সমুদ্রস্তনিত পৃথ্বীকে হতচকিত করে বব ডিলান যেদিন প্রথম ঘোষণা করলেন যে, তিনি পুরস্কারটি নেবেন; অন্তর্বর্তী নীরবতা আসলে আকস্মিক ‘বাকশূন্যতা, ’ সেদিনই আমাদের অঙ্গে অঙ্গে বাঁশি বেজে ওঠে কিন্তু একই সঙ্গে বুঝতে পারি বব ডিলানের ‘নেভারএণ্ডিং ট্যুর’ এবার সমাপ্তির পথে। এবার অনন্ত তাঁকে গ্রহণ করবে। আমি ভাবতে চাইছিলাম বেদনার এই অমোঘ সন্তান অতঃপর কী করবেন? ১৯৬৫ সালে খ্যাতির আগ্নেয়লাভায় জীর্ণ হতে হতে বব ডিলান ঘোষণা করেছিলেন যে, “আমি নিজেকে কবি বলি না কারণ শব্দটা আমার পছন্দের নয়। আমি একজন ‘ট্রাপিজশিল্পী’।” মৃদু হেসে আসন্ন ভবিষ্যতের দিকে তাকাই: প্রোটোকল অনুযায়ী নোবেল স্মারক গ্রহণ করতে হচ্ছে বব ডিলানকে হায়, কতদিন আগে মানিকবাবু ‘মদন তাঁতি’ লিখেছিলেন আর কতদিন আগে নাট্যকার জঁ জেনে শিল্পীকে মাদারি ভেবে জেনে গিয়েছিলেন—“যুগপৎ শিকার ও শিকারি; আজ সন্ধ্যায় তুমি নিজের শিকার, তুমি নিজের থেকে পালাচ্ছ ও নিজের পিছনে ধাওয়া করছ।” সুতরাং একজন গীতিকার ও গায়ককে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে কি না, তার থেকে অনেক বড়ো প্রশ্ন, একজন শিল্পী কি আমৃত্যু কৌমার্য রক্ষা করার ঝুঁকি নিতে পারেন? সমস্যাটা ফরাসি চলচ্চিত্রকার জঁ লুক গোদারের অস্কার প্রাপ্তির মতোই। শেষ পর্যন্ত খ্যাতির মাকড়সা আমাদের ঘিরে ফেলবেই। আশ্চর্য যে, এই ১৯৬৫ সালেই গোদার যুব প্রজন্মের সামনে বব ডিলানের সঙ্গে করমর্দনের চেষ্টা করেন। তাঁর ‘ম্যাস্কুলাফেমিনা’ ছবিতে রেস্তোরাঁয় দুই বন্ধু, পল ও রবের-কে দেখা যায় রবিবাসরীয় ‘লুমানিতে’ (ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র) পড়তে। চিত্রনাট্য থেকেই উদ্ধৃত করি বরং:
পল: …কী পড়ছিস তুই?
রবের: বব ডিলানের উপর একটা প্রবন্ধ
পল: সে কে?
রবের: একজন ভিয়েতনিক—তুই জানিস তো !
পল: না। ব্যাপারটা কী?
রবের: এটা একটা মার্কিন শব্দ: বিটনিক আর ভিয়েতনাম সন্ধি করে হয়েছে। পল: আচ্ছা, দেখতে দে, আপনি কে, শ্রীযুক্ত বব ডিলান ?
