১৯৭০: জোগো বনিতো যে-ভাবে ইতিহাস ছাড়িয়ে মহাকাব্যিক ক্লাসিক বিস্তৃতি পেয়ে গেল
১৯৭০-কে আমরা একটি অসামান্য, সর্বশ্রেষ্ঠ দলের গল্প হিসেবে জানি। কিন্তু আসলে ‘১৯৭০’ সেই-অর্থে কোনো দল নয়— এ ইতিহাসের সহস্র মুহূর্তের সঞ্চয়, যেখানে ব্রাজিলীয় ফুটবল নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া সম্পন্ন করেছিল। যে বোঝাপড়াটা জরুরি ছিল। কারণ ১৯৫৮ ও ১৯৬২-এর আনন্দ, গ্যারিঞ্চার স্বাধীনতা, পেলের দায়িত্ব— সবকিছু মিলেও একটি অস্বস্তি থেকে গিয়েছিল।
অস্বস্তির প্রশ্নটাও ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু নির্মম। এত সুন্দর খেলা কি দীর্ঘদিন টেকে? নাকি সৌন্দর্য নিজেই নিজের সীমা? ‘১৯৭০’ সেই প্রশ্নের উত্তর নয়; ‘১৯৭০’ সেই প্রশ্নের অবসান। এই দলে কেউ কাউকে প্রমাণ করতে মাঠে নামেনি। কেউ নিজের জায়গা দখল করতে আসেনি। সবাই জানত— এই খেলাটা একা জেতা যাবে না, আবার অতি-সমঝোতার নামে আনন্দ বিসর্জনও দেওয়া যাবে না। এই দুইয়ের মাঝখানে যে সূক্ষ্ম পথ, কিংবা অন্যত্র যে পথ, সেই পথেই ১৯৭০-এর দল হাঁটতে পেরেছিল।
হাঁটার গতি খুব ধীর নয়, আবার তাড়াহুড়োও নয়। এমন এক গতি, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় থাকে, কিন্তু কোনো দ্বিধা জন্মায় না। এই গতি আসলে বিকল্প-চিন্তার প্রকল্পহীন গতি। এই কারণেই ১৯৭০-এর সেই ব্রাজিলীয় ফুটবল এমন এক দল, বলতে হয় প্রথম সেই দল, যা শুধু খেলোয়াড়দের সমষ্টি নয়। যা এক ধরনের সমবায়ী বুদ্ধি ও বোধের উৎসারণ। যার প্রথম লক্ষণ— কেউ কেন্দ্র দখল করেনি। পেলে ছিলেন, কিন্তু তিনি কেন্দ্র ছিলেন না। তোস্তাও ছিলেন, কিন্তু তিনি স্ট্রাইকার হয়েও স্ট্রাইক পজিশনে কেবল থাকেননি। রিভেলিনো ছিলেন, কিন্তু তিনি শুধুই বাঁ-পায়ের জাদুকরী স্কিলের ও শক্তির বিস্ফোরণ নন। জেয়ারজিনহো ছিলেন, কিন্তু তিনি উইংয়ের সীমা অতিক্রম করে গেছেন। এই সীমানার মধ্যে সীমা-না-মানাটাই গুরুত্বপূর্ণ। সীমা ভাঙা অবশ্য বিশৃঙ্খলায় নয়; সীমার যে প্রয়োজন ফুরিয়েছে, এটাকেই নান্দনিক কৌশলের ছলনায় প্রতিষ্ঠা করা। ৭০-এর ফুটবল এমন এক স্তরে পৌঁছেছিল, যেখানে কাঠামো আর শৃঙ্খলিত নয়, বরং বনভূমির নিজস্ব সৌকর্যে স্মৃতির দৃশ্য-মালা যেন। খেলোয়াড়রা জানত— কে কোথায় থাকবে, কে কখন কোথায় আসবে, কিন্তু এই জানা কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশে হয়ে ওঠে না; অনুভবের অতি সূক্ষ্মতায় তা অরগ্যানিক প্রক্রিয়ায় স্ব-সম্পন্ন হয়। এই অনুভব একসঙ্গে খেলার অভ্যাস থেকে আসে না, আসে একসঙ্গে ভাবার অভ্যাস থেকে। এইখানেই ১৯৭০ স্বতন্ত্র, বিশেষ অর্থেই একক।
