অনিশ রায়
আজকাল বাংলা সাংস্কৃতিক বাজারে একটা কথা খুবই প্রচলিত, এমনকি মেধাজীবী সৃষ্টিশীল মানুষজনের মধ্যেও এ বিষয়ে ইতিবাচক সমর্থন লক্ষ করি। কথাটা এরকম— বাংলা ভাষায় আন্তর্জাতিক লেখক নেই। বাংলা সাহিত্যের লেখকেরা পৃথিবীর বৃহত্তর পাঠসমাজে যথেষ্ট পরিচিত নন, আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাননি, বড়ো আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থায় তাঁদের বই প্রকাশিত হয় না, পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাঠ্যতালিকায় তাঁদের উপস্থিতি অপ্রতুল। ফলে তাঁদের ‘বিশ্বসাহিত্য’-এর পরিসরে প্রবেশ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। কথাটার ঐতিহাসিক সত্যতা যেমন আছে, তেমনই এই বক্তব্যের ভিতরে একটা অস্বস্তিও আছে। অস্বস্তিটা ঠিক এই নির্দিষ্ট প্রশ্নের বিরুদ্ধে নয়; বরং সেই প্রশ্নকে আরও দূর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন থেকেই এসেছে। রবীন্দ্রনাথকে আমরা ‘বিশ্বকবি’ বলি কেন—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কী বলতে পারি আমরা? তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে? ইউরোপ-আমেরিকার বুদ্ধিজীবী মহল একসময় তাঁকে নিয়ে প্রবল উৎসাহ দেখিয়েছিলেন বলে? বহু ভ্রমণ করেছেন বলে? পৃথিবীর বহু দেশে গিয়েছেন বলে? তাঁর লেখা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে বলে? যদি এইসবই ‘বিশ্বকবি’র মাপকাঠি হয়, তবে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বকবিত্ব খুবই ভঙ্গুর অভিধা। কারণ খ্যাতির ইতিহাসে উত্থান আছে, পতন আছে, আবিষ্কার আছে, বিস্মরণও আছে। যে পশ্চিম একদিন তাঁকে নিয়ে প্রায় উন্মত্ত হয়েছিল, সেই পশ্চিমেরই একাংশ পরে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইয়েটসের বিস্মিত উচ্ছ্বাস থেকে ইয়েটসের ‘ড্যাম টেগোর’— গীতাঞ্জলির বিস্ময়কর সাফল্য থেকে পরবর্তী উদাসীনতা—রবীন্দ্রনাথের পশ্চিমী অভ্যর্থনার ইতিহাস নিজেই যেন প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক খ্যাতি কতখানি সময়ের, রুচির, প্রতিষ্ঠানের এবং সাংস্কৃতিক ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল হয়ে ছিল। অমর্ত্য সেনও দেখিয়েছেন, ইউরোপ ও আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিশ শতকের গোড়ার বিপুল উত্তেজনা পরে প্রায় সম্পূর্ণত স্তিমিত হয়ে যায়।
কিন্তু এখানেই আরও বড়ো প্রশ্ন উঠছে। আমরা কি ‘বিশ্বসাহিত্য’ বলতে অজান্তেই এমন এক সাহিত্য-মানচিত্র বুঝে নিচ্ছি— যার কেন্দ্র প্যারিস, লন্ডন, নিউইয়র্ক, বার্লিন, অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড, স্টকহোম নোবেল কমিটি, বৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা, পশ্চিমের প্রধান সংবাদপত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়? কোনও লেখক সেখানে প্রবেশ করলে তিনি ‘বিশ্বলেখক’; প্রবেশ করতে না-পারলে তাঁর বিশ্বজনীনতা সন্দেহের বিষয় হতেও পারে—এই ধারণা কি নিজেই ঔপনিবেশিক ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া বহন করে না?
প্রশ্নটা অস্বস্তিকর, কারণ এর উত্তর যে দ্বিমুখী। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অপ্রয়োজনীয় নয়। অনুবাদ অপ্রয়োজনীয় নয়। পৃথিবী ব্যাপী পাঠকের কাছে পৌঁছনো অপ্রয়োজনীয় নয়। কোনও ভাষার সাহিত্য যদি নিজের সীমানার বাইরে যেতে না-পারে, তবে তার সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়— একথা মানতেই হয়। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা বাস্তব। যদিও তা নিয়ে আত্ম-বিড়ম্বনা বা জাতীয় হতাশার কোনও অবকাশ কি সত্যিই আছে? বরং মনে রাখা ভালো যে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আর সাহিত্যিক মহত্ত্বকে একই দাঁড়িপাল্লায় বসানো আরও বড়ো ভুল। বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ইতিহাসের ঘটনা; বিশ্বমানের হয়ে ওঠা শিল্পের ঘটনা। দুইয়ের মধ্যে কদাচ মিল ঘটে, প্রায়শই ঘটে না। আর সাহিত্য-ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়গুলির অনেকটাই কিন্তু তৈরি হয়েছে সেই বিচ্ছেদের ভিতর দিয়ে।