রবের: মাদলেইন-এর কথা কখনও বলেনি? রোজ ওর দশ হাজার রেকর্ড বিক্রি হয় ৷
গোদার যে মধ্যষাটে যুব প্রজন্মের কাছে বব ডিলানকে বিগ্রহতুল্য ভেবেছিলেন, তার কারণ অনেক। বস্তুত ডিলান তখন সমুদ্র শাসন করছেন। বিটলস্রা খ্যাতির শিখরে। জন লেনন আমাদের তবু জানাচ্ছেন, “পারিতে ১৯৬৫ সালে আমরা প্রথম ডিলানকে শুনি। পল (ম্যাককার্টনি) রেকর্ডটা নিয়ে এল। একজন ফরাসি ডান্স জকির কাছ থেকে। রেকর্ডটা ছিল ‘দ্য হুইলিন বব ডিলান।’ আমরা তিন সপ্তাহ এটা ছাড়া কিছুই শুনিনি। হা-ঘরেও আমাদের সঙ্গী ছিলেন ডিলান। আর পল ম্যাকার্টনি তো আত্মহারা। তাঁর বক্তব্য, বব ভাবলেই আমার গায়ে কাঁটা দেয়। লোকেরা বলে অনেক সময় যে, এখন আর তেমন ভালো লাগে না। তো আমি বলি, আরে না, এ বব ডিলান। আমার মনে হয়, বব পিকাসোর মতো। লোকেরা বলতেই থাকবে এই যুগটা সেই যুগের থেকে ভালো। সেই সময়টা এই সময়ের থেকে। আর আমি বলে যাব, না, ইনি হচ্ছেন পিকাসো—আমূল তুলনারহিত।”
সারা পৃথিবীর কবিরা ডিলানকে নিয়ে পাগল। তা শুধু ডিলান টমাসের থেকে পাওয়া দ্রুতগামিতার জন্য নয়। লাইফ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিট দলপতি আলেন গিন্সবার্গ জানাচ্ছেন, বব ডিলানের ভাষা অনেকটাই জাক কেরুয়াকের প্ররোচনায়। কী সুন্দর স্মৃতিচারণ করে চলেন গিন্সবার্গ। বললেন গাঁজা ও হাসিসতাড়িত দিনগুলোতে নিউইয়র্কের গ্রিনউইচ পল্লীতে যেমন হয়, সেরকম এক আড্ডায় সেই মর্তবাউলের কথা। “বব আমার হাত থেকে কেরুয়াকের মেক্সিকো সিটি ব্লুজ কেড়ে নিয়ে পড়তে শুরু করে। আমি জানতে চাইলাম, তুমি এর কী বোঝ? তো, ও আমাকে জানাল, ১৯৫৯ সালে এই বইটা কেউ ওকে দিয়েছিল, আর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে যায়। আমি বললাম, কেন? বব জানাল, এই প্রথম কবিতা যা আমার সঙ্গে নিজের ভাষায় কথা বলল।” ডিলানের আপাদমস্তক তো কেরুয়াকের সেইসব বিদ্যুৎচমক-তুল্য কটাক্ষ: সেই দু-চাকার মোটর সাইকেল, জিপসিরানি, কালো ম্যাডোনা আর তার রুপালি চুমকিওলা ফ্যান্টম প্রেমিক। কেরুয়াকের অপ্রত্যাশিত উপমা আর স্বয়ংক্রিয় লেখা, তাতে একটু সুরের ছোঁয়া লাগালেই জনতার সমুদ্র দুলে ওঠে।
তাহলে? আমাদের পুরোনো প্রশ্নে ফিরে যাই। কে বব ডিলান? আসলে, সময়ের জামায় একটা লুকোনো লিপস্টিকের দাগ, যা কোনো ডিটারজেন্ট কেচে পরিষ্কার করতে পারবে না। ষাটদশকের এইসব গোপন চুমুর নাম চে গুয়েভারা, জঁ লুক গোদার, বিটলস সম্প্রদায় এবং অবশ্যই বব ডিলান। আর এই যুগসৌন্দর্যের স্তনাগ্রশিখর: ভিয়েতনাম। যদিও বলা হয় যে বব ডিলান ততটা প্রতিবাদের শিল্পী নন, যদি বলা হয় ইতিহাসে কালো চামড়ার উলকি গেঁথে দেওয়া তাঁর একসময়ের আবেগ, তবুও এই সময়ই তার মিথুনলগ্ন । পিকাসোকে যেমন গের্নিকা থেকে আলাদা করা কঠিন, গোদারকে যেমন ষাট দশকের ঐতিহ্য থেকে টেনে আনা ঐতিহাসিকের পক্ষেও ঝুঁকির, বব ডিলানের ক্ষেত্রেও ষাটের দশক তাই; আর আমাদের পক্ষেও—‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার…. ‘
পঞ্চাশ বছর পরেও স্টকহোম থেকে এই ঘোষণা শোনামাত্র আমাদের পানপাত্রে সোনালি তরল ঝকমক করে ওঠে—‘পরাণসখা বন্ধু হে আমার !
