“যদি একদিন ক্রিকেট নিজেই মানুষ হয়ে জন্মাত, তবে তার নাম হতো সম্ভবত গারফিল্ড সোবার্স।”
কারণ ক্রিকেট কখনও শুধু ব্যাটিং হতে চায়নি, শুধু বোলিংও নয়। সে চেয়েছিল শক্তি ও সৌন্দর্যের, যুক্তি ও কল্পনার, শৃঙ্খলা ও স্বাধীনতার এক অসম্ভব মিলন। কিন্তু ইতিহাসে অধিকাংশ মানুষ তার কেবল একটি মুখই ধারণ করতে পেরেছেন। কেউ ব্যাট হাতে অমর, কেউ বল হাতে, কেউ নেতৃত্বে। যেন প্রত্যেকে ক্রিকেটের মহাগ্রন্থের একটি করে অধ্যায়।
সোবার্স, একমাত্র গ্যারি সোবার্স, ব্যতিক্রম। তিনি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ।
তাঁকে ‘সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার’ বলা হয়। কথাটি ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ অলরাউন্ডার শব্দটি দক্ষতার পরিমাপ; সোবার্সের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি ছিল অস্তিত্বের। তিনি এমন এক ক্রিকেটার, যিনি খেলার প্রতিটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। তাঁর বাঁহাতি ব্যাটিং ছিল কবিতা, তাঁর দ্রুতগতির বোলিং ছিল বজ্রের উচ্চারণ, তাঁর স্পিন ছিল ধাঁধা, আর তাঁর ফিল্ডিং ছিল নৃত্য। মনে হতো, একজন মানুষ নন—ক্রিকেটের সমস্ত সম্ভাবনা একটি শরীরে আশ্রয় নিয়েছে।
তাই আশ্চর্যের কিছু নেই যে, ডন ব্র্যাডম্যানের মতো কিংবদন্তির পাশে যে অল্প কয়েকটি নাম ইতিহাস উচ্চারণ করেছে, তাদের মধ্যে গারফিল্ড সোবার্স সবচেয়ে উজ্জ্বল। কিন্তু এই তুলনা পরিসংখ্যানের নয়। ব্র্যাডম্যান ক্রিকেটের সর্বোচ্চ শিখর; সোবার্স ক্রিকেটের সবচেয়ে বিস্তৃত দিগন্ত।
মৃত্যুর পর মানুষকে স্মরণ করার দুটি পথ আছে। এক পথ পরিসংখ্যানের—কত রান, কত উইকেট, কত শতরান, কত রেকর্ড। আরেক পথ স্মৃতির—তিনি আমাদের কল্পনাকে কত দূর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রথমটি ইতিহাসের হিসাব, দ্বিতীয়টি সভ্যতার স্মৃতি।
স্যার গারফিল্ড সোবার্সকে স্মরণ করতে বসে মনে হয়, তাঁকে সংখ্যার খাতায় বন্দি করাই তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড়ো অন্যায়। কারণ তিনি এমন এক ক্রিকেটার, যাঁর পরিচয় স্কোরকার্ডের সীমা অতিক্রম করে শিল্প, দর্শন ও ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
