প্রাচীন পুথিচিত্র থেকে আধুনিক শিল্পচেতনা
ভূমিকা
বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে চিত্রকলার একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। বাংলার চিত্রকলার বিবর্তন কোনো সরলরেখায় ঘটেনি; ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা, লোকজ জীবন, ঔপনিবেশিকতার অভিঘাত, জাতীয়তাবাদ, আধুনিকতার অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক শিল্পভাবনার পারস্পরিক সংযোগে এর রূপ ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে।
পালযুগের তালপাতার পুথিচিত্র থেকে শুরু করে বাংলার পট, মুর্শিদাবাদ শৈলী, কোম্পানি শৈলী, কালীঘাটের পট, পাশ্চাত্য অ্যাকাডেমিক শিল্পরীতি এবং নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতির মধ্য দিয়ে বাংলা চিত্রকলা আধুনিকতার দিকে এগিয়েছে। অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, নন্দলাল, রবীন্দ্রনাথ, সুনয়নী দেবী, বিনোদবিহারী, যামিনী রায় ও রামকিঙ্করের হাতে এই শিল্পচেতনা আরও স্বতন্ত্র ও গভীর হয়ে উঠেছে।
এই দীর্ঘ বিবর্তনের ভিতরে তাই শুধু ছবির পরিবর্তন নয়, বাঙালির সমাজ, রুচি, ধর্মবিশ্বাস, জাতীয়তাবোধ এবং আত্মপরিচয়ের পরিবর্তনের ইতিহাসও ধরা পড়ে।
১. পালযুগের চিত্রকলা
বাংলার প্রাচীন চিত্রকলার ইতিহাসে পালযুগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আনুমানিক অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত পালরাজাদের শাসনকালে পূর্বভারত বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধ শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। নালন্দা, বিক্রমশীলা, সোমপুর প্রভৃতি মহাবিহারকে কেন্দ্র করে যে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠেছিল, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল চিত্রকলার চর্চা।
এই যুগের চিত্রকলার প্রধান নিদর্শন পাওয়া যায় তালপাতায় লেখা পুথির অলংকরণে। ক্ষুদ্র আকারের এই পুথিচিত্রে বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব, দেবদেবী ও বোধিসত্ত্বের বিভিন্ন রূপ অঙ্কিত হয়েছে।
পালচিত্রের বৈশিষ্ট্য
পালযুগের পুথিচিত্রে সাধারণত দেখা যায়—
- সূক্ষ্ম ও দৃঢ় রেখার ব্যবহার;
- ক্ষুদ্র পরিসরে মূর্তি নির্মাণ;
- সংযত অথচ দীপ্ত রঙের প্রয়োগ;
- মুখমণ্ডলে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি;
- অলংকারের সূক্ষ্ম উপস্থাপনা;
- ধর্মীয় প্রতীক ও মূর্তির বিধিবদ্ধ রূপ।
পালচিত্রের সঙ্গে অজন্তার চিত্রকলার ঐতিহ্যের সম্পর্কও শিল্প-ইতিহাসে আলোচিত হয়েছে।
পালচিত্রের বিষয়
পালযুগের চিত্রকলায় প্রধানত দেখা যায়—
বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব, তারা, প্রজ্ঞাপারমিতা এবং বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন দেবদেবী।
পুথির পাতার সীমিত পরিসরের কারণে ছবিগুলির বিন্যাস ছিল সংহত, সংক্ষিপ্ত ও অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত।
২. পাল-পরবর্তী চিত্রধারা
পালরাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে চিত্রকলার এই ঐতিহ্য সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। পুথির অলংকরণ, পটচিত্র এবং পরবর্তী বৈষ্ণব চিত্রধারার মধ্যে পালচিত্রের কিছু বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার লক্ষ করা যায়।