আমরা তাঁকে আজও ভালোবাসি কেন? ভেবে দেখা যায়, গানকে শুধু কবিতার কাছাকাছি না, মুখের ভাষাকে গানের কাছাকাছি করে দেওয়া ডিলানের অবিশ্বাস্য অবদান। গিটার, কিবোর্ড আর হারমোনিকা পরিবেষ্টিত ডিলানকে দেখেই আমাদের মনে হল, পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি। ষাট দশক জুড়ে কেন জানি না, তাত্ত্বিক না হয়েও মনে হয়, আমাদের গান একটু ‘তব, ’ ‘গেনু,’ ‘তনু’ শব্দগুলোকে ভুলতে চাইছিল, যেমন বাংলায়, তেমনই হিন্দিতে। সলিল চৌধুরীর ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’ যদি ‘কভু’ শব্দটিকে এডিট করে আমাদের বুকপকেটে ঢুকে যায়, তাহলে এও ভাবার যে, মহম্মদ রফির গলায় ‘আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কা চর্চা হর জবান পর’— আমাদের শীর্ণ কোমরকেও মোচড় দিয়েছিল। আর হেমন্তর গলায় ‘তুমি এলে অনেকদিনের পরে যেন বৃষ্টি এল’ শুনে আমরা বুঝতে পারি হাজরা মোড় বা ফড়িয়াপুকুরের ট্রামডিপোতে গান আর কবিতার মধ্যে শর্টকাট করা যায়। বব ডিলান বাঙালি যুবকের কাছে বেশ খানিকটা সেরকমই একটি মুহূর্ত। এলভিস প্রিসলি তার আগে আমাদের নাচ শিখিয়েছিলেন। কিন্তু কথা বলে বৃষ্টি ডেকে আনার ম্যাজিক জলে স্থলে প্রথম বব ডিলানেরই। তিনি আমাদের আত্মায় শিলমোহর দেগে দেন তখনই, যখন ষাটের বঞ্চিত, প্রত্যাখ্যাত প্রজন্ম বুঝতে পারে ভুল স্বপ্নে বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই। বব ডিলান তাঁর নাম পালটে নিলেন। আপাতভাবে হয়তো কবি ডিলান টমাসের প্রতি আসক্তি থেকে, কিন্তু অন্তরে ছিল মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। যেন খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে শামুকের তুলতুলে শরীরটা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লেখেন—‘আমি কপাল থেকে ঘামের মতো মুছে নিয়েছি পিতামহের নাম।’ আর তারও আগে আটলান্টিকের ওপারে বব জানান, ‘আমাদের জন্ম ভুল, নাম ভুল বাবা-মার থেকে। এরকম হয়, নিজেকে যা বলার ইচ্ছা, তাই বলো। এই দেশ স্বাধীন।’ তখনও বব সম্যক বুঝতে পারেননি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বাধীন দেশ যেখানে স্বাধীনতা একটি স্ট্যাচুর নাম ।