ডন ব্র্যাডম্যানকে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ শিখর বলা হয়। তাঁর ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড় আজও মানুষের কল্পনাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। কিন্তু ক্রিকেটবিশ্বে বহু দশক ধরে আর-একটি কথাও সমানভাবে উচ্চারিত হয়েছে—ব্র্যাডম্যানের পাশে যদি আর একটি নাম বসানো যায়, তবে সেটি গারফিল্ড সোবার্স। এই তুলনা কখনও কেবল পরিসংখ্যানের ছিল না। ব্র্যাডম্যান ছিলেন ব্যাটিংয়ের পরম শৃঙ্খলা; সোবার্স ছিলেন ক্রিকেটের পরম স্বাধীনতা। একজন এক শিল্পকে নিখুঁত করেছিলেন, অন্যজন গোটা শিল্পেরই রূপ ধারণ করেছিলেন।
ব্র্যাডম্যান যেন এক মহৎ স্থপতি—একটি স্তম্ভও যার পরিকল্পনার বাইরে নয়। আর সোবার্স ছিলেন রেনেসাঁর শিল্পী; তিনি একই সঙ্গে চিত্রকর, ভাস্কর, সুরকার ও কবি। ক্রিকেট তাঁর কাছে কোনো একক দক্ষতার পরীক্ষা ছিল না; ছিল সৃষ্টিশীলতার এক অবিরাম উৎসব। সেই কারণেই তাঁকে শুধু ‘সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার’ বলা যথেষ্ট নয়। অলরাউন্ডার শব্দটি দক্ষতার পরিচয় দেয়, কিন্তু সোবার্সের পরিচয় ছিল আরও গভীর—তিনি ক্রিকেটের পূর্ণমানব।
তাঁর ব্যাটিংয়ের দিকে তাকালে মনে হয়, তিনি নিয়মকে অস্বীকার করেননি; বরং নিয়মকে এমনভাবে আত্মস্থ করেছিলেন যে তা আর আলাদা করে চোখে পড়ত না। তাঁর কভার ড্রাইভে ছিল সঙ্গীতের লয়, হুকে ছিল নাটকের বিস্ফোরণ, কাটে ছিল ক্যালিগ্রাফির সূক্ষ্মতা। অনেক ব্যাটসম্যান ব্যাকরণ মেনে খেলেন; সোবার্স খেলতেন কবিতার মতো। ব্যাকরণ সেখানে আছে, কিন্তু পাঠক তাকে ব্যাকরণ হিসেবে অনুভব করেন না—শুধু সৌন্দর্য অনুভব করেন।
এইখানেই নেভিল কার্ডাসের ক্রিকেট-দর্শনের কথা মনে পড়ে। কার্ডাস লিখেছিলেন, ক্রিকেটকে কেবল স্কোরবোর্ড দিয়ে বিচার করা যায় না; কারণ স্কোরবোর্ড একটি ইনিংসের সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারে না। একটি কভার ড্রাইভের দীপ্তি, একটি ফলো-থ্রুর ছন্দ, কিংবা একজন ব্যাটসম্যানের উপস্থিতির নান্দনিকতা কোনো সংখ্যার মধ্যে ধরা পড়ে না। সোবার্স যেন সেই দর্শনের জীবন্ত রূপ। তাঁর ৩৬৫* অবশ্যই ইতিহাস, কিন্তু তার চেয়েও বড়ো ইতিহাস তাঁর খেলার ভঙ্গি—যা মানুষকে পরিসংখ্যানের বাইরে ক্রিকেটের শিল্পদর্শনকে আবিষ্কার করতে শিখিয়েছে।
কিন্তু সোবার্সকে বুঝতে হলে শুধু শিল্পের ভাষা যথেষ্ট নয়; ইতিহাসের ভাষাও জানতে হয়। তিনি এমন এক সময়ে উঠে এসেছিলেন, যখন ক্যারিবীয় সমাজ ঔপনিবেশিকতার দীর্ঘ অন্ধকার থেকে আত্মপরিচয়ের আলো খুঁজছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট ছিল নিছক বিনোদন নয়; ছিল আত্মমর্যাদার ঘোষণা। সি. এল. আর. জেমস তাঁর বিখ্যাত প্রশ্ন তুলেছিলেন—
“যারা শুধু ক্রিকেট জানে, তারা ক্রিকেট সম্পর্কে কতটুকুই বা জানে?”
