ব্রাজিল ও জোগা বনিতো| পর্ব-৭| ১৯৮২

১৯৮২: সৌন্দর্য হারেতবু হার মানে না

জিকোসক্রেটিস ও এক অসম্পূর্ণ পরিপূর্ণতার দর্শন

১৯৭০-এর পরে ব্রাজিলীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা সাফল্য ছিল না— ছিল নীরবতা। এই নীরবতা আসে তখনই, যখন সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে বলে মনে হয়। ১৯৭০ যেন সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল। সৌন্দর্য কাজ করে— এই বিশ্বাসও প্রতিষ্ঠিত। দলগত শিল্প সম্ভব— এই প্রমাণও হাজির। ঝুঁকি নেওয়া মানেই আত্মঘাতী নয়— এই সাহসও ছিল প্রায় অব্যয়। কিন্তু ইতিহাস বড়ো নিষ্ঠুর। যে-মুহূর্তে কেউ ভাবেন, আপনি লক্ষ্যে পৌঁছে গেছেন, সেই মুহূর্তেই ইতিহাস নতুন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। ‘১৯৮২’ সেই প্রশ্ন। প্রশ্নটি হলো— সৌন্দর্যকে কি জিততেই হবে? নাকি সৌন্দর্য নিজের শর্তে বাঁচতে পারে? প্রশ্নের উত্তর ‘১৯৮২’ দেয়নি। বরং প্রশ্নটাকেই স্থায়ী করে দিয়ে গেছে। এই কারণেই ‘১৯৮২’ কখনো হার হিসেবেও সম্পূর্ণ আলোচিত হয় না। এ-এক দ্বৈত-অবস্থান। ১৯৮২-র ব্রাজিলকে অনেকেই বলেন— সর্বকালের সেরা দল, যারা বিশ্বকাপ জেতেনি। বাক্যটির মধ্যেই এক দার্শনিক দ্বন্দ্ব লুকিয়ে আছে। সেরা মানে কি জয়? নাকি সেরা মানে সম্ভাবনার পরিসর?

১৯৮২-ই সেই পরিসর। এই দল মাঠে নামত এমন এক আত্মবিশ্বাস নিয়ে, যেখানে জয় কোনো আলাদা লক্ষ ছিল না। লক্ষ ছিল খেলা ঠিকভাবে খেলা। ‘ঠিকভাবে’ বিষয়টা আবার ফিরে আসে। কিন্তু এবার এর অর্থ বদলে গেছে। ১৯৭০-এ ‘ঠিক’ মানে ছিল ভারসাম্য। ১৯৮২-তে ঠিক মানে হয়ে গেল বিশ্বাস। বিশ্বাস যে— বল খেলোয়াড়ের পায়ের কাছে নিরাপদ। বিশ্বাস যে— পাসই সমাধান। বিশ্বাস যে— চিন্তা দেহের আগে আসবে।

