সিনেমা কথা-৫

হাসির ঝলকে মানুষের শিশিরভেজা মুখ

অনিশ রায়

গ্রিফিথের পরে সিনেমা আর কেবল নতুন কোনো যন্ত্রের বিস্ময় হয়ে থাকল না; ধীরে ধীরে সে হয়ে উঠল একটি শিল্পভাষা, এক সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এক শিল্প-শ্রমের সম্মিলিত পরিসর এবং শেষপর্যন্ত আধুনিক মানুষের আত্মপরিচয় নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। আমেরিকার শহর, উপশহর, বাজার, মেলা, কারখানা-অঞ্চল—সবখানেই সিনেমার উপস্থিতি ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠল। মানুষের অবসর, কৌতূহল, বিনোদন, স্বপ্ন এবং দৈনন্দিন ক্লান্তির সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক গভীর হতে লাগল। উনিশ শতকের শেষপ্রান্তে যে যন্ত্র মানুষের চোখের সামনে চলমান আলোর বিস্ময় নিয়ে এসেছিল, বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে সেই যন্ত্রই হয়ে উঠল এক বিপুল জনসংস্কৃতির কেন্দ্র। সিনেমা তখন আর একক উদ্ভাবকের কৌতূহল নয়; তার পেছনে গড়ে উঠছে প্রযোজনা, বিতরণ, প্রদর্শন এবং শ্রমের নির্দিষ্ট সুসংগঠিত অর্থনীতি। স্টুডিও ব্যবস্থা সেই পরিবর্তনেরই স্বাভাবিক পরিণতি। চলচ্চিত্র নির্মাণ ক্রমে এমন এক শিল্প-কারখানার রূপ পেল— যেখানে পরিচালক, অভিনেতা, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদক, সেট-নির্মাতা, কস্টিউম-শিল্পী, লেখক এবং অসংখ্য অদৃশ্য শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করেন। শিল্প আর কারখানা পরস্পরের বিপরীত নয়—সিনেমার জন্মলগ্নেই তারা এক অদ্ভুত সহাবস্থানে এসে দাঁড়াল।

কিন্তু এই যান্ত্রিকভাবে সংগঠিত শিল্পব্যবস্থার ভিতরেই জন্ম নিল এমন এক শিল্পরূপ, যার উপাদান ছিল মানুষের হাসি। এর মধ্যে যেন ইতিহাসের এক গভীর পরিহাস ছিল। যে সমাজ ক্রমশ যন্ত্র, সময়, উৎপাদন, শৃঙ্খলা এবং অর্থের নিয়মে মানুষকে বেঁধে ফেলছিল, সেই সমাজেরই বিনোদনের পর্দায় মানুষ নিজের সমস্ত নিয়ম ভেঙে পড়তে শুরু করল। কারখানায় যেখানে কোনো ভুল মানে উৎপাদনের ক্ষতি, সিনেমার পর্দায় সেই ভুলই হয়ে উঠল হাসির উৎস। রাস্তায় যেখানে পড়ে যাওয়া বিপজ্জনক, পর্দায় পড়ে যাওয়া হয়ে উঠল কৌতুক। পুলিশ যেখানে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতীক, স্ল্যাপস্টিকে সেই পুলিশই বারবার নিজের পায়ে হোঁচট খেতে লাগল। আধুনিকতার শৃঙ্খলা যত শক্তিশালী হয়েছে, হাসি যেন তত বেশি তার বিরুদ্ধে মানুষের শরীরের ক্ষুদ্র বিদ্রোহ হয়ে উঠেছে।

