বৈচিত্র‍্যের ভারত বনাম মনুবাদের ভারত

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র-রাজনীতি ও অন্যান্য

 

অনিশ রায়

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে যখন রাজনৈতিক ভাষায় উচ্চারিত হয়—‘বিকৃতকামা’, ‘বিকৃতমনা’, ‘বিকটদর্শন’, ‘বিপথগামীরা মেধাবীর ছদ্মবেশ ছাড়ো’—তখন প্রথম শ্রবণে বা দর্শনে মনে হতে পারে, এগুলো নিছক কদর্য রাজনৈতিক স্লোগান। প্রতিপক্ষকে অপমান করার সস্তা কৌশল। কিন্তু ভাষার ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতা কখনও নিছক গালাগালির মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করে না। সীমাবদ্ধও রাখে না। আসলে কোনো মানুষকে ‘স্বাভাবিক’ আর অন্য কাউকে ‘বিকৃত’ বলে চিহ্নিত করার মুহূর্তে ক্ষমতা মানুষের অস্তিত্বের ওপর নিজের বিচারই আরোপ করে। কে গ্রহণযোগ্য, কে গ্রহণযোগ্য নয়, কোন শরীর মর্যাদার যোগ্য, কোন আকাঙ্ক্ষা বৈধ, কোন জীবনযাপন সমাজের অনুমোদন পাবে— ক্ষমতা সেই সীমারেখা নির্ধারণ করার প্রক্রিয়াই চালায়। ফলে যাদবপুরের যে ঘটনা, তাকে কেবল কোনো বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে দেখলে তার শাসনতান্ত্রিক গভীর ষড়যন্ত্র ধরা পড়বে না। কারণ সেখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় ভারতকে কল্পনা করার দুই ভিন্ন ধারণা—একদিকে এমন ভারত, যেখানে মানুষ তার বৈচিত্র্য, প্রশ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীনতা নিয়ে দেশের নাগরিক; অন্যদিকে এমন ভারত, যেখানে মানুষের পরিচয় তার জন্ম, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থান, ধর্মীয় বিধান এবং পূর্বনির্ধারিত কর্তব্যের দ্বারা নির্ধারিত। প্রথম ভারত সংবিধানের ভারত; দ্বিতীয় ভারত মনুর ভারত। এই দ্বন্দ্ব আধুনিক ভারতের কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক আবিষ্কার নয়। তার শিকড় বহু সহস্র বছরের গভীরে, ভারতীয় সভ্যতার আত্মসংঘাতের মধ্যেই প্রোথিত।

ভারতকে বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো ভ্রান্তিগুলোর একটা হল তাকে নির্দিষ্ট কোনো দৃষ্টির সভ্যতা বলে কল্পনা করার একপেশে প্রবণতা। কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিতেই উপলব্ধ হয়, ভারত কখনও একক স্বরে কথা বলেনি। বেদীয় যজ্ঞের পাশে উপনিষদের প্রশ্ন জন্মেছে। ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রের বিপরীতে বৌদ্ধ ও জৈন প্রত্যাখ্যানের দাবি দৃঢ়তায় দাঁড়িয়েছে। ঈশ্বরবাদী দর্শনের পাশাপাশি চার্বাক বস্তুবাদ মানুষের জিজ্ঞাসাকে অন্য পথের সন্ধানে নিয়ে গেছে। শঙ্করের অদ্বৈতের পাশে রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈত, বুদ্ধের অনাত্মবাদের পাশে ভক্তির আত্মসমর্পণ, কবীরের নির্বিশেষ মানবধর্মের পাশে মীরার ব্যক্তিগত প্রেম, চৈতন্যের প্রেমভক্তির পাশে লালনের দেহতত্ত্ব—সব মিলিয়ে ভারতীয় চেতনা কোনো সোজা, একরৈখিক নদী নয়। বরং তা অসংখ্য স্রোত, প্রতিস্রোত, ভাঙন ও পুনর্গঠনের সম্মিলিত ভূগোল। উপনিষদের ‘নেতি, নেতি’ তাই শুধু দার্শনিক সূত্র নয়, ভারতীয় চিন্তার এক গভীর প্রবণতার চিরকালীন প্রতীক—সত্যকে কোনো চূড়ান্ত সংজ্ঞায় বন্দি না করার সাহস। আমি যা জেনেছি, যা বলেছি, তার বাইরেও কি কিছু আছে? এই প্রশ্নের ভিতরেই চিন্তার স্বাধীনতা জন্ম নেয়। বুদ্ধের আবির্ভাবও সেই অর্থে শুধু নতুন ধর্মের জন্ম নয়। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কর্তৃত্বের সামনে মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে দাঁড় করানোর এক দ্বান্দ্বিক সংশ্লেষের ধারায় ঐতিহাসিক উদ্ভাবনা। চার্বাকের কণ্ঠ আজ মূল গ্রন্থসূত্রে আমাদের কাছে নেই, তার দর্শনের অধিকাংশই বিরোধীদের লেখায় সংরক্ষিত। তবু সেই কণ্ঠের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে, ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে শাস্ত্রের সত্যকে অস্বীকার করার অধিকারও কোনো-না-কোনো সময়, সদর্থে সবসময়ই ছিল। ভারতীয় সভ্যতার মহত্ত্ব তাই তার নিখুঁত ঐকমত্যের ভিতর দিয়ে প্রাপ্ত নয়; তার মহত্ত্ব রক্ষিত হয়ে চলে বিরোধ সহ্য করার দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাক্রমে।

