সংজ্ঞা, ধারণা, শ্রেণিবিভাগ ও প্রয়োগ
১. অব্যয় : শব্দটির অর্থ ও ধারণা
‘অব্যয়’ শব্দটি সংস্কৃত অ + ব্যয় থেকে গঠিত। ‘ব্যয়’ অর্থ পরিবর্তন বা ক্ষয়; অতএব আক্ষরিক অর্থে অব্যয় = যার পরিবর্তন বা ব্যয় নেই।
সংস্কৃত ব্যাকরণে অব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—এটি সাধারণত লিঙ্গ, বচন, পুরুষ, কারক ইত্যাদির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রূপ পরিবর্তন করে না।
কিন্তু বাংলা ভাষায় ‘অব্যয়’ শব্দটির ধারণা সংস্কৃতের সঙ্গে সম্পূর্ণ এক নয়। বাংলা ভাষায় এমন বহু পদ অব্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়, যাদের উৎপত্তি নামপদ বা ক্রিয়াপদ থেকে; আবার কিছু অনুসর্গের মধ্যে বিভক্তির চিহ্নও দেখা যায়।
যেমন—
মধ্যে, পাশে, উপরে, নিচে, জন্য, থেকে, দিয়ে, করে ইত্যাদি।
অতএব—
গুরুত্বপূর্ণ কথা
‘যে পদের কোনো পরিবর্তন হয় না’—এটি অব্যয়ের ঐতিহ্যগত ধারণা; কিন্তু বাংলা ব্যাকরণে অব্যয় নির্ণয়ের একমাত্র মানদণ্ড এটি নয়।
বাংলায় অব্যয়ের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য দেখতে হবে—বাক্যে পদটি কী কাজ করছে এবং বাক্যের অন্যান্য পদ/বাক্যাংশের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।
২. অব্যয় পদ কাকে বলে?
ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অব্যয়ের কাজ ব্যাখ্যা করতে বলেছেন—বাক্যগত উক্তি এবং বাক্যস্থ পদগুলির পারস্পরিক সম্বন্ধকে স্থান, কাল, পাত্র ও প্রকারের দিক থেকে পরিস্ফুট করে যে পদগুলি, সেগুলি অব্যয়।
এই ধারণাকে সহজ করে বলা যায়—
সংজ্ঞা
যে পদ সাধারণত লিঙ্গ, বচন, পুরুষ বা কারক অনুসারে রূপান্তরিত না হয়ে বাক্যের বিভিন্ন পদ, পদগুচ্ছ ও উপবাক্যের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে অথবা বক্তার বিশেষ মনোভাব, আবেগ, সংশয়, সম্মতি, নিষেধ, বিস্ময়, ব্যঞ্জনা ইত্যাদি প্রকাশ করে, তাকে অব্যয় পদ বলে।
অব্যয়ের কাজ শুধু ‘সংযোগ’ সৃষ্টি করা নয়। অব্যয়—
- সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে,
- দুটি পদ বা বাক্যকে যুক্ত করতে পারে,
- কারণ বা ফল বোঝাতে পারে,
- শর্ত বা বিকল্প প্রকাশ করতে পারে,
- সীমা নির্ধারণ করতে পারে,
- বক্তার আবেগ প্রকাশ করতে পারে,
- সম্মতি বা অসম্মতি জানাতে পারে,
- প্রশ্ন বা নিষেধ প্রকাশ করতে পারে,
- বাক্যের সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা ও মনোভাব প্রকাশ করতে পারে।
৩. অব্যয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য
অব্যয়কে চেনার জন্য কয়েকটি বৈশিষ্ট্য মনে রাখা প্রয়োজন।
১. সাধারণত রূপান্তরহীন
অব্যয় সাধারণত লিঙ্গ, বচন, পুরুষ ইত্যাদির সঙ্গে মিলিয়ে রূপ পরিবর্তন করে না।
সে কিন্তু আসেনি।
তারা কিন্তু আসেনি।
‘কিন্তু’ অপরিবর্তিত।
২. বাক্যের সম্পর্ক ও ভাব প্রকাশ করে
রাহুল এবং সুমন এসেছে।
‘এবং’ দুটি পদকে যুক্ত করেছে।
সে আসেনি কারণ সে অসুস্থ।
‘কারণ’ কারণ-সম্পর্ক প্রকাশ করেছে।
৩. বক্তার মনোভাব প্রকাশ করতে পারে
আহা! কী সুন্দর দৃশ্য!
