সংক্ষিপ্ত রূপরেখা
ভূমিকা
চলচ্চিত্র আধুনিক যুগের এক অনন্য যৌগিক শিল্পমাধ্যম। সাহিত্য, নাটক, অভিনয়, সংগীত, চিত্রকলা, আলোকচিত্র, নৃত্য, স্থাপত্য, প্রযুক্তি এবং সম্পাদনাশিল্প—বিভিন্ন শিল্প ও কারিগরি বিদ্যার সম্মিলিত প্রয়াসে চলচ্চিত্রের জন্ম। কিন্তু চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়ে না। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, প্রেম, স্বপ্ন, হতাশা, মূল্যবোধ ও পরিবর্তিত মানসিকতার এক অসামান্য দৃশ্যমান দলিল হয়ে উঠতে পারে চলচ্চিত্র।
বাংলার সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক তার জন্মলগ্নের প্রায় কাছাকাছি সময় থেকেই। কলকাতা ছিল ঔপনিবেশিক ভারতের অন্যতম প্রধান নগরকেন্দ্র; মুদ্রণ, সংবাদপত্র, নাটক, আলোকচিত্র, আধুনিক শিক্ষা ও নাগরিক সংস্কৃতির পাশাপাশি নতুন দৃশ্যপ্রযুক্তির প্রতিও এখানকার মানুষের প্রবল আগ্রহ ছিল। সেই পরিবেশেই বাংলায় বায়োস্কোপ প্রদর্শনের সূচনা এবং অল্পদিনের মধ্যেই দেশীয়ভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ দেখা যায়।
হীরালাল সেনের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকে শুরু করে ম্যাডান থিয়েটার্সের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার, নিউ থিয়েটার্সের শিল্পসমৃদ্ধ যুগ, উত্তম–সুচিত্রার জনপ্রিয়তার অধ্যায়, সত্যজিৎ রায়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ঋত্বিক ঘটকের দেশভাগের বেদনা, মৃণাল সেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চলচ্চিত্রভাষা, তপন সিংহের মানবিকতা এবং তরুণ মজুমদারের মধ্যবিত্ত জীবনচিত্র—সব মিলিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস এক দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
বাংলা চলচ্চিত্রের পাঠ তাই আসলে কেবল চলচ্চিত্রের পাঠ নয়; এটি বাঙালির সমাজ, রুচি, সাহিত্য, সংগীত, রাজনীতি, প্রেম, পারিবারিক জীবন, মধ্যবিত্ত মানসিকতা এবং আত্মপরিচয়ের দৃশ্যমান ইতিহাস।
১. চলচ্চিত্রের উদ্ভব
উনিশ শতকের শেষভাগে আলোকচিত্রে চলমান দৃশ্য ধারণ ও প্রদর্শনের প্রযুক্তিগত পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের জন্ম।
এই ইতিহাসে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়—অগাস্ত লুমিয়ের ও লুই লুমিয়ের বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসে তাঁদের সিনেমাটোগ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে জনসমক্ষে চলচ্চিত্র প্রদর্শন চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।
সিনেমাটোগ্রাফ ছিল এমন একটি যন্ত্র, যার সাহায্যে ছবি তোলা, ফিল্ম প্রিন্ট করা এবং পর্দায় প্রদর্শন—এই তিনটি কাজই করা সম্ভব ছিল।
তাঁদের প্রথম দিকের চলচ্চিত্রগুলিতে ছিল দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট দৃশ্য—কারখানা থেকে শ্রমিকদের বেরিয়ে আসা, রেলগাড়ির আগমন, পথের দৃশ্য, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ইত্যাদি।
অর্থাৎ চলচ্চিত্রের জন্মলগ্নেই বাস্তব জীবনকে দৃশ্যমান করে তোলার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল।
লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
তাঁদের গুরুত্ব এই কারণে যে—
- তাঁরা চলচ্চিত্রকে জনসাধারণের প্রদর্শনযোগ্য শিল্পে পরিণত করেন;
- চলমান ছবিকে বাণিজ্যিক প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন;
- চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত কাঠামোকে কার্যকর রূপ দেন;
- চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক বিনোদন ও শিল্পমাধ্যমে পরিণত করার ভিত্তি তৈরি করেন।
তাই তাঁদের বিশ্বচলচ্চিত্রের অন্যতম জনক বলা হয়। পাঠ্যসূত্রেও ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসে তাঁদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২. ভারতে চলচ্চিত্রের আগমন
১৮৯৬ সালের ৭ জুলাই বোম্বাইয়ের ওয়াটসন হোটেলে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। এর মাধ্যমে ভারতীয় দর্শক প্রথম আধুনিক চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হয়।
এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই কলকাতা, মাদ্রাজ, দিল্লি এবং অন্যান্য শহরে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা শুরু হয়।
কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিবেশ চলচ্চিত্রের বিকাশের পক্ষে বিশেষ সহায়ক ছিল। ইতিমধ্যে এখানে—
- বাংলা থিয়েটার;
- সংবাদপত্র;
- ছাপাখানা;
- আলোকচিত্র;
- সাহিত্যচর্চা;
- আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা
প্রভৃতি বিকশিত হয়েছিল।
ফলে নতুন এই দৃশ্যশিল্প দ্রুত বাঙালি সমাজের কৌতূহল ও আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে।
৩. বাংলায় বায়োস্কোপের সূচনা
প্রথম দিকে চলচ্চিত্রকে সাধারণভাবে বায়োস্কোপ বলা হত।
বিদেশ থেকে চলচ্চিত্র এনে কলকাতার বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শন করা হত। ক্রমে বাঙালির মধ্যেও এই নতুন প্রযুক্তিকে নিজের হাতে আয়ত্ত করার আগ্রহ জন্মায়।
এই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম—
হীরালাল সেন।
তাঁর হাতেই বাংলা চলচ্চিত্রের দেশীয় নির্মাণ-প্রয়াস একটি সুসংগঠিত রূপ পায়।
৪. হীরালাল সেন : বাংলা চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ
হীরালাল সেন (১৮৬৬–১৯১৭) বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অগ্রগণ্য পথিকৃৎ।
তিনি ছিলেন—
- চলচ্চিত্রগ্রাহক;
- চলচ্চিত্র প্রদর্শক;
- চলচ্চিত্র নির্মাতা;
- তথ্যচিত্র নির্মাতা;
- বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা।
১৮৯৮ সালে তিনি তাঁর ভাই মতিলাল সেনের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন—
Royal Bioscope Company
এই সংস্থার মাধ্যমে বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি দেশীয়ভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও চিত্রগ্রহণ শুরু হয়।