ইতিহাসের এই নিরবচ্ছিন্ন পাঠের ভিতরেই মনুস্মৃতির অবস্থানকে বুঝতে হয়। মনুস্মৃতি ভারতীয় সভ্যতার সমগ্র পরিচয় নয়, ভারতীয় সমাজের একমাত্র বিধানও নয়। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক বিধিব্যবস্থার ইতিহাসে তার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। মনুস্মৃতির কাছে সমাজ কেবল স্বাধীন ব্যক্তিদের সমষ্টি হিসেবে স্বীকৃত নয়। সেখানে সমাজ এক সুসংগঠিত শ্রেণিবিন্যাস। যেখানে মানুষের অবস্থান তার জন্ম, বর্ণ, লিঙ্গ এবং নির্ধারিত ধর্ম বা কর্তব্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে এই নিয়ন্ত্রণ আরও প্রকট। নারীকে স্বতন্ত্র সামাজিক-নৈতিক সত্তা হিসেবে কল্পনা করার পরিবর্তে তাকে পিতা, স্বামী, পুত্র—পুরুষ অভিভাবকত্বের ধারাবাহিকতার মধ্যে স্থাপন করা হয়। এখানে নারীর নিরাপত্তার ভাষা আর স্বাধীনতার ভাষা এক নয়। তাকে রক্ষার নামে যে ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, তার অন্তর্গত যুক্তিই হল নিয়ন্ত্রণ। ফলে, নারীকে রক্ষা করতে হবে, এই ভাবনা ও সিদ্ধান্তের আড়ালে অনেক সময় যে প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে তা হল, নারীর ওপর অধিকার কার থাকবে? মনুস্মৃতির সামাজিক কল্পনায় সেই প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তিস্বাধীনতার দিকে যায় না। যায় পুরুষতান্ত্রিক অভিভাবকত্বের দিকে।

এখানেই সংবিধানের সঙ্গে মনুস্মৃতির ভাব ও আদর্শগত সংঘাত। মনুবাদে মানুষকে প্রথমে নাগরিক হিসেবে দেখা হয় না; সংবিধান মানুষকে প্রথমেই নাগরিক করে তোলে। মনুবাদের সামাজিক যুক্তি বলতে চায়—তোমার জন্ম কোথায়? তোমার বর্ণ কী? তোমার লিঙ্গ কী? তোমার কর্তব্য কী? তোমার ওপর কার অধিকার? বিপরীতে সংবিধানের নৈতিক ও মানবিক যুক্তি অন্য জায়গা থেকে শুরু করে—তুমি মানুষ। তোমার মর্যাদা কোথায়? তোমার স্বাধীনতা কোথায়? তোমার সমতা কোথায়? ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নং অনুচ্ছেদ আইনের চোখে সমতার প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৫ নং অনুচ্ছেদ ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ ও জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ১৯ নং নাগরিক স্বাধীনতার পরিসর নির্মাণ করে। ২১ নং জীবনের অধিকারকে এমন এক সাংবিধানিক মর্যাদা দিয়েছে, যার ভিতর দিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মর্যাদা, গোপনীয়তা, স্বায়ত্তশাসন এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে ভারতীয় সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম-নির্ধারণ নয়; মানুষের পরিচয়কে পুনর্লিখনের এক বিপ্লবী সংকল্পায়ন। জন্ম থেকে নাগরিকত্বে উত্তরণ, প্রজার অবস্থান থেকে অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তিসত্তায় স্থাপন, গোষ্ঠী-কর্তব্যের নির্ধারিত খাঁচা থেকে স্বাধীনতার সম্ভাবনাকে নির্ধারণ—ভারতের রাজনৈতিক আধুনিকতার সবচেয়ে বড়ো রূপান্তর এখানেই।

এই কারণেই মনুস্মৃতি ও সংবিধানের দ্বন্দ্বকে নিছক পুরোনো বনাম নতুনের দ্বন্দ্ব বলে দেখলে চলে না। বিষয়টি সময়ের দ্বন্দ্বের চেয়ে গভীর। তা মূলত মানুষের ধারণার দ্বন্দ্ব। মানুষ কি প্রথমে কোনো সামাজিক পরিচয়ের বাহক, তারপর কি মানুষ পরিচয়? নাকি সব পরিচয়ের আগে সে মানুষ? মানুষ কি জন্মসূত্রে প্রাপ্ত অবস্থানের ভিতর নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ করবে? নাকি নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখবে? সমাজ কি ব্যক্তিকে তার নির্ধারিত ভূমিকা অনুসারে গ্রহণ করবে? নাকি ব্যক্তির মর্যাদা তার ভূমিকা, ধর্ম, লিঙ্গ, যৌনতা কিংবা জন্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকবে? মনুবাদের ভারত প্রথম প্রশ্নগুলোর দিকে ঝুঁকে যায়; সংবিধানের ভারত সমর্থন করে শেষের ভাবনাগুলোকে। এই দুই ভারত একই ভূখণ্ডে সহাবস্থান করে। এবং আধুনিক ভারতীয় রাজনীতির গভীরতম সংঘাতগুলোর অন্যতম সক্রিয়তা এই সহাবস্থানের মধ্যেই।

নারীর প্রশ্নে দ্বন্দ্ব আরও নগ্ন হয়ে ওঠে। ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ ঐতিহ্য নারীকে দেবী করেছে—দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, শক্তি। কিন্তু দেবী বানিয়ে দেওয়া আর স্বাধীন মানুষ হিসেবে স্বীকার করা এক কথা নয়। যে সমাজ পূজার মঞ্চে নারীকে শক্তির প্রতীক করে—সেই সমাজই কখনও কখনও বাস্তব নারীর শরীর, পোশাক, প্রেম, যৌনতা, চলাফেরা, পেশা এবং রাজনৈতিক মতামতের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। কারণ দেবীর কোনো ব্যক্তিগত নাগরিক অধিকার লাগে না। ইচ্ছানুযায়ী দেবীর পূজা করা যায়, কিন্তু নারীর স্বাধীনতা মেনে নিতে হলে ক্ষমতার কাঠামো বদলাতে হয়। নারী দেবী নয়, প্রথমত এবং শেষত সে মানুষ— আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কি এই কথার ভিত্তিতে হওয়া উচিৎ নয়? তাই নারীকে অলৌকিক দেবী বানিয়ে দূরে সরিয়ে রাখা নয়, মানুষ হিসেবে তার পাশে দাঁড়ানো বা তাকে পাশে পাওয়াই মুক্ত রাজনীতির ভিত্তি হতে পারে। আর দেবী বানালেও সেই দেবী লৌকিক চেতনার ভিত্তিতে, প্রকৃতির জীবন্ত প্রতীক হিসেবে বর্ণিত হোক; অলৌকিক বাতাবরণ ঘনিয়ে দৈবতার দোহাই দিয়ে তাকে বন্দি করার ফন্দি যেন আর না-ফাঁদা হয়। তাতে অন্তত নারীর প্রতি জাগতিক কৃতজ্ঞতাটুকু অভিব্যক্ত হওয়ার পথ পাবে৷