এইখানেই ম্যাক সেনেটের আবির্ভাব। তাঁর Keystone Film Company-কে কেন্দ্র করে যে দ্রুতগতি, ধাওয়া, শারীরিক সংঘর্ষ, অতিরঞ্জিত অঙ্গভঙ্গি, পড়ে যাওয়া, মারামারি, পুলিশি তাড়া এবং পরিস্থিতির ক্রমাগত বিপর্যয় নিয়ে কমিক ভাষা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তীকালে তারই নাম হয় স্ল্যাপস্টিক। প্রথম দৃষ্টিতে এই ছবিগুলিকে মনে হতে পারে নিছক এলোমেলো ভাঁড়ামি—কিছুটা সার্কাস, কিছুটা মূকাভিনয়, কিছুটা রাস্তার কৌতুক, আর তার সঙ্গে অবিশ্বাস্য দ্রুততার শরীরী বিপর্যয়। কিন্তু এর ভিতরে ছিল নতুন শতকের মানুষের জীবনযাত্রার এক অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি। স্ল্যাপস্টিকের পৃথিবী কখনও স্থির নয়। সবাই দৌড়চ্ছে, সবাই কাউকে তাড়া করছে, কেউ পালাচ্ছে, কেউ পড়ছে, কেউ উঠে আবার দৌড়চ্ছে। যেন শিল্পায়িত সভ্যতার নিজস্ব ছন্দই পর্দায় একটি হাস্যকর গতিশীলতায় পরিণত হয়েছে। আধুনিক মানুষ সময়ের পিছনে দৌড়চ্ছে, চাকরির পিছনে দৌড়চ্ছে, অর্থের পিছনে দৌড়চ্ছে, সামাজিক সাফল্যের পিছনে দৌড়চ্ছে—আর সিনেমা সেই অনন্ত দৌড়কে উল্টে দিয়ে হাসির দৃশ্যে পরিণত করেছে।

এই হাসির মধ্যে তাই কেবল আনন্দ নেই, আছে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। সমাজ মানুষকে যত বেশি নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ করে, হাসি তত বেশি সেই নিয়মের সাময়িক বিলোপ ঘটায়। কোনো মানুষ যখন স্ল্যাপস্টিকের পর্দায় পুলিশকে ফাঁকি দেয়, মালিকের সামনে পড়ে যায়, টেবিল ভেঙে ফেলে, নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন দর্শক শুধু অন্যের বিপর্যয়ে হাসে না; নিজের জীবনের শৃঙ্খলা থেকেও কয়েক মুহূর্তের জন্য মুক্তি পায়। সে যে অফিসে বসে নিয়ম মেনে কাজ করে, যে কারখানায় ঘণ্টার শব্দে ওঠে-বসে, যে শহরে ট্রাফিকের নিয়ম মানে, যে সমাজে নিজের আচরণকে প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রণ করে—পর্দায় সে সেই সমস্ত নিয়মের বিপরীত এক পৃথিবী দেখতে পায়। এই অর্থে স্ল্যাপস্টিক আধুনিকতার বিরুদ্ধে মানুষের শরীরের এক ক্ষুদ্র অথচ গভীর প্রতিবাদ।

ম্যাক সেনেটের এই কমেডির কারখানা থেকেই পরে বেরিয়ে এলেন এমন কিছু শিল্পী, যাঁরা কৌতুককে নিছক বিনোদন থেকে পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র-শিল্পে উন্নীত করলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে মহৎ, শাশ্বত কিংবদন্তির নাম চার্লি চ্যাপলিন। তাঁর আগমন চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন এক মুহূর্ত, যখন হাসি হঠাৎ মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম প্রশ্নগুলির দিকে তাকাতে শুরু করল। চ্যাপলিনকে শুধু কৌতুক অভিনেতা বলা তাই তাঁর শিল্পের প্রতি অন্যায়। তিনি ছিলেন আধুনিক মানুষের এক অসামান্য দার্শনিক, যিনি দর্শনের ভাষায় নয়, শরীরের ভাষায় কথা বলেছিলেন। সমাজতত্ত্বের তত্ত্ব লিখে নয়, এক ভবঘুরের ক্ষুধা, প্রেম, অপমান, স্বপ্ন ও পরাজয়কে পর্দায় রেখে আধুনিক সভ্যতার সমালোচনা করেছিলেন।

তাঁর ‘Little Tramp’ চরিত্র সম্ভবত চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বিশ্বজনীন প্রতীকগুলির অন্যতম। ছোটো ডার্বি টুপি, আঁটসাঁট কোট, ঢোলা প্যান্ট, অসম মাপের জুতো, হাতে বেতের ছড়ি আর ছোটো গোঁফ—এই মানুষ কোনো নির্দিষ্ট দেশের মানুষ হয়েও যেন কোনো দেশের মানুষ নন। তাঁর কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, অথচ পৃথিবীই তাঁর আশ্রয়। তাঁর কাছে অর্থ নেই, কিন্তু আত্মমর্যাদা আছে। সামাজিক পরিচয় নেই, কিন্তু ভালোবাসার গভীর ক্ষমতা আছে। নিরাপত্তা নেই, কিন্তু স্বপ্ন আছে। তিনি সভ্যতার প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অসংখ্য মানুষের প্রতিনিধি, যাদের শ্রমে শহর তৈরি হয়, কিন্তু যাদের জন্য শহরে বসবাসযোগ্য স্থান থাকে না।

