(১)
মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসকে যদি একটি-মাত্র প্রশ্নে সংকুচিত করা যায়, তবে সেই প্রশ্নটি সম্ভবত এই যে—মানুষ কীভাবে তার অভাবকে সংগঠিত করে? মনে হয়, অর্থনীতির জন্ম এই প্রশ্ন থেকেই। রাষ্ট্রের জন্মও এই প্রশ্ন থেকেই। এমনকি আইন, নৈতিকতা, ব্যক্তিগত সম্পত্তি, বাজারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারণাও বহু-অংশে এই অভাব-সংগঠনের ইতিহাসেরই বিভিন্ন অধ্যায়। মানুষ যখন শিকারী-জীবন থেকে কৃষিনির্ভর সমাজে প্রবেশ করল, তখনই উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সঙ্গে জন্ম নিয়েছিল সম্পত্তি; সম্পত্তির সঙ্গে জন্ম নিয়েছিল মালিকানা; মালিকানার সঙ্গে আসে বিনিময়; আর বিনিময়ের জটিলতাকে সহজ করার জন্য আবির্ভূত হয় অর্থ। অর্থাৎ টাকা মানবসভ্যতার সূচনা নয়, বরং একটি দীর্ঘ সামাজিক বিবর্তনেরই ফল।
এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ইলন মাস্কের বক্তব্য—‘২০৩৬ সালের মধ্যে পৃথিবীতে টাকার প্রয়োজন প্রায় শেষ হয়ে যাবে’—নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। কিন্তু এ কি নিছক প্রযুক্তিপ্রেমী একজন উদ্যোক্তার কল্পনা? নাকি মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন? আমার মনে হয়, মাস্কের বক্তব্যকে কেবল প্রযুক্তিগত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখলে তার তাৎপর্য বোঝা যাবে না। তা অর্থনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রতত্ত্ব এবং সভ্যতার ইতিহাসকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
প্রথমেই প্রশ্ন জাগে— টাকা আসলে কী? আমরা সাধারণত টাকাকে কাগজের নোট, ধাতব মুদ্রা কিংবা ব্যাংক-অ্যাকাউন্টের ডিজিটাল সংখ্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিতে টাকা কেবল বিনিময়ের মাধ্যম নয়। টাকা মূল্য পরিমাপের একক। সম্পদ সঞ্চয়ের উপায়। এবং ভবিষ্যতের প্রতি সামাজিক আস্থার প্রতীক। আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, টাকা আসলে বিশাল সম্মিলিত সামাজিক বিশ্বাস। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন একে অপরকে না-চিনেও একই মুদ্রার ওপর আস্থা রেখে লেনদেন করে। সেই অর্থে টাকা বস্তু নয়; একটি সুবৃহৎ সামাজিক প্রতিষ্ঠান।
মোটা দাগের অল্প বোঝায় বলতে পারি, ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ বাজারকে ‘মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতার সম্প্রসারণ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, ব্যক্তি যখন নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ করে, তখন একটি ‘অদৃশ্য হাত’ (Invisible Hand) সেই ব্যক্তিগত স্বার্থকে সামাজিক কল্যাণে রূপান্তরিত করতে পারে। এই ব্যাখ্যায়, অর্থ হলো বাজারকে কার্যকর রাখার একটি যৌক্তিক মাধ্যম।
কিন্তু কার্ল মার্ক্স সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, অর্থ কেবল কাগজ বা ধাতু নয়; অর্থ সামাজিক ক্ষমতার বিমূর্ত রূপ। অর্থ এমন এক শক্তি, যা মানুষের শ্রমকে পণ্যে রূপান্তরিত করে, আবার মানুষকেও বাজারের এক বিনিময়যোগ্য সত্তায় পরিণত করে। মার্ক্সের বিশ্লেষণে অর্থ হলো ক্ষমতার ভাষা, শ্রেণি-সম্পর্কের মাধ্যম এবং উৎপাদনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার। তাই প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, যদি উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা অল্প কয়েকজন ব্যক্তি বা কর্পোরেশনের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে অর্থের বিলোপ নয়; বরং অর্থের নতুন ক্ষমতাযোগ্য রূপের জন্ম হবে।
এখানেই ইলন মাস্কের বক্তব্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়ে ফেলে। তাঁর ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে ‘Post-Scarcity Economy’—অর্থাৎ এমন এক অর্থনীতি, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন এবং হিউম্যানয়েড রোবটের কারণে উৎপাদন এত বিপুল হবে যে অভাবের ধারণাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তখন নাকি খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় অধিকাংশ জিনিস এত সহজলভ্য হবে যে, অর্থের আর প্রয়োজনই থাকবে না।
ধারণাটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু এ-ও মনে রাখা জরুরি যে, মানবসভ্যতার ইতিহাসে ‘অভাবহীন পৃথিবী’-র স্বপ্ন নতুন নয়। প্রাচীন গ্রিকদের ‘গোল্ডেন এজ’, টমাস মোরের ইউটোপিয়া, সমাজতান্ত্রিক কল্পরাষ্ট্র, এমনকি ধর্মীয় স্বর্গের ধারণাও মূলত অভাবহীন জীবনেরই স্বপ্ন। ইলন মাস্কের বক্তব্য সেই প্রাচীন ইউটোপিয়ারই প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সংস্করণ।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন উঠে আসে। অর্থনীতির জন্ম কি কেবল উৎপাদনের ঘাটতি থেকে? নাকি মানুষের অস্তিত্বের মধ্যেই অপ্রতুলতা (Scarcity) নিহিত?
