জোগো বনিতো: দুলে চলা এক সভ্যতার রূপকথা (পর্ব- ১)

অনিশ রায়—

তারা একে খেলল—
আর আমরা বুঝলাম,
শরীর কেবল বর্তমান নয়,
স্মৃতি-ভাণ্ডারের সজীব ভাণ্ড।
 
তারা একে খেলল—
আর ছন্দ মিলে গেল,
যুক্তির পথ সোজা নয় সর্বদা।
জগৎ এবারও জানল। 
 
ক্ষমতা চোখ নামাতে বাধ্য হল,
কারণ তারা দোলা জানত—
জানত দোলের গভীর কৌশলও।
 
তারা দেখাল—
ছলনা মানে লুকোনো নয়,
সময় আর স্থান খোঁজার অব্যয়।
 
ঝুঁকি মানে হঠকারিতা নয়,
ঝুঁকি মানে দায় স্বীকার।
ঝুঁকি মানে নিজেদের উদ্ধার।
 
ড্রিবল মানে অন্যকে পিছনে ফেলে যাওয়া নয়,
ড্রিবল মানে নিজেকে
এক মুহূর্তও 
অস্বীকৃত হতে না-দেওয়া।
জগতের আনন্দধারায় অবাধ ভেসে যাওয়া।
 
একদিন ওই শরীরকে বলা হয়েছিল—
চলো, কাজ করো, চুপ থাকো।
শরীর কিছু বলেনি।
কেবলই চলেছিল। 
আর ভিতরে ভিতরে দুলেছিল।
 
এই দোলের ভেতর ছিল
নাচের অক্লান্ত বিভঙ্গ,
লড়াইয়ের ধৈর্য,
আর অপেক্ষার প্রবোধ।
 
সাম্বা সেদিনও নিছক উৎসব ছিল না,
ক্যাপোইরা তখনও নিছক যুদ্ধ ছিল না।
ছিল প্রতিরোধের নাচ৷ 
নাচের মধ্যে যুদ্ধ। 
যুদ্ধের মধ্যে সংগীত।
সংগীতে ছন্দের দোলা।
ছন্দে ছন্দে ললিত নাচের তাল।    
 
তারপর সেই দোলের বহমান অভ্যাস
পেল একটি চামড়ার বল।
প্রতিষ্ঠান দিয়েছিল নাম, ফুটবল। 
 
বলটা খুব ভারী ছিল,
আর মাঠ ছিল অসমান,
কিন্তু শরীর কেমন করে যেন বুঝেছিল—
এভাবে মেনে নিয়ে সোজা চলে যাওয়া, 
শুরুর আগেই হেরে যাওয়া নিশ্চয়৷ 
 
তাই তারা বাঁক নিল।
তাই তারা থামল।
তাই তারা হাসল। 
এমন সময়ে;
যখন হাসাই অপরাধ। নিষিদ্ধ।
 
সেদিন থেকেই,
ফুটবলের চেনা-নিয়ম ভেঙে পড়ল,
তারা ফুটবলকেও শরীরের ছন্দে, ইশারায় নাচাল।
 
জিঙ্গা স্টেপ নয় তখন, না কোনো ভান—
জিঙ্গা হয়ে গেল এক অবস্থান।
 
আমি তোমার মতো হব না।
আমি তোমার নির্দেশ মানি না।  চলব না তোমার প্রত্যাশা মেনে।
— স্পর্ধাও উঠেছিল দুলে। 
কেউ এসে ডাক দিল—‘জোগো বনিতো’ ব’লে।
 
শরীর তো আগেই জানত—
তবু নাম নয়,
এ-যে এক নৈতিক কারুকর্মের দায়।
 
তাই সুন্দরভাবে খেলো—
কারণ কুৎসিতভাবে বাঁচা,
সেই থেকে আমাদের হয়েছে শেখানো। 
 
ভুল করো—
কারণ নিখুঁত হলেই যে, 
আর কিছু জন্মাবে না কোনোদিনও।
ঝুঁকি নাও—
ভয় কোনো উত্তরাধিকার নয় জেনো।
 