চ্যাপলিনের ভবঘুরে ভঙ্গি তাই কেবল দরিদ্র মানুষের প্রতীক নয়; সে আধুনিক সভ্যতার নৈতিক বিবেক। তাকে দেখে আমরা হাসি, কিন্তু হাসতে হাসতেই বুঝতে পারি—আমরা আসলে নিজেদের ওপরই হাসছি। কারণ তার ক্ষুধা আমাদের সভ্যতার ব্যর্থতা। তার অপমান আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার অমানবিকতা। তার একাকীত্ব আমাদের নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা। আর তার স্বপ্ন আমাদেরই মানুষের মতো বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। The Kid, The Gold Rush, City Lights, Modern Times, Limelight কিংবা The Great Dictator—চ্যাপলিনের প্রতিটি বড়ো ছবির ভিতরে এই দ্বৈততা কাজ করেছে। হাসির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কান্না; কৌতুকের ভিতরে জন্ম নেয় করুণা; আর করুণার গভীরে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় সামাজিক সমালোচনা।

এইখানেই চ্যাপলিনের সঙ্গে চার্লস ডিকেন্সের এক গভীর আত্মীয়তা খুঁজে পাওয়া যায়। ডিকেন্স উনিশ শতকের শিল্পসভ্যতার ভিতরে হারিয়ে যাওয়া শিশু, দরিদ্র, শ্রমিক, ক্ষুদ্র কর্মচারী ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। চ্যাপলিন বিশ শতকের যান্ত্রিক নগরসভ্যতার সেই মানুষকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে বসালেন। ডিকেন্স শব্দ দিয়ে যে করুণা নির্মাণ করেছিলেন, চ্যাপলিন শরীর দিয়ে তার দৃশ্য নির্মাণ করলেন। ডিকেন্সের চরিত্ররা যেমন বিশাল সামাজিক যন্ত্রের সামনে ক্ষুদ্র হয়ে যায়— চ্যাপলিনের ভবঘুরেও তেমনই পুলিশ, কারখানা, ক্ষুধা, অর্থ এবং ক্ষমতার সামনে বারবার পরাজিত হয়। কিন্তু ডিকেন্সের মানুষ যেমন শেষপর্যন্ত মানবিকতার আশ্রয় খুঁজে পায়— চ্যাপলিনের ভবঘুরেও তেমনই বারবার উঠে দাঁড়ায়। এই উঠে দাঁড়ানোর মধ্যেই তাঁর শিল্পের আশাবাদ।

Modern Times-এ এই মানবিকতা আরও তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক অর্থ পায়। শিল্পসভ্যতার যন্ত্র যখন মানুষের শ্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন চ্যাপলিন মানুষের শরীরকে সেই যন্ত্রের ভিতরে আটকে দেন। মানুষ আর যন্ত্র চালাচ্ছে না; যন্ত্র যেন মানুষকে চালাচ্ছে। ঘড়ি, conveyor belt, factory discipline, উৎপাদনের নিরন্তর গতি—সব মিলিয়ে মানুষ নিজেই যেন উৎপাদন ব্যবস্থার এক ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ। অথচ চ্যাপলিন সেই যন্ত্রের ভিতরেও হাসির জায়গা খুঁজে পান। তাঁর শরীর মেশিনের সঙ্গে তাল মেলাতে না-পেরে বিপর্যস্ত হয়, আর সেই বিপর্যয় দর্শককে হাসায়। কিন্তু সেই হাসির কয়েক মুহূর্ত পরেই আমরা বুঝতে পারি—এ আসলে মানুষের যান্ত্রিকীকরণের বিরুদ্ধে এক গভীর ব্যঙ্গ।

চ্যাপলিনের রাজনৈতিক শিল্পের প্রকৃত শক্তিও এখানেই। তিনি বড়ো বড়ো রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে মানুষকে শিক্ষা দেন না; তিনি ক্ষমতার মুখোশ খুলে দেন। The Great Dictator-এ ফ্যাসিবাদী ক্ষমতার প্রতীককে তিনি হাস্যকর করে তুলেছিলেন। স্বৈরাচারের ক্ষমতা শুধু তার অস্ত্র বা সেনাবাহিনীতে নয়, তার চারপাশে নির্মিত ভয়ের আবহে। চ্যাপলিন সেই ভয়ের মধ্যে হাসির প্রবেশ ঘটান। একজন একনায়ককে যখন তিনি হাসির চরিত্রে পরিণত করেন, তখন তার অলৌকিক ক্ষমতার আবরণও খানিকটা খুলে যায়। এ এক গভীর রাজনৈতিক শিল্পকৌশল—অত্যাচারীকে প্রথমে মানুষকে ভয় দেখাতে হয়; আর তাকে নিয়ে হাসতে পারা মানে সেই ভয়ের অংশটাকেই নষ্ট করে দেওয়া।

