দ্বিতীয় বৃহৎ খণ্ড
৩০০টি নির্বাচিত প্রবাদ, অর্থ ও স্বাভাবিক বাক্যে প্রয়োগ
ভূমিকা
বাংলা প্রবাদ-প্রবচন কোনো অভিধানের শুকনো শব্দতালিকা নয়। মানুষের বহু প্রজন্মের জীবনযাপন, অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা, বুদ্ধি, কৌতুক, সতর্কতা, কৃষিজীবন, সংসার, অর্থনীতি, প্রেম, শত্রুতা, রাজনীতি এবং নৈতিক বোধের দীর্ঘ সঞ্চয় কয়েকটি শব্দে জমাট বেঁধে প্রবাদে রূপ নেয়। তাই একটি ভালো প্রবাদ অনেক সময় দীর্ঘ উপদেশের চেয়েও বেশি কথা বলে।
‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’ শুধু অপ্রত্যাশিত বিপদের কথা বলে না; মানুষের অনুসন্ধিৎসার অনিশ্চিত পরিণতির কথাও বলে। ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’ মানুষের আগাম আনন্দের হাস্যকর প্রবণতাকে ধরেছে। ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ অন্যায় চিরকাল গোপন থাকে না—এই গভীর বিশ্বাসকে ধারণ করে। আর ‘রক্ষকই ভক্ষক’ ক্ষমতার সবচেয়ে ভয়ংকর বিকৃতিকে কয়েকটি শব্দে প্রকাশ করে।
এই খণ্ডে তাই শুধু পরীক্ষায় আসতে পারে এমন প্রবাদ নয়, বাংলা ভাষার ব্যবহারিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে মূল্যবান প্রবাদ-প্রবচনও রাখা হয়েছে।
অ
১. অকর্মার ঢেঁকি
অর্থ: যে কোনো কাজের যোগ্য নয়, অথচ বোঝা হয়ে আছে।
বাক্যে প্রয়োগ: সারাদিন বসে থেকে অন্যের কাজে বাধা দেওয়া লোকটি যেন সংসারের অকর্মার ঢেঁকি।
২. অকর্মারা বেশি কথা বলে
অর্থ: যারা কাজ করতে পারে না, তারা কথায় বেশি দক্ষ।
বাক্যে প্রয়োগ: কাজের সময় কাউকে পাওয়া যায় না, অথচ সভায় সবার আগে বক্তৃতা—অকর্মারা বেশি কথা বলে।
৩. অন্ধের দেশে কানা রাজা
অর্থ: যোগ্য লোকের অভাবে অল্প যোগ্য ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রতিষ্ঠানে যখন প্রকৃত বিশেষজ্ঞ কেউ নেই, তখন সামান্য জ্ঞানী লোকটিই অন্ধের দেশে কানা রাজা।
৪. অন্ধের হাতি দেখা
অর্থ: কোনো বিষয়কে সম্পূর্ণ না জেনে আংশিক ধারণা করা।
বাক্যে প্রয়োগ: একটি ঘটনার সামান্য অংশ শুনে পুরো সত্যের বিচার করা অন্ধের হাতি দেখার মতো।
৫. অন্ধের কপালে সূর্য
অর্থ: অসম্ভব বা দুর্লভ সৌভাগ্য।
বাক্যে প্রয়োগ: এত প্রতিকূলতার মধ্যে হঠাৎ এমন সুযোগ পাওয়া যেন অন্ধের কপালে সূর্য ওঠা।
৬. অতি বাড় বেড়ো না, ঝড়ে পড়ে যাবে
অর্থ: অতিরিক্ত অহংকার বা বাড়াবাড়ির পরিণতি খারাপ।
বাক্যে প্রয়োগ: সাফল্যে এত অহংকার কোরো না—অতি বাড় বেড়ো না, ঝড়ে পড়ে যাবে।
৭. অতি শোকে পাথর
অর্থ: অতিরিক্ত দুঃখ মানুষকে অনুভূতিহীন করে দেয়।
বাক্যে প্রয়োগ: একের পর এক শোকে তিনি এমন নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন যে মনে হল, অতি শোকে পাথর।
৮. অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট
অর্থ: অতিরিক্ত লোকের হস্তক্ষেপে কাজের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: পরিকল্পনায় এতজনের মতামত ঢুকল যে শেষ পর্যন্ত অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হল।
৯. অভাবে স্বভাব নষ্ট
অর্থ: দীর্ঘ অভাব মানুষের স্বাভাবিক চরিত্র ও নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: দীর্ঘদিনের অনটন তাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল—অভাবে স্বভাব নষ্ট।
১০. অতি মেঘে অনাবৃষ্টি
অর্থ: বেশি আয়োজন বা কথাবার্তার তুলনায় ফল সামান্য হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: সভায় এত আলোচনা হল, অথচ কাজের কাজ কিছুই হল না—অতি মেঘে অনাবৃষ্টি।
১১. অগভীর জলে সফরী ফরফরায়
অর্থ: অল্প জ্ঞান বা সামর্থ্যের মানুষই বেশি আস্ফালন করে।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য জ্ঞান নিয়েই তার এত পাণ্ডিত্য—অগভীর জলে সফরী ফরফরায়।
১২. অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর
অর্থ: সামান্য দুঃখে মানুষ কাঁদে, অতিরিক্ত দুঃখে অনুভূতিহীন হয়ে যায়।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রথমে সে কাঁদছিল, পরে একেবারে চুপ হয়ে গেল—অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর।
আ
১৩. আপন ভালো পাগলেও বোঝে
অর্থ: নিজের স্বার্থের কথা মানুষ বুঝতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: সবাই আপত্তি করলেও সে নিজের ভবিষ্যৎ বুঝেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে—আপন ভালো পাগলেও বোঝে।
১৪. আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও
অর্থ: নিজে না মেনে অন্যকে উপদেশ দেওয়া উচিত নয়।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজে নিয়ম মানেন না, অথচ কর্মীদের শাসন করেন—আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও।
১৫. আপন পায়ে কুড়াল মারা
অর্থ: নিজের কাজেই নিজের ক্ষতি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: রাগের মাথায় চাকরি ছেড়ে দিয়ে সে নিজের পায়ে কুড়াল মারল।
১৬. আঙুল ফুলে কলাগাছ
অর্থ: অল্প সময়ে অস্বাভাবিকভাবে ধনী বা প্রভাবশালী হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যবসা করে সে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল।
১৭. আতুরে নিয়ম নাস্তি
অর্থ: অসুস্থ বা বিপন্ন অবস্থায় সাধারণ নিয়ম অনেক সময় শিথিল হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: গুরুতর অসুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে সব নিয়ম কঠোরভাবে মানানো যায় না—আতুরে নিয়ম নাস্তি।
১৮. আকাশ কুসুম
অর্থ: অসম্ভব বা অলীক কল্পনা।
বাক্যে প্রয়োগ: কোনো পরিশ্রম না করে রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন আকাশ কুসুম।
১৯. আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া
অর্থ: অত্যন্ত দুর্লভ ও আকাঙ্ক্ষিত কিছু পাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: বহু বছরের সাধনার পর পুরস্কার পেয়ে তার মনে হল, আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে।
২০. আসল কথা গোপন, বাহাদুরি প্রবল
অর্থ: মূল বিষয় আড়াল করে বাহ্যিক প্রদর্শন করা।
বাক্যে প্রয়োগ: সমস্যার সমাধান না করে অনুষ্ঠান সাজানো আসল কথা গোপন, বাহাদুরি প্রবল।
ই
২১. ইটের পাকা
অর্থ: দৃঢ় বা শক্ত অবস্থান; সহজে নড়ানো যায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: বহু বছরের অভিজ্ঞতায় তাঁর সিদ্ধান্ত এখন ইটের পাকার মতো দৃঢ়।
২২. ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়
অর্থ: আন্তরিক ইচ্ছা থাকলে পথ পাওয়া যায়।
