R9, রোনালদো লুইস নাজারিও দ্য লিমা : সীমার ওপারের এক মানব-পুরাণ
অনিশ রায়
(১)
রোনালদো নাজারিও, নম্বর ৯, আর-নাইন—একটি সংখ্যা, একটি নাম, নাকি মানুষের সম্ভাবনার এক নিঃশব্দ প্রমাণ? ফুটবলের ইতিহাসে অনেক মহান খেলোয়াড় এসেছেন। গেছেন। কেউ রেকর্ড বানিয়েছেন। কেউ ভেঙেছেন। কিন্তু কিছু বিরল মানুষ থাকেন, যাদের অর্জন সংখ্যায় ধরা যায় না, শুধুই অনুভূতিতে কাজ করে। আর-নাইন সেই দ্বিতীয় বৃত্তের মানুষ— যার খেলা, শরীর, ভাঙন, বীভৎসতা, সৌন্দর্য ও নীরবতা আমাদের মানুষ ও ফুটবলার সম্পর্কে ধারণাকেই বদলে দেয়। মানুষের বা ফুটবলারের অর্জনের একটা অংশ দৃশ্যমান— গোল, শিরোপা, পরিসংখ্যান, ট্রফি। আরেকটা অংশ অদৃশ্য— বীভৎসতা, বিস্ময়, শিল্প, সৌন্দর্য, ক্ষণস্থায়িত্ব, অনিবার্যতা। রোনালদোর গল্প আসলে এই অদৃশ্য অংশের ইতিহাস।
রিও দে জেনেইরোর ধুলোমাখা গলি থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ ফাইনালের আলো পর্যন্ত তার যাত্রা কোনো মেলোড্রামাটিক সিনেমা নয়; বরং শরীর-মন-সম্ভাবনার এক দীর্ঘ পরীক্ষাগার। এমন বললে তা অত্যুক্তি হয় না, বরং তারপরেও অনেকটাই না-বলা থেকে যায়। আসলে সে তৈরি হয়নি, সে হয়ে উঠেছে। মানবশরীর, স্নায়ুবিজ্ঞান, সৌন্দর্যবোধ ও মানসিক শক্তির এক বিশেষ সংযোগবিন্দুতে। তার শরীর— যন্ত্রের মতো কার্যকর, আবার মানুষের মতোই ভঙ্গুর। তার মন— শিশুর মতো সহজ, আবার যোদ্ধার মতো নির্মম, দৃঢ়, নির্ভীক। ঋজু-কঠিন অথচ অভিযোজনীয়। তার খেলা ঝড়ের মতো আক্রমণাত্মক। কিন্তু শেষ-মুহূর্তে সুদক্ষ শল্যচিকিৎসকের হাতের মতো নিখুঁত। ধীর। অকম্পিত৷
তাই R9-কে কেবল এক ফুটবলার হিসেবে নয়, তাঁকে এক বিরল মানব-অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখাই সংগত। যেখানে পদার্থবিদ্যা, স্নায়ুবিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব, শিল্পতত্ত্ব, দর্শন ও সামাজিক বাস্তবতা এক ফ্রেমে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু এই মানব-অভিজ্ঞতার আরেক স্তর আছে—তা ইতিহাস। কারণ R9 শূন্যে আবির্ভূত হননি। তিনি এমন এক ফুটবল-সময়ে এসেছিলেন, যখন ৯০-এর দশকের ইউরোপীয় ফুটবল ধীরে ধীরে পুরোনো ‘নাম্বার নাইন’-এর সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছিল। স্ট্রাইকার মানে শুধু বক্সের ভিতর বা কাছাকাছি অপেক্ষা করে থাকা মানুষ হলে আর চলবে না। স্ট্রাইকারকে নেমে আসতে হবে। বল নিতে হবে। জায়গা বানাতে হবে। আবার সেই জায়গায় ফিরে গিয়ে নিজেই আক্রমণ শেষ করতে হবে। একদিকে ইতালীয় প্রতিরক্ষার সংগঠিত জোনাল বুদ্ধি, অন্যদিকে ডাচ ও ব্রাজিলীয় আক্রমণাত্মক স্বাধীনতা, স্পেনের টেকনিক্যাল সংস্কৃতি, ইংল্যান্ডের দ্রুত ট্রানজিশন—এই সমস্ত ফুটবলীয় ধারার সংযোগস্থলে R9 নিজের পরিভাষা তৈরি করেছিলেন। তাঁর বিশেষত্ব ছিল, তিনি কোনো একক ঘরানার ছাত্র হয়ে থাকেননি; বরং একাধিক ঘরানাকে নিজের শরীরের মধ্যে এমনভাবে মিশিয়ে নিয়েছিলেন যে, তার খেলার আলাদা কোনো ব্যাকরণ খুঁজতে গেলে শেষপর্যন্ত রোনালদো নাজারিওর কাছেই ফিরে আসতে হয়। আর কোনো বিকল্প পথ বা বিকল্প দৃষ্টান্ত নেই৷
(২)
প্রথমে R9-এর ফিজিক্স অব ফিজিক্যাল বিল্ট: অর্থাৎ তাঁর গতি, দৌড় ও বিস্ফোরণের নীরব সমীকরণ বুঝতে চেষ্টা করি। R9-কে বুঝতে গেলে প্রথমেই আসতে হয় তার শরীরের দিকে। তিনি শক্তিশালী ছিলেন নিশ্চিত, কিন্তু কেবল ‘পাওয়ার’ দিয়ে তাকে বোঝা যায় না। তার শরীর ছিল এক সূক্ষ্ম টিউন করা বায়োমেকানিক্যাল সিস্টেম—যেখানে দ্রুত সংকোচনক্ষম ফাস্ট-সুইচ পেশি, হিপ মেকানিক্স, জয়েন্ট টর্ক, সেন্টার অব গ্রাভিটি, রিয়্যাকশন টাইম— সবকিছু মিলেই গড়ে উঠেছিল অন্য মাত্রার গতি।
তার গতি ছিল তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো।
প্রথমত, ‘ফাস্ট-সুইচ মাসল
ফাইবারের’ অস্বাভাবিক ঘনত্ব তাকে মাত্র কয়েক ধাপে শীর্ষ গতিতে পৌঁছে দিত। তিনি ‘লম্বা–ছোটো–লম্বা’ স্ট্রাইডের একটি অদ্ভুত বিন্যাস ব্যবহার করতেন—একটি লম্বা পদক্ষেপে দূরত্ব গিলে নেওয়া, কয়েকটি ছোটো পদক্ষেপে ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠা; ভগ্নাংশ বিরতি; তারপর হঠাৎ বিস্ফোরণ। ডিফেন্ডারের দেহ তখনও সমন্বয় ঠিক করতে ব্যস্ত, আর তিনি এরই মধ্যে অবস্থান বদলে ফেলেন।
দ্বিতীয়ত, তার ‘হিপ ফ্লেকশন’ এমনভাবে কাজ করত যে প্রতিটি স্ট্রাইডে হিপের লোডিং থেকে অতিরিক্ত ‘স্টোরড এনার্জি’ বেরিয়ে আসত। এর ফলে সে কম স্টেপে বেশি ট্রেরেস্ট্রিয়াল ইনার্শা(ভূ-জড়তা) নিয়ে সামনে ঠেলে দিতেন নিজেকে।