তবে চ্যাপলিন একা নন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাস্টার কীটন—যাঁর শিল্প ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন অথচ সমান গভীর। চ্যাপলিনের মুখে আবেগের ঢেউ থাকলেও কীটনের মুখে যেন এক আশ্চর্য স্থিরতা। পৃথিবী ভেঙে পড়ছে, ট্রেন ছুটছে, বাড়ি ধসে যাচ্ছে, পুলিশ তাড়া করছে, প্রেমিকা বিপন্ন—আর কীটনের মুখে প্রায় কোনো পরিবর্তন নেই। এই ‘deadpan’ অভিব্যক্তিই তাঁর কমেডির কেন্দ্রীয় শক্তি। চ্যাপলিন যেখানে মানুষের অনুভূতিকে দৃশ্যমান করেন, কীটন সেখানে মানুষ ও বস্তু, মানুষ ও যন্ত্র, মানুষ ও স্থাপত্যের সম্পর্ককে কৌতুকের ভাষায় রূপ দেন।

তাঁর Sherlock Jr., The Navigator, Steamboat Bill, Jr., The General প্রভৃতি চলচ্চিত্রে দেখা যায়, কীভাবে এক গ্যাগ নিজেই চলচ্চিত্র-ব্যাকরণের অংশ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর কৌতুক শুধু অভিনয়ের ওপর নির্ভর করে না; ক্যামেরার অবস্থান, দৃশ্যের নির্মাণ, সম্পাদনার গতি, স্থানের ব্যবহার এবং শারীরিক গতিবিদ্যা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য-চিন্তা। The General-এ আমেরিকান গৃহযুদ্ধের পটভূমি যেমন ইতিহাসকে কমিক ভঙ্গির মধ্যে নিয়ে আসে, তেমনই ট্রেন হয়ে ওঠে চলমান চলচ্চিত্র-যন্ত্র। কীটনের স্বভাবগত মানুষ সেই যন্ত্রের সঙ্গে যুদ্ধও করে, তাকে নিয়ন্ত্রণও করে, আবার তার ভিতরেই নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। তাঁর হাসির ভিতর তাই আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক সূক্ষ্ম দর্শন কাজ করে।

হ্যারল্ড লয়েড আবার অন্য ধরনের মানুষকে পর্দায় নিয়ে এলেন—সাধারণ, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, শহুরে যুবক, যে জীবনে সফল হতে চায় এবং সেই সাফল্যের জন্য বিপজ্জনক উচ্চতাতেও উঠতে প্রস্তুত। তাঁর বিখ্যাত ঘড়িতে ঝুলে থাকা মানুষের দৃশ্যকে শুধু স্টান্ট হিসেবে দেখলে তার অর্থ কমে যায়। সেখানে নিচে রয়েছে অসীম পতনের সম্ভাবনা, উপরে রয়েছে সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা, আর মাঝখানে সময়ের সঙ্গে যুদ্ধরত মানুষ। আধুনিক শহুরে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন যেন সেই এক মুহূর্তে স্থির হয়ে আছে—উপরে উঠতেই হবে, কিন্তু সামান্য ভুলেই পতন। লয়েডের হাসি তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভয়কেও হাসির মধ্যে রূপান্তরিত করে।

এরপর আসে লরেল ও হার্ডির জুটি—স্ট্যান লরেল এবং অলিভার হার্ডি। তাঁদের কমেডির শক্তি শারীরিক বৈপরীত্যে যেমন, তেমনই মানুষের সম্পর্কের অন্তর্নিহিত বিশৃঙ্খলায়। রোগা লরেলের শিশুসুলভ সরলতা এবং মোটা হার্ডির আত্মম্ভরী আত্মবিশ্বাস একে অপরকে ধাক্কা দিতে দিতে এমন এক পৃথিবী তৈরি করে, যেখানে সামান্য কোনো কাজও শেষপর্যন্ত বিপর্যয়ে পরিণত হয়। দরজা খোলা, একটি কাঠের তক্তা সরানো, কোনো যন্ত্র মেরামত করা—সবই যেন সভ্যতার বিরুদ্ধে এক ক্ষুদ্র যুদ্ধ। তাঁরা ব্যর্থ হন, আবার চেষ্টা করেন, আবার ব্যর্থ হন। এই অনন্ত ব্যর্থতাই তাঁদের হাসির মূল উৎস; কিন্তু সেই ব্যর্থতার মধ্যেও থাকে বন্ধুত্বের এক অদ্ভুত উষ্ণতা। মানুষ যতই পৃথিবীকে ঠিক করতে যাক, পৃথিবী ততই তাকে নতুন করে বিপদে ফেলবে—লরেল ও হার্ডির কমেডি যেন এই চিরন্তন মানবিক সত্যকেই শিশুর হাসির মতো সরল করে দেয়।