চৈতন্যদেবের যুগে কৃষ্ণলীলা ও বৈষ্ণব বিষয়কে কেন্দ্র করে চিত্রাঙ্কনের প্রচলন ছিল বলেও বৈষ্ণব সাহিত্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
অতএব পালচিত্রকে বাংলার পরবর্তী চিত্রকলার ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। বরং এটি বাংলার পুথিচিত্র ও লোকচিত্রের একটি প্রাচীন ভিত্তি।
৩. পটচিত্র : বাংলার লোকচিত্রের ঐতিহ্য
বাংলার লোকচিত্রের ইতিহাসে পটচিত্র একটি সুদীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ধারা।
‘পট’ বলতে সাধারণভাবে কাপড় বা কাগজের ওপর অঙ্কিত ধারাবাহিক চিত্রকে বোঝায়। পটুয়ারা পট আঁকতেন এবং পট খুলে খুলে তার কাহিনি গান গেয়ে পরিবেশন করতেন।
অতএব পট ছিল একই সঙ্গে—
চিত্র, কাহিনি, সংগীত, অভিনয় ও জনশিক্ষার মাধ্যম।
এই কারণে পটকে বাংলার প্রাচীন দৃশ্য-শ্রাব্য লোকমাধ্যমগুলির অন্যতম বলা যায়।
পটের বিষয়
পটে অঙ্কিত হয়েছে—
- রামায়ণ;
- মহাভারত;
- পুরাণ;
- মনসামঙ্গল;
- চণ্ডীমঙ্গল;
- কৃষ্ণলীলা;
- গাজীর কাহিনি;
- সত্যপীরের কাহিনি;
- সামাজিক ঘটনা;
- ঐতিহাসিক ঘটনা।
পরবর্তী সময়ে সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাও পটের বিষয় হয়েছে।
৪. গাজীর পট ও সত্যপীরের পট
বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল হিন্দু ও মুসলমানের লোকবিশ্বাসের পারস্পরিক সংমিশ্রণ।
এর গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন—
গাজীর পট
সত্যপীরের পট
এই পটগুলিতে বাংলার গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাসের সমন্বিত রূপ প্রকাশ পেয়েছে।
৫. সুলতানি যুগ ও পারস্যের প্রভাব
বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর চিত্রকলায় নতুন সাংস্কৃতিক প্রভাব প্রবেশ করে। রাজদরবার ও পাণ্ডুলিপির অলংকরণে পারস্যের সাফাভি চিত্ররীতির প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।
এই সময়ে চিত্রকলার বিষয় ও পৃষ্ঠপোষকতায় পরিবর্তন ঘটে। ইসলামি-ফারসি নন্দনতত্ত্ব বাংলার বিদ্যমান শিল্পধারার সঙ্গে যুক্ত হয়।
তবে এই দরবারি প্রভাবের পাশাপাশি বাংলার নিজস্ব পট ও লোকচিত্রের ধারাও অব্যাহত ছিল।
৬. মুর্শিদাবাদ চিত্রশৈলী
বাংলার চিত্রকলার ইতিহাসে অষ্টাদশ শতক একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই সময়ে মুর্শিদাবাদ বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং সেখানে একটি স্বতন্ত্র দরবারি চিত্রশৈলীর বিকাশ ঘটে।
বিশেষত আলিবর্দি খানের আমলে মুর্শিদাবাদ চিত্ররীতির স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মুর্শিদাবাদ শৈলীর উৎস
এই শৈলীতে প্রধানত তিনটি শিল্পপ্রবাহের সমন্বয় দেখা যায়—
মুঘল চিত্ররীতি + রাজপুত চিত্ররীতি + বাংলার দেশজ পটচিত্র।
মুঘল দরবারের পৃষ্ঠপোষকতা দুর্বল হওয়ার পর বহু শিল্পী বিভিন্ন প্রাদেশিক দরবারে আশ্রয় নেন। তাঁদের একটি অংশ মুর্শিদাবাদে এসে স্থানীয় পরিবেশ ও রুচির সঙ্গে মুঘল শিল্পরীতিকে মিলিয়ে নতুন শিল্পভাষা নির্মাণ করেন।
বৈশিষ্ট্য
মুর্শিদাবাদ চিত্রে দেখা যায়—
- সূক্ষ্ম রেখা;
- মৃদু ও শীতল বর্ণ;
- মানবমূর্তির সূক্ষ্ম রূপায়ণ;