তৃতীয়ত, তার ‘সেন্টার অব গ্রাভিটি’ অস্বাভাবিকভাবে নীচু ও স্থিতিশীল ছিল। উপরের অংশ নমনীয়, নিচের অংশ ইটের দেওয়ালের মতো দৃঢ়—ডিফেন্ডার ধাক্কা দিলে শরীর নড়ত, কিন্তু অক্ষ ভাঙত না। এই কারণেই দৌড়ের সময় তার শরীর সে-অর্থে দুলত না। বল পায়ের সামনে ৩০–৫০ সেন্টিমিটার দূরে থাকত, এবং গতি এতটুকু কমে যেত না।
তাঁর দৌড় সরলরেখায় ছিল না; ছিল ত্রিভুজ, তির্যক, আর্ক। এক ডায়াগনাল থেকে আরেক ডায়াগনালে কাট করতে করতে সে প্রতিপক্ষের কভার করিডরগুলো ছিঁড়ে ফেলতেন। কখনও ফ্ল্যাট স্প্রিন্ট নয়—বরং গতির ‘পালস’, ‘তরঙ্গ’, ভেতরে-বাইরে গতি বাড়ানো-কমানো, কম্বাইন কন্ট্রোল। এই ‘কাইনেটিক ডিসেপশন’-ই ডিফেন্ডারকে ভুল টাইমিং-এ ট্যাকল করতে বাধ্য করত। গতি তার কাছে কেবল দ্রুততার বিষয় ছিল না; ছিল সময় ও স্থানের(time and space) ওপর এক নিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাচারিতা।
এইখানেই R9-এর দৌড়ের সবচেয়ে বড়ো রহস্য। তিনি শুধু দ্রুত ছিলেন না; সে দ্রুততার মধ্যেই, বা জাস্ট পরবর্তী লহমায় ধীর হতে জানতেন। আধুনিক ফুটবলে অ্যাক্সেলারেশন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ডিসেলারেশন-ও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডিফেন্ডারকে হারানোর জন্য সবসময় তার চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে হয় না; কখনও কখনও তাকে থামিয়ে দিতে হয়। R9 এই থামার শিল্প জানতেন। এক মুহূর্তে তিনি শরীরকে সামান্য শিথিল করতেন, যেন আক্রমণের গতি শেষ; ডিফেন্ডারের শরীর তখন নিজের ভার সামনের দিকে দিয়ে ফেলত; ঠিক সেই মুহূর্তে আবার বিস্ফোরণ। অর্থাৎ তাঁর অ্যাক্সেলারেশনের শক্তির সঙ্গে ডিসেলারেশনের বুদ্ধি যুক্ত ছিল। গতি সেখানে কেবল পায়ের শক্তি নয়—গতি ছিল প্রতিপক্ষের গতির ওপর নিয়ন্ত্রণ।
এই কারণেই R9-এর বহু সেরা দৌড়কে শুধুমাত্র ‘স্প্রিন্ট’ বলা যায় না। সেখানে ছিল ‘রিদম ম্যানিপুলেশন’। তিনি নিজের গতির ছন্দ বদলাতেন। আর সেই ছন্দের সঙ্গে ডিফেন্ডারের স্নায়ুতন্ত্রকে জড়িয়ে ফেলতেন। ডিফেন্ডার সাধারণত আক্রমণকারীর পায়ের দিকে তাকায়, কিন্তু R9 তাকে নিজের শরীরের দিকে তাকাতে বাধ্য করতেন। শরীর একদিকে কথা বলত, পা অন্যদিকে। কাঁধ একদিকে, কোমর অন্যদিকে। চোখ সামনে, বল পায়ের তলায়। ফুটবলীয় ডিসেপশন-এর এমন সংহত রূপ খুব কম খেলোয়াড়ের মধ্যে দেখা গেছে।
(৩)
এবার R9-এর দিক-বদলের শিল্প: তার ড্রিবল, মাইক্রো টাচ ও কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তা তৈরি করার মতো বিষয় নিয়ে বলা যাক৷ অনেক খেলোয়াড় ড্রিবল করে গতি বা আমোদ(মজা) দেখাতে বা খেলার শর্ত-সাপেক্ষ প্রয়োজনে। আর-নাইনের ড্রিবল ছিল ডিফেন্ডারের স্নায়ুতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ আক্রমণ; প্রচণ্ড স্ফুর্তির স্বকীয়তায়। বিপক্ষের খেলার হিসেবটাই তছনছ করতে। ফুটবলের ভাষায় তার ওইটাকেও ‘ড্রিবল’-ই বলতে হয় আমাদের। কিন্তু এর ভিতরে কাজ করত— রিঅ্যাকশন টাইম (প্রতিক্রিয়া-সময়), পারসেপশন ল্যাটেন্সি (অনুধাবন-বিলম্ব), মোটর প্ল্যানিং (গতিশক্তি-পরিকল্পনা), ওয়েট শিফট (ওজন-স্থানান্তর), প্রবাবিলিস্টিক মুভমেন্ট (সম্ভাবনাভিত্তিক গতি)।
ডিফেন্ডারের পারসেপশন-রিঅ্যাকশন সাইকেল (অনুধাবন–প্রতিক্রিয়া) সাধারণত হয় ০.২৫–০.৩০ সেকেন্ড। আর-নাইন তার দিক বদল করতেন অনেক সময় ০.১০–০.১২ সেকেন্ডের মাঝে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষ যখন বুঝতে শুরু করে সে কী করছে, তখন তিনি ইতিমধ্যেই পরবর্তী অবস্থানে পৌঁছে গেছেন। এ যেন বাস্তব মাঠে কোয়ান্টাম সুপারপজিশন (কোয়ান্টাম-অবস্থান-সমাপতন)—
তিনি কখনও বলের কাছে গিয়ে সাথে সাথে ঠিক করতেন না, কী করবেন। উলটে বলকে রেখে দিতেন এক ধরনের ‘সম্ভাবনাময় অস্পষ্টতায়’—এইমুহূর্তে তিনি বাইরে যেতে পারেন, ভিতরে কাট করতে পারেন। শট নিতে পারেন, পাস ছাড়তে পারেন। নুটম্যাগ, ত্রিভেলা, ল্যামব্রেতা, ক্যানেতা, সোল-রোল— যা খুশি করতে পারেন। কিংবা এলাস্টিকো (ফুটবলের দ্রুত দিক-বদলানো স্কিল-মুভ) দিতে পারেন, স্টেপ-ওভার বা ডবল স্টেপ ওভার(পা ঘুরিয়ে প্রতিপক্ষকে ভুল পথে পাঠানোর ড্রিবলিং মুভ) করে বেরিয়ে যেতে পারেন। ডিফেন্ডারের মস্তিষ্ক একসাথে এত সম্ভাবনা প্রক্রিয়া করতে পারে না; ওভারলোড হয়। এই ‘কগনিটিভ ওভারলোড’-ই আর-নাইনের ড্রিবলের মূল বৈজ্ঞানিক শক্তি।
