পাখিরা: মৃত্যুর হাত ধরে প্রেমের উড়ান

  অনিশ রায়

 ॥ ১ 

অভিজ্ঞতার অন্তহীন অবলম্বনগুলিকে সার্থকভাবে প্রকাশ করার জন্যই কলাকৃতির ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন; কখনো তা অন্তর্লীন থাকে, কখনো বা বহির্ভূত। হয়তো এ-কারণেই বাংলা কবিতার ঈশ্বরপ্রতিম শিল্পী জীবনানন্দের কবিতায় ভিতর ও বাইরের মধ্যে কোনো স্পষ্ট বিভাজন-রেখা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। তিনি বাংলা কবিতায় যে নতুন চেতনার পথিকৃৎ, সেই চেতনার চুম্বকশক্তিতে দৃশ্য ও অদৃশ্য, মূর্ত ও বিমূর্তের চিরাগত ভেদরেখা মুছে গেছে। যেখানে মানুষের অস্তিত্ব নিছক ব্যক্তি-সীমায় আবদ্ধ নয়, যেখানে নৈর্ব্যক্তিক চিন্তাবীজও ব্যক্তিগত অবচেতনায় ঢেউ তোলে। ফলে বহির্ভূত মনন ও আত্মমুখী কবি-হৃদয় হয়ে ওঠে একে অন্যের পরিপূরক। বাস্তব ব্যক্তিজীবনে সত্য যখন শুধুই খণ্ডিত হয়ে যায়, তখন পরাবাস্তবে সমগ্রের সন্ধান হয়ে ওঠে কবির সৃষ্টি-ভাবনার মৌল প্রেরণা। পরস্পর বিপরীত এবং অসম বস্তুও যে-বিন্দুতে বৃহত্তর সামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দিতে পারে, জীবনানন্দের কবিতার উপাদান সেখানে চেতনাকে সঞ্চারিত করে। তাই তাঁর কবিতার শব্দ, উপমা, রূপক এবং চিত্রকল্পে ফুটে ওঠে অনস্বীকার্য এক আত্মতা; অবচেতনার সূক্ষ্মতর স্পন্দন তাতে এমন দীপ্তি যুক্ত করে যে ব্যক্তি ও ব্যক্তিসত্তার মধ্যবর্তী শূন্যায়তন আলোকিত হয়ে ওঠে। সেই আলোয় কল্পনার মধ্যে বাস্তব আর বাস্তবের মধ্যে কল্পনার সঞ্চরণ চলে ছায়ার ছায়া হয়ে। এই কথাগুলি মনে রেখেই সম্ভবত কবির ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কাব্যের ‘পাখিরা’ কবিতাটি পড়তে হয়।

কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ সনে, ‘কল্লোল’ পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায়, আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগে। অথচ চিরকালীন নবীনত্বের এক প্রত্যাশী অভিজ্ঞানে আজও বিস্ময় জাগিয়ে চলেছে। কবিতাটি সম্পর্কে প্রথমেই বলতে হয় যে, ‘পাখিরা’ বাস্তবের জগতে পা রেখেও কল্পনার হাত ধরে চিরকালীন অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের বৃহত্তর সত্যকে সন্ধান করতে চেয়েছে।

সাধারণের চোখেও এ বিষয় নিশ্চিত ধরা পড়ে যে, জীবনানন্দের কবিতায় পাখির যাওয়া-আসা অবিরাম। বলা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেইসব পাখি তাঁর ভিন্ন ভিন্ন চেতনার মনোবীজ হয়ে উঠেছে। কখনো বা হয়েছে তাঁর সৃষ্টির প্রত্ন-প্রতীক। অর্থাৎ কবির কবিতায় পাখি শুধু অনুপুঙ্খে নয়, মহত্তর তাৎপর্য নিয়েই বার বার এসেছে। তবে শুধু জীবনানন্দে কেন, পৃথিবীর সবদেশের সাহিত্যেই পাখির পদচারণা সুদূর অতীত থেকে। আরো স্পষ্ট করে বলতে হয়, একটি পাখির মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তো পৃথিবীর প্রথম কবি জন্মেছিলেন। বিশ্বকবিও তো কবিত্বের সাধনায় গুহার আঁধার থেকে বার বার শুনেছেন প্রভাত পাখির গান। জীবনানন্দের কাব্যেও দেখি পাখিদের ওড়াউড়ি। তারা এসে কখনো কাব্যের রঙ-রূপ-রসকে বদলে দিয়েছে, কখনো কবির জগৎ ও জীবনের অভিজ্ঞতায় জুড়ে দিয়েছে প্রাজ্ঞ-স্বর। আসলে নৃ-বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে কবি জেনেছেন পাখির সঙ্গে, পাখির জীবনধারার সঙ্গে মানুষের অন্তরঙ্গ মিল আছে। অর্থাৎ স্বাভাবিক ঐতিহ্যস্বীকৃত পথে এবং জীববিজ্ঞানের বাস্তব উপলব্ধির সামর্থ্যেই কবির কাব্যে পাখির প্রাসঙ্গিক সংকল্পনাবৃত্ত রচিত হয়েছে। ‘পাখিরা’ কবিতাটি সেদিক থেকেও হয়েছে বিশিষ্ট ধারণার উদ্ভাসন।