রবীন্দ্রনাথের পশ্চিমী অভ্যর্থনার ইতিহাস এই দ্বন্দ্বের এক অসামান্য দৃষ্টান্ত। ১৯১২ সালে ইংল্যান্ডে পৌঁছে যাওয়া ইংরেজি গীতাঞ্জলি, ইয়েটসের উচ্ছ্বসিত ভূমিকা, ম্যাকমিলানের প্রকাশনা, তারপর ১৯১৩ সালের নোবেল—সবকিছু যেন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ঘটেছিল। ইংরেজি Song Offerings প্রকাশের পর নোবেল ঘোষণার আগে বহুবার পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল; অল্প সময়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক কল্পনার এক বিরাট চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সেই আবিষ্কারের ভিতরেই যে বিপজ্জনক সরলীকরণ ছিল। পশ্চিমের একাংশ রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এমন এক ‘প্রাচ্য’কে দেখতে চেয়েছিল, যে প্রাচ্য আধ্যাত্মিক, রহস্যময়, বস্তুসভ্যতার বিপরীতে আত্মার আশ্রয়স্থল। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত দার্শনিক গভীরতা সেই ছবির সঙ্গে মেলেনি। তিনি যেমন উপনিষদের উত্তরাধিকার বহন করেছেন, তেমনই ইউরোপীয় বুদ্ধিবাদ, বিজ্ঞান, আধুনিক শিক্ষা, স্বাধীন চিন্তা ও মানবতাবাদের সঙ্গে গভীর সংলাপে ব্যাপৃত ছিলেন। তিনি জাতীয়তাবাদের অন্ধ উন্মাদনার সমালোচক, কিন্তু দেশবিহীন মানুষের পরিচয়ে নন; তিনি ধর্মবোধে গভীর, কিন্তু ধর্মীয় সংকীর্ণতার সমর্থক নন; তিনি প্রকৃতিপ্রেমী, কিন্তু রোমান্টিক প্রকৃতির শাস্ত্রীয় চিত্রকর নন; তিনি আধুনিকতার সমালোচক, অথচ আধুনিকতার জ্ঞানতাত্ত্বিক শক্তিরও অনুসন্ধানী। পশ্চিম তাঁকে প্রথমে যে বাক্সে ভরেছিল, রবীন্দ্রনাথ সেই বাক্সের চেয়ে অনেক বড়ো ছিলেন। ফলে মুগ্ধতার অবসানও যেন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। ইয়েটসের প্রাথমিক উচ্ছ্বাস এবং পরবর্তী বিপ্রতীপ উদাসীনতার ইতিহাস সেই সাংস্কৃতিক ভ্রান্ত-পাঠেরই অংশ।
আয়ান জ্যাকের ২০১১ সালের প্রবন্ধ তাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি আমাদের আত্মতুষ্টিতে আঘাত করেন। তিনি দেখান, ইংরেজিভাষী পাঠক রবীন্দ্রনাথকে কতখানি জানেন? অভিধান, উদ্ধৃতি-সংকলন, সাধারণ পাঠ-সংস্কৃতিতে তাঁর উপস্থিতি কোথায়? তাঁর কঠিন প্রশ্ন—যে মানুষ বাংলা পড়তে পারেন না, তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা কতটা বিচার করবেন? বিষয়টা নিশ্চিত অনুবাদের সংকটকে সামনে আনে। কিন্তু জ্যাকের শেষ প্রস্তাব—রবীন্দ্রনাথকে কবি হিসেবে ভুলে গিয়ে শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, সমাজচিন্তক, পরিবেশসচেতন মানুষ কিংবা নারী-অধিকারবিষয়ক চিন্তাবিদের পরিচয়ে সামনে আনা—রবীন্দ্রনাথের প্রতি আরও এক ধরনের অবিচার। কারণ রবীন্দ্রনাথ নিজে যে পরিচয়কে তাঁর শিল্পীসত্তার কেন্দ্র বলে জানতেন, সেই কবি-সত্তাকেই পাশ কাটিয়ে তাঁকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা মানে পশ্চিমের সুবিধাজনক পাঠের জন্য আবারও রবীন্দ্রনাথকে ছেঁটে ফেলা। জ্যাকের যুক্তি তাই একই সঙ্গে সত্য এবং অসম্পূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের কবিতা বিশ্ববাসী যথেষ্ট পড়েনি—সত্য। অনুবাদ দুর্বল—বহুলাংশে সত্য। কিন্তু তাই বলে কবিকে সরিয়ে রেখে ‘সহজে বোঝা যায়’ এমন রবীন্দ্রনাথকে প্রতিষ্ঠা করা আরও বড়ো ক্ষতি। ২০১১ সালেই এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিক্রিয়া উঠেছিল; রবীন্দ্রনাথকে ‘অপ্রাসঙ্গিক প্রাচ্য মিস্টিক’ হিসেবে খারিজ করা যে যথেষ্ট নয়, সেই কথাও উচ্চারিত হয়েছিল। কারণ রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীনতা তাঁর শিল্প-পাসপোর্টে নেই। তাঁর বিশ্ব তাঁর প্রসারিত চেতনার পরিসরে।
‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো / সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও’— এই গানকে পর্যটনশিল্পের মেজাজ ও দর্শন দিয়ে পড়া যায় না। বিশ্ব এখানে পৃথিবীর মানচিত্র নয়; মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নৈতিক ও অস্তিত্বগত ক্ষেত্র। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ করতে পারে অপর-সত্তার মধ্যে অনুভব করে। তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়। ব্যক্তিসত্তা, সমাজ, প্রকৃতি, প্রেম, ঈশ্বর, ইতিহাস, স্বাধীনতা—সব এক বৃহৎ আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে স্থাপিত। তাঁর বিশ্বমানবতা কোনও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ‘ভদ্র’ ভাষা ব্যবহার করে তারিফ আদায় করার জন্য নয়। তার ভিতরে রয়েছে সভ্যতার সংকট, জাতীয়তাবাদের বিপদ, সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা, মানুষের স্বাধীন সত্তার দাবি। আর এখানেই রবীন্দ্রনাথকে শুধু কবিতার কবি হিসেবে দেখলেও তাঁকে সম্পূর্ণ দেখা হয় না। তাঁর গান নিয়ে ভাবতে গেলে তাঁর বিশ্বজনীনতার আরও এক আশ্চর্য মাত্রা প্রকাশ পায়।