এই কারণেই ‘বিকটদর্শন’ শব্দ রাজনৈতিকভাবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিকভাবে। নারীর শরীরকে সুন্দর, শালীন, আকর্ষণীয়, গ্রহণযোগ্য কিংবা অগ্রহণযোগ্য বলে বিচার করার ক্ষমতা কার? শরীরের কোন আকৃতি সামাজিক অনুমোদন পাবে? কোন পোশাক ভদ্র, কোন পোশাক অশালীন? কোন যৌনতা স্বাভাবিক, কোন আকাঙ্ক্ষা বিকৃত? প্রশ্নগুলো আলাদা মনে হলেও তাদের ভিতরে একই ক্ষমতার কাঠামো কাজ করে। পুরুষতন্ত্র যেমন নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, বাজারও তার শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। পুরুষতন্ত্র চায় নৈতিকতার নামে, বাজার চায় সৌন্দর্যের নামে। একজন বলতে চায়, নারীর শরীর শাসিত হবে; অন্যস্বর বলতে থাকে, নারীর শরীর বিক্রয়যোগ্য আদর্শে পৌঁছোতে হবে। ফলে শরীরের স্বাধীনতা কেবল যৌন স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; তা অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং মানবমর্যাদার প্রশ্ন। যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের ‘বিকৃত’ বলে চিহ্নিত করার মধ্যে তাই শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নেই। আছে স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণে নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ রাখার আকাঙ্ক্ষা।

এখানে যৌন ও লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষ এবং তার সঙ্গে জড়িত মানুষের অভিজ্ঞতাও ভারতীয় গণতন্ত্রের বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। সংবিধান যৌন পরিচয়ের প্রতিটি রূপের নাম আলাদা করে লেখেনি—কিন্তু সংবিধানের নৈতিক পরিসর ব্যক্তির মর্যাদা, স্বাধীনতা, সমতা ও স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত অস্তিত্বকে স্বাভাবিক বা ‘বিকৃত’ বলে বিচার করার জায়গায় রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র-পরিচালক থাকে না। ‘ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটিস’ মামলায় তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গোপনীয়তা রক্ষার যে অধিকার, তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি আছে। এবং সমকামী সম্পর্ককে অপরাধের পরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিচারিক বিকাশও ঘটেছে। সবমিলিয়ে ভারতীয় সংবিধান মানুষের শরীর ও পরিচয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের পুরোনো ধারণাকে ক্রমশ সংকুচিত করেছে। ফলে শরীর এখানে আর কেবল সামাজিক নীতির বিষয় নয়; শরীর নিজেই হয়ে উঠেছে এক স্বাধীনতার ভূখণ্ড।

এই জায়গাতেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং সেই সংক্রান্ত অস্থির অস্তিত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় যদি শুধু ডিগ্রি অর্জনের জায়গা হয়, তাহলে তার কোনো বিপজ্জনক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রশ্ন করে, তখন একাংশের কাছে তার অস্তিত্ব অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কারণ সবকিছুর বাইরে গিয়ে প্রশ্নই পূর্বতন এবং উত্তরাধিকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। যাদবপুরের ঐতিহাসিক পরিচয়ের মধ্যে সেই প্রশ্ন করার প্রবণতা বহুদিন ধরেই রয়েছে— বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি, শিল্প, ছাত্র-আন্দোলন, মুক্তচিন্তা, মতাদর্শগত বিতর্ক—সব মিলিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা যায় না; তাকে দেখতে হয় ভারতীয় গণতন্ত্রের এক পরীক্ষাগার হিসেবে। সেখানে কেউ ভুল বলবে বা ভুল করবে, সেই ভুলের প্রভাবও পড়বে, কেউ ইচ্ছামতো পোশাক পরবে, কেউ প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতাকে প্রত্যাখ্যান করবে, কেউ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলবে, কেউ আবার রাষ্ট্রের পক্ষেও যুক্তি দেবে—বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌবনের প্রাণশক্তি সেখানেই। যৌবন বিপদগামী, বিপথগামী হয়, আত্মসংশোধনের মধ্য দিয়েই ফেরে। আবার নৈয়ায়িকতার মধ্যে থেকেও অস্বস্তিতে ভোগে৷ সবক্ষেত্রে প্রশ্ন কিন্তু সক্রিয় থাকে৷ কখনো নিজেকে, কখনো প্রতিষ্ঠানকে, কখনো সরকারকে, কখনো সমাজকে। মোটকথা প্রশ্নহীন বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়; তা কেবল পরীক্ষাকেন্দ্র হয়ে নিজেকে অচলায়তনে পরিণত করে।

