাবিজ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করে এবং ভাষাবিজ্ঞানীদের কাছে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। নৃতত্ত্বের সঙ্গে মেলবন্ধনের ফলেই ভাষাবিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন যে কোনো ভাষা উন্নত বা অনুন্নত বা মিষ্টি বা কর্কশ এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, সব ভাষাই সমান ও গুরুত্বপূর্ণ।


শৈলী বিজ্ঞান :

মানুষের মনের ভাব প্রকাশিত হয় ভাষার মাধ্যমে। কিন্তু এই ‘ভাষার মাধ্যমে’ বলতে বোঝায় ভাষার বিশিষ্টতা। ভাষার এই বিশিষ্টতার আলোচনায় ভাষার রূপ বা form অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই form বা রূপ আসলে লেখকের লেখার শৈলীর ওপর নির্ভর করে। কোনো লেখকের লেখার এই শৈলী বিশ্লেষণকেই আসলে Stylistics বা শৈলী বিজ্ঞান বলা হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে শৈলী বিজ্ঞানের নিরিখ হল প্রয়োগ নির্ভর। অর্থাৎ কোনো লেখক বা সাহিত্যিকের পাঠ্যবস্তু বা Text এবং সেই Text-এর প্রয়োগ রীতি এবং কৌশলই একমাত্র বিবেচ্য। শৈলীবিজ্ঞানের দিক থেকে লিখন শৈলীর বিচার হলে Objective বা নৈর্ব্যক্তিক বিচার। কোনো Text বা পাঠ্যবস্তুর গোড়ার কথা হলে ভাষারীতি। স্যামুয়েল ওয়েসলি (Samuel Wesley) একেই বলেছেন ‘চিন্তার পোশাক’ বা ‘the dress of thought’। এর মানে কোনো একজন লেখক তার চিন্তাভাবনাকে যে ভাবে সাজিয়ে ভাষার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেন।

Style বা শৈলী বিভিন্ন রকমের হলেও, প্রধানত ভাবে একে দু-ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। প্রথমটি Evaluative বা মূল্যায়নাভিত্তিক, আর দ্বিতীয়টি Descriptive বা বর্ণনামূলক। মূল্যায়নাভিত্তিক শৈলী আসলে কোনো লেখার শৈলীর বৈশিষ্ট্যসমূহের প্রকাশ। অন্যদিকে বর্ণনামূলক শৈলী হল কোনো লেখকের লেখার শৈলীর বিবরণ বা বর্ণনা। প্রথমটি দ্বারা বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের লিখন শৈলীর পার্থক্য নিরূপণ করা যায়। দ্বিতীয়টির সাহায্যে রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের সঙ্গে ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের শৈলীর তফাত সূচিত করা যেতে পারে।

ফেদরন দ্য সসুর ভাষার নানা উপাদান (ধ্বনি, রূপ বা ‘শব্দাংশ’, বাক্য ইত্যাদি) এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের মূল সংবিধি, ভাষার বিভিন্ন উপাদান ও উপাদানগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের জালবিন্যাসকে নাম দিয়েছিলেন লাং (Langue) প্যারোল (Parole) হল সেই সংবিধিকে মান্য করেও ভাষা ব্যবহারের উপাদান নির্বাচন ও প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে নিজস্ব একটি বিন্যাসে স্পষ্ট ও প্রকট বাচনক্রিয়া। এই যে বহুবিন্যাসের সম্ভাবনার মধ্যে একটি সম্ভাবনাকে বেছে নেওয়া—এটাই শৈলীর গোড়ার কথা। সেই অর্থে শৈলীর বিষয়টি প্যারোলের প্রক্রিয়াতেই চলে আসবে।

শৈলীর মূলে রয়েছে রচনাকারের নির্বাচন। শৈলীকে সচরাচর যে মতাদর্শগুলির আলোয় দেখা হয় সেগুলিকে পর্যালোচনা করলে এই কথাটিই প্রমাণ হয়। স্টাইল হল প্রচলিত আদর্শ থেকে বিচ্যুতি কিংবা ‘স্টাইল হল এক ধরনের বিন্যাসের পুনরাবৃত্তি বা সমাহার, কিংবা স্টাইল হল ব্যাকরণের সম্ভাবনার বিশেষ নিষ্কাশন’—উক্তিগুলির মধ্যে সর্বত্রই রচয়িতার নির্বাচনের প্রক্রিয়াটির গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যে মুহূর্তে রচনার পরিণামী প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়, তখনই এসে পড়ে নির্বাচনের প্রসঙ্গ। ভাষাবিজ্ঞানী মিলিট একে বলেছেন ‘rhetorical choice’ বা অলংকারিক নির্বাচন।