বাক্যে প্রয়োগ: অর্থের অভাব সত্ত্বেও সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে—ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।
২৩. ইঁদুরে বাঁধ ভাঙে
অর্থ: সামান্য কারণ থেকেও বড়ো বিপদ সৃষ্টি হতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: ছোটো অনিয়মটাকে তুচ্ছ ভেবো না; ইঁদুরে বাঁধ ভাঙে।
ঈ
২৪. ঈশ্বরের মার দুনিয়ার বার
অর্থ: নিয়তির আঘাত থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন।
বাক্যে প্রয়োগ: এত সাবধান হয়েও দুর্ঘটনাটি ঘটল—ঈশ্বরের মার দুনিয়ার বার।
উ
২৫. উলুবনে মুক্তো ছড়ানো
অর্থ: অনুপযুক্ত ব্যক্তির কাছে মূল্যবান জ্ঞান বা সম্পদ দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: যে বই পড়তেই চায় না তাকে সাহিত্য বোঝানো উলুবনে মুক্তো ছড়ানো।
২৬. উভয় সংকট
অর্থ: দুই দিকেই বিপদ।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি ছাড়লেও বিপদ, থাকলেও অপমান—উভয় সংকট।
২৭. ওজন বুঝে চলা
অর্থ: নিজের সামর্থ্য বুঝে কাজ করা।
বাক্যে প্রয়োগ: বড়ো ব্যবসায় নামার আগে ওজন বুঝে চলা দরকার।
২৮. উনো পাঁজুরে বরাখুরে
অর্থ: অত্যন্ত হতভাগ্য বা অলক্ষণে ব্যক্তি।
বাক্যে প্রয়োগ: লোকটির জীবনে একের পর এক বিপদ—সবাই যেন তাকে উনো পাঁজুরে বরাখুরে বলেই ঠাট্টা করে।
২৯. উনো ভাতে দুনো বল
অর্থ: পরিমিত আহার শরীরের পক্ষে উপকারী।
বাক্যে প্রয়োগ: অতিভোজন নয়, পরিমিত খাওয়াই ভালো—উনো ভাতে দুনো বল।
এ
৩০. এঁচোড়ে পাকিলে অচিরেই গোল্লায় যায়
অর্থ: অল্প বয়সে অতিরিক্ত পেকে গেলে চরিত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাক্যে প্রয়োগ: ছেলেটির অকাল পাকা স্বভাব দেখে বাবা চিন্তিত—এঁচোড়ে পাকিলে অচিরেই গোল্লায় যায়।
৩১. এঁটো খায় মিঠার লোভে
অর্থ: লাভের আশায় মানুষ নীচু কাজও করতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য সুবিধার জন্য এত অপমান সহ্য করা এঁটো খায় মিঠার লোভের মতো।
৩২. একে রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর
অর্থ: এক বিপদের সঙ্গে আরেক বিপদ যুক্ত হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি গেল, তার ওপর ঋণের নোটিশ—একে রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর।
৩৩. এক হাতে তালি বাজে না
অর্থ: বিরোধে উভয় পক্ষেরই কিছু দায় থাকে।
বাক্যে প্রয়োগ: ঝগড়ার জন্য শুধু একজনকে দোষ দেওয়া যায় না—এক হাতে তালি বাজে না।
৩৪. এক মাঘে শীত যায় না
অর্থ: একবার বিপদ কেটে গেলেই ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়।
বাক্যে প্রয়োগ: একবার সফল হয়েই নিশ্চিন্ত হয়ো না—এক মাঘে শীত যায় না।
৩৫. এক ঢিলে দুই পাখি
অর্থ: এক কাজের মাধ্যমে দুই উদ্দেশ্য সাধন।
বাক্যে প্রয়োগ: বাজারও হল, বন্ধুর সঙ্গে দেখাও হল—এক ঢিলে দুই পাখি।
৩৬. একতাই বল
অর্থ: ঐক্যের মধ্যে শক্তি।
বাক্যে প্রয়োগ: সবাই একসঙ্গে দাঁড়ানোতেই দাবি আদায় হল—একতাই বল।
৩৭. এক বনে দুই বাঘ থাকতে পারে না
অর্থ: একই জায়গায় দুই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী দীর্ঘদিন সহাবস্থান করতে পারে না।
বাক্যে প্রয়োগ: দুই নেতার মধ্যে শেষ পর্যন্ত একজনকেই সরে যেতে হল—এক বনে দুই বাঘ থাকতে পারে না।
ঐ
৩৮. ঐক্যই শক্তি
অর্থ: মিলিত প্রচেষ্টায় বড়ো কাজ সম্ভব।
বাক্যে প্রয়োগ: গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে বাঁধ বাঁচাল—ঐক্যই শক্তি।
ক
৩৯. কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে
অর্থ: পরিশ্রম করলে সাফল্য আসে।
বাক্যে প্রয়োগ: বছরের পর বছর অনুশীলনের ফলেই সে সফল হয়েছে—কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।
৪০. কান টানলে মাথা আসে
অর্থ: একটি বিষয় অনুসরণ করলে সংশ্লিষ্ট আরও বিষয় প্রকাশ পায়।
বাক্যে প্রয়োগ: এক দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে আরও অনেক অনিয়ম বেরোল—কান টানলে মাথা আসে।
৪১. কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা
অর্থ: এক উপায় দিয়ে অন্য বিপদ দূর করা।
বাক্যে প্রয়োগ: এক প্রতিদ্বন্দ্বীর সাহায্যে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরানো কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা।
৪২. কেঁচো খুঁড়তে সাপ
অর্থ: ছোটো বিষয় অনুসন্ধান করতে গিয়ে বড়ো সমস্যা বের হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: পুরোনো হিসাব খুঁজতে গিয়ে বিশাল দুর্নীতি ধরা পড়ল—কেঁচো খুঁড়তে সাপ।
৪৩. কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন
অর্থ: বাস্তবতার বিপরীত নাম বা পরিচয় দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: অযোগ্য লোককে ‘বিশেষজ্ঞ’ বলা কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন।
৪৪. কপাল যার মন্দ, সে যায় যেথা সাগর শুকায়
অর্থ: দুর্ভাগা মানুষের সর্বত্র বিপদ।
বাক্যে প্রয়োগ: যে চাকরিতেই গেল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হল—কপাল যার মন্দ, সে যায় যেথা সাগর শুকায়।
৪৫. কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ পাকলে করে ঠাস
অর্থ: ছোটোবেলায় শিক্ষা না দিলে পরে সংশোধন কঠিন।
বাক্যে প্রয়োগ: শিশুর চরিত্র গঠনে শৈশবের শিক্ষা জরুরি—কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ পাকলে করে ঠাস।
৪৬. কাঁঠালের আমসত্ত্ব
অর্থ: অসম্ভব বা অবাস্তব কল্পনা।
বাক্যে প্রয়োগ: কোনো প্রস্তুতি ছাড়া পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার আশা কাঁঠালের আমসত্ত্ব।
৪৭. কাঁঠালের আমসত্ত্বে বাঘের দুধ
অর্থ: অসম্ভবের ওপর আরও অসম্ভব কল্পনা জুড়ে দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: সে যে পরিকল্পনা করেছে তাতে কাঁঠালের আমসত্ত্বে বাঘের দুধ জোগাড়ের মতো অসম্ভব সব শর্ত আছে।
৪৮. কেঁচো খুঁড়তে সাপ, সাপ খুঁড়তে নাগ
অর্থ: এক অনুসন্ধান থেকে ক্রমে আরও বড়ো সমস্যা প্রকাশ পাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: তদন্ত যত এগোল, তত বড়ো দুর্নীতি সামনে এল—কেঁচো খুঁড়তে সাপ, সাপ খুঁড়তে নাগ।
খ
৪৯. খাল কেটে কুমির আনা
অর্থ: নিজের হাতে বিপদ ডেকে আনা।
বাক্যে প্রয়োগ: স্বার্থের জন্য অচেনা লোককে ব্যবসায় ঢুকিয়ে সে খাল কেটে কুমির আনল।
৫০. খালি কলসি বেশি বাজে
অর্থ: অল্প জ্ঞানীরাই বেশি কথা বলে।
বাক্যে প্রয়োগ: কাজের বেলায় নীরব, বক্তৃতার বেলায় অগ্রগণ্য—খালি কলসি বেশি বাজে।
৫১. খুঁটির জোরে ভেড়া নাচে
