অধ্যায় : ধ্বনিতত্ত্ব

১. ভূমিকা

সাধারণভাবে বলা যায়, ভাষাবিজ্ঞানের যে অংশে ধ্বনি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকেই ধ্বনিতত্ত্ব বলে। তবে মানুষের বাগ্‌যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনিই ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য। হাসি, কান্না, হাঁচি, নাকডাকা, ভয়ের চিৎকার অথবা বৃষ্টির শব্দ, ঝড়ের আওয়াজ, গাড়ির হর্ন, কুকুরের ডাক ইত্যাদি sound বা শব্দ হলেও ধ্বনি বলে গণ্য নয়।

ধ্বনিতত্ত্ব বর্ণ বা লেখার বিষয় নিয়ে আলোচনা করে না। এর আলোচ্য হল বাগ্‌ধ্বনি, অর্থাৎ মুখের ভাষা বা মুখের কথা। ধ্বনি, শব্দ, পদ, বাক্য ইত্যাদি হল ভাষার এক-একটি স্তর। সবচেয়ে নীচে ধ্বনিস্তর, তার ওপরে রূপস্তর, তার ওপরে পদস্তর, তার ওপরে বাক্যস্তর এবং সর্বোপরি অর্থের স্তর। ভাষার ধ্বনিস্তর নিয়ে আলোচনার নাম ধ্বনিতত্ত্ব

এখানে বাগ্‌ধ্বনি সম্পর্কে তিনটি জরুরি কথা মনে রাখা দরকার—

(১) যদিও ধ্বনিখণ্ডের চেয়ে ধ্বনিপ্রবাহের বাস্তবতা অনেক বেশি, তবুও বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে ব্যাকরণের গণ্ডিতে আমরা খণ্ডধ্বনিকেই গুরুত্ব দেব। খণ্ডধ্বনির নাম বিভাজ্যধ্বনি

(২) ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য একক বাগ্‌ধ্বনি হল ভাষার অর্থহীন ও ক্ষুদ্রতম একক। তবে অর্থহীন হলেও ভাষার মানে তৈরির ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অপরিসীম।

(৩) আমরা ধ্বনি উচ্চারণ করে মুখে যা বলি, তা বাংলা লিপির বর্ণ ব্যবহার করে লিখেও ফেলি। কিন্তু ধ্বনি ও বর্ণের পারস্পরিক সম্পর্ক খুব সরল নয়


২. ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়

ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয় হল একটি নির্দিষ্ট ভাষার বাগ্‌ধ্বনির ব্যবহারিক চরিত্র

ভাষাবিজ্ঞানের দুটি শাখায় বাগ্‌ধ্বনি নিয়ে আলোচনা করা হয়—

১. ধ্বনিবিজ্ঞান (Phonetics)
২. ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology)

ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্বের পার্থক্য

ধ্বনিবিজ্ঞানধ্বনিতত্ত্ব
বাগ্‌ধ্বনির বিশ্লেষণ করেএকটি নির্দিষ্ট ভাষায় ধ্বনির ব্যবহার বিশ্লেষণ করে
উচ্চারণগত দিক আলোচনা করেব্যবহারিক চরিত্র আলোচনা করে
শ্রুতিগত দিক আলোচনা করেধ্বনির পারস্পরিক সম্পর্ক আলোচনা করে
ধ্বনিতরঙ্গগত দিক আলোচনা করেধ্বনির অবস্থান ও সমাবেশ আলোচনা করে

ধ্বনিবিজ্ঞান ধ্বনি বিশ্লেষণ করে—
উচ্চারণগত, ধ্বনিতরঙ্গগত ও শ্রুতিগত দিক থেকে।

ধ্বনিতত্ত্ব ধ্বনি বিশ্লেষণ করে—
নির্দিষ্ট ভাষায় ধ্বনির ব্যবহারিক চরিত্রের দিক থেকে।