এই দল স্কিলকে আলাদা করে সম্মান করেনি। স্কিল মারাত্মকভাবে ছিল, কিন্তু তা ‘দেখানো’ হয়নি, অর্থাৎ তা প্রদর্শনবাদ হয়ে ওঠেনি। বরং প্রদর্শনবাদের সব মাত্রা ছাড়িয়ে হয়েছিল প্রয়োজনের দর্শন। স্কিলের কাব্যিকতা ছিল প্রয়োজনের অস্থি-মাংসের ভিতরে; সংগোপনে। হঠাৎ হঠাৎ তা ঝলকে উঠেছিল সুন্দরীর কটাক্ষের মতো করে। যেমন— পেলের রিলিজ দ্য বল ইনটু দ্য ব্লাইন্ড সাইট ফ্রি-স্পেস, কিংবা ব্যাকহিল পাস। যে পাস নিয়ে এত কথা হয়, কিন্তু এর গভীরতা ঠিক সেই প্রচলিত বিখ্যাত কথায় নেই যে, এ এক আশ্চর্য সুন্দর পাস। এর গভীরতা আছে এই ভাবনায় যে— পেলে জানতেন, এই মুহূর্তে গোল করাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, গোল করার অচেনা পথগুলো তৈরি করা অনেক বেশি জরুরি। এই বোধই ১৯৭০-এর সারকথা। এই বোধের নাম দেওয়া চলে— আত্মবিশ্বাসী বৌদ্ধিক সংযম।
এই অদ্ভুত সংযম কোনো ইউরোপীয় বাস্তববাদে ভাবাই সম্ভব ছিল না তখন, নব্য-বাস্তববাদেও নয়। যা এসেছে ব্রাজিলীয় অভিজ্ঞতা থেকে— অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের সমার্থক যেখানে বিপদ বা সর্বনাশ। আবার উচ্ছ্বাসহীনতা মানে অস্তিত্বহীনতা। ১৯৫০-এর স্মৃতি তখনও দেহে ছিল। যদিও সেই স্মৃতি ভয় হয়ে ওঠেনি। সেই স্মৃতি পরিণতি হয়ে উঠেছিল। এই পরিণতির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ তোস্তাও।
তোস্তাও: চিন্তার স্ট্রাইকার
১৯৭০-এর পথে ব্রাজিল বুঝেছিল— শুধু স্কিল নয়, দরকার তরল বুদ্ধিও। এখানেই স্থপতি হয়ে ওঠেন তোস্তাও। তিনি গোল করতেন, কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে— তিনি জায়গা তৈরি করতেন। এই কাজগুলো আলাদা করে চোখে পড়ে না। কিন্তু খেলার ছন্দ এইখানেই তৈরি হয়। তোস্তাও দেখান— বুদ্ধি মানে গতি কমানো নয়; বুদ্ধি মানে গতি কোথায় বাড়বে, তা নিশ্চিতভাবে সঠিক জানাও। স্ট্রাইকার হয়েও মাঝমাঠে নেমে আসা, বহু বহু পাস খেলা, ডিফেন্ডার টেনে বের করে এনে জমাট ডিফেন্স ভেঙে ফেলা— এই সবই আধুনিক ফলস-৯(False 9)-এর পূর্বাভাস। আধুনিক ফলস-৯-এর ধারণাটাই বিশ্ব-ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত করেন তোস্তাও (যদিও এর সূত্রপাত হয়েছিল বা প্রথম আভাস পাওয়া গিয়েছিল ভাভা, আলতাফিনি ও পেলের নড়াচড়া ও ফলস স্থানবদলের মধ্য দিয়ে)। তোস্তাও কোনো ক্লাসিক স্ট্রাইকার নন, কিন্তু আধুনিক স্ট্রাইক ধারণার অগ্রদূত (যে ফ্রি-ফলস-পজিশনে রোনালদো, রোনালদিনহো, মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো, নেইমার প্রমুখ খেলেছেন ও খেলেন– সেই পজিশনিং ফাংশনটাই তৈরি হয়েছিল পেলে ও তোস্তাও-এর খেলার ধরন থেকে)। যাই হোক, তোস্তাও প্রমাণ করলেন— জোগো বনিতো দেহে মাখতে মাখতে মূলত মস্তিষ্কে গিয়েই সৌন্দর্যের পূর্ণাধার হয়ে ওঠে।
রিভেলিনো: শক্তির নান্দনিকতা