এখানে ‘আহা’ বক্তার আনন্দ/মুগ্ধতা প্রকাশ করছে।
৪. স্বাধীন অর্থ অপেক্ষা ব্যাকরণগত বা ভাবগত কাজ অনেক সময় প্রধান
‘কিন্তু’, ‘এবং’, ‘তাই’, ‘যদি’, ‘অথবা’ ইত্যাদির নিজস্ব অভিধানগত অর্থের তুলনায় বাক্যের মধ্যে তাদের সম্পর্ক-নির্মাণের কাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৪. অব্যয়ের শ্রেণিবিভাগ
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অব্যয়কে বৃহত্তর অর্থে সম্বন্ধবাচক ও মনোভাববাচক—এই দুই ভাগে দেখেছেন।
আধুনিক বিদ্যালয়-ব্যাকরণে ব্যবহারিক সুবিধার জন্য অব্যয়কে সাধারণত চারটি প্রধান ভাগে আলোচনা করা হয়—
১. অনন্বয়ী অব্যয়
২. পদান্বয়ী অব্যয় বা অনুসর্গ
৩. সমুচ্চয়ী অব্যয়
৪. ধ্বন্যাত্মক অব্যয়
তবে মনে রাখতে হবে, ব্যাকরণগ্রন্থভেদে শ্রেণিবিভাগের নাম ও উপশ্রেণির সংখ্যা কিছুটা আলাদা হতে পারে। একই শব্দ বাক্যভেদে ভিন্ন ধরনের কাজও করতে পারে।
৫. অনন্বয়ী অব্যয়
সংজ্ঞা
যে অব্যয় বাক্যের দুটি পদ, পদগুচ্ছ বা উপবাক্যের মধ্যে প্রত্যক্ষ ব্যাকরণগত সম্পর্ক স্থাপন না করে বক্তার আবেগ, মনোভাব, সম্বোধন, সম্মতি, নিষেধ, প্রশ্ন, ব্যঞ্জনা ইত্যাদি প্রকাশ করে, তাকে অনন্বয়ী অব্যয় বলে।
অর্থাৎ, এরা মূলত অন্বয়-স্থাপন না করে বক্তার মনোভাব বা বাক্যের বিশেষ সুর প্রকাশ করে।
যেমন—
হায়! সব শেষ হয়ে গেল।
ওহে! এদিকে এসো।
একটু জল দাও না।
তুমি কিন্তু ভালো কাজ করোনি।
৬. অনন্বয়ী অব্যয়ের প্রধান শ্রেণি
অনন্বয়ী অব্যয়ের উপশ্রেণির সংখ্যা ও নাম ব্যাকরণগ্রন্থভেদে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য প্রধান কয়েকটি শ্রেণি নিচে দেওয়া হল।
ক. বাক্যালংকারিক বা আলংকারিক অব্যয়
সংজ্ঞা
যে অব্যয় বাক্যের মূল অর্থের সঙ্গে নতুন কোনো অপরিহার্য তথ্য যোগ না করেও বাক্যের সুর, ব্যঞ্জনা, অনুযোগ, কোমলতা, জোর বা আবেগকে সূক্ষ্মভাবে পরিবর্তিত করে, তাকে বাক্যালংকারিক অব্যয় বলে।
এদের অনেক সময় নিরর্থক অব্যয়ও বলা হয়। তবে ‘নিরর্থক’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা ঠিক নয়। এদের স্বতন্ত্র বস্তুগত অর্থ কম, কিন্তু বাক্যে এদের ভাবগত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ
একবার নাচো তো দেখি।
এখানে ‘তো’ বাদ দিলে—
একবার নাচো দেখি।
মূল বক্তব্য থাকে, কিন্তু অনুরোধের বিশেষ সুরটি বদলে যায়।
আরও—
তুমি কিন্তু কাজটা ভালো করোনি।
এখানে ‘কিন্তু’ সমুচ্চয়ী অব্যয়ও হতে পারে। কিন্তু এই বাক্যে এটি দুটি বাক্যকে যুক্ত করছে না; বরং অনুযোগ/অভিমান/জোর প্রকাশ করছে। তাই এখানে ‘কিন্তু’ অনন্বয়ী, আলংকারিক অব্যয়।
আরও উদাহরণ
একটু জল দাও না।
আমি আজ যাব না।
সে যে এমন করবে, ভাবিনি।
৭. সম্বোধনসূচক অব্যয়
সংজ্ঞা
কাউকে সরাসরি সম্বোধন বা আহ্বান করার জন্য ব্যবহৃত অব্যয়কে সম্বোধনসূচক অব্যয় বলে।
যেমন—
হে, ওহে, ওগো, ওরে, ওলো, রে ইত্যাদি।
উদাহরণ—
হে বন্ধু, এসো।
ওগো, একটু শোনো।
ওরে, এদিকে আয়।
গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
সম্বোধনসূচক অব্যয় ≠ সম্বোধন পদ।
যেমন—
হে বন্ধু!
এখানে ‘হে’ = সম্বোধনসূচক অব্যয়
‘বন্ধু’ = সম্বোধন পদ
সম্বোধন পদ কারকের আলোচনায় পৃথকভাবে বিবেচিত হয়।
৮. আবেগসূচক অব্যয়
সংজ্ঞা
বক্তার আকস্মিক আবেগ, অনুভূতি বা মানসিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে যে অব্যয়, তাকে আবেগসূচক অব্যয় বলে।
এগুলির অর্থ প্রসঙ্গনির্ভর।
বিস্ময়
অ্যাঁ! তুমি এখানে?
আনন্দ
হুররে! আমরা জিতে গেছি!
দুঃখ
হায়! সব শেষ!
করুণা
আহা! লোকটির কী দুর্দশা!
ঘৃণা
ছিঃ! এমন কাজ করতে নেই।
যন্ত্রণা
উঃ! কী ব্যথা!
বিরক্তি
আঃ! আর ভালো লাগছে না।
ভয়
মাগো! সাপ!
লজ্জা/সংকোচ
মরি মরি! এ কী বললে!
গুরুত্বপূর্ণ
একটি আবেগসূচক অব্যয় সবসময় একটি মাত্র আবেগ প্রকাশ করবে—এমন নয়।
যেমন—
আঃ! কী আরাম!
এখানে ‘আঃ’ স্বস্তি/আরাম প্রকাশ করছে।
আবার—
আঃ! আর পারছি না!