হীরালাল সেনের কৃতিত্বের বিশেষ দিক হল—তিনি চলচ্চিত্রকে শুধু বিদেশি বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করেননি; বরং নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাষা ও প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন।
৫. মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে : হীরালাল সেনের অভিনব উদ্যোগ
বাংলা চলচ্চিত্রের আদিপর্বে নাটকের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর।
হীরালাল সেন সমকালীন বাংলা নাটকের দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করতে শুরু করেন। বিশেষ করে ক্লাসিক থিয়েটার-এ অভিনীত নাটকের বিভিন্ন অংশ তিনি চলচ্চিত্রে রূপ দেন।
এর ফলে বাংলা নাট্যচর্চা ও চলচ্চিত্রের মধ্যে একটি প্রাথমিক সেতু গড়ে ওঠে।
তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- ভ্রমর
- হরিরাজ
- বুদ্ধদেব
- আলিবাবা ও চল্লিশ চোর
প্রভৃতি।
এভাবে মঞ্চের অভিনয়, কাহিনি ও দৃশ্যকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার প্রয়াস বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অভিনব ঘটনা।
৬. হীরালাল সেনের তথ্যচিত্র
বাংলা তথা ভারতীয় তথ্যচিত্রের ইতিহাসেও হীরালাল সেনের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ—
দিল্লি দরবার
তিনি সমকালীন বিভিন্ন জনসমাবেশ, রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাও ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন-সংক্রান্ত চিত্রগ্রহণ।
ফলে চলচ্চিত্রকে তিনি কেবল নাট্যরূপ বা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; সমকালকে নথিবদ্ধ করার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন।
৭. হীরালাল সেন ও বিজ্ঞাপনচিত্র
চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হীরালাল সেনের আর-একটি অভিনব অবদান হল বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ।
ব্যবসায়িক পণ্যের প্রচারের জন্য তিনি চলমান চিত্র ব্যবহার করেছিলেন।
অর্থাৎ চলচ্চিত্রের—
বিনোদন → তথ্য → বিজ্ঞাপন
এই বহুমুখী সম্ভাবনা তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের একেবারে আদিপর্বেই বুঝতে পেরেছিলেন।
৮. হীরালাল সেনের চলচ্চিত্রের পরিণতি
দুর্ভাগ্যজনকভাবে হীরালাল সেনের অধিকাংশ চলচ্চিত্র আজ আর সংরক্ষিত নেই। অগ্নিকাণ্ডের ফলে তাঁর বহু চলচ্চিত্রের ফিল্ম নষ্ট হয়ে যায়।
তবু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর গুরুত্ব অম্লান।
কারণ—
চলচ্চিত্র যখন ভারতীয় সমাজে একেবারে নতুন প্রযুক্তি, তখন একজন বাঙালি নিজে চলচ্চিত্র প্রদর্শন, চিত্রগ্রহণ, চলচ্চিত্র নির্মাণ, তথ্যচিত্র এবং বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছিলেন।
এই কারণেই হীরালাল সেনকে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ বলা হয়।
৯. বাংলা চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগ
বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাথমিক পর্যায় ছিল নির্বাক যুগ।
এই সময় চলচ্চিত্রে কোনো রেকর্ড করা সংলাপ শোনা যেত না। অভিনয়, মুখভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি, দৃশ্যবিন্যাস এবং প্রয়োজনমতো লিখিত বক্তব্যের সাহায্যে গল্প এগিয়ে যেত।
নির্বাক যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. পৌরাণিক ও ধর্মীয় কাহিনির প্রাধান্য।
২. নাটকের সঙ্গে চলচ্চিত্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
৩. নাট্যাভিনেতাদের চলচ্চিত্রে আগমন।
৪. মঞ্চসজ্জা ও অভিনয়রীতির প্রভাব।
৫. বিনোদননির্ভর চলচ্চিত্রের প্রাধান্য।
৬. পৌরাণিক, ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক কাহিনির ব্যবহার।
৭. ধীরে ধীরে সামাজিক বিষয়ের প্রবেশ।
৮. চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত ভাষা তখনও পরীক্ষাধীন।
৯. সংগীত ও ব্যাখ্যাকারীর সাহায্যে প্রদর্শন।
১০. বাংলা সাহিত্যের কাহিনি চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠা।
নির্বাক যুগে চলচ্চিত্র ছিল মূলত দৃশ্যনির্ভর শিল্প; ফলে অভিনেতার দেহভঙ্গি ও মুখের অভিব্যক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
১০. ম্যাডান থিয়েটার্স
বাংলা চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগের বিকাশে জে. এফ. ম্যাডান-এর প্রতিষ্ঠিত Madan Theatres অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাডান ছিলেন পারসি ব্যবসায়ী এবং কলকাতার বিনোদন জগতের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা।
তাঁর উদ্যোগে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনারও একটি বৃহৎ ব্যবসায়িক কাঠামো গড়ে ওঠে।
১৯১৯ সালে Madan Theatres Limited প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর চলচ্চিত্র প্রযোজনা আরও সংগঠিত হয়।
১১. ম্যাডান থিয়েটার্সের চলচ্চিত্র
ম্যাডান থিয়েটার্সের প্রযোজনায় নির্মিত নির্বাক চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- বিল্বমঙ্গল
- বিষবৃক্ষ
- নল-দময়ন্তী
- ধ্রুব চরিত্র
- বেহুলা
- মহাভারত
- সাবিত্রী-সত্যবান
- সতী
- নূরজাহান
প্রভৃতি।
ম্যাডান থিয়েটার্স বাংলা চলচ্চিত্রকে বৃহৎ দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছে দেয় এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য একটি সংগঠিত পরিকাঠামো গড়ে তোলে।
১২. অন্যান্য নির্বাক চলচ্চিত্র সংস্থা
ম্যাডান থিয়েটার্সের পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অরোরা ফিল্ম কোম্পানি
এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনাদি বসু-র নাম যুক্ত।
ইন্দো-ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানি
বাংলার নির্বাক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান।
তাজমহল ফিল্ম কোম্পানি