তাঁর দিক বদলের প্রক্রিয়া খুব সূক্ষ্ম। প্রথমে থাকে মাইক্রো-লিন: শরীর খুব সামান্য একদিকে ঝুঁকে ইঙ্গিত দেয়, সে ডানে যাবে। ঠিক সেই ক্ষণেই বল মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার অন্যদিকে চলে যায়— মাইক্রো-টাচ (অতি-সূক্ষ্ম স্পর্শ)। এই ক্ষুদ্র স্পর্শই ডিফেন্ডারের পায়ের ওজন এক ফ্রেমে ভুল দিকে ফেলে দেয়। তারপর জয়েন্ট টর্ক (সন্ধিস্থলে উৎপন্ন ঘূর্ণন-বল) খুলে তিনি বিস্ফোরণের মতো সেই নতুন দিক ধরে বেরিয়ে যান। চোখ যা দেখে, শরীর সেই অনুযায়ী ওজন ফেলে—আর-নাইন ঠিক সেই ‘ওজন ফেলার মুহূর্তটাকে’ ফাঁদ বানিয়ে ব্যবহার করতেন। স্টেপ-ওভার তার কাছে কোনো প্রদর্শনী ছিল না; তা ছিল ওয়েট শিফট ট্র্যাপ। তিনি বৃত্ত এঁকে পা চালিয়ে ডিফেন্ডারের ওয়েট(weight) এক পায়ে নিয়ে এসে ঠিক বিপরীত দিকে চলে যেতেন। এলাস্টিকোতে একবারে বলকে মুহূর্তের মধ্যে দুই বিপরীত দিকে নড়িয়ে তিনি যেন বলের গতিপথ নিয়ে এক ধরনের অপটিক্যাল ইলিউশন(দৃষ্টিবিভ্রম) তৈরি করতেন— প্রথমে বাইরে ঠেলা, তারপর ভেতরে টেনে নেওয়া; ডিফেন্ডার যখন বাইরে ট্যাকল করতে বেরোয়, তখন তার ভেতরের পথ ফাঁকা হয়ে যায়। এই বিষয়টাই রিভেলিনোর পরে অভাবিত বিপ্লবে বিশ্ব-ফুটবলে স্থাপন করেন R9।
আর এখানেই R9-এর সঙ্গে বহু বিখ্যাত ড্রিবলারের পার্থক্য। তাঁর ড্রিবল শুধুই বল পায়ের কাছে রেখে জিগজ্যাগ নয়। তাঁর ড্রিবল ছিল প্রগ্রেশনের ড্রিবল। অর্থাৎ প্রতিটি ফেইন্টের অন্তিম উদ্দেশ্য ছিল সামনে এগোনো। তিনি ড্রিবলকে প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করেননি; ড্রিবলকে ব্যবহার করেছেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ লাইন ভাঙতে। তার শরীর যখন একদিকে যেত, তার উদ্দেশ্য ছিল অন্যদিকে জায়গা তৈরি করা; তার প্রথম টাচ যখন সামনে যেত, তা শুধু বল নেওয়া ছিল না, পরবর্তী তিন সেকেন্ডের ভবিষ্যৎ দখল করা ছিল। একজন মহান ড্রিবলার প্রতিপক্ষকে হারায়। R9 অনেক সময় প্রতিপক্ষের সামনে থাকা পুরো স্থানটাকেই লুপ্ত করে দিতেন। কারণ তিনি শুধু প্লেয়ার কাটাতেন না; তিনি ডিফেন্সিভ জিওমেট্রি সম্পূর্ণ কেটে ফেলতেন। দুই সেন্টার-ব্যাকের মধ্যবর্তী চ্যানেল, ফুল-ব্যাক এবং সেন্টার-ব্যাকের মাঝের হাফ-স্পেস, গোলকিপারের সামনে শেষ কয়েক মিটার—এই প্রতিটি অঞ্চলের আলাদা আলাদা মূল্য ছিল তার কাছে। একজন সাধারণ স্ট্রাইকার বল দেখে সিদ্ধান্ত নেয়; R9 অনেক সময় বল পাওয়ার আগেই সিদ্ধান্তের অর্ধেক নিয়ে ফেলতেন। তার স্ক্যানিং, বডি ওরিয়েন্টেশন এবং প্রথম টাচ পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত ছিল যে রিসিভিং অ্যাকশন-ই অ্যাটাকিং অ্যাকশন-এ পরিণত হতো।
R9-এর শ্রেষ্ঠত্বের আরেক অদ্ভুত দিক ছিল তাঁর ফার্স্ট টাচ। প্রথম স্পর্শকে সাধারণত বল নিয়ন্ত্রণের শুরু বলা হয়। R9-এর ক্ষেত্রে ফার্স্ট টাচ ছিল কখনও কখনও সমাপ্তির শুরু। বল পায়ের কাছে থামানো নয়; বলকে এমন জায়গায় নেওয়া, যেখানে ডিফেন্ডারের পরবর্তী পদক্ষেপ অর্থহীন হয়ে যায়। একজন ডিফেন্ডার হয়তো ভাবছে সে বল আটকাবে; R9-এর ফার্স্ট টাচ ইতিমধ্যেই তাকে পাশ কাটিয়ে ভবিষ্যতের দিকে চলে গেছেন। এই কারণেই তাঁর অনেক গোল দেখতে খুব সহজ লাগে। কিন্তু সহজ দেখানোর পেছনে যে স্পেস-নির্ভর স্পেশাল ক্যালকুলেশন, সেটাই অসাধারণ।
রোনালদোকে তিনটি উপায়ে দেখার প্রস্তুতি থাকতে হয়। অফ দ্য বল, অন দ্য বল এবং স্টপ বল সিচ্যুয়েশন। অফ দ্য বলে তাঁর দৌড় ছিল নিখুঁত স্থান-নির্বাচন। ডিফেন্ডার যেখানে তাকে দেখছে, তিনি তার আগেই স্থানিক ভিন্নতা তৈরি করে ফেলেছেন। অন দ্য বলে প্রথম স্পর্শেই তিনি ভরকেন্দ্র, গতি ও দিক বদলে দিতেন। শরীর ও বলের মধ্যে যেন আলাদা কোনো নির্বাচন-সাপেক্ষতা থাকত না। আর স্টপ বলে তাঁর দক্ষতা ছিল আরও সূক্ষ্ম। বল থামিয়েও তিনি খেলা থামাতেন না; বরং ডিফেন্ডারের সিদ্ধান্তকে এক মুহূর্তে ছারখার করে দিতেন। সেই ক্ষুদ্র বিরতির পরই আসত দিকবদল, গতি, ফাঁক। ব্রাজিলীয় ফুটবলের স্টপ বল সিচ্যুয়েশনে বল-নিয়ন্ত্রণের ও কার্যকরী স্কিলের দীর্ঘ ঐতিহ্যের মধ্যেও রোনালদোর বিশেষত্ব এখানেই যে, তিনি স্থিরতা ও গতিকে একই ক্রিয়ায় পরিণত করে ফেলতেন।