শৈলী বিচার করার ক্ষেত্রে যে প্রকারণ বা tool-গুলি ব্যবহৃত হয় সেগুলি হল—

১. foregrounding বা প্রমুখন,

২. deviation বা বিচ্যুতি,

৩. Parallelism বা সমান্তরালতা,

৪. Code Switching বা কোডবদল বা সংকেতবদল এবং

৫. Polyphony বা বহুস্বরতা বা বহুধ্বনিময়তা।

একটি ভাষারীতির মধ্যে অন্যরীতির শব্দ বা বাক্যাংশ ব্যবহারকে কোড বদল বা সংকেত বদল বলে। বাংলা বলতে বলতে ইংরেজি শব্দ বা বাক্যাংশ ব্যবহার, এক উপভাষায় কখনও বা ভিন্নের মধ্যে অন্য উপভাষার প্রয়োগ-প্রভৃতিকে কোডবদলের দৃষ্টান্ত বলা যেতে পারে। উপন্যাস বা মহাকাব্য ও অন্যান্য আখ্যানে বহু শ্রেণির বহুবিচিত্র স্বভাবের, অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশ থেকে আগত বহু চরিত্রের সমাগম ঘটে। এই ভাবেই চরিত্রগুলি ভিন্ন ভিন্ন স্বরকে প্রতিষ্ঠা করে এবং এই স্বরগুলির জটিল বিন্যাসে গ্রথিত হয় উপন্যাস বা মহাকাব্যের কথাবিশ্ব। মিখাইল বাখতিন এই বিষয়টিকেই ‘বহুস্বরিতা’ আখ্যা দিয়েছেন।


অভিধানবিজ্ঞান :

ভাষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হল অভিধান বিজ্ঞান (Lexicography)। ভারতে অভিধান রচনার সূত্রপাত যাস্কের ‘নিরুক্ত’ থেকে। একাদশ শতাব্দীতে ‘অভিধান’ বোঝাতে জন গারল্যান্ড প্রথম ‘Dictionarius’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৫৩৮ সালে ইংরেজি ‘Dictionary’ শব্দটি পাওয়া যায় স্যার থমাস এলিয়টের ল্যাটিন-ইংরেজি অভিধানে।

ভাষাবিজ্ঞানের দিক থেকে আদর্শ অভিধানে প্রতিটি entry বা শব্দের তিন স্তর থাকবে ১. শব্দের গঠনগত স্তর, ২. অর্থগত স্তর এবং ৩. ব্যাকরণগত স্তর। তৃতীয় স্তরটি অভিধানের দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অভিধান অনেকরকম হয়। তার মধ্যে অতি পরিচিত হল একভাষিক ও দ্বিভাষিক অভিধান। যেখানে এক ভাষার শব্দকে সেই ভাষাতেই ব্যাখ্যা করা হয়, তা হল একভাষিক অভিধান। যেমন, বাংলা থেকে বাংলা, ইংরেজি থেকে ইংরেজি। যখন এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়, তখন তা দ্বিভাষিক অভিধান। যখন কোনো অভিধানে একটি শব্দের প্রথম প্রচলনের সময়, প্রথম প্রচলনের সময়ে তার কী অর্থ ছিল, কীভাবে অর্থ বদল গঠন, সাম্প্রতিকতম রূপ বা অর্থ কী—এই সব থাকে, তখন তাকে ইতিহাসভিত্তিক অভিধান বলা হয়। যেমন- The Shorter Oxford English Dictionary। এছাড়াও আরেক রকমের অভিধান হল বিষয়-অভিধান যেখানে কোনো বিষয়ের নানা কিছু অভিধানের মতো করে সাজানো ও ব্যাখ্যা করা থাকে। যেমন ইতিহাস অভিধান, অর্থনীতির অভিধান, উদ্ভিদবিদ্যার অভিধান ইত্যাদি।

বাংলা ভাষা ও শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস (পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ)- পাঠ্যগ্রন্থ অনুসারে লিখিত। 

উচ্চ মাধ্যমিক – ১ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

নির্বাচিত প্রশ্নোত্তর

১. ভাষাবিজ্ঞান কী?

উত্তর: ভাষা নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত ও পদ্ধতিগত চর্চাই ভাষাবিজ্ঞান।

২. ভাষাবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য কী?

উত্তর: ভাষা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং তার যথাযথ বর্ণনা প্রদান করা।

৩. ভাষাবিজ্ঞানের পদ্ধতি কী ধরনের?