নির্বাক যুগে এই প্রতিষ্ঠানও চলচ্চিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইন্ডিয়ান সিনেমা আর্টস
প্রাথমিক বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশে আরও একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
এইসব প্রতিষ্ঠান মিলেই বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাথমিক শিল্প ও ব্যবসায়িক কাঠামো গড়ে তোলে।
১৩. ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক : দাদাসাহেব ফালকে
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে—
ধুন্দিরাজ গোবিন্দ ফালকে
অর্থাৎ দাদাসাহেব ফালকে-র নাম চিরস্মরণীয়।
১৯১৩ সালে তিনি নির্মাণ করেন—
রাজা হরিশ্চন্দ্র
এটি ভারতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্বাক কাহিনিচিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
তাঁকে তাই বলা হয়—
ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে—
- লঙ্কা দহন
- শ্রীকৃষ্ণ জন্ম
- সাবিত্রী
- শকুন্তলা
প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
১৪. সবাক চলচ্চিত্রের আগমন
প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে চলচ্চিত্রে শব্দ সংযোজিত হয়। ফলে নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগের অবসান এবং সবাক চলচ্চিত্রের যুগের সূচনা ঘটে।
শব্দের আগমনের ফলে চলচ্চিত্রে যুক্ত হল—
- সংলাপ;
- গান;
- সংগীত;
- শব্দপ্রভাব;
- নেপথ্যধ্বনি।
ফলে চলচ্চিত্রের ভাষা আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে।
বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের প্রাথমিক ইতিহাসে জামাই ষষ্ঠী এবং দেনা-পাওনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
১৫. নিউ থিয়েটার্স
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে New Theatres একটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায়।
প্রতিষ্ঠাতা—
বীরেন্দ্রনাথ সরকার (বি. এন. সরকার)।
১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১ কলকাতায় নিউ থিয়েটার্স প্রতিষ্ঠিত হয়। পাঠ্যসূচির চলচ্চিত্র-ইতিহাস অংশেও নিউ থিয়েটার্সকে এই পর্যায়ের অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখা হয়েছে।
বি. এন. সরকার চলচ্চিত্রকে কেবল ব্যবসা হিসেবে দেখেননি। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ শিল্পী, প্রশিক্ষিত কলাকুশলী, উৎকৃষ্ট সংগীত এবং সাহিত্যনির্ভর কাহিনির মাধ্যমে চলচ্চিত্রকে একটি উচ্চমানের শিল্পে উন্নীত করার চেষ্টা করেছিলেন।
১৬. ‘দেনা-পাওনা’
১৯৩১ সালে প্রেমাঙ্কুর আতর্থী পরিচালিত—
দেনা-পাওনা
নিউ থিয়েটার্সের প্রথমদিকের গুরুত্বপূর্ণ সবাক চলচ্চিত্র।
সংগীত পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—
রাইচাঁদ বড়াল।
‘দেনা-পাওনা’ বাংলা চলচ্চিত্রে সবাক যুগকে সুসংহত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৭. নিউ থিয়েটার্সের স্বর্ণযুগ
নিউ থিয়েটার্সের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক বিরাট প্রতিভাসমষ্টি।
পরিচালক
- দেবকীকুমার বসু
- প্রমথেশ বড়ুয়া
- নীতিন বসু
- প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
অভিনেতা
- পাহাড়ি সান্যাল
- ছবি বিশ্বাস
- কানন দেবী
- কে. এল. সায়গল
- কে. সি. দে
- পৃথ্বীরাজ কাপুর
সংগীত
- রাইচাঁদ বড়াল
- পঙ্কজকুমার মল্লিক
- তিমির বরণ
প্রমুখ।
নিউ থিয়েটার্সের বিশেষ কৃতিত্ব ছিল—পরিচালক, অভিনেতা, গায়ক, সংগীতজ্ঞ, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদক ও প্রযুক্তিবিদদের এক ছাদের নীচে এনে একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
১৮. ‘চণ্ডীদাস’
দেবকীকুমার বসু পরিচালিত চণ্ডীদাস নিউ থিয়েটার্সের অন্যতম উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।
ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মানবিকতার বক্তব্য এবং সংগীতের অসামান্য ব্যবহারের জন্য ছবিটি বিশেষভাবে স্মরণীয়।
এই চলচ্চিত্রে স্পষ্ট হয় যে নিউ থিয়েটার্সের কাছে চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়—মানবিক ও সামাজিক বক্তব্য প্রকাশেরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
১৯. ‘দেবদাস’
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিউ থিয়েটার্সের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি—
দেবদাস (১৯৩৫)।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে বাংলা সংস্করণে প্রমথেশ বড়ুয়া অভিনয় ও পরিচালনা করেন।
হিন্দি সংস্করণে কে. এল. সায়গল অভিনয় করেন।
ফলে বাংলা চলচ্চিত্র প্রথমবারের মতো সর্বভারতীয় দর্শকের কাছে আরও শক্তিশালীভাবে পৌঁছায়।
২০. নিউ থিয়েটার্স ও সংগীত
নিউ থিয়েটার্সের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হল বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীতের মর্যাদা বৃদ্ধি।
রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক চলচ্চিত্রের গানকে শুধু বিনোদনের উপকরণ না রেখে চলচ্চিত্রের আবেগ, চরিত্র ও কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ করে তোলেন।
এই যুগ থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রের গান একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হতে থাকে।
২১. ‘ভাগ্যচক্র’ ও প্লেব্যাক
১৯৩৫ সালে নির্মিত ভাগ্যচক্র বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ঘটনা।
এই চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক বা নেপথ্যগান ব্যবহারের সূচনা ঘটে বলে পাঠ্যভিত্তিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে—
অভিনেতা ও গায়কের ভূমিকা পৃথক হয়ে গেল।
পরবর্তী বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীতের বিকাশে এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
২২. প্রমথেশ বড়ুয়া
বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, পরিচালক ও চলচ্চিত্রব্যক্তিত্ব—