কীভাবে তিনি কিংবদন্তি হয়ে গেলেন? আমাদের মনে পড়তে পারে, ষাট দশকের শুরুতে তার লোকশ্রুত রূপকথাসমূহ—’ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড,’ ‘দ্য টাইমস দে আর আ চেঞ্জিন’ বা ১৯৬৫ সালের লোকগীতি থেকে ক্রমশ সরে আসা ‘লাইক আ রোলিং স্টোন।’ বাতাসে বিস্ফোরণ কীভাবে ঘটল? ডিলান ‘৬২ সালে গ্রিনউইচ পল্লির একটি কাফেতে, প্রথম শ্রোতাদের জানালেন যে, একটা গান গাইছি যা প্রতিবাদের গান নয়, এমন কিছু কথা যা কেউ কাউকে বলতেই পারে। অনতিকালের মধ্যেই মে মাসের বসন্তে পিট সিগারকে নিয়ে সেই গানটি তিনি আবার গাইলেন আর ক্রমশই এই গানটি হয়ে উঠল নির্যাতিতের আত্মকথা। আমি শুধু এইটুকুই বলতে চাই যে, বব ডিলান রেকর্ড কোম্পানির দাবি করা উল্কাপাত নন, বরং লোকসংগীতের পুনরুজ্জীবনে তাঁর ভূমিকা নিতান্ত পদাতিকের মতো। বস্তুত এই গানের মেলোডি পিট সিগারই প্রথম উল্লেখ করেন। কানাডায় পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাসদের সেই বিখ্যাত গান যার নাম ‘নো মোর অকশন ব্লক,’ সেখান থেকেই এসেছে এইসব যদিও সেই গানের কথা তখনকার রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতাবস্থাকে প্রশ্ন করেছিল। ধরা যেতে পারে ‘ফ্রি হুইলিন’ অ্যালবাম থেকে আর-একটি গানের কথা—‘আ হার্ড রেনস আ গননা ফল’ যা লোকগাথা লর্ড র্যান্ডাল থেকে সংগৃহীত হয়। ডিলানের দূরদর্শিতা হতে পারে, ইতিহাসের কূটাভাস হতে পারে যে, এই গান গাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই কিউবার বিখ্যাত মিসাইল সংকট শুরু হয়। ডিলান কালপুরুষ হয়ে উঠলেন। এই যে, একধরনের বিশেষ গান—বলা যেতে পারে প্রতি-সাংস্কৃতিক উচ্চারণ, তার ভিত্তি একইসঙ্গে অবলুপ্ত চৈতন্য, পরাবাস্তব আর সুরের মিলন। বলাবাহুল্য, ষাট দশক এই স্বাক্ষরটির খোঁজই করছিল।
বিটলস্রা, বিশেষত জর্জ হ্যারিসন এই অ্যালবামটি (ফ্রি হুইলিন) সম্পর্কে বলেছিলেন, “আমরা তো শুধু গেয়েছিলাম। আমরা তো শুধু বাজিয়েছিলাম। এই গানগুলোর বিষয় আর প্রবণতা কী যে সুন্দর আর কী অবিশ্বাস্যভাবে মৌলিক!” বব ডিলান বিষয়ে আমেরিকানরা যদি ভেবে থাকেন যে তিনি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ অথবা মানবাধিকার নিয়ে ভাবেন, তাহলে কলকাতায় আমরা তাঁকে চিনেছিলাম ভাঙনের জয়গানের মধ্যে দিয়ে। হে পাঠক, ভেবে দেখুন, পশ্চিমবাংলায় ষাটের দশক যেন স্থায়ী ভাঙাচোরার দশক। অর্থনৈতিক সংকট বেড়ে যাচ্ছে। সিনেমা হলে যদিও ‘এই পথ যদি না শেষ হয়,’ বাইরে স্বপ্নের জতুগৃহ; ভারত-চিন সীমান্ত সংঘর্ষ আর কমিউনিস্ট পার্টির ভেঙে যাওয়া। এমনকি প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্ররা বিদ্রোহ করছে। গ্রামবাংলায় চাল নেই, একদিন কেরোসিন লাইন থেকে ফেরার পথে পুলিশের গুলিতে নুরুল ইসলাম আর আনন্দ হাইত নামে দুটি কিশোর মারা গেল। তাদের শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে সারা দেশের