অনীক দত্ত: বাঙালি মধ্যবিত্তের এক অসম্পূর্ণ নন্দনরেখা

অনীক দত্ত: বাঙালি মধ্যবিত্তের এক অসম্পূর্ণ নন্দনরেখা
 
অনিশ রায়
 
চলচ্চিত্র জগতে এমন কিছু নির্মাতা আসেন, যাঁরা কেবল গল্প নির্মাণ করেন না; তাঁরা সময়ের সীমানায় মানুষের চিন্তার-শরীরকে কখনও কখনও দৃশ্যমান করে তুলতে পারেন। তাঁদের চলচ্চিত্র চরিত্র ও ঘটনার সরল বিন্যাস হয়েও একটি সভ্যতার আত্মপ্রতিকৃতিও হয়ে ওঠে। তাঁরা ক্যামেরা দিয়ে কারুকার্য মানুষকে দেখান না, এমন নয়, কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালি-মনকে নিজের দিকে তাকাতেও বাধ্য করেন। বাংলা চলচ্চিত্রের পরিসরে অনীক দত্ত তেমনই এক নির্মাতা। যাঁর চলচ্চিত্রকে প্রায়শই কেবল ব্যঙ্গ কৌতুক, কমেডি কিংবা মধ্যবিত্তের গল্প বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়। কিন্তু তাঁর সিনেমায় আসলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক খনন-কার্য পরিচালিত হয়। যেখানে বাঙালির স্মৃতি, আত্মপ্রবঞ্চনা, সামাজিক সংকট, সাংস্কৃতিক অহংকার, নীরব বিষণ্ণতা, এবং হতাশ চাতুর্য স্তরে স্তরে জমা থাকে।
 
তবে এই পরিচালকের মূল্যায়নে যদি কেবল তাঁর শক্তির তালিকা দিতে হয়, তা আজকের তালব্য-শ জাতীয় সাঁড়াশি সাবাশি দেওয়াই হয়ে যায়। মনে রাখতে হয় তার মতো একজন পরিচালক সাফল্যের মধ্য দিয়ে যতটা নির্মিত হন, ততটাই নির্মিত হন হয়তো সীমাবদ্ধতা দ্বারা।
 
বাংলা চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিক ধারায় আমরা নানা স্বর ও স্বরলিপির নিবিড়তা দেখেছি। ঋত্বিক ঘটক একভাবে ইতিহাসের ক্ষতকে ব্যক্তিক ও সামাজিক ভাঙনের মধ্যে দিয়ে দেখেছেন; সত্যজিৎ রায় মানুষের নীরব বাস্তবতাকে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে ধরেছেন; মৃণাল সেন রাজনৈতিক অস্থিরতাকে মানুষের জীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন; তপন সিংহ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত-রুচিতে গল্পকে সাম্যাবস্থার নিটোল বুননে নক্সিকাঁথার মতো পরিবেশন করেছেন। অনীক দত্ত এই ধারার আরেকটি ভিন্ন উপশাখা নির্মাণ করেন, এ কথা নিশ্চিতভাবে বলার মতো সত্যিই কোনো পরিসর হয়েছে কিনা, তা আরও ভাববেন বিশিষ্ট-জনেরা। এখন অন্তত এটুকু বলতে পারি, তিনি উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার না-করে, হয়তো কখনো বিশেষভাবে ব্যবহার করেই মানুষের গণ্ডি-চিহ্নিত ক্ষুদ্রতম সামাজিক অভ্যাস, সাংস্কৃতিক ভঙ্গি, বোকামি এবং আত্মপ্রবঞ্চনার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অস্তিত্বগত অস্বস্তিকে ধরতে চেয়েছেন। এদিক থেকে অন্তত উত্তর-বিশ্বায়নকালীন আর্থ-সামাজিক অধ্যায়ে তিনি সময়ের মুদ্রাকে সঠিকভাবে উপার্জন ও ব্যয় করেছেন। আবার হয়তো সঞ্চয়ের অক্টেভগুলোকেও আয়ত্ত করতে চাইছিলেন৷
 