প্রমথেশ বড়ুয়া।
তিনি অভিনয় ও পরিচালনা—দুই ক্ষেত্রেই আধুনিক চলচ্চিত্রভাষা নির্মাণে ভূমিকা রাখেন।
তাঁর চলচ্চিত্রে—
- প্রেম;
- ব্যক্তিমানুষের সংকট;
- সামাজিক সম্পর্ক;
- মনস্তত্ত্ব;
- অপরাধবোধ;
- আত্মসংঘাত
বিশেষ গুরুত্ব পায়।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
- অপরাধী
- দেবদাস
- মঞ্জিল
- মুক্তি
- রজত জয়ন্তী
- গৃহদাহ
- শেষ উত্তর
- উত্তরায়ণ
প্রভৃতি।
২৩. দেবকীকুমার বসু
দেবকীকুমার বসু বাংলা চলচ্চিত্রের শিল্পমান উন্নত করার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক।
তাঁর চলচ্চিত্রে—
সাহিত্য + সংগীত + অভিনয় + দৃশ্যরচনা
একটি সুসংহত শিল্পরূপ লাভ করে।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
- চণ্ডীদাস
- বিদ্যাপতি
- মীরাবাঈ
- কবি
- ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য
- সাগর সঙ্গমে
প্রভৃতি।
২৪. নিউ থিয়েটার্সের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
নিউ থিয়েটার্সের গুরুত্ব শুধু তার নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যায় নয়।
এটি—
বাংলা সাহিত্য + নাটক + সংগীত + অভিনয় + প্রযুক্তি + চলচ্চিত্র
এই সমস্ত শিল্পধারাকে একটি কেন্দ্রে এনে দিয়েছিল।
নিউ থিয়েটার্সের স্টুডিয়ো সংস্কৃতি বাংলা চলচ্চিত্রের পরবর্তী বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে।
২৫. পঞ্চাশের দশক : বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন যুগ
১৯৫০-এর দশক বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অসাধারণ সন্ধিক্ষণ।
একদিকে জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বিস্তার, অন্যদিকে বাস্তবধর্মী ও শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রের উত্থান—এই দুই প্রবাহ পাশাপাশি বিকশিত হয়।
এই সময়ে আবির্ভাব ঘটে—
- সত্যজিৎ রায়;
- ঋত্বিক ঘটক;
- মৃণাল সেন;
- তপন সিংহ
প্রমুখের।
অন্যদিকে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের জনপ্রিয়তা বাংলা চলচ্চিত্রের তারকা-সংস্কৃতিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
পাঠ্যভিত্তিক আলোচনাতেও পঞ্চাশের দশকের এই পরিবর্তনের সঙ্গে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘অপরাজিত’, ‘অপুর সংসার’, ‘নাগরিক’, ‘অযান্ত্রিক’, ‘রাত ভোর’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘অন্তরীক্ষ’ ও ‘কাবুলিওয়ালা’-র মতো চলচ্চিত্রকে বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
২৬. ‘সাড়ে চুয়াত্তর’
১৯৫৩ সালে নির্মল দে পরিচালিত—
সাড়ে চুয়াত্তর
বাংলা জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।
কলকাতার মেসজীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে—
- হাস্যরস;
- বাঙালিয়ানা;
- প্রেম;
- নাগরিক জীবন
একটি প্রাণবন্ত রূপ পায়।
এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই উত্তম কুমার–সুচিত্রা সেন জুটির জনপ্রিয়তার সূচনা।
২৭. উত্তম কুমার–সুচিত্রা সেন যুগ
উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়।
তাঁদের জুটি বাংলা মধ্যবিত্তের প্রেম, পোশাক, কথাবার্তা, আবেগ ও স্বপ্নের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
তাঁদের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে—
- সাড়ে চুয়াত্তর
- অগ্নিপরীক্ষা
- শাপমোচন
- হারানো সুর
- সপ্তপদী
- পথে হল দেরি
- রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত
- দেয়া-নেয়া
- দ্বীপ জ্বেলে যাই
- দুই পৃথিবী
প্রভৃতি স্মরণীয়।
এই জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে রোমান্টিক তারকা-সংস্কৃতির এক স্থায়ী প্রতীক হয়ে ওঠে।
২৮. উত্তম কুমার
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে—
উত্তম কুমার
শুধু একজন অভিনেতা নন; তিনি এক সাংস্কৃতিক প্রতীক।
তাঁর অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল—
- স্বাভাবিক বাচনভঙ্গি;
- সংযত অভিব্যক্তি;
- রোমান্টিক ব্যক্তিত্ব;
- চরিত্র অনুযায়ী অভিনয়ের বৈচিত্র্য;
- গানের দৃশ্যে স্বাভাবিক উপস্থিতি;
- দর্শকের সঙ্গে আবেগের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক।
তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র—
- সাড়ে চুয়াত্তর
- হারানো সুর
- শাপমোচন
- সপ্তপদী
- ঝিন্দের বন্দী
- ভ্রান্তিবিলাস
- থানা থেকে আসছি
- নায়ক
- চিড়িয়াখানা
- অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি
- নিশিপদ্ম
- বাঘবন্দীর খেলা
- সব্যসাচী
প্রভৃতি।
তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনাতেও হাত দেন। শুধু একটি বছর, বনপলাশীর পদাবলী, কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
২৯. সুচিত্রা সেন
বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা—
সুচিত্রা সেন।
উত্তম কুমারের বিপরীতে তাঁর অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন রোমান্টিক নন্দনতত্ত্ব নির্মাণ করে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র—
- সাত নম্বর কয়েদী
- সাড়ে চুয়াত্তর
- অগ্নিপরীক্ষা
- দেবদাস
- শাপমোচন
- সাগরিকা
- হারানো সুর
- রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত
- সপ্তপদী
- দ্বীপ জ্বেলে যাই
- দেবী চৌধুরাণী
- সাত পাকে বাঁধা
প্রভৃতি।
সুচিত্রা সেনের অভিনয়ে একই সঙ্গে সৌন্দর্য, আত্মমর্যাদা, সংবেদনশীলতা ও চরিত্রের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব ফুটে উঠত।
৩০. যাত্রিক
পঞ্চাশের দশকের জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্রে যাত্রিক একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
এই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনজন পরিচালক—
- তরুণ মজুমদার;
- দিলীপ মুখোপাধ্যায়;
- শচীন মুখোপাধ্যায়।
তাঁদের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র—