॥ 

কবিতাটির সূচনা এক বসন্তের রাতে। বিনিদ্র কবি-কথকের কল্পনা-আশ্রিত ব্যাপ্ত অনুভূতির মধ্য দিয় –

“ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে—

বসন্তের রাতে 

বিছানায় শুয়ে আছি 

—এখন সে কতো রাত! 

ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর

স্কাইলাইট মাথার উপর

আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।

তারপর চলে যায় কোথায় আকাশে ?

তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে।” 

এই স্তবকে দর্শন, শ্রুতি ও ঘ্রাণের ইন্দ্রিয়-সচেতনতায় এক সহজ আকাঙ্ক্ষার পরিবেশ রচিত হয়েছে। কবি-পুরুষ এক বসন্তের রাতে অতন্দ্র বিছানায় একাকী শুয়ে আছেন। বিনিদ্র নিঃসঙ্গতায় তিনি শুনছেন সমুদ্রের স্বর, দেখছেন স্কাইলাইট মাথার উপর, দূরাগত অথচ স্পষ্টতায় কানে আসছে পাখির কলতান— এসবই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বসন্তের রাতকে করেছে মাধুর্যময়। যদিও এই প্রত্যক্ষতার শরীরে কবি জুড়ে দেন অন্তর্ভূত অনুভূতির গাঢ়তা। আর তাই সমুদ্রের জলের নোনা-স্বাদের সঙ্গে পাখির ডানার ঘ্রাণের অপ্রত্যক্ষ জৈব অনুভূতি কবিতার প্রাথমিক আবহকে করে তুলেছে মাদকতাময়। সদর্থে কবিতার প্রথম অংশকে আপাতভাবে সহজ, সরল, সুন্দর ও নিরীহ লিরিক বলে মনে হলেও প্রকৃত ইঙ্গিতে তা নয়। “আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর– লক্ষণীয়, পাখিদের কলতান শোনা যায়, এ কথা কবি বলেননি; ‘কথা কয় পরস্পর’—এমন মানবায়নের সুরটিকেই জুড়ে দিয়েছেন। যা কবিতার পরবর্তী স্তবকের উদ্দেশ্যমুখ সূচিত করেছে। আরও দেখা যায়, এই স্তবকেই স্বগতোক্তির মতো দুটি প্রশ্ন— ,

(১) “এখন সে কতো রাত!”

(২) “তারপর চলে যায় কোথায় আকাশে?” 

 
সমুদ্রের স্বর কবির মনে সাড়া জাগায়, পাখিদের হার্দ্য-আলাপচারিতা কবির অনুভবের প্রদেশে অজানা ভাষার প্রেরণা বহন করে আনে। অথচ রাতের সময়প্রবাহ সম্পর্কে তিনি অনিশ্চিত, পাখিদের গন্তব্য সম্পর্কে অজ্ঞ। ‘কতো’ আর ‘কোথায়’, এই জিজ্ঞাসা-জ্ঞাপকতার মেজাজ সম্পূর্ণ কবিতা জুড়েই বর্তমান। অর্থাৎ, এর মধ্যে দিয়েই প্রাতিস্বিক পৃথিবীর অন্তরালবর্তী রহস্য ও অপরিমেয় অনুভূতির বাচন সম্পৃক্ত হয়ে অস্তিত্বের নতুন পরিসর এবং সন্ধানী আকাঙ্ক্ষার নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে ওঠে। আকাশের অসীমতা আর সমুদ্রের অতলতা যেমন মাটির দৈহিকতা দিয়েই অনুধাবন করতে হয়। ‘বিছানা’ শব্দটি সেই মৃত্তিকাজীবী দেহভাবনাকেই কি উসকে দেয় না? বিছানায় শুয়ে বসন্তের রাতে কবির বিনিদ্র জাগরণ তবে কি অপরিতৃপ্ত কামনার বিষণ্ণ দীর্ঘশ্বাস নয়?