৩. বাগ্‌ধ্বনির শ্রেণিবিভাগ

বাগ্‌ধ্বনি প্রধানত দুই ধরনের—

ক) বিভাজ্যধ্বনি

এর দুটি মূল ভাগ—

  • স্বরধ্বনি
  • ব্যঞ্জনধ্বনি

খ) অবিভাজ্যধ্বনি

এর মধ্যে পড়ে—

  • দৈর্ঘ্য
  • শ্বাসাঘাত
  • যতি
  • সুরতরঙ্গ

৪. স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি

মৌলিক স্বরধ্বনি

আন্তর্জাতিকভাবে ভাষাবিজ্ঞানীদের দ্বারা স্বীকৃত মৌলিক স্বরধ্বনি (Cardinal Vowels) হল বিভিন্ন ভাষার স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিহ্বার অবস্থান ও ওষ্ঠের আকৃতি বোঝানোর মানদণ্ড। অধ্যাপক ড্যানিয়েল জোন্স মৌলিক স্বরধ্বনিকে ‘Scales of Cardinal Vowels’ বলেছেন।

মৌলিক স্বরধ্বনির সংজ্ঞা

যে স্বরধ্বনিগুলিকে বিশ্লেষণ করা যায় না, তাদের মৌলিক স্বরধ্বনি বলে।

বাংলায় মৌলিক স্বরধ্বনি ৭টি

যথা— অ, আ, ই, উ, এ, ও, অ্যা।


৫. মৌলিক স্বরধ্বনির গুণগত শ্রেণিবিভাগ

মৌলিক স্বরধ্বনির গুণগত শ্রেণিবিভাগের প্রধান মানদণ্ড তিনটি—

ক) জিহ্বার অবস্থান
খ) মুখবিবরের শূন্যতার পরিমাপ
গ) ওষ্ঠের আকৃতি


ক) জিহ্বার অবস্থান অনুসারে

১. সম্মুখ স্বরধ্বনি

যে স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিহ্বা সামনের দিকে, অর্থাৎ ওষ্ঠের দিকে এগিয়ে আসে, তাকে সম্মুখ স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : ই, এ, অ্যা।

২. পশ্চাৎ স্বরধ্বনি

যে স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিহ্বা পিছনের দিকে, অর্থাৎ গলার দিকে গুটিয়ে যায়, তাকে পশ্চাৎ স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : অ, ও, উ।

৩. কেন্দ্রীয় স্বরধ্বনি

সম্মুখ স্বর ও পশ্চাৎ স্বরের মাঝামাঝি অবস্থানে জিহ্বাকে রেখে যে স্বরধ্বনি উচ্চারণ করা হয়, তাকে কেন্দ্রীয় স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : আ।

৪. উচ্চ স্বরধ্বনি

যে স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিহ্বা মুখবিবরের সর্বোচ্চ স্থানে থাকে, তাকে উচ্চ স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : ই, উ।

৫. উচ্চমধ্য স্বরধ্বনি

জিহ্বা যখন মুখবিবরের সর্বোচ্চ স্থানের তুলনায় সামান্য নীচে অবস্থান করে এবং সেই অবস্থায় যে স্বরধ্বনি সৃষ্টি হয়, তাকে উচ্চমধ্য স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : এ, ও।

৬. নিম্ন স্বরধ্বনি

যে স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিহ্বা মুখবিবরের সর্বনিম্ন স্থানে থাকে, তাকে নিম্ন স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : আ।

৭. নিম্নমধ্য স্বরধ্বনি

জিহ্বা যখন মুখবিবরের সর্বনিম্ন স্থানের সামান্য উপরে অবস্থান করে এবং সেই সময় যে স্বরধ্বনি উচ্চারণ করা হয়, তাকে নিম্নমধ্য স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : অ, অ্যা।


৬. মুখবিবরের শূন্যতার পরিমাপ অনুসারে স্বরধ্বনি

মুখবিবরের ভিতরের শূন্যস্থানের পরিমাপ অনুসারে স্বরধ্বনিকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

১. সংবৃত স্বরধ্বনি

যে স্বরধ্বনি উচ্চারণ করার সময় মুখবিবর কম খোলা থাকে, তাকে সংবৃত স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : ই, উ।

২. বিবৃত স্বরধ্বনি

যে স্বরধ্বনি উচ্চারণ করার সময় মুখবিবর সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বা খোলা থাকে, তাকে বিবৃত স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : আ।

৩. অর্ধসংবৃত স্বরধ্বনি

যে স্বরধ্বনি উচ্চারণ করার সময় মুখবিবর খুব বেশি কিংবা কম উন্মুক্ত না হয়ে মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকে, তাকে অর্ধসংবৃত স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : এ, ও।