এই বিশ্বাসের নাম জিকো। জিকো কোনো বিস্ফোরণ নন। তিনি কোনো গ্যারিঞ্চা নন। তিনি কোনো পেলে নন। তিনি একজন অদ্ভুত চিন্তাশীল মানুষ, যিনি বল পেলে খেলার বহুমুখী সম্ভাবনাগুলো দেখতে পান। আরেকটি হলো তার হিসেব। যা অবশ্য শুষ্ক নয়। কবিতার পংক্তির মতো— ছন্দে বাঁধা, কিন্তু তার বিস্তার আগাম বলা যায় না। ১৯৭০-এর পর ব্রাজিল বুঝতে পারে— বিশ্ব তাদের অনুকরণ করছে। কিন্তু অনুকরণকারীদের ভিড়ে শ্রেষ্ঠ থাকা কঠিন। ইউরোপীয় ফুটবল দ্রুত সংগঠিত হচ্ছে— জোনাল মার্কিং, ফিজিক্যাল কন্ডিশনিং, ফলাফলকেন্দ্রিক পরিকল্পনা। ব্রাজিলের শুধু স্কিল দিয়ে আর বিস্ময় জাগানো যাচ্ছে না; প্রতিপক্ষও প্রস্তুত। এই মুহূর্তে সৌন্দর্যকে রক্ষা করতে হলে দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তন। জিকো যেন সেই বুদ্ধিবৃত্তিক সৌন্দর্যের গণিত। জিকোই হলেন এই বিবর্তনের মুখ। তিনি দেখালেন— স্কিল মানে শুধু ড্রিবল নয়; স্কিল মানে সমীকরণ। তাঁর ফ্রি-কিক ছিল অধ্যয়ন; পাস ছিল কৌণিক হিসাব; অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট ছিল স্পেস-ম্যানেজমেন্ট। জিকোর শিল্প নীরব নয়— তা শৃঙ্খলিত সৌন্দর্য। জিকোর কৃতিত্ব ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ব্রাজিলীয় তথা বিশ্ব-ফুটবলে ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্লে-মেকার’-এর ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর খেলায় জোগো বনিতো যুক্তি পায়, আর জোগা বনিতো পায় দায়িত্ববোধ— ঝুঁকি নেওয়া হবে, কিন্তু অন্যভাবে, ঠিক অন্ধভাবে নয়। জিকো বুঝতেন— স্কিল যদি সময়ের তরঙ্গের সঙ্গে না-মেশে, তবে তা হবে আত্মঘাতী। এই উপলব্ধিই তাঁকে ১৯৮২-র কেন্দ্রে রাখে।

কিন্তু ‘১৯৮২’ শুধু জিকোর দল নয়। সক্রেটিসেরও দল। সক্রেটিসকে বোঝা একপ্রকার কঠিন, কারণ তিনি দৌড়ান না। তিনি মাঠে সোচ্চারও না। সক্রেটিস হলেন ননচ্যালান্ট নেতৃত্ব। অর্থাৎ শান্ত, নিরুদ্বেগ ও উদাসীন আচরণ, যার কোনো বিষয়ে কোনো দুশ্চিন্তা, আগ্রহ বা উত্তেজনা প্রকাশ পায় না। গুরুত্বপূর্ণ বা জটিল পরিস্থিতিতেও যিনি সম্পূর্ণ নির্বিকার এবং সহজ-স্বাভাবিক থাকেন। সক্রেটিস অবশ্য ছিলেন এই পর্বের নৈতিক কণ্ঠ। লম্বা দেহ, ধীর গতি, অথচ তীক্ষ্ণ সিদ্ধান্ত— হিল-পাসে তিনি খেলার টেম্পো বদলে দিতেন। সক্রেটিসের স্কিল ছিল অলসতার ভান। তিনি দেখালেন— সব সৌন্দর্য উচ্চস্বরে আসে না; কিছু সৌন্দর্য ভাবনার গোপন কোষে জন্ম নেয়। তিনি বলের সঙ্গে তাড়াহুড়ো করেন না। যেন হাঁটেন। কিন্তু হাঁটার ভেতরে আছে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা। সক্রেটিসের খেলায় লয় ধীর হয়। তা অবশ্য প্রতিপক্ষের জন্য বিপজ্জনক। কারণ এখানে দেরি হওয়া নেই; আছে এক চটুল অপেক্ষা। অপেক্ষা মানে গোপন সক্রিয়তা। ঠিক মুহূর্তটি বেছে নেওয়া। এই ক্ষমতাই সক্রেটিসকে দার্শনিক করে তোলে। মাঠের বাইরে সক্রেটিস গণতন্ত্রের কথা বলতেন; মাঠের ভেতরে খেলতেন স্বাধীনতার ভাষায়। তাঁর উপস্থিতিতে জোগা বনিতো কেবল কৌশল নয়, রাজনৈতিক অবস্থান হয়ে ওঠে। তিনি মাঠে রাজনীতি করতেন না, কিন্তু তাঁর খেলাই ছিল রাজনৈতিক দর্শণ। কারণ তিনি সোচ্চারে বলতেন— তাড়াহুড়ো একপ্রকার দাসত্ব। স্বাধীনতা মানে সময়ের উপর অধিকার। অধিকারের এই দাবি ১৯৮২-র সৌন্দর্যের অপর কেন্দ্র।