দ্বিতীয় স্তবকেই আমাদের জিজ্ঞাসা স্পষ্ট উত্তর পায়। প্রিয়-সঙ্গাতুর কামনার উত্তাপকে ইন্দ্রিয়ঘন আবেদনে তুলে ধরেন কবি—

“শরীরে এসেছে স্বাদ বসন্তের রাতে

চোখ আর চায় না ঘুমাতে 

জানালার থেকে ওই নক্ষত্রের আলো নেমে আসে

সাগরের জলের বাতাসে 

আমার হৃদয় সুস্থ হয়

সবাই ঘুমায়ে আছে সব দিকে

সমুদ্রের এই ধারে কাহাদের নোঙরের হয়েছে সময়।” 

কবিতার এই স্তবকেই পাখি এবং পাখির কোনো অনুষঙ্গ নেই। এখানে ব্যক্তি-কবির অস্তিবাদী শারীরিকতাই অন্তর্বর্তী চেতনা থেকে বেরিয়ে বাস্তবিক প্রাকৃতিকতায় প্রতিষ্ঠা পেতে চেয়েছে। ‘নক্ষত্রের আলো’-র নেমে আসা এবং ‘সমুদ্রের জলের বাতাসে’-র স্পর্শ কবির নিঃসঙ্গ কামনায় alter existance হয়ে ওঠে। বসন্তের নির্জন প্রকৃতির মাদকতাময় সান্নিধ্যে কবির অস্থির ‘হৃদয় সুস্থ হয়’। বোঝা যায়, পাখির পারস্পরিক বোঝাপড়ার সূত্র ধরে সঙ্গীর বিকল্পে কবি প্রকৃতির নিবিড় আবহে দেখতে পাচ্ছেন দর্পনের উভপার্শ্বের ইতি ও নেতির অবয়ব। তাই নিজের কামনা-কাতর উদগ্র অস্থিরতা প্রশমিত হওয়ার পরেই অনুভব করেন—

“সবাই ঘুমায়ে আছে সব দিকে—”।

এখানেই বেশি সুষ্ঠুভাবে চারিদিককার প্রতিবেশচেতনা নিয়ে শুদ্ধ বিপরীতের আয়োজনে কবিতার বক্তব্য আরো সত্য হয়ে উঠতে চায় পুনরায় ভাব-কল্পনার আশ্রয়ে। কবির নিঃসঙ্গ ঘুমহীনতার বিপরীতে সকলের নিশ্চিন্ত ইন্দ্রিয়ঘন তৃপ্তির ঘুম। আবার এই ব্যাপ্ত ঘুম এবং কর্মহীন ঘুমহীনতার পটভূমিতেই— “সমুদ্রের এই ধারে কাহাদের নোঙরের হয়েছে সময়?” কবির জিজ্ঞাসা। কিন্তু কাকে? নিজেকে নিশ্চয়ই। অর্থাৎ প্রেরণার কল্পনা এবং অনীপ্সিত বাস্তবের নিয়ত বোঝাপড়ায় কবি আত্ম-ক্রিয়াত্মক অস্তিত্বকেই যেন চিনে নিতে চাইছেন। ‘সমুদ্রের এই ধারে’ কবি অনিদ্র অথচ সেই সমুদ্রের বাতাসে তাঁর হৃদয় সুস্থিত। সেইখানে আশ্রয়ের খোঁজে এসেছে কেউ বা কারা। ‘নোঙর’ শব্দে সেই অবলম্বনময় আশ্রয়ের নির্দিষ্টতা। কিন্তু সেই সুস্থিত জীবনযাপনের বাসনায় কারা এসেছে, তা কবি বলেন না। তবে কি পাখিরা? তাহলে এই স্তবকে ‘পাখিরা’ অনুষঙ্গে আসে না ঠিকই, কিন্তু আসে অনুমেয় প্রসঙ্গ নির্ভরতায়। অভিযান আর গন্তব্যের সুনিশ্চয়তার ইঙ্গিতেই এ কথা বলেন কবি।

।। ৩ ।।

যেসব পাখিরা বসন্তের রাতে জীবনের নির্দিষ্ট খোঁজে আকাশে উড়ে চলেছে, তাদের অতীত-জীবন-কল্পনা এই কবিতার শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি— 