৪. অর্ধবিবৃত স্বরধ্বনি

যে স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখবিবর সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয় না, তাকে অর্ধবিবৃত স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : অ, অ্যা।


৭. ওষ্ঠের আকৃতি অনুসারে স্বরধ্বনি

ওষ্ঠের আকৃতি অনুসারে স্বরধ্বনিকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—

১. প্রসারিত স্বরধ্বনি

যে স্বরধ্বনি উচ্চারণ করার সময় ওষ্ঠ ও অধর প্রসারিত হয়, তাকে প্রসারিত স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : ই, এ, অ্যা।

২. কুঞ্চিত স্বরধ্বনি

যে স্বরধ্বনি উচ্চারণ করার সময় ওষ্ঠ ও অধর গোল হয়ে কুঞ্চিত আকার ধারণ করে, তাকে কুঞ্চিত স্বরধ্বনি বলে।

উদাহরণ : অ, উ, ও।


৮. ব্যঞ্জনধ্বনি

মান্য বাংলায় ব্যঞ্জনধ্বনির সংখ্যা ৩০টি

স্পর্শধ্বনি

ক থেকে ম পর্যন্ত ২৫টি ধ্বনি স্পর্শধ্বনি।

অল্পপ্রাণ ধ্বনি

বর্গের প্রথম ও তৃতীয় ধ্বনিগুলিকে অল্পপ্রাণ ধ্বনি বলে।

যথা— ক্, গ্, চ্, জ্, ট্, ড্, ত্, দ্, প্, ব্।

মহাপ্রাণ ধ্বনি

বর্গের দ্বিতীয় ও চতুর্থ ধ্বনিগুলিকে মহাপ্রাণ ধ্বনি বলে।

যথা— খ্, ঘ্, ছ্, ঝ্, ঠ্, ঢ্, থ্, ধ্, ফ্, ভ্।

অঘোষ ধ্বনি

বর্গের প্রথম ও দ্বিতীয় ধ্বনিগুলিকে অঘোষ ধ্বনি বলে।

যথা— ক্, খ্, চ্, ছ্, ট্, ঠ্, ত্, থ্, প্, ফ্।

ঘোষ ধ্বনি

বর্গের তৃতীয় ও চতুর্থ ধ্বনিগুলিকে ঘোষ ধ্বনি বলে।

যথা— গ্, ঘ্, জ্, ঝ্, ড্, ঢ্, দ্, ধ্, ব্, ভ্।

নাসিক্য ধ্বনি

প্রত্যেক বর্গের পঞ্চম ধ্বনিগুলিকে নাসিক্য ধ্বনি বলে।

যথা— ঙ, ঞ, ণ, ন্, ম্।

উষ্মধ্বনি

শ, ষ, স, হ—এই চারটি উষ্মধ্বনি।

অন্যান্য ব্যঞ্জনধ্বনি

কম্পিত ধ্বনি — র্
তাড়িত ধ্বনি — ড়, ঢ়
পার্শ্বিক ধ্বনি — ল


৯. অর্ধস্বরধ্বনি

বাংলা উচ্চারণে চারটি অর্ধস্বরধ্বনি আছে। এগুলির জন্য বাংলায় কোনো বর্ণ নির্দিষ্ট নেই।

খই, বউ, আয়, যাও—এই চারটি শব্দ যে যে অসম্পূর্ণ স্বরধ্বনির উচ্চারণে শেষ হয়, সেই চারটি অর্ধস্বর।

তবে বাংলা অর্ধস্বর নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।


১০. ধ্বনিমূল ও সহধ্বনি

ধ্বনিতত্ত্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল—

ধ্বনিমূল এবং সহধ্বনি

ধ্বনিমূল

বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানে উচ্চারণ-বৈচিত্র্যসহ প্রত্যেকটি মূলধ্বনিকে ধ্বনিমূল বলে।

সহধ্বনি

কোনো নির্দিষ্ট ধ্বনির উচ্চারণস্থান তার অবস্থান অনুযায়ী বদলে যায়। প্রতিবেশ অনুযায়ী ধ্বনির উচ্চারণভেদকে সহধ্বনি বলে।

অর্থাৎ প্রতিবেশবিশেষে বাংলা /ল/-এর তিন রকম উচ্চারণ হয়। /ল/-কে বলে ধ্বনিমূল এবং এর তিন রকম উচ্চারণভেদকে বলে সহধ্বনি।