চলচ্চিত্র-তত্ত্বের ভাষায় বলা হয়, চলচ্চিত্র মূলত construction of gaze— বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির নির্মাণ। পরিচালক শুধু কী দেখাবেন তা নির্ধারণ করেন না; তিনি নির্ধারণ করেন দর্শক কীভাবে দেখবে। অনীক দত্তের সবচেয়ে বড়ো শক্তি এখানেই। তিনি দর্শককে ঘটনার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখেন না; ঘটনার সঙ্গে হাঁটিয়ে নেন। হাঁপাতেও বাধ্য করেন। ফলত তাঁর চলচ্চিত্র-দেখা মানে দাক্ষিণাত্য-সুলভ কিংবা মারাঠি-অপভ্রংশ থেকে কোনো ভাঙা-বাস্তবতার পরিশীলিত বঙ্গীকরণ পর্যবেক্ষণ করা নয়; একপ্রকার নব্বই-উত্তর দশকের চলমান পরিবর্তনশীল বঙ্গ-জীবনকেই খুঁড়িয়ে খুঁচিয়ে ধাওয়া করা। তাঁর সিনেমা ঠিক আয়না নয়। বলা ভালো, আয়নায় প্রতিফলিত পশ্চাৎপটের খাপছাড়া অন্ধকার। যেখানে কোনো মধ্যবিত্ত-অবয়ব নিজের মুখশ্রী নয়, নিজের নীরব আবছা পরিপার্শ্বকে দেখতে পায়।
 
অবশ্য এখানেই তাঁর সীমাবদ্ধতা  বলা যায়, হয়তো-বা নিজের টানা সীমানা। কারণ তাঁর চলচ্চিত্রের অনেক শক্তিই শেষপর্যন্ত তাঁর দুর্বলতাকেও উসকে দিয়েছে। সে-প্রসঙ্গ আলাদা। তবে অনীক দত্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। তিনি মানুষকে বড়ো ঘটনা দিয়ে দেখেন না বা  বোঝেন না; মানুষের ক্ষুদ্র অভ্যাস দিয়ে বোঝেন। চেয়ারে বসার ভঙ্গি, হাঁটাচলা বা শরীরী-ভাষার শ্রেণিগত তারতম্য, আঞ্চলিক বা স্তরিত ব্যক্তি-বৈশিষ্ট্য, উচ্চারণের কৃত্রিমতা, বৌদ্ধিক ভঙ্গিমা, মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক আত্মগরিমা— এসব সূক্ষ্ম বিষয় তাঁর নজর এড়ায় না।
 
ভূতের ভবিষ্যৎ-এ এই শক্তির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায়। আপাতদৃষ্টিতে এই সিনেমা একটি ব্যঙ্গাত্মক কমেডি; কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এই ছায়াছবি স্মৃতি ও আধুনিকতার সংঘাতের চলচ্চিত্র। ছবির ভূত যারা, তারা তো  ইতিহাসের বিভাজিত নির্বাসিত অংশ। ইতিহাসের মৃত অধ্যায়ের গগন বিপিন শশী ইয়াসিন মকবুল— সব অনুর মতন উদ্ভাসিত পৃথিবীর উপেক্ষিত জীবন এবং ঔপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক দ্বৈত-শাসনব্যবস্থার দম্ভপীড়িত দুর্বল-অযোগ্য উচ্ছিষ্ট জনশৃঙ্খল৷ জিগমুন্ড বাউমানের Liquid Modernity — এমন এক বাস্তবতা, যেখানে স্থায়িত্ব বলে কিছু নেই। আধুনিক শহর পুরনো বাড়ি ভেঙে ফেলে। পুরনো মানুষকে অপ্রয়োজনীয় বানায়। পুরনো স্মৃতিকে পশ্চাৎপদ ঘোষণা করে।অনীক দত্ত ইতিহাসের এই কালিক-সংঘাতকে নির্মম-কৌতুকের মাধ্যমে বলে যান। রমনোত্তর  জেন-ওয়াই-এর গর্ভে জেন-জি-র সাবলীল সম্ভাবনাকে দেখতে দেখতে৷
 