এখানে ‘আঃ’ বিরক্তি বা যন্ত্রণা প্রকাশ করছে।
অতএব শব্দ নয়, প্রসঙ্গই আবেগ নির্ধারণ করে।
৯. সম্মতিজ্ঞাপক অব্যয়
সংজ্ঞা
কোনো বক্তব্য, প্রস্তাব বা প্রশ্নের প্রতি বক্তার সম্মতি বা স্বীকৃতি প্রকাশ করে যে অব্যয়, তাকে সম্মতিজ্ঞাপক অব্যয় বলে।
যেমন—
হ্যাঁ, হুঁ, বেশ, আচ্ছা, ঠিক ইত্যাদি।
উদাহরণ—
হ্যাঁ, আমি যাব।
বেশ, তাই হবে।
আচ্ছা, তুমি যাও।
১০. অসম্মতিজ্ঞাপক অব্যয়
সংজ্ঞা
কোনো বক্তব্য বা প্রস্তাবের প্রতি বক্তার অসম্মতি প্রকাশ করে যে অব্যয়, তাকে অসম্মতিজ্ঞাপক অব্যয় বলে।
যেমন—
না, নাহ্, কক্ষণো না ইত্যাদি।
না, আমি যাব না।
কক্ষণো না, এ কাজ আমি করব না।
১১. নিষেধাত্মক অব্যয়
সংজ্ঞা
কোনো কাজ করা উচিত নয়, ঘটেনি বা ঘটবে না—এই ধরনের নেতিবাচক বা নিষেধের ভাব প্রকাশ করে যে অব্যয়, তাকে নিষেধাত্মক অব্যয় বলে।
প্রধান উদাহরণ—
না, নি, নে ইত্যাদি।
উদাহরণ—
সেখানে যেও না।
আমি তা করিনি।
এখানে ‘না’ নিষেধ প্রকাশ করছে।
‘না’ একাধিক কাজ করতে পারে
তুমি না গেলে আমি যাব না।
প্রথম ‘না’ = নিষেধ/নেতিবাচকতা
দ্বিতীয় ‘না’ = নেতিবাচক ক্রিয়ার অংশ
আবার—
একটু বসো না।
এখানে ‘না’ নিষেধ নয়; বরং অনুরোধের কোমলতা প্রকাশ করছে।
অতএব একই শব্দের পদ ও শ্রেণি প্রসঙ্গভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।
১২. প্রশ্নসূচক অব্যয়
সংজ্ঞা
প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসার ভাব প্রকাশে ব্যবহৃত অব্যয়কে প্রশ্নসূচক অব্যয় বলে।
প্রধান উদাহরণ—
কি
যেমন—
তুমি কি আজ যাবে?
এখানে উত্তর—
হ্যাঁ / না
হতে পারে।
‘কি’ ও ‘কী’ আবার মনে রাখুন
তুমি কি যাবে? → হ্যাঁ/না-প্রশ্ন
তুমি কী করবে? → কোনো কাজের পরিচয় জানতে চাওয়া
অতএব—
কি = প্রশ্নসূচক অব্যয়
কী = প্রশ্নবাচক সর্বনাম/অন্যান্য পদ, ব্যবহারভেদে
১৩. পদান্বয়ী অব্যয় বা অনুসর্গ
সংজ্ঞা
যে অব্যয় কোনো নামপদ বা সর্বনামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাক্যের অন্য পদের সঙ্গে তার সম্পর্ক—যেমন স্থান, কাল, কারণ, উদ্দেশ্য, তুলনা, সহিততা, বিচ্ছেদ ইত্যাদি—প্রকাশ করে, তাকে পদান্বয়ী অব্যয় বলে।
এগুলিকে বাংলা ব্যাকরণে সাধারণত অনুসর্গ বলা হয়।
উদাহরণ—
তোমার জন্য
আমার সঙ্গে
কলকাতা থেকে
আমার চেয়ে
ঘরের মধ্যে
তার পাশে
১৪. অনুসর্গ ও Preposition/Postposition
ইংরেজিতে—
in the room
for you
with him
বাংলায়—
ঘরের মধ্যে
তোমার জন্য
তার সঙ্গে
বাংলা অনুসর্গ সাধারণত সংশ্লিষ্ট পদের পরে বসে। তাই এদের ইংরেজির postposition-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়।
সূত্র
বাংলায় Preposition-এর প্রধান সমতুল্য = অনুসর্গ/Postposition।
তবে বাংলা ব্যাকরণে অনুসর্গকে ‘অব্যয়’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, তা ব্যাকরণপদ্ধতিভেদে পৃথক হতে পারে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অনুসর্গকে অব্যয়ের প্রচলিত শ্রেণির মধ্যে রাখেননি; কিন্তু বিদ্যালয়-ব্যাকরণে পদান্বয়ী অব্যয় নামে এটি বহুল প্রচলিত।
১৫. পদান্বয়ী অব্যয়ের উদাহরণ
দ্বারা, দিয়া, দিয়ে, কর্তৃক, জন্য, নিমিত্ত, হইতে, হতে, থেকে, চেয়ে, অপেক্ষা, মধ্যে, পাশে, উপরে, নিচে, সঙ্গে, বিনা, ছাড়া, ব্যতীত, তরে, লাগি ইত্যাদি।
উদাহরণ—
কলম দিয়ে লিখি।
তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
কলকাতা থেকে এসেছি।
তোমার চেয়ে সে বড়।
ঘরের মধ্যে কেউ নেই।
তার পাশে আমি বসেছিলাম।
১৬. পদান্বয়ী অব্যয়ের শ্রেণিবিভাগ
পদান্বয়ী অব্যয় বা অনুসর্গকে উৎপত্তি ও গঠন অনুসারে প্রধানত—
১. নামজাত অনুসর্গ
২. ক্রিয়াজাত অনুসর্গ
৩. যৌগিক অনুসর্গ
—এইভাবে আলোচনা করা যায়।
১৭. নামজাত অনুসর্গ
সংজ্ঞা
নামপদ থেকে উৎপন্ন বা নামপদজাত অনুসর্গকে নামজাত অনুসর্গ বলে।
যেমন—
দ্বারা, কর্তৃক, বিনা, অপেক্ষা, নিমিত্ত, জন্য, মধ্যে, পাশে, উপরে ইত্যাদি।
উদাহরণ—
সরকারের দ্বারা কাজটি সম্পন্ন হয়েছে।
তোমার জন্য উপহার এনেছি।
তার পাশে বসো।
অনেক নামজাত অনুসর্গের মধ্যে বিভক্তির চিহ্ন বা বিভক্তিসদৃশ রূপ দেখা যায়।
১৮. ক্রিয়াজাত অনুসর্গ
সংজ্ঞা
ক্রিয়াপদ থেকে উৎপন্ন এমন রূপ, যা বাক্যে ক্রিয়ার পরিবর্তে অনুসর্গের কাজ করে এবং কোনো পদের সঙ্গে অন্য পদের সম্পর্ক স্থাপন করে, তাকে ক্রিয়াজাত অনুসর্গ বলা হয়।
এদের অনেকগুলির রূপ ঐতিহাসিকভাবে অসমাপিকা ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
যেমন—
দিয়ে, করে, নিয়ে, ধরে, হতে, থেকে, চেয়ে ইত্যাদি।
উদাহরণ—
কলম দিয়ে লিখি।
বাস করে কলকাতায় এলাম।
বই নিয়ে এসো।
রাস্তা ধরে হাঁটো।
কোথা হতে এলে?