- পোশাক ও অলংকারের নিখুঁত বিবরণ;
- দরবারি পরিবেশ;
- প্রকৃতি ও স্থাপত্যের উপস্থাপনা;
- শিকার ও সামাজিক জীবনের দৃশ্য।
বিষয়
- নবাবের দরবার;
- শিকার;
- যুদ্ধ;
- সংগীত;
- নৃত্য;
- নারী-পুরুষের সামাজিক জীবন;
- রাগমালা;
- স্থাপত্য;
- প্রকৃতি।
মুর্শিদাবাদ শৈলী তাই বাংলার চিত্রকলায় দরবারি শিল্প ও দেশজ শিল্পরীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়।
৭. কোম্পানি শৈলী
১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের পর বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ দ্রুত বদলে যায়। মুর্শিদাবাদের নবাবি পৃষ্ঠপোষকতা ক্রমশ দুর্বল হয় এবং কলকাতা ব্রিটিশ শাসনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার চিত্রকলায় নতুন একটি ধারা দেখা দেয়—
কোম্পানি শৈলী বা Company Painting।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ও ইউরোপীয় পৃষ্ঠপোষকেরা ভারতীয় মানুষ, পোশাক, পেশা, উদ্ভিদ, প্রাণী, স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি সংগ্রহে আগ্রহী ছিলেন।
স্থানীয় শিল্পীরা তাঁদের জন্য এই ধরনের ছবি আঁকতে শুরু করেন।
কোম্পানি শৈলীর বৈশিষ্ট্য
- বাস্তবধর্মী অঙ্কন;
- পর্যবেক্ষণনির্ভর চিত্র;
- ইউরোপীয় পার্সপেক্টিভ;
- আলো-ছায়ার ব্যবহার;
- প্রকৃতি ও স্থাপত্যের বিশদ উপস্থাপনা;
- উদ্ভিদ ও প্রাণীর নিখুঁত অঙ্কন;
- মানুষের পোশাক ও পেশার পরিচয়;
- স্বচ্ছ জলরঙের ব্যবহার।
অর্থাৎ—
দেশীয় শিল্পঐতিহ্য ও ইউরোপীয় বাস্তবতাবাদের সংমিশ্রণেই কোম্পানি শৈলীর বিকাশ।
উল্লেখযোগ্য শিল্পী
এই ধারার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- পীরবক্স;
- শেখ জয়নুদ্দীন;
- শেখ মুহম্মদ আমীর।
বিশেষত শেখ মুহম্মদ আমীর জীবজন্তুর চিত্রাঙ্কনে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।
৮. কোম্পানি শৈলীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব
কোম্পানি চিত্রকে কেবল পাশ্চাত্য অনুকরণ বলে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পূর্ণ বোঝা যায় না।
এখানে একদিকে ছিল—
ঔপনিবেশিক পৃষ্ঠপোষকতা,
অন্যদিকে—
দেশীয় শিল্পীর ঐতিহ্য ও দক্ষতা,
আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল—
ইউরোপীয় বাস্তবতাবাদ ও পর্যবেক্ষণশক্তি।
এই মিলনের ফলে ভারতীয় শিল্পীরা নতুন ধরনের বিষয় ও কৌশলের সঙ্গে পরিচিত হন।
৯. কালীঘাটের পট
উনিশ শতকে কলকাতার কালীঘাট মন্দিরকে কেন্দ্র করে পটচিত্রের এক নতুন নগরধারা গড়ে ওঠে।
গ্রামবাংলার পট যখন কলকাতার নাগরিক পরিবেশে প্রবেশ করল, তখন তার বিষয়বস্তুও পরিবর্তিত হল।
প্রথমদিকে কালীঘাটের পটে ছিল—
- কালী;
- শিব;
- দুর্গা;
- লক্ষ্মী;
- সরস্বতী;
- কৃষ্ণ।
পরবর্তীকালে শিল্পীরা সমকালীন নাগরিক সমাজকে তাঁদের ছবির বিষয় করে তুললেন।
১০. কালীঘাটের পট : সমাজের আয়না
কালীঘাটের পটে উঠে আসে—
- বাবুসমাজ;
- বাঈজী;
- সন্ন্যাসী;
- গৃহবধূ;
- সাহেব;
- ভণ্ড ধর্মগুরু;
- নাগরিক মধ্যবিত্ত;
- দাম্পত্যজীবন;
- সামাজিক ভণ্ডামি।
মোহন্ত-এলোকেশী এই ধারার অন্যতম বিখ্যাত বিষয়।
ফলে কালীঘাটের পট শুধু ধর্মীয় চিত্র নয়; উনিশ শতকের কলকাতার সামাজিক ব্যঙ্গ ও নাগরিক জীবনের দৃশ্যমান দলিল।
শিল্পরীতি
কালীঘাট পটে—