অবশ্য যাদবপুরের একুশ শতকের এই পর্বের ছেলেমেয়েদের নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হয়। শুধু তাদের বিরুদ্ধে উচ্চারিত ‘বিকৃত’ শব্দের প্রতিবাদ করে থেমে গেলে চলে না। যাদবপুরের প্রতিবাদী ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, ইচ্ছাও নেই; বরং সেই ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষার জন্যই তার নিজের সীমাগুলিকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন বলে মনে করি। কারণ যাদবপুরে রাজনীতি অনেক সময় শুধু রাজনৈতিক মত প্রকাশের মুক্ত মাধ্যম হয়ে থাকে না, অনেক ক্ষেত্রেই তা এক সাংস্কৃতিক ভঙ্গি হিসেবে উপস্থিত হতে দেখা যায়। পোশাক, ভাষা, দেওয়াললিখন, স্লোগান, সম্পর্কের প্রকাশ্য বিচরণ, সামাজিক মাধ্যমে দৃশ্যমানতা—এসব প্রতিবাদের প্রকাশ হতে পারে, কিন্তু এগুলির কোনোটিই আত্মশক্তির তীব্রতায় সামাজিক পরিবর্তনের প্রমাণ হয়ে ওঠেনি। প্রতিবাদ শুরু হয় অন্যায় প্রত্যাখ্যানের স্পর্ধা থেকে। আর সেখানেই তার সীমা শেষ হয়। তাকে বিপ্লবের দিকে যেতে হলে প্রথমে প্রশ্ন করতে হয়—এই অন্যায় কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে, কোন সামাজিক সম্পর্ক তাকে টিকিয়ে রাখছে এবং সেই সম্পর্কের ভিতরে আমাদের নিজেদের অবস্থান কোথায়। এখানেই প্রতিবাদ আত্মসমালোচনার ভিতর দিয়ে সামাজিক সমস্যার প্রকৃত পরিসরে প্রবেশ করে। তখন নিজেদের শ্রেণি, জাতিগত অবস্থান, বর্ণচিহ্ন, পারিবারিক সুবিধা, শিক্ষাগত সুযোগ, সাংস্কৃতিক পুঁজি কিংবা লিঙ্গগত সুবিধাকেও প্রশ্নের মধ্যে আনতে হয়। এর ফলে আরও কঠিন ধাপ আসে— তখন অন্যায়ের বিরোধিতা শুধু নৈতিক অবস্থান হিসেবে নয়, সামাজিক সম্পর্ক বদলের দায় হিসেবেও গ্রহণ করতে হয়। কারণ বিপ্লবের লক্ষ্য কেবল অন্যায় ক্ষমতাকে হঠানো নয়; যে কাঠামো একজনকে সুবিধা দেয় এবং অন্যজনকে বঞ্চিত করে, সেই সম্পর্কের পুনরুৎপাদনও বন্ধ করা। এই অর্থে ‘হোক কলরব’ যাদবপুরের ছাত্রপ্রতিবাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক মুহূর্ত—তা প্রতিবাদকে দৃশ্যমান করেছিল, প্রবল সংহতি ও বৃহত্তর জনপরিসর দিয়েছিল। কিন্তু কোনো আন্দোলনের তীব্রতা, জনপ্রিয়তা বা সাংস্কৃতিক অভিঘাত তাকে হঠাৎ করেই বিপ্লবে পরিণত করে না। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের বাইরে গিয়ে সমাজের ক্ষমতা-বণ্টন, সুবিধার উত্তরাধিকার এবং অসমতার পুনরুৎপাদনের ব্যবস্থাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা। সেই জায়গায় পৌঁছোতে না পারলে প্রতিবাদ ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিণত হয়—যেখানে বিদ্রোহের চিহ্নগুলি থাকে বটে, কিন্তু বিদ্রোহের সামাজিক দায় অদৃশ্য থেকে যায়। তখনই তা পরিণত হয় শৌখিন বিপ্লবে। বিপ্লব তখন আর সমাজ বা সমাজচেতনা বদলের কঠিন কর্তব্য হয়ে ওঠে না, সমাজ বদলের ডাকও তার মধ্য দিয়ে উচ্চকিত হয় না, তা হয়ে যায় কেবল নিজের প্রগতিশীল অবস্থানের প্রকাশ। তা ক্রমশ নিজের জীবনযাপনের নন্দনতত্ত্ব বদলানোর কথা বলে, কিন্তু নিজের সুবিধার কাঠামোকে অক্ষত রেখে সেই কথা চলতে থাকে। সেক্ষেত্রেও তারা ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় নিশ্চিত, কিন্তু নিজের ভিতরে ক্ষমতার যে অংশ গভীর নিরাপত্তার বেষ্টনীতে আছে, তাকে উচ্ছেদ করার প্রয়োজন অনুভব করে না। প্রতিবাদ তখন কেবলই উচ্চতর কণ্ঠস্বর পায়; কিন্তু বিপ্লব যে আত্মরূপান্তরের দায় অনুভব করার কথা বলে, তার স্বর অশ্রুতই থেকে যায়। প্রতিবাদ যখন নিজেই বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিণত হয়, তখন তার সামাজিক ভিত্তি নিয়ে আত্মসমালোচনার ক্ষেত্রই আর গঠিত হয় না। এই দায়ের জায়গাতেই দুটির প্রকৃত পার্থক্য। 