চাঁপাডাঙার বৌ (১৯৫৪)
পরবর্তী সময়ে তরুণ মজুমদার একক পরিচালক হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্রে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন।
৩১. তরুণ মজুমদার
তরুণ মজুমদারের চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে—
- বাঙালি মধ্যবিত্ত;
- গ্রামীণ জীবন;
- প্রেম;
- পরিবার;
- মূল্যবোধ;
- হাসি-কান্না;
- সামাজিক সম্পর্ক।
তাঁর চলচ্চিত্রের ভাষা সহজ, স্বাভাবিক এবং গভীরভাবে বাঙালিয়ানা-নির্ভর।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
- চাঁপাডাঙার বৌ
- বালিকা বধূ
- শ্রীমান পৃথ্বীরাজ
- দাদার কীর্তি
- গণদেবতা
- ভালোবাসা ভালোবাসা
- আলো
- চাঁদের বাড়ি
প্রভৃতি।
৩২. সত্যজিৎ রায়
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সত্যজিৎ রায় এক যুগান্তকারী নাম।
তিনি চলচ্চিত্রকে শুধু কাহিনি বলার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা, সময়, দৃশ্য, শব্দ, নীরবতা, সম্পাদনা ও সংগীতের মাধ্যমে মানবজীবনকে প্রকাশ করেছেন।
তিনি ছিলেন—
- পরিচালক;
- চিত্রনাট্যকার;
- সংগীত পরিচালক;
- শিল্পনির্দেশক;
- প্রচ্ছদশিল্পী;
- লেখক;
- সম্পাদক।
তিনি কলকাতার ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
৩৩. ‘পথের পাঁচালী’
১৯৫৫ সালে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন—
পথের পাঁচালী।
এটি বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
গ্রামীণ বাংলার জীবনকে কোনো কৃত্রিম রোমান্টিকতা ছাড়াই মানবিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে উপস্থাপন করে ছবিটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
৩৪. অপু ত্রয়ী
সত্যজিৎ রায়ের—
১. পথের পাঁচালী
২. অপরাজিত
৩. অপুর সংসার
এই তিনটি চলচ্চিত্রকে একত্রে বলা হয়—
অপু ত্রয়ী।
অপুর শৈশব, কৈশোর, শিক্ষা, প্রেম, বিবাহ, পিতৃত্ব ও জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ত্রয়ী এক ব্যক্তিমানুষের বেড়ে ওঠার ইতিহাসকে বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছে।
৩৫. সত্যজিৎ রায়ের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
সাহিত্যনির্ভর
- জলসাঘর
- দেবী
- তিন কন্যা
- চারুলতা
- ঘরে বাইরে
- অভিযান
নগরজীবন
- মহানগর
- প্রতিদ্বন্দ্বী
- সীমাবদ্ধ
- জন অরণ্য
মনস্তাত্ত্বিক
- নায়ক
- কান্চনজঙ্ঘা
- অরণ্যের দিনরাত্রি
শিশু-কিশোর
- গুপী গাইন বাঘা বাইন
- সোনার কেল্লা
- জয় বাবা ফেলুনাথ
- হীরক রাজার দেশে
অন্যান্য
- অশনি সংকেত
- শাখা প্রশাখা
- গণশত্রু
- আগন্তুক
- শতরঞ্জ কে খিলাড়ি
প্রভৃতি।
৩৬. সত্যজিৎ রায় ও সাহিত্যরূপান্তর
বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যরূপান্তরের ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়ের অবদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
চারুলতা রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’-এর চলচ্চিত্ররূপ।
এখানে উনিশ শতকের শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের—
- দাম্পত্য;
- নিঃসঙ্গতা;
- মানসিক আকর্ষণ;
- সাহিত্যরুচি;
- নারীস্বাধীনতার সীমা
অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
৩৭. সত্যজিৎ রায়ের শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র
শিশু-কিশোর চলচ্চিত্রেও তাঁর অবদান অসামান্য।
গুপী গাইন বাঘা বাইন
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত।
সোনার কেল্লা
ফেলুদা চরিত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
জয় বাবা ফেলুনাথ
ফেলুদা-সিরিজের আর-একটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।
হীরক রাজার দেশে
শিশুদের চলচ্চিত্র হলেও এর মধ্যে—
- স্বৈরাচার;
- ক্ষমতা;
- শিক্ষা;
- প্রতিবাদ;
- স্বাধীনতা
নিয়ে গভীর রাজনৈতিক ব্যঙ্গ রয়েছে।
৩৮. সত্যজিৎ রায়ের আন্তর্জাতিক সম্মান
সত্যজিৎ রায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃত।
১৯৯২ সালে তিনি লাভ করেন—
Academy Honorary Award বা সম্মানসূচক অস্কার।
একই বছর তিনি পান—
ভারতরত্ন।
বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্বচলচ্চিত্রের মানচিত্রে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য।
৩৯. ঋত্বিক ঘটক
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সত্যজিৎ রায়ের পাশাপাশি আর-এক মৌলিক প্রতিভা—
ঋত্বিক কুমার ঘটক।
তাঁর চলচ্চিত্রে—
- দেশভাগ;
- উদ্বাস্তু জীবন;
- শ্রেণিসংগ্রাম;
- বামপন্থী চেতনা;
- মানবিকতা;
- পরিবার;
- বিচ্ছিন্নতা;
- ইতিহাসের ক্ষত
বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
৪০. ‘নাগরিক’
ঋত্বিক ঘটকের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র—
নাগরিক।
চলচ্চিত্রটি ১৯৫২ সালে নির্মিত হলেও তাঁর জীবদ্দশায় মুক্তি পায়নি।
কলকাতার মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের—
- বেকারত্ব;
- বাসস্থানের সমস্যা;
- অর্থনৈতিক সংকট;
- সামাজিক অনিশ্চয়তা
এই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে।
৪১. ‘অযান্ত্রিক’
ঋত্বিক ঘটকের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র—
অযান্ত্রিক (১৯৫৮)।
সুবোধ ঘোষের গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে মানুষ ও একটি পুরোনো মোটরগাড়ির সম্পর্ককে কেন্দ্র করে মানবিকতার অনুসন্ধান করা হয়েছে।
যন্ত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও চলচ্চিত্রটির প্রকৃত বিষয়—
মানুষের একাকিত্ব, আবেগ ও সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা।
৪২. ঋত্বিক ঘটকের দেশভাগ-ত্রয়ী
ঋত্বিক ঘটকের তিনটি চলচ্চিত্র—
- মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)
- কোমল গান্ধার (১৯৬১)
- সুবর্ণরেখা (১৯৬২/মুক্তি ১৯৬৫)
দেশভাগের অভিঘাত, উদ্বাস্তু জীবন ও ভাঙা মানুষের স্বপ্নকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