এলাস্টিকো, স্টেপ-ওভার, ডবল স্টেপ-ওভার বা পেডালোডার মতোই নুটম্যাগ, ত্রিভেলা, ল্যামব্রেতা, ক্যানেতা, সোল-রোল—ব্রাজিলীয় ফুটবলের দীর্ঘ ঐতিহ্যের মধ্যে প্রচলিত অথচ কম ব্যবহৃত চকিত স্কিল বা কৌশলগুলো রোনালদোর পায়ে এসে যেন স্থান ও সময়ের নতুন দর্শন লাভ করল। নুটম্যাগে বিপক্ষের দুই পায়ের ক্ষুদ্র ফাঁক তাঁর কাছে হয়ে উঠত সম্ভাবনার পথ; তাও আবার সেটা R9 করত দু-পায়ে সমানভাবে, অ্যাডভান্স এবং রিভার্স প্রক্রিয়ায়৷ ক্যানেতায় বল ও শরীরকে বিপরীত দিকে পাঠিয়ে তিনি ডিফেন্ডারের সিদ্ধান্তকে এক মুহূর্তের জন্য অনিশ্চিত করতেন। ল্যামব্রেতায় বাধার উপর দিয়ে বল তুলে নিতেন। ত্রিভেলায় স্পর্শের কৌণিকতা দিয়ে বদলে দিতেন বলের ভবিষ্যৎ। কৌশলের পরিণামগুলো তাই শুধু ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করার কাজে আটকে থাকত না, তা হয়ে উঠত বিপক্ষের সিদ্ধান্তের সময়টুকুও কেড়ে নেওয়ার নানা ছলনাময় সূত্র৷ এইখানেই ব্রাজিলীয় রাস্তার ফুটবলের স্বতঃস্ফূর্ততা মিশে যেতে শুরু করল ইউরোপীয় ফুটবলের গতি, চাপ ও শৃঙ্খলার সঙ্গে। এইসকল শিল্প-কারুকর্ম R9 এমন সাবলীলভাবে ধারাবাহিক আকর্ষণীয়তায় সাধন করলেন যে, বিশ্ব-ফুটবলে এগুলোই বিশেষ আইকনিক হয়ে উঠতে চাইল। আবার সোল-রোল বা সোল-ড্রাগকে তিনি সোল-রোল-ওভারে রূপান্তরিত করে নিজস্বতার ছায়াপথও নির্মাণ করে ফেললেন মৌলিক ভঙ্গিতে। আর বিশ্ব-ফুটবলও নিজস্ব ভাব, ভাষা ও ভঙ্গির সন্ধান পেয়ে নব্য-আধুনিকতার ময়দানে পদার্পণ করল। রোনালদো কৌশলকে প্রদর্শন থেকে সিদ্ধান্তে, কারুকার্য থেকে কার্যকারিতায়, ঐতিহ্য থেকে নতুন সম্ভাবনায় নিয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ ঐতিহ্যের নবায়মানতার অগ্রদূত হয়ে তিনিই বিশ্ব-ফুটবলকে নতুনভাবে আধুনিক করে তুলেছিলেন৷ তাঁর ফুটবলে সৌন্দর্য মানে শুধু সৌন্দর্য নয়; সেই সৌন্দর্য মানে অসম্ভবকে সম্ভব করার মুহূর্ত। আর এই অসম্ভবের প্রদেশে সম্ভবের সক্ষমতা দর্শক-মনে যতই প্রীতি সঞ্চার করুক না কেন, বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাছে তা রীতিমতো তৈরি করে রাখত ভীতির আবহ৷
ডিফেন্ডারদের গভীর স্নায়ুতন্ত্রে R9-এর উপস্থিতি কীভাবে ভীতি তৈরি করত, সেই বিষয় নিয়েও বলা জরুরি। R9-এর প্রসঙ্গে ‘ভয়’ শব্দটা আনুষ্ঠানিক বা রূপকতা নয়; এ সম্পূর্ণ নিউরো- মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। ভয় এখানে কোনো সাধারণ বড়ো ম্যাচের চাপ নয়; তা নিয়ন্ত্রণহীনতার অনুভূতি। ডিফেন্ডার জানত—তার সমস্ত অভিজ্ঞতা, শক্তি, পজিশনিং, ট্যাক্টিক— কোনো কিছুই হয়তো যথেষ্ট হবে না।
মনস্তত্ত্ব বলছে, ভয় জন্মায় তখন, যখন মানুষ অনুভব করে: সে নিজেই আর নিয়ন্ত্রণে নেই। R9 এমন অবস্থাই তৈরি করতেন। একদিকে অপ্রত্যাশিত গতি, অন্যদিকে অনিশ্চিত দিক, তার ওপর ক্লিনিক্যাল ফিনিশ— ডিফেন্ডার বুঝে যেত, ঘটনাটা তার হাতে নেই। অ্যান্টিসিপেশন প্যারালাইসিস (অতি-পূর্বানুমানজনিত স্থবিরতা) দেখা দিত— সে আগেভাগেই ভাবতে শুরু করত, ডানে যাবে না বামে? এই আগাম ভাবনার ভেতরেই তার পা সামান্য দেরি করে, সেকেন্ডের ভগ্নাংশ হারিয়ে যায়, আর R9 ঠিক সেই সময়টুকু ব্যবহার করতেন। তার উপস্থিতি ‘স্পেসিয়াল অ্যাঙ্জাইটি’(স্থানের ভীতি/ স্থান-সংক্রান্ত উদ্বেগ) সৃষ্টি করত। মনে হতো নিজের জায়গা ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে, বিকল্প কমে যাচ্ছে, পায়ে পায়ে ঘাস সরে যাচ্ছে। তার ড্রিবল ও দৌড় ‘হিউমিলিয়েশন ড্রেড’-ও (অপমান-ভীতি/ অপমানজনিত শঙ্কা) তৈরি করত—সে শুধু বিশেষ প্লেয়ারকে হারাবে না; এমনভাবে কাটিয়ে যাবে, এমনভাবে গোল করবে, যা বছর পরেও মানুষের স্মৃতিতে রিপ্লে হয়ে ঘুরবে। এই সম্ভাব্য অপমানের ভয় অনেক সময় ডিফেন্ডারকে আরও স্টিফ করে দিত। সর্বশেষ স্তর ‘ইনএভিটেবিলিটি ফিয়ার’ (অপরিহার্যতা-ভীতি/ অনিবার্য ঘটনার শঙ্কা)— যা-ই করা হোক, ওকে হয়তো থামানো যাবে না। এ ধরনের অনুভূতি মানুষের লড়াই-প্রবৃত্তিকে ক্ষণিকের জন্য নিষ্প্রভ করে। এই সব ভয়ের জৈব ভিত্তি আছে। তাতে ‘সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ সক্রিয় হয়, হৃদস্পন্দন বাড়ে, পেশি কঠিন হয়, চোখের মণি প্রসারিত হয়, শ্বাস দ্রুত হয়। এগুলো যুদ্ধের প্রস্তুতি, কিন্তু ফুটবলে এই অতি-উত্তেজনা প্রায়ই ভুল টাইমিং, ভুল ট্যাকল, ভুল ডিসিশনে ডিলে সৃষ্টি করে। ফলে R9-এর সামনে দাঁড়িয়ে বহু মহান ডিফেন্ডারও অনেক সময় অদ্ভুতভাবে ’ছোটো’ দেখাত।
কিন্তু ভয়ের আরেক স্তর ছিল—রেপুটেশন। একবার কোনো স্ট্রাইকারের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার স্মৃতি তৈরি হয়ে গেলে পরবর্তী ম্যাচের সিদ্ধান্তগুলোও সেই স্মৃতি দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। R9-এর বিরুদ্ধে খেলতে নামা ডিফেন্ডারের মাথায় শুধু বর্তমান মুহূর্ত থাকত না। থাকত আগের ম্যাচের দৃশ্য, আগের কাট, আগের গোল, আগের ভুল। ফুটবলে মেমোরি কখনো কখনো ট্যাকটিকাল বার্ডেন হয়ে ওঠে। R9 সেই বার্ডেনকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করতেন। একজন ডিফেন্ডার তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে শুধু বল দেখত না; নিজের অতীতও দেখত।