সম্ভবত অর্থনীতির প্রায় সব শাখাই একমত যে, অপ্রতুলতা মানবজীবনের মৌলিক বাস্তবতা। পৃথিবীর জমি সীমিত, বিশুদ্ধ পানীয় জল সীমিত, বিরল খনিজ সীমিত, পরিবেশের ধারণক্ষমতা সীমিত, এমনকি মানুষের সময়ও সীমিত। প্রযুক্তি উৎপাদন বাড়াতে পারে, উৎপাদনের খরচ কমাতে পারে, কিন্তু এই মৌলিক সীমাবদ্ধতাগুলি সম্পূর্ণ বিলোপ করতে পারে না। বরং প্রযুক্তি নিজেই নতুন ধরনের অপ্রতুলতার জন্ম দেয়— ডেটা, কম্পিউটিং ক্ষমতা, বিরল সেমিকন্ডাক্টর, শক্তি, অ্যালগরিদম এবং তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আজকের পৃথিবীতে নতুন ক্ষমতার সম্পদে পরিণত হয়েছে।
অতএব, প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, ভবিষ্যতে কত বেশি উৎপাদন হবে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—সেই উৎপাদনের মালিক কে হবে?
(২)
আমরা দেখতে চাইলাম, অর্থ কেবল বিনিময়ের মাধ্যম নয়; সামাজিক আস্থা, ক্ষমতা এবং সভ্যতার সংগঠনের অন্যতম ভিত্তি-ও। এখন প্রশ্ন হলো— যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং হিউম্যানয়েড রোবট ভবিষ্যতে মানুষের অধিকাংশ শ্রমের বিকল্প হয়ে ওঠে, তাহলে সেই নতুন সমাজে ক্ষমতার কাঠামো কেমন হবে?
অ্যারিস্টটল মানুষকে বলেছিলেন ‘Political Animal’—রাজনৈতিক প্রাণি। এই সংজ্ঞার গভীর তাৎপর্য আজও বিস্ময়করভাবে গ্রহণীয়। অ্যারিস্টটলের কাছে মানুষ কেবল খাদ্য উৎপাদনকারী বা ভোগকারী সত্তা নয়; সে ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, আইন, মালিকানা এবং ক্ষমতা নিয়ে চিন্তা করে বলেই সে মানুষ। অর্থনীতি তাই তাঁর কাছে কখনও নিছক উৎপাদনের বিজ্ঞান নয়; তা রাজনৈতিক জীবনেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইলন মাস্কের ভবিষ্যৎ-চিন্তাকে বিচার করলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি প্রযুক্তিগত নয়, রাজনৈতিক। যদি এ.আই সমস্ত উৎপাদন করে, যদি রোবট সমস্ত শ্রম সম্পন্ন করে, তাহলে সেই এ.আই-এর মালিক কে হবে? সেই রোবটের মালিক কে হবে? উৎপাদনের ফল কীভাবে বণ্টিত হবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর কোনো সফটওয়্যার বা কোনো যন্ত্র দিতে পারে না। এগুলি রাষ্ট্র, আইন, সমাজ ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রশ্ন।
এখানেই কার্ল মার্ক্সের বিশ্লেষণ নতুন অর্থে ফিরে আসে। মার্ক্স বলেছিলেন, ইতিহাস মূলত উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা পরিবর্তনের ইতিহাস। দাসপ্রথা, সামন্ততন্ত্র, পুঁজিবাদ—প্রত্যেক যুগেই উৎপাদনের উপায় যার হাতে, ক্ষমতাও শেষপর্যন্ত তার হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে উৎপাদনের উপায় যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা, সুপারকম্পিউটার এবং রোবট হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্নটি আগের মতোই থাকবে— এই নতুন উৎপাদনশক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকছে?