রবীন্দ্রসংগীতকে বাঙালির ‘জনপ্রিয় গান’ বলে সীমাবদ্ধ করা তাঁর সৃষ্টির প্রকৃত গুরুত্বকে ছোটো করা। পশ্চিমী ধ্রুপদি সংগীতের ইতিহাসে বাখ, মোৎসার্ট, বিটোফেন, শুবের্ট, হুগো উলফ—প্রত্যেকেই সংগীতের ভাষাকে অসামান্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। তাঁদের সৃষ্টির নন্দনতাত্ত্বিক মূল্য নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানের ঐতিহাসিক ও সত্তাতাত্ত্বিক প্রকৃতি অন্যরকম। তিনি শুধু গান লেখেননি; এক জাতির অন্তর্জীবনের জন্য প্রায় সম্পূর্ণ এক সুরভাষ্য নির্মাণ করেছেন। প্রেম, পূজা, প্রকৃতি, দেশ, ঋতু, বিরহ, আনন্দ, মৃত্যু, শোক, আত্মসমর্পণ, বিদ্রোহ, প্রার্থনা, মানবসম্পর্ক, সামাজিক উৎসব—জীবনের এত বিচিত্র আবেগ ও পরিস্থিতিকে এত বিপুল সংখ্যায়, এত রকম সুরে, এত বহুবিধ ছন্দে এবং এত স্বতন্ত্র কাব্যিক ভাষায় কোনও একক স্রষ্টা জাতির দৈনন্দিন অনুভূতির ভিতর প্রবেশ করিয়ে দিতে পেরেছেন—বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে এর তুলনা আছে কিনা জানি না। নিশ্চিত না হয়েও অনুমানে বলছি— নেই। (বিশিষ্ট সংগীতবিদ সুধীর চক্রবর্তী এমনই বলতে চেয়েছেন।)
এখানে ‘বেশি’ বলতে গুণে বেশি নয়; সৃষ্টির ব্যাপ্তি, বৈচিত্র্য, অন্তঃসঞ্চার এবং সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রভাবের এক বিরল সমাবেশ। বাখ ইউরোপীয় সংগীতের আত্মাকে পুনর্গঠন করেছেন; বিটোফেন ব্যক্তিসত্তার মহাকাব্যিক উত্তরণকে সিম্ফনিক রূপ দিয়েছেন; শুবের্ট ব্যক্তিগত বিষণ্ণতা ও লিরিক সৌন্দর্যের নতুন ভূখণ্ড নির্মাণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ অন্য এক কাজ করেছেন—একটি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্ম, প্রেম, মৃত্যু, ঋতু, উৎসব, প্রার্থনা, স্বদেশ, বিচ্ছেদ এবং আত্মপরিচয়ের ভিতরে সংগীতকে এমনভাবে প্রবেশ করিয়েছেন যে গান আর কেবল শিল্পকর্ম থাকেনি; হয়ে উঠেছে জাতীয় জীবনের চিরায়ত ঐতিহ্যের অন্তঃস্মৃতি। বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ; দুটির স্রষ্টাই রবীন্দ্রনাথ। তাঁর গান ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তে যেমন বাজে, তেমনই বাজে জাতীয় বিপর্যয়ে; প্রেমিকের নিঃসঙ্গতায় যেমন উচ্চারিত হয়, তেমনই বিদ্যালয়ের প্রার্থনায়; বসন্তোৎসবে যেমন, মৃত্যুশয্যার পাশে তেমন। কোনও জাতির জীবনযাপনে সংগীতের এমন সর্বাঙ্গীণ অন্তঃপ্রবেশ স্বয়ং এক সভ্যতাগর্বী বিরলতম ঘটনা। রবীন্দ্রনাথের গানকে পৃথিবী যথেষ্ট না-জানলে রবীন্দ্রনাথের খুব একটা ক্ষতি হয় বলে মনে করি না; বরং বিশ্বসংগীতের ইতিহাসের এক বিশাল সাংস্কৃতিক ভূখণ্ডই অনাবিষ্কৃত থেকে যায়।
আর রবীন্দ্রনাথের এই গানের ভিতরেই বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের রহস্য রয়েছে। তিনি শুধু বাংলা ভাষায় লিখেছেন, বিষয়টা এমন নয়; তিনি বাংলা ভাষার অনুভব করার ক্ষমতাকেই বদলে দিয়েছেন। প্রেমকে বাঙালি যেভাবে বলেছে, বর্ষাকে যেভাবে অনুভব করেছে, শরৎকে যেভাবে চিনেছে, বিদায়কে যেভাবে উচ্চারণ করেছে, মৃত্যুকে যেভাবে অন্তরের সঙ্গে মিলিয়েছে—তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ভাষা প্রবলভাবে কাজ করেছে। রবীন্দ্রবিরোধী বাঙালিও রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকারে বাংলা ভাষার সন্তান।
ফলে এদিক থেকে তো ‘বিশ্বকবি’ শব্দের আরেক অর্থ আবিষ্কৃত হয়ে যায়। বিশ্বকবি বলতে পৃথিবীর সর্বত্র সবচেয়ে বেশি পঠিত কবি নন। বিশ্বকবি বলতে এমন কবি, যিনি নিজের ভাষার গভীরে গিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতার এমন স্তর আবিষ্কার করেছেন, যা অন্য ভাষার মানুষও একদিন আবিষ্কার করতে পারে। বিশ্বজনীনতা বাজারের বাইরে জন্ম নেয়, অনুবাদের ভিতর দিয়ে তার ভ্রমণ সম্ভব হয়। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই কথা আরও জোর দিয়ে বলতে হয়, কারণ বাংলা ভাষার বহু বড়ো সৃষ্টির সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের বৃহৎ পাঠসমাজের পরিচয় এখনও অসম্পূর্ণ। এই অসম্পূর্ণতা আমাদের জন্য দুঃখের, কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের জন্যও ক্ষতির— এ কথা কি অস্বীকার করা যায়?