এই চলচ্চিত্রগুলিতে দেশভাগ শুধু রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি পরিবার, প্রেম, স্মৃতি, পরিচয় ও অস্তিত্বের সংকট।
৪৩. ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’
১৯৫৮ সালে নির্মিত—
বাড়ি থেকে পালিয়ে
একটি শিশুর চোখে শহরকে দেখার সুযোগ করে দেয়।
শিশুর সরল দৃষ্টির মধ্য দিয়ে নগরজীবনের জটিলতা, বৈষম্য ও মানুষের সম্পর্কের নানা দিক এখানে ফুটে ওঠে।
৪৪. ‘তিতাস একটি নদীর নাম’
অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে ঋত্বিক ঘটক নির্মাণ করেন—
তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)।
নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানুষের জীবন, জীবিকা, সামাজিক কাঠামো ও অস্তিত্বসংকট এখানে মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি লাভ করেছে।
৪৫. ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’
ঋত্বিক ঘটকের শেষদিকের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র—
যুক্তি তক্কো আর গপ্পো।
এটি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা, শিল্পীর সংকট, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজের সময়ের সঙ্গে আত্মসমালোচনামূলক সংলাপ।
তিনি নিজেই নীলকণ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করেন।
৪৬. ঋত্বিক ঘটকের তথ্যচিত্র
তথ্যচিত্রের ক্ষেত্রেও ঋত্বিক ঘটকের অবদান রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য—
- আমার লেনিন
- পুরুলিয়া ছৌ
প্রভৃতি।
পাঠ্যভিত্তিক উপাদানেও তাঁর এই তথ্যচিত্রগুলির উল্লেখ রয়েছে।
৪৭. মৃণাল সেন
বাংলা চলচ্চিত্রের আর-এক মহীরুহ—
মৃণাল সেন।
তাঁর চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে—
- রাজনীতি;
- সমাজ;
- মধ্যবিত্ত;
- নগরজীবন;
- বেকারত্ব;
- শ্রেণিবৈষম্য;
- নৈতিক সংকট;
- রাজনৈতিক অস্থিরতা
বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
৪৮. ‘রাত ভোর’
১৯৫৬ সালে মৃণাল সেনের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র—
রাত ভোর।
ছবিটি খুব বেশি সাফল্য অর্জন করেনি।
কিন্তু পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলির মাধ্যমে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান পরিচালক হয়ে ওঠেন।
৪৯. মৃণাল সেনের উত্তরণ
নীল আকাশের নীচে
তাঁকে দেশীয় দর্শকের কাছে পরিচিত করে।
বাইশে শ্রাবণ
তাঁকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রমহলে পরিচিতি দেয়।
ভুবন সোম
১৯৬৯ সালের এই চলচ্চিত্র ভারতীয় নতুন চলচ্চিত্র আন্দোলন বা New Wave-এর ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫০. কলকাতা ট্রিলজি
মৃণাল সেনের—
১. ইন্টারভিউ
২. কলকাতা ৭১
৩. পদাতিক
এই তিনটি চলচ্চিত্রকে সাধারণভাবে কলকাতা ট্রিলজি বলা হয়।
এখানে উঠে আসে—
- যুবসমাজ;
- বেকারত্ব;
- রাজনৈতিক অস্থিরতা;
- শ্রেণিবৈষম্য;
- মধ্যবিত্তের সংকট;
- নগরজীবনের অসহায়তা।
৫১. ‘একদিন প্রতিদিন’
একজন কর্মজীবী তরুণী রাতে বাড়ি না-ফেরাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ভেতরের উদ্বেগ, সামাজিক মূল্যবোধ, নারীর স্বাধীনতা এবং প্রতিবেশী-সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়।
৫২. ‘খারিজ’
একটি গৃহকর্মীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নির্মিত—
খারিজ
মধ্যবিত্ত সমাজের আত্মসন্তুষ্টি, নৈতিক দায়িত্ব ও শ্রেণিসম্পর্ককে কঠোরভাবে পরীক্ষা করে।
চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসিত হয়।
৫৩. ‘আকালের সন্ধানে’
১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে নির্মিত—
আকালের সন্ধানে
অতীতের দুর্ভিক্ষ ও বর্তমানের বাস্তবতাকে পাশাপাশি দাঁড় করায়।
১৯৮১ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি বিশেষ জুরি পুরস্কার—Silver Bear লাভ করে।
৫৪. মৃণাল সেনের পরবর্তী চলচ্চিত্র
পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র—
- মহাপৃথিবী
- অন্তরীন
- আমার ভুবন
প্রভৃতি।
তাঁর শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র—
আমার ভুবন (২০০২)।
বাংলার বাইরে তিনি হিন্দি, ওড়িয়া ও তেলুগু ভাষাতেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
৫৫. তপন সিংহ
বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান পরিচালক—
তপন সিংহ।
তাঁর চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য—
শিল্পমান ও জনপ্রিয়তার মধ্যে সেতুবন্ধন।
তিনি বাংলা সাহিত্যের গল্পকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষ ছিলেন।
৫৬. তপন সিংহের চলচ্চিত্র
তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র—
অঙ্কুশ (১৯৫৪)।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র—
- উপহার
- কাবুলিওয়ালা
- লৌহকপাট
- ক্ষণিকের অতিথি
- ক্ষুধিত পাষাণ
- ঝিন্দের বন্দী
- হাঁসুলি বাঁকের উপকথা
- জতুগৃহ
- অতিথি
- আরোহী
- হাটে বাজারে
- গল্প হলেও সত্যি
- সাগিনা মাহাতো
- সবুজ দ্বীপের রাজা
- সফেদ হাতি
- বাঞ্ছারামের বাগান
- আতঙ্ক
- হুইলচেয়ার
- অন্তর্ধান
প্রভৃতি।
৫৭. ‘কাবুলিওয়ালা’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে তপন সিংহের—
কাবুলিওয়ালা (১৯৫৭)
বাংলা চলচ্চিত্রের এক স্মরণীয় সৃষ্টি।
ভাষা, জাতি, দেশ ও সংস্কৃতির পার্থক্য অতিক্রম করে পিতৃত্ব ও মানবিকতার সার্বজনীনতা এই চলচ্চিত্রের মূল শক্তি।
৫৮. তপন সিংহের শিল্পচেতনা
তাঁর চলচ্চিত্র—
- মানবিক;
- সাহিত্যনির্ভর;
- সংবেদনশীল;
- সহজবোধ্য;
- প্রযুক্তিগতভাবে পরিশীলিত;
- জনপ্রিয়;
- শিল্পসম্মত।
এই কারণে তপন সিংহ বাংলা চলচ্চিত্রে একটি স্বতন্ত্র ধারার নির্মাতা।
৫৯. বাংলা ছোটদের চলচ্চিত্র
বাংলা চলচ্চিত্রে শিশু-কিশোরদের জন্য নির্মিত চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে।
এই ধারায় উল্লেখযোগ্য—
- পরিবর্তন
- বাবলা
- দেড়শো খোকার কাণ্ড
- মানিক
- বাদশা
- ডাকাতের হাতে
- হীরের প্রজাপতি
