R9, রোনালদো লুইস নাজারিও দ্য লিমা : সীমার ওপারের এক মানব-পুরাণ

R9, রোনালদো লুইস নাজারিও দ্য লিমা : সীমার ওপারের এক মানব-পুরাণ

অনিশ রায়

(১)

রোনালদো নাজারিও, নম্বর ৯, আর-নাইন—একটি সংখ্যা, একটি নাম, নাকি মানুষের সম্ভাবনার এক নিঃশব্দ প্রমাণ? ফুটবলের ইতিহাসে অনেক মহান খেলোয়াড় এসেছেন। গেছেন। কেউ রেকর্ড বানিয়েছেন। কেউ ভেঙেছেন। কিন্তু কিছু বিরল মানুষ থাকেন, যাদের অর্জন সংখ্যায় ধরা যায় না, শুধুই অনুভূতিতে কাজ করে। আর-নাইন সেই দ্বিতীয় বৃত্তের মানুষ— যার খেলা, শরীর, ভাঙন, বীভৎসতা, সৌন্দর্য ও নীরবতা আমাদের মানুষ ও  ফুটবলার সম্পর্কে ধারণাকেই বদলে দেয়। মানুষের বা ফুটবলারের অর্জনের একটা অংশ দৃশ্যমান— গোল, শিরোপা, পরিসংখ্যান, ট্রফি। আরেকটা অংশ অদৃশ্য— বীভৎসতা, বিস্ময়, শিল্প, সৌন্দর্য, ক্ষণস্থায়িত্ব, অনিবার্যতা। রোনালদোর গল্প আসলে এই অদৃশ্য অংশের ইতিহাস।

রিও দে জেনেইরোর ধুলোমাখা গলি থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ ফাইনালের আলো পর্যন্ত তার যাত্রা কোনো মেলোড্রামাটিক সিনেমা নয়; বরং শরীর-মন-সম্ভাবনার এক দীর্ঘ পরীক্ষাগার। এমন বললে তা অত্যুক্তি হয় না, বরং তারপরেও অনেকটাই না-বলা থেকে যায়। আসলে সে তৈরি হয়নি, সে হয়ে উঠেছে। মানবশরীর, স্নায়ুবিজ্ঞান, সৌন্দর্যবোধ ও মানসিক শক্তির এক বিশেষ সংযোগবিন্দুতে। তার শরীর— যন্ত্রের মতো কার্যকর, আবার মানুষের মতোই ভঙ্গুর। তার মন— শিশুর মতো সহজ, আবার যোদ্ধার মতো নির্মম, দৃঢ়, নির্ভীক। ঋজু-কঠিন অথচ অভিযোজনীয়। তার খেলা ঝড়ের মতো আক্রমণাত্মক। কিন্তু শেষ-মুহূর্তে সুদক্ষ শল্যচিকিৎসকের হাতের মতো নিখুঁত। ধীর। অকম্পিত৷

তাই R9-কে কেবল এক ফুটবলার হিসেবে নয়, তাঁকে এক বিরল মানব-অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখাই সংগত। যেখানে পদার্থবিদ্যা, স্নায়ুবিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব, শিল্পতত্ত্ব, দর্শন ও সামাজিক বাস্তবতা এক ফ্রেমে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু এই মানব-অভিজ্ঞতার আরেক স্তর আছে—তা ইতিহাস। কারণ R9 শূন্যে আবির্ভূত হননি। তিনি এমন এক ফুটবল-সময়ে এসেছিলেন, যখন ৯০-এর দশকের ইউরোপীয় ফুটবল ধীরে ধীরে পুরোনো ‘নাম্বার নাইন’-এর সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছিল। স্ট্রাইকার মানে শুধু বক্সের ভিতর বা কাছাকাছি অপেক্ষা করে থাকা মানুষ হলে আর চলবে না। স্ট্রাইকারকে নেমে আসতে হবে। বল নিতে হবে। জায়গা বানাতে হবে। আবার সেই জায়গায় ফিরে গিয়ে নিজেই আক্রমণ শেষ করতে হবে। একদিকে ইতালীয় প্রতিরক্ষার সংগঠিত জোনাল বুদ্ধি, অন্যদিকে ডাচ ও ব্রাজিলীয় আক্রমণাত্মক স্বাধীনতা, স্পেনের টেকনিক্যাল সংস্কৃতি, ইংল্যান্ডের দ্রুত ট্রানজিশন—এই সমস্ত ফুটবলীয় ধারার সংযোগস্থলে R9 নিজের পরিভাষা তৈরি করেছিলেন। তাঁর বিশেষত্ব ছিল, তিনি কোনো একক ঘরানার ছাত্র হয়ে থাকেননি; বরং একাধিক ঘরানাকে নিজের শরীরের মধ্যে এমনভাবে মিশিয়ে নিয়েছিলেন যে, তার খেলার আলাদা কোনো ব্যাকরণ খুঁজতে গেলে শেষপর্যন্ত রোনালদো নাজারিওর কাছেই ফিরে আসতে হয়। আর কোনো বিকল্প পথ বা বিকল্প দৃষ্টান্ত নেই৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top