সময় এল।
বিশ্ব তাকাল।
কেউ উড়ল,
কেউ থামল।
কেউ ভাঙল।
কেউ জিতল—
কেউ হারল।
 
কিন্তু শরীর হল না নিশ্চল।
আরও আরও প্রাণ পেয়ে গেল। 
 
যখন সৌন্দর্য জিতল,
তাকে বলা হলো ভাগ্য।
যখন সৌন্দর্য হারল,
তাকে বলা হলো বোকামি।
 
কিন্তু সেই পায়ে পায়ে নৃত্যরত শরীর এতদিনে জানে—
সৌন্দর্য উত্তর নয়,
সৌন্দর্য প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা যত। 
বিস্ময় আর আনন্দই সৌন্দর্য। 
 
আজ সমতল মাঠে 
সংখ্যা আছে।
ডেটা আছে।
গ্রাফ আছে।
 
কিন্তু নটরাজ শরীর এখনো মনে রাখে—
একদিন নাচ ছিল প্রতিরোধ,
একদিন ছন্দ ছিল আশ্রয়,
একদিন পবিত্র ছলনাই ছিল— বেঁচে থাকার অপর পরিচয়।
তার জীবনের অশ্রু-আনন্দ-ঘাম।
জোগা বনিতো— এই স্মৃতির বিপ্লবী নাম।  
 
আজ ঝুঁকি অপরাধ,
আজ আনন্দ সন্দেহ,
আজ সৌন্দর্য ব্যয়।
 
তবুও—
একটি পা যদি হঠাৎ থেমে যায়,
তারপর চকিতে ওঠে ঝলসে;
একটি চোখ যদি মুহূর্তের জন্য হাসে,
একটি দেহ যদি বলে—
এখন নয় তো নাই-বা,
এইখানেই, 
এ-ভাবেই সবুজ ঘাসে, হলুদ আলোতে, মাটিতে মিশে থাকো।
শিরায় শিরায় নীল জলের মতো ছলাৎ ছলাৎ দুলে চলো।  
 
তখন ফুটবল আবার মানুষের  হয়।
 
এই রূপকথা তাই আর হয় না শেষ।
 
এ-যে খেলা নয়।
বিধি-নিয়ম নয়। 
নৈতিকতা নয়।
ইতিহাসও নয়।
 
এ এক সচল জায়মান দুরন্ত দেহ—
যে এখনো ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে
নির্মল সভ্যতার ভার মৃদু বাতাসে বয়ে নিয়ে চলে…
 

##########

(দাসত্বউত্তর দেহের খেলা: ব্রাজিল ও জোগো বনিটো পর্ব-১)

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলকে কেবল ক্রীড়ার ইতিহাস হিসেবে পড়া একধরনের তাড়াহুড়ো করে ফেলা। এই তাড়াহুড়োর ফলেই আমরা ট্রফির দিকে তাকাই, স্কোরলাইনের দিকে তাকাই, বিশ্বকাপের সংখ্যার দিকে তাকাই— কিন্তু যে জায়গাটিতে তাকানো সবচেয়ে জরুরি, সেখানেই চোখ ফেরাই না। সেই জায়গাটি হলো দেহ বা দেহভঙ্গি। ব্রাজিলীয় ফুটবল আসলে একটি শরীরের ইতিহাস— যে শরীর  দীর্ঘদিন কোনো রাষ্ট্রভাষায় কথা বলতে পারেনি। কোনো নাগরিক ব্যাকরণে নিজেকে চিনতে শেখেনি। কোনো রাজনৈতিক ও নৈতিক পাঠ্যক্রমে নিজের জায়গা খুঁজে পায়নি।

এই শরীরকে বলা হয়েছিল— চলবে। কাজ করবে। সহ্য করবে। কিন্তু কথা বলবে না।

ঔপনিবেশিক ব্রাজিলে দেহ ছিল উৎপাদনের বস্তু। পোর্তুগিজ শাসনের চোখে শরীরের কোনো আত্মকথা ছিল না; ছিল কেবল শ্রমের হিসেব। দেহের স্মৃতি রাষ্ট্রের কাছে অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু দেহের এমন এক স্মৃতি থাকে, যাকে কোনো শাসন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে পারে না—তা হল ছন্দ। ভাষা যেখানে নিষিদ্ধ হয়, ছন্দ সেখানেই শ্বাস ফেলে, আত্মরক্ষা করে। ইতিহাসের বহু-পর্বে দেখা গেছে, মানুষের মুখ বন্ধ করা গেলেও দেহকে স্থবির করা যায় না। সে দোল খোঁজে। বাঁক খোঁজে। সে নড়াচড়া চায়। এই নড়াচড়াই ব্রাজিলীয় সংস্কৃতির প্রথম রাজনৈতিক উত্তর।