অর্থ: শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকের সাহায্যে অযোগ্য লোকও দাপট দেখায়।
বাক্যে প্রয়োগ: নেতার আত্মীয় বলেই ছেলেটির এত দাপট—খুঁটির জোরে ভেড়া নাচে।
৫২. খিদে পেলে বাঘে ঘাস খায়
অর্থ: প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ নিচু বা অনভ্যস্ত কাজও করতে বাধ্য হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: বড়ো ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও জীবিকার জন্য সে ছোটো কাজ করছে—খিদে পেলে বাঘে ঘাস খায়।
৫৩. খেতে বসলে ভূতের ভয়
অর্থ: প্রয়োজনের সময়ে অযথা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: সুযোগ পেয়েও সে ভয় পেয়ে সরে গেল—খেতে বসলে ভূতের ভয়।
৫৪. খরার মধ্যে বৃষ্টি
অর্থ: দুর্দিনে হঠাৎ স্বস্তি বা আশার দেখা পাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: দীর্ঘ বেকারত্বের পর চাকরির খবর খরার মধ্যে বৃষ্টির মতো এল।
গ
৫৫. গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল
অর্থ: কাজ হওয়ার আগেই ফল ভোগের আনন্দ করা।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি এখনও হয়নি, তার আগেই নতুন গাড়ির পরিকল্পনা—গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল।
৫৬. গরু মেরে জুতো দান
অর্থ: বড়ো ক্ষতি করে সামান্য উপকার করা।
বাক্যে প্রয়োগ: কর্মীদের বেতন কমিয়ে সামান্য বোনাস দেওয়া গরু মেরে জুতো দান।
৫৭. গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না
অর্থ: নিজের জায়গায় যোগ্য ব্যক্তির মূল্যায়ন হয় না।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের শহরেই তার প্রতিভার মূল্য কেউ দিল না—গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না।
৫৮. গায়ে মানে না আপনি মোড়ল
অর্থ: যোগ্যতা না থাকলেও নিজেকে নেতা ভাবা।
বাক্যে প্রয়োগ: কেউ দায়িত্ব দেয়নি, অথচ সবাইকে নির্দেশ—গায়ে মানে না আপনি মোড়ল।
৫৯. গোলায় ধান নেই, গোফে তেল
অর্থ: সামর্থ্য নেই, অথচ বড়ো আয়োজন বা অহংকার।
বাক্যে প্রয়োগ: আয় নেই, অথচ বিলাসী জীবনের পরিকল্পনা—গোলায় ধান নেই, গোফে তেল।
৬০. গঙ্গা জলে গঙ্গা পূজা
অর্থ: যার জিনিস তাকে দিয়েই তার উপকার করা।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রতিষ্ঠানের টাকাতেই প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানের খরচ মেটানো হল—গঙ্গা জলে গঙ্গা পূজা।
৬১. ঘটি কেনা গঙ্গাস্নান
অর্থ: একসঙ্গে দুই কাজ সম্পন্ন করা।
বাক্যে প্রয়োগ: বাজার করতে গিয়ে গঙ্গাস্নানও সেরে এলাম—ঘটি কেনা গঙ্গাস্নান।
ঘ
৬২. ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘে ভয় পায়
অর্থ: আগের অভিজ্ঞতায় সামান্য বিপদেও ভয় পাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: আগের ক্ষতির পর সামান্য ঝুঁকিতেও সে ভয় পায়—ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘে ভয় পায়।
৬৩. ঘরের শত্রু বিভীষণ
অর্থ: আপনজনের মধ্যে বিশ্বাসঘাতক থাকা।
বাক্যে প্রয়োগ: বাইরের শত্রু নয়, নিজের লোকই তথ্য ফাঁস করেছে—ঘরের শত্রু বিভীষণ।
৬৪. ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া
অর্থ: প্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মন দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: পড়াশোনা বাদ দিয়ে সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত থাকা ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার মতো।
৬৫. ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে
অর্থ: একজনের দুরবস্থায় অন্যজনের আনন্দ পাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: বন্ধুর বিপদে সাহায্য না করে হাসা ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসের মতো।
৬৬. ঘটি ডোবে না, নামে তালপুকুর
অর্থ: সামান্য সামর্থ্য নিয়েও বড়ো বড়ো দম্ভ করা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য সম্পত্তি নিয়েই তার এমন অহংকার—ঘটি ডোবে না, নামে তালপুকুর।
৬৭. ঘটকালি করতে গিয়ে বিয়ে করে আসা
অর্থ: অন্যের কাজ করতে গিয়ে নিজের কাজ করে ফেলা।
বাক্যে প্রয়োগ: বন্ধুর চাকরি খুঁজতে গিয়ে নিজেই চাকরিটা পেয়ে গেল—ঘটকালি করতে গিয়ে বিয়ে করে আসা।
চ
৬৮. চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে
অর্থ: ক্ষতির পরে বুদ্ধির উদয়।
বাক্যে প্রয়োগ: টাকা হারানোর পর নিরাপত্তা বাড়ানো হল—চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।
৬৯. চোরে চোরে মাসতুতো ভাই
অর্থ: অসৎ লোকেরা স্বার্থের প্রশ্নে পরস্পরের সহযোগী।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজেদের মধ্যে ঝগড়া থাকলেও স্বার্থে তারা এক—চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।
৭০. চোরের মায়ের বড়ো গলা
অর্থ: দোষী ব্যক্তি উল্টো বেশি অভিযোগ করে।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের ভুল ধরা পড়তেই সে অন্যদের দোষ দিতে লাগল—চোরের মায়ের বড়ো গলা।
৭১. চাচা আপন প্রাণ বাঁচা
অর্থ: বিপদের সময় সবাই নিজের নিরাপত্তা আগে দেখে।
বাক্যে প্রয়োগ: বিপদ শুরু হতেই সবাই পালাল—চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।
৭২. চাঁদের হাট
অর্থ: আনন্দময় বা মনোরম সমাবেশ।
বাক্যে প্রয়োগ: কবি-সাহিত্যিকদের মিলনে মেলা যেন চাঁদের হাট।
৭৩. চেনা বামুনের পৈতে লাগে না
অর্থ: পরিচিত মানুষের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য অতিরিক্ত পরিচয় প্রয়োজন হয় না।
বাক্যে প্রয়োগ: তাঁর কাজই তাঁর পরিচয়—চেনা বামুনের পৈতে লাগে না।
ছ
৭৪. ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো
অর্থ: যার কোনো মূল্য নেই।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রয়োজনের সময় কেউ তাকে মনে করে না—ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো।
৭৫. ছাই চাপা আগুন
অর্থ: সুপ্ত ক্রোধ বা শক্তি।
বাক্যে প্রয়োগ: এতদিনের নীরবতার মধ্যে ছাই চাপা আগুন জমে ছিল।
৭৬. ছাগলে কি না খায়, পাগলে কি না বলে
অর্থ: নির্বোধের কথা বা কাজের ঠিক নেই।
বাক্যে প্রয়োগ: তার কথার কোনো যুক্তি নেই—ছাগলে কি না খায়, পাগলে কি না বলে।
৭৭. ছুঁচোর কেত্তন
অর্থ: অতি সামান্য বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত হইচই।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য ভুল নিয়ে যে হইচই শুরু হয়েছে, তা ছুঁচোর কেত্তন ছাড়া আর কী!