তার হাতে ভূতেরা প্রতীক নয়, একথা বলাই বাহুল্য। ভয়ের বা রহস্যের মেটাফরও একেবারেই নয়৷ তারা একপ্রকার বিস্মৃতির বিরুদ্ধে বর্ণবাদী অথচ স্বার্থ-সংগঠিত প্রতিরোধের বায়বীয় ভাষা। তাদের চলাফেরায় শোনা যায়— ভূত একটা বাড়িতে থাকে না, ভূত থাকে ইতিহাসের অমুদ্রিত পাতার নিকষ অন্ধকারে। কিন্তু কালের গঠন-বিন্যাসে, কিংবদন্তির ধ্বনিমাত্রায়। তার ভঙ্গুর কাঠামোটাকে ভাঙলেও সেই সাক্ষ্য মুছে যাবে। যদিও চলচ্চিত্র মূলত দৃশ্য ও শ্রুতি শিল্প। সিনেমা কথা দিয়েই কেবল নয়, ছবি দিয়েও চিন্তা করে। অথচ অনীক দত্তের চলচ্চিত্রে মনে হয় তিনি ক্যামেরার চেয়ে ভাষার ওপর বেশি নির্ভর করছেন। আবার সেই ভাষা বড্ড বেশি বুদ্ধিভিত্তিক। তাতে আটপৌরে চলন বা অপভাষার মিশ্রণ কার্যকরী হলেও কখনো কখনো ক্লান্তিকর, এটুকু বললে খুব বোকামি হবে না আশা করি। কারণ স্থির বিবেচনায় বলতে হয়, তিনি তো ঋত্বিক ঘটকের মতো দার্শনিক ও ঐতিহাসিক আত্ম-সংবেদে আধুনিকতার উত্তরণমুখী চেতনার বেদান্তকার নন৷ তাই তাঁর সেই অতি-কথন কালের অপরাপর কণ্ঠধ্বনি হয়ে ওঠে না; আরোপিত অতিশয়োক্তি বলেও মনে হতে পারে৷ তাঁর সিনেমায় সংলাপ তীক্ষ্ণ। বুদ্ধিদীপ্ত। সটান চটকদারিতেও সাংস্কৃতিক ইঙ্গিতে ঠাসা। কিন্তু সেই সংলাপ সাহিত্য-ঘেঁষা ন্যারেটিভের অংশ হয়ে ওঠে যতটা; ততটা ঠিক সিনেম্যাটিক হয় কিনা, প্রশ্ন থাকেই৷ সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা-তে একটি দূরবীনের শট, অপরাজিত-তে অপুর কলকাতায় পদার্পন বা ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা-তে নীতার চিৎকার, কিংবা আলো-আঁধারি ঘরে মুখ চেপে কাশি— এগুলো সংলাপ ছাড়াই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভাঙা বাংলার স্মৃতির শাস্ত্র হয়ে উঠেছে।
 