এই কারণে ব্রাজিলের ইতিহাস শুধু ঘটনাক্রমের ইতিহাস নয়; এখানে আছে দেহভঙ্গির ইতিহাসও। দাসত্ব-উত্তর ব্রাজিলে যে সমাজ গড়ে উঠেছিল, সেখানে কথা বলার অধিকার ছিল অসমভাবে বণ্টিত। কিন্তু উৎসব ছিল। ধর্মীয় আচার ছিল। লোকসংস্কৃতি ছিল। আর ছিল নাচ। নাচ এখানে বিনোদন নয়—নাচ এখানে বেঁচে থাকার কৌশল। শরীর ও শরীরী বিভঙ্গকে দৃশ্যমান রাখার একমাত্র পথ।

সাম্বা সেই কৌশলের নাম। সাম্বা কোনো নাচের স্টেপ নয়, কোনো সাজানো কোরিওগ্রাফি নয়। তা দেহের বেঁচে থাকার পদ্ধতি। সাম্বায় দেহ আঘাত করে না; সে দোলে, পিছোয়, হঠাৎ এগিয়ে আসে। এখানে প্রতিরোধ আছে, কিন্তু সে প্রতিরোধ প্রকাশ্য নয়। সাম্বা শেখায়— সব আঘাত সরাসরি করতে হয় না। কখনো কখনো আঘাত আসে দোলের ভেতর থেকে, ছন্দের আড়াল দিয়ে।

এই ছদ্মবেশী প্রতিরোধই ব্রাজিলীয় দেহভাষার মূল স্বভাব। আর এই স্বভাবের সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ ক্যাপোইরা। ক্যাপোইরা যুদ্ধ, কিন্তু যুদ্ধের নামে নাচ। উপনিবেশিক চোখে যা ছিল বিনোদন। লোকাচার। বাস্তবে তা ছিল আত্মরক্ষার পাঠ। ক্যাপোইরার দেহ কখনো সোজা আক্রমণ করে না। সে নিচু হয়, ঘোরে, বিভ্রান্ত করে। এই বিভ্রান্তির নাম ‘মালিসিয়া’। শক্তির বিরুদ্ধে শক্তি নয়— শক্তির বিরুদ্ধে কৌশল। এই কৌশলই দাসত্ব-পরবর্তী মানুষের সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র।

এখানে এক মৌলিক বিষয় বোঝা জরুরি। ব্রাজিলীয় সংস্কৃতিতে দেহ কখনোই স্থির নয়। স্থির দেহ মানে শাসিত দেহ। তাই ব্রাজিলীয় দেহভাষা সবসময় চলমান। এই চলমানতা কোনো সৌন্দর্যের খেয়াল নয়; তা রাজনৈতিক প্রয়োজন। দেহকে দৃশ্যমান রাখা মানে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করা। অস্তিত্বকে জায়মান ও জীবন্ত রাখা।

ফুটবল যখন ব্রাজিলে আসে, তখন সে এই প্রস্তুত দেহের সামনে দাঁড়ায়। ইংরেজরা যে খেলাটি এনেছিল, তা ছিল শৃঙ্খলার খেলা। রেখা, নিয়ম, অবস্থান— সবকিছু নির্দিষ্ট। ফুটবল ছিল যুক্তির খেলাও। কিন্তু ব্রাজিলের মাঠ যুক্তি মানে না। আবহাওয়াও মানে না। দেহ-ও তা মানে না। অসম জমি, দারিদ্র্য, অনিয়ম— সব মিলিয়ে নিয়ম ভেঙে পড়ে।

ফলে এখানে ফুটবলকে টিকে থাকতে হলে ধরন বদলাতে হয়। কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় ঘটে। ফুটবল বদলায় না— বদলায় তার ভাষা। সাম্বার দোল ফুটবলে ঢুকে পড়ে। ক্যাপোইরার ‘মালিসিয়া’ ফুটবলের শরীরে বসে যায়। কার্নিভালের মুখোশ মাঠে নামতে শুরু করে।