এইখানেই ‘শৌখিন বিপ্লব’-এর ভাবনা এসে যায়। যে ছাত্র বা ছাত্রী সহজেই রাষ্ট্র, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, পুরুষতন্ত্র কিংবা মনুবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হতে পারে, তার কাছে আরও কঠিন প্রশ্ন হল—নিজের শ্রেণিগত অবস্থান সম্পর্কে সে কতটা অস্বস্তি বোধ করে? যে পরিবার থেকে সে এসেছে, সেই পরিবারের শিক্ষাগত পুঁজি, ভাষাগত সুবিধা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক পরিচিতি এবং সাংস্কৃতিক পরিসর তার রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস তৈরিতে কতখানি ভূমিকা নিয়েছে? এই প্রশ্ন কাউকে অপরাধী করার জন্য নয়। কিন্তু এই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে ‘মেধা’ সম্পর্কে বিশেষভাবেই বিপজ্জনক সরলতা তৈরি হয়। কারণ পরীক্ষার খাতায় মেধা ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু মেধা বিকশিত হওয়ার সামাজিক পরিবেশ কখনও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত নয়। যে সমাজে জাত, শ্রেণি, অঞ্চল ও পারিবারিক সম্পদের ভিত্তিতে শিক্ষার সুযোগ মারাত্মকভাবে অসম, সেখানে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের দিকে তাকিয়ে সামাজিক ন্যায় বিচার করা যায় না। যাদবপুরের ছাত্রসমাজের কোনো অংশ যদি মনুবাদের বিরুদ্ধে তীব্র হয় অথচ সংরক্ষণের ঐতিহাসিক প্রয়োজন, জাতিগত বঞ্চনা, প্রান্তিক সম্প্রদায়ের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে অস্বস্তিকর নীরবতা বজায় রাখে, কিংবা দায়সারা দলীয় নির্দেশ পালন করে মাত্র, নিজের ভিতরে সেই সমস্যাকে জারিত না করে কেবল কৃত্রিম উদারনৈতিক প্রদর্শন চালায়, অথচ ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে বিপরীত ভাব বজায় রেখে চলে— তবে সেখানে মারাত্মক মৌলিক অসংগতি তৈরি হয়। যার ফল কিন্তু আরও সুদূরপ্রসারী৷ কারণ মনুবাদকে কেবল তার ধর্মীয় বা শাস্ত্রীয় ভাষায় প্রত্যাখ্যান করলেই তার সামাজিক উত্তরাধিকার বিলীন হয়ে যায় না। জন্মের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের যে কাঠামো একসময় প্রকাশ্য ছিল, তা আধুনিক সমাজে সময়-বিশেষে ‘যোগ্যতা’, ‘মেধা’, ‘রুচি’, ‘উৎকর্ষতা’ এবং ‘সাংস্কৃতিক মান’ ইত্যাদি নানা ভাষায় নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে। করতে পারে নয়, তীব্রভাবে করছে। কেবল ভঙ্গি অনেক সূক্ষ্ম, সুচারু। যাদবপুর কোথাও তার মধ্যে আটকে যাচ্ছে না তো? আরও নির্দিষ্ট প্রশ্ন এখানে জরুরি বলে মনে করছি। যাদবপুরের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই মূলধারার দলীয় রাজনীতির বাইরে নানা ছাত্র-সংগঠন, স্বাধীন উদ্যোগ ও প্রতিবাদী পরিসর তৈরি করেছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতারও তো শ্রেণিগত সীমা থাকতে পারে। ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে যে রাজনৈতিক ভাষা স্বতঃস্ফূর্ত, বুদ্ধিদীপ্ত এবং স্বাভাবিক বলে মনে হয়, তা গ্রামের কোনো প্রথম-প্রজন্মের বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়ার কাছে মোটেই একইভাবে স্বাভাবিক নয়। যে ভাষায় ‘স্বাধীনতা’, ‘বডি পলিটিক্স’, ‘জেন্ডার’, ‘কুইয়ার’, ‘প্রিভিলেজ’ কিংবা ‘আইডেন্টিটি’ নিয়ে আলোচনা হয়, সেই ভাষার সাংস্কৃতিক পুঁজি সবার কি সমান? ফলে যে ক্যাম্পাস নিজেকে মুক্তির ক্ষেত্র বলে জানে, তার নিজের ভাষাও কখনও কখনও এক নতুন সাংস্কৃতিক অভিজাত্য বা শ্রেণি-চরিত্র তৈরি করে ফেলছে বা ফেলতে পারে, সে-কথা কি ভাবার নয়? সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক সচেতনতা আর সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এক জিনিস কি থাকছে? কেউ প্রগতিশীল এলিট ভাষা জানে বলে ইচ্ছে করলেই সে প্রান্তিক মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার কাছাকাছি চলে যায় না। বরং কখনও ভাষার সেই তথাকথিত ‘দক্ষতা’ সামাজিক দূরত্বকে আড়াল করার আরেক ধাপ্পাবাজি হয়ে যাচ্ছে কিনা তা দেখবে কে? যাদবপুরের জন্য তাই প্রশ্ন—ক্যাম্পাসে কে কথা বলতে পারছে, শুধু তা দেখলে হবে না; কার ভাষাকে সহজে বুদ্ধিদীপ্ত বলে গ্রহণ করা হচ্ছে, কার অস্বস্তিকে পশ্চাৎমুখী বলে বাতিল করা হচ্ছে, এবং কার অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক তত্ত্বে অনুবাদিত হওয়ার আগেই প্রান্তে পড়ে থাকছে, তার কি কোনো মূল্যায়ন হচ্ছে? এই ভাবনা বাদ দিয়ে বিপ্লবী চেতনা কি প্রদর্শনযোগ্য ভঙ্গিসর্বস্ব হয়ে পড়ে না?

এই আত্মসমালোচনা নারীর প্রশ্নেও প্রয়োজন, তবে এখানেও তাদের স্বাধীনতাকে সন্দেহ করা হচ্ছে না। বরং তাদের চারপাশে তৈরি পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকে শনাক্ত করাই মূল উদ্দেশ্য। একজন ছাত্রী বা নারী নিজের পোশাক, শরীর, প্রেম, যৌনতা বা জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে—এ তার অধিকার। কিন্তু সেই স্বাধীনতাকে ক্যাম্পাসের কোনো পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি যদি নিজের যৌন কল্পনার উপাদান করে তোলে, তবে স্বাধীনতার সেই দাবির অর্থ বদলে যায় না; বদলে যায় তাকে দেখার পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। নারী যত স্বাধীন, পুরুষের তত বেশি অধিকার—এমন কোনো নৈতিক যুক্তি নেই। বরং নারী স্বাধীন বলেই তার স্বাধীনতার ওপর পুরুষের কোনো অতিরিক্ত দাবি থাকতে পারে না। নারীকে ‘রক্ষণশীল’ পুরুষ যেমন নিজের নৈতিকতার অধীন করতে চায়, তেমনই তথাকথিত প্রগতিশীল পুরুষ কখনও তার মুক্ত শরীরকে নিজের আধুনিক যৌন অধিকারের ক্ষেত্র বলেই ভাবতে পারে, মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির নাম দিয়ে তাকে সহজলভ্য ও সস্তা করে তুলতে পারে; এবং তাকে ব্যবহার্য ও ভোগ্য করে তোলার আলট্রা পথ নির্মাণ করে নিতে পারে। প্রথমটি নিষেধের পিতৃতন্ত্র, দ্বিতীয়টি অনুমোদনের ছদ্মবেশে ভোগের পুরুষতন্ত্র। দুটির মধ্যেই নারীকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র subject হিসেবে গ্রহণ করার ব্যর্থতা আছে। ফলে ক্যাম্পাসে নারী কতটা ‘মুক্ত’—এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, তার স্বাধীনতার অর্থ কে নির্ধারণ করছে এবং সেই অর্থ নির্ধারণে তার নিজের কণ্ঠ কতখানি চূড়ান্ত? কারণ যাদবপুরকে রক্ষণশীল সমাজের মতো করে বিচার করলে ভুল হবে। তার শক্তি তার প্রশ্নে, তার অস্বস্তিতে, তার কর্তৃত্ববিরোধী ঐতিহ্যে। কিন্তু সেই শক্তিই যদি আত্মসমালোচনাহীন হয়ে ওঠে, তবে প্রতিবাদ এক অভ্যাসে, স্বাধীনতার দাবি এক স্টাইলে, প্রগতিশীলতা নির্দিষ্ট পরিচয়ে এবং বিপ্লব একপ্রকার ক্যাম্পাস-নন্দনতত্ত্বে পরিণত হতে পারে। তখন ছাত্র-রাজনীতি সমাজের গভীর অসাম্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার বদলে নিজের সাংস্কৃতিক পরিসরেই ঘুরতে থাকে আর তাকেই পল্লবিত করে চলে।