“সাগরের ওই পারে— আরো দূর পার

কোনো এক মেরুর পাহাড়ে 

এই সব পাখি ছিল

ব্লিজার্ডের তাড়া খেয়ে দলে দলে সমুদ্রের ’পরে 

নেমেছিলো তারা তারপর,

মানুষ যেমন মৃত্যুর অজ্ঞানে নেমে পড়ে। 

বাদামী—সোনালি—শাদা—ফুফু ডানার ভিতরে 

রবারের বলের মতো ছোট বুকে

তাদের জীবন ছিলো— 

যেমন রয়েছে মৃত্যু লক্ষ-লক্ষ মাইল ধরে সমুদ্রের মুখে 

তেমন অতল সত্য হ’য়ে।”

প্রকৃতির প্রাণঘাতী আক্রমণের বিরুদ্ধে পাখিদের যে নিরন্তর জীবন সাধনা, তার পরিণাম-ও তো সুনিশ্চিত মৃত্যু— ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অথচ ব্যাপক নিধন। তবুও মেরু-ঝড়ের দুর্বিপাক থেকে অমোঘ প্রখরতায় তারা সমুদ্রের ওপরে নেমে পড়ে— বাঁচার সহজাত আকাঙ্ক্ষায়। মেরু-পাহাড়ের বিপরীতে তারা মেরু-সাগরকে জীবনের আশ্রয় বলে মনে করে। এই বর্ণনা-পর্বে ‘ব্লিজার্ড’ শব্দটি বিশেষ অভিনিবেশ দাবি করে। ‘মেরুঝড়’ বললে অপরিচিত ভয়ংকরের সম্পূর্ণ অভিভব তৈরি হত না, এবং তার আকস্মিক উৎপাতে পাখিদের আক্রান্ত ও সন্ত্রস্ত অবস্থাটিও এতখানি শিহরিত করত না। শব্দটি সম্পূর্ণ স্তবকেই এক অভিনবত্ব দান করেছে। এরপরেই কবি জীবন ও মৃত্যুর চির অনন্বয়ের ভাবনাসূত্র ব্যক্ত করেন একেবারেই নিজস্ব স্টাইলে— “মানুষ যেমন তার মৃত্যুর অজ্ঞানে নেমে পড়ে।” বাঁচার সাধনায় মৃত্যুর পথেই তো পা বাড়ায় মানুষ— এই মৃত্যু-অভিজ্ঞতা আকস্মিকের দোলা হতে পারে, কিন্তু তা অমোঘ। এই অভিজ্ঞতার সাথেই কবি জুড়ে দেন ‘অজ্ঞানে’ শব্দটি; যা পেয়ে যায় এক অভিধা-অতিরেক ব্যঞ্জনা। মৃত্যু প্রাণের বিপরীত, কিন্তু তা পরিচিত অনিবার্যতা; তবু মানুষ তা বিস্মৃত হতে পারে বলেই বাঁচতে পারে। সুতরাং এই ‘অজ্ঞানতা’ নিছক সংজ্ঞাহীনতা নয়, কিংবা শারীরিকতাও নয়, এমনকি মনস্তাত্ত্বিকও নয়— এ অজ্ঞানতা হল উপলব্ধি ও যুক্তি-সচেতনতার চেনা-বৃত্তের বাইরে থাকা ‘instinctual energy’(এই ভাবনাতেই কবিতাটি আস্তিক গীতলতার মধ্যে জটিল ভাব মিশিয়ে নেয়)। আর ঠিক সে-কারণেই কবি ‘বাদামী- সোনালি-শাদা ফুটফুট ডানার ভিতরে’ থাকা ‘রবারের বলের মতো ছোটো বুকে’ পাখিদের জীবনের সপ্রাণতা ও সক্রিয়তার কথা বোঝাতে চেয়েছেন। রবারের বলের স্প্রিংধর্মিতায় তো instinctual energy’-র ইঙ্গিতই স্পষ্ট হয়। বাদামী, সোনালি, শাদা ইত্যাদি রঙে জীবনের বৈচিত্র্যই অভিব্যক্ত। কিন্তু আশ্চর্য হতে হয়, যখন দেখি, এই বিচিত্র জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত সপ্রাণতাকে কবি তুলনা করেন লক্ষ লক্ষ মাইল ধরে সমুদ্রের মুখে অতল সত্য মৃত্যুর সঙ্গে। আসলে খুব ছোটো জীবনের সক্রিয়তা বৃহৎ মৃত্যুর নিষ্ক্রিয়তার সঙ্গে এখানে একাকার হয়ে গিয়েছে। মৃত্যুর সঙ্গে তুলনায় জীবনের অপহ্নব, আবার এই তুলনাই জীবনের ক্ষুদ্রতার গণ্ডি ভেঙে তাকে অনন্ত বিস্তার দান করতে চেয়েছে। ‘অতল সত্য’ শব্দবন্ধটি তাই হয়ে পড়ে দ্বিমাত্রিক।