অনেক সমকালীন গবেষক এই নতুন বাস্তবতাকে ‘ডিজিটাল পুঁজিবাদ’ কিংবা ‘সার্ভেইলেন্স ক্যাপিটালিজম’ নামে ব্যাখ্যা করেন। এখানে পণ্য কেবল বস্তু নয়; মানুষের আচরণ, মানুষের আবেগ, ব্যক্তিগত তথ্য, অনলাইন অভ্যাস, এমনকি মনোযোগও বাজারে বিক্রয়যোগ্য সম্পদে পরিণত হয়। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে অর্থ কাগজের নোট থেকে ডিজিটাল ডেটায় রূপান্তরিত হতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন যদি একই থাকে, তবে অর্থের বিলোপ ঘটবে না; বরং তার চরিত্র বদলাবে।
এই কারণেই মাস্কের ‘Post-Scarcity Economy’ ধারণার মধ্যেও অদ্ভুত অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব রয়েছে। প্রযুক্তিগত প্রাচুর্য মানেই সামাজিক ন্যায়বিচার নয়। ইতিহাসে বহুবার উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু বৈষম্য কমেনি। শিল্পবিপ্লব ইউরোপে অভূতপূর্ব উৎপাদনশীলতা সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু একই সঙ্গে শ্রমিক-শোষণ, শিশুশ্রম এবং চরম বৈষম্যেরও জন্ম দিয়েছিল। প্রযুক্তি নিজে কখনও নৈতিক নয়; প্রযুক্তি কেবল এক শক্তি। সেই শক্তি কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা নির্ধারণ করে সমাজ ও রাজনীতি।
অন্যদিকে জন মেনার্ড কেইনস ১৯৩০ সালে অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে (অমর্ত্য সেন-এর ‘উন্নয়ন, কল্যাণ অর্থনীতি ও মানবক্ষমতা’ নিয়ে লেখায় কেইনসের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রভাব বিষয়ক আলোচনা আছে) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে এমন এক সময় আসবে যখন মানুষ সপ্তাহে মাত্র পনেরো ঘণ্টা কাজ করলেই জীবনের প্রয়োজন মিটে যাবে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, উৎপাদনশীলতা এত বৃদ্ধি পাবে যে জীবিকার জন্য অতিরিক্ত শ্রমের প্রয়োজন থাকবে না। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলছে। গত একশো বছরে বিদ্যুৎ, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পৃথিবীকে আমূল বদলে দিয়েছে। তবুও অধিকাংশ মানুষ এখনও দীর্ঘ সময় কাজ করে। কেন?