এই দলে ছিলেন ফালকাও। মাঝমাঠের গভীরতা। ছিলেন সেরেজো। ছিল এদের সবাইকে নির্দিষ্ট-সূত্রে ধরে রাখার এক নীরব বোধ। এই বোধ হলো— খেলা নিজের মুক্তির আনন্দে খেলো। এই ব্রাজিল দল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দলগুলোর একটি। তারা জেতেনি, তবু অমর। কারণ এই দলটি প্রমাণ করেছিল— ফুটবল কী হতে পারে! ৮২-র খেলায় ডিফেন্স ছিল না, এমন অভিযোগ বহুবার এসেছে। কথাটি ভুল। বিশেষ অর্থেই ভুল। ডিফেন্স ছিল, কিন্তু শঙ্কার উপর দাঁড়ানো নয়। বিশ্বাসের উপর দাঁড়ানো। বিশ্বাস এই যে, আমরা আক্রমণ থামাব না। কারণ থামা মানেই নিজেকে অস্বীকার করা। যা ১৯৮২-র ব্রাজিল করতে রাজি ছিল না। এইখানেই তারা হারল। কিন্তু এই হার কৌশলগত নয়। এই হার অস্তিত্বের দৃঢ়তায় নৈতিক আদর্শের লক্ষ্যে স্থিত থাকারই ফল।

ইতালির বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে ব্রাজিল জানত— ড্র করলেই চলবে। জানা থাকা সত্ত্বেও তারা খেলেছে জেতার জন্য। এ কি ভুল? আসলে ইতালির কাছে এই হার কৌশলগত ছিল না; ছিল দর্শনের পরাজয়। এই পরাজয়ের পর বিশ্ব ফুটবল বিভক্ত হয়— একদল বলে, সৌন্দর্য ঝুঁকি; আরেকদল বলে, ঝুঁকি না-নিলে সৌন্দর্য মরে। ‘১৯৮২’ হয়তো এই বিতর্কের চিরস্থায়ী রেফারেন্স। ১৯৮২-র ব্রাজিল হয়তো ভুল ছিল। কিন্তু তা অপরাধ নয়। কারণ এই সিদ্ধান্তটি এসেছিল সেই গভীর বিশ্বাস থেকে— আমরা অন্যভাবে হিসেবি ছক-ভিত্তিক খেলতে পারি না। এই ‘না-পারার’ ভেতরেই ১৯৮২-র সৌন্দর্য। বিশ্ব-ফুটবলের অপার বিস্ময় ও কৌতূহল। এই সৌন্দর্য আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ তা ফলাফলকে স্পষ্ট করে; প্রশ্ন করে। আমরা অভ্যস্ত এই ভাবনায়— সেরা মানেই জয়। জয় মানেই শ্রেষ্ঠত্ব। কিন্তু মনে এটাও রাখতে হয় যে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যের নায়করা অধিকাংশই পরাজিত কিংবা অসম্পূর্ণ বিজয়ের অধিকারী। আসলে তা হতে হয় ‘মহৎ পরাজয়’। বিশ্ব-ফুটবলে এই একবারই মহৎ পরাজয়ের গৌরব ব্রাজিল ঐতিহ্য-স্বরূপ অর্জন করতে পেরেছে। ব্রাজিলই পেরেছে। আর কোনো দল নয়। ১৯৮২-র কথা বললে পাওলো রোসির ইতালির বিজয়ের আগে জিকো-সক্রেটিস-ফালকাওয়ের ব্রাজিলের পরাজয়ের কথাই বলে থাকে সবাই। ‘১৯৮২’-ই একমাত্র সেই সাল, যে সালের সঙ্গে পরাজিত ব্রাজিলের মহত্বই জড়িয়ে আছে। এই ব্যতিক্রম ফুটবল কেন, সর্বক্ষেত্রে বিস্ময়করভাবেই অবিস্মরণীয়। কারণ ‘১৯৮২’ বলতে পেরেছিল— সেরা মানে নিজের আদর্শের সংকল্পিত শর্তে অটল থাকার কথা। এই অবস্থান বিশেষ ত্যাগমুখী ঔদার্যময় শ্লাঘায় পূর্ণ। কারণ ইতিহাস জয়ীদের মনে রাখে। আর ১৯৮২-কে মনে রাখে অন্যভাবে। যা থেকে যায় এক ধরনের মানদণ্ড হিসেবে— যেখানে জেতা-হারা ব্যাপারটা প্রশ্নের অনেক বাইরে চলে যায়।