ধ্বনিতত্ত্বের অন্যতম দায়িত্ব হল ভাষায় উচ্চারিত বিভিন্ন ধ্বনির মধ্যে ধ্বনিমূল ও সহধ্বনি শনাক্ত করা। সূক্ষ্মভাবে বলতে হয় কোন্ ধ্বনিটি কোন্ ধ্বনিমূল পরিবারের সহধ্বনি। এই কাজের কয়েকটি পদ্ধতি আছে।


১১. ধ্বনিমূল শণাক্তকরণের পদ্ধতি

ক) ন্যূনতম শব্দজোড়

দুটি ভিন্ন শব্দের মধ্যে উচ্চারণগত ন্যূনতম (একটি মাত্র) পার্থক্য থাকলে সেই শব্দজোড়কে ন্যূনতম শব্দজোড় বলে।

উদাহরণ : ‘আম’ ও ‘জাম’।

ন্যূনতম শব্দজোড়ে উচ্চারিত দুটি ধ্বনি ভাষার দুটি পৃথক ধ্বনিমূল।

উদাহরণ :

  • তালা — খালা
  • নরম — গরম
  • দশক — দমক
  • দরগা — দরজা
  • ঝুল — ঝোল
  • তিল — তেল
  • ভালো — কালো
  • দাম — দান

খ) পরিপূরক অবস্থান

উচ্চারণগতভাবে মিল আছে এমন যে ধ্বনিগুলি নিজেদের নির্দিষ্ট প্রতিবেশে উচ্চারিত হয়, অর্থাৎ একটির জায়গায় অন্যটি উচ্চারিত হয় না এবং পরিপূরক অবস্থানে থাকে, সেই ধ্বনিগুলি কোনো একটি ধ্বনিমূলের সহধ্বনি হিসেবে শনাক্ত হয়।

উদাহরণ : ওপরে উল্লিখিত তিন ধরনের /ল/।

গ) ধ্বনির মুক্ত বৈচিত্র্য

কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় দুটি ধ্বনি পার্থক্যমূলক অবস্থানে রয়েছে, আপাতবিচারে ন্যূনতম শব্দজোড়ের মতো, কিন্তু জোড়ের শব্দ দুটির মধ্যে অর্থের কোনো পার্থক্য নেই।

যেমন, ‘গাঢ়’ শব্দটা কারো উচ্চারণে গাঢ়, আবার কারো উচ্চারণে গাড়। এই তফাতের ওপর প্রতিবেশের কোনো প্রভাব নেই। বরং এটি অভ্যাস বা সামর্থ্য অনুযায়ী যেমন খুশি উচ্চারণ।

এই রকম উচ্চারণভেদকে বলে ধ্বনির মুক্ত বৈচিত্র্য


১২. ধ্বনিমূলের অবস্থান ও সমাবেশ

ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে পড়ে ধ্বনিমূলের অবস্থান ও সমাবেশ

অবস্থান বলতে বোঝায়, একটি ধ্বনিমূল শব্দের কোন্ কোন্ অংশে এবং কোন্ কোন্ ধ্বনি-প্রতিবেশে উচ্চারিত হতে পারে তার খবর।

সমাবেশ বলতে বোঝায়, একটি ধ্বনিমূল আর কোন্ কোন্ ধ্বনিমূলের সঙ্গে একত্রিত হয়ে যুক্তধ্বনি তৈরি করতে পারে তার খবর।

ধ্বনিমূলের অবস্থান

শব্দের নানা অংশ—

  • শব্দ শুরুর মুখটা হল আদ্য
  • শব্দের একেবারে শেষ অংশটা হল অন্ত্য
  • বাকি অংশটুকু মধ্য
  • দুটি স্বরধ্বনির মধ্যবর্তী অংশ হল স্বরমধ্যগত প্রতিবেশ

এ ছাড়াও আছে নির্দিষ্ট ধ্বনির প্রতিবেশ—অর্থাৎ আলোচ্য ধ্বনিমূলটির ঠিক পূর্ববর্তী বা ঠিক পরবর্তী ধ্বনিটি কী অথবা কোন্ কোন্ ধ্বনির পরে বা কোন্ কোন্ ধ্বনির আগে উচ্চারিত হতে পারে।