ফ্যাটি আরবাকল, ম্যাক্স লিন্ডার থেকে শুরু করে পরবর্তী মার্ক্স ব্রাদার্স—এই বৃহত্তর কমেডি-পরম্পরাই দেখিয়ে দেয়, সিনেমা খুব তাড়াতাড়ি বুঝে ফেলেছিল যে হাসি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; তা মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। পরবর্তী সময়ে মার্ক্স ব্রাদার্সের বুদ্ধিদীপ্ত বিশৃঙ্খলা, ভাষা ও কর্তৃত্বের ওপর আক্রমণ, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অযৌক্তিকতা নিয়ে ব্যঙ্গ—সবই নির্বাক যুগের শরীরী কমেডির ভিত থেকে আরও এক নতুন ভাষার দিকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ নির্বাক কমেডি শেষ হয়ে যায়নি; তার শরীরী ব্যাকরণ পরবর্তী কালের চলচ্চিত্রে নানা রূপে রূপান্তরিত হয়েছে।

এই সমস্ত শিল্পীর কাজকে একত্রে দেখলে বোঝা যায়, নির্বাক কমেডির প্রকৃত আবিষ্কার আসলে ‘হাসানো’ নয়। তার প্রকৃত আবিষ্কার ছিল—মানুষের দৈনন্দিন ব্যর্থতাকে শিল্পে পরিণত করা। সাহিত্য দীর্ঘদিন ধরে রাজা, বীর, দেবতা এবং মহান ব্যক্তিদের গল্প বলেছে; সিনেমা এসে সাধারণ মানুষকে তার কেন্দ্রে বসাল। যে মানুষ ইতিহাসের বইয়ে নেই, সে পর্দায় এল। যে মানুষ ক্ষমতাহীন, সে নায়ক হল। যে মানুষ প্রতিদিন হোঁচট খায়, তার হোঁচটই হয়ে উঠল শিল্পের দৃশ্য। এই অর্থে নির্বাক কমেডি ছিল চলচ্চিত্রের এক গভীর গণতান্ত্রিক মুহূর্ত।

কারণ হাসির সময় মানুষ সমান হয়ে যায়। রাজা যেমন হাসে, ভবঘুরেও হাসে। শিক্ষিত যেমন হাসে, নিরক্ষরও হাসে। ভাষা না-জানলেও বোঝা যায় কেউ পড়ে গেছে, কেউ প্রেমে পড়েছে, কেউ ভয় পেয়েছে, কেউ ক্ষুধার্ত। শব্দের বিভাজন যেখানে মানুষকে আলাদা করে, শরীরের কৌতুক সেখানে তাদের মিলিত করে। নির্বাক কমেডি এই অর্থে ছিল সিনেমার প্রথম আন্তর্জাতিক ভাষাগুলির অন্যতম। পৃথিবীর এক প্রান্তে তৈরি কোনো চলচ্চিত্র অন্য প্রান্তের মানুষও বুঝতে পারত, কারণ হাসির ব্যাকরণ ভাষার অভিধানের বাইরে তৈরি হয়।

আর সেই কারণেই নির্বাক কমেডির ইতিহাস আসলে আধুনিক মানুষের ইতিহাসের বিশেষ অধ্যায়। যা কেবল কিছু কৌতুক অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়; যা এমন এক সময়ের দলিল— যখন মানুষ শিল্পায়ন, নগরায়ন, দারিদ্র্য, যন্ত্রসভ্যতা, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বিশাল পরিবর্তনের মধ্যে নিজেকে নতুন করে চিনতে শুরু করেছিল। সিনেমা সেই মানুষকে প্রথমে হাসিয়েছিল, তারপর তার হাসির ভিতরেই তার ভয়, ক্ষুধা, অপমান, প্রেম, একাকীত্ব এবং স্বপ্নকে দৃশ্যমান করেছিল।