উত্তর: ভাষাবিজ্ঞানের পদ্ধতি মূলত আরোহমূলক।

৪. ভাষাবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রথম ধাপ কী?

উত্তর: তথ্যসংগ্রহ (Data Collection) ও নথিভুক্তকরণ (Recording)।

৫. তথ্যসংগ্রহের পর ভাষাবিজ্ঞানের দ্বিতীয় ধাপ কী?

উত্তর: বিশ্লেষণ (Analysis)।

৬. ভাষাবিজ্ঞানে বিশ্লেষণের পর কী করা হয়?

উত্তর: যথাযথ বা নৈর্ব্যক্তিক বর্ণনা (Objective Description) করা হয়।

৭. ভাষাবিজ্ঞান মূলত কোন ভাষাকে গুরুত্ব দেয়?

উত্তর: মুখের ভাষাকে।

৮. ভাষাবিজ্ঞান লিখিত ভাষার চেয়ে মুখের ভাষাকে কেন বেশি গুরুত্ব দেয়?

উত্তর: কারণ মুখের ভাষা মানবসমাজে সর্বজনীন ও প্রাথমিক যোগাযোগমাধ্যম।

৯. ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় লিখিত ভাষা কেন সীমাবদ্ধ?

উত্তর: কারণ পৃথিবীর বহু ভাষার কোনো লিখিত রূপ বা লিপি নেই।

১০. ভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে নৃতত্ত্বের সম্পর্কের ফলে কী ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?

উত্তর: কোনো ভাষাই উন্নত-অনুন্নত, মিষ্টি-কর্কশ ইত্যাদি নয়; সব ভাষাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।


তুলনামূলক, ঐতিহাসিক ও বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান

১১. ভাষাবিজ্ঞানের তিনটি প্রধান শাখা কী?

উত্তর: তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান, ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান এবং বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান।

১২. তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রপাত কে করেন?

উত্তর: স্যার উইলিয়াম জোন্স (Sir William Jones)।

১৩. স্যার উইলিয়াম জোন্স কোন সালে তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রপাত করেন?

উত্তর: ১৭৮৬ সালে।

১৪. উইলিয়াম জোন্স কোন কোন ভাষার মধ্যে সাদৃশ্য লক্ষ করেছিলেন?

উত্তর: সংস্কৃত, গ্রিক, লাতিন ও ফারসি ভাষার মধ্যে।

১৫. উইলিয়াম জোন্সের মতে উল্লিখিত ভাষাগুলির মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল?

উত্তর: এগুলির একটি অভিন্ন মূলভাষা বা উৎস ছিল।

১৬. ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর ধারণার সঙ্গে কার নাম যুক্ত?

উত্তর: স্যার উইলিয়াম জোন্সের।

১৭. তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান কী নিয়ে আলোচনা করে?

উত্তর: সমগোত্রীয় ভাষাগুলির তুলনা করে তাদের উৎস ও পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করে।

১৮. ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান কী নিয়ে আলোচনা করে?

উত্তর: সময়ের সঙ্গে ভাষার পরিবর্তন ও বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে।

১৯. ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?

উত্তর: ধ্বনির পরিবর্তন।

২০. ভাষার কালগত রূপান্তরের কারণ অনুসন্ধান করে কোন শাখা?

উত্তর: ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান।

২১. বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান কী নিয়ে আলোচনা করে?

উত্তর: কোনো নির্দিষ্ট সময়ের প্রচলিত ভাষার গঠন ও ব্যবস্থার বিচার-বিশ্লেষণ করে।

২২. বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের গুরুত্ব কোন ভাষার ক্ষেত্রে বেশি?

উত্তর: যে ভাষার কোনো অতীত নিদর্শন নেই বা এখনও পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয়নি, সেই ভাষার ক্ষেত্রে।

২৩. বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের প্রধান আলোচ্য বিষয় কয়টি?

উত্তর: চারটি—ধ্বনিবিজ্ঞান, ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব; শব্দার্থতত্ত্বও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


প্রধান ভাষাবিজ্ঞান ও ফলিত ভাষাবিজ্ঞান

২৪. ভাষাবিজ্ঞানের মূল আলোচ্য বিষয় কী?

উত্তর: মানুষের ভাষা এবং ভাষার সঙ্গে জীবনের বিভিন্ন সংলগ্ন দিক।

২৫. ভাষাবিজ্ঞানের গবেষকদের প্রধানত কয়টি দলে ভাগ করা যায়?