১৩. ধ্বনির সমাবেশ

বিভিন্ন ধ্বনির সমাবেশের ফলে বিভিন্ন ধরনের যুগ্মধ্বনি তৈরি হয়।

স্বরধ্বনির সঙ্গে অর্ধস্বরের সমাবেশে তৈরি হয় দ্বিস্বরধ্বনি

অর্ধস্বরের জন্য কোনো বর্ণ নির্দিষ্ট নেই।

চারটি দ্বিস্বরধ্বনি হল—

[ওউ], [ওই], [অও], [অউ]।

যেমন— যথাক্রমে নৌ, কই, হয় ও হত শব্দে।

ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশে দুই ধরনের যুগ্মধ্বনি তৈরি হয়—

১. গুচ্ছধ্বনি ২. যুক্তধ্বনি


১৪. গুচ্ছধ্বনি

পাশাপাশি উচ্চারিত দুটি ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশকে গুচ্ছধ্বনি বলে। যাদের মাঝখানে কোনো স্বরধ্বনি নেই।

এই দুই ব্যঞ্জনের মাঝে কোনো স্বরধ্বনি না থাকলেও দলসীমা থাকে। অর্থাৎ দুটি ব্যঞ্জনের প্রথমটি পূর্ববর্তী দলের এবং শেষেরটি পরবর্তী দলের অংশ বলে গণ্য হয়।

বাংলায় দুটি ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশে তৈরি গুচ্ছধ্বনির সংখ্যা ২০০টির বেশি

তিনটি ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশেও গুচ্ছধ্বনি তৈরি হয়। যেমন—অস্ত্র ও যন্ত্র শব্দে। তিনটি ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশে তৈরি গুচ্ছধ্বনির তৃতীয় ব্যঞ্জনটি সদাসর্বদাই [র] এবং বাংলায় এরকম গুচ্ছধ্বনির সংখ্যা ৮টি

চারটি ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশে তৈরি গুচ্ছধ্বনি বাংলায় মাত্র ১টি ক্ষেত্রে দেখা যায়—তা হল ‘সংস্কৃত’ শব্দটি।


১৫. যুক্তধ্বনি

যে ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশগুলি শব্দের আদ্য অবস্থানে বা দলের আদিতে উচ্চারিত হতে পারে, সেগুলিকে যুক্তধ্বনি বলে।

যুক্তধ্বনির সমাবেশ গুচ্ছধ্বনির তুলনায় বেশি পাকাপোক্ত, কারণ এই ধ্বনিগুলির মধ্যে কোনো দলসীমা থাকে না।

দুই ব্যঞ্জন সমাবেশের যুক্তধ্বনিতে হয় প্রথম ব্যঞ্জনটি [স], নয়তো দ্বিতীয় ব্যঞ্জনটি [র] বা [ল] হয়।

বাংলা শব্দে এই রকম যুক্তধ্বনির সংখ্যা ২৮টি

তিন ব্যঞ্জনের সমাবেশে তৈরি যুক্তধ্বনির সংখ্যা ২টিস্ ও স্প; যেমন পাওয়া যায় স্ত্রী, স্পৃহা ইত্যাদি শব্দে।


১৬. অবিভাজ্য ধ্বনি

বিভাজ্য ধ্বনিকে মুখের কথার ধ্বনিপ্রবাহ থেকে কৃত্রিমভাবে হলেও খণ্ড খণ্ড করে বিভাজন করা যায়। যেমন—‘তুমি’ কথাটার উচ্চারণের খণ্ডগুলি হল ত + উ + ম + ই

কিন্তু ভাষায় আরও কিছু ধ্বনি-উপাদান থাকে, যেগুলিকে এই রকম কৃত্রিমভাবেও খণ্ড করা যায় না। কারণ এই উপাদানগুলি কোনো বিভাজ্যধ্বনির অংশ নয়; বরং এগুলি একাধিক ধ্বনিখণ্ড জুড়ে অবস্থান করে। এগুলিকে অবিভাজ্য ধ্বনি বলে।

বাংলাতেও এই রকম কয়েকটি অবিভাজ্য ধ্বনি আছে।

প্রধান অবিভাজ্য ধ্বনি—

শ্বাসাঘাত, দৈর্ঘ্য, যতি ও সুরতরঙ্গ।


১৬.১ শ্বাসাঘাত

শ্বাসাঘাত হল একাধিক দলযুক্ত শব্দের কোনো একটি দলকে অপেক্ষাকৃত বেশি জোর দিয়ে উচ্চারণ করা।