এর উত্তর অর্থনীতির পাশাপাশি সমাজতত্ত্বেও নিহিত। প্রযুক্তি মানুষের চাহিদা পূরণ করে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন চাহিদাও সৃষ্টি করে। একসময় টেলিফোন ছিল বিলাসিতা; আজ তা প্রয়োজন। একসময় ইন্টারনেট ছিল বিশেষ সুবিধা; আজ তা মৌলিক কাঠামো। প্রযুক্তি যেমন সমস্যার সমাধান করে, তেমনি নতুন সমস্যারও জন্ম দেয়। ফলে কাজের ধরন বদলায়, কিন্তু কাজের প্রয়োজন সম্পূর্ণ বিলীন হয় না।
এখানেই জ্যাঁ বোদ্রিলার-এর চিন্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, আধুনিক ভোগবাদী সমাজে মানুষ আর কেবল প্রয়োজনের জন্য পণ্য ব্যবহার করে না; বরং প্রতীক, সামাজিক মর্যাদা এবং শ্রেণি-পরিচয়ের জন্যও ভোগ করে। একটি বিলাসবহুল গাড়ির মূল্য তার যান্ত্রিক গুণে নয়; বরং তার সামাজিক সংকেতে। একটি দামি ঘড়ি সময় দেখার জন্য তত নয়; যতটা সামাজিক অবস্থান প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ আধুনিক অর্থনীতি কেবল প্রয়োজনের অর্থনীতি নয়; তা অবস্থানগত প্রতীকেরও অর্থনীতি।
এই বিশ্লেষণকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের বুর্দিয়ো। তিনি দেখিয়েছেন, সমাজে শুধু অর্থনৈতিক পুঁজি নয়; সাংস্কৃতিক পুঁজি, সামাজিক পুঁজি এবং প্রতীকী পুঁজি—এই তিনটিও ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। একজন মানুষের ডিগ্রি, ভাষাজ্ঞান, সামাজিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক রুচি কিংবা সামাজিক মর্যাদাও এক ধরনের পুঁজি। ফলে ভবিষ্যতে যদি খাদ্য ও বাসস্থান সহজলভ্যও হয়ে যায়, তবুও শিক্ষা, মর্যাদা, প্রভাব, সামাজিক স্বীকৃতি এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অসমতা থেকেই যাবে। অর্থাৎ প্রাচুর্য বৈষম্যের অবসান ঘটায় না; কেবল তার রূপান্তর ঘটায়।
এই কারণেই ইলন মাস্কের বক্তব্যকে সরল প্রযুক্তিগত আশাবাদ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর বক্তব্য আমাদের এমন এক অদূর ভবিষ্যতের ভাবনার সামনে দাঁড় করায়, যেখানে প্রশ্নটি আর কেবল অর্থনৈতিক নয়; বরং দার্শনিক, রাজনৈতিক এবং সভ্যতাগত হয়ে যায়। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে হয়তো অর্থের রূপ বদলাবে, কিন্তু ক্ষমতা, মর্যাদা এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন কি সত্যিই বিলুপ্ত হবে? নাকি তারা আরও সূক্ষ্ম, আরও অদৃশ্য এবং আরও জটিল কুটিল রূপ ধারণ করবে?
(৩)
এখানে এসে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে উপস্থিত হয়—মানুষ যদি জীবিকার জন্য কাজ না-করে, তবে কাজের অর্থ কী হবে? এই প্রশ্নটি নতুন নয়। শিল্পবিপ্লবের সময়ও এই প্রশ্ন উঠেছিল, কম্পিউটারের আবির্ভাবের সময়ও উঠেছিল, আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও আবার উঠছে। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর কেবল অর্থনীতির বইয়ে নেই; এর উত্তর নিহিত রয়েছে দর্শন, সমাজবিজ্ঞান এবং মানবসভ্যতার ইতিহাসে।
জার্মান দার্শনিক হেগেলের কাছে শ্রম ছিল মানুষের আত্মবিকাশের অন্যতম প্রধান উপায়। মানুষ প্রকৃতিকে পরিবর্তন করতে গিয়ে আসলে নিজেকেই পরিবর্তন করে। শ্রম কেবল জীবিকা অর্জনের উপায় নয়; শ্রম আত্মসচেতনতারও জন্ম দেয়। মানুষ নিজের শ্রমের মধ্য দিয়েই নিজের সৃজনশীলতা, দক্ষতা এবং স্বাধীনতার পরিচয় লাভ করে। এই কারণেই শ্রমকে কেবল অর্থনৈতিক ক্রিয়া হিসেবে দেখলে তার গভীর মানবিক তাৎপর্য হারিয়ে যায়।