উত্তর: দুটি—প্রধান ভাষাবিজ্ঞান ও ফলিত ভাষাবিজ্ঞান।

২৬. প্রধান ভাষাবিজ্ঞান কী?

উত্তর: ভাষার কেন্দ্রীয় চরিত্র, বিন্যাস ও গঠনপ্রণালী নিয়ে যে ভাষাবিজ্ঞান আলোচনা করে তাকে প্রধান ভাষাবিজ্ঞান বলে।

২৭. প্রধান ভাষাবিজ্ঞানের প্রধান পাঁচটি শাখা কী?

উত্তর: ধ্বনিবিজ্ঞান, ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব ও শব্দার্থতত্ত্ব।

২৮. ধ্বনিবিজ্ঞান কী?

উত্তর: ভাষায় ব্যবহৃত ধ্বনির উচ্চারণ, উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে যে শাখা আলোচনা করে তাকে ধ্বনিবিজ্ঞান বলে।

২৯. ধ্বনিতত্ত্ব কী?

উত্তর: ভাষার ধ্বনিগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভাষাব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা নিয়ে যে শাখা আলোচনা করে তাকে ধ্বনিতত্ত্ব বলে।

৩০. রূপতত্ত্ব কী?

উত্তর: শব্দ ও পদের গঠন এবং তাদের ক্ষুদ্রতম অর্থবহ একক নিয়ে যে শাখা আলোচনা করে তাকে রূপতত্ত্ব বলে।

৩১. বাক্যতত্ত্ব কী?

উত্তর: বাক্যের গঠন ও বিন্যাস নিয়ে যে শাখা আলোচনা করে তাকে বাক্যতত্ত্ব বলে।

৩২. শব্দার্থতত্ত্ব কী?

উত্তর: শব্দের অর্থ নিয়ে যে শাখা আলোচনা করে তাকে শব্দার্থতত্ত্ব বলে।

৩৩. ফলিত ভাষাবিজ্ঞান কী?

উত্তর: ভাষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্ব ও পদ্ধতিকে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগের আলোচনা হল ফলিত ভাষাবিজ্ঞান।

৩৪. সমাজভাষাবিজ্ঞান কোন ধরনের ভাষাবিজ্ঞানের শাখা?

উত্তর: ফলিত ভাষাবিজ্ঞানের শাখা।

৩৫. মনোভাষাবিজ্ঞান কী নিয়ে আলোচনা করে?

উত্তর: ভাষা ও মনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে।

৩৬. স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান কী নিয়ে আলোচনা করে?

উত্তর: ভাষা ও মানবমস্তিষ্কের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে।

৩৭. নৃভাষাবিজ্ঞান কী নিয়ে আলোচনা করে?

উত্তর: ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে।

৩৮. শৈলী বিজ্ঞান কী?

উত্তর: কোনো লেখকের ভাষারীতি বা লেখার শৈলী বিশ্লেষণের বিজ্ঞানকে শৈলী বিজ্ঞান বা Stylistics বলে।

৩৯. অভিধানবিজ্ঞান কী?

উত্তর: অভিধান রচনা, বিন্যাস ও শব্দের অর্থ-সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে যে শাখা আলোচনা করে তাকে অভিধানবিজ্ঞান বা Lexicography বলে।


সমাজভাষাবিজ্ঞান

৪০. সমাজভাষাবিজ্ঞান কী?

উত্তর: ভাষা কীভাবে সমাজে কাজ করে এবং সমাজ কীভাবে ভাষার ওপর প্রভাব বিস্তার করে—তার আলোচনা হল সমাজভাষাবিজ্ঞান।

৪১. সমাজভাষাবিজ্ঞানের প্রধান তিনটি ভাগ কী?

উত্তর: বর্ণনাত্মক, পরিবর্তনমান এবং প্রয়োগমূলক সমাজভাষাবিজ্ঞান।

৪২. বর্ণনাত্মক সমাজভাষাবিজ্ঞান কী নিয়ে আলোচনা করে?

উত্তর: ভাষার বক্তা, শ্রোতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভাষাব্যবহারের বৈচিত্র্য নিয়ে।

৪৩. ভাষার ব্যবহার কোন তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে?

