সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের ‘আধুনিকতার তিন তাস’: চলচ্চিত্রের পর্দায় আধুনিকতার অন্তর্লেখ

অনিশ রায়

চলচ্চিত্র শেষ হয়ে যাওয়ার পরও শেষ হয় না। ছবির ভিতরে যে সময়টি চলেছিল, তা আমাদের ভিতরে চলতেই থাকে। যদি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র পুনর্বার দেখা হয় বা ভাবা যায়৷ তাঁর ছবিগুলো সেই বিরল পরিসরের অন্তর্গত। এমনকি তাঁর ছবির মানুষগুলিও কেবল পর্দায় বেঁচে থাকে না, তারা আমাদের সময়ের ভিতর এসে বাসা বাঁধে, আমাদের ভিতর ঘরে আমাদের সঙ্গে হাত মেলায়। সেই কারণেই সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের ‘আধুনিকতার তিন তাস: সত্যজিতের ট্রিলজি’-কে নিছক চলচ্চিত্র-সমালোচনা বলে পড়া যায় না। আসলে তা এক সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রাপথের স্বরসংগতি—যেখানে রেলগাড়ির শব্দের সঙ্গে শোনা যায় ঔপনিবেশিক আধুনিকতার আগমন, বিজলী বাতির আলোয় দেখা যায় জ্ঞানের মুক্তির স্বপ্ন, আর কলকাতার অন্ধকার গলিতে এসে ধরা পড়ে সেই স্বপ্নের অন্তঃচেতন অবসাদ।

এখানে সত্যজিৎ রায় কেবল চলচ্চিত্রকার নন—তিনি সীমাতিক্রমী যুগের মানসিক পর্যবেক্ষক এবং পর্যটক। আর অপু, সিদ্ধার্থ, শ্যামলেন্দু, সোমনাথেরা তো তখন নিছক চরিত্র থাকতে পারে না; তারা ভারতীয় আধুনিকতার বিভিন্ন বয়স, বিভিন্ন বিশ্বাস, সংশয় এবং ক্ষয়ের প্রতিরূপ হয়ে যায়। একজনের হাতে পৃথিবী আবিষ্কারের গ্লোব, অন্যজনের চোখে পৃথিবী সম্পর্কে ক্রমশ ঘনীভূত অনাস্থা, আর পরের জনের জীবনে পৃথিবী এসে দাঁড়ায় বাজারের হিসাব হয়ে। একই ইতিহাসের ভিতর দিয়ে মানুষের এই তিন রূপান্তরই ‘তিন তাস’-এর প্রকৃত নাটক।

এই লেখার সবচেয়ে বড়ো শক্তি লেখকের দৃষ্টির ব্যাপ্তি ও বৌদ্ধিক সাহস। সত্যজিৎকে কোনও নির্দিষ্ট তত্ত্বের খাঁচায় বন্দি না করে লেখক তাঁকে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আত্মপরিচয়, পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ, রেনেসাঁ, এনলাইটেনমেন্ট, মার্কসবাদ, নগরায়ণ, প্রযুক্তি, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন-চেতনা এবং বিশ্ব-ইতিহাসের দীর্ঘ পরম্পরার ভিতর স্থাপন করে ফেলেন। ফলে ‘পথের পাঁচালী’ আর কেবল গ্রামবাংলার দারিদ্র্য, শৈশব ও কৌম-সৌন্দর্যের ছবি থাকে না; কাশবনের মধ্য দিয়ে ছুটে যাওয়া রেলগাড়িও তখন এক ভূগোল, যা দৃশ্যমাত্রার ভিতর দিয়ে সময় ও ইতিহাসকে ছিন্ন করে এগিয়ে চলা আধুনিকতার এক অনিবার্য প্রতীক হয়ে ওঠে।

অপুর যাত্রার মধ্যে লেখক দেখতে পান ভারতীয় আধুনিকতার এক গভীর টেলিওলজি—গ্রাম থেকে শহর, পুরাণ থেকে বিজ্ঞান, উত্তরাধিকার থেকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, অন্ধবিশ্বাস থেকে যুক্তি, স্থবিরতা থেকে গতি। ঊনবিংশ শতকের বাঙালি মননের সেই মহৎ বিশ্বাস—জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করবে—অপুর চোখের আলোয় যেন একজন তরুণ মুখশ্রী লাভ করে। রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ, ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তি থেকে ভারতীয় নবজাগরণ—এই দীর্ঘ বৌদ্ধিক স্রোত এসে অপুর জীবনে ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। শিয়ালদায় তার অবতরণ তাই কেবল এক গ্রাম্য বালকের শহরে আসা নয়; তা মূলত ভারতীয় আধুনিকতার ভূগোলে এক নতুন নাগরিকের জন্মমুহূর্ত।