চতুর্থ স্তবকে এসে জীবন-মৃত্যুর ক্ষুদ্র ও বৃহত্তর রূপকল্পের আয়োজন থেকে কবি সত্য মৃত্যুর স্বীকৃতির পরও জীবনকেই প্রশ্রয় দিতে চেয়েছেন— 

“কোথাও জীবন আছে— জীবনের স্বাদ রহিয়াছে 

কোথাও নদীর জল রয়ে গেছে— সাগরের তিতা ফেনা নয়

খেলার বলের মতো তাদের হৃদয়

এই জানিয়াছে

কোথাও রয়েছে পড়ে শীত পিছে, আশ্বাসের কাছে

তারা আসিয়াছে।”

‘রবারের বল’ বস্তুগত সামগ্রী; কিন্তু তা যখন খেলার উপযোগী হয়, তখনই তা উদ্দেশ্যগত সার্থকতা লাভ করে। পাখিদের ‘রবারের বলের মতো’ বিকল্প উদ্ভাবনী ধারণা ‘খেলার বলের মতো’ সক্রিয় প্রাণধর্মিতা লাভ করেছে বলেই তারা জেনেছে— ‘সাগরের তিতা ফেনা’র মতো জীবন শুধু বিস্বাদময় মৃত্যু-আকীর্ণ নয়, ‘নদীর জলের’ মতো কোথাও জীবন, জীবনের সুস্বাদ আছে। অর্থাৎ ‘রবারের বল’ এবং ‘খেলার বল’ হয়ে ওঠে ‘idea’ এবং ‘intention’-র প্রত্যক্ষধর্মী রূপায়ণ। ‘কোথাও’ শব্দে চিরকালীন অন্বেষণধর্মিতাই যেন ব্যক্ত হয়— “হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোন খানে।” তাই পাখিরা ব্লিজার্ভের তাড়া, তিক্ত শীতলতা পিছনে ফেলে কবোষ্ণ আশ্বাসের কাছে পৌঁছোবার অভিপ্রায়ে ডানা মেলে দেয়। এর নামই তো জীবনধারণ। এর মধ্যেই তো পালিত হয় জীবনের ধর্ম। এভাবেই তো ক্ষণজীবী অস্তিত্ব রক্ষার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা পায় চিরকালীন প্রাণের ধারা।

তারপর সেই স্বাদ আর আশ্বাসের সন্ধানী পথে চলতে চলতে তারা একসময় পুনর্বাসনের মাটি পায়; পায় আহ্লাদের আকাঙ্ক্ষিত পরিসর –

“তারপর চলে যায় কোন্ এক খেতে

তাহাদের প্রিয়ের সাথে আকাশের পথে যেতে যেতে 

সে কি কথা কয়

তাদের প্রথম ডিম জন্মিবার এসেছে সময়

 অনেক লবণ ঘেঁটে সমুদ্রের পাওয়া গেছে এ মাটির ঘ্রাণ

ভালোবাসা আর ভালোবাসার সন্তান, আর সেই নীড়,

এই স্বাদ—গভীর—গভীর।”

‘খেত’ এখানে শুধুমাত্র শস্যক্ষেত নয়, তা জীবনক্ষেত নিশ্চয়ই। এই ক্ষেতেই খড়কুটো দিয়ে তারা বাঞ্ছিত নীড় রচনা করবে। প্রাণ-উৎপাদনের পরিকল্পনায় পরস্পর নিবিড় হবে। শারীরিক বাসনায় হবে প্রগলভ। অনেকেই কবিতার এই পর্বে যৌনতার উলঙ্গ আভাস পান। যৌনতার কথা অস্বীকার করা যায় না বটে, তবে সেই ভাবনাকে দ্বিধাহীন স্বাভাবিকতায় স্বীকৃতি দেওয়াও যায় না। কেননা, বহু মৃত্যুভয় আর ক্লান্তির লবণাক্ত পথ পার করে পাখিরা জীবনের স্বাদ পেতে উন্মুখ। আর জীবনের সম্ভাব্য ইঙ্গিতেই প্রকাশ্য হয়েছে প্রেমের প্রস্তাব, যৌনতার জৈবিক দাবি। তাই প্রেম আর বংশরক্ষার স্বাভাবিক কামনায় যে যৌনতার কথা আসে, তা কেবল স্থূল ইন্দ্রিয়-চরিতার্থতা নয়, বিকৃত লালসা নয়— তার সঙ্গে মিশে থাকে মধুর প্রেমবোধ এবং আন্তরিক দায়বোধ—