অনীক দত্তের ক্ষেত্রে প্রায়ই তার পরিবেশিত চরিত্র নিজেই নিজের অটোবায়োগ্রাফি হয়ে ওঠে। ফলে দর্শকের বোধসম্মত স্বাধীনতার দায় সংকুচিত হয়। এই প্রক্রিয়া শিল্প-দৃষ্টিতে একপ্রকার যে সুলভ আপস, অনীক দত্তের মতো পরিচালক নিজেও বোধহয় সেটা জানতেন। চলচ্চিত্র-তত্ত্বে একে over-determination বলা হয়। অর্থাৎ পরিচালকই দর্শকের ভাবনার জায়গা কমিয়ে দেন। বাণিজ্যিক সরলতার মনোভঙ্গিকে যে পরিচালক পাশ কাটিয়ে যাননি, নিজস্ব ভঙ্গিতেই তা কার্যক্ষেত্রে তার কাছে কাম্য ছিল, তাতে কোনো দোষ নেই; কিন্তু তার মতো পরিচালকের কাছে আরও কোনো নতুন পদাঙ্ক আশা করতেই পারেন সচেতন দর্শক— সেই দাবিও হয়তো পরিচালক রাখতেন, যদি আরও পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি-জাত কাজ করার সময় তিনি পেতেন। আপাতত কথাটুকুর ভিতরকার অসম্পূর্ণ আশাবাদকে গচ্ছিত-ই রাখতে হচ্ছে মনে মনে। আর যে উপায় নেই৷ তবে সিনেমায় বিপ্লবদা নামক অনুপস্থিত চরিত্রের  দীর্ঘকালীন ও বিলম্বিত উপস্থিতি-সম্ভাবনা এক্ষেত্রে এতটাই শিল্পিত যে, রক্তকরবীর রঞ্জনকে মনে পড়তে পারে, একুশ শতকীয় প্রতিসরণের থ্রি-ডি ভার্সান হিসেবে। আরও একটি বিষয় হলো তাঁর mise-en-scène বা দৃশ্যবিন্যাস। তাঁর ছবির ফ্রেমগুলো প্রায়শই কার্যকর, কিন্তু সবসময় তা ভাষিক সংগতির তালে অপরিস্রুত অভ্যাসে কবিত্বময় গুরুচণ্ডালি হয়নি। হয়েছে অতি পালিশি মুন্সিয়ানায়। এর ফলে তা যতটা ব্যাকরণিক হয়েছে, ততটা বোধহয় ছায়াচিত্রের রূপকথা নয়৷ তাঁর দৃশ্যের মধ্যে ভাব আছে, কিন্তু দৃশ্যের নিজস্ব আত্মিকতা তুলনামূলক কম। ফ্রেম বেশিরভাগ সময় চরিত্রের কথাকে ধারণ করেছে, কিন্তু চরিত্রের নির্বাক পরিসর তথা প্রতিবেশকে সবসময় ধারণ করতে পারেনি। এই কারণে তিনি ধারণার পরিচালক হিসেবে বেশ শক্তিশালী হলেও, দৃশ্য পরম্পরার স্বতঃস্ফূর্ত শিল্পী হিসেবে সবসময় সমান উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি।
 
তাঁর চরিত্র নির্মাণেও একই দ্বৈততা দেখা যায়।  অনীক দত্ত চরিত্রের সামাজিক পরিচয় নির্মাণে অত্যন্ত দক্ষ। আমরা দ্রুত বুঝতে পারি চরিত্রটি কোন শ্রেণির, কোন সাংস্কৃতিক অবস্থানের। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার জায়গায় তিনি কি সবসময় আমাদের নিয়ে যেতে পেরেছেন? আবার তাঁর অনেক চরিত্র ধারণার প্রতিনিধি হয়ে ওঠে ঠিকই; কিন্তু সময়ের সাবেক মানুষ হয়ে ওঠে না। তাঁর চরিত্র অনেক সময় ইতিহাসের মন্তব্য করে। ঋত্বিক ঘটকের চরিত্রের মতো ইতিহাস বহন করে না। অনীকবাবুর চরিত্র পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে চলে। সামাজিক বহুমাত্রিকতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে না। ভূতের গতিশীল মহিমাতেও না।
 