এইভাবে ফুটবল আর ‘ইংরেজ’ হয়ে থাকে না। সে হয়ে ওঠে ব্রাজিলীয়।

কার্নিভাল এখানে এক পৃথক ভাবনা। কার্নিভাল ব্রাজিলীয় সমাজে একটি অস্থায়ী স্বাধীনতার অবসর ও পরিসর। কিছুদিনের জন্য শ্রেণি ভাঙে। নিয়ম ভাঙে। শালীনতা ভাঙে। দেহ রঙিন হয়। মুখোশ পরে।  নিজেকে প্রকাশ করে। এই কার্নিভাল কোনো পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নয়; সামাজিক চাপ থেকে সাময়িক মুক্তির পরিসর। ফুটবল হয়ে গেল সেই কার্নিভালের দৈনন্দিন সংস্করণ। মাঠে দেহ আর নিজেকে লুকোতে বাধ্য নয়। সে দৃশ্যমান হতে পারে।

এই দৃশ্যমানতা রাজনৈতিক। দাসত্ব-উত্তর সমাজে দেহকে প্রদর্শনও ছিল বিদ্রোহ। এখানেই জোগা বনিটোর নৈতিকতা জন্ম নেয়। সুন্দরভাবে খেলা মানে কেবল দক্ষ হওয়া নয়। সুন্দরভাবে খেলা মানে দেহকে লুকোবে না। ভয় পাবে না। নিজেকে ছোটো করবে না।

এই জায়গাতেই ইংরেজ তথা ইউরোপীয় ফুটবল আর ব্রাজিলীয় ফুটবল আলাদা হয়। ইউরোপে খেলোয়াড় কোচের নকশা অনুসরণ করে। ব্রাজিলে খেলোয়াড় নকশা ভাঙে। এই ভাঙন বিশৃঙ্খলা নয়; বরঞ্চ অন্যরকম শৃঙ্খলা। সাম্বার মতোই এখানে ছন্দ আছে, কিন্তু ছন্দ বাঁধা নয়। এই ছন্দ থেকেই জন্ম নেয় ‘জোগো বনিটো’— খেলার সৌন্দর্যকে দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা।

সেই সৌন্দর্য কোনো বিলাসিতা নয়। দারিদ্র্যের ভেতর জন্মানো এই খেলায় সৌন্দর্য ছিল টিকে থাকার কৌশল। অসম মাঠে বল নিয়ন্ত্রণ, রুক্ষ-কঠিন প্রতিপক্ষের দুর্বল মুহূর্ত তৈরি ও ফাঁক খোঁজা— সবই প্রয়োজনের ফল। স্কিল এখানে অলংকার নয়। স্কিল এখানে সমস্যা সমাধান।

এই কারণে ব্রাজিলীয় ফুটবলে সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা আলাদা নয়। একটি এলাস্টিকো সুন্দর, কারণ তা কার্যকর। একটি দেহভঙ্গি দর্শককে আনন্দ দেয়, কারণ তা প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে। এখানে সৌন্দর্য বাস্তববাদী। তীব্র রাজনৈতিক। 

আর এই বাস্তববাদ গভীরভাবে দেহনির্ভর। ইউরোপীয় ফুটবল চিন্তা, পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেয়। ব্রাজিলীয় ফুটবল স্মৃতিকে। এই স্মৃতি লিখিত নয়, দৈহিক; এই স্মৃতি সঞ্চিত দেহে। নাচে। উৎসবে। খেলায়। ফুটবলার যখন বল পায়, সে শুধু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে না— সে নিজের দেহের স্মৃতি ধারণ করে তা ব্যবহার করে। এই দেহ-স্মৃতির কারণেই ব্রাজিলীয় ফুটবল এত ব্যতিক্রমী। এত ব্যক্তিমাত্রিক। তাই একই পজিশনে দুই ব্রাজিলীয় খেলোয়াড় কখনো একরকম খেলে না। কারণ প্রত্যেকের দেহ সময়-মাত্রায় আলাদা ইতিহাস বহন করে। এই বৈচিত্র্য কোনো পরিকল্পনার ফসল নয়; একেবারেই সামাজিক বাস্তবতার ফল।