জীবনানন্দ দাশের দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বনলতা সেন নিয়ে পৃথিবী যদি মুগ্ধ হয়, ভালো। কিন্তু জীবনানন্দকে ‘বনলতা সেন’-এ আটকে রাখলে জীবনানন্দের প্রতি ভয়াবহ অবিচার হয়। তাঁর প্রকৃত মহাদেশ আরও দূরে—মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, বেলা অবেলা কালবেলা। সেখানে বাংলা আর কেবল বাংলার ভূগোলে বাঁধা নয়; সেখানে দুই মহাযুদ্ধের ক্ষত, ফ্যাসিবাদের অন্ধকার, সভ্যতার আত্মধ্বংস, মানুষের বিচ্ছিন্নতা, ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা, মৃত্যুর অনিবার্যতা, নগরসভ্যতার ক্লান্তি এবং পৃথিবীর উপর মানুষের ক্রমবর্ধমান অপরাধবোধ এক অদ্ভুত কাব্যিক অন্ধকারে এসে মিশেছে। জীবনানন্দের সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কার হয়তো কোনও দৃশ্য নয়, কোনও উপমাও নাই-বা ধরলাম, না-হয় কাব্যভাষার অনন্যতাকেও বাদ রাখলাম; কিন্তু সময়কে অনুভব করার তাঁর সেই নতুন পদ্ধতিকে কীভাবে এড়াবে বিশ্ব? তাঁর কবিতায় অতীত বর্তমানের ভিতর মৃত হয়ে পড়ে থাকে না; অদৃশ্য জীবাশ্মের মতো বর্তমানকে বিদ্ধ করে। মানুষ কেবল নিজের জীবনে বাস করে না; সে মৃত সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ, প্রাণির বিবর্তন, যুদ্ধের স্মৃতি, ইতিহাসের অপরাধ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ভিতরও বাস করে। এই সময়বোধ বিশ শতকের গভীরতম মানবিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত। শ্রেষ্ঠ বিদগ্ধ সমালোচকদের লেখা পড়ে অল্প-বিস্তর বুঝেছি যে— এলিয়টের The Waste Land-এ সভ্যতার ভাঙন যেমন পৌরাণিক ও সাংস্কৃতিক উদ্ধৃতির ভগ্নাংশে প্রকাশ পায়, জীবনানন্দের কবিতায় সেই ভাঙন অন্য ভূগোল, অন্য স্মৃতি, অন্য প্রাণি ও অন্য অন্ধকারের ভিতর দিয়ে প্রকাশিত। কাফকা মানুষের উপর অদৃশ্য ক্ষমতার আতঙ্ককে ভাষা দিয়েছেন; কাম্যু নির্মম অর্থহীনতার মুখোমুখি মানুষের অস্তিত্বকে নির্মাণ করেছেন; রিলকে মৃত্যুচেতনার ভিতর আত্মার গভীর গুহা অনুসন্ধান করেছেন; নেরুদা ব্যক্তিমানুষের প্রেম, শরীর, প্রকৃতি ও ইতিহাসকে ক্রমে মহাদেশীয় মানুষের অভিজ্ঞতায় প্রসারিত করেছেন; লোরকা আন্দালুসিয়ার মাটি, লোকস্মৃতি, কামনা, রক্ত ও মৃত্যুকে এমন এক আধুনিক প্রতীকময়তায় উন্নীত করেছেন, যেখানে স্থানীয় ভূগোল মানুষের আদিম নিয়তির ভূগোলে পরিণত হয়েছে। জীবনানন্দ সেই যুগেরই অন্য এক অন্ধকারে পৌঁছে দেখেছেন— মানুষের সভ্যতা যত এগোয়, তার ভিতরের অন্ধকার নিঃসঙ্গতাও তত ঘনীভূত হয়।
এঁরা কেউ কারও সমান নন। আর তুলনা মানে শ্রেণিবিন্যাসও নয়। কিন্তু একই শতাব্দীর গভীর মানবিক কম্পন বিভিন্ন ভাষায় যে ভিন্ন ভিন্ন শিল্পরূপ লাভ করেছে, জীবনানন্দ সেই বিশ্ব-সমকালীনতার এক অসামান্য এবং বলা যায় সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিনিধি। আর বেলা অবেলা কালবেলা? সেখানে ব্যক্তিগত প্রেম বা প্রকৃতির লিরিক সৌন্দর্যের বাইরে এতই প্রসারিত যে, ইতিহাস নিজেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে। বাংলা তথা বিশ্ব-কবিতায় এমন এক পরিণত সভ্যতাবোধের উদাহরণ বিরল। তাঁর কবিতা শুধু ‘সুন্দর’ নয়; তা প্রতিনিয়ত সুন্দরকে সন্দেহ করে, সভ্যতাকে সন্দেহ করে, মানুষকেও সন্দেহ করে। অথচ সেই সন্দেহের ভিতর দিয়েই মানুষের জন্য এক গভীর করুণা জন্ম নেয়। পৃথিবীর বহু কবি আধুনিকতার অন্ধকারে প্রবেশ করেছেন; কিন্তু জীবনানন্দ বাংলা ভাষায় যে নির্জন, ধীর, প্রায় ভূতাত্ত্বিক অন্ধকার নির্মাণ করেছেন, তার যথার্থ সমতুল্য কোথায় খুঁজে পাব?
তাঁকে পৃথিবী যথেষ্ট পড়েনি—সত্য। কিন্তু পৃথিবী তাঁকে এখনও যথেষ্ট পড়তে পারেনি বলেই তাঁর কাব্যের মহত্ত্ব এতটুকু কমে না। বরং প্রশ্ন তুলে যদি বলি—যে বিশ্ব জীবনানন্দকে যথেষ্ট আবিষ্কার করেনি, তার বিশ্ব-সাহিত্যবোধ কি এখনও অসম্পূর্ণ নয়? হয়তো বিশ্বপাঠকের সেই মেধাবী গভীরতা অর্জন করা এখনও সময়-সাপেক্ষ অপেক্ষার স্তরে— তাই তিনি পঠিত হননি৷ এভাবেও তো ভাবতে পারি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও একই ভুল আমরা করি। পুতুল নাচের ইতিকথাকে বাঙালি সমাজের উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করলেই যেন দায়িত্ব শেষ। অথচ মানিক মানুষের শরীর, কামনা, অর্থনৈতিক কাঠামো, শ্রেণি, সামাজিক বিধিনিষেধ, ক্ষমতা ও নিয়তিতত্ত্বের এমন এক আন্তঃসম্পর্ক নির্মাণ করেছেন, যেখানে সমাজবিজ্ঞান আর অস্তিত্বতত্ত্ব একে অপরের ভিতরে বহুদৃষ্টির আলো নিয়ে প্রবেশ করে। তাঁর মানুষ কেবল সমাজের শিকার নয়; নিজের কামনা, লোভ, আকাঙ্ক্ষা ও শরীরেরও বন্দি। বিশিষ্ট মানুষজনের