যাদবপুরের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বিশ্লেষণে ছাত্রসমাজের বিভাজন, সংগঠনগুলির পারস্পরিক সংঘাত এবং ছাত্র-রাজনীতির পরিবর্তিত কাঠামোর কথা উঠে এসেছে। এমনকি ছাত্র আন্দোলনের ক্যাম্পাসে আবদ্ধ হয়ে পড়া এবং সামাজিক মাধ্যমের ভিত্তিতে তার নতুন রূপ পাওয়ার প্রশ্নও আলোচিত হয়েছে। তাই যাদবপুরের কাছে প্রশ্ন আসলে অন্যদের চেয়ে কঠিন: তোমরা কি শুধু মনুবাদের বিরুদ্ধে, নাকি নিজের সুবিধার সেই অংশের বিরুদ্ধেও, যা মনুবাদের দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাস থেকে কোনো না কোনোভাবে উপকৃত? তোমরা কি শুধু রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে প্রশ্ন করো, নাকি নিজেদের সাংস্কৃতিক ক্ষমতাকেও? তোমরা কি নারীর বাহ্যিক স্বাধীনতার পক্ষে, নাকি নারীর স্বাধীনতাকে আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শ্রেণিমাত্রার আকাঙ্ক্ষা থেকে আলাদা করে প্রকৃত সম্মান করার পক্ষে? তোমরা কি সংরক্ষণকে সমর্থন করো কেবল নীতিগতভাবে, নাকি নিজের সুবিধাপ্রাপ্ত ‘মেধা’র ধারণাকেও সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড় করাতে প্রস্তুত? তোমরা কি প্রান্তিক মানুষের হয়ে কথা বলো, নাকি এমন এক রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করো যেখানে প্রান্তিক মানুষকে আবারও তোমাদের ভাষাতেই নিজের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়? প্রশ্নগুলি যাদবপুরকে খাটো করার জন্য নয়; বরং তার নিজের ঘোষিত বৈচিত্র্য, স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার আদর্শকে আরও কঠিনভাবে সত্য করে তোলার জন্যই করছি। কারণ যে বিশ্ববিদ্যালয় অন্যকে প্রশ্ন করার নৈতিক অধিকার দাবি করে, তাকে নিজের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন করতে হয়। মনুবাদের প্রাচীন রূপ ছিল জন্মের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ; তার আধুনিক রূপ হতে পারে নিজের সামাজিক অবস্থানকে অদৃশ্য রেখে নিজের যোগ্যতাকে সর্বজনীন মাপকাঠি বলে প্রতিষ্ঠা করা। আরও সূক্ষ্ম সাংস্কৃতিক রূপ হতে পারে, নিজের স্বাধীনতার অভিজ্ঞতাকেই সকল মানুষের স্বাধীনতার স্বাভাবিক মডেল বলে চিহ্নিত বা প্রচার করে দেওয়া। বৈচিত্র্যের ভারত এই তিনটিকেই অস্বীকার করে। কারণ বৈচিত্র্য মানে তো শুধু বহু-মতের সহাবস্থান নয়। মানুষের অসম সামাজিক সূচনাবিন্দুগুলিকেও স্বীকার করা। সংরক্ষণ, জাতিগত বৈষম্য, শিক্ষাগত সুযোগের অসম বণ্টন কিংবা সাংস্কৃতিক পুঁজির উত্তরাধিকার তাই কেবল নীতিগত প্রশ্ন নয়; এগুলি সমতার বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন। সেই প্রশ্ন নিজের সুবিধার জায়গায় এসে পৌঁছোলেই মুক্তচিন্তার প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়। আগেই বলেছি, প্রতিবাদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তোলে; বিপ্লব সেই অন্যায়ের পুনরুৎপাদনকারী সামাজিক সম্পর্কের ভিত বদলাতে চায়। প্রতিবাদ যদি নিজের সামাজিক অবস্থান, সুবিধা ও দায়কে প্রশ্ন না করে, তবে তা শেষপর্যন্ত নিজের প্রগতিশীল পরিচয়ের মধ্যেই নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে আরও নির্মম বিভেদের পথ প্রশস্ত করে। তখন বিদ্রোহ আর সমাজরূপান্তরের কঠিন কর্মসূচি থাকে না। তা হয়ে ওঠে জীবনযাপনের এক নন্দনতত্ত্ব, এক সাংস্কৃতিক অভিজাত আত্মপরিচয়। যে আত্মপরিচয়ে আমেরিকা, ইউরোপ বা অপর মহাদেশীয় শিলমোহর আরও গর্বিত স্ট্যাটাস বয়ে আনতে সক্ষম হয় কেবল। সেখানেই তো শৌখিন বিপ্লবের গন্তব্য। তার ভাষা বিপ্লবী, ভঙ্গি প্রতিস্পর্ধী, প্রতীক আধুনিক; কিন্তু নিজের সুবিধার কাঠামো ভাঙার দায় সেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে অনুপস্থিত। তাই যাদবপুরের ছেলেমেয়েদের কাছে প্রশ্ন থাকবেই—তোমরা কিসের বিরুদ্ধে, শুধু সেটাই একমাত্র দেখার বিষয় নয়। তোমাদের নিজেদের সামাজিক অবস্থানের ভিতরে কোন ইতিহাস কথা বলছে, কোন সুবিধা তোমাদের স্বাধীনতাকে সহজ করেছে, কোন বঞ্চনা সেই স্বাধীনতাকে অন্যের কাছে কঠিন করে রেখেছে—সেই কথাও কি তোমরা শুনতে পাচ্ছ? আর সেই ইতিহাসের বিরুদ্ধে, নিজের বৈষম্যমূলক সুবিধার বিরুদ্ধে, তোমাদের মানবিক প্রতিবাদের কণ্ঠ কি কখনো সত্যিই কেঁপে উঠতে চেয়েছে?