(৪)
R9-এর নান্দনিকতা; তাঁর সৌন্দর্যের স্থাপত্য বিশ্ব-ফুটবলে একটা চিরন্তন অধ্যায়। ফুটবল খেলাকে সাধারণত কৌশল, শক্তি, গোল, গতি দিয়ে মাপা হয়। R9-কে বুঝতে হলে তার ওপর আরও একটি স্তর রাখতে হয়— অর্থাৎ শিল্পের স্তর। কারণ তার দৌড়, ড্রিবল, ফিনিশ— সবকিছুই এমনভাবে ঘটত যে তা শুধু কার্যকর নয়, গভীরভাবে নান্দনিকও ছিল।
R9-এর খেলার সঙ্গে চিত্রকলায় ক্যারাভ্যাজ্জিওর কিয়ারোস্কিউরোর (আলো-অন্ধকারের বৈপরীত্যে সৃষ্ট চিত্রশৈলী) মিল পাওয়া যায়। আলো-ছায়ার তীক্ষ্ণ দ্বন্দ্ব দিয়ে ক্যারাভ্যাজ্জিও যে নাটক তৈরি করতেন, R9 তেমনই শরীরের ঝোঁক ও বলের দিক বদলে ডিফেন্ডারের দৃষ্টিতে আলো-ছায়ার ফাঁক বানাতেন। শরীর একদিকে ঝুঁকে, বল হঠাৎ অন্যদিকে গেলে দৃষ্টির ওপর যেন এক ‘মোমেন্টারি ডার্কনেস’ নামে। ভেলাথকেজের শান্ত কিন্তু গভীর দৃশ্যের মতো তিনি গোল করতেন প্রায় নির্বিকার মুখে, অবিশ্বাস্য টাইমিং ও স্পেসে। কম অঙ্গভঙ্গি, কম কারুকার্য, কম ড্রামা, অথচ অসীম গভীরতা। আবার সালভাদোর দালির বিকৃত জ্যামিতির মতোই তিনি অসম্ভব কোণ থেকে, অদ্ভুত শরীরী-অবস্থান থেকে গোল করতেন। ক্যানভাসের নিয়মের বাইরে গিয়ে নতুন নিয়ম তৈরি করতেন। কিংবা যামিনী রায়ের পটচিত্রের রেখার বিস্তারের মতো ফুটবলীয় হিসেবের বাইরে পৌঁছে দিতেন নিজের শৈলী। আবার তাঁর দৌড় ও টাচ যেন ভারতীয় রাগের আলাপ ও মীড়ের মিশ্রণ। শুরুতে ধীর আলাপ। গতি কম, পর্যবেক্ষণ বেশি। তারপর তান। কয়েকটি দ্রুত স্টেপ, হঠাৎ গতি পরিবর্তন, তীব্রতা। তার বল-টাচ ছিল টানা, ধারাবাহিক। কাটাছেঁড়া নয়, বরং মীড়ের মতো এক সুর থেকে আরেক সুরে গলে যাওয়া। ফিনিশ ছিল ‘সম’। যেখানে সমস্ত বিচ্যুতি, দোলাচলতা, অনিশ্চয়তা থেমে গিয়ে এক-বিন্দুতে এসে মিলে যায়।
ক্রিস্টোফার নোলানের সময়-ভাঙা, ধীর ও দ্রুত ফ্রেমের ভেতরে ফ্রেম তৈরি করা চলচ্চিত্রের পর্দায় যতটা ছিন্ন-সংগতি, R9 ততটাই বাস্তব মাঠে সময়ের অনুভূতি ভেঙে দিতেন। আকিরা কুরোসাওয়ার সিনেমায় যেমন শূন্য সময়, নীরব বিরতি— রোনাল্ডার তেমনি মাঠ-পড়া, থামা, তাকানো, তারপর হঠাৎ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। আবার অন্যদিকে তারোকভস্কির চিত্রনাট্যে নিমগ্ন-বহুলতায় যে এলিগ্যান্ট ভায়োলেন্স— তার ড্রিবল তেমন সুন্দর, মসৃণ, কিন্তু ভেতরে বিধ্বংসী। এক কম্প্যাক্ট কাব্যিক নৃশংসতা।
আর R9-এর নান্দনিকতার সবচেয়ে গভীর দিক সম্ভবত তাঁর ‘ইকনমি অব মুভমেন্ট’। তিনি অনেক কিছু করতেন না; তিনি প্রয়োজনীয় জিনিসটুকুই করতেন। মহান শিল্পীদের মতো তাঁর খেলার মধ্যে ‘অতিরিক্ত’ কম, কিন্তু তা হয়ে যায় সময়ের অতিশয়োক্তি। এক শরীরের সামান্য বাঁক, একটি টাচ, এক পা সামনে, তারপর শট। দর্শক পরে রিপ্লেতে বুঝতে পারে, গোলের আগে যে পাঁচটি ক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার প্রত্যেকটিরই নিজস্ব অর্থ ছিল। সেই অর্থ live television-এর চোখে ধরা পড়ে না সবসময়। শিল্পের মতো ফুটবলকেও কখনো কখনো প্রথম দর্শনে সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। এই না-বোঝার শিল্পিত কারবারি মাত্র দুজন— পেলে ও রোনালদো নাজারিও।
আর এইখানেই R9-এর সৌন্দর্য ‘কৌশল’ থেকে ‘রূপ’-এ উত্তীর্ণ হয়। তাঁর ফুটবলিং ফর্মের মধ্যে ‘ফাংশন’ এবং ‘বিউটি’ আলাদা ছিল না। তিনি কার্যকর বলেই সুন্দর, আর সুন্দর বলেই কার্যকর। ফলত সব আপাত দ্বন্দ্বের বাইরে ছিলেন। তাঁর শরীর যখন প্রতিপক্ষকে ছিন্ন করত, তখন তা একইসঙ্গে হয়ে উঠত জিওমেট্রি এবং পোয়েট্রি।
(৫)
ইতিহাসের সেই মঞ্চ; যেখানে PSV, বার্সেলোনা, ইন্টার এবং এক নতুন স্ট্রাইকারের জন্ম হয়— সেই পর্বে ভ্রমণ করা যাক। R9-এর গল্পকে কেবল বিশ্বকাপ দিয়ে পড়লে অসম্পূর্ণ থাকে। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল তাঁর ভাষাকে তৈরি করেছিল। PSV Eindhoven-এ তাঁর গোল করার ক্ষুধা, Barcelona-য় তাঁর বিস্ফোরক সৃজনশীলতা, Inter Milan-এ এসে আরও শারীরিক ও কৌশলগত পরিণতি—এই ধারাবাহিকতা তাঁকে একেবারে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। UEFA-র হিসাব অনুযায়ী, PSV, Barcelona, Inter, Real Madrid ও Milan—এই পাঁচ ক্লাবে তাঁর মোট ৪০২ ম্যাচে ২৭৩ গোল ছিল; তাঁর ইউরোপীয় ক্লাব-জীবনের সঙ্গে UEFA Cup Winners’ Cup ও UEFA Cup-এর মতো শিরোপাও যুক্ত ছিল। Champions League শিরোপা তাঁর অধরা থেকে যায়—আর এই অসম্পূর্ণতাও তাঁর নিজস্ব মিথেরই অংশ।
