গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
১. প্রোফেসর শঙ্কু, অরনিথন ও কর্ভাস
১. প্রোফেসর শঙ্কু পোষা ময়নাটিকে কতগুলি বাংলা শব্দ উচ্চারণ করতে শিখিয়েছিলেন ?
উত্তর : একশোর ওপর।
২. ছেলেবেলায় প্রোফেসর শঙ্কুর বাড়িতে যে পোষা পাখি ছিল তা হলো—
ক) কাক খ) ময়না গ) টিয়া ঘ) কাকাতুয়া
→উত্তর: ময়না
৩. ‘ভূমিকম্প, ভূমিকম্প’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল—
ক) ময়না খ) কাক গ) প্রহ্লাদ ঘ) কর্ভাস
→উত্তর: ময়না
৪. “সব পাখির মধ্যে একটি বিশেষ পাখি বিশেষভাবে প্রোফেসর শঙ্কুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।” — কোন পাখি?
উত্তর : একটি সাধারণ কাক।
৫. কত তারিখ শঙ্কুর ‘অরনিথন’ যন্ত্র তৈরী শেষ হয়?
উত্তর : ২৭ শে সেপ্টেম্বর।
৬. “কর্ভাস” গল্পে প্রোফেসর শঙ্কুর তৈরি পাখি-পড়ানো যন্ত্রটির নাম—
ক) অরনিথন খ) রিমেমব্রেন গ) সমলোলিন ঘ) অথনিরণ
→উত্তর : অরনিথন
৭. প্রোফেসর শঙ্কুর পাখি-পড়ানো যন্ত্রটির কাজ কী ছিল?
উত্তর : পাখির মস্তিষ্কে বিশেষ তরঙ্গ প্রেরণ করে তাকে ভাষা ও আচরণ শেখানো।
৮. কর্ভাস কাক জাতীয় পাখির—
ক) গ্রিক নাম খ) ল্যাটিন নাম গ) স্প্যানিশ নাম ঘ) চিলিয়ান নাম
→উত্তর : ল্যাটিন নাম
৯. কর্ভাসের ট্রেনিং-এর সময় কখন ?
উত্তর : সকাল ৮ টা থেকে ৯ টা৷
১০. কর্ভাসের ট্রেনিং এর সময়—
ক) সকাল ছ’টা থেকে সাতটা
খ) সকাল সাতটা থেকে আটটা
গ) সকাল আটটা থেকে ন’টা
ঘ) সকাল ন’টা থেকে দশটা
→উত্তর : সকাল আটটা থেকে ন’টা
১১. বিশেষ করে তোলার প্রধান কারণ কী?
উত্তর : তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও শেখার ক্ষমতা, যার ফলে সে মানুষের মতো নির্দেশ বুঝতে পারত।
২. পাখি ও পাখিবিজ্ঞান
১২. অস্ট্রেলিয়াতে কোন পাখি মাটিতে বাসা করে থাকে?
উত্তর : ম্যালি ফাউল
১৩. ম্যালি ফাউলের বাসার ভেতরের তাপমাত্রা কত থাকে?
উত্তর : ৭৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট।
১৪. ম্যালি ফাউল ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর জন্য তাদের বাসার ভিতরে তাপমাত্রা কত রাখে?
ক) সত্তর ডিগ্রি ফারেনহাইট
খ) আটাত্তর ডিগ্রি ফারেনহাইট
গ) পঁচাত্তর ডিগ্রি ফারেনহাইট
ঘ) আশি ডিগ্রি ফারেনহাইট
→উত্তর : আটাত্তর ডিগ্রি ফারেনহাইট
১৫. কোন পাখি নিজেদের পালক ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়?
উত্তর : গ্রিব নামক পাখি।
১৬. নিজেদের পালক ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় যে পাখি—
ক) ম্যালি-ফাউল
খ) গ্রিব
গ) হর্নবিল
ঘ) অস্ট্রিচ
→উত্তর : গ্রিব
১৭. দিকনির্ণয় ক্ষমতা রয়েছে কোন পাখির?
উত্তর : যাযাবর পাখি।
১৮. “সে সম্পর্কে একটা প্রবন্ধ লিখছি।” — প্রোফেসর শঙ্কু কোন সম্পর্কে?
উত্তর : পাখির মস্তিষ্কের বিষয়ে।
৩. চিলি, সম্মেলন ও সংবাদপত্র
১৯. প্রোফেসর শঙ্কু তার কর্ভাসকে নিয়ে যে দেশে পক্ষি সন্মেলনে গিয়েছিল?