তোমার চেয়ে আমি বড়।
গুরুত্বপূর্ণ
‘দিয়ে’, ‘করে’, ‘নিয়ে’ ইত্যাদি সব বাক্যে একই পদ হবে না।
যেমন—
সে কাজটি করে বাড়ি গেল।
এখানে ‘করে’ অসমাপিকা ক্রিয়া।
কিন্তু—
গাড়ি করে কলকাতা গেলাম।
এখানে ‘করে’ পরিবহণের মাধ্যম নির্দেশ করছে; অনুসর্গসুলভ কাজ করছে।
অতএব—
পদ নির্ণয়ে শব্দের চেহারা নয়, বাক্যে তার কাজ বিচার করতে হবে।
১৯. যৌগিক অনুসর্গ
সংজ্ঞা
দুই বা ততোধিক অনুসর্গজাত উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত অনুসর্গকে যৌগিক অনুসর্গ বলে।
যেমন—
মধ্যে দিয়ে
ভিতর দিয়ে
মধ্যে থেকে
উপরে দিয়ে
সামনে থেকে
উদাহরণ—
ঘরের মধ্যে দিয়ে আলো আসছে।
রাস্তার মধ্যে দিয়ে হাঁটবে না।
বাড়ির ভিতর থেকে শব্দ আসছে।
অনুসর্গের দ্বিত্ব
অনুসর্গের দ্বিত্বও বাংলা ভাষায় দেখা যায়—
আমার পাশে পাশে হাঁটো।
দাগের ভিতরে ভিতরে ছুটতে হবে।
এখানে দ্বিত্বের ফলে অর্থে বিশেষ ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়।
২০. সমুচ্চয়ী অব্যয়
সংজ্ঞা
যে অব্যয় দুটি বা ততোধিক পদ, পদগুচ্ছ, বাক্যাংশ বা উপবাক্যের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপন করে তাদের যুক্ত করে, তাকে সমুচ্চয়ী অব্যয় বলে।
ইংরেজিতে একে Conjunction বলা হয়।
উদাহরণ—
রাহুল ও সুমন এসেছে।
সে এসেছিল, কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা করেনি।
তাড়াতাড়ি এসো, নইলে দেরি হয়ে যাবে।
গুরুত্বপূর্ণ
সমুচ্চয়ী অব্যয়ের কাজ শুধু ‘যোগ করা’ নয়।
এগুলি—
- যোগ,
- বিকল্প,
- বৈপরীত্য,
- কারণ,
- ফল,
- শর্ত,
- অন্যথা,
- সংশয়,
- সিদ্ধান্ত
ইত্যাদি সম্পর্ক প্রকাশ করতে পারে।
২১. সমুচ্চয়ী অব্যয়ের প্রধান শ্রেণিবিভাগ
বিদ্যালয়স্তরে প্রধানত নিচের শ্রেণিগুলি মনে রাখা সুবিধাজনক—
১. সংযোজক
২. বিয়োজক/বৈকল্পিক
৩. সংকোচক/বৈপরীত্যসূচক
৪. হেতুবাচক
৫. অন্যথাবাচক
৬. সাপেক্ষ
৭. কার্য-ফল/ব্যবস্থাসূচক
৮. সিদ্ধান্তবাচক
৯. সংশয়াত্মক/আশঙ্কাসূচক
তবে সব ব্যাকরণে সব শ্রেণি সমানভাবে স্বীকৃত নয়।
২২. সংযোজক অব্যয়
সংজ্ঞা
যে সমুচ্চয়ী অব্যয় দুটি বা ততোধিক পদ, পদগুচ্ছ বা উপবাক্যকে যোগ করে, তাকে সংযোজক অব্যয় বলে।
যেমন—
ও, এবং, আর, তথা ইত্যাদি।
উদাহরণ—
তুমি ও আমি যাব।
সে আসবে এবং তুমি তার সঙ্গে যাবে।
রাহুল আর সুমন বন্ধু।
২৩. বিয়োজক বা বৈকল্পিক অব্যয়
সংজ্ঞা
দুটি বা ততোধিক সম্ভাবনা বা বিকল্পের মধ্যে নির্বাচন নির্দেশ করে যে সমুচ্চয়ী অব্যয়, তাকে বিয়োজক বা বৈকল্পিক অব্যয় বলে।
যেমন—
বা, অথবা, কিংবা, নাকি ইত্যাদি।
উদাহরণ—
তুমি যাবে অথবা রাম যাবে।
চা বা কফি খাবে?