জ
৭৮. জলে কুমির ডাঙায় বাঘ
অর্থ: দুই দিকেই বিপদ।
বাক্যে প্রয়োগ: ঋণ শোধ করাও কঠিন, ব্যবসা বন্ধ করাও কঠিন—জলে কুমির ডাঙায় বাঘ।
৭৯. জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ
অর্থ: যার ওপর নির্ভর করতে হয়, তার সঙ্গে শত্রুতা করা বোকামি।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরিদাতার সঙ্গে অকারণে ঝগড়া করে সে জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করল।
৮০. যত গর্জে তত বর্ষে না
অর্থ: বেশি হুমকি দেওয়া ব্যক্তি সবসময় বেশি কাজ করে না।
বাক্যে প্রয়োগ: তার কথার জোর অনেক, কাজের জোর কম—যত গর্জে তত বর্ষে না।
৮১. যত দোষ নন্দ ঘোষ
অর্থ: নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপানো।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের ভুল স্বীকার না করে সবাইকে দায়ী করা যত দোষ নন্দ ঘোষ।
৮২. ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি
অর্থ: অন্যের কারণে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে নিজের কৃতিত্ব বলে দাবি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: দলের সাফল্যকে নিজের একার কৃতিত্ব বলা ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি।
৮৩. জোর যার মুলুক তার
অর্থ: শক্তিশালী ব্যক্তিরই আধিপত্য চলে।
বাক্যে প্রয়োগ: আইনের শাসন দুর্বল হলে জোর যার মুলুক তার হয়ে ওঠে।
ট
৮৪. টনক নড়া
অর্থ: হুঁশ হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: কর্মীরা প্রতিবাদে নামতেই কর্তৃপক্ষের টনক নড়ল।
৮৫. ঠেলায় পড়লে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়
অর্থ: বিপদে শত্রুরাও একত্র হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: বড়ো বিপদের মুখে দুই বিরোধী দলও একসঙ্গে দাঁড়াল—ঠেলায় পড়লে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়।
৮৬. ঠেলার নাম বাবাজি
অর্থ: চাপ না দিলে কাজ হয় না।
বাক্যে প্রয়োগ: বারবার তাগাদা না দিলে সে নড়েই না—ঠেলার নাম বাবাজি।
৮৭. টেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে
অর্থ: স্বভাব সহজে বদলায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: জায়গা বদলালেও তার পুরোনো অভ্যাস গেল না—টেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।
ত
৮৮. তিলকে তাল করা
অর্থ: ছোটো ঘটনাকে বড়ো করে তোলা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য ভুল নিয়ে এত আলোচনা করা তিলকে তাল করা।
৮৯. তেলে মাথায় তেল দেওয়া
অর্থ: যার যথেষ্ট আছে তাকেই আরও দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: ধনীদের আরও সুবিধা দেওয়া তেলে মাথায় তেল দেওয়া।
৯০. তাসের ঘর
অর্থ: ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো ব্যবস্থা।
বাক্যে প্রয়োগ: মিথ্যার ওপর গড়া সম্পর্ক তাসের ঘরের মতো।
৯১. তীর্থের কাক
অর্থ: অধীর অপেক্ষা করা ব্যক্তি।
বাক্যে প্রয়োগ: চিঠির উত্তরের জন্য সে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছে।
৯২. তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকা
অর্থ: জীবনের শেষ পর্যায়ে দুরবস্থায় পড়া।
বাক্যে প্রয়োগ: একসময় ধনী ছিলেন, এখন নিঃস্ব—তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছেন।
৯৩. তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠা
অর্থ: সামান্যতেই অত্যন্ত রেগে যাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য সমালোচনাতেই তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন।
দ
৯৪. দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না
অর্থ: কোনো জিনিস থাকা অবস্থায় তার মূল্য বোঝা হয় না।
বাক্যে প্রয়োগ: সুস্থ থাকতেই শরীরের যত্ন নাও—দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না।
৯৫. দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা
অর্থ: শত্রুকে নিজের হাতে লালন করা।
বাক্যে প্রয়োগ: যে পরে বিশ্বাসঘাতকতা করল, তাকেই এতদিন প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল—দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা।
৯৬. দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো
অর্থ: আসল জিনিস না পেয়ে বিকল্পে সন্তুষ্ট হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: বিদেশে যেতে না পেরে পাহাড়ে বেড়ানো দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো।
৯৭. দূরের ঢোলের শব্দ মধুর
অর্থ: দূরের জিনিস বাস্তবের চেয়ে ভালো মনে হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: অন্যের জীবন দেখে ঈর্ষা কোরো না—দূরের ঢোলের শব্দ মধুর।
৯৮. ধর্মের কল বাতাসে নড়ে
অর্থ: অন্যায় একদিন প্রকাশিত হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: বহুদিনের দুর্নীতি শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পেল—ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।
৯৯. ধর্মের ঢাক আপনি বাজে
অর্থ: সত্য ও ন্যায় শেষ পর্যন্ত নিজের শক্তিতে প্রকাশ পায়।
বাক্যে প্রয়োগ: সত্যকে চেপে রাখার চেষ্টা করে লাভ নেই—ধর্মের ঢাক আপনি বাজে।
১০০. দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো
অর্থ: ক্ষতিকর ব্যক্তির চেয়ে তার অনুপস্থিতি ভালো।
বাক্যে প্রয়োগ: অসৎ কর্মীর চেয়ে শূন্য পদ ভালো—দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।
১০১. দশের লাঠি একের বোঝা
অর্থ: সম্মিলিত শক্তিতে কঠিন কাজ সহজ হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: সবাই মিলে বাঁধ মেরামত করল—দশের লাঠি একের বোঝা।
১০২. দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ
অর্থ: মিলিতভাবে কাজ করলে জয়-পরাজয় নিয়ে লজ্জা নেই।
বাক্যে প্রয়োগ: সবাই মিলে চেষ্টা করাই বড়ো কথা—দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ।
ন
১০৩. নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা
অর্থ: নিজের অযোগ্যতার জন্য অন্যকে দোষ দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: পরীক্ষায় খারাপ করে প্রশ্নপত্রকে দায়ী করা নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা।
১০৪. নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো
অর্থ: কিছু থাকা না থাকার চেয়ে ভালো।
বাক্যে প্রয়োগ: আপাতত কম বেতনের চাকরিটা নাও—নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।
১০৫. নতুন ঝাড়ু বেশি ঝাড়ে
অর্থ: নতুন ব্যক্তি প্রথমে অতিরিক্ত উৎসাহ দেখায়।
বাক্যে প্রয়োগ: নতুন কর্মী এসেই সবাইকে নিয়ম শেখাচ্ছে—নতুন ঝাড়ু বেশি ঝাড়ে।
১০৬. নুন আনতে পান্তা ফুরোয়
অর্থ: চরম অভাব।
বাক্যে প্রয়োগ: সংসারে এমন অভাব যে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।
১০৭. নুনের ছিটে ক্ষতে
অর্থ: দুঃখের ওপর আরও কষ্ট দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি হারানোর পর বন্ধুর বিদ্রূপ যেন নুনের ছিটে ক্ষতে।
১০৮. নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ
অর্থ: অন্যের ক্ষতি করতে গিয়ে নিজেরই বেশি ক্ষতি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যবসা নষ্ট করতে গিয়ে নিজের ব্যবসাও বন্ধ হল—নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ।
প
১০৯. পাকা ধানে মই দেওয়া
অর্থ: কারও ভালো অবস্থায় ইচ্ছাকৃত ক্ষতি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: ব্যবসা ভালো চলার সময় মিথ্যা প্রচার করা পাকা ধানে মই দেওয়া।
১১০. পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে
অর্থ: এমন অবস্থায় পড়া যেখান থেকে সহজে বেরোনোর উপায় নেই।
বাক্যে প্রয়োগ: চুক্তিতে সই করার পর শর্ত বুঝে সে বলল—পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে।
১১১. পাপের ফল ভুগতেই হয়