ক) দেশে
খ) নরওয়ে দেশে
গ) চিলি দেশে
ঘ) ডেনমার্ক দেশে
→উত্তর : চিলি দেশে
২০. চিলি ও আর্জেন্টিনার মধ্যে প্রাচীরের মতো কে দাঁড়িয়ে?
উত্তর : আন্দিজ পর্বতশ্রেণী।
২১. কোন পর্বত শ্রেণি চিলি ও আর্জেন্টিনার মধ্যে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়েছিল?
ক) কাঞ্চনজঙ্গা
খ) সুলিটেলমা
গ) আন্ডিজ
ঘ) রকি
→উত্তর : আন্ডিজ
২২. পক্ষিবিজ্ঞানীদের কনফারেন্স এর চেয়ারম্যান ছিলেন?
ক) গ্রেনফিল
খ) কারেরাস
গ) কোভারুবিয়াস
ঘ) আর্গাস
→উত্তর : কোভারুবিয়াস
২৩. প্রোফেসর শঙ্কু হোটেলের কত নম্বর ঘরে ছিলেন?
ক) একাত্তর নম্বর
খ) একশো সাত নম্বর
গ) একাশি নম্বর
ঘ) একশো এগারো নম্বর
→উত্তর : একাশি নম্বর
২৪. সানতিয়াগোর কোন সংবাদপত্রে কর্ভাসের খবর বেরিয়েছিল?
ক) টাইমস অব লন্ডন
খ) টাইমস অব ইন্ডিয়া
গ) টাইমস অব সানতিয়াগো
ঘ) কোরিয়েরে দেল সানতিয়াগো
→উত্তর : কোরিয়েরে দেল সানতিয়াগো
৪. জাদুকর আর্গাস
২৫. চিলিয়ান জাদুকরটি কী নামে পরিচিত?
উত্তর : আর্গাস।
২৬. আর্গাসের আসল নাম কী?
উত্তর : দ্যেমিনগো বার্তেলেমে সারমিয়েনতো।
২৭. আর্গাসের চশমার পাওয়ার কত?
উত্তর : মাইনাস কুড়ি। (চশমাটি সোনা দিয়ে তৈরি)
২৮. আর্গাসের বাড়িতে কতজন চাকর?
উত্তর : ২৬ জন।
২৯. শহরের পূর্ব প্রান্তে আর্গাসের কত কামরা বিশিষ্ট প্রাসাদ রয়েছে?
উত্তর : পঞ্চাশ কামরা।
৩০. আর্গাসের কটা ক্যাডিলাক গাড়ি?
উত্তর : ৪ টি।
৩১. আর্গাস কত বছর বয়স থেকে ম্যাজিক দেখতে আরম্ভ করেছে?
উত্তর : ১৯ বছর।
৩২. আর্গাস কত বছর বয়স থেকে পাখি নিয়ে ম্যাজিক দেখতে আরম্ভ করেছে?
উত্তর : ২৩ বছর।
৩৩. জাদুকর আর্গাস সম্পর্কে নীচের কোন তথ্যটি সঠিক নয়?
ক) আর্গাস ছিলেন একজন বিখ্যাত চিলিয়ান জাদুকর
খ) আর্গাসের নাক ছিল টিয়া পাখির মতো
গ) আর্গাস লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফুট ছিল
ঘ) আর্গাসের চোখে মাইনাস কুড়ি পাওয়ারের চশমা ছিল
→উত্তর : আর্গাস লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফুট ছিল
৩৪. চিলিয়ান জাদুকর আর্গাস সম্পর্কে নীচের কোন মন্তব্যটি সঠিক নয়—
ক) আর্গাসের চশমার পাওয়ার ছিল মাইনাস কুড়ি
খ) ইনি ম্যাজিকে নানা রকম পাখি ব্যবহার করেন
গ) আর্গাস তেইশ বছর বয়স থেকে ম্যাজিক দেখাতে আরম্ভ করেছে
ঘ) আর্গাসের পঞ্চাশ কামরাবিশিষ্ট প্রাসাদ, ছাব্বিশজন চাকর এবং চারটি ক্যাডিলাক গাড়ি আছে
→উত্তর : আর্গাস তেইশ বছর বয়স থেকে ম্যাজিক দেখাতে আরম্ভ করেছে
৩৫. প্রফেসর শঙ্কুর ঘরে ঢোকার পর আর্গাসের কোটের পকেট থেকে কী দেখা যাচ্ছিল?