সে আজ আসবে কিংবা কাল আসবে।
২৪. সংকোচক বা বৈপরীত্যসূচক অব্যয়
সংজ্ঞা
দুটি বক্তব্যের মধ্যে প্রত্যাশাবিরোধ, বৈপরীত্য বা আপাত-বিরোধ প্রকাশ করে যে সমুচ্চয়ী অব্যয়, তাকে সংকোচক বা বৈপরীত্যসূচক অব্যয় বলে।
যেমন—
কিন্তু, অথচ, তথাপি, তবুও, যদিও…তবুও ইত্যাদি।
উদাহরণ—
সে এসেছে, কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা করেনি।
অনেক বৃষ্টি হয়েছে, তবুও খেলা বন্ধ হয়নি।
সে ধনী, অথচ খুব বিনয়ী।
‘কিন্তু’-এর দ্বৈত ব্যবহার
সে এসেছে কিন্তু দেখা করেনি।
এখানে ‘কিন্তু’ = সংকোচক সমুচ্চয়ী অব্যয়।
তুমি কিন্তু কাজটি ভালো করোনি।
এখানে ‘কিন্তু’ দুটি বাক্যকে যুক্ত করছে না; বরং অনুযোগ/জোর প্রকাশ করছে। তাই এটি অনন্বয়ী আলংকারিক অব্যয়।
এটি পরীক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২৫. হেতুবাচক অব্যয়
সংজ্ঞা
যে সমুচ্চয়ী অব্যয় কোনো কাজ বা ঘটনার কারণ বা হেতু নির্দেশ করে, তাকে হেতুবাচক অব্যয় বলে।
যেমন—
কারণ, কেননা, যেহেতু ইত্যাদি।
উদাহরণ—
আমি যেতে পারিনি, কারণ আমি অসুস্থ ছিলাম।
সে আসেনি, কেননা তার শরীর খারাপ।
যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছে, সেহেতু খেলা বন্ধ থাকবে।
২৬. অন্যথাবাচক বা ব্যতিরেকাত্মক অব্যয়
সংজ্ঞা
একটি শর্ত বা ঘটনা পূরণ না হলে তার পরিবর্তে অন্য একটি ফল ঘটবে—এই ভাব প্রকাশ করে যে অব্যয়, তাকে অন্যথাবাচক অব্যয় বলে।
যেমন—
নইলে, নতুবা, নয়তো, না হলে ইত্যাদি।
উদাহরণ—
তাড়াতাড়ি এসো, নইলে ট্রেন চলে যাবে।
এখন পড়ো, নয়তো পরীক্ষায় সমস্যা হবে।
২৭. সাপেক্ষ বা নিত্যসম্বন্ধী অব্যয়
সংজ্ঞা
যে অব্যয় সাধারণত জোড়ায় ব্যবহৃত হয়ে দুটি অংশের মধ্যে শর্ত, আশঙ্কা, সম্পর্ক বা নির্ভরতা প্রকাশ করে, তাকে সাপেক্ষ বা নিত্যসম্বন্ধী অব্যয় বলে।
উদাহরণ—
যদি—তবে
যদি—তাহলে
যদিও—তবুও
যেহেতু—সেহেতু
যেমন—তেমন
যত—তত
তবে এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখতে হবে।
একই রকম দেখতে সব জোড়া একই ধরনের পদ নয়
যে—সে → সাপেক্ষ সর্বনাম
যেমন—তেমন → প্রসঙ্গভেদে সাপেক্ষ বিশেষণ/ক্রিয়াবিশেষণজাত ব্যবহার
যদি—তবে → সাপেক্ষ সমুচ্চয়ী অব্যয়
অতএব—
সাপেক্ষ সর্বনাম, সাপেক্ষ বিশেষণ এবং সাপেক্ষ অব্যয়—তিনটি আলাদা ব্যাকরণিক ধারণা।
২৮. সংশয়াত্মক বা আশঙ্কাসূচক অব্যয়
সংজ্ঞা
কোনো সম্ভাব্য ঘটনা সম্পর্কে সংশয়, আশঙ্কা বা ভয় প্রকাশ করে যে অব্যয়, তাকে সংশয়াত্মক বা আশঙ্কাসূচক অব্যয় বলা হয়।
যেমন—
পাছে, বুঝি ইত্যাদি।
উদাহরণ—
আমি ভয় পেয়েছিলাম, পাছে কেউ জেনে যায়।
বুঝি সে আর আসবে না।
‘পাছে’ অনেক ক্ষেত্রে আশঙ্কাসূচক সম্পর্ক তৈরি করে।
২৯. কার্য-ফল বা ব্যবস্থাসূচক অব্যয়
কোনো ঘটনা থেকে উদ্ভূত ফল, সিদ্ধান্ত বা সেই ফলের ভিত্তিতে গৃহীত ব্যবস্থা বোঝাতে কিছু সমুচ্চয়ী অব্যয় ব্যবহৃত হয়।
যেমন—
তাই, ফলে, সুতরাং, কাজেই, অতএব ইত্যাদি।
উদাহরণ—
আজ বৃষ্টি হবে, তাই ছাতা নাও।
সে অসুস্থ, সুতরাং আজ আসবে না।
অনেক রাত হয়েছে, কাজেই এখন বাড়ি ফিরি।
এগুলির মধ্যে ‘তাই’, ‘ফলে’ কার্য-ফল; ‘সুতরাং’, ‘অতএব’, ‘কাজেই’ সিদ্ধান্ত বা ফল নির্দেশে ব্যবহৃত হয়।
৩০. সিদ্ধান্তবাচক অব্যয়
সংজ্ঞা
পূর্ববর্তী বক্তব্য থেকে কোনো সিদ্ধান্ত, উপসংহার বা নির্যাস প্রকাশ করে যে অব্যয়, তাকে সিদ্ধান্তবাচক অব্যয় বলে।
যেমন—
অতএব, সুতরাং, কাজেই, অর্থাৎ ইত্যাদি।
উদাহরণ—
সে পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে; অতএব, সে অত্যন্ত মেধাবী।
সে আসেনি; সুতরাং সভা শুরু করা যাবে না।
‘অর্থাৎ’
‘অর্থাৎ’ সাধারণত পূর্বোক্ত বক্তব্যকে অন্যভাবে স্পষ্ট বা ব্যাখ্যা করে।
সে আজ আসবে না, অর্থাৎ সভায় তার উপস্থিতি থাকবে না।
এটি ব্যাখ্যাসূচক/স্পষ্টীকরণমূলক সমুচ্চয়ী অব্যয় হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