কথায় বুঝেছি, কাম্যুর ‘দ্য আউটসাইডার’ আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতার এক স্মরণীয় এবং ব্যাপ্ত রূপ নির্মাণ করেছে। কিন্তু আধুনিকতার সমস্ত অস্তিত্বগত সংকট ইউরোপীয় দর্শনের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। মানিক নিজের সমাজবাস্তবতার ভিতর এমন মানুষ নির্মাণ করেছেন, যার অস্তিত্ব অর্থনীতি ও শরীরের দ্বারা যেমন নির্ধারিত, তেমনই তার অন্তর্গত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ক্রমাগত বিদীর্ণ। দুই সাহিত্যিককে এক করে দেওয়া ভুল; কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের আলোচনায় মানিককে অনুপস্থিত রাখাও কম ভুল নয়; তা প্রায় অপরাধ।
আর বিভূতিভূষণ? পথের পাঁচালী বিশ্বমানের—এই বাক্যও আর কতটুকু বলে? এই বাক্যও যথেষ্ট নয় এই সৃষ্টি সম্পর্কে। আরণ্যক নিয়ে বাংলা সাহিত্যের আত্মবিশ্বাস আরও গভীর হওয়া উচিৎ বলে মনে করি। পৃথিবীর নানা সাহিত্যে বন আছে, জাঙ্গলিক জীবন আছে, প্রকৃতি আছে, মানুষের সভ্যতার বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রতিরোধ আছে। কিন্তু আরণ্যক-এর মতো করে ভূমি, বন, মানুষের দারিদ্র্য-নির্ভর অস্তিত্বচেতনার কৌণিক সীমানা, জমির মালিকানা, ঔপনিবেশিক অর্থনীতি, আদিবাসী জীবন, ব্যক্তিগত অপরাধবোধ, সৌন্দর্যের মোহ এবং ধ্বংসের অনিবার্যতা—সবকিছুকে নৈতিক ও নন্দনচেতনার বহুগামী জটিলতার ভিতর স্থাপন করা উপন্যাস খুব সহজে দ্বিতীয়টি কি পাওয়া সম্ভব হয়েছে? (আক্ষেপের বিষয়, ঋত্বিক ঘটক আরণ্যক সিনেমাটি নির্মাণ করে যেতে পারেননি, সেটা সম্ভব হলে আমার বিশ্বাস, আরণ্যক বিশ্বসাহিত্যে তার একক আসন এতদিনে অর্জন করে ফেলতে পারত।)
মানুষ যে সৌন্দর্য উপভোগ করে, সেই সৌন্দর্যের ধ্বংসেও তারই হাত রয়েছে। একুশ শতকের পরিবেশ-সমালোচনার বহু ধারণা নিয়ে আজ যে অ্যাকাডেমিক আলোচনা চলছে, আরণ্যক তার বহু আগে সাহিত্যের অভিজ্ঞতায় এমন এক নৈতিক দ্বন্দ্ব নির্মাণ করে গেছে। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাস নিয়ে সাম্প্রতিক এক পরিবেশ-সমালোচনামূলক গবেষণাতেও নৃতাত্ত্বিক আধিপত্য, পরিবেশের উপর মানুষের কর্তৃত্ব এবং ‘এনভায়রনমেন্টালিজম অব দ্য পুওর’-এর মতো ধারণার আলোকে নতুন পাঠের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। তাই বলতেই হয়—আরণ্যক-এর মতো উপন্যাস পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি হয়নি—এই বাক্যকে যদি অহংকারের ঘোষণা না-বানিয়ে নন্দনতাত্ত্বিক দাবি হিসেবে পড়ি, তবে তার ভিতরে যথেষ্ট যুক্তি খুঁজে পেতে পারি। কারণ অনুরূপ বিষয় নিয়ে অনেক উপন্যাস থাকতে পারে; কিন্তু বিভূতিভূষণের প্রকৃতি, স্মৃতি, অপরাধবোধ, ভূমি ও মানুষের সম্পর্কের যে স্বর, তার দ্বিতীয় জন্ম অসম্ভব। মহৎ শিল্পের মৌলিকত্ব এখানেই—বিষয় পুনরাবৃত্ত হতে পারে, কিন্তু সেই দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্জন্ম হয় না।
বিশ্বসাহিত্যের প্রকৃত মহত্ত্বের ইতিহাস তাই আসলে অনুবাদের ইতিহাসের চেয়ে বড়ো। টলস্টয়ের রাশিয়া, দস্তয়েভস্কির পিটার্সবার্গ, ফকনারের দক্ষিণ মিসিসিপি, মার্কেসের মাকন্দো—কোনওটাই বিমূর্ত ‘বিশ্ব’ নয়। তারা গভীরভাবে স্থানীয়। কিন্তু সেই স্থানিকতার এমন ঘনত্ব সৃষ্টি করেছে, যেখানে অন্য মানুষ নিজের অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেরেছে। বিশ্বজনীনতা স্থানিকতাকে মুছে ফেলে না; বরং স্থানীয় অভিজ্ঞতার গভীরে এমন মানবিক সত্য আবিষ্কার করে, যা নিজের ভূগোল অতিক্রম করতে সক্ষম।
বাংলা সাহিত্যের দুর্ভাগ্য এই নয় যে, তার লেখকেরা প্রাদেশিক। দুর্ভাগ্য হলো, তাদের প্রাদেশিক বলে ভাবার মতো আন্তর্জাতিক পাঠ-ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট প্রসারিত হয়নি। বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক উপস্থিতি দুর্বল। অনুবাদের অভাব আছে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা-ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ দুর্বল। বাংলা সাহিত্য নিয়ে বিশ্বমানের বিদেশি ভাষার সমালোচনা অপ্রতুল। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান, এজেন্সি, আন্তর্জাতিক পুরস্কার, প্রকাশনা—সব মিলিয়ে যে সাংস্কৃতিক অবকাঠামো ছাড়া কোনও ভাষার সাহিত্য বিশ্বপাঠে নিয়মিত প্রবেশ করতে পারে না, সেখানে বাংলা অনেক পিছিয়ে।কিন্তু এখানেই সমকালীন বাংলা সাহিত্যের সামনে সম্ভবত আরেকটি নির্মম প্রশ্ন এসে দাঁড়াবে। আমরা কি পৃথিবীর কাছে পৌঁছতে চাই, নাকি পৃথিবীর কাছে নিজেদের বিপণনযোগ্য করতে চাই? দুইয়ের মধ্যে কিন্তু পার্থক্য বিরাট।