অনেকটাই অকংগ্রেসি সরকার তৈরি করে দিল। মহাকরণের কংগ্রেসি মহিমাও তখন অস্তমিত হচ্ছে। গ্রামে ভূমিহীনরা খাসজমি দখলের লড়াইয়ে নেমেছে। নকশালবাড়ির স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল তৈরি হয়ে গেল। সেই অশান্তি, দুঃস্বপ্ন আর কারামুক্তির মধ্যে যাদের মনে হয়েছিল সঙ্গী, কোয়াংত্রি শহরে অবরোধ মুক্তির জন্য যে কণ্ঠস্বরের প্রয়োজন হয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম নিশ্চয়ই বব ডিলান ।
পল রবসন ১৯৩৪ সালের এক প্রবন্ধে অভিযোগ করেছিলেন যে, শ্বেতাঙ্গ সভ্যতা প্রজ্ঞাকে নিয়ে পুতুল বানায়। তারা চিন্তার দেবতার পুজো করে কিন্তু নিগ্রোরা অনুভব করতে চায় প্রত্যক্ষ উপলব্ধি। এই প্রত্যক্ষতাকে পাওয়ার জন্যই রবসন নিজেও ‘ওল্ড ম্যান রিভার’—গানটিকে বিষণ্ণ, কালো, লোকঘরানা থেকে উদ্দীপক মার্কিনি কথ্যরীতির কাছাকাছি নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। তিনি নিগ্রো আধ্যাত্মিকতাকে ক্রমশ মিলিয়ে দিতে চাইছিলেন মার্কিনি শ্রমজীবীর মূল সংস্কৃতিতে। বব ডিলানও যখন তাঁর গানে বলেন, ‘উত্তরটা বন্ধু আমার উড়ে বেড়াচ্ছে বাতাসে,’ তখন আমরা বুঝতে পারি ক্রীতদাস সমস্যার উদ্ধৃতি নয়, বব ডিলান চাইছেন সামাজিক সমস্যাকে রোজকার চর্চায় অন্তর্ভুক্ত করতে। ‘
এই একই ঘটনা তাঁকে ঘিরে পৃথিবীতে ঘটছিল। ১৯৬৫ সালে লন্ডনে যখন তিনি ‘ভিয়েতনাম নিয়ে আমাকে কিছু মিথ্যে কথা বলো’ গাইলেন, তখন সারা হল আর তার পাশাপাশি রক্ষণশীল ব্রিটিশ সভ্যতাও দাঁড়িয়ে ওঠে। নক্ষত্রখচিত রাত্রিতে ইংল্যান্ড বব ডিলানের সুরে সুর মিলিয়েই গাইতে থাকে ‘টুনাইট লেটস অল মেক লাভ ইন লন্ডন ।
কিন্তু এর পর থেকেই ধীরে ধীরে অলক্ষিত বনচ্ছায়াতলে বব ডিলান প্রতিবাদের মিছিল থেকে সরে গেলেন। তফাত শুধু, আরও আলো তাঁকে ঢেকে ফেলল। বস্তুত ‘৬৫ সালের গরমে ‘লাইক আ রোলিং স্টোন’-এ একটি ছ-মিনিটের একক তাঁকে কলরব মুখরিত খ্যাতির প্রাঙ্গণ থেকে নিয়ে গেল মিডিয়ার জ্যোতিষ্কলোকে। এই যাওয়া যে সুষম ছিল তা বলতে পারি না । যেমন, বব ডিলান যখন বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা শুরু করলেন তখন তাঁকে সস্তায় বাণিজ্যিকীকরণ বলার লোকের অভাব হয়নি। ‘৭০ সালে তাঁর ‘আত্মপ্রতিকৃতি’ শুনে রোলিং স্টোন লেখক গ্রেসি মার্কার্স আঁতকে উঠেছিলেন—কী আবর্জনা! বব ডিলানের খ্যাতি যত আকাশছোঁয়া হয়ে উঠল ততই তাঁর কিংবদন্তিসমা একদা প্রণয়িনী ও অসামান্য গায়িকা জোন বেইজ-এর মনে হল: ‘Perhaps the picturs in the times could no longer be put in rhymes’.