এইখানেই ব্রাজিলীয় ফুটবল একক হয়ে ওঠে। কারণ এ কোনো ফর্মুলা নয়। তা অনুকরণযোগ্য নয়। অনুকরণ করলে ট্রিক পাওয়া যায়, দর্শন পাওয়া যায় না। এখানে যে বিষয়টি স্পষ্ট করতে  হয়— ব্রাজিলীয় ফুটবল কোনো পরিকল্পনার ফল নয়। দাসত্ব-উত্তর দেহের দীর্ঘ লড়াইয়ের নান্দনিক পরিণতি। সাম্বা, ক্যাপোইরা, কার্নিভাল— সব মিলিয়ে ফুটবল এখানে দেহের নতুন ভাষা।

সাম্বা নাচ নয়: ছন্দময় প্রতিরোধ 

নাচকে আমরা প্রায়ই ভুল বিচার করি। তাকে বিনোদনের খোপে ঢুকিয়ে দিই। মনে করি— দিনের কাজ সেরে, পারিবারিক-সামাজিক-ঐতিহাসিক স্তরের দায় মিটিয়ে, চেনা-রাজনীতির হিসেব চুকিয়ে মানুষ নাচে। কিন্তু দাসত্ব-উত্তর সমাজে নাচ কাজের পরে আসে না। নাচ-ই কাজ। নাচ-ই ইতিহাস। নাচ-ই রাজনীতি। সাম্বাও সেই ভুল বোঝাবুঝির প্রথম শিকার। আমরা সাম্বাকে দেখি রঙিন পোশাকে, কার্নিভালের আলোয়, হাসির ফোয়ারায়। কিন্তু এই দেখা একধরনের নিরাপদ দেখা। যেখানে সাম্বা আমাদের আনন্দ দেয়; কিন্তু ভাবায় না। অথচ সাম্বার জন্ম ভাবনাজাত প্রশ্ন থেকে। সাম্বা জন্মেছে এমন এক সমাজে, যেখানে দেহ কথা বলতে পারত না, যেখানে শরীরী নড়াচড়াই কথার বিকল্প হতে পারে; তাই শরীরী নড়াচড়া বন্ধ হয়নি কোনোকালেই।

ফলত সাম্বা কেবল নাচের নাম নয়। সাম্বা হলো ছন্দের আশ্রয়ে, দেহ-দোলের ভিতর দিয়ে বেঁচে থাকার পদ্ধতি। বেঁচে থাকার বিকল্প ও অবলম্বন।

ছন্দ এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। কারণ ছন্দ মানে নিয়ম নয়; ছন্দ মানে পুনরাবৃত্তি, কিন্তু যান্ত্রিক নয়। ছন্দ মানে প্রত্যাবর্তন, কিন্তু হু-বহু নয়। পাশ্চাত্য সংগীতে যেখানে মিটার নির্দিষ্ট, সেখানে আফ্রিকান ছন্দে রয়েছে পলিরিদম— একাধিক ছন্দ একসঙ্গে, একে অপরকে অস্বীকার না-করে। এই বহুস্বরে চলা-ই সাম্বার প্রাণ। এবং এই বহুস্বরে চলাই উপনিবেশ-প্রভাবাচ্ছন্ন সমাজের বাস্তবতা। একটি দেহ যদি একটিমাত্র ছন্দে আটকে থাকে, তবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। কিন্তু দেহ যদি একাধিক ছন্দে চলে— তখন সে শাসনের বাইরে যায়। অন্তত সম্ভাবনা তৈরি হয়৷ সাম্বা সেই বহুছন্দের দেহচর্চা। এখানে দেহ কখনো সামনে যায়, কখনো পিছোয়, কখনো পাশে সরে যায়। সরলরেখায় চলা এখানে অস্বাভাবিক। এই অ-সরলতা একেবারেই নান্দনিক বিলাস নয়। তা রাজনৈতিক বুদ্ধি। দাসত্বের সমাজে সরলতা মানে বিপদ। সোজা দাঁড়ালে চাবুক পড়ে। চোখে চোখ রাখলে শাস্তি। তাই দেহ নিজেই মন্ত্র পেয়ে যায় ঘূর্ণনের৷ শিখে নেয় ঘুরে ঘুরে দাঁড়াতে। বাঁক নিতে। আত্মরক্ষার্থে ভান বা ছল বা কৌশল করতে। যে ভান বা ছলের সঙ্গে নাটকের গভীর সম্পর্ক আছে। গ্রিক নাটকে যেখানে ট্র্যাজেডি মুখোমুখি দাঁড়ানো সংঘর্ষ, সেখানে আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান দেহনাট্যে সংঘর্ষ পরোক্ষ। মুখোশ আছে। ছদ্মবেশ আছে। যেমন কার্নিভালে থাকে। নাটক এখানে মঞ্চে নয়; রাস্তায়। সংলাপ শব্দে নয়— পায়ে, কোমরে, কাঁধে।