বাংলায় সাধারণত শব্দের প্রথম দলটিতে শ্বাসাঘাতের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। যান্ত্রিক নিরীক্ষাতেও প্রথম দলে শ্বাসাঘাতের উপস্থিতি দেখা যায়।

শ্বাসাঘাতের উপস্থিতি পুরো দল জুড়ে, কোনো নির্দিষ্ট ধ্বনিতে নয়। তাই এটি অবিভাজ্য ধ্বনি।

উদাহরণ : মাখন, আরতি, লোকবল।


১৬.২ দৈর্ঘ্য

দৈর্ঘ্য বলতে সাধারণত বোঝায় দলের উচ্চারণে স্বরধ্বনির দৈর্ঘ্য।

বাংলায় বহুদল শব্দের স্বরধ্বনির তুলনায় একদল শব্দের স্বরধ্বনির দৈর্ঘ্য বেশি। ফলে একদল শব্দের দৈর্ঘ্যও বেশি।

উদাহরণ : ‘আমার’ শব্দের [আ]-এর চেয়ে ‘আম’ শব্দের [আ] বেশি দীর্ঘ।


১৬.৩ যতি

যতি হল দল বা শব্দসীমায় অপেক্ষাকৃত লঘু ছেদ।

উদাহরণ :

‘রহিম একা দশজনকে চ্যালেঞ্জ করেছে।’

‘রহিম একাদশজনকে চ্যালেঞ্জ করেছে।’

প্রথম বাক্যে ‘একা’ শব্দ উচ্চারণের পরে আমরা যতি ব্যবহার করি, কিন্তু দ্বিতীয়টিতে ‘একাদশজনকে’ যতি ছাড়াই উচ্চারণ করি।


১৬.৪ সুরতরঙ্গ

বাক্যে সুরের ওঠাপড়াকে সুরতরঙ্গ বলে।

যেমন—

বিবৃতিবাক্য : মিঠু কাল স্কুলে যাবে।

প্রশ্নবাক্য : মিঠু কাল স্কুলে যাবে?

এই দুটি বাক্যের উচ্চারণে সুরের ওঠাপড়া দু-রকমের। অর্থাৎ এই দুই ধরনের বাক্যে আমরা দু-রকমের সুরতরঙ্গ ব্যবহার করি।


একনজরে : ধ্বনিতত্ত্ব

বিষয়তথ্য
বাংলায় মৌলিক স্বরধ্বনি৭টি
মান্য বাংলায় ব্যঞ্জনধ্বনি৩০টি
স্পর্শধ্বনি২৫টি
অল্পপ্রাণ ধ্বনি১০টি
মহাপ্রাণ ধ্বনি১০টি
অঘোষ ধ্বনি১০টি
ঘোষ ধ্বনি১০টি
নাসিক্য ধ্বনি৫টি
উষ্মধ্বনিশ, ষ, স, হ
অর্ধস্বরধ্বনি৪টি
বিভাজ্যধ্বনিস্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি
অবিভাজ্যধ্বনিদৈর্ঘ্য, শ্বাসাঘাত, যতি, সুরতরঙ্গ
দুই ব্যঞ্জনের গুচ্ছধ্বনি২০০টির বেশি
তিন ব্যঞ্জনের গুচ্ছধ্বনি৮টি
চার ব্যঞ্জনের গুচ্ছধ্বনি১টি
যুক্তধ্বনি২৮টি
‘Phonology’-এর বাংলাধ্বনিতত্ত্ব

স্বরধ্বনির শ্রেণিবিন্যাস : একনজরে

স্বরধ্বনিজিহ্বার অবস্থানমুখবিবরওষ্ঠ
উচ্চ, সম্মুখসংবৃতপ্রসৃত
উচ্চ, পশ্চাৎসংবৃতকুঞ্চিত
উচ্চমধ্য, সম্মুখঅর্ধসংবৃতপ্রসৃত
উচ্চমধ্য, পশ্চাৎঅর্ধসংবৃতকুঞ্চিত
অ্যানিম্নমধ্য, সম্মুখঅর্ধবিবৃতপ্রসৃত
নিম্নমধ্য, পশ্চাৎঅর্ধবিবৃতকুঞ্চিত
নিম্ন, কেন্দ্রীয়বিবৃত