এই যুগে রিভেলিনো ব্রাজিলীয় ফুটবলে নতুন মাত্রা যোগ করেন। রিভেলিনোর ব্রাজিলীয় স্কিলের আলোকিত দিক হলো যে– এখানে নাচ নেই, এখানে আছে বিস্ফোরণ, আছে দৃষ্টিনন্দন ভাঙন। তাঁর বাঁ-পায়ের শট, দূরপাল্লার গোল বা ফ্রি-কিক, দূর থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত, গতির দৌড়ে শক্তির সঙ্গে ইনসাইড-আউটসাইড এবং তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবিত স্কিল ‘এলাস্টিকো’ (ফ্লিপ-ফ্ল্যাপ) দেখাল— স্কিল মানেই কেবল কোমল নান্দনিকতা নয়, প্রয়োজনে শক্তিও। রিভেলিনোর এলাস্টিকো নিছক ট্রিক নয়; বলা যায় দিকবদলের দর্শন। এক পায়ে বল বাইরে-ভিতরে মুহূর্তে বদলে প্রতিপক্ষকে স্তম্ভিত ও মানসিকভাবে অস্থির করে দেওয়া— যা ব্রাজিলীয় স্কিলের সবচেয়ে আইকনিক চিহ্নগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তিনি যে ফুটবলের রীতি তৈরি করেন, তা পরবর্তী দশকে তরুণ-প্রতিভাদের অনুকরণ তথা অনুসরণযোগ্য এবং আকাঙ্ক্ষিত অর্জন হয়ে ওঠে। দিয়েগো মারাদোনা দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যে জানিয়েছেন, তাঁর আকৈশোরের আইডল ছিলেন রিভেলিনো। তিনি রিভেলিনোকেই তাঁর ফুটবলের ভাব-গত গুরু মনে করতেন। এবং সারা বিশ্ব জানে, মারাদোনা এই বিশেষ ফুটবল-রীতিকে আরও নিজস্ব ভঙ্গিতে মিশিয়ে, কী অত্যাশ্চর্যভাবে পরিবেশন করে বিস্ময়-নক্ষত্রের মতো কালোত্তীর্ণ হয়ে আছেন! আরও পরে রোনালদো (আর-৯) এই রীতিকে অভিনব বিপ্লবী বিবর্তনের সঙ্গে একাকার করে কীভাবে যুগোত্তর পর্যায়ে পৌঁছে দেন!
অতএব, বলতে পারি, রিভেলিনোর তীব্রতা না-থাকলে ‘১৯৭০’ সম্পূর্ণ হতো না। কারণ আনন্দ যদি সবসময় মোলায়েম হয়, তবে কখনো তা আত্মরক্ষায় ব্যর্থ হয়। তাই তখন থেকেই বিশ্ব-ফুটবলে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয় এই-ভাবনা– সৌন্দর্য মানে প্রয়োজনীয় তীব্রতাও।
জেয়ারজিনহো: উইং থেকে সুচারু বিস্ফোরণ
১৯৭০-এর বিশ্বকাপে জেয়ারজিনহো প্রতিটি ম্যাচে গোল করেন। এ-এক অভাবনীয় পরিসংখ্যান, আবার যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; যা উইং-খেলার রূপান্তর। উইঙ্গার আর শুধু ক্রস দেওয়ার লোক নন— তিনি হলেন গোলের হুমকি। জেয়ারজিনহো স্কিলকে সরাসরি ফলাফলের দিকে চালিত করেন। তাঁর দৌড়, কাট-ইন, আচমকা তড়িৎ শট— সব মিলিয়ে জোগা বনিতোর বাস্তববাদী রূপ মূর্ত হয়ে ওঠে। এর ভিতর দিয়ে একপ্রকার আত্মরক্ষার কাজটাই করে জেয়ারজিনহো। তিনি উইং থেকে এসে গোল করে যান। যা আজ স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু তখন ব্যাপারটা ছিল সত্যই বিপ্লব। তিনিই প্রথম দেখান— উইং মানে প্রান্ত নয়, উইং মানে প্রবেশপথ। আর এই প্রবেশপথগুলোই ওপেন থাকে, কারণ মাঝখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না। এই