উত্তর: বক্তা (Sender), শ্রোতা (Receiver) এবং উপলক্ষ বা পরিস্থিতি (Setting)-এর ওপর।

৪৪. Register কী?

উত্তর: উপলক্ষ বা পরিস্থিতি অনুযায়ী ভাষার যে পরিবর্তন ঘটে তাকে Register বলে।

৪৫. Code কী?

উত্তর: কোনো ব্যক্তির ব্যবহৃত বিশেষ ভাষারীতি বা ভাষাবৈচিত্র্যকে Code বলে।

৪৬. Code Switching কী?

উত্তর: পরিস্থিতি অনুযায়ী এক ভাষা বা ভাষারীতি থেকে অন্য ভাষা বা ভাষারীতিতে পরিবর্তন করাকে Code Switching বলে।

৪৭. পরিবর্তনমান সমাজভাষাবিজ্ঞান কী নিয়ে আলোচনা করে?

উত্তর: সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে ভাষার পরিবর্তন ও বিবর্তন নিয়ে।

৪৮. প্রয়োগমূলক সমাজভাষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কী?

উত্তর: মাতৃভাষা শিক্ষা ও অন্য ভাষা শিক্ষার পদ্ধতি উদ্ভাবন।

৪৯. ভাষা পরিকল্পনা কোন ভাষাবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত?

উত্তর: প্রয়োগমূলক সমাজভাষাবিজ্ঞানের।


মনোভাষাবিজ্ঞান ও স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান

৫০. মনোভাষাবিজ্ঞান কী?

উত্তর: ভাষা ও মনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে যে শাখা আলোচনা ও গবেষণা করে তাকে মনোভাষাবিজ্ঞান বলে।

৫১. ভাষা শেখার সঙ্গে কোন শাখার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে?

উত্তর: মনোভাষাবিজ্ঞানের।

৫২. Language Acquisition-এর বাংলা কী?

উত্তর: ভাষা শেখা বা ভাষা অর্জন।

৫৩. Language Impairment-এর বাংলা কী?

উত্তর: ভাষাগত সমস্যা বা ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা।

৫৪. Language Acquisition Device-এর সংক্ষিপ্ত রূপ কী?

উত্তর: LAD।

৫৫. LAD-এর ধারণাটি কে প্রস্তাব করেন?

উত্তর: নোয়াম চমস্কি (Noam Chomsky)।

৫৬. Universal Grammar কী?

উত্তর: মানুষের ভাষা শেখার অন্তর্নিহিত ও সর্বজনীন ব্যাকরণগত কাঠামোর ধারণাকে Universal Grammar বলে।

৫৭. স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান কী?

উত্তর: মানবমস্তিষ্কের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক ও ভাষাব্যবহারজনিত সমস্যার বৈজ্ঞানিক আলোচনা হল স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান।

৫৮. স্নায়ুভাষাবিজ্ঞানের গবেষণায় ব্যবহৃত দুটি আধুনিক প্রযুক্তির নাম কী?

উত্তর: PET (Positron Emission Tomography) এবং fMRI (Functional Magnetic Resonance Imaging)।


শৈলী বিজ্ঞান ও অভিধানবিজ্ঞান

৫৯. শৈলী বিচারের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কী?

উত্তর: Foregrounding, Deviation, Parallelism, Code Switching এবং Polyphony।

৬০. Polyphony বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: বহুস্বরিতা বা একই রচনায় বহু স্বরের সহাবস্থানকে Polyphony বা বহুস্বরিতা বলে।


⭐ পরীক্ষার জন্য আরও ১০টি অতি গুরুত্বপূর্ণ এককথায় তথ্য

এগুলোও ১ নম্বরের প্রশ্ন হিসেবে বিশেষভাবে মনে রাখার মতো

প্রশ্নউত্তর
১. Stylistics-এর বাংলা কী?শৈলী বিজ্ঞান
২. Lexicography-এর বাংলা কী?অভিধানবিজ্ঞান
৩. Sociolinguistics-এর বাংলা কী?সমাজভাষাবিজ্ঞান
৪. Psycholinguistics-এর বাংলা কী?মনোভাষাবিজ্ঞান
৫. Neurolinguistics-এর বাংলা কী?স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান
৬. Anthropology-এর সঙ্গে যুক্ত ভাষাবিজ্ঞানের শাখা কোনটি?নৃভাষাবিজ্ঞান
৭. ভাষার সামাজিক ব্যবহার নিয়ে কোন শাখা আলোচনা করে?সমাজভাষাবিজ্ঞান
৮. ভাষা ও মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়ে কোন শাখা আলোচনা করে?স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান
৯. ভাষা ও মনের সম্পর্ক নিয়ে কোন শাখা আলোচনা করে?মনোভাষাবিজ্ঞান
১০. ভাষার প্রয়োগ নিয়ে কোন শাখা আলোচনা করে?ফলিত ভাষাবিজ্ঞান
### পরিবেশনে- ড. অনিশ রায়

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top