উত্তর : “কোরিয়েরে দেল সানতিয়াগো”–র সান্ধ্য সংস্করণ।
৩৬. “ম্যাজিশিয়ান জাতটা আমাকে বড্ড আনকামফরটেবল করে তোলে।” এ কথা বলেছেন—
ক) গ্রেনফেল
খ) কোভারুবিয়াস
গ) কারেরাস
ঘ) প্রোফেসর শঙ্কু
→উত্তর : প্রোফেসর শঙ্কু
৩৭. আর্গাস সম্পর্কে যিনি খোঁজ খবর রাখেন—
উত্তর : কারেরাস।
৫. কর্ভাসকে কেনার প্রস্তাব
৩৮. কর্ভাসের জন্য আর্গাস কত মূল্য দিতে চেয়েছিল?
ক) সাত হাজার এসকুডো
খ) আট হাজার এসকুডো
গ) দশ হাজার এসকুডো
ঘ) পনেরো হাজার এসকুডো
→উত্তর : দশ হাজার এসকুডো
৩৯. কর্ভাসের জন্য আর্গাস কত মূল্য দিতে রাজি?
উত্তর : দশ হাজার এসকুডো।
৪০. পনেরো হাজার টাকা = কত এসকুডো ?
ক) পাঁচ হাজার এসকুডো
খ) দশ হাজার এসকুডো
গ) বিশ হাজার এসকুডো
ঘ) বারো হাজার এসকুডো
→উত্তর : দশ হাজার এসকুডো
৪১. দশ হাজার এসকুডো মানে কত টাকা?
উত্তর : পনেরো হাজার।
৬. গল্পের শেষাংশ
৪২. হাঁটু গেড়ে বসে কে মেরিমাতার নাম জপ করতে শুরু করেছিল?
ক) গ্রেনফেল
খ) কোভারুবিয়াস
গ) কারেরাস
ঘ) গাড়ির ড্রাইভার
→উত্তর : গাড়ির ড্রাইভার
৪৩. কর্ভাস কোন গাছে বসেছিল?
উত্তর : অ্যাকেসিয়া।
৭. প্রকাশনা
৪৪. কর্ভাস প্রথম প্রকাশিত হয়—
ক) আনন্দমেলা, ১৩৭৯
খ) সন্দেশ, ১৩৬৮
গ) আনন্দমেলা, ১৩৬৮
ঘ) সন্দেশ, ১৩৭১
→উত্তর : সন্দেশ, ১৩৬৮।
কর্ভাস (৫ মানের উত্তর)
প্রশ্ন : শঙ্কর পাখি বানানোর যন্ত্র দিয়ে কর্ভাসকে শিক্ষিত করার প্রক্রিয়াটি বর্ণনা করো।
উত্তর :
বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় সাহিত্য সৃষ্টিতেও অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী। বিশেষ করে রহস্য গল্প-উপন্যাস এবং কল্পবিজ্ঞান নির্ভর সৃষ্টিগুলিতে তিনি অনন্য। তাঁর সৃষ্ট দুটি অমর চরিত্র ফেলুদা এবং প্রফেসর শঙ্কু। প্রফেসর শঙ্কু সত্যজিৎ রায়ের চেতনায় উদ্ভাসিত এক আদর্শ বিজ্ঞানীর সার্থক মূর্তি যেন। তাকে কেন্দ্র করেই একটি অসাধারণ গল্প গড়ে উঠেছে, যার নাম কর্ভাস। এই গল্পে শঙ্কু পক্ষী-প্রশিক্ষক হিসেবে এক ব্যতিক্রমী ভঙ্গিতে আবির্ভূত হয়েছেন।
পক্ষীকে শিক্ষিত করার জন্য প্রফেসর শঙ্কু ‘অরনিথন’ নামে একটি বিশেষ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। যন্ত্রটি অত্যন্ত সহজ ও সরল প্রযুক্তিতে নির্মিত; এতে জটিলতার কোনো চিহ্ন নেই। যন্ত্রটির দুটি অংশ ছিল। প্রথম অংশটি খাঁচার মতো, যেখানে শিক্ষানবিশ পাখিটিকে রাখা হয়। দ্বিতীয় অংশটি বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত, যার মাধ্যমে জ্ঞান, বুদ্ধি এবং শিক্ষণীয় তথ্য পাখির মস্তিষ্কে প্রবাহিত করা সম্ভব।
শঙ্কুর সাধারণ ল্যাবরেটরির জানলায় নিয়মিত চড়ুই, শালিক, পায়রা, ঘুঘু ও বুলবুলির সমাগম ঘটত। তাদের মধ্যেই একটি কাক শঙ্কুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কারণ তার স্বভাব ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। যন্ত্রটির কাজ শেষ হওয়ার পর শঙ্কু সেটি টেবিলের ওপর রেখে দরজা খুলে দেন। তখন সেই কাকটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাঁচার মধ্যে ঢুকে পড়ে। শঙ্কু পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষণীয় বিষয়গুলি যন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিলেন। কাকটি প্রবেশ করতেই তিনি যন্ত্রের বোতাম টিপে দেন। সঙ্গে সঙ্গে কাকটির চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে এবং তার নড়াচড়া স্থির হয়ে যায়।