এই প্রশ্নের গভীর অর্থ ছিল, ক্রিকেট কখনও কেবল ব্যাট-বলের খেলা নয়; ক্রিকেট সমাজ, রাজনীতি, জাতিসত্তা ও স্বাধীনতারও ইতিহাস।
সোবার্স সেই ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতীক। শিল্পী এবং বিপ্লবী। তাঁর প্রতিটি শতরান, প্রতিটি উইকেট, প্রতিটি ক্যাচ যেন বলছিল—ক্যারিবীয় মানুষের প্রতিভা কোনো সাম্রাজ্যের দয়ার ফল নয়; তা তাদের নিজস্ব সৃষ্টিশক্তির প্রকাশ। তিনি মাঠে যেমন প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করেছেন, তেমনি উপনিবেশিক মানসিকতার অহংকারকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাঁর অপরাজিত ৩৬৫ রানের ইনিংসকে কেবল বিশ্বরেকর্ড বলা যায় না। সেই ট্রিপল সেঞ্চুরি ছিল এক সভ্যতার আত্মবিশ্বাসের ভাষ্য। পরে ব্রায়ান লারা সেই রেকর্ড ভেঙেছেন, কিন্তু সোবার্সের ইনিংসের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ভাঙেননি। কারণ সেই ইনিংস প্রমাণ করেছিল—কল্পনারও কোনো সীমা নেই। ক্রিকেটের ইতিহাসে কিছু ইনিংস স্কোরের জন্য অমর, কিছু ইনিংস মানুষের চেতনার জন্য। সোবার্সের ৩৬৫ ছিল চৈতন্যের জাগরণ।
আর শুধু ব্যাটিং? না। নতুন বলে দ্রুতগতির বোলিং, প্রয়োজনে বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিন, আবার পরিস্থিতি বদলালে চিনাম্যান—একজন মানুষ যেন তিন-চারজন বোলারের কাজ করছেন। স্লিপে তাঁর ক্যাচিং ছিল বিস্ময়ের বিস্ময়। একজন অধিনায়ক হিসেবে দলের ভরসা, একজন ফিল্ডার হিসেবে দলের প্রাণ। ক্রিকেটের অভিধানে এমন কোনো অধ্যায় ছিল না, যেখানে সোবার্সের নাম লেখা নেই।
এই বহুমাত্রিকতার কারণেই তাঁকে দার্শনিক অর্থে ‘পূর্ণমানব’ বলা যায়। আধুনিক সভ্যতা বিশেষকে মহিমান্বিত করে। তুমি ব্যাটসম্যান, তুমি বোলার, তুমি বিশেষজ্ঞ। কিন্তু সোবার্স সেই বিভাজনকে অবজ্ঞায় অস্বীকার করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, মানুষের প্রকৃত শক্তি একমাত্রিকতায় নয়, বহুমাত্রিকতায়। এই ভাবনা আমাদের গ্রিক দর্শনের সেই আদর্শের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে শিক্ষার লক্ষ্য ছিল পূর্ণ মানুষ তৈরি করা। আবার রেনেসাঁর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির কথাও মনে পড়ে—যাঁকে একক পরিচয়ে আবদ্ধ করা যায় না। সোবার্সও তেমনই; তাঁকে কেবল অলরাউন্ডার বললে তাঁর প্রতি ভয়ংকর অবিচার করা হয়।
তিনি যেন এক মহাকাব্যিক চরিত্র। হোমারের অ্যাকিলিস যেমন কেবল যুদ্ধ করেন না, একটি যুগের বীরত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন, সোবার্সও তেমনি কেবল ম্যাচ জেতাননি; তিনি ক্রিকেটের কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করেছেন। তাঁর বিখ্যাত ছয় বলে ছয় ছক্কা কেবল রেকর্ড নয়; তা মানুষের সীমা ভেঙে দেওয়ার মুহূর্ত। শিল্পীর কাজই তো অসম্ভবকে সম্ভব বলে দেখানো। সোবার্স সেই শিল্পীর ভূমিকাই পালন করেছিলেন। তিনি সেই অসম্ভবের শিল্পী। সম্ভাবনার কাণ্ডারী।