অপরাজিত সিনেমা এই দ্বৈত-স্বভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। এখানে অনীক দত্ত তাঁর আপাত স্বাভাবিক ব্যঙ্গধর্মী ছায়া-সুনিবিড়তা থেকে বেরিয়ে এসে গভীর নির্মাণক্ষম সংবেদনশীলতার দিকে এগিয়ে গেছেন, এ কথা নিঃসংকোচে বলা যায়। ছবিটি শুধু একজন চলচ্চিত্রকারের জীবনের সূচনাপর্বের পুনর্নির্মাণ নয়; তা হয়ে যায় সৃষ্টি-মুহূর্তের আত্মিক নির্জনতা ও বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয়ে স্রষ্টাবৃত্তির ইতিকথা। দার্শনিক নীৎশে বলেছিলেন—“মানুষের ভেতরে বিশৃঙ্খলা থাকতে হয়, যাতে সে একটি নৃত্যরত নক্ষত্রের জন্ম দিতে পারে।” অপরাজিত সিনেমায় সেই বিশৃঙ্খলার খণ্ডিত ছায়া আছে।শিল্পীর নিভৃত অবসরের বিস্রস্ত পদচারণা গণনার প্রয়াস আছে।স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘর্ষ দেখানোর কারুকাজ আছে। ইতিহাসের সঙ্গে যাপন প্রক্রিয়ার মতভেদ আছে৷ তবু প্রশ্নও আছে। ছবিতে কি অনুসন্ধান বেশি, নাকি উদযাপন? অনেক সময় মনে হয়,  সিনেমা তার বিষয়বস্তুকে সপ্রশ্ন পর্যবেক্ষণ করার বদলে তাকে অতিরিক্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছে। নিজস্ব সৃষ্টির অবস্থান থেকে তদ্‌গত দৃষ্টির দূরত্ব অনেকটাই কমে গেছে। সশ্রদ্ধ ভালোবাসার চৌম্বক আকর্ষণে প্রয়োজনের শিল্প-দূরত্বটুকুও বজায় থাকেনি। দূরত্ব ছাড়া পরিপূর্ণ দেখাটাই যে ধাক্কা খায়, সে কথাও সম্ভবত পরিচালক বিস্মৃত হয়েছেন। তাতে অঙ্গ নিটোল নিখুঁত স্পষ্ট হলেও, তা খণ্ডদৃষ্টিরই অনুধ্যান হয়ে গেছে। ফলে কোনো একটা বিষয়ে যত মনোযোগী মুগ্ধ বিশ্লেষণ দানা বেঁধেছে, অন্য আরেকটা উপেক্ষিত হয়েছে স্বাভাবিক নিয়মেই। জাঁ রেনোয়ারের অতি-প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গও এভাবেই সিনেমায় অব্যক্ত থেকেছে। সদর্থে বলা যায়, কোনো ঘটনা-পক্ষের চূড়ান্ত মোহ-বিভ্রান্তি পরিচালককে অভ্রান্ত কয়েকটি ত্রুটির পথেও পরিচালিত করেছে।
 
আশ্চর্য প্রদীপ সিনেমাতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। এখানে সাহিত্য বিষয়ের ছায়াছবি নির্মাণ নয়, এখানে জীবনের হাস্যকর ও মর্মান্তিক পরিণতির আশ্চর্য মায়াছবি দেখানোই ছিল মূলত সিনেমাটিক আলোকবিন্দু। প্রদীপের নীচের এই আলো-অন্ধকারের মায়াময় দোলাটাই ছিল পরিচালকের অন্বিষ্ট। এবং তাতেই তিনি সর্বাপেক্ষা ফোকাসড ছিলেন, এবং সেই ধাক্কাটা দেওয়ার জন্যই দীর্ঘক্ষণ প্রদীপে তৈল সিঞ্চনের কাজ করে যাচ্ছিলেন, সে-কথা কিন্তু প্রাক্‌-লগ্নেই ধরা পড়ে যায়। এই অতি-সাবলীল তরল বয়ান সিনেমায় মজার আমেজপূর্ণ মেজাজ তৈরি করলেও মধ্যবিত্তের চিরায়ত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রটাকে উন্মোচন করতে তেমন সক্ষম হয়নি, এ-কথা জোর করে আর প্রতিষ্ঠা করতে নিশ্চয়ই হবে না। আসলে সিনেমা ধারণাগতভাবে যত সমৃদ্ধ, তার দৃশ্যভাষা ততটা গভীর বহুমাত্রিক হতে পারেনি, অনেকটাই আরামদায়ক হয়ে গেছে৷ বৌদ্ধিক স্তরে যে দ্বান্দ্বিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হতে পারেনি; ফলত ভিজ্যুয়াল স্তরেও আকস্মিকের চমক সত্ত্বেও তা সমানভাবে মানসিক ক্ষত তৈরি করতে সক্ষম হয় না।
 