প্রভৃতি।
সত্যজিৎ রায়ের গুপী গাইন বাঘা বাইন, সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ, হীরক রাজার দেশে এই ধারাকে শিল্পের উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
৬০. বাংলা তথ্যচিত্র
কাহিনিচিত্রের পাশাপাশি বাংলা চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা—
তথ্যচিত্র বা Documentary।
তথ্যচিত্রে কাল্পনিক কাহিনির পরিবর্তে বাস্তব ঘটনা, ব্যক্তি, স্থান, ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি বা নির্দিষ্ট বিষয়কে উপস্থাপন করা হয়।
বাংলা তথ্যচিত্রের প্রাথমিক ইতিহাসে হীরালাল সেনের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।
৬১. হরিসাধন দাশগুপ্ত
বাংলা তথ্যচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতাদের মধ্যে—
হরিসাধন দাশগুপ্ত
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাঁর তথ্যচিত্রে শিল্প, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্বের জীবনকে তথ্যসমৃদ্ধভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
৬২. সত্যজিৎ রায়ের তথ্যচিত্র
সত্যজিৎ রায় তথ্যচিত্র নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
উল্লেখযোগ্য—
- Rabindranath Tagore
- The Inner Eye
- Sikkim
প্রভৃতি।
৬৩. অন্যান্য তথ্যচিত্র নির্মাতা
বাংলা তথ্যচিত্রের ধারায় উল্লেখযোগ্য—
- হরিসাধন দাশগুপ্ত;
- চিদানন্দ দাশগুপ্ত;
- পূর্ণেন্দু পত্রী;
- মৃণাল সেন;
- ঋত্বিক ঘটক;
- বিমল রায়;
- গৌতম ঘোষ
প্রমুখ।
তথ্যচিত্র বাংলা চলচ্চিত্রকে কাহিনির সীমা অতিক্রম করে ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প ও বাস্তব জীবনের দলিল হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।
৬৪. বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্য
বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল তার সঙ্গে সাহিত্যের গভীর সম্পর্ক।
বঙ্কিমচন্দ্র → রবীন্দ্রনাথ → শরৎচন্দ্র → বিভূতিভূষণ → তারাশঙ্কর → মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় → অদ্বৈত মল্লবর্মণ
প্রমুখ সাহিত্যিকের রচনা চলচ্চিত্রের কাহিনির উৎস হয়েছে।
এই সম্পর্কের বিশেষত্ব হল—চলচ্চিত্র কেবল সাহিত্যকে অনুবাদ করেনি; বরং চলচ্চিত্র তার নিজস্ব দৃশ্য ও শব্দের ভাষায় সাহিত্যিক অভিজ্ঞতাকে পুনর্নির্মাণ করেছে।
৬৫. বাংলা চলচ্চিত্রের দুটি প্রধান প্রবাহ
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মোটামুটি দুটি বড় প্রবাহ লক্ষ করা যায়।
ক. জনপ্রিয় বা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র
এর প্রধান বৈশিষ্ট্য—
- তারকা;
- প্রেম;
- গান;
- হাস্যরস;
- পারিবারিক আবেগ;
- বিনোদন।
খ. শিল্পধর্মী বা সমান্তরাল চলচ্চিত্র
এর কেন্দ্রে—
- বাস্তবতা;
- রাজনীতি;
- সমাজ;
- শ্রেণি;
- ইতিহাস;
- মানুষের মনস্তত্ত্ব;
- অস্তিত্বের সংকট।
তবে এই দুই ধারাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। তপন সিংহ ও তরুণ মজুমদারের মতো পরিচালক দেখিয়েছেন যে শিল্পগুণ ও জনপ্রিয়তা পরস্পরের বিরোধী নয়।
৬৬. বাংলা চলচ্চিত্রের বিবর্তন : একটি ধারাবাহিক রেখাচিত্র
লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়
↓
ভারতে চলচ্চিত্রের আগমন — ১৮৯৬
↓
কলকাতায় বায়োস্কোপ
↓
হীরালাল সেন
↓
Royal Bioscope Company — ১৮৯৮
↓
নির্বাক যুগ
↓
ম্যাডান থিয়েটার্স
↓
অরোরা / তাজমহল / ইন্ডো-ব্রিটিশ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান
↓
সবাক চলচ্চিত্র
↓
নিউ থিয়েটার্স — ১৯৩১
↓
দেনা-পাওনা / চণ্ডীদাস / দেবদাস
↓
প্লেব্যাকের সূচনা
↓
প্রমথেশ বড়ুয়া ও দেবকীকুমার বসু
↓
পঞ্চাশের দশক
↓
উত্তম–সুচিত্রা যুগ
↓
সত্যজিৎ রায়
↓
ঋত্বিক ঘটক
↓
মৃণাল সেন
↓
তপন সিংহ
↓
তরুণ মজুমদার
↓
শিল্পধর্মী ও সমান্তরাল চলচ্চিত্র
↓
সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্র।
৬৭. একনজরে : গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| চলচ্চিত্রের প্রাথমিক পথিকৃৎ | লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় |
| লুমিয়েরদের গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শন | ১৮৯৫ |
| ভারতে চলচ্চিত্রের আগমন | ১৮৯৬ |
| প্রথম প্রদর্শনের স্থান | ওয়াটসন হোটেল, বোম্বাই |
| বাংলা চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ | হীরালাল সেন |
| Royal Bioscope Company | ১৮৯৮ |
| হীরালালের উল্লেখযোগ্য কাজ | ভ্রমর, হরিরাজ, বুদ্ধদেব |
| তথ্যচিত্রের প্রাথমিক পথিকৃৎ | হীরালাল সেন |
| নির্বাক যুগের প্রধান প্রতিষ্ঠান | ম্যাডান থিয়েটার্স |
| ম্যাডান থিয়েটার্সের প্রতিষ্ঠাতা | জে. এফ. ম্যাডান |
| ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক | দাদাসাহেব ফালকে |
| রাজা হরিশ্চন্দ্র | ১৯১৩ |
| নিউ থিয়েটার্স প্রতিষ্ঠা | ১৯৩১ |
| প্রতিষ্ঠাতা | বি. এন. সরকার |
| প্রথমদিকের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র | দেনা-পাওনা |
| গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক | দেবকীকুমার বসু, প্রমথেশ বড়ুয়া, নীতিন বসু |
| গুরুত্বপূর্ণ সংগীতজ্ঞ | রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজকুমার মল্লিক |
| গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র | চণ্ডীদাস, দেবদাস, বিদ্যাপতি |
| প্লেব্যাকের প্রাথমিক যুগ | ভাগ্যচক্র |
| পঞ্চাশের দশকের জনপ্রিয় জুটি | উত্তম কুমার–সুচিত্রা সেন |
| জুটির প্রথম চলচ্চিত্র | সাড়ে চুয়াত্তর |
| সত্যজিতের প্রথম চলচ্চিত্র | পথের পাঁচালী |
| অপু ত্রয়ী | পথের পাঁচালী, অপরাজিত, অপুর সংসার |
| ঋত্বিকের প্রথম পরিচালিত ছবি | নাগরিক |
| ঋত্বিকের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য | অযান্ত্রিক |
| ঋত্বিকের গুরুত্বপূর্ণ ত্রয়ী | মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা |
| মৃণাল সেনের প্রথম চলচ্চিত্র | রাত ভোর |