এইভাবেই শুরু হয় তার শিক্ষালাভ। পরে কাকটি আশ্চর্যরকম বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে থাকে। শঙ্কু তার নাম দেন ‘কর্ভাস’। অরনিথনের মাধ্যমে শিক্ষাদানের এই অভিনব পদ্ধতিই গল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
প্রশ্ন : কর্ভাসের হিউম্যান ইন্টেলিজেন্সের পরিচয় দাও।
উত্তর : বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় সাহিত্য সৃষ্টিতেও অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী। বিশেষ করে রহস্য গল্প-উপন্যাস এবং কল্পবিজ্ঞান নির্ভর সৃষ্টিগুলিতে তিনি অনন্য। তাঁর সৃষ্ট দুটি অমর চরিত্র ফেলুদা এবং প্রফেসর শঙ্কু। প্রফেসর শঙ্কু সত্যজিৎ রায়ের চেতনায় উদ্ভাসিত এক আদর্শ বিজ্ঞানীর সার্থক মূর্তি যেন। তাকে কেন্দ্র করেই একটি অসাধারণ গল্প গড়ে উঠেছে, যার নাম কর্ভাস। এই গল্পে শঙ্কু পক্ষী-প্রশিক্ষক হিসেবে এক ব্যতিক্রমী ভঙ্গিতে আবির্ভূত হয়েছেন।
অরনিথন যন্ত্রের বিশেষ শিক্ষাদান পদ্ধতির সাহায্যে কর্ভাস অঙ্ক, জ্যামিতি, ইতিহাস, ভূগোল, পদার্থবিদ্যা ও রসায়নসহ নানা বিষয়ে অল্পবিস্তর শিক্ষা লাভ করতে শুরু করে। অবশ্য সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে সংখ্যা চিহ্নিতকরণ এবং অল্প কয়েকটি শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমেই সে তার শিক্ষার পরিচয় দিত। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কর্ভাসের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটে, যা তাকে সাধারণ পাখির পর্যায় থেকে অনেক উঁচুতে তুলে নিয়ে যায়। তার মধ্যে আশ্চর্যভাবে মানবীয় বুদ্ধিমত্তা বা হিউম্যান ইন্টেলিজেন্সের বিকাশ ঘটেছিল।
এই মানবীয় বুদ্ধিমত্তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন গল্পে পাওয়া যায়। প্রথমত, প্রফেসর শঙ্কু যখন সান্তিয়াগো যাওয়ার জন্য সুটকেস গোছানোর কাজ শেষ করেন, তখন তিনি দেখেন কর্ভাস ঠোঁটে সুটকেসের চাবি নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এটি কেবল অনুকরণ নয়, বরং পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতার পরিচয়।
দ্বিতীয়ত, যাত্রার ঠিক আগে কর্ভাস খাঁচার মধ্যে অস্বাভাবিক ছটফটানি শুরু করে। তার আচরণ দেখে মনে হয়েছিল, সে যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি শঙ্কুর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে।
তৃতীয়ত, খাঁচার দরজা খুলে দিতেই কর্ভাস উড়ে গিয়ে রাইটিং টেবিলের দেরাজে ঠোঁট দিয়ে বারবার টোকা দিতে থাকে। দেরাজ খুলে দেখা যায়, সেখানেই সান্তিয়াগো যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাসপোর্টটি রয়ে গেছে।
এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে কর্ভাসের মধ্যে স্মৃতিশক্তি, উপস্থিত বুদ্ধি, পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষমতা এবং দায়িত্ববোধের মতো মানবীয় গুণাবলি বিকশিত হয়েছিল। তাই কর্ভাসের আচরণে হিউম্যান ইন্টেলিজেন্সের সুস্পষ্ট প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।
প্রশ্ন : কর্ভাসকে কে, কীভাবে চুরি করেছিল? সেই বিপদ থেকে তার উদ্ধারকার্য কীভাবে সম্পন্ন হয়?