Barcelona-য় R9 ছিলেন যেন গতি ও কল্পনার সম্মিলিত বিস্ফোরণ। সেখানে তিনি শুধু স্ট্রাইকার ছিলেন না; কখনও উইঙ্গারের মতো ওয়াইড চ্যানেলে যেতেন, কখনও মিডফিল্ডের কাছে নেমে বল নিতেন, আবার পরের মুহূর্তেই সেন্টার ব্যাকের পেছনে অদৃশ্য হয়ে যেতেন। তাঁর আক্রমণের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল আন-প্রেডেক্টিবিলিটি। ডিফেন্ডার জানত না তিনি কোথা থেকে আসবেন, কিন্তু আরও বড়ো কথা—জানলেও তাঁকে থামানোর সময় থাকত না।
Inter-এ এসে এই প্রতিভার সঙ্গে যুক্ত হয় সংঘর্ষ। Serie A তখন এমন এক দুর্ধর্ষ ডিফেন্সিভ সংস্কৃতির ভিতরে ছিল, যেখানে একজন ফরোয়ার্ডের স্পেস পাওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। সেখানে R9-এর শ্রেষ্ঠত্বের পরীক্ষা ছিল অন্যরকম। তিনি এমন এক ফুটবল-পরিবেশে খেলছিলেন যেখানে প্রতিটি পজেশনের চারপাশে ডিফেন্সিভ ক্যালকুলেশন, ফিজিক্যাল মার্কিং এবং ট্যাকটিক্যাল কমপ্যাক্টনেস কাজ করত। ফলে তাঁর গতি তখন শুধু স্পেকট্যাকল ছিল না; ছিল ট্যাকটিক্যাল ওয়েপন।
১৯৯৭ ও ৯৮ সময়কালের R9-কে তাই কেবল ‘দ্রুত ফরোয়ার্ড’ বললে অন্যায় হয়। তিনি ছিলেন ‘ট্রানজিশন ফুটবলে’র এক প্রাথমিক পূর্ণাঙ্গ প্রতীক। বল জেতার পর তিনিই প্রথম ‘আউটলেট’, তিনিই ‘প্রগ্রেশন’, তিনিই ফাইনাল ‘অ্যাকশন’। তিনি মিডিফিল্ড থেকে পাওয়া বলকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কাউন্টার অ্যাটাকে রূপ দিতে পারতেন। অর্থাৎ তিনি একসঙ্গে তিনটি অঞ্চলকে যুক্ত করতেন—নিজের অর্ধ, মধ্যমাঠ, পেনিট্রেটিভ জোন অথবা পেনাল্টি এরিয়া। তাঁর শরীর ছিল সেই তিন অঞ্চলের মধ্যে চলমান সেতু। এখানেই তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব। আধুনিক ফুটবলের হাইব্রিড ফরোয়ার্ড, কমপ্লিট ফরোয়ার্ড, ট্রানজিশন স্ট্রাইকার, অ্যাটাকিং নাইন—এই সমস্ত ধারণা পরবর্তী দশকে আরও নানা রূপ পেয়েছে। কিন্তু R9-এর ‘peak’ অনেক আগেই দেখিয়ে দিয়েছিল, একজন কেন্দ্রীয় আক্রমণকারী একইসঙ্গে ড্রিবলার, স্প্রিন্টার, ক্রিয়েটর এবং ফিনিশার হতে পারেন। এই চারটি পরিচয়কে একই শরীরে এত উচ্চমাত্রায় একত্র করার ঘটনা বিশ্ব-ফুটবলে একেবারেই বিরল।
(৬)
R9-এর ফিনিশিং; তাঁর গোলের আগে যে দর্শন তৈরি হতো, তা বহুকাল ধরেই এক গবেষণার বিষয় হয়ে আছে। R9-এর গোলকে কেবল শট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর ফিনিশিংয়ের মধ্যে ছিল ডিসিশন হায়ারার্কি। কখন পাওয়ার, কখন প্লেসমেন্ট, কখন গোলকিপারের শরীর পড়া, কখন নিয়ার পোস্ট, কখন ফার পোস্ট, কখন গোলকিপারকে এগিয়ে আসতে বাধ্য করে পরে বল সরিয়ে দেওয়া—এই সিদ্ধান্তগুলো প্রায় একই মুহূর্তে কাজ করত। তাঁর এই এক বিশেষ ক্ষমতা ছিল, গোলকিপারের শরীর পড়ে ফেলা। গোলরক্ষক সাধারণত শটের আগে নিজের ব্যালান্স বজায় রাখতে চায়। R9 অনেক সময় সেই ব্যালান্সকে ব্যবহার করতেন। তিনি গোলকিপারের শরীরের সেন্টার দেখে বুঝতেন কোন দিকে শেষ মুহূর্তে স্থান খোলা থাকবে। ফলে তাঁর কিছু ফিনিশ এত সহজ দেখায়, যেন গোলকিপার নিজেই গোলের দরজা খুলে দিয়েছে। আসলে গোলরক্ষক দরজা খোলেনি; R9 দরজা কোথায় আছে, তা আগে থেকেই দেখে ফেলেছিলেন। আর তাঁর ফিনিশিংয়ের মধ্যে ছিল ‘বডি ডিসগাইজ’। শরীর বলছিল শক্তিশালী শট আসছে, পা বলছে প্লেসমেন্ট। অথবা শরীর বলছিল ফার কর্ণার, বল চলে যাচ্ছে নিয়ার কর্নার। এই বিভ্রান্তি গোলকিপারের ডিসিশন মেকিং উইন্ডো আরও ছোটো করে দিত। তাঁর ফিনিশিং ছিল অনেক সময় শট-এর চেয়ে অনেক বেশি ‘ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট’। এই কারণেই R9-এর গোলের রিপ্লে দেখলে দেখা যায়, বল জালে যাওয়ার আগেই গোল প্রায় হয়ে গেছে। শেষ শটটি কেবল তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
এবার R9-এর পতন; হাঁটুর ভাঙন ও শরীরের বিশ্বাসঘাতকতার অন্ধকার অধ্যায়ে প্রবেশ করা যাক৷
তবু এই ‘ফেনোমেনন’-এর গল্প শুধু আলোকিত উত্থানের নয়। ১৯৯৯ ও ২০০১ সময়টা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নির্মম এক অন্ধকার-পর্ব। যে হাঁটু তাকে পৃথিবীর দ্রুততমদের একজন বানিয়েছিল, সেই হাঁটুই একদিন লাইভ টেলিভিশনের সামনে হঠাৎ ভেঙে দুমড়ে গেল। চোখের সামনে টিভির পর্দা আমার। মনে হল চোখ খুলে দেখা এক দুঃস্বপ্ন। দৌড় শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভিতরের এক জট খুলে যাওয়ার মতো লাগল, আর ক্যামেরার সামনে দেখা গেল তার হাঁটু অস্বাভাবিকভাবে সরে যাচ্ছে। এই মুহূর্তকে কি শুধু ‘ইনজুরি’ বলা যায়?