দৃষ্টিটাই ফুটবলে জেয়ারজিনহোর আবিষ্কার। বলতে গেলে, এটাই ১৯৭০-এর সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব— মাঠের মাঝ-পরিসর ফাঁকা করে রাখা। এই ফাঁকা জায়গা অজ্ঞাত নয়। এই ফাঁকা জায়গা চিন্তার স্বতন্ত্র ভিন্নতায় ঠাসা। এই জায়গাতেই পেলে কাজ করে যেতেন অবিরাম। তিনি সেখানে ঢোকেন, আবার সরে যান। এমন মুক্ত আসা-যাওয়ার বিচিত্র ধরনই তাঁর নেতৃত্ব। যা নির্দেশ দেয় না। যা বোঝায়— সবাইকে খেলতে দাও। সেই খেলতে-দেওয়ার দর্শনই জোগো বনিতোর পূর্ণ রূপ।
জোগো বনিতো এখানে আর ‘সুন্দর খেলা’ মাত্র নয়। তা হয়ে যায় অস্তিত্বমাত্রায় একটি শৈল্পিক অবস্থা। এখানে ঝুঁকি নেওয়া সাবলীল, কারণ ঝুঁকি নেওয়া নিরাপদ। যা আসে হয়তো এই বিশ্বাস থেকে যে— যদি আমি ব্যর্থ হই, দল ভেঙে পড়বে না। এই বিশ্বাসই ব্রাজিল ফুটবল-শিল্পের সবচেয়ে বড়ো সম্ভাবনা ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ১৯৭০-এর দল সেই বিশ্বাস তৈরি করেছিল। এই দলটি প্রমাণ করতে পেরেছিল— সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা, আনন্দ ও কার্যকারিতা একসঙ্গে থাকতে পারে। যেখানে কেউ স্থির নয়, সবাই চিন্তাশীল। এই কারণেই সেই বিশ্বকাপের গোলগুলো দলগত শিল্পকর্ম। কোনোটাই একক নায়কের প্রচারমুখী ঘোষণা নয়। এখানে নায়ক হয়ে যায় সম্মিলিত ছন্দ। এই ছন্দ থামলে, ব্রজিলীয় ফুটবলও থামে। জোগো বনিতো বনাম জোগা বনিতো– এই যুগে পার্থক্য স্পষ্ট হয়। জোগো বনিতো— খেলার সৌন্দর্য, সামগ্রিক দর্শন। জোগা বনিতো— খেলোয়াড়ের আচরণ, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। ১৯৭০-এর দল এই দুইয়ের মিলন। তারা সুন্দর খেলেছে (জোগো বনিতো), কারণ তারা সুন্দরভাবে খেলেছে (জোগা বনিতো)। ১৯৭০-এর পর থেকে ফুটবল বিশ্বে একটি নীরব সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়— যদি কোনো দল সুন্দর খেলতে চায়, তাকে ব্রাজিলের খেলার দিকে তাকাতে হবে, এবং পাঠ নিতে হবে। ব্রাজিল ফুটবল মাঠে শুধু জেতে না; তারা সংজ্ঞা দেয়। সৌন্দর্য কেমন, আক্রমণ কেমন, দলগত শিল্প কী— সবকিছুর মানদণ্ড হয়ে ওঠে ব্রাজিল। এই পর্বে ব্রাজিল ফুটবল পৌঁছে যায় তার শিখরে। স্কিল তখন ভাষা, বুদ্ধি তখন ছন্দ, আর সৌন্দর্য তখন দায়িত্ব।
১৯৭০-এর পর বিশ্ব-ফুটবল এই ছন্দ শিখতে চেয়েছে। অনুকরণ করেছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। কারণ এই ছন্দ জন্মানোর পেছনে যে থাকতে হয় দীর্ঘ ইতিহাসের স্নায়ুবিক উপলব্ধি, দাসত্ব-উত্তর দেহের সহজাত কৌশলী দোলা, আনন্দ-ক্ষত-স্মৃতির সম্মিলন। এই সবকিছুর মিলনেই ‘১৯৭০’ সম্ভব। এই কারণেই ‘১৯৭০’ বিশ্ব-ফুটবলের ইতিহাসে পুনরাবৃত্তি হয়নি। সম্ভবত হতেও পারে না।
(চলবে…)
### ড. অনিশ রায়