অর্থ: অন্যায়ের ফল একদিন ভোগ করতে হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: বহুদিন অন্যায় করে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ল—পাপের ফল ভুগতেই হয়।
১১২. পিঁপড়ের পাখা ওঠে মরিবার তরে
অর্থ: অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা অহংকার পতনের পূর্বলক্ষণ।
বাক্যে প্রয়োগ: সাফল্যে তার অহংকার দেখে মনে হয়—পিঁপড়ের পাখা ওঠে মরিবার তরে।
১১৩. পেটের দায়ে বাঘে ঘাস খায়
অর্থ: জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ অনভ্যস্ত কাজও করতে বাধ্য হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: সংসারের দায়ে তাকে নিজের পছন্দের কাজ ছাড়তে হল—পেটের দায়ে বাঘে ঘাস খায়।
১১৪. পাকা খেলোয়াড়ের চাল বোঝা কঠিন
অর্থ: অভিজ্ঞ মানুষের কৌশল সহজে বোঝা যায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: ব্যবসায়ী কী পরিকল্পনা করেছে কেউ বুঝতে পারল না—পাকা খেলোয়াড়ের চাল বোঝা কঠিন।
ফ
১১৫. ফল পাকলে গাছ নোয়
অর্থ: প্রকৃত গুণী ও জ্ঞানী মানুষ সাধারণত বিনয়ী হন।
বাক্যে প্রয়োগ: এত বড়ো পণ্ডিত হয়েও তাঁর বিনয় দেখে মনে হয়—ফল পাকলে গাছ নোয়।
১১৬. ফকিরের কেরামতি
অর্থ: সামান্য ঘটনাকে নিজের অসাধারণ কৃতিত্ব বলে দেখানো।
বাক্যে প্রয়োগ: দলের কাজকে নিজের কৃতিত্ব বলা নিছক ফকিরের কেরামতি।
ব
১১৭. বিনা মেঘে বজ্রপাত
অর্থ: আকস্মিক বিপদ।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি চলে যাওয়ার খবর তার জীবনে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এল।
১১৮. বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়
অর্থ: অধীন ব্যক্তি মূল ব্যক্তির চেয়েও বেশি উদ্ধত হয়ে ওঠা।
বাক্যে প্রয়োগ: মালিকের সহকারীই যেন মালিকের চেয়ে বড়ো—বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়।
১১৯. বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খাওয়ানো
অর্থ: চরম বিরোধী পক্ষকে একসঙ্গে সামলানো।
বাক্যে প্রয়োগ: দুই শত্রুপক্ষকে আলোচনায় বসানো বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খাওয়ানো।
১২০. বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা
অর্থ: শক্তিশালী শত্রুর আক্রমণ ভয়াবহ।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রভাবশালী লোকের সঙ্গে অকারণে বিরোধে যেও না—বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা।
১২১. বসে বসে রাজার হাল
অর্থ: পরিশ্রম না করে আরামে থাকা।
বাক্যে প্রয়োগ: অন্যের উপার্জনে বসে থাকা বসে বসে রাজার হাল।
১২২. বামুন গেল ঘর, তো লাঙল তুলে ধর
অর্থ: নিজের কাজ নয় এমন বিষয়ে অনধিকার চর্চা করা।
বাক্যে প্রয়োগ: বিষয় না জেনেই বিশেষজ্ঞের মতো মত দেওয়া বামুন গেল ঘর, তো লাঙল তুলে ধর।
১২৩. বড়ো মাছ ছোটো মাছকে খায়
অর্থ: শক্তিশালী দুর্বলকে গ্রাস করে।
বাক্যে প্রয়োগ: নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে বড়ো প্রতিষ্ঠানগুলো ছোটো ব্যবসাকে গ্রাস করছে—বড়ো মাছ ছোটো মাছকে খায়।
১২৪. বনের মোষ তাড়ানো
অর্থ: অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট করা।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের কাজ ফেলে সারাদিন অন্যের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকা বনের মোষ তাড়ানো।
ভ
১২৫. ভাতে মারলে বাঘও মরে
অর্থ: জীবিকার পথ বন্ধ করলে শক্তিশালী ব্যক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাক্যে প্রয়োগ: অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত বড়ো প্রতিষ্ঠানকেও নত করতে পারে—ভাতে মারলে বাঘও মরে।
১২৬. ভাঙা কুলো
অর্থ: যার কোনো মূল্য বা কার্যকারিতা নেই।
বাক্যে প্রয়োগ: কাজের সময় কেউ তাকে মনে করে না—ভাঙা কুলোর মতো পড়ে আছে।
ম
১২৭. মেঘ না চাইতেই জল
অর্থ: না চাইতেই প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রয়োজনের সময় বন্ধুর সাহায্য পাওয়া মেঘ না চাইতেই জল।
১২৮. মরার উপর খাঁড়ার ঘা
অর্থ: বিপদের ওপর আরও বিপদ।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি হারানোর পর বাড়িভাড়া বাড়ল—মরার উপর খাঁড়ার ঘা।
১২৯. মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত
অর্থ: ক্ষমতার সীমা খুব সংকীর্ণ।
বাক্যে প্রয়োগ: তার সব পরিকল্পনা কথার মধ্যেই শেষ—মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত।
১৩০. মুখে রাম, বগলে ছুরি
অর্থ: বাইরে ভালোবাসা, ভিতরে শত্রুতা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামনে বন্ধুত্ব, পেছনে ষড়যন্ত্র—মুখে রাম, বগলে ছুরি।
১৩১. মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি
অর্থ: অতিরিক্ত বা কৃত্রিম দরদ দেখানো।
বাক্যে প্রয়োগ: এতদিন খোঁজ নেয়নি, আজ হঠাৎ এত দরদ—মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি।
১৩২. মাছের তেলে মাছ ভাজা
অর্থ: যার সম্পদ তাকে দিয়েই তার কাজ করা।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রতিষ্ঠানের অর্থেই প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠান—মাছের তেলে মাছ ভাজা।
১৩৩. মশা মারতে কামান দাগা
অর্থ: সামান্য সমস্যার জন্য অতি বড়ো ব্যবস্থা নেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: ছোটো ভুলের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা মশা মারতে কামান দাগার মতো।
১৩৪. মরা হাতি লাখ টাকা
অর্থ: কোনো বড়ো বা মূল্যবান জিনিস ধ্বংসের পরও তার কিছু মূল্য থাকে।
বাক্যে প্রয়োগ: পুরোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও তার জমি ও সম্পত্তির মূল্য কমেনি—মরা হাতি লাখ টাকা।
য
১৩৫. যার লাঠি তার মাটি
অর্থ: শক্তিশালীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: আইনের শাসন দুর্বল হলে সমাজে যার লাঠি তার মাটি হয়ে যায়।
১৩৬. যেমন কর্ম তেমন ফল
অর্থ: কাজ অনুযায়ী ফল পাওয়া যায়।
বাক্যে প্রয়োগ: অন্যায় করে কেউ চিরকাল পার পায় না—যেমন কর্ম তেমন ফল।
১৩৭. যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে
অর্থ: দক্ষ ব্যক্তি একসঙ্গে বহু দায়িত্ব সামলাতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: সংসার ও চাকরি দুটোই সামলে সে প্রমাণ করেছে—যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে।
১৩৮. যে সহে সে রহে
অর্থ: ধৈর্যশীল মানুষ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
বাক্যে প্রয়োগ: কঠিন সময়ে ধৈর্য হারিও না—যে সহে সে রহে।
১৩৯. যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ
অর্থ: ক্ষমতার পরিবেশে গিয়ে অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহারে অভ্যস্ত হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: ক্ষমতায় গিয়ে পুরোনো আদর্শ ভুলে যাওয়া দেখে মনে হল—যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ।
১৪০. যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা
অর্থ: কাউকে অপছন্দ করলে তার সবকিছুই খারাপ লাগে।
বাক্যে প্রয়োগ: লোকটিকে সে এমন অপছন্দ করে যে তার ভালো কাজও খারাপ লাগে—যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা।
র
১৪১. রথ দেখা কলা বেচা
অর্থ: একসঙ্গে দুই উদ্দেশ্য সাধন।
বাক্যে প্রয়োগ: চিকিৎসাও হল, বন্ধুর সঙ্গে দেখাও হল—রথ দেখা কলা বেচা।
১৪২. রাঁধতে জানে না, শ্বশুরবাড়ির দোষ
অর্থ: নিজের অযোগ্যতার দায় অন্যের ওপর চাপানো।
বাক্যে প্রয়োগ: কাজ করতে না পেরে পরিবেশকে দোষ দেওয়া রাঁধতে জানে না, শ্বশুরবাড়ির দোষ।
১৪৩. রাখে হরি, মারে কে
অর্থ: ঈশ্বর রক্ষা করলে কেউ ক্ষতি করতে পারে না।
বাক্যে প্রয়োগ: ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকেও সে বেঁচে গেল—রাখে হরি, মারে কে।
১৪৪. রক্ষকই ভক্ষক
অর্থ: যে রক্ষা করার দায়িত্বে, সেই যখন ক্ষতি করে।
বাক্যে প্রয়োগ: নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকেরাই যখন চুরি করল, তখন রক্ষকই ভক্ষক প্রমাণিত হল।
ল