- শক্তিশালী কালো রেখা;
- দ্রুত তুলির টান;
- সমতল রঙ;
- সরলীকৃত অবয়ব;
- অপ্রয়োজনীয় বিবরণের বর্জন;
- গতিশীল ভঙ্গি
বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।
১১. পাশ্চাত্য অ্যাকাডেমিক শিল্পরীতি
ঔপনিবেশিক যুগে ভারতে পাশ্চাত্য শিল্পশিক্ষার প্রসার ঘটে। ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিক শিল্পরীতিতে গুরুত্ব পায়—
- বাস্তবানুগ মানবদেহ;
- শারীরিক গঠন;
- পার্সপেক্টিভ;
- আলো-ছায়া;
- ত্রিমাত্রিকতার অনুভূতি;
- তেলরঙ।
কলকাতায় Government School of Art-এর মতো প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু এই পাশ্চাত্য অনুকরণের মধ্যেই একটি প্রশ্ন ক্রমশ প্রবল হয়ে ওঠে—
ভারতীয় শিল্পের নিজস্ব পরিচয় কোথায়?
এই প্রশ্ন থেকেই নব্যবঙ্গীয় শিল্প-আন্দোলনের জন্ম।
১২. নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতি
উনিশ শতকের শেষভাগে পাশ্চাত্য অ্যাকাডেমিক রীতির আধিপত্যের বিরুদ্ধে ভারতীয় শিল্পঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কারের যে আন্দোলন শুরু হয়, তার প্রধান মুখ ছিলেন—
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এই শিল্পধারা পরিচিত হয়—
নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতি বা Bengal School
নামে।
১৩. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৮৭১–১৯৫১
অবনীন্দ্রনাথ বাংলা তথা আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী শিল্পী।
তিনি ভারতীয় শিল্পের নিজস্ব আত্মপরিচয় পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেন। মুঘল ও রাজপুত ক্ষুদ্রচিত্র, অজন্তা, ভারতীয় পুরাণ, বৈষ্ণব ঐতিহ্য এবং জাপানি শিল্পরীতি তাঁর শিল্পচিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
জাপানি শিল্পী ওকাকুরা কাকুজো ও ইয়োকোয়ামা তাইকান-এর প্রভাব তাঁর শিল্পজীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
১৪. অবনীন্দ্রনাথের ‘ওয়াশ’ পদ্ধতি
অবনীন্দ্রনাথের শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—
ওয়াশ টেকনিক।
পাতলা জলরঙের স্তর বারবার প্রয়োগ ও ধৌত করে তিনি রঙের কোমলতা, স্বচ্ছতা ও আবছায়া সৃষ্টি করতেন।
তাঁর চিত্রে তাই দেখা যায়—
কোমল বর্ণ + সূক্ষ্ম রেখা + কাব্যিক আবহ + স্বপ্নময়তা।
১৫. অবনীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য চিত্র
- ভারতমাতা
- শাহজাহানের অন্তিমশয্যা
- কচ ও দেবযানী
- কৃষ্ণলীলা
- শ্বেত অভিসারিকা
- অশোকের রানী
- দেবদাসী
ভারতমাতা
‘ভারতমাতা’ অবনীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রতীকী চিত্র।
একজন শান্ত, সংযত, সন্ন্যাসিনীর মতো মাতৃমূর্তির মাধ্যমে দেশকে কল্পনা করা হয়েছে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী শিল্পচেতনার ইতিহাসে এই ছবির গুরুত্ব বিশেষ।
১৬. ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট
১৯০৭ সালে গড়ে ওঠে—
Indian Society of Oriental Art।
ভারতীয় শিল্পের পুনর্জাগরণ, প্রদর্শনী, শিল্পচর্চা ও প্রাচ্য শিল্পের প্রচারে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অবনীন্দ্রনাথ ও তাঁর সহযোগীদের শিল্পচর্চার সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