| মৃণালের কলকাতা ট্রিলজি | ইন্টারভিউ, কলকাতা ৭১, পদাতিক |
| তপন সিংহের প্রথম চলচ্চিত্র | অঙ্কুশ |
| তপনের উল্লেখযোগ্য ছবি | কাবুলিওয়ালা |
| যাত্রিকের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র | চাঁপাডাঙার বৌ |
| শিশু চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য ধারা | পরিবর্তন, বাবলা প্রভৃতি |
| তথ্যচিত্রের অন্যতম পথিকৃৎ | হীরালাল সেন |
৬৮. বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস : প্রধান ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের অবদান
হীরালাল সেন
সূচনা, চিত্রগ্রহণ, তথ্যচিত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্র।
জে. এফ. ম্যাডান
প্রাতিষ্ঠানিক চলচ্চিত্র ব্যবসা ও নির্বাক যুগের বিস্তার।
বি. এন. সরকার
নিউ থিয়েটার্স ও স্টুডিয়ো-ভিত্তিক চলচ্চিত্র সংস্কৃতি।
প্রমথেশ বড়ুয়া
আধুনিক অভিনয়, পরিচালনা ও চলচ্চিত্রের মনস্তাত্ত্বিক ভাষা।
দেবকীকুমার বসু
সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্রের শিল্পসম্মত সমন্বয়।
রাইচাঁদ বড়াল
বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতভাষার বিকাশ।
পঙ্কজকুমার মল্লিক
চলচ্চিত্রের গান ও সংগীতকে জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত করা।
উত্তম কুমার
বাংলা তারকা-সংস্কৃতি ও জনপ্রিয় অভিনয়ের সর্বোচ্চ প্রতীক।
সুচিত্রা সেন
বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক ও মননশীল নারীচরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার।
সত্যজিৎ রায়
বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্বশিল্পের মর্যাদায় উন্নীত করা।
ঋত্বিক ঘটক
দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন ও ইতিহাসের ক্ষতকে চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়া।
মৃণাল সেন
রাজনীতি, নগরজীবন ও মধ্যবিত্তের সংকটের চলচ্চিত্ররূপ।
তপন সিংহ
মানবিকতা, সাহিত্য ও জনপ্রিয়তার সমন্বয়।
তরুণ মজুমদার
বাঙালি মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ জীবনের সহজ, মানবিক ও আবেগময় রূপায়ণ।
৬৯. বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস : মনে রাখার মতো দশটি মাইলফলক
১. ১৮৯৫ — লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের চলচ্চিত্র প্রদর্শন।
২. ১৮৯৬ — ভারতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সূচনা।
৩. ১৮৯৮ — হীরালাল সেনের Royal Bioscope Company।
৪. নির্বাক যুগ — বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাথমিক বিকাশ।
৫. ম্যাডান থিয়েটার্স — প্রাতিষ্ঠানিক চলচ্চিত্র-ব্যবস্থার বিস্তার।
৬. ১৯৩১ — নিউ থিয়েটার্স প্রতিষ্ঠা ও সবাক যুগের সুসংগঠন।
৭. ১৯৩৫ — দেবদাস ও প্লেব্যাকের প্রাথমিক যুগ।
৮. ১৯৫৩ — সাড়ে চুয়াত্তর ও উত্তম–সুচিত্রা যুগের সূচনা।
৯. ১৯৫৫ — পথের পাঁচালী ও বাংলা চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক উত্থান।
১০. পরবর্তী যুগ — সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল, তপন, তরুণ প্রমুখের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রের বহুমুখী বিকাশ।
৭০. উপসংহার
বাঙালির চলচ্চিত্রের ইতিহাস কোনো একক পরিচালক, অভিনেতা বা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এটি একটি সমাজের চোখ খুলে যাওয়ার ইতিহাস।
হীরালাল সেন যখন প্রথম ক্যামেরায় মঞ্চের দৃশ্য, বাস্তব ঘটনা ও সমকালকে ধরে রাখছিলেন, তখন বাঙালি চলচ্চিত্রকে একটি নতুন প্রযুক্তিগত বিস্ময় হিসেবে আবিষ্কার করছিল। ম্যাডান থিয়েটার্স সেই বিস্ময়কে বৃহৎ ব্যবসায়িক কাঠামো দিল। নিউ থিয়েটার্স তাকে শিল্পে উন্নীত করল—সাহিত্য, সংগীত, অভিনয় ও প্রযুক্তিকে একত্র করল। প্রমথেশ বড়ুয়া ও দেবকীকুমার বসু চলচ্চিত্রের অভিনয় ও নন্দনতত্ত্বকে পরিণত করলেন।
পঞ্চাশের দশকে বাংলা সিনেমা যেন একই সঙ্গে দুটি পথ আবিষ্কার করল। একদিকে উত্তম কুমার–সুচিত্রা সেনের জনপ্রিয়তার আলো, অন্যদিকে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনের শিল্প-অনুসন্ধান। একজন বাঙালির প্রেম ও সৌন্দর্যকে, একজন দেশভাগের ক্ষতকে, আর একজন অস্থির নগরসমাজের রাজনৈতিক বিবেককে পর্দায় নিয়ে এলেন।
তপন সিংহ দেখালেন—মানবিকতা ও শিল্পগুণকে জনপ্রিয়তার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়। তরুণ মজুমদার দেখালেন—বাঙালির মধ্যবিত্ত সংসার, প্রেম, পরিবার ও গ্রামীণ জীবনের মধ্যেও অসীম চলচ্চিত্র-সম্ভাবনা রয়েছে। শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্রের ধারাগুলি বাংলা চলচ্চিত্রকে আরও বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিসর দিয়েছে।
তাই বাঙালির চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে শেষ পর্যন্ত বলা যায়—
বায়োস্কোপের বিস্ময় থেকে শিল্পের আত্মসচেতনতা, স্টুডিয়োর স্বর্ণযুগ থেকে তারকাসংস্কৃতি, আর সেখান থেকে মানুষের ইতিহাস ও সমাজের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার এক দীর্ঘ দৃশ্যযাত্রা।
এটি শুধু পর্দায় চলমান ছবির ইতিহাস নয়;
এটি বাঙালির সমাজ, সাহিত্য, সংগীত, রাজনীতি, প্রেম, মধ্যবিত্ত জীবন, দেশভাগ, স্বপ্ন, সংকট এবং আত্মপরিচয়ের দৃশ্যমান ইতিহাস।
আর সেই কারণেই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হীরালাল সেন থেকে সত্যজিৎ রায়, উত্তম কুমার থেকে ঋত্বিক ঘটক, সুচিত্রা সেন থেকে মৃণাল সেন, তপন সিংহ থেকে তরুণ মজুমদার—প্রত্যেকটি নাম আসলে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক-একটি অধ্যায়।
পাঠ্য-নির্ভরতা
পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের বর্তমান পাঠক্রমে দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমেস্টারের বাংলা বিষয়ে ‘বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস : সংক্ষিপ্ত রূপরেখা’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