সম্ভবত এখানেই নির্বাক কমেডির সবচেয়ে বড়ো দার্শনিক তাৎপর্য। মানুষ নিজের দুঃখকে সরাসরি সহ্য করতে পারে না; তাকে সামান্য দূরে সরিয়ে দেখতে হয়। হাসি সেই দূরত্ব তৈরি করে। আমরা পর্দায় একজন মানুষকে পড়ে যেতে দেখি এবং হাসি; তারপর দেখি সে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে। আবার পড়ছে, আবার উঠছে, আবার হাঁটছে। এই পুনরাবৃত্তির ভিতরেই মানুষের অস্তিত্বের এক চিরন্তন রূপক লুকিয়ে আছে। মানুষ পরাজিত হয়, কিন্তু পরাজয়কে তার শেষ সত্য বলে মেনে নেয় না। সে উঠে দাঁড়ায়। সে আবার ভালোবাসে। আবার স্বপ্ন দেখে। আবার ব্যর্থ হয়। এবং তবু পরদিন পৃথিবীর দিকে মুখ তুলে হাঁটতে শুরু করে।

চ্যাপলিনের ভবঘুরে, কীটনের নির্বিকার মানুষ, লয়েডের উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক, লরেল-হার্ডির চিরপরাজিত অথচ অবিচ্ছেদ্য জুটি—সবাই যেন একই মানবগাথার ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র। তাঁদের কেউ মহাকাব্যের নায়ক নন, কারও হাতে সাম্রাজ্য নেই, কেউ ইতিহাসের সিংহাসনে বসেন না। কিন্তু তাঁরা ইতিহাসের অন্য প্রান্তের মানুষ—যারা পৃথিবী শাসন করে না, পৃথিবীর ধাক্কা খেয়ে বেঁচে থাকে। সিনেমা তাদের মুখকে আলোয় এনে বলেছিল, ইতিহাস শুধু ক্ষমতাবানদের নয়; যারা প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে, ইতিহাস তাদেরও।

তাই নির্বাক কমেডির পর্দায় যে হাসি আমরা শুনি, তার ভিতরে আসলে দীর্ঘ মানবিক প্রতিধ্বনি আছে। সেখানে শিল্পসভ্যতার শব্দ আছে, কারখানার শব্দ আছে, পুলিশের বুটের শব্দ আছে, ক্ষুধার্ত মানুষের নিঃশ্বাস আছে, প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাস আছে, পরাজিত মানুষের কান্না আছে। আর তার মধ্যেই আছে অদম্য জীবনের হাসি।

সিনেমা যখন কথা বলতেও শেখেনি, তখন সে মানুষকে কথা বলিয়েছিল তার শরীর দিয়ে। আর সেই শরীরের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভাষাগুলির প্রধান ছিল হাসি। সেই হাসি কখনও কৌতুক, কখনও প্রতিবাদ, কখনও প্রেম, কখনও বিদ্রূপ, কখনও আত্মরক্ষা, কখনও বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। তাই চ্যাপলিন, কীটন, লয়েড, লরেল, হার্ডি কিংবা তাঁদের উত্তরসূরিদের দিকে তাকালে আমরা শুধু চলচ্চিত্রের শৈশব দেখি না; আমরা দেখি আধুনিক মানুষের নিজের মুখের আবিষ্কার।

অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে আলো জ্বলে ওঠে। পর্দায় একজন ছোট্ট মানুষ হাঁটছে। পৃথিবী তাকে ঠেলে দিচ্ছে, পুলিশ তাকে তাড়া করছে, ক্ষুধা তাকে অনুসরণ করছে, যন্ত্র তাকে গ্রাস করতে চাইছে। সে পড়ে যায়। দর্শক হাসে। তারপর সে উঠে দাঁড়ায়, টুপিটা ঠিক করে, ছড়িটা হাতে নেয়, একবার পিছনে তাকায় এবং আবার হাঁটতে শুরু করে। সেই হাঁটাই হয়তো সিনেমার প্রথম মহৎ মানবিক উপাখ্যান। কারণ শেষপর্যন্ত পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার আগে মানুষকে পৃথিবীর সমস্ত আঘাতের মধ্যেও বেঁচে থাকতে হয়। আর সেই বেঁচে থাকার শিল্পের শর্ত—হাসি এবং আবার হাসি।

[কৃতজ্ঞ স্মরণ- সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়-এর বিভিন্ন নিবন্ধ, গ্রন্থাদি ও আলোচনাসমূহ ]

 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top