১৭. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৮৬৭–১৯৩৮
গগনেন্দ্রনাথ ছিলেন চিত্রশিল্পী, ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী এবং আধুনিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষক।
প্রথমদিকে জাপানি চিত্ররীতির প্রভাব গ্রহণ করলেও পরবর্তীকালে তিনি পাশ্চাত্য আধুনিক শিল্পের বিভিন্ন প্রবণতার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।
১৭.১ গগনেন্দ্রনাথের ব্যঙ্গচিত্র
তাঁর ব্যঙ্গচিত্রে উঠে এসেছে—
- বাবুসমাজ;
- সামাজিক ভণ্ডামি;
- ঔপনিবেশিক মানসিকতা;
- অনুকরণপ্রবণ শিক্ষিত সমাজ;
- সামাজিক অসংগতি।
তাঁর ব্যঙ্গচিত্র তাই একই সঙ্গে শিল্প ও সামাজিক সমালোচনা।
১৭.২ গগনেন্দ্রনাথ ও কিউবিজম
পরবর্তী পর্যায়ে গগনেন্দ্রনাথ কিউবিস্ট প্রবণতা গ্রহণ করেন।
এর ফলে বাংলা চিত্রকলায় ভারতীয় ঐতিহ্য থেকে পাশ্চাত্য আধুনিকতার দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে ওঠেন।
১৮. নন্দলাল বসু
১৮৮২–১৯৬৬
অবনীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিষ্য নন্দলাল বসু।
তাঁর পরিচিতি—
শিল্পাচার্য।
তাঁর শিল্পে ভারতীয় ঐতিহ্য, লোকশিল্প, প্রকৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন একত্রিত হয়েছে।
১৯. নন্দলালের উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম
- সতী
- পার্থসারথি
- হলকর্ষণ
- রাঙামাটির পথ
- সহজপাঠ-এর অলংকরণ
প্রভৃতি।
২০. নন্দলাল ও শান্তিনিকেতন
বিশ্বভারতীর কলাভবন-কে আধুনিক ভারতীয় শিল্পশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে নন্দলাল বসুর ভূমিকা অসামান্য।
তাঁর শিল্পভাবনার মূল ভিত্তি ছিল—
প্রকৃতি + দেশজ শিল্প + ভারতীয় ঐতিহ্য + সৃজনশীল স্বাধীনতা।
২১. ভারতীয় সংবিধানের অলংকরণ
ভারতের সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপির অলংকরণের সঙ্গে নন্দলাল বসু ও তাঁর সহযোগীদের নাম বিশেষভাবে যুক্ত।
ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিভিন্ন পর্যায় সেখানে চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে।
২২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : চিত্রশিল্পী
রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার বিশেষত্ব হল—
তিনি প্রথাগত অর্থে স্বশিক্ষিত শিল্পী।
পাণ্ডুলিপির কাটাকুটি, রেখা ও আকস্মিক আকার থেকেই তাঁর চিত্রচর্চার সূত্রপাত।
সাহিত্যিক জীবনের পরিণত পর্যায়ে তাঁর চিত্রসত্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।
২৩. রবীন্দ্রনাথের চিত্রশৈলী
রবীন্দ্রনাথ কোনো একটি প্রচলিত শিল্পরীতির অনুসরণ করেননি।
তাঁর ছবিতে দেখা যায়—
- কল্পিত মুখ;
- মুখোশসদৃশ অবয়ব;
- অদ্ভুত প্রাণী;
- স্বাধীন রেখা;
- গাঢ় রঙ;
- বিমূর্ততার প্রবণতা;
- স্বতঃস্ফূর্ত রূপসৃষ্টি।
তাঁর চিত্রকলায় সাহিত্যিক কল্পনা ও দৃশ্যমান রূপের এক অভিনব সমন্বয় ঘটেছে।
২৪. সুনয়নী দেবী
জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের চিত্রকলার ইতিহাসে সুনয়নী দেবী একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়।
তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা না নিয়েও নিজস্ব চিত্রভাষা নির্মাণ করেন।
তাঁর শিল্পে—
- লোকচিত্র;