তার শরীর যেন নিজের শক্তির বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করল। রক্তকরবীর রাজাই যেন নিজেকে ভাঙলেন শক্তির আধিক্যে। মনে হবেই, তার পেশি, বিস্ফোরণশক্তি, গতি—সবকিছু এত উচ্চমাত্রায় পৌঁছেছিল যে সেই লোড বহন করার জন্য তার হাঁটুর জোড়াটাই জন্মসূত্রে যথেষ্ট ছিল না। যেমন পৌরাণিক পরাশক্তিধর চরিত্রের কোষে বিধাতা বেঁধে দেন ধ্বংসের অঙ্কুর। যে শরীর ছিল এতদিন তার গর্ব, সেই শরীরই হঠাৎ তাকে থামিয়ে দিল। স্টেডিয়ামে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল। প্রতিপক্ষ, সতীর্থ, দর্শক— সবাই আত্মপ্রবোধের পরও বুঝেছিল, এই ঘটনাই হয়তো বিশাল একটা শেষ হতে পারে। ভিতরে এর থেকেও বড়ো ভয় ছিল সকলের মজ্জায়, শেষ-ই নিশ্চয়। আর আমি যেন, সেই অজস্র সহস্র কোটির ভিড়েও, একা একা, একটা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সভ্যতার উপর চলা ধ্বংসলীলা দেখতে দেখতেও ভাবছিলাম, এ অসম্ভব। এ অসম্ভব। এভাবে শেষ হতে পারে না। অতঃপর…
এই পতনের ঐতিহাসিকতা আরও গভীর, কারণ ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছিল যখন R9 ইতিমধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁর হাঁটু শুধু একজন খেলোয়াড়ের হাঁটু ছিল না। তা ছিল এক ফুটবল-প্রজন্মের স্বপ্নের অংশ। তাই ইনজুরির সেই দৃশ্য ব্যক্তিগত শারীরিক বিপর্যয়কে ছাড়িয়ে ‘কালেক্টিভ ট্রমা’ হয়ে উঠেছিল। মানুষ শুধু একজন খেলোয়াড়কে পড়ে যেতে দেখেনি; দেখেছিল সম্ভাবনার যে সম্পূর্ণতা, তার অতি-আকস্মিক অভাবিত অপ্রাকৃত পতন।
আর এখানেই পুরাণের সঙ্গে ইতিহাসের পার্থক্য। পুরাণে নায়ক কখনও ভাঙে না। ইতিহাসে নায়ক ভাঙে। তার হাঁটু ভাঙে। শরীর ব্যর্থ হয়। পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। সময় নিষ্ঠুর হয়। কিন্তু সেই ভাঙার পরও যদি সে ফিরে আসে, তখন সে আর কেবল নায়ক থাকে না; সে হয়ে ওঠে মানুষের চিরকালীন অভিজ্ঞতার জায়মান প্রতীক। তখন সেখানে এসে ইতিহাসও পুরাণের হাত ধরে নির্দ্বিধায়।
(৭)
R9-এর পুনর্জন্ম; ব্যথার ভিতরেই নতুন হয়ে ওঠার সেই বৃত্তান্ত বিশ্ব-ফুটবলে এক নবতর সংযোজনী৷ বিপর্যয়ের পর শুরু হলো প্রতিদিনের এক নীরব যুদ্ধ। ২২ মাসের নির্বাসন। কিংবা হয়তো পুনর্বাসন। অপারেশন, জিম, পুনরায় হাঁটা শেখা, দৌড় শেখা। ধীরে। কিংবা হয়তো, ওইরকম মারাত্মক দুর্ঘটনার পর এটাই সবচেয়ে দ্রুততায়। হাঁটুকে আবার নিজের শরীরের অংশভুক্ত করা। প্রতি ভোরে উঠে, প্রতিবার ব্যথার ব্যায়ামের মুহূর্তে হয়তো একটাই প্রশ্ন সামনে দাঁড়াত—আর কি আগের মতো পারব? যদি না পারি, তবে কে রোনালদো? হয়তো আলব্যের কাম্যুর ‘বিদ্রোহের দর্শন’-র সঙ্গে নিজের জীবনকে পড়া। মানুষ ভাগ্যের সামনে মাথা নত করে না। সে অর্থহীনতার মাঝেও অর্থ তৈরি করে। এ শুধু বাইরের কোনো ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধই নয়, বরং ছিল এক অভ্যন্তরীণ লড়াই। R9 স্বীকার করলেন তার ভাঙন। কিন্তু মানলেন না তার শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। অনুভব করলেন—আগের শরীর আর ফিরবে না। আগের রোনাল্ডো আর এই শরীরকে চালনা করবে না। শরীরও চেনা রোনাল্ডোকে চাইছে না। তাই খেলার ভাষাটাই বদলাতে হবে। অচেনা হবে সে, চেনা অবয়বে৷ ২২ মাস পর ফুটবলে পা দিলেন। বদলের গাঠনিক রূপ দেখা গেল। এবং তা বিশ্বকাপেই। ২০০২ সাল৷ শতাব্দীর প্রথম বিশ্বকাপ। শ্রেষ্ঠ মঞ্চ। আর আবিশ্বের কোটি কোটি চোখ দেখল, আর জানল, শবাগারেই মিথের প্রকৃত জন্ম হয়৷ নতুন অস্তিত্বের আয়না-শরীর নিয়ে। যেখানে প্রাকৃতের ছায়াচিত্র ভেসে ওঠে হামেশাই, তবে অলকে পলকে।
না; শরীর আর ১৯৯৬-১৯৯৯ সালের মতো বিস্ফোরক না। গতি সামান্য কম। কিন্তু দেখা গেল অন্য কিছু বেড়ে গেছে ব্যস্তানুপাতে। মাঠ পড়ার ক্ষমতা, ফিনিশিংয়ের শীতলতা, ডিসিশন-মেকিং-এর পরিণতি। ৮ গোল। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে দুটি গোল। সোনার বুট। আগের বিশ্বকাপের সোনার বলের পরই সোনার বুট। ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। এগুলো এক মানুষ, এক শরীর, এক ভাঙন, এক পুনর্গঠনের গল্প।
২০০২-এর এই পুনরাগমনকে ফুটবল ইতিহাসের পরিসরে রাখলে তার গুরুত্ব আর ভাষায় বলে বোঝানো যায় না। FIFA-র নথি অনুযায়ী, ২০০২ বিশ্বকাপে R9 সাত ম্যাচে আট গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। ফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে করেছিলেন দুই গোল। তাঁর বিশ্বকাপ-জীবনের মোট গোল দাঁড়ায় ১৫—১৯ ম্যাচে, চারটি বিশ্বকাপ-অভিযানে (১৯৯৪), ১৯৯৮, ২০০২ ও ২০০৬ মিলিয়ে।কিন্তু ২০০২-এর আসল সৌন্দর্য সংখ্যায় ধরা পড়ে না। ১৯৯৮-এর R9 যদি হয় সম্ভাবনার বিস্ফোরণ, তবে ২০০২-এর R9 ছিল সম্ভাবনার শৃঙ্খলা। প্রথমজন বল পেয়ে পৃথিবীকে দ্রুত করে দিতেন। দ্বিতীয়জন সময়কে নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধীর করতেন। প্রথমজনের মধ্যে ছিল ‘স্টর্ম’; দ্বিতীয়জনের মধ্যে ছিল ‘গ্রাভিটি’। ফাইনালের দুটি গোল যেন এই রূপান্তরের দুই আলাদা অধ্যায়। প্রথম গোলটি আসে অলিভার কানের সেভের পর রিবাউন্ড থেকে। দ্বিতীয় গোল আরও গভীর—রিভালদোর ইন্টেলিজেন্ট ডামি, ক্লেবারসনের মাইনাস, R9-এর পজিশনিং, এবং তারপর সেই শান্ত ফিনিশ। FIFA-র বর্ণনাতেও দ্বিতীয় গোলের আগে রিভালদোর ডামি-র কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। এই গোলগুলো দেখলে বোঝা যায়, R9 তখন আর কেবল নিজের শরীর দিয়ে ম্যাচ জিতছেন না। তিনি অন্যদের মুভমেন্ট, স্পেস, টাইমিং এবং ডিফেন্সিভ অ্যাটেনশনকে নিজের পক্ষে সংগঠিত করছেন। অর্থাৎ ইনজুরি তাঁর পিজিকাল ভোক্যাবুলারিকে কিছুটা সীমিত করলেও, ফুটবল ইন্টেলিজেন্স-এর ভোক্যাবুলারিকে যেন আরও ঘন করে দিয়েছিল।