“ভালোবাসা আর ভালোবাসার সন্তান আর সেই নীড়”

ফলত, এই শারীরিকতার মধ্যে দিয়েই অস্তিত্ব বাঙ্ময় হয়ে ওঠে নিবিড় প্রেমের উপলব্ধিতে। অস্তিত্ব রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠাকামিতাই প্রাণের প্রথম ও প্রবল শর্ত। কিন্তু তার নির্যাস, নশ্বর জীবনে প্রতিষ্ঠার এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে ‘ভালোবাসা আর ভালোবাসার সন্তান’ প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে। এই ভালোবাসা ভরা নীড়ের আশ্বাস মৃত্যুর অতল সত্যের চেয়েও গভীর, গভীরতর –

“এই স্বাদ— গভীর — গভীর”।

।। ৪।।

এই গভীরতার নির্দিষ্ট প্রতিবেদন এবং মৃত্যুজয়ী আশার বাণীতেই কবিতা শেষ হয় না। কবি এর সঙ্গে যুক্ত করেন আত্মকথনের আপাত বিরোধী সহাবস্থান— 

“আজ এই বসন্তের রাতে 

ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে

ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,

স্কাইলাইট মাথার উপর

আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।” 

একই স্তবক শুরুতে এবং শেষে উচ্চারিত হওয়ায় ধ্রুবপদের মতো মনে হয়। তবে স্বরক্ষেপণের ভিন্নতা স্পষ্ট। এখানে নিঃসঙ্গতার বিষণ্ণতা এবং পাখিদের বিপন্নতাজনিত দুঃশ্চিন্তায় কবি আর অস্থির নন। বরং, এখানে কবি একইসঙ্গে মৃত্যুর সুর আর জীবনের স্বর শুনতে পাচ্ছেন। সমুদ্র, নক্ষত্র, আকাশ আর পাখির জীবনকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। সমুদ্রকে যেমন পছন্দ করেছেন, তেমনি পাখির জীবনস্পৃহাকেও ভালোবাসতে চেয়েছেন। একইসঙ্গে এই বিপরীতের সমারোহকে প্রশ্রয় দিতে পেরেছেন বলেই কবিতায় এসেছে এক বক্তব্য-অতিরেকী বোধ, যা মৃত্যুর সুনিশ্চিত নির্মমতায় উচ্চকিত হয়েও জীবনের প্রতি ভালোবাসায় নিঃসংশয় হতে পেরেছে। তাই তো বিনিদ্র ও নিঃসঙ্গ বসন্ত রাতের উদ্বেগ ও অপরিতৃপ্তি, সমুদ্রের তরঙ্গ-প্রলাপ প্রচ্ছন্ন হয়ে কবির চেতনায় প্রকট হয়ে ধরা দেয় চারণ-পাখিদের হার্দ্য আলাপ। আর এখানেই ‘পাখিরা’ কবিতা কবির সংবেদনায় রচনা করে যায় অস্তিত্বরক্ষার আদিম সংগ্রামের সঙ্গে চিরন্তন প্রাণের ভালোবাসায় উত্তরণের ইতিকথা।

কিংবা, হয়তো ভেবে নিতে পারি, পাখিদের রূপকে সভ্যতার যাযাবর বৃত্তিধারী মানুষগুলির অকথিত আখ্যান, অথবা ব্লিজার্ডের মতো জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও রাজনীতির ক্রুর চক্রান্তে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে ভয়ংকর উদ্বাস্তু জীবন সংগ্রামের কথাও এখানে অভিব্যক্ত হয়ে গেছে।

###গ্রন্থবদ্ধ- জীবনানন্দ দাশ-এর শ্রেষ্ঠ কবিতা / জিজ্ঞাসায়, অন্বেষায় / অনিশ রায় / নিউ বইপত্র ( প্রকাশ – এপ্রিল, ২০১৯)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top