- পুরাণ;
- ধর্মীয় অনুভূতি;
- সরল রেখা;
- সমতল রঙ
বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।
উল্লেখযোগ্য চিত্র
- মা যশোদা
- রাধা
- কচ ও দেবযানী
- অহল্যা হল পাষাণী
- বৌদ্ধভিক্ষু
- শেষ নিশ্বাস
২৫. বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়
শান্তিনিকেতনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী—
বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়।
তিনি নন্দলাল বসুর ছাত্র।
তাঁর শিল্পে—
- রেখা;
- স্থানবিন্যাস;
- প্রকৃতি;
- মানুষ;
- ইতিহাস;
- পরিবেশ
বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
শান্তিনিকেতনের দেওয়ালচিত্র তাঁর শিল্পজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
দৃষ্টিশক্তির গুরুতর অবনতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর শিল্পসাধনা অব্যাহত রাখেন।
২৬. যামিনী রায়
১৮৮৭–১৯৭২
আধুনিক বাংলা চিত্রকলায় যামিনী রায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন।
প্রথম জীবনে তিনি পাশ্চাত্য অ্যাকাডেমিক রীতিতে ছবি আঁকলেও পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ নতুন পথ গ্রহণ করেন—
বাংলার লোকশিল্প ও পটচিত্রের দিকে প্রত্যাবর্তন।
২৭. যামিনী রায় ও লোকশিল্প
যামিনী রায় বাংলার পটুয়া ও কালীঘাটের পট থেকে গভীরভাবে প্রভাবিত হন।
তবে তিনি পটের অনুকরণ করেননি; বরং লোকশিল্পের রেখা, রঙ ও সরলীকরণকে আধুনিক চিত্রকলার ভাষায় রূপান্তরিত করেন।
২৮. যামিনী রায়ের শিল্পরীতি
তাঁর ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য—
- দৃঢ় কালো রেখা;
- সমতল রঙ;
- সরলীকৃত অবয়ব;
- ছন্দময় রেখা;
- দেশীয় রঙ;
- লোকশিল্পের প্রভাব।
তিনি খড়িমাটি, ভুসোকালি ও উদ্ভিদজাত রঙের মতো দেশীয় উপকরণ ব্যবহারে আগ্রহী ছিলেন।
উল্লেখযোগ্য চিত্র
- সাঁওতাল জননী ও শিশু
- মাদলবাদনরত সাঁওতাল
- নৃত্যরত সাঁওতাল মা ও শিশু
- রাধাকৃষ্ণ
- যিশু
তিনি লাভ করেন—
পদ্মভূষণ — ১৯৫৪
ললিতকলা আকাদেমির ফেলোশিপ — ১৯৫৫।
২৯. রামকিঙ্কর বেইজ
১৯০৬–১৯৮০
রামকিঙ্কর বেইজ আধুনিক ভারতীয় শিল্পের এক মৌলিক প্রতিভা।
তিনি ছিলেন—
চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর।
তাঁর শিল্পে সাধারণ মানুষ, শ্রম, প্রকৃতি ও জীবনশক্তি এক নতুন আধুনিক রূপ লাভ করেছে।
৩০. রামকিঙ্করের চিত্রকলা
উল্লেখযোগ্য চিত্র—
- কুকুর-সহ রমণী
- পিকনিক
- ঝড়ের পরে
- বিনোদিনী
৩১. রামকিঙ্করের ভাস্কর্য
আধুনিক ভারতীয় ভাস্কর্যের ইতিহাসে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ—
- সাঁওতাল পরিবার
- সুজাতা
- হাটের পথে
বিশেষত ‘সাঁওতাল পরিবার’ আধুনিক ভারতীয় ভাস্কর্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
তাঁর শিল্পে সাঁওতাল জীবন, শ্রম ও প্রকৃতি বিশেষ তাৎপর্য লাভ করেছে।
৩২. রামকিঙ্করের শিল্পের বৈশিষ্ট্য
তাঁর শিল্পে—
গতি + শ্রম + শরীর + প্রকৃতি + সাধারণ মানুষ
একটি বৃহত্তর আধুনিক নন্দনতত্ত্বে রূপান্তরিত হয়েছে।
তিনি প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণার পরিবর্তে জীবনের শক্তি ও বাস্তবতাকে শিল্পের কেন্দ্রে এনেছেন।
তিনি লাভ করেন—
পদ্মভূষণ — ১৯৭০।
৩৩. বাঙালির চিত্রকলার বিবর্তন : ধারাবাহিক রেখাচিত্র