পুনর্জন্মের পর R9-এর থেকে জন্ম নেওয়া ডিফেন্ডারদের ভয় ছিল আধুনিক ফুটবলে এক অন্য শেড৷ চোট-পূর্ব R9-এর ভয় আসত গতি ও ড্রিবল থেকে। এক অনিয়ন্ত্রিত ঝড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। ২০০২-এর পরে তার ভয় হয়ে গেল অনেক বেশি নীরব, শান্ত ও পরিণত। এবার তাকে দেখে ডিফেন্ডাররা জানল—সে সবসময় দৌড়াবে না, কিন্তু যেদিন সে দৌড়াবে বা যেদিন সে একটিই সঠিক টাচ নেবে, তখন সেটা প্রায় অনিবার্য হবেই। আগের ভয় ছিল— হঠাৎ ধেয়ে আসা ঝড়; নতুন ভয় হল—নীরবে জমতে থাকা ধীরতার চাপ। এই পর্বে সে দৌড়াত কম, কিন্তু যেখানে দৌড়াত, সেখানে আউটকাম প্রায় পূর্বনির্ধারিত। সে ড্রিবল কম করত, কিন্তু পেনাল্টি এরিয়ায় প্রথম টাচই ডিফেন্ডারকে আউট অব ইক্যুয়েশন করে দিত। ফিয়ার ইনডেক্স-এর ভাষায়—তার শারীরিক আগ্রাসনের ভয় সামান্য কমেছে ঠিকই, কিন্তু ভয় বেড়েছে মানসিক, স্থানিক, সিদ্ধান্ত-নির্ণায়ক ও উৎপ্রেক্ষাগত(Hypothetical Imagery)। যা সাবেকি রোনাল্ডোর সম্ভাবনানির্ভর কল্পনা৷ তার সঙ্গে আবার মেশানো কিছু অতিরিক্ত শালীনতা৷ সব মিলিয়ে আরেক নতুন উচ্চতা। আরেক নতুন সম্ভ্রম।
পরিবর্তিত শরীর, ভাঙন, তবুও তো আছে কিছু বাকি, অস্তিত্বের দর্শন কি একেই বলে? কিয়ের্কেগার্ড তাঁর দার্শনিকতায় নিশ্চিত বলবেন ‘সম্ভাবনার পতন’। যে মানুষকে পৃথিবী একসময় সীমাহীন সম্ভাবনার প্রতীক মনে করত, এক মুহূর্তে দেখল—তার সম্ভাবনা কেটে গেছে, থেমে গেছে। অ্যামাজন অববাহিকার কোনো এক কোণে বসে স্বপ্নে সেও ভাবছে— আর কি ফিরে আসা সম্ভব?—এ কি কেবল পেশাদার ক্যারিয়ারের প্রশ্ন, নাকি আত্ম-অস্তিত্বের।
হাইডেগারকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলবেন, আমাদের ‘Being-in-the-world’ ভেঙে যায়, যখন আমাদের পরিচিত মাটি হঠাৎ সরে যায়। ফুটবলারের জন্য মাঠই তার পৃথিবী; ইনজুরির সময় সেই পৃথিবীই অদৃশ্য হয়ে গেল। মাঠের জীব হঠাৎ নিজেকে খুঁজে পেল এক মাঠহীন জীবনে। যেখানে আর কোনো চিৎকার নেই। লাইভ ক্যামেরা নেই। শুধু রিহ্যাব রুম আর ব্যথার নিস্তব্ধ হাহাকার।
মরিস মার্লো পঁতি-র চিত্রকলার ভাবনায় বলা চলে, শরীর কোনো বস্তু নয়; অর্থের প্রথম ঠিকানা। R9-এর শরীরটাই তো ছিল তার ভাষা। তার ধর্ম। তার প্রকাশ। সেই শরীরের মৌলিক ভাষা ভেঙে গেলে তার সামনে দুটি-মাত্র পথই খোলা ছিল—ভাষা হারানো, অথবা ভাষাকে রূপান্তর করা। মাতৃভাষার অন্য সীমানা তৈরি করা। তিনি দ্বিতীয় পথ বেছে নিলেন। এক্সপ্লোসিভনেস (বিস্ফোরণধর্মী শক্তি) কমিয়ে ডিসিশন-ই ভাবকেন্দ্র হল; ৫ জন প্রতিপক্ষকে কাটানোর ড্রিবল ২ টাচে গোলের জ্যামিতিতে চলে গেল। ‘কীভাবে ধ্বংস করব’ এই ভাবনা থেকে ‘কীভাবে নিখুঁত শেষ করব’— সেই দৃষ্টিভঙ্গিই ভাষা পেয়ে গেল।
এই রূপান্তরের মধ্যেই R9-এর দর্শনগত শ্রেষ্ঠত্ব। কারণ প্রত্যাবর্তন মানেই আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়। রিটার্ন ইজ নট রিপিটিশন। কিন্তু ফিরে আসা মানে কখনও কখনও নতুন মানুষ হয়ে ফিরে আসা। আগের শরীরের কাছে ফিরে না-গিয়ে, আগের আত্মপরিচয়কে অন্য শরীরে পুনঃস্থাপিত করা। R9-এর ক্ষেত্রে কামব্যাক তাই রিহ্যাবিলিটেশনের চেয়েও বড়ো শব্দ। তাকে বলা চলে রি-অথরশিপ—নিজের ফুটবলীয় জীবনী নিজেই নতুন করে লেখা।
এখানে তাঁর পরবর্তী বছরগুলিও গুরুত্বপূর্ণ। Real Madrid-এ তিনি আবারও বিশ্ব ফুটবলের বৃহৎ মঞ্চে নিজেকে স্থাপন করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে জিদান, ফিগো, রবার্তো কার্লোস, বেকহ্যাম, রাউল প্রমুখের উপস্থিতি তাঁকে অন্য ধরনের ফুটবল ইকোলজির মধ্যে রাখে। আগের মতো একক বিস্ফোরণ নয়; এবার তিনি স্টার কনস্টেলেশনের এক কেন্দ্র। তারপর Milan-এ গিয়ে আবারও বয়স, ভারি শরীর এবং প্রতিযোগিতার সঙ্গে নতুন সমঝোতা তৈরি করতে হয়। তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার আগ-পর্যন্ত শরীর তাঁকে বারবার সীমার কথা মনে করিয়েছে; কিন্তু প্রতিবার তিনি সেই সীমার ভিতর নতুন কোনো ‘ফুটবলিং সলিউশন’ খুঁজেছেন। UEFA তাঁর অবসরকে বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁকে গত পঁচিশ বছরের শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড় হিসেবে উল্লেখ করেছিল। এবং তাঁর ইউরোপীয় ক্লাব-জীবনের পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছিল। যদিও এসব নেহাতই তুচ্ছ বিষয়।