যাই হোক, ফিরে আসি এই লেখার মূল লক্ষ্যে, ভারতের আধুনিকতার ইতিহাসও কিন্তু এই প্রশ্ন করার ইতিহাস। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন বিধবা বিবাহের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি শুধু পাশ্চাত্য যুক্তি ধার করে সমাজকে সংশোধন করেননি; শাস্ত্রের ভিতর থেকেও যুক্তি খুঁজে বের করেছিলেন। ১৮৫৬ সালের হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন কোনো দেশীয় শূন্য অবস্থা থেকে জন্ম নেয়নি। তার পেছনে ছিল দীর্ঘ সামাজিক সংগ্রাম, যুক্তি, শাস্ত্রব্যাখ্যা এবং মানবিক বিবেকের সংঘর্ষ। পরে ড. বি. আর. আম্বেদকর আরও মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন—শুধু রাজনৈতিক গণতন্ত্র দিয়ে কি সমাজ গণতান্ত্রিক হয়? ভোটাধিকার থাকলেই কি মানুষ সমান হয়ে যায়? আইন যদি সমতার কথা বলে, কিন্তু সমাজ যদি জন্মের ভিত্তিতে মানুষকে উচ্চ-নীচ করে রাখে, তাহলে সংবিধানের প্রতিশ্রুতিই তো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আম্বেদকরের সামাজিক গণতন্ত্রের ধারণা তাই মনুবাদ ও সংবিধানের সংঘাতকে আরও গভীরতর ও প্রসারিত করে তোলে। সংবিধান তো কেবল রাষ্ট্রের আইন বদলাতে চায়নি; তা মানুষের বৈষম্যের বিপরীতে পারস্পরিক সম্পর্কের নৈতিক ভিত্তিও বদলাতে চেয়েছে।

ফলত ভারতীয় সংবিধানকে ‘বিদেশি’ বলে দেগে দেওয়া যেমন হাস্যকর, তেমনই ইতিহাসকে একচক্ষু করে রাখার সুবিধাতান্ত্রিক ভঙ্গি-প্রচার। আধুনিক সাংবিধানিক কাঠামোর কিছু ধারণা ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে গভীর আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে, এ-কথা সত্য। কিন্তু ভারতের সংবিধান কোনো বিদেশি ছাঁচে বসানো ‘রেডিমেড পণ্য’ নয়। তার ভিতরে আছে ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা, ভিন্ন পথ ও মতের দীর্ঘকালীন স্বাধীনতা সংগ্রামের কথকতা, সামাজিক সংস্কার, জাতিভেদের বিরুদ্ধে লড়াই, নারীর অধিকার, শ্রমিকের দাবি, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা এবং সহস্র বছর জুড়ে চলা ভারতীয় আত্মসমালোচনার উত্তরাধিকার। সংবিধান ভারতকে তার অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি; বরং অতীতের ভিতরকার মুক্তির স্রোতগুলোকে আধুনিক রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিতে রূপ দিতে চেয়েছে। ভারতীয় ঐতিহ্যের যে অংশ মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, সংবিধান তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে। যে অংশ মানুষকে জন্মের খাঁচায় বন্দি করতে চায়, সংবিধান তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

তাই ‘মনুবাদের ভারত’ কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ভারত নয়, আর ‘বৈচিত্র‍্যের ভারত’ কোনো কল্পিত ইউটোপিয়া নয়। দুটোই ভারতীয় বাস্তবতার ভিতরে সক্রিয় দুই প্রবণতা। এক প্রবণতা চায় পরিচয়কে স্থির রাখতে, শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে, নারীকে রক্ষার নামে তাকে পুরুষালি অভিভাবকত্বের অধীন রাখতে, ভিন্ন যৌনতা ও ভিন্ন জীবনযাপনকে সন্দেহের চোখে দেখতে, প্রশ্নকে অবাধ্য অসভ্যতা বলে চিহ্নিত করতে এবং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে প্রাকৃতিক ও দৈবিক বলে প্রতিষ্ঠা করতে। আর অন্য প্রবণতা বিশ্বাস করে—মানুষ জন্মের ভিতিতে কোনো বর্ণ নিয়ে আসে না, নাগরিকত্বের উপরে মানুষ আর কোনো সামাজিক শ্রেণির শংসাপত্র বহন করে না। তার মর্যাদা তার অস্তিত্বের অন্তর্গত। প্রথম প্রবণতা সমাজকে স্থবির করে রাখতে চায়। দ্বিতীয় প্রবণতা সমাজকে ন্যায়সংগত সাম্যে স্থিত করে সমষ্টিচেতনায় চলমান রাখতে চায়। প্রথমটি শৃঙ্খলার নামে আনুগত্য দাবি করে; দ্বিতীয়টি স্বাধীনতার ভিতর দিয়েও সন্ধান করে চলে দায়িত্ব।

ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই দুই প্রবণতার মধ্যে কোনটি শেষপর্যন্ত তার গণতান্ত্রিক কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, তার ওপর। কারণ গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়। গণতন্ত্র মানুষের মুখের স্বাধীনতা, শরীরের স্বাধীনতা, ভালোবাসার স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, বিশ্বাস করার ও অবিশ্বাস করার স্বাধীনতা, নিজের জীবন নিজের মতো করে নির্বাচন করে নেওয়ার অধিকার। কোনো রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে আধুনিক হয়, যখন সে নাগরিককে তার অনুগত পরিচয়ের জন্য নয়, তার মানবিক মর্যাদার জন্য স্বীকৃতি দেয়। আর কোনো সভ্যতা তখনই সত্যিকার অর্থে মহান হয়, যখন সে নিজের ভিতরের অন্যায়কে পবিত্রতার নামে রক্ষা না-করে, নিজের সংস্কারের সঙ্গেই দ্বন্দ্বে নামার সাহস রাখে।

মনুবাদের ভারত আমাদের অতীতের এক শক্তিশালী সামাজিক কল্পনা—তার ভিতরে শৃঙ্খলা আছে, শ্রেণিবিন্যাস আছে, কর্তব্য আছে, কিন্তু সমতার আধুনিক ধারণা নেই। সংবিধানের ভারত এক অসমাপ্ত সংকল্পায়ন—তার ভিতরে প্রতিশ্রুতি আছে, স্বাধীনতা আছে, সমতা আছে, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব করার জন্য প্রতিনিয়ত প্রয়োজন সামাজিক সংগ্রাম। তাই মনুবাদ বনাম সংবিধানের সংঘাত শেষ হয়ে যায়নি। সংসদে, আদালতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাস্তায়, পরিবারের ভিতরে, নারীর শরীরে, নারীর অস্তিত্বে, প্রেমের অধিকারে, ভাষার স্বাধীনতায়, পোশাকের স্বাধীনতায়, রাজনৈতিক মতপ্রকাশে—সংঘাত প্রতিদিন নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে। যখন কোনো নারীকে তার যুক্তির বদলে শরীর দিয়ে বিচার করা হয়— যখন কোনো ছাত্রকে তার রাজনৈতিক মতের বদলে চেহারা দিয়ে অপমান করা হয়— যখন কোনো যৌন পরিচয়কে ‘বিকৃতি’ বলা হয়— যখন কোনো প্রশ্নকে ‘সংস্কৃতিবিরোধী’ বলে চুপ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়— তখনই জানতে হবে মনুবাদের ভারত আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। আর যখন কোনো মানুষ দাঁড়িয়ে বলে—আমার জন্ম আমার মর্যাদা নির্ধারণ করবে না, আমার শরীরের ওপর আমার অধিকার আছে, আমার ভালোবাসা অপরাধ নয়, আমার প্রশ্ন রাষ্ট্রদ্রোহ নয়, আমার ভিন্নতা আমাকে মানুষ হিসেবে হীন প্রতিপন্ন করে না—তখনই জানতে হবে সংবিধানের ভারত কথা বলছে।