তবে হ্যাঁ, ভবিষ্যতের ভূত গত দশকের (বলতে পারেন গত দু-দশকের) একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিবেশনা৷ একটু ভিন্ন স্বর সংযোজনে এ-কথা বলতেই হয়৷ যদিও এর আস্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন প্রায় আপামর বাঙালি৷  যারা অতি আগ্রহের সু-ভাগ্যে সিনেমাহলে বসে এই সিনেমা দেখার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছেন, তাদের মধ্যে আমি একজন ছিলাম৷  এখানে সিনেমার ভালো-মন্দ ছেড়ে দিয়েও  একথা শুধু জোরের সঙ্গে বলব— ঋত্বিক, মৃণালের পর সেই-অর্থে পলিটিক্যাল সিনেমা দেখার সুযোগ আমাদের আর কোথায় হয়েছে? পলিটিক্যাল স্যাটায়ার তো সেখানে কষ্ট-কল্পনা৷ এই সিনেমা সেই খরাতপ্ত মাটিতে দু-এক ফোটা জল সিঞ্চনের সুযোগ এনে দিয়েছিল৷ বাঙালির ঝুঁকে যাওয়া মেরুদণ্ডের ভিড়ে এই ঋজু বলিষ্ঠতাটুকু দেখিয়েছিলেন একমাত্র পরিচালক অনীক দত্ত৷ আপনার কাছে এই ব্যাপারে অনেকটাই ঋণী থাকবে বাংলার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।  কিন্তু শাসকের কাছে তা নিশ্চিতভাবেই ‘সিডিশন’ হওয়ার ছিল। অতঃপর, তৎকালীন শাসকের রুদ্র-তাপে (পড়তে পারেন, ‘অসভ্য তাণ্ডবে’) বাঙালির সামান্য ব্যতিক্রমী দেখার  সুযোগটুকুও বাষ্প হয়ে উবে গেল৷ যেভাবে আজ আপনার জীবন এই অসভ্য পরিপার্শ্বের অতি-তাপে বাষ্পীভূত হতে হতে ভবিষ্যতের ভূত হয়ে গেল। জানি না, হয়তো অনাগত ভবিষ্যতের ঘাড়ে চেপে বসবেন এই সিনেমাগুলোর দৌলতে, আর তাদের ফিরিয়ে ফিরিয়ে আনবেন আজকের এই ভৌতিক অতীতের অদ্ভুত  দিনরাতগুলোর ভিতরে।
 