হান্না আরেন্ট এই আলোচনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি মানুষের কার্যকলাপকে তিন ভাগে বিভক্ত করেন—Labour, Work এবং Action। তাঁর মতে, কেবল জীবিকা নির্বাহের জন্য করা শ্রমই মানুষের সর্বোচ্চ পরিচয় নয়। মানুষ তখনই প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে ওঠে, যখন সে সৃষ্টি করে, চিন্তা করে, মত প্রকাশ করে, সমাজে অংশগ্রহণ করে এবং ইতিহাস নির্মাণে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের অধিকাংশ শ্রমের দায়িত্ব গ্রহণও করে— তবুও মানুষের সৃজনশীলতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত, শিল্পচর্চা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন চিন্তার প্রয়োজন কখনও শেষ হবে না।
এই কারণেই প্রযুক্তিগত উন্নতির প্রশ্ন শেষপর্যন্ত এসে মানুষের প্রশ্নে পরিণত হয়। যন্ত্র উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে পারে না। প্রযুক্তি তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে পারে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কবিতা লিখতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, এমনকি বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও সহায়তা করতে পারে; কিন্তু তা মৌলিক উদ্ভাবনী প্রতিভাজাত সৃজনধর্মী হবে না; হবে সমবায়ী মানবিক ভাবনাগুলিরই নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ সম্পাদন। আবার মানুষের মতো ইতিহাসের নৈতিক দায়িত্বও বহন করতে পারবে না। আদৌ পারবে কি? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত।
আরও গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, ইলন মাস্কের বক্তব্যে ‘টাকা’ শব্দ আসলে একটি প্রতীক। প্রকৃত প্রশ্ন টাকা নয়; মূল্য। অর্থ নিজে কোনো মূল্য নয়; মূল্যের সামাজিক প্রতীক মাত্র। ইতিহাসে কড়ি, শঙ্খ, লবণ, সোনা, রূপা, কাগজের নোট, ব্যাংক আমানত, ডিজিটাল মুদ্রা—সবই বিভিন্ন সময়ে মূল্যবিনিময়ের মাধ্যম হয়েছে। মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মূল্যবিনিময়ের প্রয়োজন শেষ হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে কাগুজে টাকা বিলুপ্ত হলেও মূল্যায়নের কোনো না কোনো ব্যবস্থা অবশ্যই থাকবে। হতে পারে ডিজিটাল টোকেন, শক্তিভিত্তিক হিসাব, ডেটা-স্বত্ব, গণনাশক্তির অধিকার অথবা সম্পূর্ণ নতুন কোনো সামাজিক বিনিময়ব্যবস্থা। কিন্তু মূল্য, আস্থা এবং বিনিময়—এই তিনটি ধারণা মানবসমাজ থেকে বিলীন হবে, এমন ভাবা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়।
এখানেই সভ্যতার ইতিহাস আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কৃষিবিপ্লব মানুষের জীবন বদলেছিল, কিন্তু বৈষম্যও সৃষ্টি করেছিল। শিল্পবিপ্লব উৎপাদন বাড়িয়েছিল, কিন্তু নতুন শ্রেণি-সংঘাতও সৃষ্টি করেছিল। ডিজিটাল বিপ্লব পৃথিবীকে যুক্ত করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে নজরদারি, তথ্য-একচেটিয়াকরণ এবং ক্ষমতার নতুন যুগের সূচনা করেছে। ইতিহাসের প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব একদিকে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে নতুন সংকটও জন্ম দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও সম্ভবত এই ঐতিহাসিক নিয়মের ব্যতিক্রম হবে না।
সুতরাং ২০৩৬ সালের মধ্যে ‘টাকার বিলোপ’—এই ভবিষ্যদ্বাণীকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করার আগে আমাদের আরও মৌলিক প্রশ্ন করতে হবে। যদি উৎপাদন অসীম হয়, তাহলে সেই উৎপাদনের মালিক কে হবে? যদি শ্রমের প্রয়োজন কমে যায়, তাহলে মানুষের আয় কোথা থেকে আসবে? যদি রাষ্ট্র কর আদায় করতে না পারে, তাহলে জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা কীভাবে চলবে? যদি অল্প কয়েকটি প্রযুক্তি-প্রতিষ্ঠান সমগ্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, তাহলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী হবে? এবং যদি মানুষ জীবিকার জন্য কাজ না-ও করে, তাহলে সে তার জীবনের অর্থ কোথায় খুঁজে পাবে?