উত্তর : বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় সাহিত্য সৃষ্টিতেও অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী। বিশেষ করে রহস্য গল্প-উপন্যাস এবং কল্পবিজ্ঞান নির্ভর সৃষ্টিগুলিতে তিনি অনন্য। তাঁর সৃষ্ট দুটি অমর চরিত্র ফেলুদা এবং প্রফেসর শঙ্কু। প্রফেসর শঙ্কু সত্যজিৎ রায়ের চেতনায় উদ্ভাসিত এক আদর্শ বিজ্ঞানীর সার্থক মূর্তি যেন। তাকে কেন্দ্র করেই একটি অসাধারণ গল্প গড়ে উঠেছে, যার নাম কর্ভাস। এই গল্পে শঙ্কু পক্ষী-প্রশিক্ষক হিসেবে এক ব্যতিক্রমী ভঙ্গিতে আবির্ভূত হয়েছেন।
কর্ভাসকে চুরি করেছিল চিলির বিখ্যাত জাদুকর আর্গাস। আর্গাস ছিলেন একজন খ্যাতনামা পেশাদার ঐন্দ্রজালিক, যার যাদুকৌশল ও সম্মোহনী শক্তির অসাধারণ দক্ষতা ছিল। পক্ষী-সম্মেলনে কর্ভাসের আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তা দেখে সে গভীরভাবে মুগ্ধ হয় এবং কর্ভাসকে নিজের দখলে নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করে।
একদিন রাতে আর্গাস নাটকীয়ভাবে প্রফেসর শঙ্কুর হোটেল কক্ষে উপস্থিত হয়। সে কর্ভাসের বুদ্ধিমত্তার ভূয়সী প্রশংসা করে এবং হঠাৎই তাকে কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু শঙ্কু এই অযৌক্তিক প্রস্তাবে রাজি হননি। ফলে আর্গাস অপমানিত হয়ে ফিরে যায়।
পরদিন দুপুরে শঙ্কু বাইরে থেকে ফিরে এসে দেখেন, ঘরের দরজা খোলা এবং খাঁচাসহ কর্ভাস উধাও। পরে জানা যায়, আর্গাস হোটেলের বয়দের হিপনোটাইজ করে ডুপ্লিকেট চাবির সাহায্যে ঘরে প্রবেশ করেছিল এবং কর্ভাসকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল।
কর্ভাসকে উদ্ধারের জন্য শঙ্কু পুলিশের সাহায্য নেন। গ্রেনভেল ও অন্যান্য পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দ্রুত ভালপারাইজোর রাস্তার দিকে রওনা দেন। প্রায় চল্লিশ মাইল অতিক্রম করার পর একটি দুর্ঘটনাগ্রস্ত সিলভার ক্যাডিলাক গাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। গাড়ির ভিতরে ছিল কর্ভাসবিহীন খাঁচা।
হঠাৎ আর্গাসের চিৎকার শোনা যায়। দেখা যায়, কর্ভাস একটি অ্যাকাসিয়া গাছে বসে আছে এবং তার ঠোঁটে রয়েছে আর্গাসের সোনার চশমা। চশমা হারিয়ে আর্গাস কার্যত দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েছিল এবং সেই কারণেই দুর্ঘটনার শিকার হয়। ফলে তাকে সহজেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। এভাবে কর্ভাস নিজের বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নিজেকেই উদ্ধার করে এবং শেষ পর্যন্ত প্রফেসর শঙ্কুর কাছে ফিরে আসে।
────────────────────────
প্রশ্ন : কর্ভাস গল্প অবলম্বনে কাকটির চারিত্রিক রূপরেখা নির্মাণ করো।
উত্তর : যে কোনো গল্পে কোনো বিশেষ চরিত্রের উজ্জ্বল বিশিষ্টতা গল্পকে শিল্পসফল করে তোলে। এজাতীয় চরিত্র সাধারণত বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে, স্বাভাবিক বিকাশের ধারায় এগিয়ে চলে, অন্যদের প্রভাবিত করে এবং তার মধ্যে মানবিক ঔচিত্যবোধ কাজ করে। এসব গুণের সমন্বয়ে চরিত্রটি গল্পের নিয়ন্তা-শক্তি হয়ে ওঠে। ‘কর্ভাস’ গল্পের কর্ভাস চরিত্রটিও এই পথ ধরেই পাঠকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে পাখিকে কেন্দ্র করে বহু গল্প রচিত হয়েছে। উপেন্দ্রকিশোরের ‘টুনটুনি ও বিড়াল কথা’, ‘টুনটুনি ও রাজার কথা’, সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘তোতা কাহিনী’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাকাহিনী’ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কিন্তু ‘কর্ভাস’ গল্পে পাখিটি কোনো রূপক চরিত্র নয়; তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও গুরুত্ব রয়েছে।