এইখানেই সাম্বা আর ইউরোপীয় ব্যালে আলাদা হয়। ব্যালে শৃঙ্খলার শরীর। মেরুদণ্ড সোজা, ভরকেন্দ্র স্থির, সেখানে মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে শরীরকে টেনে তোলা। সাম্বা তার উল্টো। এখানে ভরকেন্দ্র নড়ে। মেরুদণ্ড ঢিলে। মাধ্যাকর্ষণ শত্রু নয়— সহচর। দেহ মাটির সঙ্গে কথা বলে। আর মাটির সঙ্গে কথোপকথনই সাম্বাকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। কারণ উপনিবেশিক শাসন দেহকে মাটি থেকে আলাদা করতে চেয়েছিল। দাস মানে ছিল বিচ্ছিন্ন দেহ— ভূমি থেকে, স্মৃতি থেকে, দেবতা থেকে। সাম্বা সেই বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে দেহকে আবার মাটিতে নামায়। এই দৃষ্টিতে দেখলে, সাম্বা একটি দার্শনিক অবস্থান। যা বলে— শাসনের নির্দেশাবলিতে আমি ভারসাম্য রাখব না। আমি দুলব। আমি এক জায়গায় দাঁড়াব না। আমি নড়ব। এই নড়াচড়াই স্বাধীনতার প্রথম ভাষা।

নিউটনীয় বলবিদ্যায় যেমন স্থিরতা মানে নিয়ন্ত্রণযোগ্য অবস্থা। কিন্তু ক্যাওস থিওরি আমাদের শেখায়— অস্থিতিশীলতার মধ্যেও প্যাটার্ন থাকে। সাম্বা সেই ক্যাওস-প্যাটার্ন। বাইরে থেকে বিশৃঙ্খলা, ভেতরে ছন্দ। এই দ্বৈততা শাসকের কাছে ভয়ংকর। কারণ সে বিশৃঙ্খলা দেখে। অথচ ছন্দ ধরতে পারে না। এই ছন্দই সমাজ-রাজনীতি-প্রকৃতির স্বাভাবিকতায় ব্রাজিল ফুটবলে ঢুকে পড়ে।

ফুটবলে আমরা যখন বলি— ‘ব্রাজিলীয় ড্রিবল’— তখন আমরা আসলে সাম্বার একটি রূপের কথা বলি। ড্রিবল মানে কেবল বল পায়ের সঙ্গে রাখা নয়। কাউকে শুধু পিছনে ফেলে যাওয়া নয়। ড্রিবল মানে প্রতিপক্ষকে সময়ের ভুল হিসেব করাতে বাধ্য করা। যেমন সাম্বায় শরীর প্রতিপক্ষের চোখকে ভুল ছন্দ ধরাতে বাধ্য করে। এইখানে পাশ্চাত্য সংগীত আর আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান সংগীতের তফাৎ মনে রাখা দরকার। ইউরোপীয় সংগীতে ‘ডাউনবিট’ স্পষ্ট। আপনি জানেন, কোথায় জোর পড়বে। কিন্তু সাম্বায় জোর সরে যায়। আপনি ধরতে পারবেন না, ঠিক কোথায় আঘাত আসবে। এই অনিশ্চয়তাই তার শক্তি। ফুটবল মাঠে ব্রাজিলীয় খেলোয়াড় এই অনিশ্চয়তা নিয়ে আসে। প্রতিপক্ষ যেখানে প্যাটার্ন খোঁজে, সেখানে ব্রাজিলীয় দেহ প্যাটার্ন ভাঙে। তা কোনো তাৎক্ষণিক বুদ্ধির ফল নয়; তা দেহের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণ কোনো একাডেমিতে হয়নি। হয়েছে রাস্তায়। উঠোনে। উৎসবে। যেখানে দেহকে একাধিক কাজ একসঙ্গে করতে হয়েছে— নাচতে। বাঁচতে। পালাতে। লুকোতে। এই বহুকাজের স্মৃতি দেহে জমা থাকে।

আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান সাহিত্যেও বর্ণনা সরল নয়। সময় ভাঙা। স্মৃতি টুকরো টুকরো। তা কোনো পরিশীলিত বিন্যাস নয়। তা বাস্তবতার গঠন। সাম্বা সেই ভাঙা সময়ের দেহগত রূপ। সিনেমাতেও একই কথা। ইতালিয়ান নিও-রিয়ালিজম যেখানে ক্যামেরা স্থির রেখে বাস্তব ধরতে চায়, ব্রাজিলীয় সিনেমায়— বিশেষ করে পরের দিকের সিনেমা ‘নোভো’তে ক্যামেরা কাঁপে। স্থিরতা নেই। দেহের সঙ্গে ক্যামেরাও নড়ে। এমন নড়াচড়া কোনো অপটুত্ব নয়; তা সামাজিক মনস্তত্ত্বের নৈতিক সিদ্ধান্ত। ওই নৈতিকতাই সাম্বার ভেতরে। সাম্বা দুলে দুলে বলে চলে— স্থিরতা মানেই নিয়ামিক সত্য নয়। নড়াচড়াও সত্য। কখনো কখনো নড়াচড়াই একমাত্র সত্য। 

এই কারণেই সাম্বা দাসত্ব-উত্তর সমাজে শুধু বিনোদন নয়— তা আসলে অস্তিত্বের অনুশীলন। সাম্বা শেখায়— কীভাবে সরাসরি আঘাত না-করে টিকে থাকতে হয়। কীভাবে আনন্দকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। কীভাবে হাসির আড়ালে স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এই স্মৃতি ফুটবলে এসে পড়লে, খেলা আর কেবল ফলাফলের থাকে না। খেলা হয়ে ওঠে দৃশ্যমানতা। ড্রিবল তখন কেবল প্রতিপক্ষকে হারানো নয়; ড্রিবল মানে— আমাকে দেখো। আমি আছি। আমি আছি। বিস্ময়ে তাই জাগে আমার নাচ। নাচের অবিরাম ছন্দ।

এই ‘দেখো’, দাসত্ব ছাড়াতে চাওয়া সমাজে, দেহকে দেখানোই যে এক রাজনৈতিক কর্মসূচি। সাম্বা সেই দেখানোর রিহার্সাল। ফুটবল তার বৃহত্তর মঞ্চ। তাই বুঝতে পারব নিশ্চয়ই— কেন ব্রাজিলীয় ফুটবল এত আনন্দমুখর হয়েও এত গভীর। কারণ এই আনন্দ ভুলে যাওয়ার আনন্দ নয়। মনে রাখার আনন্দ। দেহ মনে রাখে— চাবুক, শিকল, নিষেধ। আর সেই স্মৃতিকে অস্বীকার না-করে, তাকে ছন্দে রূপ দেয়।

ওই রূপান্তরই শিল্প।

এই কারণেই সাম্বা কখনো নিরীহ নয়। সে হাসে, কিন্তু বোকা নয়। সে নাচে, কিন্তু ভুলে যায় না। সে আনন্দ দেয়, কিন্তু আত্মসমর্পণ করে না। ফুটবল মাঠে এই সাম্বা যখন দৌঁড়াতে শুরু করে, তখন জন্ম নেয় এক বিশেষ বিশ্বাসের নৈতিকতা—ঝুঁকি নেওয়া। সাম্বা শেখায়— স্থির থাকাই সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকি। সবচেয়ে নির্মম বিপদ৷ 

(চলবে…)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top