একুশ শতকের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা যত বেড়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই সাহিত্যিক আত্মবিশ্বাস তত কমেছে। অনুবাদ চাই— স্বাভাবিক। বিদেশি প্রকাশক চাই— স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক উৎসব চাই— স্বাভাবিক। বিদেশি পুরস্কার চাই— মানবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। কিন্তু যখন লেখকের সৃষ্টির ভিতরের প্রয়োজনের চেয়ে বিদেশি পাঠকের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বড়ো হয়ে ওঠে, তখন শিল্পের স্বাধীনতা ক্ষয়ে যায়। লেখক নিজের মাটিকে তখন আর নিজের চোখে দেখেন না; সম্ভাব্য অনুবাদকের চোখে দেখতে শুরু করেন। নিজের ভাষার পাঠকের বদলে আন্তর্জাতিক বাজারের কল্পিত পাঠক তাঁর মনের ভিতর বসে যায়।
সেখানেই শুরু হয় কাঙালবৃত্তি।কাঙালবৃত্তি বলতে বিদেশি পাঠক চাওয়ার বিষয় নয়। কাঙালবৃত্তি হলো নিজের শিল্পের মূল্য সম্পর্কে নিজের ভিতরে অনাস্থা এবং বাইরের অনুমোদনকে আত্মমর্যাদার বিকল্প বানানো।আজকের বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির একাংশে সেই কাঙালবৃত্তি নানা রূপে দৃশ্যমান। আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবের মঞ্চ, বিদেশি পুরস্কারের তালিকা, অনুবাদ-প্রকাশের খবর, বিদেশি সংবাদপত্রে ক্ষুদ্র উল্লেখ, কোনও ইউরোপীয় বা আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের প্রশংসা— এসবকে সাহিত্যিক সাফল্যের প্রধান প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা ক্রমশ বেড়েছে। অথচ নিজের ভাষার পাঠক কতজন? নিজের সাহিত্যের ইতিহাস কতটা জানা? নিজের পূর্বসূরিদের কতটা অবলোকন করা? বাংলা সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে কতটা মৌলিক কাজ হচ্ছে? জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে পৃথিবীর সঙ্গে আলাপ করার আগে আমরা নিজেরাই জীবনানন্দের কোন কোন কবিতা কত গভীরভাবে পড়ছি? আন্তর্জাতিকতার নামে যদি আত্মপরিচয় ক্ষয়ে যায়, তবে সেই আন্তর্জাতিকতা আসলে আরেক ধরনের প্রাদেশিকতা।
রবীন্দ্রনাথের জীবন তার বিপরীত উদাহরণ। তিনি পৃথিবীর দিকে হাত মেলেছেন, কিন্তু নিজের মাটি ছেড়ে নয়। তিনি ইংরেজি লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, বিদেশে গিয়েছেন, পশ্চিমের চিন্তার সঙ্গে ভাবসম্মিলন ঘটিয়েছেন; কিন্তু নিজের ভাষার মহিমা নিয়ে কখনও আত্মসমর্পণ করেননি। তাঁর ইংরেজি খ্যাতির মধ্যে আনন্দ যেমন ছিল, তেমনই ছিল অস্বস্তি। বাংলা ভাষায় তাঁর সৃষ্টির যে বিশালতা, ইংরেজি জগতে তার সামান্য অংশমাত্র পৌঁছেছিল। তাঁর নিজের চিঠিপত্রে এই ব্যবধানের বেদনাও ধরা পড়ে। ফলে রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিকতা আত্মবিসর্জনের আন্তর্জাতিকতা নয়; বরং তা হলো আত্মপরিচয়ের গভীরতা থেকে অন্যের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংলাপ বিনিময়।
এই জায়গায় মধুসূদনের ‘হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন…’, বঙ্গভাষা কবিতার স্মরণ অনিবার্য। পরধনের লোভে নিজের ভাণ্ডারকে অবহেলা করার যে আত্মসমালোচনা মধুসূদন নিজের জীবন দিয়েই করেছিলেন, আজকের বাংলা সাহিত্যেও সেই প্রশ্ন ফিরে আসে— আমরা কি বিশ্বকে চাইছি নিজের ভাণ্ডার নিয়ে, নাকি বিশ্ববাজারে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য নিজের ভাণ্ডারকেই বদলে ফেলতে চাইছি? আন্তর্জাতিক হওয়া মানে নিজের ভাষাকে লুকিয়ে ফেলা নয়। নিজের ভাষার এমন গভীরে পৌঁছনো, যেখানে পৃথিবীর অন্য ভাষার মানুষও এসে দাঁড়াতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ পেরেছিলেন। জীবনানন্দ পেরেছিলেন। মানিক পেরেছিলেন। বিভূতিভূষণ পেরেছিলেন। তাঁদের সামনে কোনও আন্তর্জাতিক বাজারের নকশা ছিল না। তাঁরা জানতেন না কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় তাঁদের নাম উঠবে। কোনও সাহিত্য-উৎসব তাঁদের লেখার জন্য রঙিন পানীয় আর পাঁচতারা হোটেল সাজিয়ে অপেক্ষা করছিল না। তাঁরা লিখেছিলেন, কারণ, মানুষের জীবন ও অনুভূতির স্তর-পরম্পরা তাঁদের ভিতরে প্রবল হয়ে উঠেছিল। সেই কারণেই তাঁদের শিল্প আজও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলতে গেলে তাই ‘বিশ্বমানের’ কথাটিও সাবধানে ব্যবহার করা দরকার। বিশ্বমানের মানে যেন এই না-হয়— পশ্চিমের কোনও স্বীকৃত লেখকের সঙ্গে তুলনা করে আমরা নিজেদের বড়ো প্রমাণ করলাম। বরং দেখতে হবে, বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টিশীলতার এমন কোন অনালোকিত পরিসর আছে, যার নিজস্ব সমতুল্য শিল্পকর্ম অন্যত্র পাওয়া কঠিন।