পালযুগের পুথিচিত্র
↓
পাল-পরবর্তী পুথিচিত্র ও ধর্মীয় চিত্রধারা
↓
লোকপট
↓
সুলতানি ও পারস্যের প্রভাব
↓
মুর্শিদাবাদ চিত্রশৈলী
↓
কোম্পানি শৈলী
↓
কালীঘাটের পট
↓
পাশ্চাত্য অ্যাকাডেমিক শিল্পরীতি
↓
নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতি
↓
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
↓
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
↓
নন্দলাল বসু
↓
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
↓
সুনয়নী দেবী
↓
শান্তিনিকেতন ও কলাভবন
↓
বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়
↓
যামিনী রায়
↓
রামকিঙ্কর বেইজ
↓
আধুনিক ও সমকালীন শিল্পচেতনা।
৩৪. গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী ও তাঁদের অবদান
| শিল্পী / ধারা | প্রধান অবদান |
|---|---|
| পালযুগ | পুথিচিত্র |
| পটুয়া | লোকপট |
| মুর্শিদাবাদ শৈলী | মুঘল, রাজপুত ও দেশজ শিল্পের সমন্বয় |
| কোম্পানি শৈলী | ভারতীয় ও ইউরোপীয় শিল্পরীতির সংমিশ্রণ |
| কালীঘাট পট | নাগরিক জীবন ও সামাজিক ব্যঙ্গ |
| অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর | নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতি |
| গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর | ব্যঙ্গচিত্র ও আধুনিক শিল্প |
| নন্দলাল বসু | ভারতীয় শিল্পশিক্ষা ও শান্তিনিকেতন |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | স্বশিক্ষিত আধুনিক চিত্রভাষা |
| সুনয়নী দেবী | স্বশিক্ষিত লোকায়ত শিল্প |
| বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় | শান্তিনিকেতনের দেওয়ালচিত্র ও আধুনিকতা |
| যামিনী রায় | লোকশিল্প-নির্ভর আধুনিকতা |
| রামকিঙ্কর বেইজ | আধুনিক চিত্রকলা ও ভাস্কর্য |
৩৫. গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম : একনজরে
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভারতমাতা, শাহজাহানের অন্তিমশয্যা, কচ ও দেবযানী, কৃষ্ণলীলা, শ্বেত অভিসারিকা, অশোকের রানী।
নন্দলাল বসু
সতী, পার্থসারথি, হলকর্ষণ, রাঙামাটির পথ।
সুনয়নী দেবী
মা যশোদা, রাধা, কচ ও দেবযানী, অহল্যা হল পাষাণী, বৌদ্ধভিক্ষু।
যামিনী রায়
সাঁওতাল জননী ও শিশু, মাদলবাদনরত সাঁওতাল, নৃত্যরত সাঁওতাল মা ও শিশু, রাধাকৃষ্ণ, যিশু।
রামকিঙ্কর বেইজ
সাঁওতাল পরিবার, সুজাতা, হাটের পথে, কুকুর-সহ রমণী, পিকনিক, ঝড়ের পরে, বিনোদিনী।
৩৬. পরীক্ষার জন্য অবশ্যই মনে রাখবে
বাংলার প্রাচীন চিত্রকলার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন — পালযুগের পুথিচিত্র।
পালযুগের পুথিচিত্রের প্রধান মাধ্যম — তালপাতা।
পালচিত্রের প্রধান বিষয় — বৌদ্ধ ধর্ম ও দেবদেবী।
পালচিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাচীন শিল্পধারা — অজন্তা।
লোকচিত্রের প্রধান শিল্পী — পটুয়া।
গাজীর পট — বাংলার লোকধর্মীয় চিত্রধারা।
মুর্শিদাবাদ শৈলী — মুঘল, রাজপুত ও বাংলার দেশজ শিল্পের সমন্বয়।
মুর্শিদাবাদ শৈলীর বিকাশ — অষ্টাদশ শতক।
কোম্পানি শৈলী — ভারতীয় ও ইউরোপীয় শিল্পরীতির সমন্বয়।
কোম্পানি শৈলীর উল্লেখযোগ্য শিল্পী — পীরবক্স, শেখ জয়নুদ্দীন, শেখ মুহম্মদ আমীর।
কালীঘাটের পট — উনিশ শতকের কলকাতাকেন্দ্রিক পটচিত্র।