‘বিজলী বাতি’ প্রসঙ্গেই লেখকের দৃষ্টি ভিন্ন প্রেক্ষিতে বিস্তার পায়। মাকে লেখা অপুর চিঠির একটি সামান্য বাক্য থেকে মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘মিডিয়া’-তত্ত্বের দিকে পৌঁছে তিনি দেখান, সত্যজিৎকে দেখা তো শুধু গল্প বা চরিত্র পাঠ নয়; দৃশ্যের অন্তর্গত প্রযুক্তি, জ্ঞান, যোগাযোগ এবং সংস্কৃতির রূপান্তরকেও অনুধাবন করা। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, দর্শন, সমাজতত্ত্ব ও প্রযুক্তি এখানে বিচ্ছিন্ন শাস্ত্র নয়— সবই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক চেতনার পরস্পর-সংযুক্ত স্তর।

কিন্তু নিবন্ধটির প্রকৃত নাটক শুরু হয় আধুনিকতার এই বিজয়গাথার ভিতরেই তার সংশয়ের জন্ম থেকে। ‘অপুর সংসার’-এর রোমান্টিক আধুনিকতা যখন ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’-এর নাগরিক অন্ধকারে এসে পৌঁছোয়, তখন ইতিহাসের সমরেখ দৃষ্টি ও ভঙ্গির কাঠামো ভেঙে যায়। যে আধুনিকতা মানুষকে মুক্ত করার কথায় প্রতিশ্রুত ছিল, তা-ই ধীরে ধীরে মানুষকে প্রতিষ্ঠান, প্রতিযোগিতা, বাজার ও পণ্যে পরিণত করে। অপুর হাতে যে বিজলী বাতি জ্ঞানের আলোকবর্তিকার মতো জ্বলে উঠেছিল, ক্যালকাটা ট্রিলজির নগরীতে সেই আলোই যেন অসংখ্য নিয়ন-আলোর ভিড়ে নিজের নৈতিক দীপ্তি হারিয়ে ফেলে।

এই রূপান্তরের সবচেয়ে সূক্ষ্ম চিহ্ন সঞ্জয়বাবু খুঁজে পান দৃষ্টির পরিবর্তনে। ‘অপরাজিত’-এর মেডিক্যাল কলেজের লেকচার থিয়েটার এবং ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-র শরীর-দর্শনের মধ্যে যে দূরত্ব, তা নিছক মধ্যবিত্ত চেতনায় যৌনতার পরিবর্তন নয়; তা নাগরিক থেকে প্রান্তিক মানুষের পৃথিবীকে দেখার পদ্ধতির পরিবর্তন। অপুর পৃথিবীতে নারী প্রেমের রহস্যে আবৃত; সিদ্ধার্থের পৃথিবীতে শরীর হয়ে ওঠে জৈব সত্য, তথ্য, ক্লিনিক্যাল বাস্তবতা। কুসুমের মাস দশকের ছায়াপথে চলতে চলতেই আমিশাষী গন্ধে ভরে যায়। রোমান্টিক মানবতাবাদের জায়গায় এসে বসে বিশ্লেষণাত্মক আধুনিকতা—হৃদয়ের জায়গায় লেকচার থিয়েটার। যেখানে ‘নয়নের মদিরেক্ষণ মায়া’ অব্যর্থ পরিহাসের মতো নিষ্ক্রিয়, সেখানে সেই গাঢ় সুসমাচার ততক্ষণে হাই-প্রোটিনসম্পন্ন নাগরিক ভাবনার কাছে রিপ্লেসমেন্টের নোটিশ জারি করে ফেলেছে।

‘সীমাবদ্ধ’-এর সিঁড়িও তাই নিছক স্থাপত্যকর্ম না হয়ে আধুনিকতার শর্তসাপেক্ষে এক অসামান্য রূপক হয়ে যায়। শ্যামলেন্দু যত উপরে ওঠেন, তাঁর ভিতরের মানুষটি তত নীচে নামে। পদোন্নতির সিঁড়ি হয়ে ওঠে নৈতিক অবনতির সিঁড়ি। শেষে পরচুলা খুলে যাওয়া যেন ব্যক্তিগত পরাজয় হয় না— হয়ে যায় কর্পোরেট আধুনিকতার মাথা থেকে সভ্যতার কৃত্রিম আবরণ খসে যাওয়ার প্রত্যক্ষ কারুশৈলী। আর ‘জন অরণ্য’-তে এসে নগরসভ্যতা প্রায় আদিমতায় প্রত্যাবর্তন করে। আধুনিক শহর মানুষের ভিতরের শিকারীকে নির্মূল করতে পারেনি; বাজার বরং তাকে নতুন অস্ত্র দিয়েছে। “নগরীর মহৎ রাত্রিতে ‘জন অরণ্য’র নায়ক নিতান্ত মাংসাশী শ্বাপদের মতো মেয়েমানুষ শিকার করে”। সোমনাথের নৈতিক পতন তাই ব্যক্তিগত দুর্বলতার বেড়া ডিঙিয়ে যে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর নৈতিক ও মানবিক ব্যর্থতার প্রতীক হয়েছে, তা নিজস্ব বাকভঙ্গিতে অসামান্যভাবে বুঝিয়ে দেন লেখক।