রবীন্দ্রনাথের মতো বহুমাত্রিক স্রষ্টা—কবি, গীতিকার, সুরকার, ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাচিন্তক, চিত্রকর, সমাজভাবুক—বিশ্বসাহিত্যে বিরল। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব কেবল কাজের সংখ্যায় নয়; বিচিত্র ক্ষেত্রগুলির মধ্যে তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তার এক অভিন্ন প্রবাহে। গান, কবিতা, শিক্ষা, প্রকৃতি, সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম—সব জায়গায় মানুষকে কেন্দ্র করে এক বিশাল অনুসন্ধান চলেছে। জীবনানন্দের অনন্যতা অন্যত্র। তিনি বাংলা কবিতাকে এমন এক সময়চেতনা দিয়েছেন, যেখানে ব্যক্তিমানুষ আর ইতিহাস আলাদা থাকে না। তাঁর কবিতায় মানুষ নিজের মৃত্যুকে যেমন অনুভব করে, তেমনই অনুভব করে পৃথিবীর মৃত্যুকেও। মহাপৃথিবী থেকে সাতটি তারার তিমির, বেলা অবেলা কালবেলা—এই দীর্ঘ যাত্রায় কবি যেন পৃথিবীর অন্তর্গত অন্ধকারের ভূতত্ত্ব তৈরি করেছেন। বাংলা কবিতা এমন গভীরে আগে যায়নি; পরেও গিয়েছে কি? বিশ্বকবিতার বৃহৎ পরিসরে তাঁর সমান্তরাল খোঁজা যায়, কিন্তু তাঁর নিজস্ব সৃষ্টিবৃত্তির পূর্ণ প্রতিরূপ পাওয়া যায় না।
মানিকের শক্তি মানুষের জৈব-সামাজিক অস্তিত্বের ভিতরে। বিভূতিভূষণের শক্তি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি ও সময়ের সম্পর্কের নৈতিক রহস্যে। শরৎচন্দ্র মানুষের সামাজিক আবেগকে যে গভীরতা দিয়েছেন, তারও নিজস্বতা আছে। তারাশঙ্কর গ্রামীণ সমাজের কামনা, ক্ষমতা, ধর্ম, অর্থনীতি ও সামষ্টিকতার যে বহুস্বরী জগৎ নির্মাণ করেছেন, তা কেবল ‘বাংলার উপন্যাস’ বলে ছোটো করা যায় না। অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে নদী, জাতিসত্তা, দারিদ্র্য ও বিলীয়মান জীবনকে যে মহাকাব্যিক বেদনায় ধারণ করেছে, তারও আন্তর্জাতিক পাঠ প্রাপ্য। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা ইতিহাস, লোকস্মৃতি, রাজনীতি ও স্বপ্নকে যে ঘনত্বে মিশিয়েছে, তার তুলনা সহজ নয়। হাসান আজিজুল হকের ছোটোগল্প মানুষের অস্তিত্বের যে সংকুচিত অথচ বিস্ফোরক অঞ্চল খুলে দেয়, তা কোনওভাবেই কেবল ‘বাংলাদেশি সাহিত্য’ নামে এক ভূগোলের মধ্যে আবদ্ধ নয়।
বাংলা সাহিত্যের মহত্ত্ব তাই কোনও এক রবীন্দ্রনাথের উপর দাঁড়িয়ে নেই। রবীন্দ্রনাথ সেই পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলির অন্যতম; পর্বতমালার বিস্তার আরও বহুদূর।আর সেই পর্বতমালা পৃথিবী এখনও যথেষ্ট দেখেনি। কিন্তু এখানেও আত্মতুষ্টি নয়—দায়িত্বের প্রশ্ন আছে। বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পাঠ তৈরি করতে হলে শুধু অনুবাদ করলেই হবে না। অনুবাদককে সাহিত্যিক হতে হবে; বিদেশি পাঠককে প্রস্তুত করতে হবে; বাংলা সাহিত্য নিয়ে বিশ্বমানের সমালোচনার ভাষা তৈরি করতে হবে; গোষ্ঠীপনা বাদ দিয়ে প্রকৃত লেখাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে প্রবেশ করাতে হবে; তুলনামূলক সাহিত্যকে নতুনভাবে নির্মাণ করতে হবে। জীবনানন্দকে এলিয়ট বা অন্যান্য পাশ্চাত্য কবিদের পাশে বসানোই যথেষ্ট নয়; জীবনানন্দের নিজস্ব আধুনিকতার ধারণা তৈরি করতে হবে। মানিককে কাফকা বা কাম্যুর সঙ্গে সমগোত্রীয় বলে প্রচার করাই যথেষ্ট নয়; মানিকের মানব-দর্শনকে বিশ্ব-উপন্যাসের তত্ত্বের ভিতরে প্রবেশ করাতে হবে। আরণ্যক-কে ‘ইকোক্রিটিক্যাল’ বলা যথেষ্ট নয়; প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে বিভূতিভূষণ যে মানব-নৈতিক জিজ্ঞাসা নির্মাণ করেছেন, তার নিজস্ব ভাষা আবিষ্কার করতে হবে। বিশ্বসাহিত্যে প্রবেশ, অর্থাৎ অন্যের সিলেবাসে কেবল নিজের নাম ঢোকানো নয়— নিজের সাহিত্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্যের সিলেবাসকেই বদলে দিতে বাধ্য করা।
তাই আজকাল যে প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক লেখক কোথায়—সেই প্রশ্নের ঐতিহাসিক সত্যতা অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। বিশ্বপাঠের দৃশ্যমান পরিসরে বাংলা ভাষার লেখকদের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু ‘আন্তর্জাতিক লেখক’ এবং ‘বিশ্বমানের লেখক’ এক করে ফেললে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড়ো সম্পদকেই ভুলভাবে বিচার করা হবে। অন্তত সাধারণ পাঠকের পাঠপ্রতিক্রিয়ায় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। তাই বিষয়টা একটু স্পষ্ট করার জন্যই বলি, রবীন্দ্রনাথের নোবেল বিশ্বকে রবীন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে গিয়েছিল; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্ব নোবেলের আগে থেকেই ছিল। নোবেল তাঁর সাহিত্যকে বড়ো করেনি; কেবল পৃথিবীর দৃষ্টি তাঁর দিকে বড়ো করেছিল। এই পার্থক্য উপলব্ধি করা ইতিহাসে খুব জরুরি। পুরস্কার দৃষ্টি তৈরি করে, আর শিল্প মহত্ত্ব তৈরি করে। প্রকাশক বাজার তৈরি করেন, কবি ভাষা তৈরি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ তৈরি করে, মহৎ সাহিত্য মানুষের ভিতরে অভিজ্ঞতা তৈরি করে। অনুবাদ সেতু নির্মাণ করে, কিন্তু নদীর দুই পারে কী আছে, তা অনুবাদ নির্ধারণ করতে পারে না।