কালীঘাট পটের বিখ্যাত সামাজিক বিষয় — মোহন্ত-এলোকেশী।
নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতির প্রধান শিল্পী — অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
‘ভারতমাতা’-র শিল্পী — অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
Indian Society of Oriental Art — ১৯০৭।
ব্যঙ্গচিত্রের জন্য বিখ্যাত — গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কিউবিস্ট প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত — গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
‘শিল্পাচার্য’ — নন্দলাল বসু।
‘সহজপাঠ’-এর অলংকরণ — নন্দলাল বসু।
স্বশিক্ষিত চিত্রশিল্পী — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সুনয়নী দেবী।
লোকশিল্প-নির্ভর আধুনিক শিল্পী — যামিনী রায়।
যামিনী রায়ের পদ্মভূষণ — ১৯৫৪।
শান্তিনিকেতনের বিশিষ্ট শিল্পী — বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়।
‘সাঁওতাল পরিবার’-এর শিল্পী — রামকিঙ্কর বেইজ।
রামকিঙ্করের পদ্মভূষণ — ১৯৭০।
উপসংহার
বাঙালির চিত্রকলার ইতিহাস আসলে নিজস্ব শিল্পপরিচয় আবিষ্কারের ইতিহাস।
পালযুগের পুথিচিত্রে যে আধ্যাত্মিক শিল্পচেতনার সূচনা, তা পরবর্তী সময়ে লোকপটের মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবন ও বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সুলতানি ও পারস্যের প্রভাব সেই শিল্পভাষায় নতুন মাত্রা এনেছে। মুর্শিদাবাদে মুঘল, রাজপুত ও দেশজ ঐতিহ্যের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছে স্বতন্ত্র দরবারি চিত্ররীতি। কোম্পানি শৈলী ভারতীয় শিল্পীর সামনে ইউরোপীয় বাস্তবতাবাদের নতুন সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে। আর কালীঘাটের পট সেই ঔপনিবেশিক নগরসমাজকে ব্যঙ্গের তীক্ষ্ণ রেখায় ধরে রেখেছে।
এরপর অবনীন্দ্রনাথ ভারতীয় শিল্পের আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। গগনেন্দ্রনাথ সেই ঐতিহ্যকে আধুনিকতার দিকে নিয়ে গেছেন। নন্দলাল ভারতীয় শিল্পকে প্রকৃতি ও লোকজীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের বাইরে দাঁড়িয়ে এক স্বতন্ত্র আধুনিক শিল্পভাষা নির্মাণ করেছেন। সুনয়নী দেবী লোকায়ত অন্তর্জগতকে চিত্রে রূপ দিয়েছেন। বিনোদবিহারী শিল্পকে পরিবেশ ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। যামিনী রায় বাংলার পট ও লোকশিল্পকে আধুনিকতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। আর রামকিঙ্কর বেইজ বাংলার মাটি, শ্রম ও মানুষকে আধুনিক ভারতীয় শিল্পের এক মহত্তর ভাষায় উন্নীত করেছেন।
সুতরাং—
পালচিত্রের আধ্যাত্মিকতা → পটের লোকজীবন → মুর্শিদাবাদের দরবারি রুচি → কোম্পানি শৈলীর বাস্তবতা → কালীঘাটের সামাজিক ব্যঙ্গ → নব্যবঙ্গীয় আত্মপরিচয় → শান্তিনিকেতনের মানবিকতা → যামিনী রায়ের লোকায়ত আধুনিকতা → রামকিঙ্করের জীবনমুখী আধুনিকতা।
এই সুদীর্ঘ ধারা বাঙালির চিত্রকলাকে কেবল শিল্পের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ রাখেনি; তাকে পরিণত করেছে বাঙালির সমাজ, সংস্কৃতি, রুচি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের এক দৃশ্যমান মানচিত্র রূপে ।