৩১. শর্তসূচক অব্যয়
শর্ত বা সম্ভাবনার ভিত্তিতে কোনো ঘটনা ঘটার সম্পর্ক প্রকাশ করে যে অব্যয়, তাকে শর্তসূচক অব্যয় বলা যায়।
যেমন—
যদি, যদি না, যতক্ষণ না ইত্যাদি।
উদাহরণ—
যদি তুমি আসো, তবে আমি যাব।
যদি বৃষ্টি না হয়, তবে খেলা হবে।
এখানে ‘যদি—তবে’ একটি সাপেক্ষ সমুচ্চয়ী সম্পর্ক তৈরি করেছে।
৩২. সীমাবাচক বা প্রতিষেধক অব্যয়
এখানে একটি সংশোধন বিশেষভাবে জরুরি।
‘শুধু’, ‘কেবল’, ‘মাত্র’, ‘একমাত্র’ ইত্যাদি সাধারণত সীমা বা সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে; এদের সবক্ষেত্রে সমুচ্চয়ী অব্যয় বলা ঠিক নয়।
যেমন—
শুধু সে আসেনি।
কেবল রাহুলই কাজটি করেছে।
এখানে ‘শুধু’/‘কেবল’ অন্য কোনো পদ বা উপবাক্যকে যুক্ত করছে না; বরং সীমাবদ্ধ করছে।
অতএব এগুলিকে অনন্বয়ী/সীমাবাচক অব্যয় বা অব্যয়জাত সীমাবাচক পদ হিসেবে বিবেচনা করা বেশি যুক্তিযুক্ত।
সূত্র
দুটি অংশ জোড়ে → সমুচ্চয়ী।
একটি অংশকে সীমিত করে → সীমাবাচক।
৩৩. উপমাবাচক পদ : একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন
‘মতো’ শব্দটিকে সরাসরি সমুচ্চয়ী অব্যয় বলা ঠিক নয়।
যেমন—
তার মতো মানুষ বিরল।
এখানে ‘মতো’ একটি অনুসর্গজাত/পদান্বয়ী পদ, যা তুলনা বা উপমার সম্পর্ক স্থাপন করছে।
অন্যদিকে—
সে এমনভাবে কথা বলল যেন সব জানে।
এখানে ‘যেন’ দুটি উপবাক্যের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করছে; এটি সমুচ্চয়ী অব্যয়ের কাজ করছে।
অতএব—
মতো → সাধারণত অনুসর্গসুলভ
যেন → প্রসঙ্গভেদে সমুচ্চয়ী/সাদৃশ্যসূচক অব্যয়
এভাবে শেখা অধিক নির্ভুল।
৩৪. ধ্বন্যাত্মক অব্যয়
বাংলা ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তার বিপুল ধ্বন্যাত্মক শব্দভাণ্ডার।
কোনো বাস্তব শব্দ, গতি, আঘাত, কম্পন, পতন, হাসি, কান্না, আওয়াজ, আলো, গন্ধ বা অনুভূতির ধ্বনি-অনুভবকে ভাষায় প্রকাশ করার জন্য যে বিশেষ শব্দরূপ তৈরি হয়, তাকে সাধারণভাবে ধ্বন্যাত্মক শব্দ বলা হয়।
যেমন—
থপথপ
ঝমঝম
টুপটাপ
কটকট
খটখট
দুমদাম
হুড়হুড়
ঝাঁঝাঁ
কুচকুচ
টনটন
উদাহরণ—
বৃষ্টি ঝমঝম করে পড়ছে।
দরজায় খটখট শব্দ হচ্ছে।
সে দুমদাম করে দরজা বন্ধ করল।
৩৫. ধ্বন্যাত্মক শব্দ কেন অব্যয় হিসেবে গণ্য হয়?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকরণিক মতভেদ আছে।
ধ্বন্যাত্মক শব্দ অনেক সময় বাক্যে ক্রিয়াবিশেষণসুলভ বা বিশেষণসুলভ কাজ করে।
যেমন—
বৃষ্টি ঝমঝম করে পড়ছে।
এখানে ‘ঝমঝম’ বৃষ্টিপাতের ধ্বনি ও প্রকৃতি প্রকাশ করছে।
সে দুমদাম করে দরজা বন্ধ করল।
এখানে ‘দুমদাম’ ক্রিয়ার ধরন বা সংঘটনের প্রকৃতি নির্দেশ করছে।
অতএব ধ্বন্যাত্মক শব্দকে সবক্ষেত্রে সরাসরি অব্যয় বলে দেওয়া ভাষাবৈজ্ঞানিকভাবে সরলীকরণ। বাংলা বিদ্যালয়-ব্যাকরণে অবশ্য এগুলিকে ধ্বন্যাত্মক অব্যয় নামে একটি পৃথক শ্রেণিতে রাখা হয়।
পরীক্ষার জন্য
ধ্বন্যাত্মক অব্যয় = ধ্বনির অনুকৃতি বা ধ্বনির ব্যঞ্জনা প্রকাশকারী অব্যয়ধর্মী শব্দ।
৩৬. ধ্বন্যাত্মক ও অনুকার শব্দ : পার্থক্য
এই দুটি ধারণা এক নয়।
অনুকার শব্দ
কোনো প্রচলিত শব্দের সঙ্গে ধ্বনিগত মিল রেখে অর্থহীন বা আংশিক অর্থহীন একটি অনুষঙ্গী শব্দ তৈরি হলে তাকে অনুকার শব্দ বলা হয়।
যেমন—
জল-টল
কাপড়-চোপড়
বই-টই
চা-টা
ঘর-টর
এখানে ‘টল’, ‘চোপড়’, ‘টই’, ‘টা’ ইত্যাদি মূল শব্দের সঙ্গে ধ্বনিগত সাদৃশ্য রেখে তৈরি হয়েছে; এগুলি মূল শব্দের অনুকরণমূলক সহচর।
ধ্বন্যাত্মক শব্দ
বাস্তব ধ্বনি বা ধ্বনির অনুভূতির অনুকরণ/ব্যঞ্জনা প্রকাশ করে—
ঝমঝম
টুপটাপ
খটখট
কটকট
দুমদাম
থপথপ
পার্থক্যের সূত্র
শব্দের সঙ্গে শব্দের মিল → অনুকার শব্দ
বাস্তব ধ্বনির সঙ্গে ধ্বনির মিল → ধ্বন্যাত্মক শব্দ
৩৭. ধ্বন্যাত্মক শব্দের আরও সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য