ফলত প্রশ্নটা তাহলে কী দাঁড়াল? মনুবাদকে আমরা মানব কি না, কিংবা সংবিধানকে আমরা শ্রদ্ধা করব কি না? বিষয়টা এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন, ভারতকে আমরা কোন নৈতিক সামাজিক মানবিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চাই? এমন ভারত, যেখানে মানুষকে আগে কোনো শ্রেণিতে বসিয়ে তারপর তার মানবিকতা স্বীকার করা হবে? নাকি এমন ভারত, যেখানে মানুষ তার সমস্ত পরিচয়, পার্থক্য, আকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস নিয়েও প্রথমে মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক বলে স্বীকৃত হবে? ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের জানায়, সর্বদা দ্বিতীয় পথের বীজও আমাদের মাটিতেই ছিল—উপনিষদের প্রশ্নে, বুদ্ধের প্রত্যাখ্যানে, চার্বাকের সংশয়ে, ভক্তির বিদ্রোহে, সুফির মানবপ্রেমে, বিদ্যাসাগরের সংস্কারে, রবীন্দ্রনাথের মুক্তচিন্তায়, আম্বেদকরের সামাজিক ন্যায়বোধে। সংবিধান সেই দীর্ঘ আত্মসংঘাতের আধুনিক রাজনৈতিক ভাষা। তাই সংবিধানকে রক্ষা করা মানে কেবল রাষ্ট্রীয় বিধানকে রক্ষা করা নয়; ভারতীয় হাজার হাজার বছরের সভ্যতায় যে প্রশ্ন করার অধিকার প্রবহমান, তাকে রক্ষা করা। আর মনুবাদকে প্রত্যাখ্যান করা মানে কোনো ধর্ম, কোনো সম্প্রদায় বা কোনো নীতিমালার ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং ঐতিহ্যের ভিতর যে আধিপত্য মানুষকে মানুষের ভেদ-দৃষ্টিতে ছোটো করেছে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কারণ প্রকৃত বিচারে সভ্যতার মর্যাদা তার প্রাচীনতার সময়-গৌরবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে না, উজ্জ্বল হয় তার আত্মসংশোধনের বিবর্তনশীল সক্ষমতায়। সংস্কৃতির মহত্ত্ব তার নিষেধের সংখ্যাধিক্যে থাকে না, থাকে তার স্বাধীনতার পরিসরে। রাষ্ট্রের শক্তি তার নাগরিককে নিরঙ্কুশ শাসন বা বাধ্যবাধকতার মধ্যে রেখে নির্ণীত হতে পারে না; নাগরিককে কতখানি মর্যাদা দিতে পারল, তার ধারণপদ্ধতির মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে।

মানুষই চিরকাল সর্বোচ্চ, তার উপর ন্যস্ত কোনো সময়কালীন বিধান নয়। মর্যাদাই বড়ো, কোনো প্রথা নয়। স্বাধীনতাই চিরকাল আকাঙ্ক্ষিত, কোনো আধিপত্য নয়। আসলে বৈচিত্র্য কোনো দুর্বলতা নয়, বৈচিত্র্যই সভ্যতার প্রাণশক্তি। ভারতকে যদি সত্যিই ভারত থাকতে হয়, তবে তাকে তার বহু কণ্ঠ, বহু শরীর, বহু বিশ্বাস, বহু অবিশ্বাস, বহু ভাষা, বহু প্রেম এবং বহু প্রশ্নকে ধারণ করতেই হবে। কারণ যে সময়পর্বের ভারত নিজের ভিতরের ভিন্নতাকে ভয় পাবে, তা শেষপর্যন্ত নিজের ইতিহাসকেই মুছে ফেলবে। আর যে ভারত ভিন্নতাকে স্বীকার করতে পারে, প্রশ্নকে জায়গা দিতে পারে, নারীর শরীরকে তার নিজের বলে মানতে পারে, ভালোবাসাকে অপরাধ না-বানিয়ে মানুষকে সহ-নাগরিক হিসেবে দেখতে পারে—সেই ভারতই তার গভীরতম সভ্যতাগত উত্তরাধিকারকে বহন করতে পারে; পেরেছে। আর সেই ভারতকেই তো চিরকালীন সাধকের ভাবনায় কবিকণ্ঠের উচ্চারণে আমরা বলতে পেরেছি ‘ভারততীর্থ’।

 

তথ্যসূত্র

১. সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মনুসংহিতা।

২. ভারতের সংবিধান, বাংলা সংস্করণ, বিধি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

৩. বি. আর. আম্বেদকর, নির্বাচিত রচনা সংকলন, সম্পা. কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর।

৪. সুকুমারী ভট্টাচার্য, প্রাচীন ভারতে নারী ও সমাজ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি।

৫. সুকুমারী ভট্টাচার্য, প্রাচীন ভারত : সমাজ ও সাহিত্য।

৬. দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ভারতীয় দর্শন, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি।

৭. সুকোমল সেন, ভারতের সভ্যতা ও সমাজ বিকাশে ধর্ম, শ্রেণী ও জাতিভেদ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি।

৮. শিবনাথ শাস্ত্রী, জাতিভেদ।

৯. বি. আর. আম্বেদকর, অস্পৃশ্য মানুষেরা : কারা এবং কেন?

১০. বি. আর. আম্বেদকর, বুদ্ধ অথবা কার্ল মার্কস।

১১. এস. চক্রবর্তী, ড. আম্বেদকর ও জাত বর্ণ শ্রেণি, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি।

১২. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের সমাজসংস্কার-সংক্রান্ত নির্বাচিত রচনা।

 

 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top