কেন্দ্রীয় স্বরধ্বনি : আ


ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিন্যাস : একনজরে

উচ্চারণস্থান অনুযায়ী

কণ্ঠ্যবর্ণ : ক, খ, গ, ঘ, ঙ
তালব্যবর্ণ : চ, ছ, জ, ঝ, ঞ
মূর্ধন্যবর্ণ : ট, ঠ, ড, ঢ, ণ
দন্ত্যবর্ণ : ত, থ, দ, ধ, ন
ওষ্ঠ্যবর্ণ : প, ফ, ব, ভ, ম

উচ্চারণপ্রকৃতি অনুযায়ী

অল্পপ্রাণ : ক, গ, চ, জ, ট, ড, ত, দ, প, ব

মহাপ্রাণ : খ, ঘ, ছ, ঝ, ঠ, ঢ, থ, ধ, ফ, ভ

অঘোষ : ক, খ, চ, ছ, ট, ঠ, ত, থ, প, ফ

ঘোষ : গ, ঘ, জ, ঝ, ড, ঢ, দ, ধ, ব, ভ

নাসিক্য : ঙ, ঞ, ণ, ন, ম

উষ্ম : শ, ষ, স, হ

কম্পিত : র

পার্শ্বিক : ল

তাড়িত অল্পপ্রাণ : ড়

তাড়িত মহাপ্রাণ : ঢ়

দন্তমূলীয় : স

কণ্ঠনালীয় : হ


গুরুত্বপূর্ণ এককথায় উত্তর

বিভাজ্য ধ্বনির অপর নাম — খণ্ডধ্বনি।
বাগ্‌ধ্বনি — দুই প্রকার।
বাগ্‌ধ্বনির দুই ভাগ — বিভাজ্য ও অবিভাজ্য।
বিভাজ্য ধ্বনির দুই ভাগ — স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি।
অবিভাজ্য ধ্বনির উদাহরণ — দৈর্ঘ্য, শ্বাসাঘাত, যতি, সুরতরঙ্গ।
‘Phonology’-এর বাংলা — ধ্বনিতত্ত্ব।
‘Phonetics’-এর বাংলা — ধ্বনিবিজ্ঞান।
পাশাপাশি উচ্চারিত দুটি ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশ — গুচ্ছধ্বনি।
একদলের অন্তর্গত ব্যঞ্জনসমাবেশ — যুক্তধ্বনি।
ন্যূনতম উচ্চারণ-পার্থক্যযুক্ত শব্দজোড় — ন্যূনতম শব্দজোড়।
ধ্বনির অবস্থানভেদে উচ্চারণের পরিবর্তন — সহধ্বনি।
মূলধ্বনিকে বলা হয় — ধ্বনিমূল।
প্রতিবেশ অনুযায়ী উচ্চারণভেদ — সহধ্বনি।
প্রতিবেশের প্রভাবহীন উচ্চারণভেদ — ধ্বনির মুক্ত বৈচিত্র্য।
বাক্যে সুরের ওঠাপড়া — সুরতরঙ্গ।
দল বা শব্দসীমায় লঘু ছেদ — যতি।
কোনো একটি দলকে বেশি জোর দিয়ে উচ্চারণ — শ্বাসাঘাত।
দলের উচ্চারণে স্বরধ্বনির দৈর্ঘ্য — দৈর্ঘ্য।
স্বরধ্বনি ও অর্ধস্বরের সমাবেশ — দ্বিস্বরধ্বনি।
বাংলায় অর্ধস্বরধ্বনি — ৪টি।
বাংলায় মৌলিক স্বরধ্বনি — ৭টি।
মান্য বাংলায় ব্যঞ্জনধ্বনি — ৩০টি।
স্পর্শধ্বনি — ২৫টি।
চার ব্যঞ্জনের গুচ্ছধ্বনির উদাহরণ — সংস্কৃত।
তিন ব্যঞ্জনের গুচ্ছধ্বনি — ৮টি।
দুই ব্যঞ্জনের গুচ্ছধ্বনি — ২০০টির বেশি।
যুক্তধ্বনির সংখ্যা — ২৮টি।

 
### পরিবেশনে- ড. অনিশ রায়
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top