ধ্বন্যাত্মক শব্দ শুধু কানে শোনা শব্দের অনুকরণ করে না; অনেক সময় দৃশ্য, গতি, অনুভূতি বা গুণের ধ্বনিময় ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে।
যেমন—
কুচকুচে কালো
ঝাঁঝাঁ রোদ
টনটনে ব্যথা
মচমচে ভাজা
এখানে সবকটি শব্দ সরাসরি কোনো বাস্তব শব্দের অনুকরণ নয়; ধ্বনির সাহায্যে অনুভূতির তীব্রতা বা গুণের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করা হয়েছে।
এই কারণেই ধ্বন্যাত্মক শব্দ বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধ্বনিসৌন্দর্য ও চিত্রকল্প-সৃষ্টিকারী উপাদান।
৩৮. একই শব্দ বিভিন্ন পদ হতে পারে
বাংলা ব্যাকরণের একটি মৌলিক নীতি—
শব্দের শ্রেণি তার অভিধানগত পরিচয়ে সবসময় স্থির নয়; বাক্যে তার ব্যবহারই পদ-পরিচয় নির্ধারণ করে।
উদাহরণ—
‘কিন্তু’
সে এসেছে, কিন্তু দেখা করেনি।
→ সংকোচক সমুচ্চয়ী অব্যয়
তুমি কিন্তু ভালো করোনি।
→ অনন্বয়ী আলংকারিক অব্যয়
‘করে’
সে কাজটি করে চলে গেল।
→ অসমাপিকা ক্রিয়া
বাস করে কলকাতা গেলাম।
→ অনুসর্গসুলভ/ক্রিয়াজাত পদ
‘না’
তুমি না গেলে আমি যাব না।
→ নিষেধাত্মক/নেতিবাচক ব্যবহার
একটু বসো না।
→ অনুরোধসূচক/আলংকারিক অব্যয়
‘যেন’
সে এমনভাবে বলল যেন সব জানে।
→ সম্পর্কসূচক সমুচ্চয়ী অব্যয়
অতএব—
শব্দ মুখস্থ নয়, বাক্যে তার কাজ নির্ণয় করাই ব্যাকরণ।
৩৯. অব্যয় ও বিভক্তির পার্থক্য
এই দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
বিভক্তি
বিভক্তি সাধারণত পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কারক বা বাক্যগত সম্পর্ক প্রকাশ করে।
রাহুলকে ডাকো।
রাহুলএর বই।
অব্যয়/অনুসর্গ
অনুসর্গ স্বাধীন শব্দরূপে পদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে।
রাহুলকে → বিভক্তি
রাহুলএর জন্য → ‘জন্য’ অনুসর্গ
সূত্র
পদের সঙ্গে লেগে থাকা → বিভক্তি
স্বাধীনভাবে পরে বসে সম্পর্ক তৈরি করা → অনুসর্গ
৪০. অব্যয় ও অনুসর্গের সম্পর্ক
‘অব্যয়’ একটি বৃহত্তর ব্যাকরণিক ধারণা, আর ‘অনুসর্গ’ একটি নির্দিষ্ট কাজ ও অবস্থান-ভিত্তিক শ্রেণি।
বিদ্যালয়-ব্যাকরণে—
পদান্বয়ী অব্যয় = অনুসর্গ
এই সমীকরণটি প্রচলিত।
কিন্তু উচ্চতর ব্যাকরণচর্চায় মনে রাখতে হবে, সব অব্যয় অনুসর্গ নয় এবং সব ব্যাকরণবিদ অনুসর্গকে অব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত করেন না।
৪১. অব্যয় নির্ণয়ের পদ্ধতি
কোনো শব্দ অব্যয় কি না বুঝতে পাঁচটি প্রশ্ন করো।
১. শব্দটি কি লিঙ্গ-বচন-পুুরুষ অনুসারে রূপ বদলায়?
না → অব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা।
২. এটি কি কোনো পদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে?
হ্যাঁ → পদান্বয়ী/অনুসর্গ।
৩. এটি কি দুটি পদ বা বাক্যাংশকে যুক্ত করছে?
হ্যাঁ → সমুচ্চয়ী।
৪. এটি কি বক্তার আবেগ, সম্মতি, নিষেধ, প্রশ্ন, সম্বোধন বা ব্যঞ্জনা প্রকাশ করছে?
হ্যাঁ → অনন্বয়ী।
৫. এটি কি কোনো ধ্বনি বা ধ্বনির ব্যঞ্জনা প্রকাশ করছে?
হ্যাঁ → ধ্বন্যাত্মক।
৪২. একটি সমন্বিত উদাহরণ
নিচের অনুচ্ছেদটি দেখো—
হায়! আজও বৃষ্টি হচ্ছে। রাহুল ও সুমন মাঠে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু বৃষ্টির জন্য তারা যেতে পারল না। তাই তারা ঘরের মধ্যে বসে গল্প করল। রাহুল বলল, “তুমি কি আজ খেলবে?” সুমন বলল, “না, আজ নয়।” যদি কাল বৃষ্টি না হয়, তবে আমরা মাঠে যাব। নইলে বাড়িতেই থাকব। বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছিল।
এখানে—
- হায় → আবেগসূচক অনন্বয়ী
- ও → সংযোজক সমুচ্চয়ী
- কিন্তু → সংকোচক সমুচ্চয়ী
- জন্য → পদান্বয়ী/অনুসর্গ
- তাই → কার্য-ফলসূচক
- মধ্যে → পদান্বয়ী/অনুসর্গ
- কি → প্রশ্নসূচক অনন্বয়ী
- না → অসম্মতি/নিষেধসূচক
- যদি—তবে → সাপেক্ষ সমুচ্চয়ী
- নইলে → অন্যথাবাচক
- ঝমঝম → ধ্বন্যাত্মক