এই প্রশ্নগুলির সহজ উত্তর নেই। কিন্তু প্রশ্নগুলিই আমাদের সময়কে নির্ণায়িত করবে বলে মনে হয়।
অতএব, ইলন মাস্কের বক্তব্যকে একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত আশাবাদের প্রতীক বলা যায়, অন্যদিকে সেই বক্তব্যকে একটি দৃষ্টান্তমূলক ভাবনা-পরীক্ষা (Thought Experiment) হিসেবেও দেখা যায়। তাঁর বক্তব্য আমাদের বাধ্য করে নতুন করে ভাবতে— অর্থনীতি কী, সম্পদ কী, শ্রম কী, মূল্য কী এবং শেষপর্যন্ত মানুষ হওয়ার অর্থই বা কী।
সম্ভবত ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কাগুজে টাকা থাকবে না, ব্যাংকের রূপ বদলাবে, লেনদেন হবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল, এমনকি বহুক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই উৎপাদনের মূল শক্তি হয়ে উঠবে। কিন্তু তাই বলে ক্ষমতা, সাম্য ও বৈষম্য, ন্যায়বিচার, মালিকানা এবং সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্ন বিলুপ্ত হবে— এমন ধারণা ইতিহাস, দর্শন কিংবা সমাজবিজ্ঞান সমর্থন করে না।
সবশেষে মনে হয়, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন এই হবে না যে— ‘টাকা থাকবে কি থাকবে না’। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মূল্য কে নির্ধারণ করবে? প্রযুক্তির ওপর অধিকার কার থাকবে? সম্পদের বণ্টন কীভাবে হবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের স্বাধীনতাকে প্রসারিত করবে, নাকি নতুন ধরনের নির্ভরতা ও নিয়ন্ত্রণের জন্ম দেবে?
মানবসভ্যতার ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—প্রযুক্তি কখনও নিজে মুক্তি দেয় না; মুক্তি আসে প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার, গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, নৈতিক বোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে। তাই ভবিষ্যতের সভ্যতা টাকাহীন হবে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সেই সভ্যতা কতটা ন্যায়ভিত্তিক, কতটা মানবিক এবং কতটা স্বাধীন হবে? হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরই বর্তমান শতাব্দীতে আগামির ইতিহাস রচনা করবে।
প্রস্তাবিত তথ্যসূত্র:
১. টাকার উৎপত্তি, বিনিময়ব্যবস্থা এবং সমাজে অর্থের ভূমিকা প্রসঙ্গে দেখুন—
ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, ভারতীয় সমাজপদ্ধতি, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
২. প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সভ্যতার সংকট, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং যন্ত্রসভ্যতার সমালোচনা প্রসঙ্গে দেখুন—
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সভ্যতার সংকট, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, শান্তিনিকেতন।
৩. মানুষ, স্বাধীনতা, নৈতিকতা এবং মানবধর্মের ধারণা প্রসঙ্গে দেখুন—
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানুষের ধর্ম, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, শান্তিনিকেতন।
৪. সমাজ, সংস্কৃতি, শ্রেণিবিন্যাস এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন প্রসঙ্গে দেখুন—
বিনয় ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, প্রকাশ ভবন, কলকাতা।
৫. সংস্কৃতির বিবর্তন, আধুনিকতা এবং সামাজিক রূপান্তর প্রসঙ্গে দেখুন—
গোপাল হালদার, সংস্কৃতির রূপান্তর, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা।
৬. বস্তুবাদ, সমাজের বিকাশ, শ্রম এবং মানবসভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি প্রসঙ্গে দেখুন—
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, লোকায়ত দর্শন, নিউ সেন্ট্রাল বুক এজেন্সি (প্রা.) লি., কলকাতা।
৭. ভারতীয় দর্শনের বিবর্তন, সমাজ ও মানবচিন্তার ঐতিহাসিক রূপান্তর প্রসঙ্গে দেখুন—
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ভারতীয় দর্শন, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা।
৮. উন্নয়ন, স্বাধীনতা, মানবক্ষমতা এবং কল্যাণ অর্থনীতির ধারণা প্রসঙ্গে দেখুন—
অমর্ত্য সেন, উন্নয়ন, স্বাধীনতা ও মানবক্ষমতা (বাংলা অনুবাদ), আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
৯. রাষ্ট্র, অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং জননীতির সমকালীন বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে দেখুন—
অশোক মিত্র, নির্বাচিত প্রবন্ধ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
১০. রণবীর চক্রবর্তী, সমাজ, রাষ্ট্র ও ইতিহাস, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা।
১১. তপোধীর ভট্টাচার্য, আধুনিক পর্ব থেকে পর্বান্তর। পুস্তক বিপণি, কলকাতা।
১২. অভিজিৎ ভট্টাচার্য (সম্পা.), উত্তর-আধুনিকতা: তত্ত্ব ও প্রয়োগ, প্যাপিরাস, কলকাতা।
###কলমে – অনিশ রায়