এই কারণেই ‘১৯৮২’ বারবার ফিরে আসে। প্রতিযুগে প্রতিবার যখন ফুটবল অন্ধ-হিসেবি হয়ে ওঠে, প্রতিবার যখন শিল্পিত আনন্দকে বোকামি বলা হয়, ‘১৯৮২’ তখন একা দাঁড়িয়ে থাকে ভিন্ন-স্রোতের কাণ্ডারী হয়ে। নিঃশব্দে। কোনো পারানির দাবি না-রেখে। এই নীরবতাই তার স্বাতন্ত্রের শক্তি। যে শক্তি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ভয়ংকর দুঃশ্চিন্তার হয়ে ওঠে। কারণ এর দায় মারাত্মক। যদি তুমি সৌন্দর্য বেছে নাও, তবে হারের দায়ও নিতে হবে। অধিকাংশই এই দায় নিতে পারে না। ১৯৮৬-তে কারেকা যেন ‘১৯৮২’-র নীরব কার্যকারী দায় বহনের অংশীদার হয়েই আসেন। ‘১৯৮২’-র দ্বন্দ্বের ভেতর থেকেই উঠে আসেন কারেকা। নিজস্ব এক সময়-নির্ভর মৌলিকতায় তিনি ড্রিবল দিয়ে নয়, টাইমিং দিয়ে গোল করেন। তাঁর স্কিল চোখে পড়ে না; কিন্তু ফাইনাল কাজটি মনে গেঁথে থাকে। কারেকা শেখালেন— জোগা বনিতো মানে প্রতিটি মুহূর্তে শিল্প দেখানো নয়; কখনো কখনো শিল্প অপ্রয়োজনীয়তাকেও বর্জন করে আরও সুচারু শিল্প হতে পারে। কারেকা সেই দায় বহনের দ্বন্দ্বে নিজেকেই শহিদ করে ফেলেন। তবু তার দ্বারা উদ্ভাবিত ‘সিক্স-ইয়ার্ড বক্সের শিল্প’ বিশ্ব-ফুটবলে দ্বিধাহীন ধারাবাহিকতায় গ্রহণীয় ও ব্যবহৃত হয়েছে। তাকে অনেকে ভুলে গেলেও তার এই শিল্প আজও প্রতিটি ফুটবল দলে ও খেলায় মর্যাদার সঙ্গে অনুশীলিত হয়ে চলেছে।

অতঃপর ‘১৯৮২’ ও ‘১৯৮৬’-র দায় নেওয়ার পরেই ব্রাজিলীয় ফুটবল আবার সাফল্যের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। একটু অন্যভাবে। একটু সংযত হয়ে। এই সংযমের কারণ উত্তর-বিশ্বায়ন বাস্তববাদ। সেই গল্পই থাকবে পরের পর্বে।

(চলবে…)

#ড. অনিশ রায়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top