১৪৫. লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু
অর্থ: লোভ মানুষকে অন্যায়ের পথে নিয়ে যায়, যার পরিণতি ভয়াবহ।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য লাভের জন্য জালিয়াতি করে সব হারাল—লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।
১৪৬. লঙ্কায় যে যায় সেই রাবণ
অর্থ: ক্ষমতার পরিবেশ মানুষকে বদলে দিতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: ক্ষমতায় গিয়ে তারাও আগের মতো রইল না—লঙ্কায় যে যায় সেই রাবণ।
১৪৭. লোহার সঙ্গে লোহা ঘষলে আগুন জ্বলে
অর্থ: দুই শক্তির সংঘাতে প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: দুই দলের সংঘর্ষ দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠল—লোহার সঙ্গে লোহা ঘষলে আগুন জ্বলে।
শ
১৪৮. শাক দিয়ে মাছ ঢাকা
অর্থ: বড়ো দোষকে ছোটো বিষয় দিয়ে আড়াল করা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য অনিয়মের কথা বলে বড়ো দুর্নীতি আড়াল করা শাক দিয়ে মাছ ঢাকা।
১৪৯. শেয়ালের এক রা
অর্থ: একই স্বার্থে সবাই একই কথা বলা।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজেদের সুবিধার প্রশ্নে সবাই এক সুরে কথা বলল—শেয়ালের এক রা।
১৫০. শাপে বর
অর্থ: ক্ষতিকর ঘটনা শেষ পর্যন্ত উপকারী হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি চলে যাওয়াই তার জন্য শাপে বর হল; পরে আরও ভালো কাজ পেল।
১৫১. শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা
অর্থ: দায়িত্ব এমন ব্যক্তির হাতে দেওয়া, যে নিজেই অবিশ্বস্ত বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট।
বাক্যে প্রয়োগ: দুর্নীতির তদন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির হাতে দেওয়া শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা।
১৫২. শিব গড়তে বাঁদর
অর্থ: ভালো কিছু করতে গিয়ে উল্টো খারাপ ফল ঘটানো।
বাক্যে প্রয়োগ: ঘর সাজাতে গিয়ে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলল—শিব গড়তে বাঁদর।
স
১৫৩. সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না
অর্থ: এমন কৌশল যাতে কাজও হয়, ক্ষতিও কম হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: দুই পক্ষের বিরোধ এমনভাবে মেটাতে হবে যাতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।
১৫৪. সাপের পাঁচ পা দেখা
অর্থ: অতিরিক্ত চালাকি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য সুযোগ পেয়েই ভবিষ্যতের দশ বছরের হিসাব করা সাপের পাঁচ পা দেখা।
১৫৫. সোনায় সোহাগা
অর্থ: ভালো কিছুর সঙ্গে আরও ভালো কিছু যোগ হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: ভালো ফলের সঙ্গে বৃত্তিও পেল—সোনায় সোহাগা।
১৫৬. সবুরে মেওয়া ফলে
অর্থ: ধৈর্য ধরলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
বাক্যে প্রয়োগ: তাড়াহুড়ো না করে অপেক্ষা করো—সবুরে মেওয়া ফলে।
১৫৭. সাত ঘাটের জল খাওয়া
অর্থ: বহু অভিজ্ঞতা অর্জন করা।
বাক্যে প্রয়োগ: ব্যবসার জগতে সে সাত ঘাটের জল খাওয়া মানুষ।
১৫৮. সাত পাঁচ ভাবা
অর্থ: নানা দিক নিয়ে অযথা বেশি চিন্তা করা।
বাক্যে প্রয়োগ: সুযোগ পেয়েও সে সাত পাঁচ ভেবে সময় নষ্ট করল।
১৫৯. সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ
অর্থ: সঙ্গ মানুষের চরিত্র ও ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
বাক্যে প্রয়োগ: বন্ধুবাছাইয়ে সতর্ক হও—সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।
১৬০. সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না
অর্থ: কখনও কৌশল বা কঠোরতা ছাড়া কাজ উদ্ধার করা যায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: বহুবার অনুরোধেও কাজ হয়নি; শেষে কঠোর হতে হল—সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না।
১৬১. সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়
অর্থ: সঠিক সময়ে কাজ করলে অল্প প্রচেষ্টায় ফল পাওয়া যায়; দেরি করলে বেশি কষ্ট হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: সময়মতো চিকিৎসা করলে রোগ বাড়ত না—সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।
হ
১৬২. হাতে কড়ি নেই, অথচ বাজারে রাজা
অর্থ: সামর্থ্য নেই অথচ বড়ো বড়ো আকাঙ্ক্ষা।
বাক্যে প্রয়োগ: আয় নেই, অথচ বিলাসী জীবনের পরিকল্পনা—হাতে কড়ি নেই, অথচ বাজারে রাজা।
১৬৩. হাতি পুষলে খরচ আছে
অর্থ: বড়ো দায়িত্বের সঙ্গে বড়ো ব্যয়ও থাকে।
বাক্যে প্রয়োগ: বড়ো প্রতিষ্ঠান চালানো শুধু সম্মানের নয়, বিপুল দায়িত্বেরও—হাতি পুষলে খরচ আছে।
১৬৪. হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা
অর্থ: পাওয়া সুযোগ নিজের ভুলে নষ্ট করা।
বাক্যে প্রয়োগ: ভালো চাকরির সুযোগ ছেড়ে দিয়ে সে হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলেছে।
১৬৫. হরি ঘোষের গোয়াল
অর্থ: অগোছালো ও বিশৃঙ্খল জায়গা।
বাক্যে প্রয়োগ: নথিপত্রের অবস্থা দেখে মনে হল অফিসটা হরি ঘোষের গোয়াল।
১৬৬. হালে পানি পাওয়া
অর্থ: কাজের সাফল্যের সম্ভাবনা দেখা দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: নতুন বিনিয়োগ আসায় ব্যবসায় হালে পানি পাওয়া গেল।
আরও লোকজ ও প্রবাদধর্মী উক্তি
১৬৭. অকণ্টকবিদ্ধ কি জানে কাঁটাফোঁটার ব্যথা
অর্থ: যে কখনও কষ্ট পায়নি, সে অন্যের কষ্ট বোঝে না।
বাক্যে প্রয়োগ: আরামে থাকা মানুষ দরিদ্রের দুঃখ বুঝবে কী করে—অকণ্টকবিদ্ধ কি জানে কাঁটাফোঁটার ব্যথা।
১৬৮. অমাবস্যার চাঁদ
অর্থ: খুব কম দেখা যায় এমন ব্যক্তি বা বস্তু।
বাক্যে প্রয়োগ: অফিসে তার দেখা পাওয়া অমাবস্যার চাঁদের মতো দুর্লভ।
১৬৯. আঁঠারো মাসে বছর
অর্থ: কোনো কাজ অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকা।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রকল্পের কাজ শেষ হতে আঁঠারো মাসে বছর হয়ে গেল।
১৭০. গড়ালিকা প্রবাহ
অর্থ: অন্যের অনুসরণে বিচারহীনভাবে চলা।
বাক্যে প্রয়োগ: সবাই করছে বলে নিজেও করা গড়ালিকা প্রবাহের লক্ষণ।
১৭১. কূপমণ্ডুক
অর্থ: সীমিত জগতের বাইরে কিছু জানে না এমন ব্যক্তি।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের ছোটো অভিজ্ঞতাকেই সমগ্র পৃথিবী মনে করা কূপমণ্ডুকের স্বভাব।
১৭২. গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসানো
অর্থ: নিজস্ব বিচার না করে স্রোতের সঙ্গে চলা।
বাক্যে প্রয়োগ: সবাই যা করছে তা-ই করা গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসানো।
১৭৩. অরন্ধে রোদন
অর্থ: কোনো ফল হবে না জেনেও অভিযোগ করা।
বাক্যে প্রয়োগ: যে কর্তৃপক্ষ কিছুই শুনবে না, তার কাছে বারবার আবেদন করা অরন্ধে রোদন।
১৭৪. অকস্মাৎ বজ্রাঘাত
অর্থ: হঠাৎ বিপদ বা আঘাত।
বাক্যে প্রয়োগ: মৃত্যুসংবাদটি পরিবারের কাছে অকস্মাৎ বজ্রাঘাতের মতো এল।
১৭৫. উরুতে বেয়ে রক্ত পড়ে, চোখ গেলোরে বাবা
অর্থ: পরস্পর সম্পর্কহীন কথা বলা।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রশ্ন করা হয়েছিল চাকরি নিয়ে, আর সে বলতে শুরু করল শৈশবের গল্প—উরুতে বেয়ে রক্ত পড়ে, চোখ গেলোরে বাবা।
১৭৬. এঁটে ধরলে চিঁচিঁ করে, ছেড়ে দিলে লম্ফঝম্ফ
অর্থ: কড়া নিয়ন্ত্রণে ভীরু, ছাড় পেলে উদ্ধত।
বাক্যে প্রয়োগ: কঠোর নজরদারিতে চুপ, সুযোগ পেলেই দাপট—এঁটে ধরলে চিঁচিঁ করে, ছেড়ে দিলে লম্ফঝম্ফ।
১৭৭. ঘট গড়তে পারে না, মেটের বায়না নেয়
অর্থ: সামর্থ্যের বাইরে বড়ো কাজের আশা করা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য পুঁজি নিয়ে বিশাল শিল্প গড়ার স্বপ্ন ঘট গড়তে পারে না, মেটের বায়না নেয়।
১৭৮. গঙ্গার জল গঙ্গায় যাওয়া
অর্থ: কোনো সম্পদ বা অর্থ নিজের উৎসেই ফিরে যাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: পুরস্কারের টাকা দিয়ে সে নিজের গ্রামের স্কুলটাকেই সাহায্য করল—গঙ্গার জল গঙ্গায় গেল।
১৭৯. চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি
অর্থ: অপরাধী নীতির কথা শুনতে চায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: যতই বোঝানো হোক, ঘুষখোরের বিবেকে সাড়া নেই—চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি।
১৮০. ছুঁচোর কেত্তন
অর্থ: তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত হইচই।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য ভুল নিয়ে এত সভা-সমিতি যেন ছুঁচোর কেত্তন।
আরও ১২০টি সংক্ষিপ্ত প্রবাদ-প্রবচন
নিচের অংশে দ্রুত মনে রাখার সুবিধার জন্য প্রবাদ — অর্থ দেওয়া হল।
১৮১. আপন চরকায় তেল দাও — নিজের কাজ নিজে করো।
১৮২. আপন মাংসে হরিণা বৈরী — নিজের স্বভাবই নিজের বিপদের কারণ।
১৮৩. আপনার নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ — নিজের ক্ষতি করে অন্যের ক্ষতি করা।
১৮৪. আমড়া কাঠের ঢেঁকি — অনুপযুক্ত ব্যক্তি।
১৮৫. আকাশ ভেঙে পড়া — মহাবিপদ আসা।
১৮৬. আকাশের চাঁদ, হাতে পাওয়া দায় — দুর্লভ বস্তু পাওয়া কঠিন।
১৮৭. আদায়-কাঁচকলায় — চরম বিরোধ।
১৮৮. ইট মারলে পাটকেল খেতে হয় — আক্রমণের পাল্টা জবাব আসে।
১৮৯. উল্টো বুঝলি রাম — কথার বিপরীত অর্থ বোঝা।
১৯০. এক ফুলে বসন্ত হয় না — একটিমাত্র উদাহরণ যথেষ্ট নয়।
১৯১. একবার গেলে আর ফিরে আসে না — সুযোগের মূল্য বোঝা।
১৯২. এক মাঘে শীত যায় না — বিপদ পুনরায় আসতে পারে।
১৯৩. এক রামে রক্ষা নেই — এক বিপদ যথেষ্ট নয়।
১৯৪. ওস্তাদের মার শেষ রাতে — দক্ষ ব্যক্তির প্রকৃত ক্ষমতা শেষে প্রকাশ পায়।
১৯৫. কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই — কাগজে আছে, বাস্তবে নেই।
১৯৬. কথায় চিড়ে ভেজে না — শুধু কথায় কাজ হয় না।
১৯৭. কেঁচোর সাত পা — অযথা জটিলতা সৃষ্টি।
১৯৮. খরচের খাতায় নাম লেখা — ক্ষতির তালিকায় পড়া।
১৯৯. খড়ের গাদায় সূচ খোঁজা — অত্যন্ত কঠিন অনুসন্ধান।
২০০. খাস্তা অবস্থা — দুরবস্থা।
২০১. খেয়ে দেয়ে বনের মোষ তাড়ানো — অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত থাকা।
২০২. গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়া — বিপদে ফেলে সাহায্য প্রত্যাহার করা।
২০৩. গরিবের ঘোড়া রোগ — সামর্থ্যের বাইরে বিলাসের আকাঙ্ক্ষা।
২০৪. গুড়ের পিঁপড়ে — স্বার্থে আকৃষ্ট লোক।
২০৫. গোবরে পদ্মফুল — খারাপ পরিবেশে ভালো প্রতিভা।
২০৬. ঘোড়ার আগে গাড়ি — কাজের ক্রম উল্টে দেওয়া।
২০৭. ঘোড়ার ডিম — কিছুই নয়।
২০৮. চক্ষু চড়কগাছ — অত্যন্ত বিস্মিত হওয়া।
২০৯. চোরের উপর বাটপারি — অসৎ ব্যক্তির ওপর আরও বড়ো অসৎ কৌশল।
২১০. চোখের মণি — অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি।
২১১. ছাইভস্ম — মূল্যহীন জিনিস।
২১২. জলে কাদা করা — অশান্তি সৃষ্টি করা।
২১৩. জলে কুমিরের ভয় — সর্বত্র বিপদ।
২১৪. ঝোপ বুঝে কোপ — পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ।
২১৫. ঝড়ের বেগে — অত্যন্ত দ্রুত।
২১৬. টাকার গরম — অর্থের অহংকার।
২১৭. টাকার কুমির — বিপুল ধনী ব্যক্তি।
২১৮. টাকায় তোলা — সহজে লাভ করা।
২১৯. ঠোঁটকাটা — মুখের ওপর কথা বলা।
২২০. ঠুঁটো জগন্নাথ — ক্ষমতা থাকলেও কাজের ক্ষমতা নেই।
২২১. ডুবন্তের খড়কুটো — শেষ অবলম্বন।
২২২. ডাহা মিথ্যা — সম্পূর্ণ মিথ্যা।
২২৩. দুই নৌকায় পা — দুই পক্ষের সুবিধা নেওয়া।
২২৪. দিন আনা দিন খাওয়া — দৈনিক আয়ে সংসার চালানো।
২২৫. দুধের মাছি — সহজে ত্যাজ্য ব্যক্তি।
২২৬. ধরি মাছ না ছুঁই পানি — কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ না করা।
২২৭. নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো — নিশ্চিন্ত থাকা।
২২৮. নাক গলানো — অযাচিত হস্তক্ষেপ।
২২৯. নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো — সম্পূর্ণ বশীভূত করা।
২৩০. পায়ের তলায় সর্ষে — স্থির থাকতে না পারা।
২৩১. পিলে চমকানো — প্রবল ভয় পাওয়া।
২৩২. পটের বিবি — সর্বদা সাজগোজ করা নারী।
২৩৩. পাততাড়ি গোটানো — চলে যাওয়ার প্রস্তুতি।
২৩৪. ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া — তুচ্ছজ্ঞান করা।
২৩৫. বকধার্মিক — ধর্মের ভানকারী।
২৩৬. বাঘের বাচ্চা — সাহসী ব্যক্তি।
২৩৭. বুকের পাটা — সাহস।
২৩৮. বুকে পাথর বাঁধা — গভীর কষ্ট সহ্য করা।
২৩৯. ভিজে বেড়াল — ভীরু ব্যক্তি।
২৪০. ভস্মে ঘি ঢালা — নিষ্ফল কাজে ব্যয় করা।
২৪১. ভাগ্যের লিখন — নিয়তির ফল।
২৪২. মগের মুল্লুক — আইনহীন অবস্থা।
২৪৩. মরণকামড় — শেষ শক্তিতে আক্রমণ।
২৪৪. মেঘে মেঘে বেলা — সময় দ্রুত চলে যাওয়া।
২৪৫. মুখে কুলুপ আঁটা — নীরব থাকা।
২৪৬. মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া — আকস্মিক মহাবিপদ।
২৪৭. মাথায় হাত দেওয়া — দুশ্চিন্তা করা।
২৪৮. মাথায় চড়ে বসা — অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হওয়া।
২৪৯. মাথা গরম — উত্তেজিত বা রাগী।
২৫০. রক্ত জল করা — কঠোর পরিশ্রম করা।
২৫১. রক্তে আগুন জ্বলা — প্রবল ক্রোধ বা উত্তেজনা।
২৫২. রুই-কাতলা — বড়ো বা প্রভাবশালী ব্যক্তি।
২৫৩. লেজ গুটানো — ভয়ে বা পরাজয়ে সরে যাওয়া।
২৫৪. লেজে গোবরে — সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা।
২৫৫. শিরে সংক্রান্তি — বড়ো বিপদ এসে পড়া।
২৫৬. শাঁখের করাত — দুই দিকেই বিপদ।
২৫৭. সোনার পাথরবাটি — অসম্ভব বস্তু।
২৫৮. সাতকাহন — দীর্ঘ কাহিনি।
২৫৯. সাপে-নেউলে — চরম শত্রুতা।
২৬০. সলতে পাকানো — গোপনে প্রস্তুতি নেওয়া।
২৬১. সোনার ছেলে — ভালো ও যোগ্য ছেলে।
২৬২. হাত গুটিয়ে বসা — নিষ্ক্রিয় থাকা।
২৬৩. হাত কামড়ানো — অনুতপ্ত হওয়া।
২৬৪. হাতে নাতে ধরা — অপরাধের সময় ধরা।
২৬৫. হাত পাকানো — কাজে দক্ষ হওয়া।
২৬৬. হাতের মুঠোয় — সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।
২৬৭. হাত ধুয়ে ফেলা — সম্পর্ক বা দায়িত্ব ত্যাগ করা।
২৬৮. হাত-পা গুটিয়ে বসা — নিষ্ক্রিয় থাকা।
২৬৯. হাতের ময়লা — তুচ্ছ অর্থ।
২৭০. হরিহর আত্মা — অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
২৭১. হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া — গভীরভাবে অনুভব করা।
২৭২. হাওয়া হয়ে যাওয়া — অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
২৭৩. অরণ্যে রোদন — নিষ্ফল আবেদন।
২৭৪. অন্ধের যষ্টি — একমাত্র অবলম্বন।
২৭৫. অমাবস্যার চাঁদ — বিরল দর্শন।
২৭৬. আদা জল খেয়ে লাগা — দৃঢ় সংকল্পে কাজে নামা।
২৭৭. আত্মারাম খাঁচাছাড়া — অত্যন্ত ভয় পাওয়া।
২৭৮. ইতি টানা — সমাপ্ত করা।
২৭৯. উড়ো চিঠি — পরিচয়হীন চিঠি।
২৮০. একচোখা বিচার — পক্ষপাতদুষ্ট বিচার।
২৮১. কানে তেল দেওয়া — কর্ণপাত না করা।
২৮২. কান ভারী করা — কারও বিরুদ্ধে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করা।
২৮৩. কান পাতলা — সহজে অন্যের কথায় প্রভাবিত হওয়া।
২৮৪. কপাল চাপড়ানো — গভীর আফসোস করা।
২৮৫. চোখে ধুলো দেওয়া — প্রতারণা করা।
২৮৬. চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো — স্পষ্ট করে বোঝানো।
২৮৭. চোখে সর্ষেফুল দেখা — বিপদে দিশেহারা হওয়া।
২৮৮. ছক্কা হাঁকানো — অসাধারণ সাফল্য পাওয়া।
২৮৯. জলে কাদা করা — অশান্তি সৃষ্টি করা।
২৯০. জল মাপা — পরিস্থিতি বুঝে নেওয়া।
২৯১. জিভে জল আসা — প্রবল লোভ হওয়া।
২৯২. দুই কূল রাখা — উভয় পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা।
২৯৩. নাক উঁচু — অহংকারী।
২৯৪. পেটের দায়ে — জীবিকার প্রয়োজনে।
২৯৫. বিনা মেঘে বজ্রপাত — আকস্মিক বিপদ।
২৯৬. মুখে মধু, অন্তরে বিষ — বাইরে মিষ্টি, ভিতরে শত্রুতা।
২৯৭. মুখে রা না কাড়া — একেবারে কিছু না বলা।
২৯৮. রক্তচক্ষু — ভয়ংকর ক্রোধ বা হুমকি।
২৯৯. লালবাতি জ্বলা — বিপদের সংকেত দেখা দেওয়া।
৩০০. হাতে চাঁদ পাওয়া — দুর্লভ আকাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভ করা।
প্রবাদ ব্যবহারের উৎকৃষ্ট সাহিত্যিক নমুনা
প্রবাদকে শুধু ‘অর্থ’ দিয়ে শেখা যায়, কিন্তু ভাষার ভিতরে বাঁচিয়ে তুলতে হলে তার স্বাভাবিক প্রয়োগ জানতে হয়।
১.