কর্ভাস একটি কাক। তার ডান চোখের নিচে একটি সাদা ফুটকি ছিল, যা তাকে অন্য কাকদের থেকে পৃথক করে তোলে। প্রফেসর শঙ্কু প্রথম দেখাতেই তার এই বিশেষত্ব লক্ষ্য করেন। কর্ভাস খুব সহজেই অরনিথন যন্ত্রের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করে। মানুষের সান্নিধ্যের প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল। এমনকি নিউটনের সঙ্গেও তার সহজ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
ভাষা শেখা, লেখা এবং অঙ্ক করার ক্ষেত্রে কর্ভাসের দক্ষতা ছিল বিস্ময়কর। সে ঠোঁটে পেন্সিল ধরে নিজের নাম, মাস, তারিখ এবং সহজ অঙ্ক লিখতে পারত। তার মধ্যে ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধও ছিল। দর্শকদের করতালির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে টেবিলে ঠকঠক শব্দ করত। তবে জোর করে কিছু করাতে গেলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাত।
কর্ভাস চরিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, প্রভুভক্তি এবং কৃতজ্ঞতাবোধ। এই গুণগুলির কারণেই সে আর্গাসের সমস্ত ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত শঙ্কুর কাছেই ফিরে আসে।
────────────────────────
প্রশ্ন : আর্গাস চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা করো।
উত্তর : সত্যজিৎ রায় রচিত শঙ্কু সিরিজের ‘কর্ভাস’ গল্পে আর্গাস একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্মরণীয় চরিত্র। প্রফেসর শঙ্কুর জ্ঞান, মানবিকতা ও সততার বিপরীতে আর্গাসকে দেখানো হয়েছে লোভ, অহংকার এবং স্বার্থপরতার প্রতীক হিসেবে। এই কারণেই তিনি গল্পের প্রধান খলচরিত্র।
আর্গাসের পুরো নাম ডেমিনগো বার্তেলেমে সামিয়েনতো। সে চিলির সান্তিয়াগোর বাসিন্দা এবং পেশায় একজন বিখ্যাত ঐন্দ্রজালিক। মাত্র ঊনিশ বছর বয়স থেকেই সে যাদুবিদ্যার প্রদর্শন করে খ্যাতি অর্জন করে। একসময় জিপসিদের সঙ্গেও সে কিছুদিন কাটিয়েছিল। ফলে যাদুবিদ্যা এবং সম্মোহন বিদ্যায় তার দক্ষতা ছিল অসাধারণ।
পক্ষী-সম্মেলনে কর্ভাসকে দেখে আর্গাস বিস্মিত হয়ে যায়। কর্ভাসের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা তাকে এতটাই আকৃষ্ট করে যে, সে যেকোনো মূল্যে তাকে নিজের দখলে আনতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই তার চরিত্রের লোভী ও দাম্ভিক দিকটি প্রকাশ পায়। সে নিজের বিপুল সম্পদের গর্ব করে এবং প্রফেসর শঙ্কুকে অর্থের বিনিময়ে কর্ভাস বিক্রি করতে রাজি করানোর চেষ্টা করে।
শারীরিক দিক থেকেও আর্গাস ছিল অদ্ভুত চেহারার মানুষ। সে প্রায় ছয় ফুট লম্বা, শীর্ণকায় এবং টিয়া পাখির মতো নাকবিশিষ্ট। চোখে ছিল মাইনাস কুড়ি পাওয়ারের চশমা। তবে তার হাতের যাদুকৌশল দর্শকদের সহজেই মুগ্ধ করত।
প্রফেসর শঙ্কু কর্ভাসকে বিক্রি করতে অস্বীকার করলে আর্গাস সম্মোহনী শক্তি ও ডুপ্লিকেট চাবির সাহায্যে তাকে চুরি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কর্ভাসের উপস্থিত বুদ্ধির কাছে সে পরাজিত হয়। দাম্ভিক, উদ্ধত, খ্যাতিলোলুপ ও স্বার্থপর আর্গাস তাই গল্পে এক সফল খলচরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