যাই হোক, অনীক দত্তের সিনেমায় সম্পাদনার ছন্দ (editing rhythm) নিয়েও আগের কথাই বলা যায়। তিনি গল্পকে ভেঙে দেন না। খুব বেশি কাঠামোগত পরীক্ষাও করেন না। অনেকটাই নিরাপদ গতিতে এগোন। ফলে তাঁর সিনেমা দর্শকের জন্য সহজলভ্য হয়, কিন্তু কখনও কখনও সেই নিরাপত্তা শিল্পের ঝুঁকিকেও কমিয়ে দেয়। তবে তাঁর সবচেয়ে বড়ো অর্জন, তিনি বাঙালি মধ্যবিত্তকে তার নিজের সাম্প্রতিক অতীতের সামনে দাঁড় করাতে পেরেছেন। চকিত ডিজলভ-এর বর্তমান কার্যকারিতার মধ্যে দিয়ে৷ এই মধ্যবিত্ত কোনো অর্থনৈতিক শ্রেণি নয়; এই মধ্যবিত্ত এক মানসিক অবস্থা। এরা উচ্চবিত্ত হতে চায়, কিন্তু পারে না; আবার নিজের সাধারণ অস্তিত্বকেও সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে শেখে না। জঁ-পল সার্ত্র বলেছিলেন— মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য। কিন্তু স্বাধীনতা আনন্দের মতোই ভয়েরও বিষয়। অনীক দত্তের চরিত্রগুলো সেই জাতীয় ভয়ের মধ্যেই বাস করে। তাই তাদের জীবন পুরোপুরি ট্র্যাজেডি হয়ে ওঠে না; বরং হয়ে ওঠে খণ্ডিত অস্তিত্বগত কমেডি। আমরা তাদের দেখে হাসি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আবিষ্কার করি— আমরা অন্য কাউকে নয়, নিজেদেরই নিয়ে হাসছিলাম। এখানেই তাঁর নির্মিত সিনেমার কার্যকারিতা, বলতে পারি, এখানেই বাঙালি মধ্যবিত্তকে দেখার তাঁর শিল্প-দৃষ্টির গভীরতা। আবার এখানেই তাঁর শিল্প-জীবনের ট্র্যাজেডি। কারণ তিনি শেষপর্যন্ত আমাদের এটুকুই বলতে পারেন— আমরা নিজের সম্পর্কে সবচেয়ে কম জানি। নিজের স্মৃতির মধ্যেই বাস করি। নিজের অভিনয়ের জগতের মধ্যেই কাটাই। নিজের তৈরি মুখোশ নিজেই পরি আর খুলি।  আর সেই মুখোশ খোলার পর প্রতিবার যাকে দেখি— সে খুব বীর নয়। খুব মহৎ-ও নয়। সে শুধু এক দ্বিধাগ্রস্ত, ভীত, অদ্ভুতভাবে হাস্যকর মানুষ। অনীক দত্তের সিনেমা সেই মানুষটির প্রতিচ্ছবি। এটুকু বুঝতে পারলে তাঁর সিনেমা মজার মধ্যে একটু বেশি অস্বস্তি দেয়, সেটুকুই দীনহীন বাংলা সিনেমার এই কাণ্ডজ্ঞান-বিবর্জিত পতিত সময়ের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি। আর এই উন্মত্ত মজে ওঠা বঙ্গজীবনের মধ্যে অনীক দত্ত নিজস্ব অবস্থান থেকে এই অস্বস্তিটুকুর অভিশাপ অন্তত আমাদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিয়ে গেলেন, তার জন্য বহুদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, অবনত হয়ে আপনার প্রতি এই বিশ্বাস রাখতে বাধ্য করলেন। নিজের শিল্প-মেজাজেই অসম্পূর্ণ আপনি চলে গেলেন নন্দনরেখা ধরে। আপনাকে জানাই সশ্রদ্ধ বিদায়।
 
 
 

2 thoughts on “অনীক দত্ত: বাঙালি মধ্যবিত্তের এক অসম্পূর্ণ নন্দনরেখা”

  1. আসাধারন লেখা। অনিক দত্তকে নিয়ে আগে কেউ এ ভাবে ভেবেছেন কিনা জানি না। অনিক দত্তের সিনেমা আবার নতুন করে দেখতে হবে, আরো ভাবতে হবে।

  2. অসামান্য লেখনী। অভিভূত হলাম পড়ে।সমৃদ্ধ হলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top