‘সত্যকে যতদিনই চাপা দেওয়া হোক, তার নিজের আলো আছে—ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।’
২.
‘নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস না থাকলে মানুষ সারাজীবন নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা বলে বেড়ায়।’
৩.
‘ক্ষমতার চেয়ারে বসার আগে মানুষ যে স্বপ্ন নিয়ে যায়, চেয়ার ছাড়ার সময় অনেকের হাতে সেই স্বপ্নের বদলে শুধু ক্ষমতার দাগ থাকে—যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ।’
৪.
‘অন্যের দুর্দশায় হাসার আগে মনে রাখা ভালো—আজ ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে, কাল আগুন নিজের উঠোনেও পৌঁছতে পারে।’
৫.
‘সাফল্য কখনও একদিনে আসে না; মাটির নিচে শিকড় যেমন নিঃশব্দে বাড়ে, তেমনই মানুষের সাধনা একদিন ফল দেয়—সবুরে মেওয়া ফলে।’
৬.
‘দূর থেকে যে জীবনকে সোনার মনে হয়, কাছে গেলে তারও ফাটল দেখা যায়; দূরের ঢোলের শব্দ মধুর।’
৭.
‘অন্যের শক্তিকে ধার করে যে অহংকার করে, তার পায়ের নিচের মাটি নিজের নয়—খুঁটির জোরে ভেড়া নাচে।’
৮.
‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ হয়তো অরণ্যে রোদনের মতো শোনায়, কিন্তু ইতিহাসের বড়ো পরিবর্তন অনেক সময় এমন একাকী স্বর থেকেই শুরু হয়।’
৯.
‘যে সুযোগ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল, সে নিজের অহংকারেই দরজা বন্ধ করে দিল—হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা।’
১০.
‘বিপদের সময়ে মানুষ যে হাতটুকু পায়, সেটাই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো আশ্রয়—ডুবন্তের খড়কুটো।’
প্রবাদ থেকে জীবনদর্শন
বাংলা প্রবাদকে কয়েকটি বৃহৎ জীবনবোধে ভাগ করা যায়।
পরিশ্রম
‘কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।’
‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।’
‘সবুরে মেওয়া ফলে।’
অহংকার
‘অতি দর্পে হত লঙ্কা।’
‘পিঁপড়ের পাখা ওঠে মরিবার তরে।’
‘ফল পাকলে গাছ নোয়।’
লোভ
‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।’
‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।’
অভিজ্ঞতা
‘সাত ঘাটের জল খাওয়া।’
‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে।’
ঐক্য
‘একতাই বল।’
‘দশের লাঠি একের বোঝা।’
‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ।’
বিপদ
‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘ।’
‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা।’
‘বিনা মেঘে বজ্রপাত।’
‘উভয় সংকট।’
বিশ্বাসঘাতকতা
‘ঘরের শত্রু বিভীষণ।’
‘দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা।’
‘মুখে রাম, বগলে ছুরি।’
‘রক্ষকই ভক্ষক।’
অযোগ্যতা
‘নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা।’
‘খালি কলসি বেশি বাজে।’
‘গায়ে মানে না আপনি মোড়ল।’
সুযোগ
‘হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা।’
‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল।’
‘নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।’
সামাজিক বাস্তবতা
‘জোর যার মুলুক তার।’
‘যার লাঠি তার মাটি।’
‘বড়ো মাছ ছোটো মাছকে খায়।’
পরীক্ষার্থীর জন্য শেষ ৫০টি অবশ্যপাঠ্য
১. অতি লোভে তাঁতি নষ্ট
২. অতি দর্পে হত লঙ্কা
৩. অতি চালাকের গলায় দড়ি
৪. অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী
৫. অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট
৬. অভাবে স্বভাব নষ্ট
৭. অন্ধের দেশে কানা রাজা
৮. অন্ধের যষ্টি
৯. আপন পায়ে কুড়াল মারা
১০. আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও
১১. ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়
১২. এক হাতে তালি বাজে না
১৩. এক ঢিলে দুই পাখি
১৪. একতাই বল
১৫. এক মাঘে শীত যায় না
১৬. কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে
১৭. কান টানলে মাথা আসে
১৮. কেঁচো খুঁড়তে সাপ
১৯. কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ পাকলে করে ঠাস
২০. খাল কেটে কুমির আনা
২১. খালি কলসি বেশি বাজে
২২. খুঁটির জোরে ভেড়া নাচে
২৩. গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল
২৪. গরু মেরে জুতো দান
২৫. গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না
২৬. ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘে ভয় পায়
২৭. ঘরের শত্রু বিভীষণ
২৮. চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে
২৯. চোরে চোরে মাসতুতো ভাই
৩০. যত গর্জে তত বর্ষে না
৩১. নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা
৩২. দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা
৩৩. দূরের ঢোলের শব্দ মধুর
৩৪. ধর্মের কল বাতাসে নড়ে
৩৫. দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো
৩৬. দশের লাঠি একের বোঝা
৩৭. বিনা মেঘে বজ্রপাত
৩৮. পাকা ধানে মই দেওয়া
৩৯. পিঁপড়ের পাখা ওঠে মরিবার তরে
৪০. মশা মারতে কামান দাগা
৪১. মরার উপর খাঁড়ার ঘা
৪২. মুখে রাম, বগলে ছুরি
৪৩. যেমন কর্ম তেমন ফল
৪৪. যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে
৪৫. রক্ষকই ভক্ষক
৪৬. লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু
৪৭. শাক দিয়ে মাছ ঢাকা
৪৮. সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না
৪৯. সবুরে মেওয়া ফলে
৫০. সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না
সমাপ্তি
বাংলা প্রবাদ-প্রবচনের সবচেয়ে বড়ো শক্তি তার সংক্ষিপ্ততায় নয়—তার ভিতরে জমে থাকা জীবনের ভারে। কৃষকের মাঠ থেকে সংসারের উঠোন, বাজার থেকে রাজদরবার, প্রেম থেকে প্রতারণা, দারিদ্র্য থেকে ক্ষমতা, হাস্যরস থেকে গভীর নৈতিক উপলব্ধি—বাংলার লোকজ জীবন তার অভিজ্ঞতার অসংখ্য চিহ্ন রেখে গেছে প্রবাদে।
‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’ মানুষকে লোভের সীমা শেখায়।
‘ফল পাকলে গাছ নোয়’ শেখায় বিনয়।
‘এক হাতে তালি বাজে না’ শেখায় দায়বোধ।
‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ শেখায় ন্যায়ের প্রতি আস্থা।
‘যার লাঠি তার মাটি’ দেখায় ক্ষমতার নির্মম বাস্তবতা।
‘দূরের ঢোলের শব্দ মধুর’ খুলে দেয় মানুষের মনের এক চিরন্তন গোপন দরজা।
তাই প্রবাদ মুখস্থ করার বিষয় নয়। প্রবাদ হল ভাষার ভিতরে সংরক্ষিত মানুষের অভিজ্ঞতা। যে ছাত্র প্রবাদ শেখে, সে শুধু বাংলা ভাষা শেখে না; সে মানুষের জীবনকে অল্প কথায় পড়তে শেখে।
প্রবাদ যত সংক্ষিপ্ত, তার ভিতরের জীবন তত দীর্ঘ।