আজকের টি-টোয়েন্টির যুগে আমরা বহুমুখী ক্রিকেটারের কথা বলি। কিন্তু বাস্তবে আধুনিক ক্রিকেট ক্রমেই বিশেষায়িত হয়েছে। ব্যাটসম্যান ব্যাটিং করেন, বোলার বোলিং করেন, ফিল্ডিং বিশেষজ্ঞ আলাদা। সোবার্স এমন এক সময়ের সন্তান, যখন একজন মানুষ ক্রিকেটের সম্পূর্ণ অভিধান হতে পেরেছেন। হয়তো সেই কারণেই আজ তাঁর মতো কাউকে কল্পনা করাও কষ্টকল্পনা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ড বদলে যায়। কেউ বেশি রান করেন, কেউ দ্রুত শতরান করেন, কেউ বেশি উইকেট নেন। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের উত্তরাধিকার রেকর্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁরা হয়ে ওঠেন এক নন্দনতত্ত্ব, এক দৃষ্টিভঙ্গি, এক সভ্যতার স্মৃতি। সোবার্স তাঁদেরই একজন, হয়তো নির্জনতম একজন। তিনি আমাদের দেখাতে পেরেছেন, প্রতিভা যখন স্বাধীন হয়, তখন তাকে কোনো একক পরিচয়ে বন্দি করা যায় না। তিনি হয়ে ওঠেন বন্ধন-মুক্তির বাণীবাহক।
তাঁর মৃত্যুর পর আমরা কেবল একজন ক্রিকেটারের বিদায়ে শোকাহত নই; আমরা এমন এক যুগের অবসান অনুভব করছি, যখন ক্রিকেট ছিল শিল্প, কল্পনা এবং মানব-সম্ভাবনার এক বিরল সম্মিলন। তাঁর চলে যাওয়া যেন আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয়—স্কোরবোর্ড সব কথা বলে না। একটি কভার ড্রাইভের সৌন্দর্য, একটি স্পেলের বুদ্ধিমত্তা, একটি ক্যাচের দীপ্তি, কিংবা মাঠে একজন মানুষের অবাধ সৃজনশীলতা—এসবের কোনো পরিসংখ্যান হয় না।
তাই গ্যারি সোবার্সকে স্মরণ করার সর্বোত্তম উপায় তাঁর রেকর্ড মুখস্থ করা নয়; তাঁর দর্শনকে মনে রাখা। তিনি দেখিয়েছিলেন, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কোনো বিশেষ দক্ষতায় নয়, বরং নিজের সমস্ত সম্ভাবনাকে মুক্ত করে দেওয়ার মধ্যেই বিবেচনাযোগ্য হয়ে ওঠে। তিনি ক্রিকেটকে কেবল খেলেননি; তিনি ক্রিকেটকে তার পূর্ণ রূপে বাঁচিয়েছিলেন।
একদিন ব্র্যাডম্যান সংখ্যার সর্বোচ্চ শিখর হয়ে উঠেছিলেন। আর সোবার্স? তিনি সংখ্যারও ওপারে চলে গিয়েছিলেন। তাই তাঁর মৃত্যু একটি জীবনের সমাপ্তি হলেও, ক্রিকেটের কল্পনায় তাঁর উপস্থিতি অনন্ত। যতদিন মানুষ ক্রিকেটকে কেবল জয়-পরাজয়ের খেলা নয়, সৌন্দর্য, স্বাধীনতা ও সৃষ্টিশীলতার শিল্প হিসেবে দেখবে, ততদিন গারফিল্ড সোবার্স বেঁচে থাকবেন—একজন মহান ক্রিকেটার হিসেবে নয়, ক্রিকেট নামের সভ্যতার প্রথম ও নিঃসঙ্গ পূর্ণমানবের পরিচয়ে।
এই নিঃসঙ্গতাই তাঁর শিখরের উচ্চতার বিস্ময়কর ধারণা দিয়ে যায়। তাঁর উচ্চতা মাপতে গেলে একজন রাধানাথ শিকদার আবশ্যিক হয়ে ওঠেন—জিওডেটিক ট্রায়াঙ্গুলেশনের সেই দুরূহ সমাধান যিনি সাধন করবেন। আমরা কেউই তা নই। তাই বিস্মিত হওয়া এবং হৃদয়ে আহত হওয়া ছাড়া সোবার্সের জন্য আমাদের নিবেদন করার আর নিজস্ব কিছুই নেই।
তবু একজন বাঙালি হয়ে, জাতীয় স্বভাবে শ্রদ্ধাবনত প্রণাম নিবেদন করে গেলাম।
— অনিশ রায়