জোন বেইজের সঙ্গে বব ডিলানের বিচ্ছেদ শুধু চূড়ান্ত হল তাই নয়; ‘we both could have died then and there’—এই আক্ষেপ শুধু একটি নারীপুরুষের প্রণয়বিলাপ নয়, সাধারণভাবে বব ডিলানকে যাঁরা সমাজসংরক্ত শিল্পী বা ইতিহাসের বিবেক ভাবেন, তাঁদের সম্মিলিত আর্তনাদ। তাহলে কি আমাদেরও মেনে নিতে হবে—একটি বিপ্লবী শুধু সোনা রুপোই ভালোবেসেছিল! কোনো সন্দেহ নেই সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের প্রতিটি স্তর ডিলানকে সমৃদ্ধ করেছে। কালো গানের বিষাদ থেকে রক অ্যান্ড রোল, গ্রিক ক্ল্যাসিক্যাল গান, গির্জা সংগীত, ব্রেখট, ভারতীয় বাউল গান কোনো কিছুকেই বব ডিলান পরিহার্য ভাবেননি। অগস্ত্যের আগ্রহে তিনি সংস্কৃতির সমুদ্র শোষণ করেছেন। নির্দয় ভাবে নিজেকে পালটে ফেলেছেন। কত না বন্ধুবিচ্ছেদ, ‘প্রিয়া তারে রুধিল না রাজ্য তারে ছেড়ে দিল পথ, ‘ আজ এই পঁচাত্তর বছর বয়সেও তিনি একাকী কুহেলিকা থেকে যাচ্ছেন।
বস্তুত বব ডিলান, সন্দেহ নেই, সংগীতকে তাঁর জ্যোতির্বলয় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছেন। বৈদ্যুতিক ও ডিজিটাল যুগে শিল্পের সঞ্চারপথ কীভাবে জনপরিসরে নতুন করে আঁকা যেতে পারে, সে বিষয়ে মোৎজার্টের বিকল্প হিসাবে বব ডিলানকে ভাবা যেতে পারে। যে ফ্যানটাসম্যাগোরিয়া বুর্জোয়া সংস্কৃতির সম্পদ তাকে নিয়েই ছিনিমিনি খেলার দুঃসাহস একমাত্র ডিলানেরই আছে। জনসংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নাড়ির সম্পর্ককে হয়তো ওয়াল্টার বেঞ্জামিন দৃষ্টান্ত হিসাবেই বর্ণনা করতেন। কিন্তু একইসঙ্গে ভেবে দেখার যে, ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের আর-এক সারথি থিওডোর আদোনো সমকালীন সংগীতকেও দেখেছিলেন দ্রব্যের বশ্যতা মেনে নিতে। তিনি অসাধারণ বিশ্লেষণে দেখিয়েছিলেন, শ্রোতা কীভাবে ক্রেতায় রূপান্তরিত হয়। আর সেই ক্রেতা কীভাবে নিজের স্বার্থকেই ধ্বংস করে। তরুণ প্রজন্ম যে দ্রুত ছন্দের বব ডিলানকে মেনে নেয়, তার উত্তর হয়তো আদোর্নো বেঁচে থাকলে এভাবেই দিতেন যে, “Their primitivism is not that of the undeveloped but that of the forcibly retarded ‘ সংগীতের জন্য এই উচ্ছাস আসলে এক বন্দির কারাগার বন্দনা। দেয়াল ছাড়া যার আর কিছুই নেই। বব ডিলানের সাংগীতিক বিপ্লব এখানে যে, পপুলার গানকে দিয়ে তিনি সামাজিক গ্লেসিয়ারে ফাটল ধরান। পরিচিতকেই তিনি অপরিচিত করে তোলার সাধনায় মাতেন। তবু ডিলানও খেয়াল করেছেন যে, সংগীতে যা কিছুই নতুন, প্রামাণ্য, রোমাঞ্চকর, তাকেই ইন্ডাস্ট্রি ছাঁচে ঢালাই করে নিতে চায়।
বব ডিলান ততটা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে চিন্তিত নন, যতটা চিন্তিত সংগীতের পণ্যপুতুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায়। আর এই জন্যেই তিনি প্রতিমুহূর্তেই তাঁর পদচিহ্নগুলো মুছে ফেলতে চান।
বব ডিলান ‘রক্তকরবী’র রাজার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে চান, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু নন্দিনী কোথায়? এ আজও তাঁর অজানা রয়ে গেল।
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
শিলাদিত্য, ২০১৬