এখানেই লেখাটির অন্তর্লীন রাজনৈতিক দর্শন সবচেয়ে তীক্ষ্ণতা লাভ করে। খাদ্য আন্দোলন, কমিউনিস্ট রাজনীতির বিভাজন, নেহরুবাদী উন্নয়ন-স্বপ্ন, ষাটের দশকের ছাত্রবিদ্রোহ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও মধ্যবিত্ত নৈতিকতার টালমাটাল অবস্থা—এসবকে লেখক সত্যজিতের চরিত্রগুলির মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করেন যে রাজনীতি আর বাইরের ঘটনা থাকে না; তা মানুষের দৈনন্দিন মূল্যচেতনার ভিতরে প্রবেশ করে। ইতিহাস তাই এখানে চরিত্রের পেছনের দৃশ্যপট নয়; ইতিহাস এখানে চরিত্রের রক্তপ্রবাহ।

এই বিশ্বচেতনা কখনও আত্মপরিচয়-বিস্মৃত নয়। মার্কস, দেকার্ত, রেনেসাঁ, এনলাইটেনমেন্ট, ম্যাকলুহান কিংবা ষাটের দশকের ইউরোপীয় ছাত্রবিদ্রোহ—সবকিছু এসে মিলেছে সত্যজিতের কলকাতায়। কিন্তু ভারতীয় অভিজ্ঞতা সেখানে নিছক গ্রহণকারী নয়, সক্রিয় ব্যাখ্যাকারী। পশ্চিমকে আত্মস্থ করে, রূপান্তর করে এবং শেষপর্যন্ত তার সীমাবদ্ধতাকেও নিজের অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে চিনে নেয় ভারতীয় আধুনিকতা।

এই কারণেই ‘তিন তাস’ আর চলচ্চিত্র-ত্রয়ীর তুলনা নয়; তিনটি ঐতিহাসিক মানসিকতার সংঘর্ষ—স্বপ্ন, সংশয় ও অবক্ষয়ের মধ্যেকার সংঘর্ষ। একই আধুনিকতার তিনটি মুখ—প্রথমটি বিশ্বাস করে, দ্বিতীয়টি প্রশ্ন করে, তৃতীয়টি আপস করে। তবু এই পাঠ নিছক অবক্ষয়ের আখ্যান শোনায় না। এর গভীরে এক অমোঘ প্রশ্ন জেগে থাকে—মানুষকে মুক্ত করার যে আধুনিকতার স্বপ্ন, তার পরিণতি যদি মানুষকেই নিজের কাছে অপরিচিত করে তোলে, তবে মুক্তির ভাষা আমরা কোথায় পুনরাবিষ্কার করব? আজকের অ্যালগরিদমিক মেট্রোপলিটন, কর্পোরেট জীবন, তথ্যের সর্বব্যাপী প্রবাহ, অসংখ্য স্ক্রিন এবং মানুষের ক্রমশ পণ্য হয়ে ওঠার যুগে অপুর ‘বিজলী বাতি’ বহুগুণিত হয়েছে নিশ্চিত; কিন্তু ইতিহাসের বিবেক দুঃস্বপ্নের মতো মাঝে মাঝেই এসে বলে যায়— “রাত কত হল”?

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের এই লেখার বিশেষত্ব এখানেই—তিনি সত্যজিৎকে অতীতের মহত্ত্বের স্মৃতিস্তম্ভ করে রাখেননি; তাঁকে ফিরিয়ে এনেছেন বর্তমানের অস্বস্তিকর পরিসরে। সেই পরিসরে শুধু সত্যজিৎ নন, আমরা নিজেরাও দৃশ্যমান হয়ে উঠি। রেলগাড়ি থেকে কর্পোরেট সিঁড়ি, গ্লোব থেকে নগরীর অন্ধকার, রেনেসাঁর মানবতাবাদ থেকে বাজারের নৈতিক শূন্যতা—চলচ্চিত্র-দৃষ্টির ভিতর দিয়ে যে দীর্ঘ সভ্যতাভ্রমণ সম্পন্ন হয়, তার প্রকৃত নাম তাই সম্ভবত আধুনিকতার অন্তর্লেখ।

তাহলে সেই আত্মবিভ্রম থেকে আত্মজিজ্ঞাসার স্তরে আসতে শেষ তাস কী হবে? সত্যিই—এখনও চালা হয়নি। তাই জানাও হয়নি। সময়ের এই দৃশ্যমান অজ্ঞানতাকে সঞ্জয়বাবু এমন মেধাদীপ্ত বুননের মাধ্যমে ইতিহাসের শ্রুতিলিখনে ধরেছেন, যেখানে শিল্প-সমালোচনাই বিশেষ উল্লম্ফনে একক শিল্পের মর্যাদা আদায় করে নিয়েছে।

 
 
 
আধুনিকতার তিন তাস: সত্যজিত রায়ের ট্রিলজ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top