একটি অনুচ্ছেদের মধ্যেই অব্যয়ের বিভিন্ন কাজ কীভাবে একসঙ্গে উপস্থিত হয়, এই উদাহরণে তা স্পষ্ট।
৪৩. অব্যয়ের শ্রেণিবিভাগ : এক নজরে
| প্রধান শ্রেণি | মূল কাজ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অনন্বয়ী | আবেগ, সম্বোধন, সম্মতি, নিষেধ, ব্যঞ্জনা | হায়, হে, হ্যাঁ, না, তো |
| পদান্বয়ী/অনুসর্গ | পদের সঙ্গে সম্পর্ক | জন্য, থেকে, সঙ্গে, মধ্যে |
| সমুচ্চয়ী | পদ/বাক্য যুক্ত করা | এবং, ও, কিন্তু, অথবা |
| ধ্বন্যাত্মক | ধ্বনি/ধ্বনির ব্যঞ্জনা | ঝমঝম, খটখট, দুমদাম |
৪৪. অনন্বয়ী অব্যয়ের স্মরণছক
আ–সম–আ–প্র–নি–স–আ
অর্থাৎ—
আলংকারিক
সম্বোধনসূচক
আবেগসূচক
প্রশ্নসূচক
নিষেধাত্মক
সম্মতি/অসম্মতি
আবেগ-ব্যঞ্জনা
৪৫. পদান্বয়ী অব্যয়ের স্মরণছক
নাম–ক্রিয়া–যোগ
নামজাত → দ্বারা, জন্য, নিমিত্ত, অপেক্ষা
ক্রিয়াজাত → দিয়ে, করে, নিয়ে, ধরে
যৌগিক → মধ্যে দিয়ে, ভিতর থেকে
৪৬. সমুচ্চয়ী অব্যয়ের স্মরণছক
যোগ–বিকল্প–বিরোধ–কারণ–শর্ত–অন্ যথা–ফল–সিদ্ধান্ত
যোগ → ও, এবং
বিকল্প → বা, অথবা
বিরোধ → কিন্তু, অথচ
কারণ → কারণ, কেননা
শর্ত → যদি, তবে
অন্যথা → নইলে, নয়তো
ফল → তাই, ফলে
সিদ্ধান্ত → অতএব, সুতরাং, কাজেই
৪৭. অব্যয়ের সর্বশেষ ‘মহাসূত্র’
অব্যয়কে একবারে মনে রাখার সবচেয়ে সহজ সূত্র—
“মন–সম্বন্ধ–যোগ–ধ্বনি”
মন
অনন্বয়ী
→ আবেগ, সম্বোধন, সম্মতি, নিষেধ, প্রশ্ন, ব্যঞ্জনা
সম্বন্ধ
পদান্বয়ী/অনুসর্গ
→ জন্য, থেকে, সঙ্গে, মধ্যে, চেয়ে
যোগ
সমুচ্চয়ী
→ এবং, ও, কিন্তু, অথবা, কারণ, যদি, তাই
ধ্বনি
ধ্বন্যাত্মক
→ ঝমঝম, খটখট, টুপটাপ, দুমদাম
৪৮. ১০ সেকেন্ডের অব্যয়-ফর্মুলা
কোনো শব্দ দেখলেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করো—
“এটি কি সম্পর্ক তৈরি করছে, যোগ করছে, মনোভাব জানাচ্ছে, না ধ্বনি বোঝাচ্ছে?”
তার উত্তর—
সম্পর্ক → পদান্বয়ী
যোগ → সমুচ্চয়ী
মনোভাব → অনন্বয়ী
ধ্বনি → ধ্বন্যাত্মক
এরপর সমুচ্চয়ী হলে—
যোগ? বিকল্প? বিরোধ? কারণ? শর্ত? অন্যথা? ফল? সিদ্ধান্ত?
আর পদান্বয়ী হলে—
নামজাত? ক্রিয়াজাত? যৌগিক?
এইটুকু মনে থাকলেই পুরো অধ্যায়ের কাঠামো মাথায় চলে আসবে।
৪৯. পরীক্ষার জন্য শেষ মুহূর্তের ‘এক পাতার ফর্মুলা’
অব্যয় = রূপান্তরহীন/অপরিবর্তনশীল পদ + বাক্যে সম্পর্ক/মনোভাব/ব্যঞ্জনা প্রকাশের কাজ।
চার প্রধান ভাগ
১. অনন্বয়ী → মন
হায়, হে, ওরে, হ্যাঁ, না, কি, তো, কিন্তু
২. পদান্বয়ী → সম্পর্ক
জন্য, থেকে, সঙ্গে, মধ্যে, চেয়ে, দ্বারা
৩. সমুচ্চয়ী → যোগ/সম্পর্ক
এবং, ও, অথবা, কিন্তু, কারণ, যদি, নইলে, তাই, অতএব
৪. ধ্বন্যাত্মক → ধ্বনি
ঝমঝম, টুপটাপ, খটখট, দুমদাম
অনুসর্গ
নামজাত + ক্রিয়াজাত + যৌগিক
সমুচ্চয়ী
সংযোজক + বিয়োজক + সংকোচক + হেতুবাচক + অন্যথাবাচক + সাপেক্ষ + ফলসূচক + সিদ্ধান্তবাচক
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
একই শব্দ সব বাক্যে একই পদ নয়।
কিন্তু → কখনও সমুচ্চয়ী, কখনও অনন্বয়ী
না → কখনও নিষেধ, কখনও সম্মতিহীনতা, কখনও আলংকারিক
করে → কখনও ক্রিয়া, কখনও অনুসর্গসুলভ
যেন → প্রসঙ্গভেদে সম্পর্কসূচক
মতো → সাধারণত অনুসর্গসুলভ
কী → সর্বনাম/অন্য পদ; কি → প্রশ্নসূচক অব্যয়
৫০. সর্বশেষ মনে রাখার বাক্য
“অব্যয় বদলায় না—কিন্তু বাক্যের ভাব বদলে দিতে পারে।”
আর অব্যয়ের চার দরজা—
মন → অনন্বয়ী
সম্বন্ধ → পদান্বয়ী
যোগ → সমুচ্চয়ী
ধ্বনি → ধ্বন্যাত্মক
এই চারটি শব্দ মনে থাকলে অব্যয় অধ্যায়ের মূল কাঠামো কখনও ভুল হবে না।
চূড়ান্ত মহামন্ত্র
“যে সম্পর্ক বাঁধে সে অনুসর্গ,
যে বাক্য জোড়ে সে সমুচ্চয়ী,
যে মনের কথা বলে সে অনন্বয়ী,
যে ধ্বনিকে ভাষা দেয় সে ধ্বন্যাত্মক।”
এটাই অব্যয় অধ্যায়ের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত, কার্যকর ও স্মরণযোগ্য সূত্র।