তাই রবীন্দ্রনাথকে বিশ্ব পড়ুক—অবশ্যই চাই। জীবনানন্দকে পৃথিবীর ভাষায় অনূদিত হতে হবে—অবশ্যই চাই। মানিক, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, অদ্বৈত, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, সুবোধ ঘোষ—সবাইকে বিশ্বপাঠের সামনে নিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু তাঁদের মহত্ত্বের জন্য কোনও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন নেই। বরং প্রশ্নটা উল্টো করা উচিৎ— পৃথিবী যদি রবীন্দ্রনাথকে না-পড়ে, পৃথিবীর কত বড়ো ক্ষতি? বিশ্ব যদি জীবনানন্দকে না-পড়ে, বিশ্বকবিতার কোথায় সীমাবদ্ধতা ঘটে যাবে? মানিককে না-পড়লে আধুনিক উপন্যাসের ইতিহাসের কোন সম্ভাব্য অধ্যায় অনুপস্থিত থাকে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বাংলা সাহিত্যের আত্মমর্যাদার ভিত্তি হতে পারে।
কারণ কোনও শিল্পীর মহত্ত্ব তাঁর পাঠকের সংখ্যায় নয়; তাঁর শিল্পমানস অভিজ্ঞতার যাত্রাপথে কতদূর পর্যন্ত নতুন ভাষা তৈরি করতে পেরেছে, সেখানে। বিশ্বচেতনার হওয়া মানে পৃথিবীর মানচিত্রে নিজের নাম ছাপা নয়। বিশ্বচেতনার হওয়া মানে মানুষের চেতনার এমন এক ভূখণ্ড আবিষ্কার করা, যার কোনও সীমান্ত নেই।রবীন্দ্রনাথ সেই ভূখণ্ড আবিষ্কার করেছেন মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগে। জীবনানন্দ আবিষ্কার করেছেন সময়, মৃত্যু, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে। মানিক পেরেছেন। বিভূতিভূষণ পেরেছেন। আর বাংলা সাহিত্যের এই আবিষ্কারগুলি পৃথিবী যথেষ্ট না-জানলে কেবল বাংলা সাহিত্য দরিদ্র হয় না— দরিদ্র হয় বিশ্বসাহিত্যও।
শেষপর্যন্ত তাই রবীন্দ্রনাথকে ‘বিশ্বকবি’ বলা হবে কি না, সেই প্রশ্নের চেয়েও বড়ো প্রশ্ন দাঁড়ায়—বিশ্বসাহিত্য নিজেই রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া কতখানি সম্পূর্ণ? জীবনানন্দকে ছাড়া বিশ শতকের কবিতার ইতিহাস কতখানি সাবালক? আরণ্যক ছাড়া প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক প্রভাব, প্রতিঘাত ও অস্তিত্বগত সম্পর্ক নিয়ে আধুনিক সাহিত্য কতখানি সত্য? মানিককে ছাড়া আধুনিক উপন্যাসের মানবতত্ত্ব কতখানি গভীর? প্রশ্নগুলি তখন আর বাঙালির আত্মপ্রশংসার প্রশ্ন থাকবে না। হয়ে উঠবে বিশ্বসাহিত্যের আত্মসমালোচনার প্রশ্ন। ফলত নিজেদের সেই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে প্রমাণ করতে হবে নিজেদেরই—কিন্তু প্রমাণের ভাষা যেন বিদেশি অনুমোদনের ভাষা না-হয়।
পরধনের লোভে নিজের ভাণ্ডারকে অস্বীকার করা যেমন আত্মবিস্মৃতি, তেমনই নিজের ভাণ্ডারের সামনে বসে থেকে পৃথিবীকে দোষ দেওয়া বা ‘ঠাঁই হল না তোমার সোনার নায় গো’ বলে হতাশা ব্যক্ত করাও মারাত্মক আত্মপ্রবঞ্চনা। তাই দরকার সত্যনিষ্ঠ আত্মবিশ্বাসী প্রতি-সংলাপ রচনা—ভিক্ষা নয়, বিনিময়; অনুকরণ নয়, সমকক্ষতা; স্বীকৃতির জন্য প্রার্থনা নয়, নিজের শিল্পকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে অন্য সংস্কৃতি ও সভ্যতাও তার সামনে এসে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত উত্তরাধিকার সম্ভবত এখানেই।
আসল কথা এবং আপাতত শেষ কথা হল— বিশ্বচেতনার হওয়া মানে মানুষের গভীরে এমন এক সত্য আবিষ্কার করা, যার সামনে পৃথিবীর সব সীমান্ত শেষপর্যন্ত ছোটো হয়ে যায়। আর সেই অর্থে বাংলা সাহিত্যের কয়েকজন স্রষ্টা ইতিমধ্যেই বিশ্বচেতনার স্রষ্টা হয়ে আছেন। পৃথিবী তাঁদের কতটা চিনেছে—সেটা পৃথিবীর ইতিহাসের প্রশ্ন। কিন্তু তাঁরা মানুষকে, বিশ্বমানব চেতনাকে কতটা আত্মস্থ করেছেন, কতটা চিনেছেন—সেটাই শিল্প ও সাহিত্যের ইতিহাসের চিরকালীন বিস্মিত জিজ্ঞাসা। সম্ভবত দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরই প্রথমটির চেয়ে অনেক অনেক বড়ো।
[২৮/৮/২০২৬-এ সাহিত্যিক আনিসুল হকের একটি ছোটো ফেসবুক পোস্টকে উপলক্ষ করে জন্ম নেওয়া নানামাত্রিক কথা— লেখকের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন, বিষয়াশ্রয়ী মতপার্থক্য ও ভাবনার মূলগত বিস্তার থেকেই এই লেখার সূত্রপাত। ]

